রবিবার, ২৪ জুন, ২০১২

বাংলাদেশের সংকট নিরসনে

এমাজউদ্দীন আহমদ


প্রফেসর স্কিডমোর (Max J. Skidmore) এবং প্রফেসর ট্রিপ (Marshall Carter Tripp) যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের বিশ্লেষণে লিখেছেন : বিশ্বের অধিকাংশ জনপদে জনগণ বসবাস করেন বিভিন্ন রূপ কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থায়। এসব জনপদে জনগণ অধিকার (Rights) লাভ করেন সরকারের কাছ থেকে অনেকটা দাক্ষিণ্য বা অনুগ্রহের মতো। 'আমেরিকার শাসনব্যবস্থায় কিন্তু ক্ষমতা চূড়ান্তভাবে স্থিত রয়েছে জনগণের মধ্যে। জনগণই এ ক্ষমতা সরকারের হাতে তুলে দেয় এবং সরকার সুনির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে তা প্রয়োগ করে।' [In the American system the power ultimately is lodged in the people, and they grant power to the government which exercise it within strict limitation] - এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের সুষম বিকাশ ঘটেছে। কখনো কোনো সময় নাগরিকদের অধিকারে সরকার হস্তক্ষেপে সাহসী হয় না। অনেকটা আমেরিকার নাগরিকের মতো আমরাও বলতে পারি, বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনগ্রসর থেকেও অন্তত তত্ত্বগত দিক থেকে বাংলাদেশেও 'প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ' (All powers in the Republic belong to the people)। প্রজাতন্ত্রের ক্ষমতার মালিক নন জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত প্রতিনিধিরা, নন নির্বাচিত এবং অনির্বাচিত সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত সরকারও। আমেরিকার নাগরিক এবং বাংলাদেশের নাগরিকদের অধিকারের পার্থক্য শুধু একটি এবং তা হলো. আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে যা বাস্তব, বাংলাদেশে তা শুধু কেতাবী, সংবিধানে লিখিত সর্বশ্রেষ্ঠ বাক্যটি। তাই দেখি যুক্তরাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বাস্তবে কার্যকর, বাংলাদেশে এখনো তা জনগণের আকাঙ্ক্ষায়।

যে গণতন্ত্র বাংলাদেশে এখনো জনগণের আকাঙ্ক্ষায়, তাকে বাস্তবে রূপ দেওয়াই তো নির্বাচিত সরকারের সবচেয়ে বড় কাজ। এ দেশের জনগণকে যদি তারা সত্যি সত্যিই ক্ষমতার মালিক মনে করেন, তবে এর কি কোনো বিকল্প আছে? গণতন্ত্র বা স্বশাসন কিন্তু সুশাসন ছাড়া কখনো বাস্তবায়িত হয় না। তাছাড়া গণতন্ত্র শুধু সুনির্দিষ্ট সময় কালের ব্যাপার নয়, ভবিষ্যতেও যেন তা জনগণের জন্য অর্থপূর্ণ হয়ে অব্যাহত থাকে, তাও নিশ্চিত করতে হবে।

আমার ধারণা, আমাদের রাজনীতিকরা দক্ষ এবং অভিজ্ঞ। সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে যে মহান মুক্তিযুদ্ধের ফসল আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ, তার যোগ্য সন্তান তারা। বাংলাদেশ কিন্তু আজ সংঘাত, হিংসা-প্রতিহিংসার আগুনে ঝলসে যাচ্ছে। ক্রমে ক্রমে হয়ে উঠছে বাসের অযোগ্য এক জনপদ। শান্তিপূর্ণ জীবনের অযোগ্য। এ জন্য দায়ী আমরাই। এটা মনুষ্যসৃষ্ট দুর্দৈব। কারও প্রতি কোনো অভিযোগ না রেখেই বলব। এ জনপদকে আবারও আমরা পরিণত করতে পারি স্বাধীনতা, স্বাতন্ত্র্য এবং শান্তি ও সুখের স্বপ্নরাজ্যে। এ জন্য প্রয়োজন শুধু রাজনীতিকদের কল্যাণকামী মন। হিংসা-প্রতিহিংসা-জেদশূন্য আকাশের মতো উদার মন।

এখন দেশে যা ঘটে চলেছে তার মূলে রয়েছে প্রধানত ২০১১ সালের ১০ মে কিছু পর্যবেক্ষণসহ সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ কর্তৃক ঘোষিত ত্রয়োদশ সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা। রায়ের পূর্ণ কপি আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে জানা গেছে, রাষ্ট্রীয় স্বার্থে এবং জনকল্যাণের বিবেচনায় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে জাতীয় সংসদের দশম ও একাদশ নির্বাচন এ ব্যবস্থার মাধ্যমে হতে পারে। দেশের রাজনীতিকরা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। ২০১১ সালে সমাপ্ত জাতীয় সংসদে কিন্তু রাজনীতিকরা এদিকে না তাকিয়ে সমগ্র ব্যবস্থাকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন পঞ্চদশ সংশোধনীতে। এ বিষয়ে আলোচনার ঝড় চলছে জোরেশোরে। বলতে দ্বিধা নেই, দেশে যে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে তার মূলে রয়েছে পঞ্চদশ সংশোধনীতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অবৈধ ঘোষণার বিষয়টি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এটিকে অগ্রহণযোগ্য বলে চিহ্নিত করেছে। কেউ কেউ আপিল বিভাগের রায়কে স্ববিরোধী বলে আখ্যায়িত করেছেন। ক্ষমতাসীন জোট খুশি হয়েছে এই ভেবে যে, অনির্বাচিত ব্যক্তিদের দ্বারা সাধারণ নির্বাচন আর অনুষ্ঠিত হবে না। প্রয়োজনবোধে ক্ষমতাসীন থেকেই নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব হবে এবং একদলীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করা সম্ভব হবে। প্রশাসন, পুলিশ বিভাগ, বিচার বিভাগে যেভাবে দলীয়করণ করা হয়েছে তা তখন অর্থপূর্ণ হয়ে উঠবে। আপিল বিভাগের সব বিচারপতি এ বিষয়ে একমত হননি। সংখ্যাধিক্যের জোরে এমন স্পর্শকাতর বিষয়ে এ রায় বাংলাদেশে সৃষ্টি করেছে এমন সমস্যা যাতে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পর্যন্ত অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।

আমার মতো সাধারণ একজন নাগরিক জাতীয় জীবনের এ সংকটকালে ছোট্ট একটা সুপারিশ রাখতে চাই। জানি, এটিও বিতর্ক সৃষ্টি করবে। তারপরও বলতে চাই, অনির্বাচিত ব্যক্তির দ্বারা নির্বাচন অনুষ্ঠান যদি গণতান্ত্রিক সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা নির্বাচনী পরিষদ অথবা কোয়ালিশন সরকার গঠিত হতে পারে যারা নবম সংসদে নির্বাচিত হয়েছিলেন তাদের সমন্বয়ে। দেশে যে দুটি রাজনৈতিক জোট বিদ্যমান তাদের মধ্যে যে পারস্পরিক বিদ্বেষ, অনাস্থা এবং অবিশ্বাস বর্তমান সেই প্রেক্ষাপটে নবম সংসদের কার্যকাল সমাপ্ত হলে দুই বড় দল থেকে সমানসংখ্যক সদস্য সমন্বয়ে আগামী নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে এ সরকার বা সংস্থা গঠিত হতে পারে। এ সংস্থা তাদের কার্যক্রমের জন্য দায়ী থাকবে মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে। সমানসংখ্যক সদস্যের কথা বলেছি তার কারণ ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর দুই জোটের মধ্যে জনসমর্থনের যে বৈষম্য ছিল এখন তা নেই। ১৮ দলীয় জোটের সমর্থকের সংখ্যা বর্তমানে হয়তো বা একটু বেশি। তাছাড়া ওই নব্বই দিনের কার্যকালে ওই সংস্থার কোনো ক্ষেত্রে ক্ষমতা প্রয়োগ বা পরিকল্পনা গ্রহণেরও কোনো সুযোগ থাকার কথা নয়। তাদের কাজ হবে শুধু একটি সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। তাই সেই সংস্থাকে হতে হবে নিরপেক্ষতার প্রতীক (A symbol of neutrality) নিরপেক্ষ নির্বাচনই একমাত্র গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। নির্বাচন অনুষ্ঠান যথেষ্ট নয়। এ নির্বাচনকে দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অবাধ, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য হতে হবে।

তখন যেহেতু সংসদ কার্যকর থাকবে না, তাই ওই সংস্থায় সংসদের নেতা এবং বিরোধী দলের নেতার উপস্থিতির প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু প্রাজ্ঞ, ধীরস্থির চিন্তার অগ্রগামী সদস্যদের। তাদের সমন্বয়ে এ সংস্থা রচিত হতে পারে। এ সংস্থার সিদ্ধান্ত পরবর্তীতে জাতীয় সংসদের মাধ্যমে গৃহীত হলে তা নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে সাংবিধানিক আইনে পরিণত হতে পারে। সংস্থার সদস্য সংখ্যায় পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু দুই এর ভারসাম্য বজায় রেখে এবং ঐকমত্যের ভিত্তিতে। সাধারণ নির্বাচন পরিচালনাকারী সংস্থা নির্দলীয় এবং নিরপেক্ষ না হলে আঠার দলের নেতৃবৃন্দ আগাম ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন, এই নির্বাচনে তারা অংশগ্রহণ করবে না। এমন নির্বাচন হতেও দেবে না। তারপরও যদি ক্ষমতাসীন দল অগ্রসর হয় এবং একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠান করে তাহলে সেই নির্বাচন হয়ে উঠতে পারে তাদের গলার কাঁটা। বিজয়মাল্য হয়ে উঠবে তখন কণ্টকপূর্ণ ক্যাকটাসের মালা।

সমগ্র বিষয়টি সম্পন্ন হতে পারে দুই বৃহৎ দলের মধ্যে অর্থপূর্ণ সংলাপের মাধ্যমে। তবে সংলাপের প্রাথমিক পর্যায়ে মধ্যম পর্যায়ের নেতাদের ভূমিকা গ্রহণই বাঞ্ছনীয়। কিছু দূর অগ্রসর হলে অথবা কোনো কোনো বিষয়ে মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হলে উভয় দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কাছে তা উপস্থাপিত হলে ভালো হয়। সংলাপকে ফলপ্রসূ করার কয়েকটি পূর্বশর্ত রয়েছে। এক. উভয় পক্ষের মধ্যে কিঞ্চিৎ হলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে। দুই. উভয় পক্ষের কোনো কোনো পর্যায়ে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা থাকা অতি জরুরি। তিন. এক্ষেত্রে জেদ পরিহার করতে হবে। চার. জনগণই যে সব ক্ষমতার মালিক, অন্য কেউ নয়_ তা সর্বদা স্মরণে রাখতে হবে। কিন্তু সংলাপের সূচনার আগে তার ক্ষেত্র তৈরি হতে হবে। হরতালে গাড়ি পোড়া বা সচিবালয়ে বোমা ফাটানোর কাল্পনিক অভিযোগে বিরোধী দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দকে যেভাবে জেলে বন্দী রাখা হয়েছে সে পরিবেশে সংলাপের সূচনা হবে না। যেভাবে সাংবাদিকদের ওপর সরকার খড়গহস্ত তা পরিবর্তিত হতে হবে। মধ্যম পর্যায়ের নেতাদের ওপর বিশ্বাস স্থাপন সম্ভব না হলে স্বয়ং রাষ্ট্রপতি হতে পারেন এ সংলাপের কেন্দ্রবিন্দু। 'winners take all' নীতির পরিবর্তে 'win win� situation তৈরির মানসিকতা রচনা করতে হবে। আমাদের দক্ষ, প্রাজ্ঞ রাজনীতিকরা নিজেদের ঘরের সমস্যা সমাধান করতে পারবেন বলে আমি বিশ্বাস করি। তা না হলে Clive অথবা Duplex-এর মতো ধুরন্ধররা আমাদের চারপাশেই রয়েছে। তখন কিন্তু নিজের ঘরেই আমরা পরবাসী হয়ে থাকতে বাধ্য হবো। যাদের আগ্রাসন ঠেকাতে পঞ্চদশ সংশোধনী গৃহীত হয়েছে, তারাও জাতির ঘাড়ে চেপে বসতে পারে- এ বিষয়টিও স্মরণে রাখা প্রয়োজন।

লেখক : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন