রবিবার, ১৩ মে, ২০১২

বিদেশে বাংলাদেশী : স্বাধীনতার ফসল



॥ ড. আবু এন এম ওয়াহিদ ॥

এবার বাংলাদেশ তার স্বাধীনতার ৪১ বছর পুরো করল। প্রতি বছর এ সময় আমরা স্বাধীনতার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে থাকি। এত বছর পরও বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে বিশেষ করে রাজনীতিতে এত অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা কেন, তা নিয়ে এই দিনে আমাদের মাঝে অনেক আলোচনা সমালোচনা হয়। এতে প্রায়ই আমরা হতাশা ব্যক্ত করি, উষ্মা প্রকাশ করি, তারপর আবার আশায় বুকও বাঁধি। স্বাধীনতার তিন যুগ পরে কী পাইনি তার ফিরিস্তি যেমন লম্বা, তেমনি কী পেয়েছি তার তালিকাও একেবারে শূন্য নয়। দেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের দুর্বলতা ও ঘাটতি নিয়ে অন্য সবার মতো আমিও মাঝে মধ্যে লিখে থাকি, তবে আজ স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের একটি ইতিবাচক দিক সম্পর্কে আমার কিছু সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির কথা তুলে ধরতে চাই। 
‘ঘরকুনো বাঙালি আর রণমুখো সেপাই’ বলে এ অঞ্চলে চালু ছিল একটি প্রাচীন প্রবাদ কিংবা বলা যায় অপবাদও। সেপাই এখনো রণমুখো, তবে বাঙালি আর ‘ঘরকুনো’ নয়। ১৯৭১ সালে অর্জিত স্বাধীনতার বদৌলতে বাঙালি তার ‘ঘরকুনো’ অপবাদ ঘোচাতে পেরেছে বলেই আমার বিশ্বাস। বেসরকারি হিসেবে আজ প্রায় এক কোটির মতো বাংলাদেশী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে সারা পৃথিবীতে। বাংলাদেশ স্বাধীন না হলে আমাদের পে এ অর্জন কোনোক্রমেই সম্ভব হতো না। আজ অসংখ্য বাংলাদেশী প্রবাসে লেখাপড়া শিখছেন, চাকরি-বাকরি করছেন, ব্যবসায়-বাণিজ্য চালাচ্ছেন, কেউ কেউ বিদেশের মাটিতে শিল্পকারখানাও গড়ে তুলছেন। এর প্রতিটি েেত্র অনেক গুণীজন আছেন যারা ইতোমধ্যে সফলতার শিখরে পৌঁছে গেছেন। আশা করি, এ ধারা আগামীতেও এভাবেই বজায় থাকবে। বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশীদের জন্য এ অর্জন গৌরবেরই বটে। এটাকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখতে চাই না। 
এবার আসি বিদেশে বাংলাদেশীদের কর্মতৎপরতা এবং সফলতা নিয়ে আমার কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথায়। ১৯৮০ সালের গোড়ার দিকে কানাডার ম্যানিটোবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাত্র এমএ পাস করে পিএইচডি শুরু করেছি। এমন সময় আমার বড় ভাইয়ের সুবাদে আমেরিকায় ইমিগ্র্যান্ট ভিসা পেয়ে যাই। কিছু দিন পরই বোস্টনের নর্থ ইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডিতে অ্যাডমিশনসহ একটি টিচিং অ্যাসিস্টেন্টশিপের অফার আসে। অফারটি পেয়ে ১৯৮০ সালের ডিসেম্বরে সিদ্ধান্ত নিলাম ম্যানিটোবার পিএইচডি প্রোগ্রাম থেকে স্বেচ্ছায় নিজেকে প্রত্যাহার করে নর্থ ইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে যোগ দেবো পরবর্তী জানুয়ারিতে। উইনিপেগ থেকে বোস্টন যাওয়ার পথে নিউ ইয়র্কে বড় ভাইয়ের বাসায় ছিলাম দু-তিন সপ্তাহ। ওই সময় সেখানে দেখা হয়েছিল এক তরুণ বাংলাদেশী গার্মেন্ট উদ্যোক্তার সাথে। কথা প্রসঙ্গে তিনি সাহসের সাথে বেশ জোর দিয়ে একটি কথা বলেছিলেন যা আজো আমার মনে আছে। তারই ভাষায়, ‘এবার ব্যবসায় লাইনআপ করে গেলাম, ইনশাআল্লাহ আগামী বছর এসে মাল্টিমিলিয়ন ডলারের কনট্র্যাক্ট সাইন করে যাবো।’ তখন ওই গার্মেন্ট ব্যবসায়ীর চোখেমুখে যে আত্মপ্রত্যয় এবং দৃঢ়তার ছাপ দেখেছিলাম, তাতে তার কথায় আমার মনে একটুও সন্দেহ দানা বাঁধতে পারেনি। 
এরপর প্রায় ১০ বছর কেটে যায়। ইতোমধ্যে জীবনের অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের চার্লস্টন শহরে ইস্টার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতির সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়েছি। এমনই একসময় ১৯৯০ সালের শেষ দিকে চার্লস্টনে মরহুম ড. মুশফেকুর রহমানের বাড়িতে দেখা হয় বাংলাদেশের একজন প্রতিষ্ঠিত এবং সফল পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তার সাথে। তার পুরো নাম কী, তা জানা হয়নি, তবে সবাই তাকে ‘জাকারিয়া সাব’ বলে ডাকছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম দিকে প্রতিষ্ঠিত একটি বড় এবং সফল গার্মেন্ট ফ্যাক্টরির মালিক। তার কোম্পানির নাম ছিল ‘জুয়েল গার্মেন্টস’। ওই দিন সবার মুখেই শুনছিলাম পোশাক শিল্পে জাকারিয়া সাবের সফলতা ও তার ধনদৌলতের কথা। ছেলেমেয়েদের আমেরিকায় পড়ানোর জন্য তিনি ওহাইওর ডেইটনে আরেকটি সংসার পেতেছিলেন। সৌভাগ্যক্রমে কিছু দিন পর ডেইটনে তার বাসায়ও আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। যত দূর মনে পড়ে তার ছেলের নাম ছিল জুয়েল এবং মেয়ে দু’টির নাম ছিল নয়ন ও নূপুর। 
২০০২ সালে গিয়েছিলাম তুরস্কের আংকারায়। সে দেশের সবচেয়ে প্রথিতযশা বিশ্ববিদ্যালয় মিডল ইস্ট টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি (সংেেপ মেটু)তে আমার একটি আমন্ত্রিত পাবলিক স্পিচ ছিল। যে দিন গিয়ে আঙ্কারা পৌঁছি তার পরদিন বেলা ১টায় ছিল আমার বক্তৃতা। ওই দিন সকালবেলা পুরো মেটু ক্যাম্পাস ঘুরে দেখছিলাম। সবশেষে একটু কান্ত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান লাইব্রেরির সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। দলে দলে ছাত্রছাত্রীরা উভয় দিকে দ্রুত পায়ে হাঁটছে। কেউ গার্লফ্রেন্ডের হাত ধরে খোশমেজাজে গল্প করে যাচ্ছে। কেউ পেরেশানিতে দৌড়াচ্ছে। কেউ পিঠের ভারী ব্যাকপ্যাকের বোঝায় রীতিমতো কাবু হয়ে গেছে। কোনোমতে সামনের দিকে পা ফেলতে পারছে না। কেউ ভাবুকের মতো ফ্যাল ফ্যাল করে অনবরত ডানে-বাঁয়ে তাকাচ্ছে আর আস্তে আস্তে হাঁটছে। কেউ বা মনের খুশিতে একা একা গান গেয়ে আনমনে হাঁটছে। মেয়েদের মধ্যে মাথায় হিজাব পরা অনেককেই দেখতে পেলাম। ছাত্রছাত্রীদের ভিড় ঠেলে হঠাৎ দেখলাম, ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে আসছে এক যুবকÑ চেহারা দেখে মনে হলো সে বাংলাদেশী হতে পারে। কথা বলে নিশ্চিত হলাম, সে আসলেই বাংলাদেশী। আমার পরিচয় জেনে ছেলেটি আমাকে আর ছাড়তে চায় না। ক্যাম্পাসের আরো কিছু অংশ ঘুরে দেখাল। তারপর ক্যাফেটেরিয়ায় নিয়ে লাঞ্চে ঘি মাখা টার্কিশ স্টাইলের আঠা আঠা ভাত খাইয়ে বক্তৃতার জন্য আমার গন্তব্যে নিয়ে রেখে গেল। পরদিন তার মেসে নিয়ে গেল। ডাল আর ডিমভুনা দিয়ে তিন দিন পর বাঙালি কায়দায় পেট ভরে ভাত খেয়েছিলাম, সে কথা আজো মনে পড়ে।
পরের বছর আফ্রিকার মালাবির রাজধানী লিলোংওয়েতে গিয়েছিলাম গবেষণা কাজের সূত্র ধরে। ওই সময় সেখানে ট্র্যাভেলারস চেক ভাঙাতে গিয়ে দেখা হয়েছিল এক বাংলাদেশী তরুণীর সাথে। নাম বিবি আমিনা। বাবার নাম মো: আবদুল মান্নান। দেশের বাড়ি নোয়াখালী জেলার সেনবাগ উপজেলায়। বাবা পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। মালাবিতে ব্যবসায় করেন। অনেক বছর আগে এক বিদেশী কোম্পানিতে চাকরি নিয়ে গিয়েছিলেন সে দেশে। কোম্পানি লাল বাতি জ্বালিয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মান্নান সাব আর দেশে ফেরেননি। শুরু করেন ব্যবসায়। এখন তিনি মালাবিতে একজন সফল ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। সময়ের অভাবে আমিনার সাথে সে দিন কথা আর বেশি হলো না। আসার সময় সে বলল, ‘আপনি কাল অবশ্যই আমাদের বাসায় আসবেন’। তাকে কথা দিয়ে মালাবি ইনস্টিটিউট হোস্টেলে ফিরে এলাম। পরদিন সকালে আমিনার বাবাকে ফোন করলাম। মান্নান সাহেব কথা বলতে বলতে আমাকে নেয়ার জন্য তার ছেলেকে দিয়ে গাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। এক-এগারোর পর বলেই নিরাপত্তার কারণে আমাদের টিম লিডার সেবাড়িতে আমাকে যেতে দিলেন না। তাঁর ছেলেকে ফিরিয়ে দিতে আমার ভীষণ খারাপ লেগেছিল। 
ওই দিন মান্নান সাহেবের সাথে আমার অনেক কথা হলো। তার সাথে কথা বলে মনে হলো, তিনি আমার কত দিনের চেনাজানা! কত আপন! তার বাড়ি আমার যাওয়া হয়নি। আমিনাকে কথা দিয়েও তার বরখেলাপ করতে হল। তবে ড্যাটা কালেকশনের প্রয়োজনে মান্নান সাহেবের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। তার ওয়্যারহাউজে গিয়েছি। মালাবির অন্যান্য শহরেও তার বিশাল ব্যবসায় দেখেছি। সারা মালাবিতে চাল, ডাল, তেল, আটা, ময়দা, চিনি, সিমেন্ট, রড, ঢেউটিন ইত্যাদির সোল ইমপোর্টার ও ডিস্ট্রিবিউটর। মান্নান সাহেব দেশটার সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী না হলেও তাদেরই একজন। একই বছর গিয়েছিলাম অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন। সেখানেও ডিকিন ইউনিভার্সিটিতে আমার সেমিনার ছিল। ওই শহরে ছিলেন আমার পূর্বপরিচিত এক বড় ভাই। নাম কামরুল চৌধুরী। তাকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই চিনতাম। দীর্ঘ দিন ধরে মেলবোর্নেই আছেন। একজন ধনাঢ্য ও সফল শিল্পপতি। তিনি অস্ট্রেলিয়ায় সবচেয়ে ধনী বাংলাদেশী। তার বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়। আমি অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার মাত্র কিছু দিন আগে তিনি বিশাল একটি কৃষিখামার কিনেছিলেন। আমাকে খামার দেখাতে নিয়ে গেলেন। সেই খামারে কয়েকটি ঘোড়াসহ পালে পালে গরু দেখেছি। তবে তার মূল ব্যবসা প্রিন্টিং মেশিন। তিনি বিভিন্ন দেশ থেকে নতুন এবং পুরান প্রিন্টিং মেশিন কেনাবেচা করেন। তার কাছ থেকে মেশিন কেনার জন্য সারা পৃথিবী থেকে বড় বড় ব্যবসায়ীরা মেলবোর্ন যান। কামরুল ভাই আমাকে মেলবোর্ন শহর বেশ ঘুরে দেখিয়েছেন। সেখানেই বিপিন নামে তার এক ভারতীয় কাস্টমারের সাথে আমার দেখা হয়েছিল। বিপিন বাবু বলেছেন, ‘তুমি যদি ইউরোপ থেকে কোনো প্রিন্টিং ব্যবসায়ীকে মেলবোর্ন আসতে দেখো তাহলে নিশ্চিত জেনে নেবে, সে কামরুল চৌধুরীর কাছেই আসছে।’ কামরুল ভাইয়ের কাছেই প্রথম শুনেছি, পৃথিবীর সেরা প্রিন্টিং মেশিন হলো জার্মানির হাইডেলবার্গ এবং জাপানের খুমুরি। 
আরো তিন বছর পর ২০০৬ সালের মার্চ মাসে এক সেমিনার উপলে সস্ত্রীক গিয়েছিলাম প্যারিস। সেখানে এক রোদ ঝলমল বিকেলে সিন সদীতে নৌবিহারের পর আইফেল টাওয়ার দেখে আমরা ফিরে আসছি হোটেলে। আসার পথে নদীর ওপর ব্রিজে দাঁড়িয়ে টাওয়ারকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে একটি ছবি তোলার পোজে দাঁড়িয়ে ভাবছি পথচারী ট্যুরিস্ট কাউকে বলব আমাদের একটি শট নিয়ে দিতে। এমন সময় ঘুরে দেখি দুই তরুণ দ্রুত পায়ে হাঁটছে টাওয়ারের দিকে। ভারতীয় মনে করে তাদের বললাম, ‘এক্সকিউজ মি, ক্যান ইউ প্লিজ টেক অ্যা পিকচার ফর আস?’ দু’জনই বলল, ‘শিওর, হোয়াই নট?’ ছবি তোলার পর জিজ্ঞেস করলাম, ‘আর ইউ ফ্রম ইন্ডিয়া’? ওরা বলল, ‘নো, উই কেম ফ্রম বাংলাদেশ’। তখন ব্রিজের পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের সাথে বেশ কিছুণ কথা বলেছিলাম। জানতে পারলাম, তারা প্যারিস গিয়েছিলেন ব্যবসায়সংক্রান্ত কাজে।
একই ট্রিপে গিয়েছিলাম স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরে। সেখানে দেখা হলো স্ট্র্যোথকাইড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. মোজাম্মেল হকের সাথে। ড. হকের সাথে আমার পরিচয় ছিল না। তবে সেখানে আমার প্রোগ্রাম ঠিক হওয়ার পর তিনিই আমার সাথে যোগাযোগ করেছিলেন ই-মেইল মারফত। আমরা যে দিন গ্লাসগো এসে পৌঁছলাম, সে দিন তিনি আমাদের এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভ করে হোটেলে তুলে দিয়ে গেলেন। বিকেলে তার বাড়িতে নিয়ে ডিনার খাইয়ে রাতে হোটেলে নামিয়ে দিয়ে গেলেন। মোজাম্মেল সাহেবের স্ত্রীর আতিথেয়তা ভোলার মতো নয়। পরদিন তিনি আমাদের লংড্রাইভে নিয়ে গেলেন সাগরপাড়ে স্কটল্যান্ডের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখাতে। তার বাড়ি উত্তরবঙ্গের লালমনিরহাটে। তিনি একজন সফল গবেষক ও অর্থনীতিবিদ। বাংলাদেশ ও আফ্রিকার উন্নয়ন অর্থনীতিতে তার অনেক অবদান আছে। 
২০০৮ সালে ঢাকা হয়ে গিয়েছিলাম মালয়েশিয়ার টেরেঙ্গানু টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সেমিনারের মূলবক্তা হিসেবে। ঢাকা থেকে আমার সাথে ছিল সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন। টেরেঙ্গানু কুয়ালালামপুর থেকে আরো প্রায় ২০০ মাইল দূরে সাগর পারের এক রিজোর্ট শহর। ছোট্ট কিন্তু খুব সুন্দর। সেখানে অনেক বাংলাদেশী শিাবিদের সাথে দেখা হয়েছিল। তার মধ্যে ড. ওয়াহিদ মুরাদের কথা না বললেই নয়। তিনি আমাদের এয়ারপোর্টে রিসিভ করা থেকে শুরু করে শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি, কেনাকাটা, বাসের টিকিট কেনা ইত্যাদিতে সাহায্য করেছেন। তিনি এতই হৃদয়বান ব্যক্তি যে, আমার এবং সালাহউদ্দিনের জন্য টেরেঙ্গানু-কুয়ালালামপুর বাসের যে টিকিট কিনেছিলেন তার দাম নেননি। অনেক জো করেও তা দিতে পারিনি। অগত্যা তার ছেলেমেয়েদের জন্য দুই বক্স চকোলেট কিনেছিলাম, সেটাও নেননি। তার আতিথেয়তা ও মহানুভবতার কথা জীবনেও ভুলব না। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়াতে । তার সাথে আমার যোগাযোগ আছে। 
২০০৯ সালে ইতালির ভেনিস বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের আমন্ত্রণে উন্নয়ন অর্থনীতির ওপর একটি আন্তর্জাতিক কর্মশালার আয়োজন করি। সে উপলে এক সন্ধ্যায় সোস্যাল ডিনারে আমাদের হোস্ট অধ্যাপক গিডো কাটজাভিলা নিয়ে গিয়েছিলেন ভেনিসের স্যান মার্কো স্কোয়ারের কাছে এক অতি পুরনো ঐতিহ্যবাহী রেস্টুরেন্ট লকোলম্বায়। সেই রেস্টুরেন্টে দেখা হয়েছিল রফিক নামে এক বাংলাদেশী তরুণ ওয়েটারের সাথে। ডিনারের ফাঁকে ফাঁকে রফিকের সাথে ভেনিসের বাংলাদেশীদের সম্বন্ধে অনেক গল্প শুনেছিলাম। এর মাঝে রফিক তার নিজেরও অনেক দুঃখসুখের কাহিনী আমার কাছে এমনভাবে বলেছিল যেন আমি তার কত দিনের পরিচিত! এভাবে বিদেশের মাটিতে আমার সাথে আরো কত স্বদেশীর দেখা হয়েছে, সবার বয়ান দেয়া এখানে সম্ভব নয়। পরিশেষে একটি কথা জোর দিয়ে বলতে চাই, বাংলাদেশের ব্যাপারে আমরা যত হতাশাই ব্যক্ত করি না কেন, দেশ স্বাধীন না হলে আমরা কি এভাবে বিদেশে পাড়ি দিতে পারতাম? আজ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪১ বছর পূর্তিতে মহান আল্লাহর দরবারে মুক্তিযুদ্ধে সব শহীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি এবং জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের সুস্থ দীর্ঘ জীবন কামনা করি। 
লেখক : ড. আবু এন এম ওয়াহিদ; অধ্যাপক, টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি; এডিটর, জার্নাল অব ডেভলপিং এরিয়াজ 
(e-mail : awahid2569@gmail.com)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন