শনিবার, ২৩ জুন, ২০১২

ভিলেন সিরাজদৌলা হিরো প্রণব মুখোপাধ্যায়


আ ব দু ল হা ই শি ক দা র

‘এলাম দেখলাম জয় করলাম’ বলে যে কথাটি বিখ্যাতদের বেলায় প্রচলিত, সে কথাটি আরও একবার সত্য হয়েছিল শচীন সেনগুপ্তের ঐতিহাসিক নাটক ‘সিরাজদ্দৌলা’র বেলায়। এই নাটকটি প্রথমবার কলকাতার মঞ্চে আসে ১৯৩৮ সালের ২৯ জুন। অর্থাত্ পলাশী বিপর্যয়ের ১৮১তম বার্ষিকীর ৬ দিন পর এবং সিরাজের শাহাদাতবার্ষিকীর ৪ দিন আগে। মঞ্চস্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই নাটকটি অর্জন করে অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা। পরবর্তীকালে মূলত এই নাটকের ওপর ভিত্তি করে ১৯৬৭ সালে খান আতাউর রহমান নির্মাণ করেন তার কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘নবাব সিরাজদ্দৌলা’। শচীন বাবুর নাটক জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। এই নাটকটি আগাগোড়া সম্পাদনা করে দিয়েছিলেন নজরুল। নাটকে ব্যবহৃত ৬টি গান, ‘আমি আলোর শিখা,’ ‘ম্যায় প্রেম নগরকো জাউঙ্গি’, ‘কেন প্রেম যমুনা আজি’, ‘পথ হারা পাখি’, ‘এ কূল ভাঙে ও কূল গড়ে’ ও ‘পলাশী হায় পলাশী’ নজরুলের লেখা। এই নাটকের সঙ্গীত পরিচালকও ছিলেন নজরুল।
মঞ্চের পাশাপাশি ১৯৩৯ সালের ২৪ নভেম্বর শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিট থেকে একটানা ২ ঘণ্টা এই নাটক প্রচারিত হয় অল ইন্ডিয়া রেডিও কলকাতা কেন্দ্র থেকে। সিরাজের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা নির্মলেন্দু লাহিড়ী। আলেয়ার সংলাপ দিয়েছিলেন ঊষাবতী। গান গেয়েছিলেন হরিমতি। অবশ্য মঞ্চে কণ্ঠ দিতেন নীহারবালা। রেডিওতে এ নাটক পরিচালনা করেছিলেন বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র।
এর পরপরই এইচএমভি কোম্পানি থেকে এই নাটকের রেকর্ড বের হয়। রেকর্ডে আলেয়ার গানে কণ্ঠ দেন পারুল বালা ঘোষ। ‘এ কূল ভাঙে ও কূল গড়ে’ গানটিতে কণ্ঠ দেন মৃণাল কান্তি ঘোষ।
নাটকের পাড়া অতিক্রম করে এই সিরাজদৌলা অচিরেই সগৌরবে জায়গা করে নেয় যাত্রা দলে। সেদিন থেকে অদ্যাবধি যাত্রার পালায় সমান জনপ্রিয়তা নিয়ে পরিবেশিত হচ্ছে সিরাজদৌলা। জনপ্রিয়তার বিচারে অদ্যাবধি শচীন বাবুর সিরাজদৌলা একমেবাদ্বিতীয়তম। জনপ্রিয়তার দিক থেকে তার ধারেকাছেও ঘেঁষতে পারেনি অন্য কোনো নাটক। ৭৪ বছর ধরে বাংলা ভাষাভাষী দর্শক গভীর আবেগ ও ভালোবাসা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে দেখে যাচ্ছে সিরাজদৌলা। কারণ সিরাজদৌলা কেবল একটি নাটক নয়, সিরাজদৌলা তার জাতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির নাম। সিরাজদৌলা তার স্বাধীনতার প্রতীক। তার স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রামের প্রথম শহীদ। অন্য কোনো কিছুর সঙ্গেই এই নামটির তুলনা হয় না।
দুই
এই সিরাজদৌলা নাটকে দেশ ও জাতির এক সঙ্কটকালে বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাব সিরাজদ্দৌলা দীর্ঘ এবং বেদনাঘন, উদ্বেগ ও আবেগাক্রান্ত কণ্ঠে দরবারে বলছেন, ‘বাংলার ভাগ্যাকাশে আজ দুর্যোগের ঘনঘটা। তার শ্যামল প্রান্তরে আজ রক্তের আল্পনা। জাতির সৌভাগ্য সূর্য আজ অস্তাচলগামী। শুধু সুপ্ত সন্তান শিয়রে রোরুদ্যমানা জননী নিশাবসানের অপেক্ষায় প্রহর গণনায় রত। কে তাকে আশা দেবে, কে তাকে ভরসা দেবে, কে শোনাবে জীবন দিয়েও রোধ করবো মরণের অভিযান।’ এই দীর্ঘ সংলাপটি দর্শকের মর্মমূলে আজও অবিরত ক্ষত সৃষ্টি করে যাচ্ছে। কারণ যাদের আশা দেয়ার কথা ছিল, ভরসা দেয়ার কথা ছিল—তারা সবাই ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থে বিদেশি সাদা চামড়ার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বণিকদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল নিজেদের আত্মা। এজন্যই ‘হাজার হাজার সৈন্য পলাশীর প্রান্তরে পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে রইল আর পরাজয় পিছন থেকে এসে জাতির ললাটে কলঙ্কের কালিমা মাখিয়ে দিয়ে গেল।’
কী কুক্ষণেই যে শচীন সেনগুপ্ত এই সংলাপগুলো লিখেছিলেন, ভেবে আজও মাথায় হাত দিতে হয়। কারণ সেই যে ২৫৫ বছর আগে পলাশী যুদ্ধের দিনকয়েক আগে সিরাজদৌলার মুখ দিয়ে তিনি বলিয়েছিলেন, যে বাংলার ভাগ্যাকাশে আজ দুর্যোগের ঘনঘটা। সেই দুর্যোগ যেমন ১৯৩৮ সালে নাটক রচনার সময় ছিল, তেমনি ২০১২ সালেও বহাল তবিয়তে জাতির মাথার ওপর জমাট বেঁধে আছে। এতটাই জমাটবদ্ধ যে, সহসা যে তা মেঘমুক্ত হবে তার কোনো আশাই নেই।
রাজনীতিতে এখন শুধু ‘রাজ’। ‘নীতি’ উধাও হয়ে গেছে সেই কবে। অর্থনীতির অর্থ এবং নীতি দুটোই আজিমপুর আর বনানীতে সাড়ে তিন হাত কবরের নিচে চাপা পড়েছে। আদর্শ, মূল্যবোধ, মানবিকতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ আর আইনের শাসন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে ফারাক্কা লাঞ্ছিত পদ্মার বুকে। যানজটে লটকে গেছে বড় হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। দুর্নীতি, হিংসা-বিদ্বেষ আর হানাহানি, সবার ওপর ঘৃণা, সংশয় আর সন্দেহ এখন পিশাচের মতো খুবলে খাচ্ছে আমাদের শ্যামল কোমল পাললিক মৃত্তিকা। আমাদের হৃিপণ্ড।
আধিপত্যবাদের দাঁত ঘষটানি দেখার জন্য এখন আর সীমান্তে যাওয়ার দরকার হয় না। বাংলাদেশের এমন কোনো জনপদ নেই যেখানে তাদের অনুচররা বাসা বাঁধেনি। এখন দেশপ্রেমিকদের বানানো হচ্ছে ভিলেন, আর ভিলেন বীরের মুকুট মাথায় দিয়ে জেঁকে বসেছে সমাজ ও রাষ্ট্রিক জীবনের সর্বত্র। পলাশীর আগের মুর্শিদাবাদ আর আজকের ঢাকার মধ্যে তেমন কোনো ফারাক অবশিষ্ট নেই।
এই দুর্বিষহ অবস্থা আরও বেশি বেশি ঘনীভূত হয় পলাশী দিবস এলে। তখন নতুন করে বিশেষ প্রক্রিয়ায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের এদেশীয় দাললারা। তারা অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে কষে গালাগালি দিতে থাকে হতভাগ্য নবাব সিরাজদৌলাকে। বাংলাদেশের যা কিছু ভালো, যা কিছু তার নিজস্ব, যা কিছু তার অর্জন—সেগুলোকে পদপিষ্ট করার পাশাপাশি আচ্ছা রকমভাবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য শুরু করে সিরাজদৌলা সম্পর্কে। ক্ষেত্রবিশেষে নিখাদ গালাগালিতে পর্যবসিত হয় এই বিবমিষা। যেন সিরাজদৌলার চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করাই এই শ্রেণীর লেখক-বুদ্ধিজীবীর কাছে সর্বশেষ ফ্যাশন।
এই গালিবাজদের শরীরে যে রক্তস্রোত বয়ে যায় এবং কী কারণে এরা সিরাজবিদ্বেষী, তার নতিজা পেশের আগে আরও একটি বিষয়ের ওপর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। প্রতি বছরই আমাদের এই শ্রেণীর জনমণ্ডলী বিশেষ একটি বিষয় নিয়ে উন্মাদ হয়ে ওঠে। তাল, লয়, মাত্রা জ্ঞান হারিয়ে স্তাবকতা, প্রশংসা ও বিশেষণ প্রয়োগের জন্য পাগল হয়ে যায়। এক ধরনের কাণ্ডজ্ঞানহীন মাতলামি আর কী?
তিন
এবার আমাদের বঙ্গপুঙ্গররা অতিশয় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে। বলা যায়, প্রণব বন্দনার মচ্ছব চলছে এখন বাংলাদেশে। বিগলিত লেখক, রাজনীতিবিদ, কলামিস্টরা লিখছেন—বাঙালির হাজার বছরের সৌভাগ্য যে একজন বাঙালি প্রথমবারের মতো ভারতের রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন। বাঙালি হিসেবে আমরা গর্বিত। আমরা ধন্য। প্রণব মুখোপাধ্যায় মহান। তিনি মহামহিম। তিনি এশিয়ার শ্রেষ্ঠ অর্থমন্ত্রী। অনেকে তাকে এশিয়ায়ও আটকে রাখতে নারাজ। তারা বলছেন, প্রণব মুখোপাধ্যায় বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্থমন্ত্রী। তিনি শ্রদ্ধেয়। তিনি পণ্ডিত। তিনি বিশ্বের সেরা রাষ্ট্রনেতা। তিনি নম্র। তিনি বিনয়ী। তার জ্ঞানের তুলনা কেবল অগণন নক্ষত্রখচিত আকাশ।
বলা হচ্ছে, তিনি বাংলাদেশের মহান বন্ধু। তিনি অকৃত্রিম বন্ধু। বাংলাদেশের আপনার চেয়ে আপন মানুষ তিনি। বাংলাদেশের জন্য তার ভালোবাসা বঙ্গোপসাগরের পানির চেয়েও বেশি। যদি তার জন্ম না হতো তাহলে হয়তো বাংলাদেশেরই জন্ম হতো না।
এই বেআক্কেল মূর্খদের কে বোঝাবে যে, পদ্মা নদীকে হত্যা করার জন্য যে ক’জন মানুষ দায়ী, তিনি তাদের একজন। যে টিপাইমুখ নিয়ে উত্কণ্ঠায় অধীর আজ বাংলাদেশ, তিনি তার অন্যতম উদ্যোক্তা। ভারতের রক্তপিপাসু বিএসএফের হাতে প্রতিদিন যে বাংলাদেশের মানুষ খুন হয়, সেজন্য তিনি একবারের জন্যও দুঃখ প্রকাশ করেননি। বিএসএফের বিচার তো দূরের কথা।
তিনি সিডরবিধ্বস্ত উপকূলীয় বাংলাদেশের একটি গ্রাম নির্মাণ করে দিতে চেয়েছিলেন, দেননি। তিনি তাদের মোসাহেব ফখরুদ্দীন-মইন উ আহমেদের সময় ৫ লাখখ টন চাল দিতে চেয়ে একটা কণাও দেননি। উপযুক্ত মূল্য দিতে চাওয়ার পরও দেননি। বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য ঘাটতি দূর করার জন্য সামান্যতম সহানুভূতিও তার কাছ থেকে বাংলাদেশ পায়নি।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পাশে দাঁড়িয়েছিলেন সত্য। সেজন্য তাকে কৃতজ্ঞতা জানাই। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সে দাঁড়ানোটাও ছিল ইন্দিরা গান্ধীর মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে। এডওয়ার্ড কেনেডি, তাকাশি হাওয়াকাওয়া, জন স্টন হাউজ কিংবা অদ্রে মালরোর মতো একক ব্যক্তি হিসেবে নয়। তার দাঁড়ানোটা ছিল ভারতের কৌশলগত সিদ্ধান্তের ফসল।
আরও একটি জিনিস দেখবার। আমাদের দাস্য মানসিকতাসম্পন্ন রাজনীতিবিদ, লেখক-বুদ্ধিজীবীরা এক চক্ষু অন্ধ ব্যক্তির মতো আচরণ করে। তাদের যদি দুই চোখই খোলা থাকতো তাহলে দেখতে পেত, ভারতের যে রাজ্যের তিনি বাসিন্দা সেই পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কিন্তু তাকে নিয়ে মোটেই আমাদের দেশের লোকজনদের মতো লাফালাফি-ফালাফালি করছে না। তারা মোটেই মাত্রাজ্ঞান হারায়নি। বিশেষণ প্রয়োগের বন্যাও সেখানে হয়নি। বরং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি পরিষ্কার বিরোধিতা করছেন প্রণব বাবুর। তার বক্তব্য অত্যন্ত পরিষ্কার। তিনি বলছেন, নামেই তিনি বাঙালি এবং পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। পশ্চিমবঙ্গের জন্য তিনি আজ পর্যন্ত কোনো কিছুই করেননি।
যাদের মানুষ প্রণব বাবু তারা তার ব্যাপারে উদাসীন এবং বিরোধী। আর আমরা যারা বাইরের লোক, তাদের ঢাকের শব্দে কান ঝালাপালা। যার বিয়ে তার খবর নাই, পাড়া-পড়শির ঘুম নাই।
অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করুন একবার। আমাদের গবেটগুলোকে মানুষ বানানোর দায়িত্ব কে নেবে? দায়িত্ব নিলেও হয়তো এরা সুস্থ হবে না। কারণ এর আত্মা এদের নিয়ন্ত্রণে নেই। তা বন্ধক পড়ে গেছে অন্যত্র। এখন হাজার চাইলেও এদের আর ফেরার উপায় নেই।
চার
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্লাইভ আর আমাদের মীরজাফর সাহেব মিলে পলাশীর মাঠে যুদ্ধ নামের প্রহসন করে কেড়ে নিয়েছিল বাংলা বিহার উড়িষ্যার স্বাধীনতা। এই প্রহসনের আড়ালে ছিল নিম্নশ্রেণীর নিকৃষ্ট কুিসত ও জঘন্য প্রকৃতির ষড়যন্ত্র, বিশ্বাসঘাতকতা। এই ষড়যন্ত্র আর বিশ্বাসঘাতকতার কাছে পরাজিত হয়েছিলেন সিরাজদৌলা।
এখন নিজেদের এই বেঈমানি আর জটিল-কুটিল জালিয়াতি-ষড়যন্ত্রকে যদি আড়াল করা না যায় তাহলে পলাশীর যুদ্ধকে জায়েজ করা যায় না। এজন্যই নিজেদের যদি হিরো সাজতে হয় তাহলে সিরাজকে ভিলেন বানানো ছাড়া অন্য পথ তো নেই। সিরাজকে যত নিচু ও নোংরা করে দেখানো যাবে, ততই উজ্জ্বল হবে তাদের নাম। এজন্যই সিরাজদৌলার চরিত্র হননের কাজটি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে অব্যাহতভাবে চালিয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তথা ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার। এই কাজে তারা লাগিয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারী, ভারত প্রবাসী সাদা চামড়ার সায়েব লেখকদের। আর সবচেয়ে বেশি সাহায্য তারা পেয়েছিল তথাকথিত বেঙ্গল রেনেসাঁর প্রডাক্ট কলকাতাকেন্দ্রিক অর্থ, বিত্ত, খ্যাতি ও পদোন্নতি-ভিখারী বাবু-বুদ্ধিজীবীদের। জাতীয় ইতিহাসের কলংক তথাকথিত জমিদার শ্রেণীর। তারও আগে মীরজাফরের সময় থেকে কিছু বেতনভুক্ত ইতিহাস লিখিয়েদের দ্বারা কোম্পানি নিজ মনের মাধুরী মিশিয়ে উত্পাদন করিয়েছিল ইতিহাস। পাশাপাশি পথে-প্রান্তরে সিরাজদৌলাকে হেয় করার জন্য, তার ভাবমূর্তি বিনাশ করার জন্য ছড়িয়ে দিয়েছিল ভাড়াটে লোকজন। গুজব ও গল্প ইতিহাসের নামে তাই চলে আসছিল তখন, এমনকি এখনও।
খুব সঙ্গত কারণেই বিজয়ী পক্ষ পরাজিতের স্কন্ধকে নিজেদের পাপ স্থাপনের সুউচ্চ মঞ্চ বানিয়েছে। ফলে সত্য হয়েছে মিথ্যা, মিথ্যা পেয়েছে সত্যের সম্মান। আর এই মিথ্যাচার, লোককথা, গল্পকে বাছ-বিচার না করেই ইতিহাসের নামে, গল্পে, কবিতায়, মহাকাব্যে দেদার পরিবেশন করেছে বাংলাভাষী মরুদণ্ডহীন কবি ও গদ্যকাররা।
উপনিবেশবাদের পক্ষে নির্লজ্জ দালালি করে সেদিন নাম ও অর্থ কামিয়েছিল রাম রাম বসু ও মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার কিংবা কবি নবীন চন্দ্র সেনরা।
মাত্র একজন মানুষ এই অন্যায় ও পাপের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন সেই ১৮৯৮ সালে। তিনি অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় মহাশয়। তার ‘সিরাজদৌলা’ গ্রন্থ দিয়ে উদঘাটন করেছিলেন আসল ইতিহাস।
কিন্তু তার হাজার কোশেশ সত্ত্বেও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসক ও সাম্রাজ্যবাদের আদর-আহ্লাদে যারা বড় হয়েছিলেন তাদের ছাও-আণ্ডা, বাল-বাচ্চারা আজও সমান তালে সিরাজদৌলার চরিত্রে কালি মাখিয়েই যাচ্ছেন।
সম্প্রতি এই পাপ ও পঙ্কে গা ভাসিয়েছেন বিখ্যাত ভারতীয় লেখক ও কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। নববর্ষ সংখ্যা সানন্দায় তিনি ‘মাত্র দশ-বারো ক্রোশ দূর’ নামে একটি গল্প লিখেছেন। সেই গল্পে তিনি দেখিয়েছেন সিরাজদৌলা লম্পট, বদমায়েশ ইত্যাদি ইত্যাদি। সুনীল আমার মতো অখ্যাত নন, বিখ্যাত লেখক। তার সম্পর্কে অসম্মানজনক কথা বলতে বাধে আমার। কিন্তু সত্যের স্বার্থে বলতে বাধ্য হচ্ছি, তিনি তার রক্ত ও মগজে বহন করে চলেছেন সেই ঔপনিবেশিক শাসক তথা সাম্রাজ্যবাদের দালালদের উত্তরাধিকার। নইলে এই ফালতু কথা তিনি লিখতে পারতেন না।
টেনিসন তার বিখ্যাত ঐতিহাসিক নাটক ‘বেকেট’-এর ভূমিকায়, তার নাটকে স্থান পাওয়া বিভিন্ন ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোর বিদেহী আত্মার উদ্দেশে একটি চমত্কার চতুর্দশপদী কবিতা লেখেন। তার কয়েকটি চরণ খুবই চমত্কার :
“আমি যদি তোমাদিগকে এমন কথা বলাই,
যাহা তোমরা বল নাই—
যদি তোমাদের সদগুণ বিলুপ্ত করিয়া ফেলি,
এবং তোমাদিগকে সম্পূর্ণ বিপরীতভাবে গঠন করি,
তাহা হইলে হে প্রাচীন প্রেতাত্মাগণ
আমার উপর ক্রুদ্ধ হইও না।
কারণ যিনি আমাদিগকে ঠিক জানেন,
তিনি জানেন, যে কেউই নিজের একদিনের
জীবনের যথার্থ বৃত্তান্ত লিখিতে পারে না,
পৃথিবীতে আর কেহই তাহার জন্য লিখিয়া দিতে পারে না।”
যদি এরকম দায়বদ্ধতা কারও মধ্যে থাকে, তাহলে সে ব্যক্তি যত বড় লেখকই হন, নিজের পাপকে ধামাচাপা দেয়ার জন্য ঘাড় উঁচু করে বলবেন না, ‘উপন্যাস লেখক সর্বত্র সত্যের শৃঙ্খলবদ্ধ নহেন। ইচ্ছামত অভীষ্ট সিদ্ধির জন্য কল্পনার আশ্রয় নিতে পারেন।’
a_hyesikder@yahoo.com

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন