বুধবার, ২০ জুন, ২০১২

তত্ত্বাবধায়ক প্রশ্নে আওয়ামী বক্তব্য কতটা যৌক্তিক



॥ ড. আবু এন এম ওয়াহিদ ॥

আমি রাজনীতি নিয়ে কলাম যে একেবারে লিখি না তা নয়, তবে বেশি লিখতে চাই না। কারণ বর্তমানে বাংলাদেশে রাজনীতি ও গণতন্ত্রের নামে যা চলছে, তা আর যা-ই হোক আমার বিবেচনায় রাজনীতিও নয়, গণতন্ত্রও নয়। তবে কী? সেটা না হয় না-ই বা বললাম। আমি দেশ-বিদেশে যা দেখি ও শুনি তার নৈতিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক ও মানবিক দিকগুলোই পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে চাই। পাঠকেরা আমার কাছ থেকে রাজনৈতিক লেখা চায় কি না জানি না, তবে বন্ধুবান্ধব অনেকেই চায় এবং বেশ জোরের সাথেই চায়, তাই মাঝে মধ্যে রাজনৈতিক কলাম লিখি। আবার কোনো কোনো সময় স্বপ্রণোদিত হয়েও এমন লেখা লিখে থাকি। বর্তমান লেখার পেছনে এ দুটো কারণই সমানভাবে প্রযোজ্য। 
গত বছর পাস হওয়া সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর পর তত্ত্বাবধায়ক বিতর্ক হঠাৎ করে সামনে চলে আসে। ফলে এমনিতে অসুস্থ রাজনীতি আরো জটিল আকার ধারণ করে। ইদানীং এই রাজনীতি রীতিমতো সঙ্ঘাতময় হয়ে উঠেছে। তত্ত্বাবধায়ক বিতর্ক এ মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড় বিতর্কের বিষয় এবং এর আশু সমাধান প্রয়োজন। বিএনপিসহ ১৮ দলীয় জোট নিঃশর্তভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পুনরুদ্ধার চাচ্ছে। তবে এখানে একটি কথা পরিষ্কার করা প্রয়োজন। তারা নামের ব্যাপারে একেবারে অনমনীয় নয়। তারা বলছে নাম যা-ই হোক, তত্ত্বাবধায়ক অথবা অন্তর্বর্তীকালীন তাতে কিছু যায় আসে না, নির্বাচনকালীন সরকার নির্দলীয় ও নিরপে হলেই চলবে। অর্থাৎ তারা নাম চায় না, চায় কাম। মজার ব্যাপার তারা নির্দলীয় ও নিরপে সরকারের যে দাবি জানাচ্ছে, তার সপে কিন্তু বলতে গেলে কোনো যুক্তিই দিচ্ছে না কিংবা দেয়ার প্রয়োজনও মনে করছে না। তারা মনে করে, তাদের দাবি ষোলোআনা ন্যায়সঙ্গত এবং এ ইস্যুতে দেশের অন্তত ৮০ শতাংশ লোক তাদের সাথেই আছে। 
আওয়ামী লীগের মনে যা-ই থাকুক, অন্তত মুখে তারা এ দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করছে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে তাদের নানা ধরনের যুক্তি একে একে জনগণের সামনে উপস্থাপিত করছে। এ বিতর্কে ১৪ দলীয় জোটের বাকি ১৩ দলের অবস্থান পরিষ্কার নয়। তবে ব্যাপারটা আগামীতে অবশ্যই আরো খোলাসা হয়ে যাবে। তাদের পে বর্তমান এ ধূম্রজালের মধ্যে আর বেশি দিন থাকা সম্ভব হবে না। মহাজোটের অবশিষ্ট শরিক এরশাদের জাতীয় পার্টি একই প্রশ্নে একেক বার একেক কথা বলছে। শেষ মুহূর্তে জাতীয় পার্টির অবস্থ্ান কী হবে, তা এরশাদ ভালো করেই জানেন, জনগণও সঠিকভাবে আন্দাজ করতে পারছে বলেই আমার বিশ্বাস; কিন্তু সরকারি দল জানে কি না আমার সন্দেহ। কারণ জেনে এবং এর মর্মার্থ বুঝে থাকলে তাদের কৌশল অন্য রকম হতো। ১৮ দলীয় জোট যুক্তি ছাড়া তাদের দাবি জানিয়ে বসে আছেÑ ফলে আমার বিবেচনায় তারা অফেন্সে আছে। পান্তরে আওয়ামী লীগ বসে নেই, তাদেরকে অনবরত যুক্তি দিতে হচ্ছে। অর্থাৎ তারা ডিফেন্সিভ পজিশন নিয়েছে। বিতর্কের আগেই বিতর্কে পরাজয়ের এটি একটি লণ বলে কেউ মনে করলেও আমি যাচাই-বাছাই না করে আওয়ামী লীগের যুক্তিগুলো ছুড়ে ফেলে দিতে চাই না। 
এবার একটু চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেখা যাক তত্ত্বাবধায়কের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের যুক্তিগুলো কতখানি গ্রহণযোগ্য। প্রথমত, তাদের যুক্তি হলো উচ্চ আদালত বলছে অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংবিধানের মূল চেতনার অর্থাৎ গণতন্ত্রের সাথে সাংঘর্ষিক, তাই পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এটা তুলে দেয়া হয়েছে। সেখানে ফিরে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই। কিভাবে ভালো নির্বাচন করা যায় এবং নির্বাচন কমিশনকে কেমন করে আরো শক্তিশালী করা যায়Ñ এ ব্যাপারে পরামর্শ থাকলে বিরোধী দল সংসদে এসে তাদের কথা বলতে পারে; যৌক্তিক হলে সেগুলো শোনা হবে, বিবেচনায় নেয়া হবে। আওয়ামী লীগের এ কথা একেবারেই ধোপে টেকে না। কারণ সংবিধানের মূল চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক অন্য কিছু কাজ তারা অতি সহজে একই সংশোধনীতে করে ফেলেছে। যেমনÑ রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এবং ‘বিসমিল্লাহ’ ও সমানভাবে ধর্মনিরপেতার সাথে যায় না। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীতে রাজনৈতিক স্বার্থে সেগুলোকে তারা সুন্দরভাবে হালাল করে নিয়েছে। 
এ ছাড়া অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অসাংবিধানিক বললেও উচ্চ আদালত দেশের জনগণের জানমাল ও সার্বিক রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বলেছেন তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা দেশে আরো ১০ বছর থাকতে পারে; তবে বিচার বিভাগকে এ থেকে দূরে রাখতে হবে। এখানে আওয়ামী লীগ সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শকে অবজ্ঞা করেছে। অর্থাৎ যেটুকু তাদের জন্য সুবিধাজনক তা গ্রহণ করেছে, অন্য অংশ বর্জন করেছে। তারা বলছেন, ‘আরো দুই টার্ম তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা থাকতে পারে।’ এটা রায়ের অংশ নয়, এটা সুপ্রিম কোর্টের একটি পর্যবেণ মাত্র। সরকার এটা মানতে বাধ্য নয়। কথাটা ঠিক, তবে এটাও ঠিক, আওয়ামী লীগ নিজের সুবিধামতো উচ্চ আদালতের দোহাই দেয়, অসুবিধা হলে আদালতের কথা কানেও নেয় না, উচ্চ আদালত তো আর অকারণে ওই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেণটি দেননি। এর চেয়েও বড় আরেকটি প্রশ্ন এখানে দেখা দেয়Ñ আওয়ামী লীগের যদি সত্যি সত্যিই অনির্বাচিত ব্যক্তিদের প্রতি এত অ্যালার্জি থাকে, তাহলে দেশের ৬৪ জেলায় তারা কী করে অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগ দিলো এবং ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত মেয়রকে সরিয়ে দু’জন অনির্বাচিত প্রশাসককে মেয়র খোকার স্থলাভিষিক্ত করল? যেহেতু এসব প্রশ্নের উত্তর নেই, তাই এটা বুঝতে কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়; নির্বাচিত সরকারের প্রতি আওয়ামী লীগের মায়াকান্না আসলে একটি মেকি কান্না ছাড়া আর কিছুই নয়। 
দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগ দাবি করে, প্রথমবারের মতো তারা সংবিধানের সংশোধন প্রক্রিয়া স্বচ্ছতার সাথে করেছে। অর্থাৎ তারা সব শ্রেণী-পেশার মানুষের কাছ থেকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে পরামর্শ নিয়ে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করেছে। তারা আরো দাবি করে, বিএনপিকেও তারা সংশোধনী কমিটিতে এসে তাদের বক্তব্য যথাযথভাবে উপস্থাপিত করার সুযোগ দিয়েছে, কিন্তু তারা সময়মতো সে সুযোগ নেয়নি। এখন চিল্লাচিল্লি করলে কী হবে? এ যুক্তিও অসার। এবং বিএনপি তাদের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে ঠিক কাজটিই করেছে, পাতানো ফাঁদে পা দেয়নি। আওয়ামী লীগও বিরোধী দলে থাকলে তা-ই করত। বিএনপির ধারণা ছিল তারা কমিটিতে গিয়ে তাদের বক্তব্য দিলেও আওয়ামী লীগ তা শুনত না। এবং তা-ই সত্যে পরিণত হয়েছে। আওয়ামী লীগ এ ব্যাপারে যা করেছে তা একেবারেই লোক দেখানো। তারা সুশীলসমাজের কথা শুনেছে, অন্য রাজনীতিবিদদের কথা শুনেছে; কিন্তু কারো কথাই তারা পাত্তা দেয়নি, কারো কথার কোনো মূল্য দেয়নি, কথা রাখেনি। শোনার ব্যাপারেও যে ঘাটতি ছিল না তা-ও নয়। পত্রিকায় দেখেছি, জাস্টিস মুস্তাফা কামাল সংশোধনী কমিটির শুনানিতে বক্তব্য দিতে গিয়েছিলেন। সেখানে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়া সম্বন্ধে সহানুভূতিশীল বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের তীব্র বিরোধিতার মুখোমুখি হন এবং বক্তব্য শেষ না করেই দুঃখভরা মন নিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন। 
জাস্টিস মুস্তাফা কামাল তো দূরের কথা, আওয়ামী লীগ তাদের জোটভুক্ত শরিক দলের কারো কথাও রাখেনি। আরো পরিতাপের বিষয় তাদের নিজের দলের সিনিয়র মন্ত্রীদের কথাও প্রধানমন্ত্রী আমলে নেননি। এ প্রসঙ্গে একটি ক্যাবিনেট মিটিংয়ের কথা না বললেই নয়। ওই সভায় অর্থমন্ত্রী মুহিত ও পরিকল্পনামন্ত্রী খন্দকার বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এবং বিসমিল্লাহ সংবিধানের মূলনীতি ধর্মনিরপেতার সাথে খাপ খায় না।’ প্রধানমন্ত্রী কোনো যুক্তি না দেখিয়ে তাদের অত্যন্ত অপ্রাসঙ্গিকভাবে ধমক দিয়ে বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর লাশ যখন পড়েছিল তখন আপনারা কোথায় ছিলেন?’ এ থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় সংবিধান সংশোধনীতে পরমত শোনার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের আন্তরিকতা কতখানি ছিল।
তৃতীয়ত, আওয়ামী লীগ সব সময় বলে থাকে, ফখরুদ্দীন-মইন উদ্দিন সরকার তত্ত্বাবধায়কের নামে তিন মাসের জন্য এসে দুই বছর মতায় থেকেছে এবং মাইনাস টু ফর্মুলা দিয়েছে, দুর্নীতি করেছে, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের নির্যাতন করেছে; দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতির সর্বনাশ করে গেছে। সুতরাং ওই দানবীয় সরকারব্যবস্থায় আমরা আর যাব না। এ যুক্তির উত্তরে বলা যায়, তাদের কথা অনুযায়ী ফখরুদ্দীন-মইন উদ্দিন সরকার তাদেরই আন্দোলনের ফসল। তাই এ সরকারের অকাম-কুকামের দায়ভার পুরো না হলেও কিছুটা তাদের ঘাড়েও পড়ে। তা নয় কি? প্রধানমন্ত্রীই ফখরুদ্দীন-মইন উদ্দিন সরকারকে দায়মুক্তি দিয়েছেন। নিজ দলের নির্যাতিত সিনিয়র সদস্যদের দাবি উপো করে তিনি এখনো ফখরুদ্দীন-মইন উদ্দিন গংয়ের বিচারের আওতায় আনছেন না। এতে কি প্রমাণ হয় না যে নির্বাচনের আগে ওই বেআইনি সরকারের সাথে তার একটি গোপন ও অশুভ আঁতাত হয়েছিল। এর চেয়ে বড় কথা, ইয়াজউদ্দিনের সরকারকে কানা হোক, খোঁড়া হোক তত্ত্বাবধায়ক সরকার বলা চলে; কিন্তু ফখরুদ্দীন-মইন উদ্দিন সরকারকে তো আদৌ তত্ত্বাবধায়ক সরকারই বলা যায় না। কারণ তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত সংবিধানের ৫২ ক ধারায় কিন্তু ফখরুদ্দীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বে শপথ নিতেই পারেন না। কারণ তিনি এর বিভিন্ন বিকল্প ক্যাটাগরির কোনোটার মধ্যেই পড়েন না। আসলে ফখরুদ্দীন-মইন উদ্দিন সরকার ছিল একটি গোঁজামিলের সরকার, একটি বেআইনি ও অসাংবিধানিক সরকার। এটা ছিল বেসামরিক ছত্রছায়ায় পুরোপুরি একটি সামরিক সরকার। এর সাথে উদাহরণ দিয়ে জাস্টিস সাহাবুদ্দীন, জাস্টিস হাবিবুর রহমান ও জাস্টিস লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে উড়িয়ে দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। 
চতুর্থত, তাদের যুক্তি হলো, ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন ছিল মাগুরার নির্বাচনের পরিপ্রেেিত। এখন সে রকম ঘটনা ঘটেনি, সে পরিস্থিতি নেই, তাই এর প্রয়োজনও নেই। এ যুক্তিকে খণ্ডন করা যায় এভাবেÑ মাগুরার মতো ঘটনা না ঘটলেও অনুরূপ ঘটনা এখনো ঘটছে এবং আলবত ঘটছে। যেমন চিটাগাং মেয়র‌্যাল নির্বাচনে ভোট গণনার সময় অনিয়ম হয়েছিল, কিন্তু বিএনপি-জামায়াতের মিছিল এবং মিডিয়ার কারণে সরকার নির্বাচনের ফলাফল পাল্টানোর সাহস দেখাতে পারেনি। পত্রিকায় দেখেছি কোনো এক উপনির্বাচনে নির্বাচন কমিশন সেনা মোতায়েনের অনুরোধ জানিয়ে প্রতিরা মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছিল। নির্বাচন শেষ হওয়ার পরও কমিশনে সে চিঠির জবাব আসেনি। নারায়ণগঞ্জ মেয়র নির্বাচনে ঘটেছে একই রকম ঘটনা। ভোটারদের সাথে কমিশনের ওয়াদার পরিপ্রেেিত নির্বাচন কমিশন সরকারের কাছে সেনা মোতায়েনের অনুরোধ জানায়। ওই নির্বাচনে সরকার সেনা মোতায়েন না করে প্রত্যভাবে সংবিধান লঙ্ঘন করেছে। নির্বাচনকালীন সময়ে নির্বাচন কমিশনকে সর্বপ্রকার সহায়তা দিতে সরকার সাংবিধানিকভাবে বাধ্য। এটা আওয়ামী লীগ সরকারের একটি বড় ধরনের ব্যত্যয়, যা মাগুরা থেকে কোনো অংশে কম নয়। 
পঞ্চম যুক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিরা প্রায়ই বলে থাকেনÑ আর দশ-পাঁচটা গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে নির্বাচন হয়, বাংলাদেশে সেভাবেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে; তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নয়। এখানে আমি বিনীতভাবে তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে বাংলাদেশ আর দশ-পাঁচটা গণতান্ত্রিক দেশের মতো নয়। এখানে রাষ্ট্রপতি খুনের মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে রাজনৈতিক আনুকূল্যে মুক্তি দেন (দুই সরকারের সময়ই তা হয়েছে)। এখানে মাগুরার মতো নির্বাচন হয়, আবার ঢাকা-উত্তর ও ঢাকা-দেিণ নির্বাচনই হয় না। এখানে সরকারি কর্মচারীরা জনতার মঞ্চে উঠে সরকারের পতন ঘটায়। এখানে হরতালের আগের রাতে ঢাকার রাজপথে বাসে বাসে আগুন জ্বলে। এখানে সরকার বিরোধী দলের নেত্রীকে ঈদের প্রাক্কালে কাঁদিয়ে এক কাপড়ে বাড়িছাড়া করতে দ্বিধাবোধ করে না। এখানে বিরোধী দলের সভায় গ্রেনেড চার্জ করে ২২ জন নিরপরাধ নারী-পুরুষকে হত্যা করে আক্রমণকারীরা সহজে পালিয়ে যায়, তারপর বিচারের নামে জজ মিয়া নাটক সাজানো হয়। সরকারবিরোধী আন্দোলন চাঙ্গা করতে এখানে বাসে বারুদ ছিটিয়ে জ্যান্ত নয়জন যাত্রীকে পুড়িয়ে মারা হয়। এখানে বিরোধী দলের জমায়েতে যাতে লোক না আসতে পারে তার জন্য তিন দিন ধরে ঢাকা শহরকে সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। এখানে জাতীয় সংসদে ফাউন্ডিং ফাদারসদের নিয়ে অশ্রাব্য ভাষায় গালমন্দ করা হয়। সরকার ও আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ নিশ্চয়ই জানেন আর দশ-পাঁচটা গণতান্ত্রিক দেশে এর কোনোটাই হয় না। দোহাই আপনাদের, তত্ত্বাবধায়ক প্রশ্নে আর দশ-পাঁচটা গণতান্ত্রিক দেশের উদাহরণ টেনে আনবেন না। এটা সরকার, বিরোধী দল এবং জাতি সবার জন্য লজ্জার বিষয়।
আওয়ামী লীগের শেষ যুক্তিÑ হবিগঞ্জে দেওয়ান ফরিদ গাজী মারা গেলে তার সিটে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে সরকারি দল হেরে গিয়ে প্রমাণ করেছে যে এ সরকারের অধীনে নিরপে নির্বাচন সম্ভব। এ যুক্তিও ধোপে টেকে না। কারণ ওই সময় সংসদে যদি সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যসংখ্যা সমান সমান থাকত এবং ওই উপনির্বাচনের ওপর নির্ভর করত আওয়ামী লীগ সরকার টিকবে, না বিএনপি নতুন সরকার গঠন করবে; তাহলেই কেবল আওয়ামী লীগের যুক্তির একটি ওজন থাকত। যেহেতু অবস্থা ছিল ভিন্ন, তাই এ যুক্তিরও নেই কোনো মূল্য। তারা আরো বলে থাকেন, আওয়ামী লীগের অধীনে যে পাঁচ হাজার স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তাতে সরকার এবং বিরোধী দল মোটামুটি সমান সমানসংখ্যক সিট পেয়েছে। তাই আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন ও নিরপেভাবে কাজ করছে। সুতরাং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন নেই। এ যুক্তির উত্তরে বলা যায়, তাই যদি হবে, তাহলে তফসিল ঘোষণার পরও কেন নতুন নির্বাচন কমিশন বিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনগুলোর ভোট গ্রহণ করতে পারল না। তার চেয়ে বড় কথা, স্থানীয় নির্বাচনের ফলাফল দেখিয়ে জাতীয় নির্বাচনের উপসংহার টানা যায় না। কারণ স্থানীয় নির্বাচনের হারজিতের ওপর নির্ভর করে না কে সরকার গঠন করবে আর কে বিরোধী দলে যাবে। 
সরকার সমর্থিত কোনো কোনো কলামিস্ট তত্ত্বাবধায়ক প্রসঙ্গে অহরহ বলে থাকেন, ‘বিএনপি বিচার মানে কিন্তু তালগাছটা আগেই তাদের।’ না, কথাটা ওভাবে ঠিক নয়। আসল ব্যাপার হলো, বিচার-সালিস বসার আগেই এজমালি তালগাছ আওয়ামী লীগ জোর করে নিয়ে গেছে। এখন তালগাছ এজমালি জোনে ফিরে এলে পরেই বিচার-সালিস বসতে পারে, বিএনপি সেটাই বলছে। অন্যভাবে বলতে গেলে আওয়ামী লীগ যদি রাজি হয় নির্বাচনকালীন সরকার হবে নির্দলীয় ও নিরপে তাহলে বিএনপি আওয়ামী লীগ সালিসে বসবে বিচার বিভাগকে বাদ দিয়ে কিভাবে কাকে প্রধান উপদেষ্টা করা যায় সেটা ঠিক করার জন্য, তার আগে নয়। কলামিস্টরা পাল্টা যুক্তি দেবেন, তালগাছ আওয়ামী লীগ নেয়নি, নিয়েছে সংসদ। যেহেতু সংসদ সার্বভৌম তাই তার সে অধিকার আছে। এ যুক্তিও অসার, কারণ সংসদ ধ্র“ব অর্থে সার্বভৌম নয়, সার্বভৌমত্বের মালিক জনগণ এবং জনগণের প্রতিনিধি হিসেবেই কেবল সংসদ সার্বভৌমত্ব চর্চা করে থাকে। আর তাই সার্বভৌমত্ব চর্চার ব্যাপারে সংসদকে সব সময় খেয়াল রাখতে হয় জনমতের দিকে। তত্ত্বাবধায়ক প্রশ্নে জনমত যে সরকার বা আওয়ামী লীগের পে নয়, তা বোঝার জন্য দৈনিক জাতীয় পত্রিকাগুলোর প্রতিদিনকার জরিপের ফলাফলই যথেষ্ট। তার চেয়ে বড় কথা, নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগ সংবিধান সংশোধন এবং বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা তুলে দেয়ার জন্য জনগণের কাছ থেকে কোনো ম্যান্ডেটও নেয়নি। তাই নতুন করে গণভোট না নিয়ে তারা সর্বসাধারণের গ্রহণযোগ্য তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা বাতিল করতে পারে না। 
আওয়ামী লীগ যুক্তি যা-ই দিক না কেন এবং বিএনপি দাবি যতই করুক না কেন, এ বিতর্কের ফয়সালা যুক্তিতে হবে না। হবে রাজপথের রাজনৈতিক শক্তিতে। এ বিষয়ে শক্তি পরীা করে ১৯৯৬ সালে বিএনপি আফসোস করেছে। ২০১২ সালে এসে আওয়ামী লীগ একই ভুল করলে একই ফল তাদেরও ভোগ করতে হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভবিষ্যৎ নিয়ে মোটাদাগে আরেকটি কথা না বললেই নয়, যত দিন পর্যন্ত প্রধান দুই রাজনৈতিক জোটের মধ্যে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও নীতিনির্ধারণী প্রশ্নে স্থায়ী সমঝোতা না হবে, যত দিন পর্যন্ত যেকোনো দল মতায় এসেই জাতীয় স্থাপনাগুলোর নাম পরিবর্তন এবং বিরোধী দলকে ঠ্যাঙানো বন্ধ না করবে, যত দিন পর্যন্ত উভয় দলের মরহুম নেতাদের বিরুদ্ধে সংসদে বিষোদগার বন্ধ না হবে, যত দিন পর্যন্ত উভয় জোট উচ্চ আদালতের প্রতি সমানভাবে শ্রদ্ধাশীল না হবেÑ তত দিন পর্যন্তই বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন থাকবে। রাজনৈতিক কলাম লেখার সময় আমি আপ্রাণ চেষ্টা করি ভারসাম্য বজায় রাখতে। কিন্তু একতরফাভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে দিয়ে সরকার আজ আমাকে সে দায় থেকে মুক্তি দিয়েছে। এ জন্য সরকার বাহাদুরকে ধন্যবাদ। 
লেখক : অধ্যাপক, টেনেশি স্টেট ইউনিভার্সিটি; এডিটর, জার্নাল অব ডেভেলপিং এরিয়াস
Awahid2569@gmail.com

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন