শুক্রবার, ১১ মে, ২০১২

‘যুদ্ধাপরাধী’ বিচার নিয়ে এত সংশয় কেন



ম ন জু র আ হ ম দ
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী তথা মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার অনুষ্ঠান নিয়ে সন্দেহের আর কোনো অবকাশ আছে কি? বিগত প্রায় সাড়ে তিনটি বছর ধরে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ওয়াদা অনুযায়ী এই বিচার কাজ শুরু করেছে। এর জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন, আদালতের স্থান নির্ধারণ, তদন্ত কমিশন গঠন, আইনজীবী প্যানেল মনোনয়ন প্রভৃতি সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে বেশ কিছুদিন আগেই বিচার প্রক্রিয়ায় হাত দেয়া হয়েছে। এই অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর ছয়জনসহ মোট সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আরও গ্রেফতারের প্রক্রিয়া চলছে। কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। একজনের বিচার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। অন্যদের কৃত অপরাধের তদন্ত চলছে। সব মিলিয়ে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ থেমে নেই। এই বিচার প্রক্রিয়া যথাযথভাবেই এগিয়ে চলেছে।
কিন্তু এরপরও ক্ষমতাসীন দল খোদ আওয়ামী লীগেরই এত সংশয় কেন এই বিচার নিয়ে? তাদের কর্মকাণ্ড দেখে স্বাভাবিকভাবে এই প্রশ্নটিই বড় হয়ে উঠেছে। দেশে-বিদেশে আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিককালে প্রায় সবক’টি সভা-সমাবেশের এজেন্ডা লক্ষ্য করা যাচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। কোথাও দাবি তোলা হচ্ছে বিচার ত্বরান্বিত করার। কোথাও হুশিয়ারি দেয়া হচ্ছে এই বিচার বানচালের চক্রান্তের বিরুদ্ধে। কোথাও বলা হচ্ছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাংলার মাটিতে হবেই।
আওয়ামী লীগের এসব বক্তব্য বা এ ধরনের দাবি উত্থাপনের পেছনে কী উদ্দেশ্য বা কোন রাজনীতি কাজ করছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। যুদ্ধাপরাধী বা মানবতাবিরোধী অপরাধী যাই বলা হোক, বিচার তাদের হচ্ছে এবং তা বাংলার মাটিতেই হচ্ছে। এ নিয়ে আবার নতুন কথা কেন? আওয়ামী লীগ দাবি জানাচ্ছে বিচার কাজ ত্বরান্বিত করার। এমন দাবিই বা তাদের কেন? এ ব্যাপারে তাদের এত সংশয় কেন? বিচার ত্বরান্বিত হবে না বা বিলম্বিত হয়ে যাবে, তারা কি এমন কোনো সন্দেহ পোষণ করেন? না করলে এমন দাবি কেন? আর করলে প্রশ্ন উঠবে, কেন করছেন? লেখার শুরুতেই বলেছি, ক্ষমতায় আওয়ামী লীগের সরকার। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ওয়াদা। সরকার এই বিচার প্রক্রিয়া শুরুও করেছে। কিন্তু তারপরও এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের এত সংশয় কেন? সবচেয়ে বড় কথা, তারা কার কাছে জানাচ্ছে এ দাবি? সরকার তো তাদেরই। তারাই তো সরকার, দেশের দণ্ড-মুণ্ডের মালিক। তারা কেন দাবি জানাবে? তারা তো দাবি বাস্তবায়ন করবে।
বিচার প্রক্রিয়া বানচালের চক্রান্তের বিরুদ্ধে হুশিয়ারি দিচ্ছে তারা। তাদের এ অভিযোগ সরাসরি বিএনপি এবং বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে। কিন্তু এ অভিযোগের সত্যতা তারা কি প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে? বিএনপি বা বিরোধী দলের কেউ কি এই বিচারের বিরোধিতা করেছে? তাদের কেউ কি কখনও এই বিচারের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেছেন? যেমন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন মওলানা ভাসানী। ১২ মার্চের বিএনপির বিশাল সমাবেশ থেকে এই বিচারের বিরুদ্ধে কি একটি শব্দও উচ্চারিত হয়েছে? না হলে এই অবান্তর বিষয়ে হুশিয়ারি-হুমকির অর্থ কী? শুধুই কি মাঠ গরম করা? বিরোধী দলের সব আন্দোলনের সঙ্গে যেভাবে যুদ্ধাপরাধী বিচারের বিষয়টি তারা জুড়ে দিচ্ছে, তাতে তো বিরোধীদের সব কর্মসূচি বন্ধ করে ঘরে বসে থাকতে হয়। বিরোধী দলের আন্দোলন মানেই তাদের ভাষায় যুদ্ধাপরাধী বিচার বানচাল করার প্রয়াস।
তবে সংশয়ের কারণ একেবারেই যে নেই তা নয়। সংশয় মামলা পরিচালনায় সরকার পক্ষের আনাড়িপনা ও অদক্ষতা নিয়ে। জানি না আওয়ামী লীগ এ ব্যাপারেই শঙ্কিত কিনা। বিচার প্রক্রিয়ার প্রথম থেকেই সরকার এমন কিছু অযোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছে যা সংশ্লিষ্ট সবার ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে। শুধু অযোগ্যতাই নয়, এই মামলার ব্যাপারে ট্রাইব্যুনাল, তদন্ত কমিশন, আইনজীবী প্যানেল প্রভৃতি গঠনে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে সোচ্চার সব মহল বিশেষ করে সুশীল সমাজকে। প্রথম ভ্রান্তিটিই ধরা পড়ল, যাদের বিচারের জন্য এই উদ্যোগ তাদের ক্ষেত্রে যুদ্ধাপরাধী সংজ্ঞাটি প্রযোজ্য নয়। কারণ তারা কেউ প্রত্যক্ষ যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য ছিলেন না। আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত সংজ্ঞা অনুযায়ী তারা যুদ্ধাপরাধীর আওতায় পড়ে না। সরকারকে সংশোধন করতে হলো এই ত্রুটি। বদলে গেল অভিযুক্তদের পরিচিতি। যুদ্ধাপরাধী নয়, তারা অভিহিত হতে থাকলেন নতুন নামে— মানবতাবিরোধী অপরাধী। মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণ করা হলো।
এটাকে ভ্রান্তি বা অজ্ঞতা বলে মেনে নেয়া গেলেও তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয় তুমুল অসন্তোষ। নিয়োগের বেশ পরে জানা জানা গেল, যাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তিনি জামায়াতে ইসলামীর লোক। এ তথ্য প্রথম প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আলাউদ্দিন আহমদ। প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে তিনি জানিয়ে দেন, এই ব্যক্তিই জামায়াতে ইসলামীর পাকিস্তানি আমলের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে বরিশাল বিএম কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভিপি পদে ছাত্রলীগ প্রার্থী আমির হোসেন আমুর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। যে জামায়াতে ইসলামী এই যুদ্ধাপরাধী বিচারের প্রধান টার্গেট, সেই জামায়াতেরই লোক কেমন করে এই মামলার তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পেলেন, তা বিস্ময়ের সৃষ্টি করলেও এই নিয়োগের রহস্য অনুদ্ঘাটিতই রয়ে গেছে। তদন্ত কমিশন পদে এই বিতর্কিত ব্যক্তির নিয়োগ বাতিল করে সরকার মুখ রক্ষা করলেও মামলা পরিচালনায় তাদের এহেন স্খলন ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতা সবাইকে শঙ্কিত করে তুলেছিল। বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল আইনজীবী প্যানেল গঠন নিয়েও। ঢাকার সব বাঘা বাঘা আইনজীবীকে পাশ কাটিয়ে রাজশাহীর একজন অজ্ঞাত আইনজীবীকে প্যানেলের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়া অনেকেই মেনে নিতে পারেননি। এ ধরনের নিয়োগে কেউ কেউ সরকারের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। প্রশ্ন তুলেছেন বিচার অনুষ্ঠানে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এবং আরও কয়েক দায়িত্বশীল ব্যক্তির কিছু কথাবার্তা তাদের এসব প্রশ্নের একটা শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছিল। সৈয়দ আশরাফ বলেছিলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে প্রতীকী।
জনমনের এসব প্রশ্ন যে অমূলক ছিল না, দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর বিচার কাজের দিকে দৃষ্টি দিলে এখন বোধ হয় তারই কিছুটা পরিচয় পাওয়া যায়। সাঈদীকেই প্রথম এই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। এই বিচার সিরিজের প্রথম মামলাই তারটি। কিন্তু কী হচ্ছে এ মামলায়? রাষ্ট্র পক্ষ কি যথাযথভাবে এগোতে পারছে? মওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে এমন ১৩৮ জনের নামের তালিকা তারা ট্রাইব্যুনালে জমা দিয়েছিল। কিন্তু অধিকাংশ সাক্ষীকেই তারা হাজির করতে পারছে না। তাদের দেয়া সাক্ষ্যেও নাকি অনেক পরস্পরবিরোধিতার প্রকাশ ঘটেছে। প্রচার মাধ্যমের খবরে জানা যাচ্ছে, সরকারি আইনজীবীদের এই ব্যর্থতায় ট্রাইব্যুনাল বিরক্তি প্রকাশ করেছেন এবং তাদের ভর্ত্সনা করেছেন। এখন গরহাজিরদের জবানবন্দিকেই সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে।
তাহলে বলতেই হবে, যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সত্যিকার অর্থেই আন্তরিক এবং আওয়ামী লীগেও যারা এই দাবিতে সোচ্চার, তাদের সংশয়ের কারণ নিশ্চয়ই আছে। হয়তো সেই সংশয় থেকেই আওয়ামী লীগ তাদের সভা-সমাবেশের এজেন্ডা করে নিয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার সাড়ে তিন বছর পরও তাদের নিজেদের সরকারের কাছেই তাদের এ দাবি জানাতে হচ্ছে।
কিন্তু কেন? যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে বিচার ত্বরান্বিত করার এ দাবি জানাতে হবে কেন? এ বিচার তো এই সরকারকে করতেই হবে। এক্ষেত্রে শৈথিল্যের কোনো সুযোগ তাদের নেই। আর যদি বিচার ত্বরান্বিত না হয়ে বিলম্বিত বা অনিশ্চিতির অতলে পড়ে যায়, কিংবা অযোগ্য পরিচালনার জন্য মামলা যদি সাফল্য না পায়, অভিযুক্তরা যদি অব্যাহতি পেয়ে যায়, তাহলে তা হবে সরকারের জন্য এক ভয়াবহ ব্যর্থতা। এমন পরিণতির জন্য বিরোধী দলের ওপর দায় চাপানোর কোনো সুযোগ নিশ্চয় সরকার বা সরকারি দলের থাকবে না।
নিউইয়র্ক, ১২ এপ্রিল ’১২

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন