জিবলু রহমান :
তারিখ একটাই-১১ মে ২০১২ সড়ক দুর্ঘটনা অনেকগুলো। ইংরেজী দ্যা ইন্ডিপেন্ডেন্টের সিনিয়র রিপোর্টার বিভাষ চন্দ্র সাহা এবং বরিশাল থেকে প্রকাশিত দৈনিক মতবাদের ফটো সাংবাদিক শহীদুজ্জামান টিটু যথাক্রমে রাজধানীর ধানমন্ডি ও গুলশানে বাসের চাপায় নিহত হযেছেন। জেলা শহর সিলেটের কাছাকাছি পৌঁছে ঘাতক ট্রাকের কারণে প্রাণ দিলেন সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ইফতেখার হোসেন শামীমসহ ৮ জন। সিরাজগঞ্জে বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম সংযোগ সড়কের কড্ডা মোড়ে ট্রাকের চাপায় তসলিম মাস্টার নিহত হয়েছেন। গাইবান্ধায় পুলিশ সুপারের দফতরের সামনে একই পরিবারের ৪ জন ও ভ্যান চালক বাসের চাপায় নিহত হয়েছেন।
এদের সবার বাড়িতে এখন শোকের মাতম। কেউই প্রিযজনদের করুণ মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না। প্রিয় সন্তানের রক্তমাখা শার্ট-প্যান্ট বুকে চেপে এখনো কাঁদছেন অনেক মা। চোখের সামনেই বুকের ধনকে ছটফট করে মরতে দেখে শোকে পাথর হযে গেছেন অনেক পিতা।
আর এভাবেই দেশের চারদিকে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিনই প্রাণ হারাচ্ছেন এবং পঙ্গু হচ্ছেন বহু মানুষ। দুর্ঘটনার পর যানবাহনের চালকরা বেশিরভাগ থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। অনেক স্থানে ক্ষুব্ধ জনতা ঘাতক গাড়িকে ভাংচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয়। আসলে ঘাতক বাস না চালক-মালিক?
চালকের অদক্ষতা ও বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর কারণেই ঘটছে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। সড়ক দুর্ঘটনায় কারো মৃত্যু হলে মামলা দায়ের করা হয় বাংলাদেশ দন্ডবিধির ৩০৪ (খ) ধারায়। এটি জামিনযোগ্য অপরাধ। আসামীকে আটকে রাখা যায় না। রাজধানী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যানবাহন আরোহী ছাড়াও পথচারীদের পথ চলতেও এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। পরিবহন সেক্টরে বিরাজমান এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির যেন কোনো প্রতিকার নেই।
ইউরোপ, আমেরিকা, চীন, জাপানেও সড়ক দুর্ঘটনা হয় কিন্তু তার সংখ্যা কম। ভারতেও এর সংখ্যা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম। এর মূল কারণ, যেসব কারণে সড়ক দুর্ঘটনা হয় সেগুলো নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা সম্পর্কে অন্যান্য দেশের সরকার উদাসীন নয়। তারা এ কাজকে নিজেদের দায়িত্বের বাইরের ব্যাপার মনে করে না।
চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানোর ফলে প্রতিদিন অসংখ্য সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় দায়ের করা মামলায় বাদী হয়ে থাকে পুলিশ। ট্রাফিক আইন অনুযায়ী আসামী করা হয় গাড়ি ও তার চালককে। মামলায় পরোক্ষভাবে গাড়ির মালিককেও জড়ানো হয়। ফলে পুলিশ ও আসামীদের সমঝোতার ভিত্তিতেই থানায়ই অধিকাংশ মামলার নিত্তি হয়ে যায়। আদালত পর্যন্ত কিছু মামলা গড়ালেও পুলিশ একে ইউডি (অপমৃত্যু) মামলা হিসেবে চিহ্নিত করে প্রতিবেদন জমা দেয়। ফলে আসামীরা নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে আদালত থেকে বেকসুর খালাস পেয়ে যায়।
আসলে বাস, ট্রাকসহ অন্যান্য যানবাহনের চালকদের ইউনিফর্মের (স্বতন্ত্র পোশাক) ব্যবস্থা না থাকায় দুর্ঘটনা ঘটিয়ে চালকরা জনগণের পাকড়াওয়ের হাত থেকে অনায়াসেই রেহাই পেয়ে যায়। চালকদের মেডিকেল চেকআপের ব্যবস্থা ও বাধ্যবাধকতা না থাকায় শারীরিক ও মানসিকভাবে অযোগ্য অনেকে গাড়ি চালাতে গিযে দুর্ঘটনা ঘটায়। চালকদের পরিচয়পত্র না থাকায় দুর্ঘটনার পর তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চালকরা ড্রাইভিং লাইসেন্সে ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে থাকে। ফলে ঠিকানা অনুযায়ী গিয়ে তাদের আর হদিস পাওয়া যায় না।
আমাদের দেশে মোটরযান আইন আছে ঠিকই কিন্তু তার প্রয়োগ নেই। রাজধানীর কোনো রুটের বাসচালক মোটরযান চালনার ন্যূনতম নিয়ম মেনে চলেন না। যেখানে-সেখানে গাড়ি থামানো, একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ভিড়ের রাস্তায় বিপজ্জনক গতিতে চালনা, ট্রাফিক নিয়মকানুন না জেনে চালকের আসনে বসা, মাদকদ্রব্য সেবন করে গাড়ি চালানো- যেন এই শহরের রাস্তায় গাড়ি চালানোর সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হয়ে উঠেছে। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালক ও তাদের সহকারীদের শাস্তি না হওয়া এবং মোটরযান নিয়ন্ত্রণে দুর্বল আইন এ অবস্থার জন্য দায়ী বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। বাড়ি থেকে বের হয়ে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বা অফিসগামী অনেকেই নির্ধারিত গন্তব্যে না পৌঁছে প্রতিদিন চলে যাচ্চেন হাসপাতালের মর্গে।
আমাদের দেশের পুলিশ ও গাড়ি চালকদের কেউই ট্রাফিক আইন মানে না। পুলিশ কর্মকর্তাদের বাধার কারণেই অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও গাড়িচালকদের জন্য আচরণবিধি প্রয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না। পুলিশের দুর্বল প্রতিবেদনের কারণেই আসামী গাড়িচালকরা আদালত থেকে অহরহ খালাস পেয়ে যায়।
সড়ক দুর্ঘটনা মামলা এজাহার আদালতে দাখিল করা হয় ঠিকই: কিন্তু তা দেখে বিচার করার কিছুই থাকে না। শতকরা ৯০ ভাগ মামলাই দেখানো হয় অপমৃত্যু মামলা হিসেবে। দু'একটি মামলায় চালকদের আসামী দেখানো হলেও আলামত হিসেবে কিছুই দেখানো হয় না। অথবা বলা হয় যে, নিহত ব্যক্তি গাড়ি থেকে নামতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাক্ষী হিসেবে কাউকে পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়। অনেক সময় চিহ্নিত গাড়িটিই যে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী, সেটা নিশ্চিত করা যায় না। ফলে আসামীরা খালাস পেয়ে যাচ্ছে।
সড়ক-দুর্ঘটনার মামলাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হয় না। দুর্ঘটনার পর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চালক ও হেলপার পালিয়ে যায়। বিশেষ করে হাইওয়ে দুর্ঘটনার পর অভিযুক্ত যানবাহন চিহ্নিত করাই যায় না। দুর্ঘটনার পর আরো বেপরোয়া গতিতে চালিয়ে চালক পালিয়ে যায়।
বেশ কয়েকবার রাজধানীতে উন্নয়নশীল দেশে সড়ক নিরাপত্তা শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। ওই সম্মেলনে দুর্ঘটনার মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে আইনানুযায়ী কি ধরনের মামলা করা যায়- এ বিষয়ে আলোচনা করা হলেও কোনো সুরাহা হয়নি। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য সম্মেলনে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করে বলা হয়, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন রাস্তায় অবাধে চলাচল করলেও এই সংস্থা তা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ।
অধিকাংশ ঘটনায় দায়ী ব্যক্তির উল্লেখযোগ্য কোনো সাজা হয়নি। ঘটনাস্থলে চালক ও হেলপার আটক হলেও আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে বেরিয়ে যায় তারা। গাড়ি অথবা চালক আটক হলেও মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে মালিকরা সংশ্লিষ্ট পুলিশের সঙ্গে গোপনে সুরাহা করে ফেলে। কিছুদিন পরই গাড়িটি থানা থেকে ছাড়িয়ে নেয়। দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিরা বিভিন্ন কারণে খবর নিতে পারে না। দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহনের মালিকের সঙ্গে আপোস করার জন্য পুলিশের আগ্রহ থাকে বেশি। এই মামলায় তেমন কোনো শাস্তি হবে না বুঝিয়ে নিহতদের স্বজনদের আপোস করতে আগ্রহী করানো হয়। যার ফলে সড়ক দুর্ঘটনার মামলার নথি নি্রাণ হয়ে যায়।
আইনের ভাষায় ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার অযোগ্যতা হিসেবে যে সব কারণ বিবেচ্য সেগুলো হলো :
১. মৃগী রোগাক্রান্ত ব্যক্তি, ২. ক্ষিপ্ত বা অধিক রাগী ব্যক্তি, ৩. হৃদরোগ, যার কারণে রোগীর আকস্মিকভাবে ‘মাথা ঘোরা' আরম্ভ হতে পারে কিংবা সে মূর্ছা যেতে পারে, ৪. উজ্জ্বল দিবালোকে (চশমা থাকলে তার সাহায্যে) প্রত্যেক চোখ দিয়ে পঁচিশ গজ দূর হতে মোটরগাড়ি সাধারণ রেজিস্ট্রেশন নম্বর দেখা (কালো রঙের প্লেটের উপর একই আকারের সাদা অক্ষর লেখা) এবং কোনো মোটর কারের রেজিস্ট্রেশন নম্বর ও সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থা দেখতে ও পার্থক্য নিরূপণ করতে অক্ষমতা, ৫. বধিরতা (হিয়ারিং এইড ব্যতীত) যার কারণে আবেদনকারীর সাধারণ শব্দ সংকেত শুনতে পারে না, ৬. লাল ও সবুজ রং তাৎক্ষণিকভাবে চিনতে না পারা, ৭. রাকতানা রোগ, ৮. যেসব রোগ ও শারীরিক অক্ষমতার কারণে কোনো ব্যক্তিকে ‘পাবলিক সার্ভিস' মোটরগাড়ি চালানোর জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্স একেবারেই মঞ্জুর করা হয় না। যেমন-কুষ্ঠ রোগী।
মোটরসাইকেল ও ট্রাই-সাইকেলের ক্ষেত্রে ৭ ও ৮ নং ক্রমিকের বিষয়গুলো প্রয়োজ্য নয়।
পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদনকারী টেস্ট পরিচালনাকারী ব্যক্তিকে আরো সন্তুষ্ট করবেন যে তিনি- ১. মোটর গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কিংবা ব্যবস্থা সম্পর্কে কার্যকর প্রাথমিক জ্ঞানসম্পন্ন, ২. মোটর গাড়িগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে জ্ঞানসম্পন্ন, ৩. ‘ফাস্ট এইড' ব্যবহারে সক্ষম, ৪. অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা ব্যবহার করতে পারেন এবং আগুন নেভানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সক্ষম, ৫. ‘টপিং আপ অপরেশন' সম্পর্কে জ্ঞানসম্পন্ন অর্থাৎ ডিস্টিলড ওয়াটারের সাহায্যে ব্যাটারি সেলের ‘টপিং আপ' মাস্টার সিলিন্ডারের ব্লেক ফ্লুইড ভরা, রেডিওয়েটরে পানি ও পাম্পে ইঞ্জিন অয়েল ভরা, ৬. গাড়ি পিছিয়ে গেলে এবং টায়ার ফেটে গেলে গাড়ির নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণে সক্ষম।
চলন্ত অবস্থায় যাত্রী উঠালে বা আসন সংখ্যার বেশি যাত্রী বহন করলে মোটারযান আইনে তার শাস্তি হচ্ছে: আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তা অতিরিক্ত যাত্রীকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিতে পারবেন এবং যাত্রী না নামা পর্যন্ত গাড়ি থামিয়ে রাখতে পারবেন। আসনের অতিরিক্ত কোন যাত্রী ভাড়া পরিশোধ করে থাকলে তিনি ভাড়া ফেরত পাবেন।
এ আইনে আরো বলা হয়েছে, বেপরোয়া কিংবা বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালানোর মতো অপরাধে প্রথমবার সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে ৬ মাসের কারাদন্ড অথবা ৫০০ টাকা জরিমানা। মাদকদ্রব্য সেবনের পর বা মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালানোর সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে ৩ মাসের কারাদন্ড বা ১ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত করা হবে। মোটরযানের ড্রাইভারদের অপরাধ ও তাৎক্ষণিক শাস্তি : ১। বাস স্টপেজে অথবা বাসস্ট্যান্ডে অবৈধভাবে গাড়ি দাঁড় করালে ১৫ টাকা, ২। নিষিদ্ধ এলাকায় গাড়ি দাঁড় করালে ১৫ টাকা, ৩। লিভিং জোনে নোটিশ অমান্য করে গাড়ি দাঁড় করালে ১০ টাকা, ৪। নোটিশ অমান্য করে গাড়ি রাখলে ১৫ টাকা, ৫। অতিরিক্ত সময়সীমার নোটিশ অমান্য করে গাড়ি রাখলে ১০ টাকা, ৬। পারাপারের নির্দিষ্ট স্থান ছাড়া অন্যত্র পথচারীদের সড়ক অতিক্রম ৫০ টাকা, ৭। নির্দিষ্ট স্থানে পথচারী পারাপারে বাধা সৃষ্টি করে গাড়ি রাখলে ৩০০ টাকা, ৮। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ লাইট অমান্য করলে ৫০ টাকা, ৯। অবিরাম বা নিষিদ্ধ হর্ন বাজালে ১০০ টাকা, ১০। নির্ধারিত গতিসীমার ঊর্ধ্বে ঘণ্টায় ১৫ মাইলের অধিক গতিতে গাড়ি চালালে (ভারী যানবাহন অন্য গাড়ির ক্ষেত্রে) ১০০ টাকা, ১১। নির্ধারিত গতিসীমার ঊর্ধ্বে (ভারী যানবাহন) ঘণ্টায় ১০ মাইলের অধিক গতিতে গাড়ি চালালে ১০০ টাকা, ১২। রাস্তার মাঝখানে হলুদ লাইন অতিক্রম করে গাড়ি চালালে ৩০ টাকা, ১৩। ট্রাফিক আইনের উল্টোদিকে গাড়ি চালালে ৩০ টাকা, ১৪। ‘গাড়ি থামাও ' ‘বন্ধ কর' বা ‘ধীরে চালাও' চিহ্ন অমান্য করলে ৩০ টাকা, ১৫। সংকেত না দিয়ে গাড়ি চালালে ৩০ টাকা, ১৬। আলোচিত শহরে ঝলমলে হেডলাইট ব্যবহার করলে ১০০ টাকা, ১৭। নিষিদ্ধ এলাকায় ওভারটেক করলে ১০০ টাকা, ১৮। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অন্য গাড়িকে পথ ছেড়ে না দিলে ৫০ টকা, ১৯। অন্যান্য যানবাহন চালাতে বাধা সৃষ্টি করলে ৫০ টকা, ২০। খারাপ সাইলেন্সার ব্যবহারের জন্য ১০ টাকা, ২১। কালো ধোঁয়া উদগিরণ হলে ১০০ টাকা, ২২। বিনা অনুমতিতে গাড়িতে লাউড স্পিকার ব্যবহার করলে ৪০ টাকা, ২৩। নির্দিষ্ট স্পপেজ ছাড়া অন্য স্থানে যাত্রী ওঠালে ৫০ টাকা, ২৪। যাত্রীবাহী গাড়িতে রুট বা এলাকার নাম লিখে না রাখলে ৫০ টাকা, ২৫। যাত্রীবাহী গাড়িতে ভাড়া ও স্টপেজের তালিকা এবং সময়সূচি প্রদর্শন না করলে ৩০ টাকা, ২৬। নির্ধারিত হারের অধিক ভাড়া দাবি করলে ৫০ টাকা, ২৭। ড্রাইভার-কন্ডাক্টর কর্তৃক গাড়ির পাদানি, বাম্পার বা ছাদে যাত্রী পরিবহন করলে ৩০ টাকা, ২৮। ড্রাইভার অথবা কন্ডাক্ট্রর লাইসেন্স, ফিটনেস সার্টিফিকেট, রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট ও বীমা সার্টিফিকেট দেখাতে না পারলে ৫০ টাকা।
গাড়িতে মানুষ এখন চড়ে না, ঝুলে। কখনো বানরের মতো, কখনো বাদুড়ের মতো। বিশেষত পিক আওয়ারে। কী ভিতরে, কী বাইরে, সব খানে একই অবস্থা। তিল ধারণের জায়গা নেই। কোথাও এতটুকু দলিত-মলিত হয়ে ঘর্মাক্ত হয়ে ঘর্মাক্ত বরণে পাদানিতে উঠলে আর ওপরে ওঠা যায় না। ঠেলেঠুলে, একপা-দু'পা করে ওপরে উঠলেও ঘাড় সোজা করা যায় না, বহু চেষ্টা তদবিরে ঘাড় সোজা করা হলে আবার ব্যালেন্স রাখা যায় না। অথচ, মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩ মতে, ক্যাপাসিটিকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে যেভাবে যাচ্ছেতাই যাত্রী বহন রাস্তাঘাটে হররোজ আজকাল চলছে, তা সম্পূর্ণ অপরাধ। ওই অধ্যাদেশের ৯৬ ধারায় বলা হয়েছে ‘কোনো মোটরগাড়ি চালক কিংবা গাড়ির ভিতর ভিন্ন অন্য কোনো স্থানে কোনো ব্যক্তিকে আরোহণ করতে দিতে পারবে না এবং অনুমোদিত সংখ্যার বেশি যাত্রীও নিতে পারবে না বা এসবের অনুমতিও দিতে পারবে না।' দিলে অনূর্ধ্ব ১০০০ টাকা জরিমানা গুণতে হবে। মোটরযান অধ্যাদেশ অনুযায়ী আগে কোনো অপরাধ করে থাকলে, সেক্ষেত্রে গুণতে হবে অনুর্ধ্ব ২০০০ টাকা। (ধারা-১৩৭)
অন্যদিকে, ৯৬ ধারার নিয়ম লঙ্ঘন করে কোনো যাত্রী কোনো মোটরযানে আরোহণ করলে পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তা বা মোটরযান পরিদর্শক তৎক্ষণাৎ সে যাত্রীকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিতে পারেন, সেরূপ যাত্রী গাড়ি থেকে না নামা পর্যন্ত ওই গাড়ি থামিয়ে রাখতে পারেন (ধারা-৯৭)। এমনকি ঘটনাস্থলেই ওই যাত্রীকে ৪০ টাকা জরিমানা (দ্বাদশ তফসিল) চার্জ করতে পারেন।
১৯৬১ সালে সড়ক পরিবহন অধ্যাদেশ আইনে চালকের বয়সের ক্ষেত্রে বিধি-নিষেধ, কাজের ঘণ্টাসহ অন্যান্য সুবিধা ও অধিকারের কথা বলা হয়েছে। ওই অধ্যাদেশের ধারা-৩-এ বয়সসীমা সম্পর্কে বলা হয়েছে-
১. চালক ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তিকে আঠার বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত কোনো সড়ক পরিবহন সার্ভিসে নিযুক্ত করা যাবে না, ২. একুশ বছর বয়স না হওয়ার পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে কোনো যানবাহন চালানোর উদ্দেশে কোনো সড়ক পরিবহন সার্ভিসে নিযুক্ত করা যাবে না এবং ৩. নিয়োগপত্র ছাড়া কাউকে নিয়োগ করা যাবে না।
কাজের ঘণ্টা ও বিশ্রাম সম্পর্কে এ আইনের ধারা-৪-এ বলা হয়েছে-
১. কোনো ব্যক্তিকে যানবাহনে-
ক. অন্তত আধ ঘণ্টাকাল বিশ্রাম না দিয়ে একনাগাড়ে পাঁচ ঘণ্টার বেশি ও অনুরূপভাবে দু'টি বিরতি না দিয়ে আট ঘণ্টার বেশি, খ. একদিনে নয় ঘণ্টার বেশি এবং গ. সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টার বেশি কাজে নিযুক্ত করা যাবে না।
২. প্রত্যেক শ্রমিক প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটানা ২৪ ঘণ্টা বিশ্রাম পাওয়ার অধিকারী এবং অনুরূপ বিশ্রামের জন্য কোনো শ্রমিকের মজুরি কর্তন করা যাবে না।
ধারা-৩-এর (ক) ও (খ)-এ বলা হয়েছে-
ক. কোনো শ্রমিকের কোনো বছর একশ' পঞ্চাশ কর্মঘণ্টার বেশি ওভারটাইম কাজে নিয়োগ করা যাবে না এবং খ. ওভারটাইম কাজে নিযুক্ত প্রত্যেক শ্রমিককে প্রতিঘণ্টার প্রাপ্ত স্বাভাবিক মজুরির হিসেবে দ্বিগুণ পারিশ্রমিক দিতে হবে।
ধারা-৪-এ বলা হয়েছে, যে ক্ষেত্রে কোনো শ্রমিককে ২ উপ-ধারার বিধান থেকে রেহাই দিতে বিধিমালা প্রণয়নের ফলে কোনো শ্রমিক কোনো সাপ্তাহিক বিশ্রাম ভোগ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, যত শিগগির সম্ভব তাকে অনুরূপ সংখ্যক ক্ষতিপূরণমূলক বিশ্রাম ঘণ্টা মঞ্জুর করতে হবে। শর্ত হচ্ছে যে, একসঙ্গে অন্তত চবিবশ ঘণ্টা ক্ষতিপূরণমূলক বিশ্রাম মঞ্জুর না করে কোনো শ্রমিককে একনাগাড়ে দশ দিন কাজ করানো যাবে না।
পরিবহন শ্রমিকদের ছুটি সম্পর্কে ধারা-৬-এ উল্লেখ করা হয়েছে-
১. কোনো সড়ক পরিবহনের চাকরিতে এক বছর চাকরি পূর্ণ হয়েছে এমন প্রত্যেক শ্রমিকের পরবর্তী বারো মাসের জন্য প্রতি বাইশ দিন কাজের জন্য একদিনের মজুরিসহ বার্ষিক ছুটি দিতে হবে। শর্ত হচ্ছে যে, অনুরূপ ছুটির মধ্যে পড়লে যে কোনো ছুটিও (সাপ্তাহিক বিশ্রামসহ) অন্তর্ভুক্ত হবে।
২. কোনো শ্রমিক যদি উপ-ধারা- ১. মোতাবেক প্রাপ্য ছুটি বারো মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ বা আংশিক না দিয়ে থাকেন, তবে ওই উপ-ধারা মোতাবেক পরবর্তী বারো মাসের ছুটির সঙ্গে তা যোগ হবে, কিন্তু ওই শ্রমিক তার হিসেবে বিশ দিন ছুটি জমা হয়ে গেলে আর এরকম ছুটি অর্জন করবেন না। শর্ত হচ্ছে যে, কোনো শ্রমিক ছুটির আবেদন করলে এবং মালিক কর্তৃক তা অস্বীকৃত হলে উপরোক্ত ছুটির সীমার পরও তার হিসেবে এ ছুটি জমা থাকবে।
৩. বার্ষিক ছুটি হিসেবের উদ্দেশে নিম্নলিখিত কারণ সত্ত্বেও কোনো শ্রমিক সড়ক পরিবহন সার্ভসে অব্যাহত চাকরি করেছেন বলে গণ্য হবে-
ক. কোনো ছুটি বা সাপ্তাহিক বিশ্রাম, খ. মজুরিসহ যে কোনো ছুটি, গ. অসুস্থতা বা দুর্ঘটনার জন্য মজুরিসহ বা বিনা মজুরিতে ছুটি, ঘ. মাস্টাররোলে নাম আছে যন্ত্রপাতি বিকল হওয়ার কারণে মালিক কর্তৃক কাজ না দেয়ার ফলে, ঙ. অবৈধ নয় এমন ধর্মঘট বা বৈধ নয় এমন লক আউট।
এছাড়া উপ-ধারা-৪ ও ৫-এ বলা হয়েছে-
প্রত্যেক শ্রমিক প্রতি পঞ্জিকা বছরের দশ দিন পূর্ণ মজুরিসহ নৈমিত্তিক ছুটি এবং পঞ্জিকা বছরের পূর্ণ মজুরিতে চৌদ্দ দিন অসুস্থতাজনিত ছুটি পাওয়ার অধিকারী হবে না, ওই ছুটি পরবর্তী বছরে জমা হবে না। ওই বিধিগুলো মান্য না করার দন্ডস্বরূপ ধারা-১১-এ বলা হয়েছে-
কোনো ব্যক্তি ও অধ্যাদেশের কোনো বিধান বা এর আওতায় প্রণীত বিধিমালার কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে অথবা পালন করতে ব্যর্থ হলে পাঁচশ টাকা পর্যন্ত জরিমানায় দন্ডনীয় হবেন এবং দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ওইরূপ লঙ্ঘন অব্যাহত থাকলে যতদিন অনুরূপ লঙ্ঘন বা ব্যর্থতা চলমান থাকে ততদিন প্রতিদিন অতিরিক্ত ৫০ টাকা হারে জরিমানায় দন্ডনীয় হইবেন।
বছরের পর বছর নিরীহ যাত্রীরা সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত এবং আহত হচ্ছে, তার থেকে অধিক সংখ্যায় অন্য কোনোভাবে জীবনের ক্ষতি হয় না, যদিও বিভিন্ন প্রকার ক্রিমিনাল-সন্ত্রাসীর হাতে হতাহতের সংখ্যাও অনেক। এক্ষেত্রে লক্ষ্য করার বিষয় যে, সন্ত্রাসীদের হাতে মৃত্যু, বোমা হামলায় নিয়ে যথার্থ মৃত্যু কারণেই হৈ-চৈ, মিটিং-মিছিল হলেও সড়ক দুর্ঘটনায় যে হাজার হাজার মানুষ বছরে হতাহত হচ্ছে- এ নিয়ে কোনো মহলেই কোনো উদ্বেগ দেখা যায় না। এর বিরুদ্ধে কোনো মহল থেকেই কোনো কার্যকর প্রতিবাদ হয় না। বিবৃতি, লেখালেখি, মিটিং-মিছিল, সংবাদপত্রে সম্পাদকীয় দেখা যায় না। হাজার হাজার নিরীহ লোকের এই মৃত্যু, পঙ্গুত্ব ও জীবনের সর্বনাশ একটি নীরব ব্যাপার হিসেবেই বাংলাদেশে নিয়মিতভাবে ঘটে চলে। সংবাদপত্রের রিপোর্ট হয় না এমন দুর্ঘটনার সংখ্যাও হাজার হাজার।
-লেখক : সদস্য সচিব, শামসুর রহমান ফাউন্ডেশন, সিলেট
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন