রবিবার, ২৪ জুন, ২০১২

সেলফোন ও ইন্টারনেটের অপব্যবহার র“খতে হবে


মোঃ বে লা য়ে ত হো সে ন
সব আবিষ্কারের লক্ষ্যই মানবকল্যাণ, কিš‘ মানুষ ব্যক্তিস্বার্থে এসব আবিষ্কারকে খারাপ প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করে। ‘নিউক্লিয়ার’ আবিষ্কৃত হয়েছিল মানবকল্যাণে, ব্যবহƒত হয়েছে মানব ধ্বংসের হাতিয়ার হিসেবে। প্রযুক্তি মানুষকে জ্ঞানের আলো দেখায় আবার মানুষের পশুবৃত্তির কারণে ভয়াবহ ক্ষতিসাধন করে সমাজ ও রাষ্ট্রের। প্রযুক্তি প্রতি মুহূর্তেই ধাপে ধাপে এগিয়ে যা”েছ, এগিয়ে নি”েছ আমাদেরও। এর ওপর ভর করে প্রতিদিনই আমরা জানছি, উদ্ভাবন করছি নতুন নতুন বিস্ময়কর সব যন্ত্রপাতি, আর প্রতিদিনই আমরা মুখোমুখি হ”িছ নতুন নতুন সমস্যার। 
বর্তমানে তথ্যের রাজ্যে বাধাহীন, অবাধ বিচরণের প্রধান মাধ্যম হ”েছ মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট। জ্ঞান ও তথ্যের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করতে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট এখন বহুল ব্যবহƒত, সর্বাধিক আলোচিত ও ব্যাপক সমালোচিত। এর প্রধান কারণ হল, মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের বাধাহীন ও শাসনহীন অবাধ ব্যবহার। ফলে সমাজ জীবনে বয়ে নিয়ে আসছে বিপজ্জনক সব ভাইরাস, বয়ে নিয়ে আসছে অপসংস্কৃতি, অশ্লীল, উলঙ্গ ও বিকৃত সব ছবি বা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর কিছু। 
মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের অপব্যবহারের অবধারিতভাবে শিকার হ”েছ অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়ে, বিশেষ করে মেয়েরা। মোবাইল ফোনের অপব্যবহার মেয়েদের লাঞ্ছিত ও নির্যাতনের একটা পথ তৈরি করে দিয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ আতংকের খবর হল, মোবাইল ফোনের অপব্যবহারের কারণে দেশের বিভিন্ন ¯’ানে নির্যাতন ও যৌন হয়রানির শিকার হয়ে মেয়েরা আÍহত্যা পর্যন্ত করছে। অন্যদিকে দেশে মারাÍকভাবে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও অন্যতম প্রধান কারণ মোবাইল ফোনের অপব্যবহার! তাছাড়া চাঁদাবাজ, ডাকাত ও হাইজাকারসহ ভয়ঙ্কর সব অপরাধীর প্রধান অস্ত্র এখন মোবাইল ফোন। এক কথায় বাংলদেশে মোবাইল ফোনের ভালোর চেয়ে খারাপের দিকটিই এখন ফোটে উঠছে। সুতরাং মোবাইল ফোনের অপব্যবহারের দিকটি এখন সর্বো”চ অগ্রাধিকার দিয়ে দেখতে হবে।
বর্তমানে মোবাইল ফোনের অপব্যবহারের দিকটি দেখতে কোন গবেষণার প্রয়োজন নেই। রাস্তাঘাটে চলাচল করলেই তা সবার চোখে পড়ে। বাংলাদেশের মোবাইল ফোন গ্রাহকদের মধ্যে এখন অর্ধেকেরও বেশি অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়ে, যাদের বয়স ১২-১৬ এর মধ্যে। এমনকি ১০ বছরের ছেলেমেয়েদের হাতেও এখন মোবাইল ফোন শোভা পা”েছ। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হল, এই মোবাইল ফোনগুলো আবার মাল্টিমিডিয়া সিস্টেম। ই”ছা করলেই এগুলো দিয়ে মন যা চায় তাই করা যায় এবং দেখা যায়। ২০ টাকা খরচ করে ২৪ ঘণ্টা ইন্টারনেট ব্রাউজ করা যায়। তাই মোবাইল ফোনে ইন্টারনেটের অপব্যবহার এখন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। আর সমাজে অপরাধের ধরন ও মাত্রা অনুধাবন করলেই তা উপলব্ধি করা যায়। যতসব অশ্লীল, উলঙ্গ ছবি মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে দেখার ব্যব¯’া আছে। আজকে যে মেয়েদের ওপর যৌন হয়রানি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সমাজে যেসব ভয়াবহ সব পারিবারিক ও সামাজিক অপরাধ সংগঠিত হ”েছ, এর প্রধান ও অন্যতম কারণ মোবাইল ফোনের অপব্যবহার। 
লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশে অপরাধের ধরন বদলে যা”েছ এবং অপরাধ গভীর থেকে গভীরতর পর্যায়ে পৌঁছার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখছে মোবাইল ফোনের অপব্যবহার। অপহরণ, চাঁদাবাজি, মুক্তিপণ আদায়সহ জঘন্য সব অপরাধ এখন সংঘটিত হ”েছ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে। তাছাড়া মোবাইল ফোনের অপব্যবহারের অন্য দিকটি হল, রাত জেগে প্রেমালাপ। অপ্রাপ্তবয়স্ক তর“ণ-তর“ণী ও ছাত্রছাত্রীরা লেখাপড়া বাদ দিয়ে এখন রাত জেগে প্রেমালাপে ব্যস্ত থাকে। এর ব্যাপকতা এত বাড়ছে যে, কোন পরিবারই এর থেকে বাদ যা”েছ না। অনেক সম্ভাবনাময় সংসার পর্যন্ত ভেঙে যা”েছ; অভিভাবকরা এসে আমাদের কাছে এ ব্যাপারে অসহায়ত্ব প্রকাশ করছে।
এ ব্যাপারে পরিবারের দায়িত্ব অপরিসীম। প্রযুক্তি আমাদের সামনে বিশ্বের অবারিত জ্ঞানের দরজা উš§ুক্ত করে দিয়েছে। যার ফলে প্রযুক্তির পথরোধ করা মানে জ্ঞানের অবাধ প্রবেশ ব্যাহত করা। কিš‘ পরিবারের দায়িত্বহীনতার কারণে খারাপ নেতিবাচক অশ্লীল কিছু বিষয় আমাদের তর“ণ-তর“ণীদের মাঝে অনুপ্রবেশ করছে। কলুষিত করছে আমাদের প্রজš§কে। এর প্রতিকার প্রথমে পরিবার থেকেই শুর“ করতে হবে। পরিবারকেই নিতে হবে অগ্রণী ভূমিকা। 
পরিবারকেই আগে জবাব দিতে হবে কী করে ১২ বছরের ছেলেমেয়েদের হাতে মোবাইল ফোন দেয়া হল। কী করে সন্তানরা লেখাপড়া বাদ দিয়ে রাত জেগে প্রেমালাপে ব্যস্ত থাকে। ভালো খারাপ দিক চিন্তা না করে শিশুদের হাতে মোবাইল ফোন নামধারী একটা ভয়ানক যন্ত্র তুলে দেয়া কোন দায়িত্বশীল কাজ নয়। অহংকারের বশবর্তী হয়ে অথবা আদর-সোহাগেÑ যে কারণেই এ ভয়াবহ যন্ত্র দেয়া হোক না কেন, আপনিই প্রথম আপনার সন্তানের মাথা খেলেন। আপনার পরিবার থেকেই আপনার সন্তানের পচন শুর“ হল। 
ভালো মানুষ বা অন্য ভালো অর্জন, তা পরিবার থেকেই সূচিত হয়। পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের ভালো কিছু চর্চা শিশুদের ধ্যানে-জ্ঞানে সঞ্চারিত হয়। আপনি লাখো কোটি টাকার ওপর ভর করে সংসার গড়লেন অথচ সন্তান মানুষ হলো না, তাতে কী লাভ হল? বিত্তের অহংকারেই আমরা অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েদের ভোগবিলাসের উপকরণ তথা তাদের হাতে মাল্টিমিডিয়া মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ তুলে দি”িছ। 
এ ব্যাপারে রাষ্ট্রেরও অনেক দায়িত্ব ও করণীয় আছে। রাষ্ট্র যদি এ দায়িত্ব পালন না করে বা এ দায়িত্ব সম্বন্ধে জ্ঞাত না হয়ে থাকে অথবা অন্য যে কোন সীমাবদ্ধতার কারণে রাষ্ট্র দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তাহলে রাষ্ট্রের ব্যর্থতার কারণে আমার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এটা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। আমরা দেখছি রাষ্ট্র এ দায়িত্ব পালন করছে না। রাষ্ট্র বহুজাতিক মোবাইল কোম্পানিগুলোকে অবাধে ও যেনতেনভাবে ব্যবসা করার সুযোগ করে দিয়েছে। এ ব্যাপারে কোন নীতিমালা বা শাসন বহুজাতিক মোবাইল কোম্পানিগুলো ফেইস করছে না। তারা বাধাহীনভাবে ব্যবসা করে যা”েছ। আপনার-আমার পরিবারের কী ক্ষতি হলো অথবা রাষ্ট্র কী ক্ষতির সম্মুখীন হলো, এতে তাদের কিছু যায় আসে না; তারা ব্যবসা করতে এসেছে এবং ব্যবসা করছেও। তারা হাজার হাজার কোটি টাকার ‘এয়ারটাইম’ বিক্রি করছে এবং মুনাফাও করছে, একমাত্র মুনাফা ছাড়া তাদের আর কোন দায়বদ্ধতা আছে বলে মনে হয় না।
বাংলাদেশের মোবাইল কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ১০ কোটি। এর মধ্যে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বাছবিচার করলে বেরিয়ে আসবে প্রায় অর্ধেকই অপ্রাপ্তবয়স্ক গ্রাহক, যারা মোবাইল ফোন ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী। এই বিশাল অপ্রাপ্তবয়স্ক গ্রাহকের হাতে মোবাইল ফোন তুলে দিয়ে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের পরিবার ও সমাজ কাঠামোর অপূরণীয় ক্ষতি করছে। তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকলে এই কচি ছেলেমেয়েদের হাতে তারা মোবাইল ফোন নামক ভয়ানক যন্ত্রটি তুলে দিত না এবং রাস্তাঘাটে পান-বিড়ির দোকানে সিমকার্ড বিক্রি করত না।
আজ রাস্তা-ঘাটে হকারি করে সিমকার্ড বিক্রি হ”েছ, এও কি সম্ভব! সিমকার্ড একটি অতি গুর“ত্বপূর্ণ জিনিস, এর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার মতো বিষয় জড়িত; জড়িত সামাজিক নিরাপত্তাও! রাষ্ট্র এ ব্যাপারে দায়িত্ব এড়াতে পারে না। কীভাবে এবং কোন ফাঁকফোকর দিয়ে এত বিশাল সংখ্যক অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েদের হাতে মোবাইল ফোন পৌঁছে গেল, এটি দেখা রাষ্ট্রের অবশ্যই দায়িত্ব।
আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোতে আঠার বছরের নিচে মোবাইল ফোন ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। সেখানে একজন মোবাইল গ্রাহক হতে হলে তাকে প্রথমে প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে, অর্থাৎ তার বয়স আঠার বছরের উপরে হতে হবে। তাকে অবশ্যই প্রয়োজনীয় যথাযথ কর্তৃপক্ষের সত্যায়িত কাগজপত্র জমা দিতে হয় এবং মোবাইল ফোন ব্যবহারের যৌক্তিক কারণ উল্লেখ করতে হয়। তাহলেই একজন মোবাইল ফোনের গ্রাহক হওয়ার যোগ্য হয়। লক্ষণীয়, গত কিছুদিন আগে ভারতের স্কুল-কলেজগুলো মোবাইল ফোন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে, যা বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকায় প্রচার হয়েছে। আরও লক্ষণীয়, ভারতের বেসরকারি মোবাইল কোম্পানিগুলোর ওপর সরকারের কঠোর নজরদারি রয়েছে। যেনতেনভাবে ব্যবসা করার সুযোগ ভারতের মোবাইল ফোন অপারেটরদের নেই। 
বাংলাদেশেও মোবাইল ফোন অপারেটরদের সরকারি কঠোর নজরদারিতায় আনতে হবে। পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তাদের জন্য নতুন নীতিমালা তৈরি করে দিতে হবে। বাধাহীন ও যেনতেনভাবে ব্যবসা করার সুযোগ বন্ধ করতে হবে। জাতীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই এসব পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারের সহযোগিতায় অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েদের অর্থাৎ ১৮ বছরের নিচে গ্রাহকদের চিহ্নিত করতে হবে এবং তাদের সিম বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে হবে। যত্রতত্র সিমকার্ড বিক্রিও বন্ধ করতে হবে। বেসরকারি মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ ইউনিয়ন, থানা ও জেলা সদরে তাদের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে বিক্রয় কেন্দ্র খুলতে হবে। শুধু সিমকার্ড বিক্রি নয়, হ্যান্ডসেটসহ সংযোগ বিক্রি বাধ্যতামূলক করতে হবে। কেননা হ্যান্ডসেটে যে আইএমই নম্বরটি থাকে, এটি একটি বিশেষ নিরাপত্তা হিসেবে ব্যবহƒত হয়ে থাকে। 
ন্যাশনাল আইডি কার্ড ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ ছাড়া কেউ যেন মোবাইল ফোন সংযোগ ক্রয় করতে না পারে সে ব্যব¯’া গ্রহণ করতে হবে। তাছাড়াও সরকারে উদ্যোগে স্কুলগুলোতে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে। ১৮ বছরের নিচে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধের আইন তৈরি করতে হবে। সামাজিক অবক্ষয়ের ভয়াবহতা এবং তর“ণ-তর“ণীদের মাঝে অপরাধের ধরন ও গভীরতা উপলব্ধিতে এনেই এটি করতে হবে। 
পরিবারেরও সব সময় খেয়াল রাখতে হবে তার সন্তান মোবাইল ফোন কী ধরনের কাজে ব্যবহার করছে। সন্দেহ হলে প্রয়োজনে তার মোবাইল ফোনের কথোপকথন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্বারা রেকর্ডও করা যেতে পারে। এভাবে কিছু কিছু দৃষ্টান্ত তৈরি করলেই মোবাইল ফোনের অপব্যবহার অনেকাংশে কমানো যাবে। 
মোঃ বেলায়েত হোসেন : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
নবষধুবঃ-১@ুধযড়ড়.পড়স

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন