বুধবার, ২৭ জুন, ২০১২

হ্যালো, নষ্ট সুশীলেরা



ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী :
 জোট সরকারের শেষ দিকে বাংলাদেশে সুশীল সমাজ নামক এক সংঘবদ্ধ ইতরগোষ্ঠীর আবির্ভাব হয়েছিল। যে ইতরেরা এই সমাজে নিজেদের ‘সুশীল সমাজ' ঘোষণা করে সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী শক্তির দালাল হিসাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছিল। তারা যে কী মাত্রায় নষ্ট ও ইতর ছিল সেটা ভাষায় প্রকাশ করা দুষ্কর। আমি কেঁদে-কেটে এক নিবন্ধ লিখে তাদের কাছে আবেদন জানিয়েছিলাম, ‘আম্মু, আমি সুশীল হবো'। জীবনে এই প্রথম সে লেখায় সুশীল হওয়ার জন্য আমি আমার যোগ্যতার বিস্তারিত তুলে ধরেছিলাম। ওনাদের জানিয়েছিলাম, ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে নয়, পত্রিকায় লিখে। কারণ ওনারা তখন সাম্রাজ্যবাদী-আধিপত্যবাদীদের মদদে এতটাই শক্তিশালী ছিলেন যে, আমার মতো নিম্নমানের মানুষের সে আকুল আবেদন শুনে তাদের কেউ আমাকে ঐ সুশীল সমাজের অন্তর্ভুক্ত হতে ডাক দেননি। তার জন্য কোনো আবেদন পত্রের ব্যবস্থা ছিল কিনা, সেটিও আমার জানা নেই। থাকলেও অমন খোলা আবেদনের পর তারা নিশ্চয়ই আমাকে আবেদন ফরমটি অন্তত মেইলে পাঠিয়ে দিতেন।
বলা নেই, কওয়া নেই, দশ-বারোজন লোক মিলে হঠাৎ এক কলঙ্কিত বিকেলে নিজেদের সুশীল বলে ঘোষণা করে বসেছিলেন। তখন সাম্রাজ্যবাদী-আধিপত্যবাদীরা সুশীল খুঁজছে। এবং তারা জানে সঠিক সুশীল কে হতে পারে। ফলে তারা টাকা ঢালল, সুশীলেরা জোট সরকারকে তথা রাজনৈতিক সরকারকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য হেন কোনো অপকর্ম নেই যাতে লিপ্ত হলেন না। তাদের প্রধান অস্ত্র তাদের হাতে গোটা দুই প্রভাবশালী পত্রিকা ছিল, কিছু এনজিও ছিল, আর ছিল কিছু ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। তাদের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশকে সারা পৃথিবীর কাছে কিভাবে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসাবে চিহ্নিত করা যায়। আহা! সেকি শোরগোল। মইন-ফকরের মতো মীরজাফরদের সঙ্গী হয়ে কিভাবে দেশে স্বৈরতন্ত্র কায়েম করা যায়, তার জন্য ঐ ইতরেরা মরিয়া হয়ে উঠেপড়ে লাগল। রাষ্ট্র ও জনগণের বিরুদ্ধে এই দ্রোহের তারা নানান নাম দেয়ার চেষ্টা করলেন। এবং তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রধান দুটি পত্রিকায় কী যে সব ইতর রিপোর্ট ছাপা হতে থাকল, চল্লিশ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে এরকমটি কখনও দেখি না।
সাংবাদিকতাকে তারা এমন নষ্ট ও স্বার্থবুদ্ধি পর্যায়ে নিয়ে গেল যে, আত্মগ্লানি অনুভূত হতে থাকল। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্সসহ পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেছি। হল্যান্ডের আইএসএস থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেছি। এই সুশীলদের মাত্র দুজনের পিএইচডি ডিগ্রী ছিল। তাদের একজন সত্যিকারই গবেষণা করে পিএইচডি অর্জন করেছিলেন। সমাজে তার সুখ্যাতিও ছিল। আর একজন পিএইচডি পেয়েছিলেন রাশিয়ান। তিনি রাশিয়ার এমন এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স অর্জন করেছিলেন যেখানে মস্কোপন্থী ছাত্রদের অনার্স পাস করলেই তার নাম দেয়া হত পিএইচডি। তেমন এক পিএইচডি এই সুশীল সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এখনও নামের আগে ডক্টর লেখেন। আমি দশ বছর সারা বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ঘুরে আমার পিএইচডি'র সকল রসদ সংগ্রহ করেছি। গোটা পঞ্চাশেক বই লিখেছি। টেলিভিশনে বিভিন্ন বিষয়ে নিরপেক্ষ বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে খানিকটা অতিরিক্ত পরিচিতি লাভ করেছি। প্রতি সপ্তাহে দুই-তিনবার পত্রিকায় লিখে আত্মপ্রকাশ করার চেষ্টা করেছি।
কিন্তু আমি কিছুতেই বুঝতে পারিনি যে, আমি কেন সুশীল হতে পারব না। সুশীল হওয়ার জন্য আমার আকুল আবেদনে তারা কেউ সাড়া দেননি। কিছুদিন ভারী ভগ্নমনোরথ ছিলাম। আমি ভাবলাম, সুশীলদের সকলেরই তো পিএইচডি ডিগ্রী নাই। আমার তো ডিগ্রী আছে। কৃতকর্ম আছে, যা ঐ সুশীলদের একজন ছাড়া বাকি কারও ছিল না। তবু আমার আকুল আবেদন তারা গ্রাহ্য করেননি।
তারা অবিরাম বলে গেছেন যে, জোট সরকার বাংলাদেশকে এক ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। সেই জন্য তারা সভা-সেমিনার করেছেন। বিদেশী পয়সায় গ্রামে গ্রামে সৎপ্রার্থীর খোঁজ করতে গেছেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের ধাওয়া খেয়ে তারা ফিরে এসেছেন। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সুশীলদের একজন অনলাইনে সৎমানুষের রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দিয়ে বেশ একটা আলোড়ন তুলেছিলেন। এক তছনছ কান্ড। এ ভদ্রলোক এখন অনেক বিপদে। তার সাকসেস স্টোরির শেষ নেই। কিংবা সাকসেস স্টোরির নামে তার প্রতিষ্ঠানের লুণ্ঠনের কোনো শেষ নেই।
বাংলাদেশে এক আমরা আশ্চর্য ব্যাপার দেখি। সেটি হলো, এ দেশের নাগরিকদের সম্মানিত ব্যক্তিরা নিজেদের সম্মান কেন যেন ব্যক্তিস্বার্থে ধরে রাখতে পারেন না। প্রেসিডেন্ট আবদুর রহমান বিশ্বাস বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হিসাবে গণতন্ত্র রক্ষায় যে ভূমিকা পালন করেছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে অবিশ্বাস্য ঘটনা হয়ে থাকবে। কিন্তু নির্বাচনের আগে তিনি এক অদ্ভুত কান্ড করে বসলেন। তিনি জাতীয় সংসদের এমপি হিসাবে দাঁড়াবার জন্য বিএনপি'র কাছে আবেদন করলেন। তার আবেদন একটু লম্বা ছিল। যদি তাকে মনোনয়ন না দেয়া হয় তাহলে যেন তার ছেলেকে মনোনয়ন দেয়া হয়। এটা ভাবতেও বিস্ময় লাগে। সাবেক প্রেসিডেন্ট থাকবেন সকল রাজনীতি, সকল স্বার্থবুদ্ধির ঊর্ধ্বে। তিনি হবেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। না। জেনারেল নাসিমের সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা রোধ করে দিয়ে এ দেশের মানুষের হৃদয়ে তিনি গভীর ঠাঁই করে নিয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনে দাঁড়াতে চেয়ে বিএনপি'র কাছে আবেদন করেছিল। আমাদের ট্র্যাজেডি এটাই। স্বৈরাচারী এরশাদ কোনো বিবেচনার যোগ্যই নন। কিন্তু আবদুর রহমান বিশ্বাসের কাছে প্রার্থিত ছিল না। তেমনি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী এমন এক ইতর কাজ করে বসল যে, তাকে দেশের রাষ্ট্রপ্রধান পদ ত্যাগ করতে হলো। তারপর তিনি অনেক রাগ। বিএনপি'র বিরুদ্ধে একজন রাজনৈতিক দল গঠন করে নিজেকে প্রেসিডেন্ট পদের মর্যাদা থেকে অনেক নিচে নামিয়ে দিলেন।
না। এটা শেখ মুজিবের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তার তো কোনো দরকারই ছিল না যে, তিনি একবার প্রেসিডেন্ট আবার প্রধানমন্ত্রী, আবার প্রেসিডেন্ট হবার জন্য সংবিধান সংশোধন করলেন। এটি ভাবাও যায় না। শেখ মুজিবুর রহমান সারা জীবন বহুদলীয় গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করেছিলেন। কিন্তু তিনি কেন যেন ক্ষমতার মোহে মদমত্ত হয়ে উঠলেন। বাকশাল গঠন করে সকল রাষ্ট্রীয় শক্তি, প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ, সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিতে চাইলেন। কে কোথায় বিচারক, কি না কি রায় দিবে, কোনো দরকার আছে! শেখ মুজিব সব কিছুই নিজের হাতে নিতে চেয়েছিলেন। অর্থাৎ বাংলাদেশে যারা প্রেসিডেন্ট হিসাবে ছিলেন, তারা কেউই তাদের মর্যাদা রক্ষা করতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। এটা আমাদের জন্য বড় দুর্ভাগ্যের বিষয়।
কিন্তু আলোচনা শুরু করেছিলাম সুশীল দিয়ে। এখন কি রাষ্ট্র ব্যর্থ? সেইসব সুশীল একেবারে রক্ত খেয়ে লম্বা জোঁক যেন। একেবারে আসল রূপে ফিরে গেছেন। তাদের লক্ষ্য অনুযায়ী, কিংবা প্রভুদের সেবাদাস হিসেবে তারা যা করেছে, তার চাইতে নিম্নমানের ইতরকর্ম পৃথিবীর ইতিহাসে কোথায়ও ঘটেছে কিনা, হুবহু তেমন কোনো ইতিহাস আমার জানা নেই। সুশীলরা বলতে পারেন, আমি ইতিহাস পড়িনি। তাদেরকে চ্যালেঞ্জ করতে চাই যে, তারা তখন যে খবর ছাপতেন, তা কোনো বিবেচনায়ই খবর ছিল না। জোট সরকারের মন্ত্রী-এমপি-নেতাদের বিরুদ্ধে তারা এমন গীবত প্রচার করতে লাগলেন, তা কোনো যৌক্তিকতার মানদন্ডে গ্রহণযোগ্য ছিল না। যেমন কোনো মন্ত্রী বা এমপি ৮ ফাইল ত্রাণের টিন চুরি করেছেন। কেউ চুরি করেছেন গাছ, কেউ বা গরু। এসব যখন প্রকাশিত হতো তখন গা গুলিয়ে আসত।
বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘকালের ও সবচেয়ে সফল অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান সম্পর্কে তারা লিখল যে, তিনি বন বিভাগের গাছের চারা চুরি করেছেন। সে চারা লাগিয়ে তিনি তার বাগানবাড়ি সজ্জিত করেছেন। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো এই যে, বছরের বৃক্ষরোপণ মওসুমে বন বিভাগ নানা জাতের লক্ষ লক্ষ চারা বিনামূল্যে জনসাধারণের মধ্যে বিতরণ করে। এবং নানা প্রচার প্রচারণার মাধ্যমে গাছ লাগাতে উৎসাহিত করে। সাইফুর রহমান যদি সে গাছ নিয়ে গিয়ে তার বাগানবাড়িতে লাগিয়ে থাকেন, তাহলে একথা নিশ্চিত করে বলা যায় যে, সে গাছগুলোর সুরক্ষা হবে। সেগুলো যথাযথভাবে বেড়ে উঠবে ও যথার্থ বিকাশ নিশ্চিত হবে। অর্থাৎ বনবিভাগের উদ্দেশ্য সফল হবে। তাকে দুর্নীতি বলে এমনভাবে প্রচার করা হলো যে সাইফুর রহমান বিরাট দুর্নীতি করে ফেলেছেন।
এমনি হাজারো গপ্পো তারা প্রতিদিন প্রচার করেছে জনগণকে ধোকা দেওয়া ও বোকা বানানোর জন্য। শেষে শুধু জোট সরকার নয়, সকল রাজনৈতিক দল ধ্বংস করার জন্য তারা উঠেপড়ে লেগেছিল। রাজনৈতিক দল মানেই যেন চোর-বাটপারের আখড়া। অর্থাৎ দেশে রাজনৈতিক দলই থাকতে পারবে না। কেবল সুশীলেরা থাকবে। তখন এই নষ্ট লোকেরা সৎ মানুষের দল গঠনের জন্য বিদেশী টাকায় গ্রামে গ্রামে ঘুরছিল। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য সফল হয়নি। সাধারণ মানুষই তাড়া করে তাদের আবার রাজধানীতে ফেরত পাঠায়। যখন তারা দেখল যে, এভাবে সৎ মানুষ খুঁজতে গেলে জনগণের হাতে মার খাওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো পথ থাকবে না। তখন তারা আর এক সুশীলকে দিয়ে সৎ মানুষের রাজনীতির দোকান খুলতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের সে প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়। তবে ওইসব ইতর প্রচারণার মাধ্যমে তারা ঠিকই দেশে সামরিক আইন নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল।
কিন্তু এখন দেশের কী অবস্থা! দ্রব্যমূল্য আকাশছোঁয়া। আইন-শৃক্মখলা বলতে দেশে কিছু নেই। প্রতিদিন ডজন ডজন মানুষ গুম হয়ে যাচ্ছে। ব্যবস্থা নেই। বিচারবিভাগ, প্রশাসন, পুলিশ সর্বত্র দলীয়করণ। টেন্ডারবাজি দখলবাজিতে দিশেহারা মানুষ। অর্থনীতি ফোকলা হয়ে গেছে। বাংলাদেশ যেন ভারতের অধীনস্ত হয়ে পড়েছে। ট্রানজিট বন্দর করিডোর ভারতকে প্রদানের  মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এখন মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে সুশীলেরা। তবে কী তাদের সকল আন্দোলনের লক্ষ এটাই ছিল। সে লক্ষ্য অর্জিত হয়ে গেছে বলেই এমন নীরবতা?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন