রবিবার, ১৩ মে, ২০১২

হিলারি-প্রণবের সফর কী পেল বাংলাদেশ






ফা র“ ক উ দ্দি ন আ হ মে দ 
সম্প্রতি বাংলাদেশে অন্তত তিন-তিনজন ভিভিআইপি বিদেশী নেতা এসে গেলেন। প্রথমত, জাপানের উপ-প্রধানমন্ত্রী তার দেশের সবরকম সহযোগিতার কথা বলে গেলেন কিš‘ বিশ্বব্যাংকের যমুনা সেতুবিষয়ক জটিলতার ব্যাপারে তার করার কিছু নেই বলে জানালেন। বললেন, ওটা আমাদেরই সুরাহা করতে হবে, তবে তিনি সুপারিশ করবেন। সমস্যা হল, বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির গন্ধ পেয়েছে বলায় জাপান (জাইকা), এডিবি ও আইডিবি একই সুরে বেঁকে বসল। তবুও কিš‘ আমাদের মন্ত্রী মহোদয় থাকলেনÑ যোগাযোগ থেকে অন্য মন্ত্রণালয়ে ঠিক যেমনি পদত্যাগ করেও সুরঞ্জিত বাবু থাকলেন দফতরবিহীন মন্ত্রী হয়ে! গরিব দেশে টাকার অভাবে সরকার চলে নাÑ কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এবং সভরিন বন্ড ইস্যু করে চালাতে হয়, তবুও শত শত অফিসার ওএসডি আছেনÑ মানে বিনা কাজে বেতন-ভাতা আর গাড়ি, ড্রাইভার ও তেল পা”েছন। তাই একজন ওএসডি বা দফতরবিহীন মন্ত্রী কী আর এমন! মজার ব্যাপার হল, উপরোক্ত দু’জনের দায়িত্ব এখন পড়েছে একজনের (জনাব ও. কাদের) ঘাড়ে। তাই তো তিনি বলেনÑ ‘দিনে থাকি রাস্তায় রাতে রেলে’। যা হোক জাপানের মতো বন্ধু দেশের উপ-প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সফর বাংলাদেশের জন্য অনেক সুফল বয়ে আনবে বলে আশা করা যায়। উল্লেখ্য, জাপান শুধু ধনী দাতা দেশই নয়, আমাদেরই মহাদেশের একটি সৎ প্রতিবেশী দেশ। 
অন্য অতি সম্মানিত বিদেশী মেহমান ছিলেন হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটন। মার্কিন ফার্স্টলেডি হিসেবে আগেও বাংলাদেশে এসেছিলেন। এবার মার্কিন প্রভাবশালী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তার সফর আমাদের আপাতদৃষ্টিতে কিছু একটা না দিলেও নসিহত দিয়েছে। তিনি সব রাজনৈতিক দলকে মিলেমিশে কাজ করতে বলেছেন, যা সব বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা প্রতিনিয়তই বলেন। কিš‘ কে শোনে কার কথা। দুটি বড় রাজনৈতিক দলের ভোট-পার্থক্য বেশি না হলেও মতপার্থক্য অনেক বেশি এবং প্রতিদিন বাড়ছে। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার পর বিএনপির ডাকা পাঁচ দিনের হরতালে দু’দল এখন দু’মের“তে আর জনগণ শুধুই ক্ষতিতে এবং চরম অস্বস্তিতে। মওদুদ সাহেবও বলেছেন, ইলিয়াস আলীকে না পাওয়া গেলে হরতালের চেয়ে আরও শক্ত কর্মসূচি দেবেন। সেটা কি জনসাধারণ জানে নাÑ তবে অগ্রিম দুঃসময়ের আশংকা করছে। ইলিয়াস আলীকে যারাই গায়েব করেছে তারা কি বুঝতে পারেনি এতে ফল ভালো হবে না? সরকার সব শক্তি ব্যয় করেও এখন পর্যন্ত যখন পেল না তখন বুঝতে হবে ব্যাপারটা জটিল। হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে দেখা করে ইলিয়াস আলীর মেয়ে যে চিঠি দিয়েছে তা হƒদয়বিদারক। গরিব ড্রাইভারের পরিবার হয়তো সেরকম আকুতি জানাতে পারেনি কিš‘ তার পরিবারের জন্য সে তো অমূল্য ছিল ঠিক যেমনি অমূল্য ছিল সেই পাঁচটি প্রাণ, যা ঢাকা ও বিশ্বনাথে অকালে হারিয়ে গেল! এসব দেখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, সরকারের কিš‘ বিরোধী দলের কি কোন করণীয় নেই শুধু সামান্য প্রতিবাদ করা ছাড়া? মিসেস হিলারি ক্লিনটন শ্রমিক নেতা আমিনুলের নৃশংস হত্যার কথাও উল্লেখ করে বলেছেন, এতে বহির্বিশ্বে বিশেষত আমাদের পোশাক রফতানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সরকারকেই এই হত্যার সুবিচার করতে হবে, যাতে শ্রমিকদের মনে আতংক ছড়িয়ে না পড়ে। মিসেস ক্লিনটন যুক্তরাষ্ট্রের আগের সুরেই কথা বলেছেন গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. ইউনূস সম্পর্কে। অর্থমন্ত্রীর প্রথমদিকের কথাবার্তায় মনে হয়েছিল সরকার ড. ইউনূসের ব্যাপারে একটু সম্মানজনক পদক্ষেপ নেবে, কিš‘ পরবর্তী সময়ে দেখা গেল সম্পূর্ণ অন্যরকম আচরণ। এখনও গ্রামীণ ব্যাংকে ভালো একজন ম্যানেজিং ডিরেক্টর নিয়োগ করে, ড. ইউনূসকে সম্মানজনক একটা অব¯’ানে নিয়ে যাওয়া মোটেই অসম্ভব নয়। ড. ইউনূস চিরদিন সব পদ দখল করে থাকবেন, এটা যেমন হতে পারে না, তেমনি অসম্মানজনকভাবে বহিষ্কৃত হবেন এটাও হিলারি কেন দেশের সাধারণ মানুষও চায় না। 
ভারতের প্রভাবশালী বাঙালি মন্ত্রী প্রণব বাবুর সফর আমাদের দু’দেশের জন্যই গুর“ত্বপূর্ণ। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন বাংলাদেশের সঙ্গে সব চুক্তিই বাস্তবায়িত হবে, কিš‘ প্রশ্ন হলÑ কবে? এখনও বঙ্গবন্ধুর আমলের অনেক চুক্তিই বাস্তবায়িত হয়নি। তাই প্রণব বাবুকে অনুরোধ করা যায়Ñ ‘দাদা যাই কর“ন আমাদের দিকটাও একটু দেখবেন।’ শুধু ভারতের জন্য ট্রানজিট, নৌর“ট ইত্যাদির ব্যাপারে ভারত সরকারের যত গরজÑ আমাদের ব্যাপারে তা নেইÑ এটা দুর্বোধ্য হলেও সত্য। ভারত সরকারকে কবিগুর“র ভাষায়ই ভাবতে হবেÑ ‘দিবে আর নিবে মিলিবে মিলাবেঃ এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরেঃ’। একতরফা বন্ধুত্ব হয় না, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে নাÑ আর ভারতের বন্ধুত্ব যেমন আমাদের ভীষণ দরকার, আমাদের বন্ধুত্বও ভারতের দরকার নানা কারণে, যা সবাই জানে। প্রণব মুখার্জি বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎকালে বলেছেন, কোন একটি বিশেষ দল নয়, বাংলাদেশের সবার সঙ্গে ভারত সম্পর্ক চায়। প্রণব বাবুর মতো বিজ্ঞ রাজনীতিকের পক্ষেই এটা বলা স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পুরোটা এবং ত্রিপুরার বেশির ভাগ লোক ভাষাগতভাবে বাঙালি (করিমগঞ্জ, কমলপুর, কৈলাশপুর ও ধর্মনগরের প্রায় সবাই বাংলাÑ অর্থাৎ সিলেটী বাংলা বলেন), তাই ভারতের সঙ্গে আমাদের ভাষা, ঐতিহ্য ও কৃষ্টিগত বিরাট মিল রয়েছে। আমাদের প্রায় সব নদী ও পাহাড়ও বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্ত ঘেঁষে ও অতিক্রম করে বয়ে চলেছে। তাই দু’দেশের মাটি, পানি ও পলিতে রয়েছে একই রূপ-গন্ধ। এসবই আমাদের নৈকট্যের সাক্ষীÑ দূরত্বের নয়। তবুও কেন জানি ছিটমহল সমস্যা, তিস্তা-গঙ্গার পানি ও অন্য অনেক নদীর পানি প্রত্যাহার ইত্যাদি দু’দেশের মধ্যে একটা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করেছে। প্রণব বাবুর এ সফরের পর আশা করা যায়, এসব ব্যাপারে ভারত আরও উদার মনোভাব গ্রহণ করবে এবং একাত্তরের মতো বাংলাদেশের প্রতি হার্দিক বন্ধুত্বের হাত বাড়াবে, যা দু’দেশের জন্যই অপরিহার্য। 
ফার“ক উদ্দিন আহমেদ : সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা, বাংলাদেশ ব্যাংক

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন