বুধবার, ২০ জুন, ২০১২

ভালো নেই ভালো আছি



আফরোজা পারভীন
চারদিকে শুধুই হতাশার কথা শুনি। ভালো নেই, ভালো থাকব কি করে, দেশের যা অবস্থা। চাল, ডাল, তেলের বাজারে আগুন। দিন-রাতে দু’চার ঘণ্টা বিদ্যুত্ থাকে না, গরমে জীবন অতিষ্ঠ। কেরোসিনের যা দাম কেনার সঙ্গতি নেই। এই খরার সময় পানির অপরিসীম কষ্ট। না আছে খাওয়ার পানি, না অজু-গোসলের। গ্যাস জ্বলে ধিকি ধিকি, মাঝে মাঝে আবার জ্বলেও না। বাড়িভাড়া আকাশচুম্বি। বাচ্চাদের যাতায়াত খরচ, টিউশন ফি, কোচিংয়ের খরচ—সবকিছুই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। আর রাস্তাঘাটের যা অবস্থা! বাড়ি থেকে বেরুলে ফিরব যে তার নিশ্চয়তা কি।
চারদিকে চাঁদাবাজি, গুম, খুন, জ্বালানির দাম বাড়তি, বিদ্যুতের দাম বাড়তি। যাব কোথায় আমরা? ইচ্ছে করলেই তো আমরা মালয়েশিয়াকে সেকেন্ড হোম বানাতে পারি না। কিংবা পারি না গরমের দু’চারমাস ইউরোপ-আমেরিকা নিদেনপক্ষে কাশ্মীর কিংবা দার্জিলিংয়ে কাটিয়ে আসতে। কাজেই শুধুই হা-হুতাশ ভারি করে তোলে বাতাস। হা-হুতাশের সঙ্গত কারণও আছে। আসলেই স্বল্প আয়ের লোকদের ছেলেমেয়ে নিয়ে টিকে থাকা কঠিন। আর দুর্ঘটনা এতই বেড়েছে যে, বাইরে বেরুতে ভয় হয়। এইতো মাত্র কিছুদিন আগে একসঙ্গে মারা গেলেন তারেক মাসুদ আর মিশুক মুনির। মাত্র দিন পনের আগে একসঙ্গে মারা গেলেন এক পরিবারের নয়জন। আজকাল তাই অনেক বাড়িতেই সবাই একসঙ্গে কোথাও যান না। কেউ বের হন গাড়িতে বা বাসে কেউ লঞ্চে। যাতে মারা গেলে পরিবারের কেউ না কেউ অন্তত বেঁচে থাকে। এই ভয় আর সংশয়ের মধ্যে কাটে মানুষের জীবন।
তাহলে কি আমরা খুবই খারাপ আছি। এ জীবন কি শুধুই বেদনা আর যাতনার! দিন যত যাচ্ছে ততই কি খারাপ হচ্ছে আমাদের অবস্থা?
আপাতদৃষ্টিতে তাই-ই মনে হয়। কারণ সাধারণ মানুষ শুধু বর্তমান নিয়েই ভাবে। দিন যাপনের প্রাত্যহিকতায় তারা যেমন মনে রাখতে পারে না অতীতকে, তেমনি পরিকল্পিতভাবে ভবিষ্যতের কথাও ভাবে না। তাই হতাশা বাড়ে।
১৫-১৭ কোটি মানুষের এদেশে প্রয়োজনের তুলনায় অবকাঠামো সীমিত। রাস্তাঘাট কম। তাও আবার ভাঙাচোরা। রাস্তাঘাটে লোকজন গিজ গিজ করে। ড্রাইভারদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা নেই। অধিকাংশ যানবাহন ত্রুটিপূর্ণ। ট্রাফিক আইন যাত্রী, গাড়িচালক, পথচারী সবারই মানার প্রবণতা কম। সে কারণে দুর্ঘটনা ঘটে।
কিন্তু আশার বাণী কি কিছুই নেই আমাদের সামনে? খাদ্য উত্পাদন বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। এভাবে চললে স্বনির্ভরতার কাছাকাছি পৌঁছানো সময়ের ব্যাপার মাত্র। এখন এক জমিতে দু’তিন ফসল হচ্ছে। তারপরও রাজনীতির হানাহানিতে মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত। কাজের সুযোগ আগের চেয়ে বেড়েছে ঠিকই কিন্তু টাকার মান কমে গেছে। কাজ থাকায় মানুষের হাতে টাকা আছে। সে কারণে ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। বেড়েছে জীবনযাত্রার মান। শিক্ষা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হলেও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা বেড়েছে এবং শিক্ষার মান নিয়েও প্রশ্ন আছে। জেলে আর গৃহকর্মীর ছেলেমেয়ে জিপিএ ফাইভ পেলেও তারা ভালো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে যথেষ্ট। অবশ্য ‘সেশনজট’ ব্যাপারটা এখন আর তেমন পীড়া দেয় না। গণহারে নকলও কমেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস আর আগের মতো হয় না। নোটবই বহুলাংশে উঠে গেছে।
অন্যদিকে প্রবৃদ্ধির হারও কিছুটা বেড়েছে। হালদা নদীতে মাছের রেণু পোনার বাম্পার উত্পাদন হয়েছে যা দেশবিভাগের পর আর কখনও হয়নি। এশিয়া কাপ ক্রিকেটে রানার্সআপ হয়েছে বাংলাদেশ, সরকারি চাকরিজীবীদের চাকরির বয়স দুই বছর বেড়েছে। সবচেয়ে বড় কথা জঙ্গিবাদ দমন হয়েছে। আমরা অনেক সময়
এসব বিষয় বিবেচনা করলে আমরা বেশ ভালো আছি। মানুষের হাতে টাকা থাকায় এখন মানুষ ব্যবহার করতে চাইছে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি যা খুবই স্বাভাবিক। বিদ্যুত্ স্বল্পতার কারণে অনেক সময়ই সেটা সম্ভব হচ্ছে না বা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। কাজেই মানুষের হতাশা বাড়ছে। কিন্তু ভেবে দেখা দরকার এই হতাশা কতটা যৌক্তিক। জনবহুল, দরিদ্র, সমস্যাসঙ্কুল একটা দেশে এর চেয়ে ভালো থাকার সুযোগ কোথায়?
লেখক : কথাশিল্পী, কলাম লেখক

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন