মঙ্গলবার, ১৯ জুন, ২০১২

ভারত-বাংলাদেশ ট্রানজিট : রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা



ইকতেদার আহমেদ
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে মিত্র শক্তির বিজয় হলে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকরা তাদের পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ভারতবর্ষের স্বাধীনতা বাস্তবায়নের কার্যক্রম গ্রহণ করে। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতবর্ষের মূল ভূখণ্ডকে তিন ভাগ করে দু’ভাগ নিয়ে পাকিস্তান নামক একটি পৃথক রাষ্ট্র এবং অপর ভাগ নিয়ে ভারত নামক একটি পৃথক রাষ্ট্র জন্ম লাভ করে। উল্লেখ্য, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ-পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টি বিজয়ী না হলে ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তি প্রলম্বিত হতো। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এ বিষয়ে বিতর্ক চলাকালে যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী ও কনজারভেটিভ পার্টির নেতা উইন্সটন চার্চিল বলেছিলেন, ব্রিটিশ সাম্র্রাজ্যের এ মুহূর্তে কোনো রূপ হ্রাস তার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, যদিও লেবার দলীয় প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট অ্যাটলি ভারতবাসীদের দেয়া পূর্ব প্রতিশ্রুতি থেকে পিছু হটতে রাজি হননি। পাকিস্তানের পূর্বভাগ পরবর্তী সময়ে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের শেষ মাসে বাংলাদেশ নামে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ভারত সরকার স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতের পূর্বাংশের আসামকে সাতটি ভাগে বিভক্ত করে প্রতিটি ভাগকে পৃথক রাজ্যের মর্যাদা দেয়। এ সাতটি রাজ্যকে সাত কন্যা বা Seven Sisters নামে অভিহিত করা হয়। সেভেন সিস্টার্স বাংলাদেশের পূর্ব ও উত্তর সীমানায় অবস্থিত। সেভেন সিস্টার্স ১৭ মাইল দীর্ঘ শিলিগুড়ি করিডোর যার অপর নাম Chicken Neck Corridor দ্বারা ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত। সেভেন সিস্টার্স স্থলবেষ্টিত এবং বাংলাদেশ দ্বারা অবরুদ্ধ হওয়ায় ভারতের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ সমৃদ্ধ সেভেন সিস্টার্সের সম্পদ আহরণপূর্বক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির উপযোগী করা এবং মূল ভূখণ্ড থেকে বিভিন্ন বাণিজ্যিক পণ্য সড়ক পথে সেভেন সিস্টার্সে পৌঁছানো সময় সাপেক্ষে, ব্যয়বহুল ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অসাশ্রয়ী বিবেচিত হচ্ছে।
সেভেন সিস্টার্সের অধিবাসীরা মঙ্গোলিও বংশোদ্ভূত হওয়ায় এবং ভাষা, কৃষ্টি, গোষ্ঠী, সংস্কৃতি ও জাতিগতভাবে তারা ভারতের মূল ভূখণ্ডের অধিবাসীদের থেকে ভিন্নতর হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত। তাছাড়া গণচীন দাবি করে আসছে ভারতকে স্বাধীনতা প্রদানকালে তারা তাদের মুক্তি সংগ্রাম নিয়ে ব্যস্ত থাকাকালে অনেকটা তাদের অলক্ষ্যে সেভেন সিস্টার্সভুক্ত অরুণাচল ও নাগাল্যান্ডকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত দেখানো হয়েছে, যা ঐতিহাসিকভাবে গণচীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।
ভারতবর্ষের শাসন ক্ষমতা ব্রিটিশরা বিভিন্ন যুদ্ধবিগ্রহের মাধ্যমে মুসলিম শাসকদের পরাস্ত করে হস্তগত করায় তারা সবসময় মুসলিমদের ওপর বৈরীভাব পোষণ করত। এরই ফলে দেখা গেল ভারতবর্ষকে এমনভাবে বিভাজন করা হলো, যা মুসলিমদের স্বার্থের প্রতিকূলে গেল। করদ মিত্র রাজ্যের রাজাদের যদিও ভারত বা পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেশ বিভাগের এক বছরের মাথায় এ ধরনের দুটি রাজ্য ভারত জোরপূর্বক নিজ দখলে নিলে ব্রিটিশদের নির্লিপ্ত থাকতে দেখা যায়। ব্রিটিশরা ভালো করেই জানত এক হাজার মাইল ব্যবধানের মুসলিম অধ্যুষিত দুটি পৃথক অংশের দীর্ঘকাল যুক্ত হয়ে থাকা সম্ভব হবে না। ঠিকই ভারত বিভাগের ২৩ বছর অতিক্রম করার কিছুকাল পর পাকিস্তান বিভক্ত হয়ে গেল। যে অঞ্চল নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান এবং পরে বাংলাদেশ সৃষ্টি হলো, এ অঞ্চলের ভৌগোলিক সীমারেখা নির্ধারণে ন্যায়পরতা, সমতা ও ন্যায়নীতি যে উপেক্ষিত হয়েছে তা সুচতুর ব্রিটিশদের শতসহস্র ইচ্ছাকৃত অন্যায়ের অন্যতম দৃষ্টান্ত।
সেভেন সিস্টার্সসহ ভারত তার ব্রিটিশ সৃষ্ট অখণ্ডতা অক্ষুণ্ন রাখার জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের কাছে নৌ ও স্থল ট্রানজিট দাবি করে আসছে। স্থল ট্রানজিটের মধ্যে সড়ক ও রেল উভয় অন্তর্ভুক্ত। ভারতের মূল ভূখণ্ডের প্রতিটি রাজ্য একে অপরের সঙ্গে রেল ও সড়ক সংযোগ দ্বারা খুব ভালোভাবে সংযুক্ত। অন্যদিকে সেভেন সিস্টার্সের চারটি রাজ্য যথা—মনিপুর, নাগাল্যান্ড, মেঘালয় ও মিজোরামে অদ্যাবধি রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। প্রাকৃতিকভাবে সেভেন সিস্টার্সের ভূ-ভাগ পাহাড় পর্বত, নদীনালা, হৃদ, হাওর ও গিরিগহ্বর সমন্বয়ে গঠিত বিধায় সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা আশানুরূপ নয়। এর মধ্যে এলাকাটি বৃষ্টিপ্রবণ হওয়ায় ভারি বর্ষণ হলে পাহাড় ধসের কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থায় মারাত্মক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়। আবার শীতকালে ঘন কুয়াশার কারণেও যোগাযোগ ব্যবস্থায় ছেদ পড়ে। এসব বাস্তবতায় বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে সড়ক, রেল ও নৌ ট্রানজিট পাওয়া গেলে ভারতের পক্ষে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রতিবন্ধকতাগুলো অতিক্রম করা সহজতর হবে এমন বদ্ধমূল ধারণা তারা পোষণ করেন।
ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ভারত বিভাগের পূর্ব পর্যন্ত নদী পথে আসাম থেকে পশ্চিম বাংলায় দ্বিমুখী চলাচলে পণ্যসামগ্রী পরিবহন করা হতো। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান শাসনামলে পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি থেকে ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দ অবধি অভ্যন্তরীণ নৌ প্রটোকলের অধীন তিনটি রুটে দ্বিমুখী চলাচলে পূর্ব পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে ভারতের আসাম ও পশ্চিম বাংলাকে নৌ ট্রানজিট সুবিধা দেয়া হয়। এ তিনটি রুট হলো—ক. ধুবরি (আসাম)-চিলমারি-গোয়ালন্দ-চাঁদপুর-নারায়ণগঞ্জ-ভৈরববাজার-ছাতক অথবা জকিগঞ্জের ভারতীয় সীমান্ত; খ. ধুবরি-চিলমারি-চাঁদপুর-বরিশাল- মোল্লারহাট-খুলনা-বিহারি কেনেল (ভারত); গ. গোদাগাড়ি (রাজশাহী)-গোয়ালন্দ সেখান থেকে একটি সাবরুট ধুবরি পর্যন্ত এবং অপরটি চাঁদপুর হয়ে ছাতক অথবা জকিগঞ্জের ভারতীয় সীমান্ত পর্যন্ত। অতঃপর বাংলাদেশের জন্ম হলে ২৮ মার্চ, ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে পুরনো প্রটোকল পুনর্বহালের মাধ্যমে দ্বিমুখী চলাচলে চারটি রুটে নৌ ট্রানজিট সুবিধা দেয়া হয়। এ চারটি রুট হলো—ক. কলকাতা-হলদিয়া-রায়মঙ্গল-চালনা-খুলনা-বরিশাল-নন্দিবাজার-চাঁদপুর-আরিচা-সিরাজগঞ্জ-বাহাদুরাবাদ-চিলমারি-ধুবরি; খ. কলকাতা-হলদিয়া-রায়মঙ্গল-মংলা-কুয়াখালী-বরিশাল-নন্দিবাজার-চাঁদপুর-নারায়ণগঞ্জ-ভৈরববাজার-আজমিরিগঞ্জ-মারকুলি-শেরপুর-ফেঞ্চুগঞ্জ-জকিগঞ্জ-করিমগঞ্জ; গ. গোদাগাড়ি (রাজশাহী)-ধুলিয়ান; ঘ. করিমগঞ্জ-জকিগঞ্জ-ফেঞ্চুগঞ্জ-শেরপুর-মারকুলি-আজমিরিগঞ্জ-ভেরববাজার-চাঁদপুর-আরিচা-সিরাজগঞ্জ-বাহাদুরাবাদ-চিলমারি-ধুবরি।
বছরব্যাপী নাব্যের অভাবে এবং রাতে নৌ-চলাচল সুবিধার অনুপস্থিতিতে নৌ ট্রানজিট ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে পড়ছে। রাজস্ব স্বল্প হওয়ার কারণে এর সুবিধা বাংলাদেশের অনুকূলে গণ্য করা যায়। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারত বিভাগের পর থেকে চট্টগ্রাম ও আসামের মধ্যে এবং কলকাতা বন্দর থেকে পূর্ব বাংলা হয়ে আসাম পর্যন্ত রেল ট্রানজিটে ছেদ পড়ে।
ধারণা করা হচ্ছে, স্থল ট্রানজিটের আওতায় প্রাথমিক পর্যায়ে দ্বিমুখী চলাচলে ১০ লাখ টন পণ্য পরিবহন করা হবে। ভারতের কাছে বেনাপোল-তামাবিল ও বেনাপোল-আখাউড়া—এ দুটি রুট সম্ভাবনাময় বলে বিবেচিত। বর্তমানে উভয় রুটে প্রতিদিন গড়ে অভ্যন্তরীণ ৭৫০টি পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল করে। ট্রানজিট সুবিধার আওতায় প্রতিদিন গড়ে অতিরিক্ত ১৫ টন মালামাল পরিবহনযোগ্য ১ হাজার ৫০০ ট্রাক চলাচল করবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বর্তমান সড়ক অবকাঠামোতে যেখানে অভ্যন্তরীণ ৭৫০টি ট্রাক ঠিকভাবে চলাচল করতে পারছে না, সেখানে অতিরিক্ত অধিক পণ্য পরিবহনযোগ্য ১ হাজার ৫০০ ট্রাক চলাচলের সুযোগ আছে কিনা? এর সোজা উত্তর ‘না’।
ভারতের সঙ্গে সম্প্রতি সম্পাদিত চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে ৫ বছরের অতিরিক্ত সময়সহ বার্ষিক ১.৭৫ হার সরল সুদে ২০ বছরে পরিশোধযোগ্য এক বিলিয়ন ডলার ঋণ মঞ্জুর করা হয়েছে। ঋণ মঞ্জুরের ১ বছর পর ঋণের অব্যবহৃত অর্থের ওপর বার্ষিক ০.০৫ হারে কমিটমেন্ট ফি ধার্য করা হয়েছে। এ ধরনের ঋণকে বলা হয় টাইড লোন। এ ঋণের আওতায় ঋণের অধীন বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলোর পণ্য ও সেবা প্রাপ্তি সাপেক্ষে ঋণ প্রদানকারী রাষ্ট্র থেকে সংগ্রহ করার বিধান রয়েছে। এ ঋণের অর্থ কীভাবে ও কোন প্রকল্পে ব্যয় করা হবে সে সম্পর্কে দেশবাসীকে অদ্যাবধি স্পষ্ট ধারণা দেয়া হয়নি। টাইড লোন অর্থনীতির সংজ্ঞা মতে, রাষ্ট্রের স্বার্থের প্রতিকূলে বিবেচিত হওয়ায় বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্র একান্ত বাধ্য না হলে টাইড লোন গ্রহণে অনাগ্রহী। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা যথা—আইএমএফ, বিশ্ব ব্যাংক, এডিবি, আইডিবি প্রভৃতি থেকে সংগৃহীত ঋণের সঙ্গে আলোচ্য ঋণের তুলনা করলে পূর্বোক্ত সংস্থাগুলোর ঋণ আমাদের দেশের জন্য অধিকতর উপযোগী বিবেচিত হয়।
ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্থল ট্রানজিট সুবিধা দেয়া না হলেও বিগত বছরে একটি এমওইউ’র আওতায় ত্রিপুরা রাজ্যের পালাটানা বিদ্যুত্ কেন্দ্রের যন্ত্রপাতি নৌ ট্রানজিটের মাধ্যমে আশুগঞ্জে আনার পর ট্রেলারবাহী হেভি ডিউটি ট্রাক দ্বারা আশুগঞ্জ থেকে আখাউড়া হয়ে উল্লিখিত বিদ্যুত্ কেন্দ্রে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে আশুগঞ্জ নৌবন্দর সংস্কার এবং আশুগঞ্জ থেকে আখাউড়া পর্যন্ত সড়ক পথ সংস্কার ও বিকল্প সড়ক নির্মাণে যে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, ধারণা করা যায় তা টাইড ঋণের অর্থের অন্তর্ভুক্ত।
ভারতের সঙ্গে আমাদের যেসব অমীমাংসিত সমস্যা রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে—ক. অভিন্ন নদীগুলোর পানির সুষম হিস্যা; খ. সমুদ্রসীমা বিরোধ নিরসন; গ. অচিহ্নিত স্থলসীমা নির্ধারণসহ ছিটমহল সমস্যার সমাধান; ঘ. বাণিজ্য বৈষম্য দূরীকরণ; ঙ. ভুটান ও নেপালের সঙ্গে সম্পাদিত ট্রানজিট চুক্তির বাস্তবায়ন; চ. কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের বৈরী মনোভাব প্রত্যাহার; ছ. সীমান্তের চারপাশে নির্মিত ১৩২টি মাদক পর্যায়ভুক্ত ফেনসিডিল কারখানা বন্ধ করে মাদকের অবৈধ পাচার প্রতিরোধ প্রভৃতি।
ভারতের সঙ্গে স্থল ট্রানজিট বিষয়টির আলোচনার সূত্রপাত হলে এর পক্ষে ও বিপক্ষে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য আসতে থাকে। পক্ষবাদীরা বলতে থাকেন, ট্রানজিট শুল্ক হিসেবে বাংলাদেশের আয় হবে প্রারম্ভিক বছর সাত হাজার কোটি টাকা, যা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকবে। এছাড়া সেতু টোল ও ফেরি ভাড়া বাবত আরও অতিরিক্ত ১০০ কোটি আয় হবে। অন্যদিকে বিরুদ্ধবাদীরা বলতে থাকেন, সেভেন সিস্টার্সে বাংলাদেশের বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর যে বাজার সৃষ্টি হয়েছে, ট্রানজিটের কারণে ভারতের মূল ভূখণ্ডের পণ্যসামগ্রী সেখানে সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া গেলে বাংলাদেশ তার বাজার হারাবে এবং এর মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য বৈষম্য আরও বৃদ্ধি পাবে। তাছাড়া ট্রানজিটের মাধ্যমে ভারত যখন সামরিক সরঞ্জামাদি পরিবহন শুরু করবে তখন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়বে।
দেশের সাধারণ জনগণের বক্তব্য—ট্রানজিট বিষয়টির সঙ্গে রাজনীতি ও অর্থনীতি নিবিড়ভাবে জড়িত। তাদের অভিমত, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যেসব রাজনৈতিক অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে তার অর্থবহ ও ন্যায়সঙ্গত সমাধান না হলে ট্রানজিট দুই প্রতিবেশীর মধ্যে কার্যকর ও সুদূরপ্রসারি অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হবে।
ভারতকে সড়ক ট্রানজিট সুবিধা প্রদান করা হলে বাংলাদেশের বিদ্যমান অবকাঠামোতে এর বাস্তবায়ন যে সম্ভব না সে বিষয়ে কোনো বিতর্ক নেই। এরপর প্রশ্ন আসে, সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য যে বিপুল পরিমাণ অর্থের ব্যয় হবে তা ট্রানজিট শুল্ক ব্যতিরেকে প্রদান করা হলে এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কতটুকু। তাছাড়া প্রতি বছর সড়ক মেরামতের জন্য যে অর্থের প্রয়োজন হবে, তা ট্রানজিট শুল্ক নেয়া না হলে কীভাবে সংস্থান করা হবে। ট্রানজিট সুবিধা প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমানের চেয়ে ন্যূনপক্ষে তিনগুণ অধিক যানবাহন চলাচল করবে, যার অধিকাংশই হবে ট্রেলারবাহী হেভি ডিউটি ট্রাক। পরিবেশের ওপর এর প্রভাব কী হতে পারে তাও ভাবনায় নেয়া প্রয়োজন। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, সড়ক ট্রানজিট বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে চিন্তাশীল গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। এ ধরনের কোনো গবেষণা হয়েছে কিনা সে ধরনের তথ্য দেশবাসীর জানা নেই।
ভারতের সঙ্গে আমাদের বিদ্যমান যে রেল সংযোগ রয়েছে তা সংস্কারের মাধ্যমে ভারত বিভাগ পূর্ববর্তী রেল সংযোগ ব্যবস্থার পুনর্বহাল করা হলে তা যাত্রী ও মালামাল পরিবহন উভয়ের জন্য সহায়ক হবে। ভারতের সেভেন সিস্টার্সের অন্তর্ভুক্ত রাজ্যগুলোর মধ্যে ত্রিপুরা চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে সন্নিকটে। আখাউড়া থেকে ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা পর্যন্ত রেল লাইন নির্মাণ ও আগের রেল লাইন সংস্কারের মাধ্যমে রেল ট্রানজিটকে যাত্রী ও মালামাল উভয় ক্ষেত্রে ব্যাপকতর করা হলে তা সড়ক ট্রানজিটের চেয়ে অধিক কার্যকর হবে মর্মে বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যখন অপর কোনো দেশের সরকারের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, সে চুক্তিকে আইনের ভাষায় বলা হয় আন্তর্জাতিক চুক্তি। দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানের ১৪৫ক অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী যে কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করার পর রাষ্ট্রপতি তা সংসদে পেশ করার ব্যবস্থা করবেন। তবে এ ধরনের কোনো চুক্তির সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় জড়িত থাকলে সে ক্ষেত্রে এরূপ চুক্তি সংসদের গোপন বৈঠকে পেশ করার কথা বলা হয়েছে।
পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পাদিত চুক্তিগুলো সংবিধানের ১৪৫ক নং অনুচ্ছেদের আলোকে সংসদে পেশ করার বিষয়ে একাধিক সাবেক ও বর্তমান সংসদ সদস্যের সঙ্গে আলোচনা করলে কেউ কোনো ইতিবাচক ধারণা দিতে পারেননি।
এখানে প্রাসঙ্গিক যে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিগত বছরে এসআরও’র মাধ্যমে কন্টেইনার ও টনপ্রতি ট্রানজিট শুল্ক ১০ হাজার টাকা ও ১ হাজার টাকা ধার্য করার পর আবার তা জনৈক উপদেষ্টা ও মন্ত্রীর হস্তক্ষেপে প্রত্যাহার করা হয়। তাই অনেকের মনের মধ্যে অনুসন্ধিত্সু প্রশ্ন, কেনইবা ট্রানজিট শুল্ক ধার্য করা হলো আবার কেনইবা প্রত্যাহার করা হলো?
সাফটা (SAFTA) চুক্তি, ২০০৪ যদিও সার্কভুক্ত সব দেশকে সব ধরনের যথা—রেল, নৌ, আকাশ ও সড়ক ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার বিষয়ে বিধানাবলী সম্বলিত করেছে, কিন্তু অদ্যাবধি স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্র নেপাল ও ভুটান এ চুক্তির আওতায় ভারতের অনাগ্রহের কারণে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারত হয়ে সংশ্লিষ্ট দুটি দেশের পণ্য পরিবহন বিষয়ে পাস্পরিক চুক্তি থাকা সত্ত্বেও ট্রানজিট সুবিধা লাভ করতে পারেনি।
সম্প্রতি ভারতের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে বলা হচ্ছে, তার পূর্বাঞ্চলের সেভেন সিস্টার্স স্থলবেষ্টিত হওয়ায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় ট্রানজিট শুল্ক ব্যতিরেকে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতস্থ পশ্চিমবঙ্গ থেকে সেভেন সিস্টার্সে পণ্য পরিবহনের সুবিধা লাভের অধিকারী। ভারতের এ দাবির প্রতি দৃঢ় সমর্থন জ্ঞাপন করেছেন সরকারের জনৈক উপদেষ্টা।
ভারতের এ দাবিটি আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে যুক্তিগ্রাহ্য কিনা সে সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার আগে আমাদের আন্তর্জাতিক আইনের বিধানাবলী পর্যালোচনার পাশাপাশি ট্রানজিট, করিডোর, ট্রান্সশিপমেন্ট বিষয়ে ধারণা লাভ করা প্রয়োজন।
প্রথমে আলোচনা করা যাক ট্রানজিট, করিডোর, ট্রান্সশিপমেন্ট কি? আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ট্রানজিট বলতে বোঝায় এক দেশ থেকে অন্য দেশে পণ্য পরিবহনে তৃতীয় এক বা একাধিক দেশের সস্পৃক্ততা। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বাংলাদেশ থেকে ভারতের ভেতর দিয়ে নেপাল বা ভুটানে পণ্য পৌঁছানো। ট্রানজিট বিষয়ে GATT ১৯৯৪ ও WTO-এর বিধানাবলীর বাইরে যে দুটি আন্তর্জাতিক কনভেনশন রয়েছে তার একটি হচ্ছে বার্সিলোনা ট্রানজিট কনভেনশন, ১৯২১ এবং অন্যটি নিউইয়র্ক ট্রানজিট কনভেনশন, ১৯৬৫।
করিডোর অর্থ একটি দেশের লম্বা সরু ভূমি দ্বারা অপর একটি দেশের অন্যভাবে বিভাজিত দুটি অংশকে সংযুক্ত করে চলাচলের সুবিধা প্রদান। যেমন—তিন বিঘা করিডোরের মাধ্যমে দহগ্রাম ছিটমহলকে বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্তকরণ। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতের পশ্চিম অংশের সঙ্গে পূর্বাংশের সংযুক্তিকরণ প্রভৃতি। করিডোরের ক্ষেত্রে এক দেশ অপর দেশকে তার ভূমির ওপর কিছু অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ প্রদান করে, যা কার্যত সে দেশের ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। তিন বিঘা করিডোর হস্তান্তর বিষয়ে ভারতের বিভিন্ন সরকার বিভিন্ন সময় একাধিকবার প্রতিশ্রুতি দিলেও অদ্যাবধি বাস্তব অর্থে ওই করিডোরের ওপর বাংলাদেশের অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ দেয়া হয়নি।
টান্সশিপমেন্ট অর্থ—এক দেশের ভেতর দিয়ে অন্য দেশের পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে এক দেশের বাহন থেকে অন্য দেশের বাহনে পণ্যের স্থানান্তর। যেমন—ভারতীয় পণ্যবাহী বাহন বাংলাদেশের বেনাপোলে প্রবেশের পর পণ্য খালাসপূর্বক বাংলাদেশের বাহনে বোঝাইকরণ এবং অতঃপর তামাবিল বা আখাউড়া সীমান্তে পৌঁছানোর পর পুনঃভারতীয় বাহনে স্থানান্তর।
ট্রানজিট সংশ্লিষ্ট GATT ও WTO-এর অনুচ্ছেদ V, VIII ও X এখনও বিশদকরণ এবং উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে এবং এ বাস্তবতায় বার্সিলোনা ট্রানজিট কনভেনশন, ১৯২১ এবং নিউইয়র্ক ট্রানজিট কনভেনশন, ১৯৬৫-এর বিধানাবলীর আলোকে স্থলবেষ্টিত নয় এমন কোনো রাষ্ট্রের কোনো অংশের জন্য বিনা শুল্কে ট্রানজিট সুবিধা দাবি আন্তর্জাতিক আইন ও বিধানাবলীর পরিপন্থী।
নেপাল ও ভুটান বাস্তব অর্থেই স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও ভারত তার অর্থনৈতিক স্বার্থের হানি ঘটিয়ে উভয় রাষ্ট্রকে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারত হয়ে পণ্য পরিবহনের সুযোগ দিচ্ছে না। আক্ষরিক অর্থে ও আন্তর্জাতিক আইনের বিধানাবলীর আলোকে ভারতের সেভেন সিস্টার্সকে স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্র বলার কোনো সুযোগ নেই। তাহলে কেন ভারত বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে সেভেন সিস্টার্সে বিনা শুল্কে ট্রানজিট সুবিধা চাইছে?
বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারতের সেভেন সিস্টার্সে বিদ্যমান চারটি নৌ-রুটের নাব্য পুনরুদ্ধারক্রমে বছরব্যাপী নৌ ট্রানজিটের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন করা গেলে ভারতের পক্ষে কম খরচে সেভেন সিস্টার্সে পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে। নাব্য পুনরুদ্ধার বিষয়ে ড্রেজিং ব্যয়বহুল বিধায় এ ক্ষেত্রে রাজস্ব পুনঃনির্ধারণ যুক্তিযুক্ত। এ কথা অনস্বীকার্য যে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রবাহিত অভিন্ন নদীগুলো বাঁধ নির্মাণ করে ভারত কর্তৃক পানি প্রত্যাহারের কারণে একদিকে বাংলাদেশ অংশে দিন দিন পানির প্রবাহ হ্রাস পাচ্ছে, অন্যদিকে পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হওয়ায় নদীগুলোর নাব্য হারিয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নৌ ট্রানজিট ভারতের জন্য স্থল ট্রানজিটের চেয়ে অধিক উপযোগী। এখন ভারতের পূর্বাঞ্চলের জনগণের স্বার্থ বিবেচনায় ভারতকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা অভিন্ন নদীগুলোর পানির সুষম প্রবাহ নিশ্চিত করে নৌ ট্রানজিটের পথ সুগম করবে কি-না?
দেশ নিয়ে ভাবেন এমন অধিকাংশ অর্থনীতিবিদের অভিমত, ট্রানজিট, করিডোর ও ট্রান্সশিপমেন্ট—এ তিনটির মধ্যে আমাদের দেশের স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে নৌ ও রেল ট্রানজিট এবং সড়ক ট্রান্সশিপমেন্ট আমাদের জন্য সব দৃষ্টিকোণ থেকে অধিক সুফলদায়ক। সড়ক ট্রান্সশিপমেন্টের ক্ষেত্রে প্রথমত, পণ্যবাহী যানবাহনের আগমন ও নির্গমন স্থলে পণ্যগুলো ওঠানো ও নামানোর কারণে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে; দ্বিতীয়ত, পরিবহন ব্যবসা দ্রুত বিকাশ লাভ করে অভ্যন্তরীণভাবে সম্পদের যোগান ও চাহিদার সৃষ্টি করে অর্থনীতির ভীতকে সুদৃঢ় করবে এবং তৃতীয়ত, পরিবহন সংশ্লিষ্ট সেবাখাতের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের প্রসার ঘটবে।
ভারত যেমন তার সব প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়াবলীকে প্রাধান্য দিচ্ছে, ঠিক তেমনি বাংলাদেশেরও উচিত হবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে সব অমীমাংসিত সমস্যা দ্রুত সমাধানের মাধ্যমে ভারতকে সড়ক ট্রানজিটের পরিবর্তে সীমিত সড়ক ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা প্রদান করে নৌ ও রেল ট্রানজিটে প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে উভয়ের স্বার্থ সমুন্নত রাখা।
লেখক : সাবেক জজ ও সাবেক রেজিস্ট্রার, সুপ্রিমকোর্ট
Email: iktederahmed@yahoo.com

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন