শুক্রবার, ১১ মে, ২০১২

শান্তি ও উন্নয়নের স্বার্থে সংলাপ জরুরি



 ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার  |  শনিবার, ১২ মে ২০১২, ২৯ 

বাং লাদেশ এখন জাতীয় সঙ্কটকাল অতিক্রম করছে। এ সঙ্কট তৈরি হয়েছে দেশের বড় দু’টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সমঝোতার অভাব থেকে। দশম সংসদ নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে সরকারি ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে ততই দূরত্ব বাড়ছে। এ কারণে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে রাজনীতি। রাজনীতির এ উত্তাপে মাত্রা যুক্ত হয়েছে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়ার পর। কারণ নতুন সংবিধান দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করায় বিরোধী দল তা মানতে রাজি নয়। নতুন সংবিধানে আরও অনেক অসঙ্গতি আছে। তবে সে সব অসঙ্গতির কথা বাদ দিয়ে যদি নির্বাচনের কথা ধরি তাহলে বলা যায়, উচ্চ আদালতের যে অপ্রকাশিত ও বিভক্ত রায়ের সংক্ষিপ্ত আদেশের একাংশের ওপর ভিত্তি করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয় বলে সরকার দাবি করে, সে রায়ের আলোকেই আরও দু’টি সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করার সুযোগ ছিল। কিন্তু সরকার সে পথে না গিয়ে এ ব্যাপারে বিরোধী দল, অ্যামিকাস কিউরি, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, মহাজোটের অংশীদার অধিকাংশ রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ এবং নাগরিক সমাজের মতামত উপেক্ষা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করে দেশকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এ সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয় তাহলে গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা বিপন্ন হতে পারে। সেজন্য গণতন্ত্রের কার্যকারিতার স্বার্থে, শান্তি ও উন্নয়নের স্বার্থে এখন এ সংঘাতের পথ থেকে পরিত্রাণের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো সংলাপ আয়োজন করা।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে এ সংলাপ হতে হবে সরকারি ও প্রধান বিরোধী দলের মধ্যে। কারণ, এ দুই বড় দলের মধ্যে আপোষরফা ঘটাতে পারলে রাজনৈতিক উত্তাপ কমে যাবে। কমে যাবে হরতাল, বিক্ষোভ, মিছিল-সমাবেশসহ বিরোধীদলীয় আন্দোলন কর্মসূচি। এরফলে রাষ্ট্রীয় কাজে স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে এবং পোশাকধারী বাহিনী তখন রাজপথের আন্দোলন দমনে নিয়োজিত না থেকে খুন-গুম ও অপরাধ দমনে মনোযোগ দিয়ে শান্তি ও উন্নয়নের স্বার্থে কাজ করতে পারবে। আপাতত আলোচ্য সংলাপের এজেন্ডা হবে মাত্র একটি, আর তা হলো আসন্ন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেমন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে সে বিষয়টি ঠিক করা। সবচেয়ে ভাল হয় এ সংলাপে যদি দেশের প্রধান দুই দলের দুই সম্মানিত নেত্রী অংশ নিয়ে এ সমস্যার মীমাংসার কৃতিত্ব অর্জন করতে পারেন। এ কাজটি করতে পারলে তা হবে দুই নেত্রীর জীবনের একটি উজ্জ্বল ঐতিহাসিক ঘটনা। তবে চলমান বাস্তবতা ও দুই নেত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক বিচার করে সে সম্ভাবনা অনেকটাই কম মনে হয়। বিকল্প হিসাবে দুই নেত্রীর মতামতের ভিত্তিতে দুই দলের মনোনীত প্রতিনিধিরাও এ সংলাপে বসতে পারেন। তবে কেবলমাত্র লোক দেখানোর জন্য সংলাপে বসলেই কিন্তু সমস্যার সমাধান হবে না। স্মর্তব্য, ২০০৬ সালে আমরা বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি হিসাবে আবদুল মান্নান ভুইয়া এবং আবদুল জলিলের বহুল আলোচিত সংলাপ নিষ্ফল হতে দেখেছি। রাজনৈতিক উত্তাপ নিরসনের সঞ্জীবনী টনিক হিসাবে সংলাপ তখনই ইতিবাচক ফল দেবে যখন সংলাপকারীরা খোলা মনে সংলাপে বসবেন এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে এজেন্ডাভুক্ত সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যেই সংলাপে বসবেন। জনগণের চাপে বা কূটনীতিকদের চাপে বাধ্য হয়ে বা তাদের খুশি করার জন্য, লোক দেখানোর জন্য সংলাপে বসলে তা হবে সময়ের অপচয়। 
দুঃখের বিষয়, প্রায় একবছর হলো সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার পর জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। অথচ এ নিয়ে প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে এখনও কোন আলাপ-আলোচনা বা সংলাপ হয়নি। ইতিমধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার পর বিরোধী দল তার অবস্থান স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে, দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন হলে তারা সে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না এবং এমন নির্বাচন তারা হতে দেবে না। কারণ, বিরোধীদলীয় নেতারা মনে করেন, এ দেশের সাংঘর্ষিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে উন্নতি না হওয়ায়, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা সুনিশ্চিত না হওয়ায় এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না হওয়ায় এখনও দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন করার মত পরিবেশ তৈরি হয়নি। অন্যদিকে সরকারি দল অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পরিবর্তে দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের পক্ষে। সরকার দলীয় নেতারা দাবি করছেন, গণতান্ত্রিক বিশ্বের অন্যান্য দেশে যেভাবে দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন হচ্ছে এ দেশেও তেমনভাবে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনা করবে, সরকার কমিশনকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবে। মহাজোট সরকারের অধীনে গত সোয়া তিন বছরে যেসব নির্বাচন হয়েছে সেসব নির্বাচনকে ভাল নির্বাচন দাবি করে সরকারের মন্ত্রী-নেতারা বলতে চান, জাতীয় সংসদ নির্বাচনও এ সরকারের অধীনে ভাল হবে। মহাজোট সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন নির্বাচনে সরকারি দলের প্রার্থীদের পরাজয়ের ঘটনা উল্লেখ করে সরকার দলীয় নেতা-মন্ত্রীরা তাদের আমলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা দাবি করে তাদের অধীনেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে চান।
সরকারি ও বিরোধী দলের এসব যুক্তি একাডেমিক হিসাবে নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করলে সরকারি দলের চেয়ে বিরোধী দলের যুক্তিগুলোকে অধিক গ্রহণযোগ্য মনে হয়। কারণ, যেসব সমস্যার কারণে এ দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল সেসব সমস্যার সমাধান না করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে। বিষয়টি অনেকটা অসুখ না সারার আগেই ওষুধ বন্ধ করে দেয়ার মত। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করলে ক্ষমতাসীন দল যে নিরপেক্ষ আচরণ করবে সে নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। এ প্রসঙ্গে এ সরকারের আমলে দু’চারটি নির্দলীয় স্থানীয় সরকার নির্বাচন ভাল হয়েছে বলে চরম প্রতিযোগিতামূলক জাতীয় সংসদ নির্বাচনও যে ভাল হবে সে নিশ্চয়তা দেয়া যায় না। যে সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের একটি নিয়মতান্ত্রিক মহাসমাবেশ পণ্ড করতে ওই মহাসমাবেশে লোক সমাগমে বাধা দিতে অঘোষিত হরতার ঘোষণা করে রাষ্ট্রীয় ও দলীয় সর্বশক্তি নিয়োগ করতে পারে, সে সরকার যে নিজেরা পরাজিত হবার সম্ভাবনা থাকলেও সংসদ নির্বাচনে নিরপেক্ষতা বজায় রাখবে এমনটা বিশ্বাস করা কঠিন। সরকার যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতি খুবই এলার্জিক হয় তাহলে মুক্ত ও অবাধ নির্বাচনের স্বার্থে যে কোন নাম দিয়ে একটি নির্দলীয় সরকার গঠন করে সে সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিতে পারে। ওই নির্দলীয় সরকারের রূপরেখা কেমন হবে, ওই সরকারের সদস্যসংখ্যা কত হবে, সরকার প্রধান কে হবেন, সরকারের আয়ুষ্কাল ও ক্ষমতা কেমন হবে, সরকারের সদস্যরা নির্বাচিত হবেন নাকি অনির্বাচিত হবেন, এ বিষয়গুলো এজেন্ডা দিয়ে যুগপত্ সংসদের ভেতরে বা বাইরে সরকারি ও বিরোধীদলীয় সংলাপে নির্ধারিত হতে পারে। সরকার এ কাজটি করতে এমনিতেই বেশি দেরি করে ফেলেছে। এখন যদি আরও দেরি করে তাহলে বিরোধী দলের দেয়া ১০ জুনের আল্টিমেটামের আগে তাদের নির্দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের দাবিতে আরও আন্দোলন ও হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা অব্যাহত রাখবে। আর এরকম হরতাল ও আন্দোলন কর্মসূচি যত বাড়বে দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা ততই বিঘ্নিত হবে। বিরোধী দল যেহেতু পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছে যে নির্দলীয় সরকারের রূপরেখা নির্ধারণের ব্যাপারে সরকারের সঙ্গে যে কোন সময়ে যে কোন স্থানে তারা আলোচনায় বসতে প্রস্তুত আছে, কাজেই রাজনৈতিক সমঝোতার বল এখন সরকারের কোর্টে। সরকার চাইলে এখন এ বিষয়ে সংলাপ আয়োজন করে রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রাম হ্রাস করতে পারে; আবার সরকার চাইলে বিরোধীদলীয় দাবির প্রতি কর্ণপাত না করে তাদেরকে আন্দোলন সংগ্রামের পথে ঠেলে দিয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করতে পারে। সরকারকেই এখন তার করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে সরকার যত দেরি করবে সরকারের জনপ্রিয়তা তত কমবে্; আর বিরোধী দল তাদের যৌক্তিক দাবি নিয়ে যত রাজপথের আন্দোলন সংগ্রামে যাবে, সারাদেশের নেতা-কর্মীদের চাঙ্গা হওয়ার মধ্যদিয়ে ততই তাদের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে।
 দেশ ও জাতির কল্যাণের কথা বিবেচনা করে নাগরিক সমাজের সদস্য এবং সুশীল সমাজ সদস্যরা পঞ্চদশ সংশোধনী পাস এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হওয়ার পর সরকার ও বিরোধী দলের দূরত্ব ও বিরাজিত রাজনৈতিক অবস্থা অনুধাবন করে এ দূরত্ব কমাবার জন্য দুই প্রধান দলের মধ্যে সংলাপ করার কথা বলা শুরু করেন। কিন্তু সরকারি নেতা-মন্ত্রীদের একগুঁয়েমিপূর্ণ বক্তব্যে তাদের সংলাপের পরামর্শ চাপা পড়ে যায়। ক্রমান্বয়ে সংসদ নির্বাচন এগিয়ে আসায় এ বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের দূরত্ব বৃদ্ধি পেয়ে রাজপথে শক্তি মোকাবেলার মধ্যদিয়ে রাজনৈতিক আন্দোলন ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ায় সংলাপের প্রয়োজনীয়তা আরও তীব্রভাবে অনুভূত হতে থাকে। এমন সময় বন্ধুপ্রতীম দাতা দেশগুলোও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার স্বার্থে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে বিরোধ নিরসনে সংলাপের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করায় বিষয়টি অধিকতর মনোযোগ পায়। অতিসমপ্রতি বাংলাদেশ সফর করা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে জাপানের উপ-প্রধানমন্ত্রী কাতসুইয়া ওকাদা, মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেটস হিলারি ক্লিন্টন এবং ভারতীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জিও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার বাধা-বিপত্তি নিরসনে দলগুলোর মধ্যে সংলাপের ওপর গুরুত্বারোপ করায় এখন কেমন সরকারের অধীনে দশম সংসদ নির্বাচন হবে সে বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপের প্রয়োজনীয়তা অধিকতর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মনোযোগ পায়। এসব বড় বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কথা বাদ দিয়ে যদি এ দেশের সাধারণ মানুষের মতামত বিবেচনা করলে দেখা যায়, সুশীল সমাজ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, কিছু বিরল ব্যতিক্রম বাদে প্রায় সবাই নির্দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন চান।
এ কথা স্বীকার্য যে স্থানীয় সমস্যা সমাধানে বিদেশিদের প্রেসক্রিপশন গ্রহণীয় নয়। তাদের পরামর্শ সবসময় ভাল নাও হতে পারে। তবে আজকের বৈশ্বিক গ্রামে বসবাস করে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়কে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করাও সম্ভব হয় না। নিজেদের সমস্যা নিজেরা সমাধান করে ফেলতে পারলে আর বিদেশিরা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে মতামত দেয়ার সুযোগ পান না। রাজনৈতিক নেতৃত্বের অপরিপক্বতা ও ব্যর্থতাই বিদেশিদেরকে এ সুযোগ করে দেয়। স্মর্তব্য, ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন চলাকালে রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হওয়ায় বিদেশিরা এমন সুযোগ পেয়েছিলেন। ওই সময় বিরোধ নিরসনকারী হিসাবে খ্যাতিমান স্যার নিনিয়ানসহ আরও কতিপয় আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব ওই সঙ্কট নিরসনে ব্যর্থ হয়েছিলেন। পরবর্তীতে আমাদের সম্মানিত রাজনৈতিক নেতারাই সাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার উদ্ভাবন করে ওই সঙ্কটের উত্তরণ ঘটিয়ে এ সত্য প্রমাণ করেছিলেন যে সমস্যা যাদের, তারাই সে সমস্যা সমাধানে বিশেষজ্ঞ। কারণ পায়ের কোথায় পিনের খোঁচা লাগছে সে ব্যাপারে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিদেশি ডাক্তারের চেয়ে অজ্ঞ জুতা পরিধানকারী অনেক বড় বিশেষজ্ঞ। অতিসমপ্রতি তিনজন সম্মানিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশ সফরকালে রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে প্রদত্ত সংলাপের পরামর্শকে ইতিবাচকভাবে নেয়াই ভাল, যদিও এ পরামর্শ এ দেশের সুশীল সমাজ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হবার পর থেকে অব্যাহতভাবে দিয়ে আসছে।         
এমতাবস্থায় সরকারের সামনে এখন দু’টি পথ খোলা আছে। এর একটি হলো সমস্যা সমাধানের পথ, সমঝোতা ও সংলাপের পথ এবং অন্যটি হল একগুঁয়েমি মনোভাব নিয়ে নিজ স্বার্থে অনড় থাকার পথ, দলীয় স্বার্থ রক্ষা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা-সহিংসতার পথ। দেখার বিষয়, সরকার নাগরিক সমাজের অধিকাংশের মতামত বিবেচনা করে, আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের মতামত শ্রদ্ধা করে, বিরোধী দলের সঙ্গে অর্থবহ সংলাপের মাধ্যমে উদ্ভূত সমস্যার সমাধানের মধ্যদিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং শান্তি ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে উদ্যোগী হয়; নাকি সকলের মতামত উপেক্ষা করে সঙ্কীর্ণ দলীয় স্বার্থে পুনরায় ক্ষমতায় যাবার জন্য প্রধান বিরোধী দলকে নির্বাচনের বাইরে রেখে, জাপাকে বিরোধী দল সাজিয়ে দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের উদ্যোগ নেয়্। তবে সকল বড় দলের অংশগ্রহণ ছাড়া সংসদ নির্বাচন হলে সে নির্বাচন একদিকে যেমন শান্তিপূর্ণ হবে না, তেমনি অন্যদিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না্। সাধারণ বিবেচনায় মনে হয়, সরকার প্রধান বিরোধী দলকে বাইরে রেখে সংসদ নির্বাচন করার বোকামি করবে না। এহেন বোকামি করলে সরকার দু’দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রথমত, ওই রকম নির্বাচন জাতীয় ও  আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা হারাবে এবং দ্বিতীয়ত, ওই নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করলেও সে সরকার আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বন্ধুহীন হয়ে পড়বে এবং জাতীয় পরিমণ্ডলে তীব্র আন্দোলন সংগ্রামের উত্তাপে শৈশবকালেই ভেঙ্গে পড়বে। জাতি আশা করছে, সরকার অচিরেই দেশের শান্তি ও উন্নয়নের স্বার্থে বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপ আয়োজনের মধ্যদিয়ে রাজনৈতিক উত্তাপ-অস্থিরতা কমিয়ে যে কোন নাম ও চরিত্রের নির্দলীয় সরকারের অধীনে মুক্ত ও অবাধ নির্বাচন আয়োজনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে নিজ জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করতে উদ্যোগ নেবে।      
[লেখক: অধ্যাপক, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।]
akhtermy@gmail.com

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন