॥ আমীন আহম্মদ চৌধূরী বীরবিক্রম ॥
(নিবন্ধটির প্রথমাংশ গতকাল প্রকাশিত হয়েছে, আজ পড়–ন বাকি অংশ)
বাংলাদেশের রাস্তাঘাট, রেল ও জলপথ বিশেষ করে গভীর সমুদ্রবন্দর পার্শ্ববর্তী ও আঞ্চলিক দেশগুলোর ব্যবহারের জন্য সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়া ও দণি চীন অঞ্চল (পরে নিকটবর্তী আসিয়ান দেশ) সমন্বয়ে একটি ইকোনমিক জোন সৃষ্টি করা সম্ভব। যাতে প্রত্যেক দেশ ব্যবসায়-বাণিজ্য সম্প্রসারিত করে, নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন করতে পারে। আমাদের অঙ্ক কষে দেখতে হবে ৪০ টন লরি ও তদূর্ধ্ব মালবাহী লরি কত দ্রুত বেনাপোল, পঞ্চগড়, সিলেট ও আগরতলা থেকে মালবাহী লরি, ইলেকট্রিক গুডস ট্রেনে ও ইঞ্জিন বোটের মাধ্যমে সমুদ্রবন্দরে (যার গভীরতা ২১ মি. হতে হবে) স্থল ও জলপথে কত সহজে পৌঁছতে পারে। সে অনুযায়ী উন্নতমানের রাস্তাঘাট নির্মাণ করা। মালামাল পৌঁছাতে যাতায়াতের জন্য ভিসা ও মুদ্রা (কমন মুদ্রা) ভাঙানোর ঝক্কি যাতে বেশি পোহাতে না হয়। থাকা-খাওয়া ও ই-মেইল, ই-কমার্স ও ব্যাংকিংসহ মাল স্টোরেজ করার সুবিধা থাকতে হবে। বেনাপোল থেকে সোজা লাকসাম হয়ে বা ভোলার ওপর দিয়ে মাইজদী হয়ে চট্টগ্রাম (সোজা চার লেইনের রাস্তাÑ দুই পাশে খাল ও রেল যোগাযোগ থাকবে) গভীর সমুদ্রবন্দরে আড়াই ঘণ্টায় যেন পৌঁছে এবং পঞ্চগড় থেকে ৪ ঘণ্টায়। অর্থাৎ চীনের দণিাঞ্চল থেকে ভারতের ভূখণ্ডের ভেতর দিয়ে ছয় ঘণ্টায় চট্টগ্রাম গভীর সমুদ্রবন্দরে মালামাল পৌঁছে। যাতে করে শুরুতেই চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে দৈনিক লেনদেন ৪০০ মিলিয়ন ডলারের মতো হয়, যা অচিরেই উন্নীত হয়ে হবে দুই বিলিয়ন ডলার। একই সাথে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো একই মুদ্রা ব্যবহার করে নিজেদের মালের ও ব্যবসার স্বার্থ সংরক্ষণ করতে পারে। ভিন্ন ভিন্ন দেশের মালামাল ভারতসহ অন্যান্য দেশের ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে যাবে বলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো যাতায়াত বাবদ রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারবে। বস্তুত ভারতকে প্রধান করে সংশ্লিষ্ট অংশগ্রহণকারী দেশগুলোকে সদস্য করে একটি রেগুলেটরি বডি এবং একইভাবে বাংলাদেশকে প্রধান করে একটি বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা। তাতে অংশগ্রহণকারী এজেন্সি ও দেশগুলোর মাঝে করপোরেট কালচার ডেভেলপ করবে। কানেকটিভিটি বহুলাংশে বেড়ে যাবে। সম্ভাবনার এই অপার দ্বারের কথা ভারতকে ভালো করে বোঝাতে হবে। ভৌত অবকাঠামোসহ রেল, স্থল ও জলপথ আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে গড়ে তুলে ২১ মি. ড্রাফটসম্পন্ন গভীর সমুদ্রবন্দর যথাশীঘ্র্র তৈরি করতে পারলেই এশিয়ান হাইওয়ের সক্রিয় পার্টনার হতে পারবে বাংলাদেশ এবং ভারতসহ পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশের সাথে সামগ্রিক উন্নয়নসহ ব্যবসায়-বাণিজ্য সম্প্রসারণ করার উদ্দেশ্যে বন্ধুত্বের হাত সম্প্রসারিত করবে। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত এ বিষয়াবলি হ্যান্ডল করার মতো কোনো ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেনি। তথ্যসমৃদ্ধ কোনো মাস্টারপ্ল্যান বা কোনো বৈজ্ঞানিক পেপার তৈরি করেনি। রাস্তাঘাট ৪০ টন ও তদূর্ধ্ব লরি, ভ্যান চলাচলের উপযুক্ত হতে হবে। রাস্তায় ব্যাংকিং, মেইনটেন্যান্স সুবিধাসহ হোটেল, স্টোর, গুদামঘর ইত্যাদি তৈরি করতে হবে। এশিয়ান হাইওয়ের সাথে সংযোগ রাস্তা অবিলম্বে নির্মাণ ও জলপথকে উন্নতমানের করতে হবে। রেলকে আন্তর্জাতিক মানের করে গড়ে তুলতে হবে। মালামাল পৌঁছানোর গতি দ্রুত থেকে দ্রুততর করতে হবে। এখন পর্যন্ত গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের কোনো খোঁজ নেই।
নিউকিয়ার পাওয়ার প্লান্ট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ওষুধ এবং কৃষিকাজে উৎপাদন বাড়ার সুদূরপ্রসারী কোনো পরিকল্পনা এখনো হাতে নেয়া হয়নি। নিউকিয়ার পাওয়ার প্লান্টের মাধ্যমে বিদ্যুৎ তৈরিতে ওভারহেড খরচাদি অনেক বেশি কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু সুদূরপ্রসারী ফলাফল বাংলাদেশের অনুকূলে। সে জন্য এ প্রকল্প পদ্মা ব্রিজের চেয়েও অনেক বেশি অগ্রাধিকার পেতে হবে। থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার সম্মতিক্রমে ও সিঙ্গাপুরের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে থাইল্যান্ডের বেথুন এলাকায় পানামা খালের মতো একটি সংযোগ খাল কাটা হলে চট্টগ্রাম সামুদ্রিক বন্দর থেকে প্যাসিফিক বা প্রশান্ত মহাসাগরের সাথে দূরত্ব অনেকখানি কমে আসবে। চিন্তা ও চেতনা উঁচুমানের করতে হবে। প্রকল্প আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে। তবেই ভারতসহ অন্যান্য দেশ বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করবে। পুঁজি বিনিয়োগের সম্ভাবনা বাড়বে বহু গুণ। ছোট চিন্তা করলে শাঁখারীপট্টি বানানো সম্ভব কিন্তু সংসদ ভবন নয়। একইভাবে বিশাল দেশ ভারতকে বন্ধু হিসেবে পেতে হলে তার ওজনকে সহ্য করার মতো মনমানসিকতা ও সাহস সঞ্চয় করতে হবে।
১৯৪০ দশকের দলাদলির রাজনীতি ও ২৪ বছর পাকিস্তানি শাসকদের অপশাসন এবং ১৯৭১ সালে তাদের পৈশাচিক নির্যাতন, লুট, হত্যা, শোষণ আমাদের মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে। ব্রিটিশ ভারতের দিকে তাকালে আমাদের মনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দোসর ও লাঠিয়াল বাংলার জমিদারদের অত্যাচার ও নির্লজ্জ শোষণের কথা, ১১৭৬ সালের মন্বন্তর ও ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভি এবং কলকাতাসহ বিভিন্ন স্থানে লোমহর্ষক দাঙ্গার কথা মনে পড়ে। বেপরোয়া হয়ে আমাদের বাপ-দাদারা পাকিস্তান আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। ঝাঁপিয়ে পড়ে শেষ পর্যন্ত আমরা পাঞ্জাবি মুসলমানদের খপ্পরে পড়ে যাই। তাই আমাদেরকে প্রচণ্ডভাবে শিকল ভাঙার গান গাইতে হলো। পাকিস্তানের দুষ্টচক্র থেকে আমরা মুক্ত হলাম। পাকিস্তান থেকে বের হয়ে আমরা আবার আরেকটা দাঙ্গাবাজ দুষ্টুচক্রের দ্বারা নিগৃহীত হতে চাই না। ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়। আমাদের অবস্থা এখন অনেকটা সে রকম। আমরা উচ্চশিতি নাজিমউদ্দিনের মতো অতি ভদ্রলোক অথচ কোমরভাঙা নীতিনির্ধারক চাইনি। আমরা ইসলামিয়া কলেজের বিএ পাস করা ঘাড়তেড়া শেখ মুজিবের মতো নীতিনির্ধারক চাই। সে জন্য চাই দেশপ্রেমে উদ্ভাসিত, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বলীয়ান মাথা উঁচু করা দণ্ডায়মান বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর মাঝে বহমান হোক সুস্থ, আন্তরিক ও স্বচ্ছ জনকল্যাণমুখী চিন্তাধারা। সেই ধারায় সিক্ত হয়ে বাংলাদেশ ভারতের সাথে আত্মিক যোগাযোগ স্থাপন করুক। খোলামেলা আলোচনা করুক। দুই দেশের সাধারণ মানুষের গমনাগমনকে সহজতর করে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃৃঢ় থেকে দৃঢ়তর করুক। নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে যে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ নির্মূল করা ও ব্যবসায়-বাণিজ্য সম্প্রসারিত করার মাঝে উভয় দেশের সাধারণ মানুষের মঙ্গল নিহিত আছে। সম্পর্কোন্নয়নের েেত্র কোনো ধরনের হীনম্মন্যতার আশ্রয় না নেয়া। কারণ বাংলাদেশ-ভারত প্রধানত ভৌগোলিক অবস্থার কারণে বন্ধু হওয়া ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর কিন্তু নেই। তবুও আমরা ছলচাতুরীর আশ্রয় নিই। অথচ ভারত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সম্মিলিতভাবে পরাশক্তির থাবা থেকে বঙ্গোপসাগরকে বাঁচিয়ে রাখার হিম্মত রাখে। সে জন্য দরকার ছলচাতুরী নয়, একে অপরকে বিশ্বাস করা। আইনসম্মত ও ন্যায়সঙ্গত রাজনৈতিক সমাধান দরদের সাথে খুঁজে বের করা। তবেই দণি এশিয়া হয়ে উঠবে আদর্শ শক্তিশালী এক আবাসস্থল।
বিশ্বমানের শিক্ষক মনমোহন সিং ঢাকায় এসে সহজ-সরল ব্যবহার দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের হৃদয় জয় করে গেলেও দিল্লিতে বসে থাকা নীতিনির্ধারকেরা তার দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার ব্যাপারে ততটা আন্তরিক নন। কারণ তারা তাদের প্রজেক্ট সময়মতো শেষ করে ভারতকে পরাশক্তিতে রূপান্তরিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সেটাই তাদের জন্য বেশি প্রণিধানযোগ্য। বাংলাদেশ হইচই করলে পরে দেখা যাবে। তাতে সম্পর্কের যে চিড় ধরতে পারে এবং তাদের প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি বাংলাদেশের মানুষের কাছে ফিকে হতে পারে সে বিষয়ে মনে হয় তারা মোটেও চিন্তিত নন। কারণ তারা বন্ধুত্বের চেয়েও খবরদারিতে বিশ্বাসী। এ ধরনের মনমানসিকতার জন্যই কিন্তু পাকিস্তান ভেঙে যায়। আর এ ধরনের খবরদারি মনমানসিকতার জন্য ভারতের সাথে বহু ভালো ভালো চুক্তি স¤পাদিত হলেও বাস্তবে দেখা যায় যে সেগুলো বছরের পর বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও বাস্তবায়ন হয় না। তাতে লোকে আশাহত হয়ে পড়ে। এ বিষয়ে উন্নতি সাধনকল্পে ভারতকে এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর মনে এমন আশঙ্কা কেমন করে উদিত হলো যে বাংলাদেশের লোক সাম্প্রদায়িক এবং বাংলাদেশে পটপরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাকিস্তান আমলে পাঞ্জাবি ডমিনেটেড গোয়েন্দা সংস্থা যেমন মনগড়া রিপোর্ট দিয়ে নানা ধরনের বিভ্রান্তি ছড়াত, এটাও সে ধরনের একটি কার্যকলাপ। মেধা, চিন্তা ও চেতনায় পূর্ব ও পশ্চিম পাঞ্জাবের অধিবাসীদের মধ্যে তেমন কোনো ফারাক নেই। এক দিকে আছে সংখ্যাগরিষ্ঠ পাঞ্জাবি মুসলমান আরেক দিকে আছে সংখ্যাগরিষ্ঠ পাঞ্জাবি হিন্দু ও শিখ। ফারাক শুধু এটুকু। ২৮ মার্চ ১৯৭১ সালে ঢাকার ভিনদেশী এক বাঙালি ডিপ্লোম্যাটের কলেজপড়–য়া মেয়ে কেঁদে কেঁদে বলেছিল যে দুই দিকের পাঞ্জাবি একত্রে মিলে বাঙালিকে একেবারে পিষে ফেলবে। ভারত পাকিস্তানের মতো শোষণ ও খবরদারির মনোভাব নিয়ে বাংলাদেশের দিকে কপট বন্ধুত্বের হাত বাড়ালে বাংলাদেশ ঝামেলায় পড়বে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সাথে সাথে এই কপট বন্ধুত্বের কারণে বাংলাদেশের মতো ভারতের কপালেও দুঃখ আছে।
বাঙালি মুসলমান মনেপ্রাণে মুসলমান, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ইসলামকে সে অন্তরের অন্তস্তল থেকে ভালোবাসে। সে যখন নিজেকে নিজেই শাসন করার সুযোগ পায় তখন সে একেবারে অসাম্প্রদায়িক। কিন্তু খবরদারির ছলে কেউ তাকে যখন অসাম্প্রদায়িক হতে বলে তখন সে সত্যি সত্যি সাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠে। এই স্পর্শকাতর বিষয়টি বাংলাদেশীদের ওপর ছেড়ে দেয়াই ভারতের জন্য সবচেয়ে বেশি বুদ্ধিমানের কাজ হবে। বিনা কারণে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে অতিরিক্ত মাতামাতি না করা। রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর প্রধান ও প্রিয়তম কবি। কবি, সাহিত্যিক, শিল্পীরা কোনো বিশেষ দেশের নাগরিক হলেও তারা কিন্তু বিশ্বনাগরিক। তার পরও বলতে হয় জন্ম, কর্ম ও নাগরিক হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ভারতবাসী। তবু ১৯৬১ সালে সেই পাকিস্তানের আইয়ুবের শক্ত মার্শাল ল উপো করে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বাংলাদেশের মানুষ রবীন্দ্রশতবার্ষিকী নিজেদের পকেটের টাকা খরচ করে পুলিশি হুলিয়া মাথায় বহন করে সগৌরবে উদযাপিত করেছিল। কোনো দূতাবাসের বা সরকারের কোনো সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা লাগেনি বলেই সেই অনুষ্ঠান হয়েছিল জনগণের প্রাণের অনুষ্ঠান। বিশ্বকবিকে তার প্রাপ্য সম্মান দেয়াই ছিল স্বতঃপ্রণোদিত সাধারণ মানুষের আন্তরিক প্রয়াস। ছিল না কোনো ভণিতা, ন্যাকামি বা ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের কোনো গন্ধ। ১৯৬০ দশকে খাজা সাহাব উদ্দীন চাচ্ছিলেন আমরা রবীন্দ্রনাথকে ভুলে যাই। ফল হলো উল্টো। বাংলাদেশের সর্বত্র রবীন্দ্রচর্চা বেড়ে যায় বহু গুণ। জন্ম নিলো ছায়ানটের মতো ছায়ানিবিড় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। অথচ রবীন্দ্রজন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠান যখন সরকার বা দূতাবাসের সহায়তায় অনুষ্ঠিত হয় তখন তা হয়ে ওঠে নিছক তাঁবেদারদের অনুষ্ঠান। সেখানে প্রাণের কোনো ছোঁয়া থাকে না। তাদের খপ্পরে পড়ে ১৫০ বছরের বৃদ্ধ কবির কঙ্কাল দেহটি দম বন্ধ হয়ে আপনা আপনি মারা পড়বে। রবীন্দ্রনাথকে ভর করে আমাদেরকে অসাম্প্রদায়িক হতে হবে না।
বাংলাদেশের মানুষ আন্তরিকভাবে মুসলমান তবে বেশির ভাগই একেবারে অসাম্প্রদায়িক। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি। আমাদের সবার একান্ত আদরের ধনÑ গৌরবের ধন। কবিকে সেখানেই থাকতে দিন। রাজনীতির নোংরা গলিতে তাকে অনুগ্রহ করে নিয়ে আসবেন না। ভুলে গেলে চলবে না যে দশ চক্রে ভগবান ভূত হওয়ার মতো ঋষীকবি রবীন্দ্রনাথ ‘বর্গি এলো দেশে...’ গান বা কবিতা আবৃত্তি করে বাংলাদেশের মায়ের সন্তানকে ঘুম পাড়ানোর প্রয়াসকে উপো করে অহেতুক শিবাজিকে নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন। পরে অবশ্য দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। একইভাবে কলকাতার বাবুদের উন্নাসিকতা ও সাম্প্রদায়িক মনোভাবের কারণে রবীন্দ্রনাথ শেষ পর্যন্ত বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। বস্তুত এ অঞ্চলে মৌলবাদী রাজনীতির আশ্রয় কেন্দ্র কিন্তু ভারত ও পাকিস্তানে। প্রয়োজনের তাগিদে ও আধিপত্য বিস্তারের তাগিদে বিকল্প শক্তি হিসেবে তাদের রসদপত্র ও ট্রেনিংয়ের জোগান দিয়ে আসছে ভারত ও পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। বেশির ভাগ েেত্রই বদ্ধমূল ধারণা থেকে কিংবা না বুঝে বরং ব্যক্তিগতভাবে টাকা বানানো তথা কমিশন পাওয়ার লোভে বা অস্ত্র বিক্রি করার ফিকির-ফন্দিতে তারা এসব কাজ প্রকল্প হিসেবে হাতে নেয়। পরে দেখা যায় ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের মতো এসব সন্ত্রাসী হাতের নাগালের বাইরে চলে যায়। বাংলাদেশকে এসব অপকর্ম থেকে অবশ্যই দূরে থাকতে হবে।
সঙ্গত কারণে মনে হয় ভারতের নীতিনির্ধারকের কাছে গ্রেটার বেঙ্গল কনসেপ্ট এখনো একটি ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতা। সে জন্য তারা আনন্দিত হবে যদি বাংলাদেশে কট্টর ইসলামপন্থীরা শাসন জারি করে। তাতে করে পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতে একটি উপ-আঞ্চলিক শক্তির বিকাশ ঘটার সম্ভাবনা তিরোহিত হবে। তবে প্রচণ্ড ধরনের ঝুঁকি আছে যে কট্টরপন্থীদের শেষ পর্যন্ত নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা অনেক দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এসব সেকেলে চিন্তাধারা দূরে সরিয়ে এই মুহূর্তে বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশেরই মনমোহন সিংয়ের সফরকে মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করে সুসম্পর্কের জাল বুনতে শুরু করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে। ভারতের নীতিনির্ধারকদের উপলব্ধি করতে হবে যে বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্তান নয়, বরং আবহমান কালের অসাম্প্রদায়িক পূর্ববঙ্গ। দণি এশিয়ার স্থিতিশীলতায় স্বাধীন ও সার্বভৌম জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশ একটি শক্ত স্তম্ভ। ভারতের নীতিনির্ধারকেরা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের দেখছে প্রতিনিয়ত, কিন্তু তাদের পূর্ববঙ্গের বাঙালিদের সমন্ধে সম্যক কোনো ধারণা নেই। জ্যোতি বসুকে কায়দা করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে দেয়া হয়নি, তাতে পশ্চিমবঙ্গে কোনো হরতাল বা অসহযোগ আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। অথচ পূর্ববঙ্গবাসী বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বানাতে গিয়ে প্রাথমিকভাবে সর্বাত্মক হরতাল ও অভূতপূর্ব অসহযোগ আন্দোলন গড়ে তুলে শেষ পর্যন্ত হাতে অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধে নেমে যায়। ফারাকটা সূক্ষ্ম হলেও মোটা দাগের ফারাক। ভারতকে তা অনুধাবন করতে হবে। বাংলাদেশের ওপর খবরদারি না করে আপনজন হিসেবে ভারত বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ালে বাংলাদেশের সাথে সাথে ভারতও লাভবান হবে প্রচণ্ডভাবে। তা না হলে ভারতকে খবরদারি জারি রাখার জন্য সূক্ষ্ম স্নায়ুযুদ্ধ চালাতে হবে। তাতে সময় ও এনার্জির অপচয় হবে। তাতে করে বন্ধুত্বের চিড় ধরাই স্বাভাবিক।
১৯৪০ দশকের অসুস্থ রাজনীতি থেকে বের হয়ে ২৪ বছর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সাথে প্রথমে স্নায়ুযুদ্ধ ও পরে প্রত্যক্ষ যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করে রাজনৈতিক চিন্তা ও চেতনায় বাংলাদেশীদের যে উত্তরণ ঘটেছে তা থেকে বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে পিছু হটা কোনোক্রমেই সম্ভব নয়; বরং নিজ ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি অবিচল আস্থা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বলীয়ান বাংলাদেশীরা সামনের দিকে এগিয়ে যাবে অপ্রতিহত গতিতে। ১৫০ মিলিয়ন মানুষের অগ্রযাত্রাকে রোধ করার ক্ষমতা খোদ ভারতের নেই। হয়তো বা সাময়িক বাধা সৃষ্টি করতে পারে। বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। তবে লেবু বেশি করে কচলালে তেতো হয়ে যায়। বেশি দরকষাকষি করে এবং চালাকি করে কায়েমি স্বার্থ হাসিল করতে গেলে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সাথে সাথে উত্তর-পূর্ব ভারত অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে। বাংলাদেশের অলিগলিতে ভারত প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থায় চলে যাবে। সেই অস্থিতিশীলতার কারণে বাংলাদেশ তিগ্রস্ত হবে প্রচণ্ডভাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি তিগ্রস্ত হবে ভারত। ভারতের একক জাতীয়তাবাদের ভিত একেবারে নড়বড়ে হয়ে যাবে। তাই উভয় দেশের মঙ্গলার্থে সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব একান্তভাবে কাম্য।
লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্ত।
sejdach@gmail.com
(নিবন্ধটির প্রথমাংশ গতকাল প্রকাশিত হয়েছে, আজ পড়–ন বাকি অংশ)
বাংলাদেশের রাস্তাঘাট, রেল ও জলপথ বিশেষ করে গভীর সমুদ্রবন্দর পার্শ্ববর্তী ও আঞ্চলিক দেশগুলোর ব্যবহারের জন্য সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়া ও দণি চীন অঞ্চল (পরে নিকটবর্তী আসিয়ান দেশ) সমন্বয়ে একটি ইকোনমিক জোন সৃষ্টি করা সম্ভব। যাতে প্রত্যেক দেশ ব্যবসায়-বাণিজ্য সম্প্রসারিত করে, নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন করতে পারে। আমাদের অঙ্ক কষে দেখতে হবে ৪০ টন লরি ও তদূর্ধ্ব মালবাহী লরি কত দ্রুত বেনাপোল, পঞ্চগড়, সিলেট ও আগরতলা থেকে মালবাহী লরি, ইলেকট্রিক গুডস ট্রেনে ও ইঞ্জিন বোটের মাধ্যমে সমুদ্রবন্দরে (যার গভীরতা ২১ মি. হতে হবে) স্থল ও জলপথে কত সহজে পৌঁছতে পারে। সে অনুযায়ী উন্নতমানের রাস্তাঘাট নির্মাণ করা। মালামাল পৌঁছাতে যাতায়াতের জন্য ভিসা ও মুদ্রা (কমন মুদ্রা) ভাঙানোর ঝক্কি যাতে বেশি পোহাতে না হয়। থাকা-খাওয়া ও ই-মেইল, ই-কমার্স ও ব্যাংকিংসহ মাল স্টোরেজ করার সুবিধা থাকতে হবে। বেনাপোল থেকে সোজা লাকসাম হয়ে বা ভোলার ওপর দিয়ে মাইজদী হয়ে চট্টগ্রাম (সোজা চার লেইনের রাস্তাÑ দুই পাশে খাল ও রেল যোগাযোগ থাকবে) গভীর সমুদ্রবন্দরে আড়াই ঘণ্টায় যেন পৌঁছে এবং পঞ্চগড় থেকে ৪ ঘণ্টায়। অর্থাৎ চীনের দণিাঞ্চল থেকে ভারতের ভূখণ্ডের ভেতর দিয়ে ছয় ঘণ্টায় চট্টগ্রাম গভীর সমুদ্রবন্দরে মালামাল পৌঁছে। যাতে করে শুরুতেই চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে দৈনিক লেনদেন ৪০০ মিলিয়ন ডলারের মতো হয়, যা অচিরেই উন্নীত হয়ে হবে দুই বিলিয়ন ডলার। একই সাথে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো একই মুদ্রা ব্যবহার করে নিজেদের মালের ও ব্যবসার স্বার্থ সংরক্ষণ করতে পারে। ভিন্ন ভিন্ন দেশের মালামাল ভারতসহ অন্যান্য দেশের ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে যাবে বলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো যাতায়াত বাবদ রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারবে। বস্তুত ভারতকে প্রধান করে সংশ্লিষ্ট অংশগ্রহণকারী দেশগুলোকে সদস্য করে একটি রেগুলেটরি বডি এবং একইভাবে বাংলাদেশকে প্রধান করে একটি বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা। তাতে অংশগ্রহণকারী এজেন্সি ও দেশগুলোর মাঝে করপোরেট কালচার ডেভেলপ করবে। কানেকটিভিটি বহুলাংশে বেড়ে যাবে। সম্ভাবনার এই অপার দ্বারের কথা ভারতকে ভালো করে বোঝাতে হবে। ভৌত অবকাঠামোসহ রেল, স্থল ও জলপথ আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে গড়ে তুলে ২১ মি. ড্রাফটসম্পন্ন গভীর সমুদ্রবন্দর যথাশীঘ্র্র তৈরি করতে পারলেই এশিয়ান হাইওয়ের সক্রিয় পার্টনার হতে পারবে বাংলাদেশ এবং ভারতসহ পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশের সাথে সামগ্রিক উন্নয়নসহ ব্যবসায়-বাণিজ্য সম্প্রসারণ করার উদ্দেশ্যে বন্ধুত্বের হাত সম্প্রসারিত করবে। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত এ বিষয়াবলি হ্যান্ডল করার মতো কোনো ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেনি। তথ্যসমৃদ্ধ কোনো মাস্টারপ্ল্যান বা কোনো বৈজ্ঞানিক পেপার তৈরি করেনি। রাস্তাঘাট ৪০ টন ও তদূর্ধ্ব লরি, ভ্যান চলাচলের উপযুক্ত হতে হবে। রাস্তায় ব্যাংকিং, মেইনটেন্যান্স সুবিধাসহ হোটেল, স্টোর, গুদামঘর ইত্যাদি তৈরি করতে হবে। এশিয়ান হাইওয়ের সাথে সংযোগ রাস্তা অবিলম্বে নির্মাণ ও জলপথকে উন্নতমানের করতে হবে। রেলকে আন্তর্জাতিক মানের করে গড়ে তুলতে হবে। মালামাল পৌঁছানোর গতি দ্রুত থেকে দ্রুততর করতে হবে। এখন পর্যন্ত গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের কোনো খোঁজ নেই।
নিউকিয়ার পাওয়ার প্লান্ট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ওষুধ এবং কৃষিকাজে উৎপাদন বাড়ার সুদূরপ্রসারী কোনো পরিকল্পনা এখনো হাতে নেয়া হয়নি। নিউকিয়ার পাওয়ার প্লান্টের মাধ্যমে বিদ্যুৎ তৈরিতে ওভারহেড খরচাদি অনেক বেশি কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু সুদূরপ্রসারী ফলাফল বাংলাদেশের অনুকূলে। সে জন্য এ প্রকল্প পদ্মা ব্রিজের চেয়েও অনেক বেশি অগ্রাধিকার পেতে হবে। থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার সম্মতিক্রমে ও সিঙ্গাপুরের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে থাইল্যান্ডের বেথুন এলাকায় পানামা খালের মতো একটি সংযোগ খাল কাটা হলে চট্টগ্রাম সামুদ্রিক বন্দর থেকে প্যাসিফিক বা প্রশান্ত মহাসাগরের সাথে দূরত্ব অনেকখানি কমে আসবে। চিন্তা ও চেতনা উঁচুমানের করতে হবে। প্রকল্প আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে। তবেই ভারতসহ অন্যান্য দেশ বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করবে। পুঁজি বিনিয়োগের সম্ভাবনা বাড়বে বহু গুণ। ছোট চিন্তা করলে শাঁখারীপট্টি বানানো সম্ভব কিন্তু সংসদ ভবন নয়। একইভাবে বিশাল দেশ ভারতকে বন্ধু হিসেবে পেতে হলে তার ওজনকে সহ্য করার মতো মনমানসিকতা ও সাহস সঞ্চয় করতে হবে।
১৯৪০ দশকের দলাদলির রাজনীতি ও ২৪ বছর পাকিস্তানি শাসকদের অপশাসন এবং ১৯৭১ সালে তাদের পৈশাচিক নির্যাতন, লুট, হত্যা, শোষণ আমাদের মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে। ব্রিটিশ ভারতের দিকে তাকালে আমাদের মনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দোসর ও লাঠিয়াল বাংলার জমিদারদের অত্যাচার ও নির্লজ্জ শোষণের কথা, ১১৭৬ সালের মন্বন্তর ও ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভি এবং কলকাতাসহ বিভিন্ন স্থানে লোমহর্ষক দাঙ্গার কথা মনে পড়ে। বেপরোয়া হয়ে আমাদের বাপ-দাদারা পাকিস্তান আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। ঝাঁপিয়ে পড়ে শেষ পর্যন্ত আমরা পাঞ্জাবি মুসলমানদের খপ্পরে পড়ে যাই। তাই আমাদেরকে প্রচণ্ডভাবে শিকল ভাঙার গান গাইতে হলো। পাকিস্তানের দুষ্টচক্র থেকে আমরা মুক্ত হলাম। পাকিস্তান থেকে বের হয়ে আমরা আবার আরেকটা দাঙ্গাবাজ দুষ্টুচক্রের দ্বারা নিগৃহীত হতে চাই না। ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়। আমাদের অবস্থা এখন অনেকটা সে রকম। আমরা উচ্চশিতি নাজিমউদ্দিনের মতো অতি ভদ্রলোক অথচ কোমরভাঙা নীতিনির্ধারক চাইনি। আমরা ইসলামিয়া কলেজের বিএ পাস করা ঘাড়তেড়া শেখ মুজিবের মতো নীতিনির্ধারক চাই। সে জন্য চাই দেশপ্রেমে উদ্ভাসিত, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বলীয়ান মাথা উঁচু করা দণ্ডায়মান বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর মাঝে বহমান হোক সুস্থ, আন্তরিক ও স্বচ্ছ জনকল্যাণমুখী চিন্তাধারা। সেই ধারায় সিক্ত হয়ে বাংলাদেশ ভারতের সাথে আত্মিক যোগাযোগ স্থাপন করুক। খোলামেলা আলোচনা করুক। দুই দেশের সাধারণ মানুষের গমনাগমনকে সহজতর করে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃৃঢ় থেকে দৃঢ়তর করুক। নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে যে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ নির্মূল করা ও ব্যবসায়-বাণিজ্য সম্প্রসারিত করার মাঝে উভয় দেশের সাধারণ মানুষের মঙ্গল নিহিত আছে। সম্পর্কোন্নয়নের েেত্র কোনো ধরনের হীনম্মন্যতার আশ্রয় না নেয়া। কারণ বাংলাদেশ-ভারত প্রধানত ভৌগোলিক অবস্থার কারণে বন্ধু হওয়া ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর কিন্তু নেই। তবুও আমরা ছলচাতুরীর আশ্রয় নিই। অথচ ভারত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সম্মিলিতভাবে পরাশক্তির থাবা থেকে বঙ্গোপসাগরকে বাঁচিয়ে রাখার হিম্মত রাখে। সে জন্য দরকার ছলচাতুরী নয়, একে অপরকে বিশ্বাস করা। আইনসম্মত ও ন্যায়সঙ্গত রাজনৈতিক সমাধান দরদের সাথে খুঁজে বের করা। তবেই দণি এশিয়া হয়ে উঠবে আদর্শ শক্তিশালী এক আবাসস্থল।
বিশ্বমানের শিক্ষক মনমোহন সিং ঢাকায় এসে সহজ-সরল ব্যবহার দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের হৃদয় জয় করে গেলেও দিল্লিতে বসে থাকা নীতিনির্ধারকেরা তার দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার ব্যাপারে ততটা আন্তরিক নন। কারণ তারা তাদের প্রজেক্ট সময়মতো শেষ করে ভারতকে পরাশক্তিতে রূপান্তরিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সেটাই তাদের জন্য বেশি প্রণিধানযোগ্য। বাংলাদেশ হইচই করলে পরে দেখা যাবে। তাতে সম্পর্কের যে চিড় ধরতে পারে এবং তাদের প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি বাংলাদেশের মানুষের কাছে ফিকে হতে পারে সে বিষয়ে মনে হয় তারা মোটেও চিন্তিত নন। কারণ তারা বন্ধুত্বের চেয়েও খবরদারিতে বিশ্বাসী। এ ধরনের মনমানসিকতার জন্যই কিন্তু পাকিস্তান ভেঙে যায়। আর এ ধরনের খবরদারি মনমানসিকতার জন্য ভারতের সাথে বহু ভালো ভালো চুক্তি স¤পাদিত হলেও বাস্তবে দেখা যায় যে সেগুলো বছরের পর বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও বাস্তবায়ন হয় না। তাতে লোকে আশাহত হয়ে পড়ে। এ বিষয়ে উন্নতি সাধনকল্পে ভারতকে এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর মনে এমন আশঙ্কা কেমন করে উদিত হলো যে বাংলাদেশের লোক সাম্প্রদায়িক এবং বাংলাদেশে পটপরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাকিস্তান আমলে পাঞ্জাবি ডমিনেটেড গোয়েন্দা সংস্থা যেমন মনগড়া রিপোর্ট দিয়ে নানা ধরনের বিভ্রান্তি ছড়াত, এটাও সে ধরনের একটি কার্যকলাপ। মেধা, চিন্তা ও চেতনায় পূর্ব ও পশ্চিম পাঞ্জাবের অধিবাসীদের মধ্যে তেমন কোনো ফারাক নেই। এক দিকে আছে সংখ্যাগরিষ্ঠ পাঞ্জাবি মুসলমান আরেক দিকে আছে সংখ্যাগরিষ্ঠ পাঞ্জাবি হিন্দু ও শিখ। ফারাক শুধু এটুকু। ২৮ মার্চ ১৯৭১ সালে ঢাকার ভিনদেশী এক বাঙালি ডিপ্লোম্যাটের কলেজপড়–য়া মেয়ে কেঁদে কেঁদে বলেছিল যে দুই দিকের পাঞ্জাবি একত্রে মিলে বাঙালিকে একেবারে পিষে ফেলবে। ভারত পাকিস্তানের মতো শোষণ ও খবরদারির মনোভাব নিয়ে বাংলাদেশের দিকে কপট বন্ধুত্বের হাত বাড়ালে বাংলাদেশ ঝামেলায় পড়বে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সাথে সাথে এই কপট বন্ধুত্বের কারণে বাংলাদেশের মতো ভারতের কপালেও দুঃখ আছে।
বাঙালি মুসলমান মনেপ্রাণে মুসলমান, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ইসলামকে সে অন্তরের অন্তস্তল থেকে ভালোবাসে। সে যখন নিজেকে নিজেই শাসন করার সুযোগ পায় তখন সে একেবারে অসাম্প্রদায়িক। কিন্তু খবরদারির ছলে কেউ তাকে যখন অসাম্প্রদায়িক হতে বলে তখন সে সত্যি সত্যি সাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠে। এই স্পর্শকাতর বিষয়টি বাংলাদেশীদের ওপর ছেড়ে দেয়াই ভারতের জন্য সবচেয়ে বেশি বুদ্ধিমানের কাজ হবে। বিনা কারণে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে অতিরিক্ত মাতামাতি না করা। রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর প্রধান ও প্রিয়তম কবি। কবি, সাহিত্যিক, শিল্পীরা কোনো বিশেষ দেশের নাগরিক হলেও তারা কিন্তু বিশ্বনাগরিক। তার পরও বলতে হয় জন্ম, কর্ম ও নাগরিক হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ভারতবাসী। তবু ১৯৬১ সালে সেই পাকিস্তানের আইয়ুবের শক্ত মার্শাল ল উপো করে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বাংলাদেশের মানুষ রবীন্দ্রশতবার্ষিকী নিজেদের পকেটের টাকা খরচ করে পুলিশি হুলিয়া মাথায় বহন করে সগৌরবে উদযাপিত করেছিল। কোনো দূতাবাসের বা সরকারের কোনো সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা লাগেনি বলেই সেই অনুষ্ঠান হয়েছিল জনগণের প্রাণের অনুষ্ঠান। বিশ্বকবিকে তার প্রাপ্য সম্মান দেয়াই ছিল স্বতঃপ্রণোদিত সাধারণ মানুষের আন্তরিক প্রয়াস। ছিল না কোনো ভণিতা, ন্যাকামি বা ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের কোনো গন্ধ। ১৯৬০ দশকে খাজা সাহাব উদ্দীন চাচ্ছিলেন আমরা রবীন্দ্রনাথকে ভুলে যাই। ফল হলো উল্টো। বাংলাদেশের সর্বত্র রবীন্দ্রচর্চা বেড়ে যায় বহু গুণ। জন্ম নিলো ছায়ানটের মতো ছায়ানিবিড় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। অথচ রবীন্দ্রজন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠান যখন সরকার বা দূতাবাসের সহায়তায় অনুষ্ঠিত হয় তখন তা হয়ে ওঠে নিছক তাঁবেদারদের অনুষ্ঠান। সেখানে প্রাণের কোনো ছোঁয়া থাকে না। তাদের খপ্পরে পড়ে ১৫০ বছরের বৃদ্ধ কবির কঙ্কাল দেহটি দম বন্ধ হয়ে আপনা আপনি মারা পড়বে। রবীন্দ্রনাথকে ভর করে আমাদেরকে অসাম্প্রদায়িক হতে হবে না।
বাংলাদেশের মানুষ আন্তরিকভাবে মুসলমান তবে বেশির ভাগই একেবারে অসাম্প্রদায়িক। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি। আমাদের সবার একান্ত আদরের ধনÑ গৌরবের ধন। কবিকে সেখানেই থাকতে দিন। রাজনীতির নোংরা গলিতে তাকে অনুগ্রহ করে নিয়ে আসবেন না। ভুলে গেলে চলবে না যে দশ চক্রে ভগবান ভূত হওয়ার মতো ঋষীকবি রবীন্দ্রনাথ ‘বর্গি এলো দেশে...’ গান বা কবিতা আবৃত্তি করে বাংলাদেশের মায়ের সন্তানকে ঘুম পাড়ানোর প্রয়াসকে উপো করে অহেতুক শিবাজিকে নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন। পরে অবশ্য দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। একইভাবে কলকাতার বাবুদের উন্নাসিকতা ও সাম্প্রদায়িক মনোভাবের কারণে রবীন্দ্রনাথ শেষ পর্যন্ত বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। বস্তুত এ অঞ্চলে মৌলবাদী রাজনীতির আশ্রয় কেন্দ্র কিন্তু ভারত ও পাকিস্তানে। প্রয়োজনের তাগিদে ও আধিপত্য বিস্তারের তাগিদে বিকল্প শক্তি হিসেবে তাদের রসদপত্র ও ট্রেনিংয়ের জোগান দিয়ে আসছে ভারত ও পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। বেশির ভাগ েেত্রই বদ্ধমূল ধারণা থেকে কিংবা না বুঝে বরং ব্যক্তিগতভাবে টাকা বানানো তথা কমিশন পাওয়ার লোভে বা অস্ত্র বিক্রি করার ফিকির-ফন্দিতে তারা এসব কাজ প্রকল্প হিসেবে হাতে নেয়। পরে দেখা যায় ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের মতো এসব সন্ত্রাসী হাতের নাগালের বাইরে চলে যায়। বাংলাদেশকে এসব অপকর্ম থেকে অবশ্যই দূরে থাকতে হবে।
সঙ্গত কারণে মনে হয় ভারতের নীতিনির্ধারকের কাছে গ্রেটার বেঙ্গল কনসেপ্ট এখনো একটি ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতা। সে জন্য তারা আনন্দিত হবে যদি বাংলাদেশে কট্টর ইসলামপন্থীরা শাসন জারি করে। তাতে করে পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতে একটি উপ-আঞ্চলিক শক্তির বিকাশ ঘটার সম্ভাবনা তিরোহিত হবে। তবে প্রচণ্ড ধরনের ঝুঁকি আছে যে কট্টরপন্থীদের শেষ পর্যন্ত নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা অনেক দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এসব সেকেলে চিন্তাধারা দূরে সরিয়ে এই মুহূর্তে বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশেরই মনমোহন সিংয়ের সফরকে মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করে সুসম্পর্কের জাল বুনতে শুরু করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে। ভারতের নীতিনির্ধারকদের উপলব্ধি করতে হবে যে বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্তান নয়, বরং আবহমান কালের অসাম্প্রদায়িক পূর্ববঙ্গ। দণি এশিয়ার স্থিতিশীলতায় স্বাধীন ও সার্বভৌম জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশ একটি শক্ত স্তম্ভ। ভারতের নীতিনির্ধারকেরা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের দেখছে প্রতিনিয়ত, কিন্তু তাদের পূর্ববঙ্গের বাঙালিদের সমন্ধে সম্যক কোনো ধারণা নেই। জ্যোতি বসুকে কায়দা করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে দেয়া হয়নি, তাতে পশ্চিমবঙ্গে কোনো হরতাল বা অসহযোগ আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। অথচ পূর্ববঙ্গবাসী বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বানাতে গিয়ে প্রাথমিকভাবে সর্বাত্মক হরতাল ও অভূতপূর্ব অসহযোগ আন্দোলন গড়ে তুলে শেষ পর্যন্ত হাতে অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধে নেমে যায়। ফারাকটা সূক্ষ্ম হলেও মোটা দাগের ফারাক। ভারতকে তা অনুধাবন করতে হবে। বাংলাদেশের ওপর খবরদারি না করে আপনজন হিসেবে ভারত বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ালে বাংলাদেশের সাথে সাথে ভারতও লাভবান হবে প্রচণ্ডভাবে। তা না হলে ভারতকে খবরদারি জারি রাখার জন্য সূক্ষ্ম স্নায়ুযুদ্ধ চালাতে হবে। তাতে সময় ও এনার্জির অপচয় হবে। তাতে করে বন্ধুত্বের চিড় ধরাই স্বাভাবিক।
১৯৪০ দশকের অসুস্থ রাজনীতি থেকে বের হয়ে ২৪ বছর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সাথে প্রথমে স্নায়ুযুদ্ধ ও পরে প্রত্যক্ষ যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করে রাজনৈতিক চিন্তা ও চেতনায় বাংলাদেশীদের যে উত্তরণ ঘটেছে তা থেকে বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে পিছু হটা কোনোক্রমেই সম্ভব নয়; বরং নিজ ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি অবিচল আস্থা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বলীয়ান বাংলাদেশীরা সামনের দিকে এগিয়ে যাবে অপ্রতিহত গতিতে। ১৫০ মিলিয়ন মানুষের অগ্রযাত্রাকে রোধ করার ক্ষমতা খোদ ভারতের নেই। হয়তো বা সাময়িক বাধা সৃষ্টি করতে পারে। বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। তবে লেবু বেশি করে কচলালে তেতো হয়ে যায়। বেশি দরকষাকষি করে এবং চালাকি করে কায়েমি স্বার্থ হাসিল করতে গেলে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সাথে সাথে উত্তর-পূর্ব ভারত অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে। বাংলাদেশের অলিগলিতে ভারত প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থায় চলে যাবে। সেই অস্থিতিশীলতার কারণে বাংলাদেশ তিগ্রস্ত হবে প্রচণ্ডভাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি তিগ্রস্ত হবে ভারত। ভারতের একক জাতীয়তাবাদের ভিত একেবারে নড়বড়ে হয়ে যাবে। তাই উভয় দেশের মঙ্গলার্থে সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব একান্তভাবে কাম্য।
লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্ত।
sejdach@gmail.com
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন