শনিবার, ৩০ জুন, ২০১২

দুর্গম যাত্রাপথে কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত


এপিজে আবদুল কালাম
নির্ধারিত রাত ৮টা ১৫ মিনিটে রাষ্ট্রপতি ভবনে এলেন সোনিয়া গান্ধী ও মনমোহন সিং। সে সময় তিনি আমাকে বিভিন্ন দল ও সংসদ সদস্যের সমর্থনসূচক সম্মতিপত্র দেখান। আমি তখন তাকে স্বাগত জানাই। তার পছন্দমতো রাষ্ট্রপতি ভবন শপথবাক্য পাঠ করার জন্য প্রস্তুত বলে জানালাম। সোনিয়া গান্ধী বললেন, তিনি মনমোহন সিংকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চান। এটা ছিল নিশ্চিতভাবেই আমার কাছে বিস্ময়ের। রাষ্ট্রপতি ভবন তখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনমোহন সিংয়ের কাছে সরকার গঠনের জন্য চিঠি পাঠানোর কাজ নতুন করে শুরু করে


এপিজে আবদুল কালাম ২০০২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ভারতের ১১তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্রপতি থাকাকালের অনেক স্মৃতি তার মনে উঁকি দেয়। সেসব নিয়ে তিনি রচনা করেন স্মৃতিকথা। ওই স্মৃতিকথা থেকে চুম্বক অংশ প্রকাশ করে ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকা। তার থেকে সংক্ষেপিত
ভাষান্তর করেছেন সুভাষ সাহা


অন্যান্য দিনের মতো আমি চেন্নাইয়ের আন্না বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছিলাম। 'ভিশন টু মিশন'-এর ওপর একটি লেকচার দিয়েছিলাম। ওই লেকচার সেশনটা এক ঘণ্টা থেকে দু'ঘণ্টা অব্দি গড়িয়েছিল। দুপুরে একদল ছাত্র গবেষকের সঙ্গে খাবার গ্রহণ করার পর আবার ক্লাসে গেলাম। বিকেলের দিকে আমি যখন আমার রুমে ফিরছিলাম তখন উপাচার্য অধ্যাপক এ. কালানিধিও আমার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, কেউ একজন দিনভর আমার সঙ্গে যোগাযোগ করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। আমি যখন কক্ষে প্রবেশ করছিলাম তখনও টেলিফোন বেজে চলছিল। আমি যখন টেলিফোনে পরিচয় জিজ্ঞেস করলাম তখন প্রধানমন্ত্রী আমার সঙ্গে কথা বলতে চান বলে অপর প্রান্ত থেকে জানানো হয়। কয়েক মাস আগে আমি শিক্ষকতা করব বলে ভারত সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে ক্যাবিনেট পদমর্যাদার পদ ছেড়ে আসি। এখন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ির সঙ্গে কথা বলার পর আমার জীবনে অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন ঘটে গেল।
গুজরাট সফর : আমার ভাবনায় উন্নয়নের অন্যতম পিলার ছিল দেশ থেকে সম্পূর্ণরূপে দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতা দূর করা। এরসঙ্গে এমন এক সমাজ নির্মাণ আমার চিন্তায় ছিল, যেখানে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে অপরাধ থাকবে না এবং কেউই নিজেকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নবোধ করবে না। ২০০২ সালের আগস্টে গুজরাট সফরের সময় এসব চিন্তাই আমার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। আর এটাকে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর আমি আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ মনে করেছি।
মাত্র কয়েক মাস আগে রাজ্যটিতে দাঙ্গা হয়েছিল এবং এর প্রভাবে হাজার হাজার মানুষ এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে বাস করছিল। এটা ছিল গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর কাজ। কারণ এটা রাজনৈতিকভাবে একটা উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল। আমি মনে করেছি, সেখানে কী ঘটেছে বা কী ঘটছে সেটা দেখা আমার মিশন নয়। বরং কী করা যেতে পারে সেটাই আমার কাজ। কী ঘটেছিল সেটা নিয়ে বিচার বিভাগে, সংসদে আলোচনা হয়েছে এবং এখনও আলোচনা চলছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে কোনো রাষ্টপতির ওই এলাকা পরিদর্শনে যাওয়ার নজির নেই। ওই সময় গুজরাট যাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও কেউ কেউ প্রশ্ন করেছেন। মন্ত্রণালয় ও আমলাতান্ত্রিক পর্যায়ে বলা হয়, এ সময় আমার গুজরাটে যাওয়া উচিত নয়। এর প্রধান কারণ ছিল রাজনৈতিক। কিন্তু আমি গুজরাট সফরের ব্যাপারে মনস্থির করে ফেলি এবং গুজরাটেই রাষ্ট্রপতি হিসেবে আমার সফরের ব্যাপারে রাষ্ট্রপতি ভবনে জোর প্রস্তুতি চলে।
প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ি আমাকে এ ব্যাপারে মাত্র একটি প্রশ্ন করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, 'আপনি কি মনে করেন এ সময় আপনার গুজরাট যাওয়া প্রয়োজন?' আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলি, আমি মনে করি আমার সফর সেখানকার জনগণের যন্ত্রণা কিছুটা হলেও লাঘব করবে এবং সেটাকেই আমি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। আমার সফরের ফলে সেখানে ত্রাণ তৎপরতা ত্বরান্বিত হবে, মানুষের মধ্যে মানসিক ঐক্য গড়ে উঠবে, আর এটাই আমার মিশন, যেটা আমি আমার শপথ গ্রহণের সময় উচ্চারণ করেছি...।
আমি গুজরাটে ১২টি এলাকা পরিদর্শন করি। এগুলোর মধ্যে ছিল তিনটি ত্রাণ শিবির এবং নয়টি দাঙ্গা উপদ্রুত এলাকা, যেগুলোতে প্রাণহানির সংখ্যা ছিল বেশি। একটি ত্রাণ শিবির পরিদর্শনের দৃশ্য আমার স্মরণে আসছে। একটি শিশু হাত বাড়িয়ে আমাকে ধরে বলল, 'রাষ্ট্রপতিজি, আমি আমার পিতা-মাতাকে ফেরত পেতে চাই।' আমি তখন বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। এরপর আমি জেলা প্রশাসনকে এ শিশুর শিক্ষাসহ যাবতীয় দেখভালের জন্য বলি। মুখ্যমন্ত্রীও আমাকে এ ব্যাপারে রাজ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেন।
আমার গোটা সফর পর্বে কেবলই মনে হয়েছে আমাদের একমাত্র এজেন্ডা কী হওয়া উচিত? যে কোনো ধর্মমতে বিশ্বাসী নাগরিকের তার ধর্মমত পালনের মৌলিক অধিকার থাকা উচিত, যাতে সে তার বিশ্বাসে অটল থেকেই সুখী হতে পারে। মানুষের মনের ঐক্যবোধকে বিপদাপন্ন করার অধিকার কারও নেই। কারণ মনের এই ঐক্যই আমাদের দেশের জীবনপ্রবাহ।
আর এটাই আমাদের দেশকে অদ্বিতীয় করেছে।
ন্যায়বিচার কী আর গণতন্ত্রই বা কী? প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার রয়েছে সম্মানের সঙ্গে বাঁচার; প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার রয়েছে স্বাতন্ত্র্যের জন্য উচ্চাকাঙ্ক্ষী হওয়ার। ন্যায্য ও যথাযথ উপায়ে সম্মান ও স্বাতন্ত্র্য অর্জনের সুযোগ করে দেয় গণতন্ত্র। আমাদের সংবিধানও সে গ্যারান্টি দেয়। প্রকৃত গণতন্ত্রে মানুষের বিশ্বাস পদ্ধতি ও লাইফস্টাইলের প্রতি সহনশীলতা গুরুত্বপূর্ণ।
অপরের মতামতের প্রতি ক্রমবর্ধমান অসহনশীলতা ও অপরের জীবনাচার বা ধর্ম বা মতামতের প্রতি ক্রমবর্ধমান ঘৃণা বা অবজ্ঞা কোনো অবস্থায়ই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রত্যেক ব্যক্তির অধিকার রক্ষার জন্য আমাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।
সোনিয়া গান্ধীর প্রধানমন্ত্রিত্ব প্রসঙ্গ : একজন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব হলো প্রত্যেক সাধারণ নির্বাচনের পর একজন নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করা বা কোনো ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন করার প্রয়োজন দেখা দিলে তা করা। এ সময় কোন দল বা জোটের সরকার গঠনের মতো অবস্থা রয়েছে সে ব্যাপারে রাষ্ট্রপতি নিজে নিশ্চিত হওয়ার প্রয়োজন পড়ে। আর এটা একটা স্থিতিশীল সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন। এখানে সিলেকশন প্রক্রিয়াটা বেশ জটিল হয়ে পড়ে যখন হাউসে কোনো এক দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে না এবং যখন সরকার গঠনের একাধিক দাবিদার থাকে। এদিক থেকে ২০০৪ সালের নির্বাচন ছিল একটা আগ্রহোদ্দীপক ঘটনা। নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে, নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার পর দেখা গেল কোনো দল সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি।
নির্বাচিতদের মধ্যে কংগ্রেস সবচেয়ে বড় দল হিসাবে আবির্ভূত হয়। এ সত্ত্বেও তিনদিন পার হয়ে গেলেও কোনো দল সরকার গঠনের দাবি জানায়নি। এটা আমার জন্য ছিল উদ্বেগের বিষয়। আমি আমার সচিবালয়কে এ ব্যাপারে নির্দেশনা দিলাম। চিঠি নিয়ে সবচেয়ে বড় দলের কাছে তারা গেল। কংগ্রেসকে সরকার গঠনের দাবি জানানোর জন্য বলা হলো।
১৮ মে আমার সঙ্গে সোনিয়া গান্ধী বৈঠক করবেন বলা হলো। তিনি নির্ধারিত সময়েই এলেন। তবে তিনি একা না এসে সঙ্গে মনমোহন সিংকে নিয়ে এলেন। তাদের সঙ্গে আমার কথা হলো। তিনি তার দলের পক্ষে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সদস্যের সমর্থন রয়েছে বলে দাবি করলেন। তবে অন্যান্য দলের কর্মকর্তাদের অনুমোদনপত্র দেখাতে পারেননি। এরপর ১৯ তারিখে তিনি সমর্থনপত্র সঙ্গে নিয়ে এলেন। তিনি কেন বিষয়টি স্থগিত রাখছেন, আমরা বিষয়টি আজ সন্ধ্যার মধ্যেই ফয়সালা করতে পারি। তিনি চলে গেলেন। এরপর বার্তা পাঠালেন, তিনি আমার সঙ্গে রাত ৮টা ১৫ মিনিটে সাক্ষাৎ করবেন।
এসব যোগাযোগ যখন এগুচ্ছিল তখন আমার কাছে বিভিন্ন দল ও ব্যক্তির কাছ থেকে ই-মেইল আসতে লাগল, আমি যাতে সোনিয়া গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ না দিই। আমি কোনো মন্তব্য না করে এসব ই-মেইল ও চিঠি সরকারের বিভিন্ন এজেন্সির কাছে পাঠিয়ে দিই। সে সময় অনেক দলের নেতারা আমার সঙ্গে দেখা করে সোনিয়া গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী করার ব্যাপারে কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার না করার জন্য অনুরোধ জানান। কারণ সেটা তাদের মতে সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না। তবে মিসেস গান্ধী সরকার গঠনের দাবি জানালে আমার তাকে নিয়োগ দেওয়া ছাড়া কোনো গত্যন্তর ছিল না।
নির্ধারিত রাত ৮টা ১৫ মিনিটে রাষ্ট্রপতি ভবনে এলেন সোনিয়া গান্ধী ও মনমোহন সিং। সে সময় তিনি আমাকে বিভিন্ন দল ও সংসদ সদস্যের সমর্থনসূচক সম্মতিপত্র দেখান। আমি তখন তাকে স্বাগত জানাই। তার পছন্দমতো রাষ্ট্রপতি ভবন শপথবাক্য পাঠ করার জন্য প্রস্তুত বলে জানালাম। সোনিয়া গান্ধী বললেন, তিনি মনমোহন সিংকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চান। এটা ছিল নিশ্চিতভাবেই আমার কাছে বিস্ময়ের। রাষ্ট্রপতি ভবন তখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনমোহন সিংয়ের কাছে সরকার গঠনের জন্য চিঠি পাঠানোর কাজ নতুন করে শুরু করে।
তবে তিন দিন ধরে কেন কোনো দল সরকার গঠনের দাবি করেনি সে ঘোর কিন্তু আমার কাটেনি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন