রবিবার, ১৩ মে, ২০১২

কোন পথে প্রিয় দেশ বাংলাদেশ?



॥ গোলাপ মুনীর ॥

গত ১০ মে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হলো ‘চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নাগরিক উদ্বেগ’ শীর্ষক একটি গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠান। সুশাসনের জন্য নাগরিক তথা সুজন নামের একটি এনজিও এ গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করেছিল। গোলটেবিল আলোচনার শিরোনাম থেকে সহজেই অনুমান করা যায়, দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে দেশের নাগরিক সাধারণ খুবই উদ্বিগ্ন। এই গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা বলেন, আগামী নির্বাচন ও চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট উত্তরণে প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দলকেই এগিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ব্যর্থ হলে তৃতীয় শক্তির উত্থান অনিবার্য হলেও সেটি নাগরিক সমাজের নেতৃত্বেই হতে হবে। জনগণ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বিবাদ ও সঙ্ঘাত এবং পরস্পরের গুম ও হত্যার রাজনীতি আর দেখতে চায় না। রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে পরস্পরের মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতার ভিত্তিতে সমাধান চায় জনগণ। সংলাপ সংসদে হবে না বাইরে হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে। বাইরে থেকে কেউ এসে বা বাইরের সমাধান দেশের ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য মঙ্গলজনক হবে না।
আলোচকদের এই বক্তব্য যথার্থ, তা বিবেকবান সবাই স্বীকার করবেন। স্বীকার করবেন দেশে একটি রাজনৈতিক সঙ্কট চলছে। এই রাজনৈতিক সঙ্কট মোকাবেলায় দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটা সংলাপ প্রয়োজন। প্রয়োজন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচনের ব্যাপারে উভয় দলের মধ্যে একটি সমঝোতায় পৌঁছা। আমাদের দেশে রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের অসহিষ্ণু রাজনৈতিক আচার-আচরণ পরস্পরের মধ্যে যে আস্থাহীন পরিবেশ বিরাজ করছে তাতে করে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান যে সম্ভব নয়, সে ব্যাপারে বলা যায় সরকারি দল ছাড়া সবাই একমত। এমনকি ক্ষমতাসীন মহাজোটের অনেক দলও এ ব্যাপারে দ্বিমত করে না। দেশের সুশীলসমাজ বারবার বলে আসছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া এ দেশে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না। কিন্তু বর্তমানে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। দলটি বলছে, দেশের উচ্চ আদালত আদেশ দিয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক। কিন্তু আওয়ামী লীগ বলছে না, একই রায়ে উচ্চ আদালত বলেন, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আরো দু’টি সাধারণ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে চলতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছেÑ আওয়ামী লীগ আজ জোরগলায় বলছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক; অথচ ১৯৯৬ সালে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কায়েমের জন্য আওয়ামী লীগ দেশে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলে বিএনপিকে বাধ্য করেছিল সে সরকারব্যবস্থা চালু করতে। তখন তাদের রাজনৈতিক জ্ঞান-অভিজ্ঞান আর প্রজ্ঞা সূত্রে কি এ সত্যই ধরা পড়েনি যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক। তখন কি আওয়ামী লীগ নেতারা নাবালক শিশু ছিলেন যে, এ বিষয়টি তখন তাদের বোধে আসেনি। আসলে কূটকৌশলে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখার অপকৌশল হিসেবে আজ আওয়ামী লীগ এসব আবোলতাবোল বকছে। আওয়ামী নেতৃত্বের বোধের এই অপরিপক্বতা আমরা অতীতেও দেখেছি। এরাই একসময় দেশে একদলীয় বাকশালী শাসন চালু করার জন্য দেশে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বাতিল করে। এরাই এবার এক সময় বাকশালব্যবস্থা বাতিল করে বহুদলীয় গণতন্ত্রের কথা বলতে থাকে। তবে ক্ষমতায় এলে এদের মাথায় আবার একদলীয় বাকশালী ভূত চাপে। ফলে সেই একই কায়দায় বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর চলে জেলজুলুম, হামলা-মামলা, আর দমনপীড়ন। 
অতি সম্প্রতি ১৮ দলীয় জোটের ৪৫ নেতাদের বিরুদ্ধে হরতালের সময় গাড়ি পোড়ানোর অভিযোগে মামলা দায়ের ও তাৎক্ষণিক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করার যে পুলিশি অপতৎপরতা চলে, তা সে প্রক্রিয়ারই অংশ মাত্র। এ দিকে সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড, ইলিয়াসের গুম ঘটনাসহ অসংখ্য গুম ও হত্যাকাণ্ডের কোনো কূল-কিনারা করতে না পারলেও ঘটনার মাত্র ১১ দিনের মাথায় এই ৪৫ জন বিরোধীদলীয় রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে পুলিশ এক অনন্য সফলতার উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। সরকারি দলের রাজনীতিবিদেরা নিজেদের স্বার্থে পুলিশকে কিভাবে ব্যবহার করতে পারেন, তারই এক অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে এ ঘটনা। রাজনীতিবিদেরা যে নিজেদের স্বার্থে পুলিশকে নির্লজ্জভাবে ব্যবহার করে চলেছেন, তারই প্রতিফলন রয়েছে মহানগর পুলিশ কমিশনার বেনজির আহমেদের বক্তব্যে। তিনি বলেন, সাংঘর্ষিক রাজনীতি বন্ধ না হলে পুলিশ গণতান্ত্রিক ভূমিকা পালন করতে পারবে না। পুলিশের আইন হলো দাসত্বমূলক। আইনের আষ্টেপৃষ্ঠে পুলিশকে বেঁধে রাখা হয়েছে। পুলিশকে ব্যবহার করা হয় রাজনৈতিক দমন-পীড়নের হাতিয়ার হিসেবে। পুলিশের জন্য যে আইনটি আছে, তা গণতান্ত্রিক নয়। এই সুযোগে স্বৈরশাসকেরা পুলিশকে নির্যাতন-নিপীড়নের কাজে ব্যবহার করে। রাজধানীতে আয়োজিত একটি গোলটেবিল আলোচনায় বেনজির আহমদ এ ধরনের বক্তব্য রাখেন। বর্তমান সরকারের আমলে তার এ কথার বাস্তব প্রতিফলন আমরা অহরহ প্রত্যক্ষ করছি। বিরোধী দলের নেতা-নেত্রীদের ওপর যে পুলিশ দমনপীড়নে অতিমাত্রায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে তাদের পদ-পদবি দিয়ে পুরস্কৃত করতে ভুল করছে না।
আওয়ামী লীগকে নিয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, এ দলটি বিরোধী মতাবলম্বীদের একেবারেই সহ্য করতে পারে না। আওয়ামী লীগ যা ভাবে, যা চায়Ñ এর বিরুদ্ধে যাদের অবস্থান তাদের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত এ দলের নেতানেত্রীরা। অতি সম্প্রতি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যু প্রশ্নে সব মহল থেকেই কার্যত যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষেই তাদের মতামত তুলে ধরছেন, তখন ুব্ধ আওয়ামী লীগের নেতানেত্রীরাসহ মহাজোটের কোনো কোনো শরিক দলের নেতাকর্মীরাও। সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকা সফরে এসে সব দলের অংশগ্রহণে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে কথা বলে গেলেন। এরপর ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোও একই কথা বলেছে। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, দেশের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট কাটানোর লক্ষ্যে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপের কোনো বিকল্প নেই। অপর দিকে ড. ইউনূস ও ফজলে হাসান আবেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে কথা বলায় তাদের ওপর ুব্ধ হয়েছে সরকার পক্ষ। তাদের এই ক্ষোভের মাত্রা যে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরো তীব্র তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
ড. ইউনূসের ওপর ুব্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অনেকটা বেসামাল হয়ে তার শান্তিতে নোবেল পাওয়ার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘তার (ইউনূস) বেসিক সাবজেক্ট ছিল অর্থনীতি। তিনি অর্থনীতিতে নোবেল পেলেন না। কোনো যুদ্ধ বন্ধ না করেই তিনি শান্তিতে নোবেল পেলেন। নোবেল কিভাবে আসে তা আমাদের অনেকেই জানেন।’
অপর দিকে ড. ইউনূস ও ফজলে হাসান আবেদের বিরুদ্ধে সমধিক ুব্ধ হতে দেখা গেছে আমাদের শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়–য়াকে। তিনি ড. ইউনূস ও ফজলে হাসান আবেদের উদ্দেশে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে কথা বলতে হলে রাজনীতিতে আসতে হবে। জনগণকে মোকাবেলা করে জনপ্রিয়তা যাচাই করতে হবে। রাজনীতির বাইরে থেকে এ বিষয়ে বিদেশীদের কাছে নালিশ করে দেশকে খাটো করার ষড়যন্ত্র পরিহার করতে পরামর্শও তিনি দেন ড. ইউনূস ও ফজলে হাসান আবেদকে। তিনি বলেন, দেশের বিরুদ্ধে বিদেশীদের কাছে নালিশ করে এ সরকারকে টলানো যাবে না। তিনি এ-ও বলেন, আগামী নির্বাচন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে করতে সরকার বদ্ধপরিকর। আন্দোলন করে সরকারকে এ অবস্থান থেকে সরানো যাবে না। শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়–য়া যখন ড. ইউনূস ও ফজলে হোসেন আবেদকে জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের কথা বলেন, তখন প্রশ্ন জাগে তিনি কখন কোন নির্বাচনে জিতে সংসদে এসেছেন বা মন্ত্রী হয়েছেন। শেখ হাসিনার আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে মন্ত্রী সভায় ঠাঁই পেয়ে আজ বড় বড় কথা বললেও, দেশের মানুষ ঠিকই জানে তার দলে সব মিলিয়ে কয়শ’ মানুষ আছে। আর এককভাবে তার দল থেকে এককভাবে তিনি ভোটে দাঁড়ালে কয়টি ভোট পাবেন, তাও এ দেশের মানুষের অজানা নয়।
বর্তমান সরকারের অবস্থান হচ্ছে আগামী নির্বাচন নির্দলীয় কোনো সরকারের অধীনে হবে না। অপর দিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের অবস্থান হচ্ছে, কোনো দলীয় সরকারের অধীনে আগামী সংসদ নির্বাচন হতে দেয়া যাবে না। সরকারি ও বিরোধী দলের এই বিপরীতমুখী অবস্থানের প্রেক্ষাপটে দেশের সুশীলসমাজ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের পক্ষে। যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোও চায় সব দলের অংশগ্রহণে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে এটুকু নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন। বাংলাদেশে এর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু সরকারপক্ষ এ ক্ষেত্রে যে একগুঁয়েমি প্রদর্শন করে চলেছে, তা দেশকে কোন সঙ্কটময় পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে, সেটাই এখন প্রশ্ন।
বিদ্যমান এ পরিস্থিতিতে দেশের মানুষ চায় সরকার ও বিরোধী দল জরুরি ভিত্তিতে সংলাপে বসে এমন একটি শান্তিপূর্ণ উপায় উদ্ভাবন করুক, যার ফলে সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু তেমন কোনো সম্ভাবনার পরিস্থিতি এখনো লক্ষ করা যাচ্ছে না। তাই দেশের মানুষের কাছে উদ্বেগ নিয়ে প্রশ্নÑ দেশ কি আবারো কোনো বড় ধরনের সঙ্ঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে? এ থেকে বেরিয়ে আসার কি কোনো উপায় নেই? 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন