॥ মে. জে. (অব:) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক ॥
লেখাটি শুরু করছি দু’টি বিষয় দিয়ে। যথা : গত কলামে লেখা ১৯৯৬ সালে পরিকল্পিত সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টা এবং গত সপ্তাহে রথী-মহারথীদের বাংলাদেশ সফরের তাৎপর্য নিয়ে। প্রথমে বলতে চাই ইতঃপূর্বে বাংলাদেশ নামের দেশটিতে পদধূলি দিয়ে গেলেন বিশ্বের তিন মতাধর রাষ্ট্রের ভিআইপি তিন ব্যক্তি। এসব ভিআইপির বাংলাদেশ সফর নিয়ে টেলিভিশন এবং প্রিন্ট মিডিয়াগুলোতে প্রচুর আলাপ-আলোচনা-সমালোচনার জোয়ার বয়ে গেছে। দেশের বিভিন্ন কলামিস্ট এবং বুদ্ধিজীবী মহল তাদের কলামে এদের সফরের তাৎপর্যকে নিজস্ব মতবাদ ও তাত্ত্বিক চিন্তা-চেতনা এবং বিশ্বাসের জায়গা থেকে নানা আঙ্গিকে জনসমক্ষে তুলে ধরতে চেষ্টা করেছেন। সর্বোপরি সবাই এরূপ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, (যার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ) বাংলাদেশে সরেজমিন প্রাপ্তি চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট, সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতির উদ্ভব এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের বিষয়টিকে গুরুত্বারোপ করে সুরাহার তাগিদ সংক্রান্ত উদ্বেগ প্রসঙ্গে জোর দিয়েছেন।
প্রথমে মূল্যায়ন করি এশিয়াভুক্ত দেশ জাপানের বিষয়টি। জাপান বাংলাদেশের প্রধান ডেভেলপমেন্ট পার্টনার বা উন্নয়ন অংশীদারী দেশ তথা বৈদেশিক ঋণ অথবা অফেরতযোগ্য ঋণসহায়তা দিয়ে বাংলাদেশকে গত ৪০টি বছর সবচেয়ে বেশি সাহায্য-সহযোগিতা করে আসছেন। উদার বন্ধুপ্রতিম এ রাষ্ট্রটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয় নিয়ে কখনো উচ্চবাচ্য কিংবা হস্তপে করেনি। কিন্তু ব্যতিক্রম ২০১২ সাল!!! অর্থনৈতিক উন্নয়নে অতি সমৃদ্ধ এ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে যাওয়া নিয়ে ১৯৬৫ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি সম্মান বিভাগে জাপানের উন্নয়নকে একটি ‘কেস স্টাডি’ হিসেবে পড়ানো হতো। এ মুহূর্তে জাপানের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে সারা বিশ্ব গবেষণারত, বলা চলে জাপান উন্নত বিশ্বের মধ্যেও উন্নততর। অথচ জাপান আমাদের এশিয়াভুক্ত দেশ। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকেরও সদস্যভুক্ত রাষ্ট্র। জাপানকে তেল, গ্যাস আমদানি করতে হয় আবার বিনিয়োগও করতে হয়। এতদসত্ত্বেও তারা মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নিকটতম রাষ্ট্র কিংবা আধা নিকটতম রাষ্ট্রের প্রতিবেশীদের প্রতি অতি আন্তরিক। কিন্তু উদার বন্ধুত্বপূর্ণ এ রাষ্ট্রের উপপ্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে এসে বলে গেলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের সাথে বাংলাদেশের বৈরিতা অথবা মতের পার্থক্য দূর না হওয়া পর্যন্ত পদ্মা সেতুতে জাপান কোনোরূপ অর্থায়নের জোগান দেবে না এমনকি এক বিন্দুও জাপান এতে সহায়তা দেবে না। এতে প্রমাণিত হয়, পদ্মা সেতুর অর্থ কেলেঙ্কারিতে বাংলাদেশ সরকারের জড়িত থাকার বিষয়ে বিশ্বব্যাংক যে অবস্থান নিয়েছে তা সঠিক সিদ্ধান্ত এবং বাংলাদেশ অহেতুক বিশ্বব্যাংকের সাথে যে তর্কে লিপ্ত হয়েছে তা ভুল ছিল। একটু আগে বললাম যে, জাপান কোনো দিন বাংলাদেশের কোনো বিষয়ে মন্তব্য কিংবা হস্তপে করেনি কিন্তু বড় দুঃখের বিষয় ২০১২ সালে এসে জাপান কেন এত বড় মন্তব্য করল? একটা কথা বলার অবকাশ থাকে যে, দুর্নীতির ব্যাপারে তারা সরাসরি মন্তব্য করেননি। তারা এত কম বুদ্ধিমান নয় যে, দুর্নীতির বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করে তাদের মূল্যায়ন কমাতে চান।
অন্য দিকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশে এসেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫০তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনের সমাপনী অনুষ্ঠানের অতিথি হিসেবে মঞ্চ আলোকিত করার জন্য কিংবা ছদ্মবেশে। অর্থাৎ তিনি ভারত-বাংলাদেশ উভয় সরকারের মধ্যে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সংলাপ কিংবা সীমান্তে বিএসএফের হাতে নিরীহ বাংলাদেশীদের হত্যার কোনোরূপ সমস্যার সমাধানের বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করতে তিনি বাংলাদেশে আসেননি। তিনি বাংলাদেশে এসেছেন যেহেতু কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রিপরিষদে বাঙালির সংখ্যাগরিষ্ঠতা কম। এ ছাড়া তিনি কেন্দ্রীয় সরকার ও কংগ্রেসের অন্যতম প্রবীণ নেতা তাই বর্তমান সরকারের কাছের লোক হিসেবে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির দেখভাল করার দায়িত্ব তার ওপরই বর্তায়। প্রণব মুখার্জি নতুন করে কোনো বিষয়ে আমাদের আশার বাণী শোনাতে পারেননি এবং কোনো বিষয়ে আঘাতও দেননি। বাংলাদেশের সাথে ভারতের যে বিষয়গুলো নিয়ে এযাবৎ চুক্তি হয়েছে সেগুলোর বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি পাশাপাশি তিস্তা চুক্তি, সীমান্তে বাংলাদেশীদের নির্বিচারে হত্যা, করিডোর, ট্রানজিটসহ ঝুলে থাকা চুক্তিগুলো নিয়ে সঙ্ঘাত এবং সঙ্কটময় বিষয়াদির সুরাহা প্রসঙ্গে কোনো আলোচনা করেননি। তবে যে দিকটি নজর কাড়ার মতো তা হলোÑ তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাাৎ করার পাশাপাশি বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার সাথেও সাাৎ করেছেন। অন্য দিকে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি আশার আলো জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন এই মর্মে, ‘ভারতের জনগণ বাংলাদেশের জনগণের সাথে বন্ধুত্ব চায় কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি কিংবা দলের সাথে নয়।’
প্রণবের এ বক্তব্য নিয়ে দু’টি কথা বলি। এটি চিরাচরিতভাবে বিশ্বের সবাই জানে যে, বর্তমান শাসক দল তথা আওয়ামী লীগ তাদের জন্মলগ্ন থেকে ভারতকে অতি মনেপ্রাণে বন্ধু ধরে নিয়েছে, ভারতের প্রতি তারা অত্যন্ত দুর্বল এবং ভারতবান্ধব সরকার হিসেবে তারা পরিচিতি লাভ করছে। অন্য দিকে ভারতও অপ্রত্যাশিত ও সীমাহীন এবং ওতপ্রোতভাবে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। এই ভারতের মাটিতেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী পাঁচটি বছর নিরাপদ আশ্রয়ে ছিলেন গত পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়কালে, পাশাপাশি আওয়ামী লীগের আরো অনেক নেতাকর্মীর মূল আশ্রয় কেন্দ্রের স্থান হিসেবে ভারতের মাটিকে উপযুক্ত মনে করে গত দশকের শুরুর দিকে সেখানে অবস্থান নিয়েছেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত বাংলাদেশকে সাহায্য-সহযোগিতা করেছে তাই তাদের সাথে একটা নিবিড় বন্ধুত্ব গড়ে উঠবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু সে বন্ধুত্বের মাত্রা কত দূর? বন্ধুত্বের মাত্রা রা করতে গিয়ে কি ১৬ কোটি বাংলাদেশীর স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থ বিসর্জন দিতে হবে? একটি বিষয় জানা আমাদের সবার জরুরি, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে সাহায্য-সহযোগিতার পেছনে ভারতেরও স্বার্থ বিদ্যমান ছিল। এ ছাড়া ভারত যদি মনে করে গত ৪০টি বছর যাবৎ আওয়ামী লীগ ছাড়া বাংলাদেশে চিন্তা-চেতনা করার মতো অন্য কোনো রাজনৈতিক দল নেই, তাহলে ভারত ভুল করবে। আমরাও ধরে নিয়েছিলাম ভারত জেনেশুনে ভুলই করে যাচ্ছে কিন্তু না, এ সফরে প্রণবের কথা শুনে মনে হলো তারা না বুঝে আগে ভুল করলেও এখন তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। আবার এমনও হতে পারে বাংলাদেশের মানুষকে সন্তুষ্ট করতে তিনি তার মুখের বাক্যটি দিয়ে গেলেন কিন্তু অন্তরে ঠিকই তার ল্য ও উদ্দেশ্য ভিন্ন। যা হোক ঠিক সময় বোঝা যাবে তার কথাটি কতটা যুক্তিযুক্ত। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে নানা ছোটখাটো সমস্যা বিদ্যমান। এগুলো সমাধানে তারা কাজ করে যাচ্ছে। অন্য দিকে কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ওপর প্রভাব বিস্তার করতে অম। যে কারণে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের মধ্যে বিরাজমান কয়েকটি ইস্যু মমতা ব্যানার্জির সদিচ্ছার ওপর নির্ভর হয়ে পড়েছে, যেগুলো চাইলেই কেন্দ্রীয় সরকার সমাধান করতে পারছে না। ভারতের অনেক প্রদেশ রয়েছে তবে তার মধ্যে আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরামÑ এ চারটি প্রদেশ অতি গুরুত্বপূর্ণ। যদিও আমরা মনে করি বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক উন্নয়নে কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবিকপে আমাদের সম্পর্ক উন্নয়ন ও সাহায্য-সহযোগিতা এবং ঝুলে থাকা চুক্তিগুলোর সমাধান নির্ভর করছে এই প্রদেশগুলোর মন্ত্রী-মুখ্যমন্ত্রী এবং জনগণের ওপর। তার প্রমাণ আমরা পেয়েছি ১৯৭১ সালে সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধের সময় এই প্রদেশগুলোই আমাদের ওতপ্রোতভাবে সহযোগিতা করেছে। হরিয়ানা কিংবা তামিলনাড়– সে দিন আমাদের সাহায্য-সহযোগিতা করেনি। প্রণব বাবুর সফরের পরপরই নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল জেসিসির মিটিং। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে মনমোহন সিং বাংলাদেশে আসার পর জেসিসি গঠিত হয়েছিল; তার প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। বৈঠকের ফলাফল পত্রপত্রিকায় এসেছে; শুধু শূন্য ফল বললে ভুল হবে আবার এক বললেও ভুল হবে। শূন্য এবং এক সংখ্যার মধ্যস্থ যেকোনো একটি একক আমরা গণনা করতে পারি আর এটি হলো সেই জেএসসির ফলাফল। তার পরও আশা করতেই থাকব কারণ যে ফ্রেম ওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট সেপ্টেম্বর মাসে করা হয়েছে সেটাই হচ্ছে নীল আকাশ অর্থাৎ নীল আকাশের নিচে পৃথিবীর হেন জায়গা নেই যেটি ছায়া পাচ্ছে না তদ্রƒপ ফ্রেম ওয়ার্ক এগ্রিমেন্টের আওতায় এমন কোনো হেন জিনিস নেই যেটিকে বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যকার নিরূপণ করা সম্ভব নয়, শর্ত হচ্ছে যদি ভারত চায়।
এবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি কিনটনের বাংলাদেশ সফরটির দিকে তাকাই যা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং উচ্চমাত্রার। দু’টি দেশই চেয়েছেন সর্বোচ্চ সুযোগটিকে কাজে লাগাতে তবে এ সফরটি হওয়ার কথা ছিল আরো কিছু দিন আগে। তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন ২০ ঘণ্টার জন্য কিন্তু তার বক্তব্য ছিল বাংলাদেশের জন্য পাঁচ বছরের দিকনির্দেশনা। বাংলাদেশ ও মার্কিন সম্পর্কের মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উদ্ভাসিত হয়েছে। সেগুলো হলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কিছু কিছু বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যভাবে ভূমিকা রাখেÑ ক. যেমন গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রমের কী হওয়া উচিত; খ. দেশের প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দলের ভূমিকা কী হওয়া উচিত; গ. কোন প্রক্রিয়া অবলম্বন করলে রাজনৈতিক সঙ্কট ও চলমান সমস্যার সমাধান হতে পারে; ঘ. কোন ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্বাচন হলে অবাধ সুষ্ঠু নিরপে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পাবে আবার এটাও বোঝা গেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি প্রলোভিত এবং আমাদের দেশে মাটির ওপরে-নিচে যে পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদই থাকুক না কেন, আরো বেশি আবিষ্কারের সম্ভাবনায় তারাও বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। ইতঃপূর্বে সমুদ্রসীমা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদের মাত্রা বেড়ে গেছে। তবে হিলারি কিনটনের সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের মঙ্গল ও কল্যাণের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহানুভূতির কথা প্রকাশ পেয়েছে সেটা আন্তরিক হোক বা লৌকিকতামূলক হোক সে েেত্র ইতিবাচক মন্তব্যই বাঞ্ছনীয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃৃথিবীব্যাপী তাদের প্রভাব বিস্তারের ত্রেকে ক্রমেই পরিবর্তন করছেন; বর্তমানে সোভিয়েত রাশিয়াকে কৌশলগত শত্র“ হিসেবে বিবেচনায় নেয় না যেমনটি নিয়েছিল ১৯৮৯ সালের আগে। নতুনভাবে তারা শত্র“ হিসেবে অন্য রাষ্ট্রের দিকে মনোনিবেশ করেছেন এবং এসব প্রতিদ্বন্দ্বী শত্র“ রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনার জাল বুনে বসে আছেন। অপর দিকে মিত্র রাষ্ট্রও খুঁজে বেড়াচ্ছেন। এ দিকটি বিবেচনা করলে দণি এশিয়ার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হলো ভারত আর ভারতের কাঁধে অস্ত্র রেখে তারা বাংলাদেশকে মিত্র বানাতে চায়। বাংলাদেশকে তারা যতই গুরুত্ব দিচ্ছে, বাস্তবে তাদের অন্তরে এবং কাগজে-কলমে অতি কিঞ্চিৎ বলে আমার অনুভূতি বা মূল্যায়ন। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিকে নিয়ে রাত-দিন পড়ে থাকার মতো সময়ও তাদের হাতে নেই তাই বাংলাদেশের দেখভাল করার দায়িত্ব দিচ্ছে ভারতকে, তবে শতভাগ না হলেও বেশির ভাগ।
দুই.
১৯৯৬ সালের মে মাসের ১৮ তারিখের ঘটনা গত সপ্তাহে প্রকাশিত কলামটি যদি কেউ না পড়ে থাকেন তাহলে নয়া দিগন্তের ওয়েবসাইটে গিয়ে কলামটি পড়তে পারবেন এটা তার চলমান অংশ। ১৮ মে ১৯৯৬ সালের দিকে ফিরে তাকালে দেখতে পাই সে দিন বাংলাদেশের সেনাবাহিনী প্রধান আবু সালেহ মুহাম্মদ নাসিম টাঙ্গাইলে একটি ঘূর্ণিঝড়কবলিত এলাকা পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। হঠাৎ করে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় আক্রান্ত মানুষের মধ্যে ত্রাণতৎপরতা চলছে তাই তিনি দেখতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরে এসে তেজগাঁও পুরনো বিমানবন্দরে হেলিকপ্টার থেকে নেমেই তিনি সংবাদ পেলেন দু’জন অফিসারের অবসরপ্রাপ্তির আদেশ। সে দিন জেনারেল নাসিমকে একটি সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল, তিনি কি বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত এই অবসর আদেশ মেনে নেবেন? না মেনে নেবেন না? বাংলাদেশ সরকার বাধ্যতামূলক অবসর আদেশ প্রদান করেছিল বগুড়ার জিওসি মেজর জেনারেল গোলাম হেলাল মোরশেদ খান এবং তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলসের উপমহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার মিরন হামিদুর রহমান। জেনারেল নাসিমের মনে সম্ভবত অনেকগুলো প্রশ্ন ছিল। স্বাভাবিক অবস্থায় যেকোনো সেনাবাহিনীর প্রধান সরকারের এই আদেশকে মেনে নেবেন। জেনারেল নাসিমের আগে-পরে যারাই সেনাপ্রধান হিসেবে এসেছেন তারা সবাই এরূপ আদেশ মেনে নিয়েছেন। কিন্তু জেনারেল নাসিম চিন্তা করলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমান এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস এই বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করে কী বার্তা অলিখিতভাবে প্রদান করছেন? শুভাকাক্সী এবং পরামর্শদাতারা তাকে বুঝালেন, হেলাল মোরশেদ আপনার প্রিয়তম জেনারেল তাকে অবসর প্রদান করে সরকার বোঝাতে চাচ্ছে তারা আপনার ওপর অসন্তুষ্ট এবং এরপর আপনার অন্যান্য প্রিয় ব্যক্তিকে অবসর প্রদান করা হবে এবং সবিশেষ আপনাকেও অবসরে পাঠিয়ে দিতে পারে। লিখিতভাবে না এলেও অলিখিতভাবে আলোচনায় প্রশ্ন উঠল কেন জেনারেল হেলাল মোরশেদকে অবসরে পাঠানো হবে? তার সহজ উত্তর ছিল এরূপÑ তারা সরকারের বিরুদ্ধাচরণ করে অশোভন কথা বলে সমালোচনা করেছেন যাতে জেনারেল নাসিমেরও পৃষ্ঠপোষকতা ছিল বলে তাদের বিশ্বাস। আইনের দিক থেকে হঠাৎ করে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়াটিতে কিঞ্চিৎ ত্র“টিপূর্ণ ছিল এটা বাস্তব। জেনারেল আবু সালেহ মুহাম্মদ নাসিম (বীরবিক্রম) তার প্রিয়তম জেনারেল গোলাম হেলাল মোরশেদ খানের বাধ্যতামূলক অবসর আদেশটিকে স্বস্তির সাথে গ্রহণ করতে পারেননি। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন এটি তিনি মান্য করবেন না। ১৯ তারিখ সারা দিন এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা, গবেষণা-সমালোচনার কোনো কমতি ছিল না। তার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মধ্যে যারা ঢাকায় আছেন তাদের সাথে মুখোমুখি আর যারা ঢাকায় নেই তাদের সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করছিলেন। সর্বোপরি তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি এই অবসরের প্রতিবাদ করবেন আইনানুগভাবে। এই প্রতিবাদের অংশ হিসেবে তিনি সরকারের কাছে চিঠি লিখলেন। দ্বিতীয় একটি বিষয় পরবর্তীকালে আবিষ্কার হয় যখন প্রতিবাদ করছিলেন তখন জেনারেল নাসিম বুঝতে পারেননি যে, দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি বিরাজ থাকার কারণে প্রতিরা মন্ত্রণালয়টি রাষ্ট্রপতি বিশ্বাসের আওতার অধীনে আছে। ১৯ তারিখ সকালবেলা জেনারেল নাসিম রাষ্ট্রপতি বিশ্বাসের সাথে দেখা করতে বঙ্গভবনে ছুটে যান সেখানে জেনারেল নাসিম রাষ্ট্রপতির কাছে মৌখিক প্রতিবাদ জানান এবং বাধ্যতামূলক অবসর আদেশ প্রত্যাহার করতে অনুরোধ করেন। রাষ্ট্রপতি বিশ্বাস তার এই বক্তব্যে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। পরিস্থিতি ঠিক এ রকম : বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি যিনি সংবিধান মোতাবেক দেশের এবং সরকারের প্রধান ঠিক ওই মুহূর্তে তিনি আদেশ করছেন দু’জন ব্যক্তিকে অবসরে যাওয়ার জন্য, অপর পে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান চাচ্ছেন তারা অবসরে না যাক। এই বিপরীতমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক মনোভাব থমথমে একটি উত্তেজনার সৃষ্টি করে। সংঘর্ষের দিক থেকে এটাকে আমরা সাংবিধানিক সংঘর্ষ, আধা রাজনৈতিক সংঘর্ষ কিংবা আধা কমান্ড সংশ্লিষ্ট সংঘর্ষ বলতে পারি। এরূপ পরিস্থিতি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ইতঃপূর্বে কখনো ঘটেনি, এযাবৎকালেও কখনো হয়নি।
এরপর আসে ২০ মে। যে উত্তেজনার ঘটনাটিকে কথা বা মুখে কিংবা লিখে বোঝানো যাবে না তা হলো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৯-২০ মে সময়কালটা ছিল কাগজে-কলমে ওপরে ওপরে সব ঠিকঠাক ও স্বাভাবিক। বাস্তবে সব কিছু ছিল উল্টোপাল্টা এবং অস্বাভাবিক সঙ্ঘাতময় উত্তেজনাপূর্ণ। পুরো সেনাবাহিনী প্রায় দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। এক দিকে বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতি জনাব বিশ্বাসের প্রতি অনুগত একটি দল অপর দিকে জেনারেল নাসিমের প্রতি অনুগত একটি দল। সেনাবাহিনী প্রধান ঢাকার বাইরে থেকে সৈন্যদের ঢাকা আসার জন্য আদেশ করেছিলেন। এ আদেশের পেছনে উছিলা ছিল ঢাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে এই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে সামাল দেয়ার জন্য অতিরিক্ত সৈন্য প্রয়োজন। সমগ্র বাংলাদেশে নয়, ঢাকার অদূরে ময়মনসিংহ থেকে একটি সেনাদল এসে জয়দেবপুরের চৌরাস্তার কাছাকাছি এসে অবস্থান নেয়। অপরপে সাভার থেকে একটি সেনাদল গিয়ে জয়দেবপুরের চৌরাস্তার কাছে অবস্থান নেয়। সাভার থেকে যারা যায় তারা রাষ্ট্রপতির প্রতি অনুগত আর ময়মনসিংহ থেকে যারা আসে তারা সেনাবাহিনী প্রধানের প্রতি অনুগত। কিন্তু সরেজমিন যেসব কর্নেল, ব্রিগেডিয়ার উপস্থিত ছিলেন তাদের উপস্থিত বুদ্ধির কারণে সৈন্যবাহিনী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়নি। আর বাংলাদেশ একটি রক্তয়ী সংঘর্ষ থেকে পরিত্রাণ পায়। সে দিনের উত্তেজনাময় মুহূর্তটি বাংলার আকাশ বাতাসকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। কোনো এক অছিলায় আমরা মুক্তি পেয়ে প্রাণে বেঁচে যাই এবং মুক্তি লাভ করি এই নিজেদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ধরে রাখতে। এ বিষয়ে পরবর্তীকালে আরো লিখব কিভাবে মুক্তি পেলাম, কারা সে দিন এমন সংঘর্ষটি ঘটানোর পাঁয়তারা করেছিল? কী ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য এবং কোন দিকে দেশটিকে ঠেলে দিতে চাইছিল সে দিন তারা?
লেখক : গবেষক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক
লেখাটি শুরু করছি দু’টি বিষয় দিয়ে। যথা : গত কলামে লেখা ১৯৯৬ সালে পরিকল্পিত সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টা এবং গত সপ্তাহে রথী-মহারথীদের বাংলাদেশ সফরের তাৎপর্য নিয়ে। প্রথমে বলতে চাই ইতঃপূর্বে বাংলাদেশ নামের দেশটিতে পদধূলি দিয়ে গেলেন বিশ্বের তিন মতাধর রাষ্ট্রের ভিআইপি তিন ব্যক্তি। এসব ভিআইপির বাংলাদেশ সফর নিয়ে টেলিভিশন এবং প্রিন্ট মিডিয়াগুলোতে প্রচুর আলাপ-আলোচনা-সমালোচনার জোয়ার বয়ে গেছে। দেশের বিভিন্ন কলামিস্ট এবং বুদ্ধিজীবী মহল তাদের কলামে এদের সফরের তাৎপর্যকে নিজস্ব মতবাদ ও তাত্ত্বিক চিন্তা-চেতনা এবং বিশ্বাসের জায়গা থেকে নানা আঙ্গিকে জনসমক্ষে তুলে ধরতে চেষ্টা করেছেন। সর্বোপরি সবাই এরূপ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, (যার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ) বাংলাদেশে সরেজমিন প্রাপ্তি চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট, সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতির উদ্ভব এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের বিষয়টিকে গুরুত্বারোপ করে সুরাহার তাগিদ সংক্রান্ত উদ্বেগ প্রসঙ্গে জোর দিয়েছেন।
প্রথমে মূল্যায়ন করি এশিয়াভুক্ত দেশ জাপানের বিষয়টি। জাপান বাংলাদেশের প্রধান ডেভেলপমেন্ট পার্টনার বা উন্নয়ন অংশীদারী দেশ তথা বৈদেশিক ঋণ অথবা অফেরতযোগ্য ঋণসহায়তা দিয়ে বাংলাদেশকে গত ৪০টি বছর সবচেয়ে বেশি সাহায্য-সহযোগিতা করে আসছেন। উদার বন্ধুপ্রতিম এ রাষ্ট্রটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয় নিয়ে কখনো উচ্চবাচ্য কিংবা হস্তপে করেনি। কিন্তু ব্যতিক্রম ২০১২ সাল!!! অর্থনৈতিক উন্নয়নে অতি সমৃদ্ধ এ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে যাওয়া নিয়ে ১৯৬৫ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি সম্মান বিভাগে জাপানের উন্নয়নকে একটি ‘কেস স্টাডি’ হিসেবে পড়ানো হতো। এ মুহূর্তে জাপানের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে সারা বিশ্ব গবেষণারত, বলা চলে জাপান উন্নত বিশ্বের মধ্যেও উন্নততর। অথচ জাপান আমাদের এশিয়াভুক্ত দেশ। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকেরও সদস্যভুক্ত রাষ্ট্র। জাপানকে তেল, গ্যাস আমদানি করতে হয় আবার বিনিয়োগও করতে হয়। এতদসত্ত্বেও তারা মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নিকটতম রাষ্ট্র কিংবা আধা নিকটতম রাষ্ট্রের প্রতিবেশীদের প্রতি অতি আন্তরিক। কিন্তু উদার বন্ধুত্বপূর্ণ এ রাষ্ট্রের উপপ্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে এসে বলে গেলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের সাথে বাংলাদেশের বৈরিতা অথবা মতের পার্থক্য দূর না হওয়া পর্যন্ত পদ্মা সেতুতে জাপান কোনোরূপ অর্থায়নের জোগান দেবে না এমনকি এক বিন্দুও জাপান এতে সহায়তা দেবে না। এতে প্রমাণিত হয়, পদ্মা সেতুর অর্থ কেলেঙ্কারিতে বাংলাদেশ সরকারের জড়িত থাকার বিষয়ে বিশ্বব্যাংক যে অবস্থান নিয়েছে তা সঠিক সিদ্ধান্ত এবং বাংলাদেশ অহেতুক বিশ্বব্যাংকের সাথে যে তর্কে লিপ্ত হয়েছে তা ভুল ছিল। একটু আগে বললাম যে, জাপান কোনো দিন বাংলাদেশের কোনো বিষয়ে মন্তব্য কিংবা হস্তপে করেনি কিন্তু বড় দুঃখের বিষয় ২০১২ সালে এসে জাপান কেন এত বড় মন্তব্য করল? একটা কথা বলার অবকাশ থাকে যে, দুর্নীতির ব্যাপারে তারা সরাসরি মন্তব্য করেননি। তারা এত কম বুদ্ধিমান নয় যে, দুর্নীতির বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করে তাদের মূল্যায়ন কমাতে চান।
অন্য দিকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশে এসেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫০তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনের সমাপনী অনুষ্ঠানের অতিথি হিসেবে মঞ্চ আলোকিত করার জন্য কিংবা ছদ্মবেশে। অর্থাৎ তিনি ভারত-বাংলাদেশ উভয় সরকারের মধ্যে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সংলাপ কিংবা সীমান্তে বিএসএফের হাতে নিরীহ বাংলাদেশীদের হত্যার কোনোরূপ সমস্যার সমাধানের বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করতে তিনি বাংলাদেশে আসেননি। তিনি বাংলাদেশে এসেছেন যেহেতু কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রিপরিষদে বাঙালির সংখ্যাগরিষ্ঠতা কম। এ ছাড়া তিনি কেন্দ্রীয় সরকার ও কংগ্রেসের অন্যতম প্রবীণ নেতা তাই বর্তমান সরকারের কাছের লোক হিসেবে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির দেখভাল করার দায়িত্ব তার ওপরই বর্তায়। প্রণব মুখার্জি নতুন করে কোনো বিষয়ে আমাদের আশার বাণী শোনাতে পারেননি এবং কোনো বিষয়ে আঘাতও দেননি। বাংলাদেশের সাথে ভারতের যে বিষয়গুলো নিয়ে এযাবৎ চুক্তি হয়েছে সেগুলোর বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি পাশাপাশি তিস্তা চুক্তি, সীমান্তে বাংলাদেশীদের নির্বিচারে হত্যা, করিডোর, ট্রানজিটসহ ঝুলে থাকা চুক্তিগুলো নিয়ে সঙ্ঘাত এবং সঙ্কটময় বিষয়াদির সুরাহা প্রসঙ্গে কোনো আলোচনা করেননি। তবে যে দিকটি নজর কাড়ার মতো তা হলোÑ তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাাৎ করার পাশাপাশি বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার সাথেও সাাৎ করেছেন। অন্য দিকে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি আশার আলো জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন এই মর্মে, ‘ভারতের জনগণ বাংলাদেশের জনগণের সাথে বন্ধুত্ব চায় কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি কিংবা দলের সাথে নয়।’
প্রণবের এ বক্তব্য নিয়ে দু’টি কথা বলি। এটি চিরাচরিতভাবে বিশ্বের সবাই জানে যে, বর্তমান শাসক দল তথা আওয়ামী লীগ তাদের জন্মলগ্ন থেকে ভারতকে অতি মনেপ্রাণে বন্ধু ধরে নিয়েছে, ভারতের প্রতি তারা অত্যন্ত দুর্বল এবং ভারতবান্ধব সরকার হিসেবে তারা পরিচিতি লাভ করছে। অন্য দিকে ভারতও অপ্রত্যাশিত ও সীমাহীন এবং ওতপ্রোতভাবে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। এই ভারতের মাটিতেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী পাঁচটি বছর নিরাপদ আশ্রয়ে ছিলেন গত পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়কালে, পাশাপাশি আওয়ামী লীগের আরো অনেক নেতাকর্মীর মূল আশ্রয় কেন্দ্রের স্থান হিসেবে ভারতের মাটিকে উপযুক্ত মনে করে গত দশকের শুরুর দিকে সেখানে অবস্থান নিয়েছেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত বাংলাদেশকে সাহায্য-সহযোগিতা করেছে তাই তাদের সাথে একটা নিবিড় বন্ধুত্ব গড়ে উঠবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু সে বন্ধুত্বের মাত্রা কত দূর? বন্ধুত্বের মাত্রা রা করতে গিয়ে কি ১৬ কোটি বাংলাদেশীর স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থ বিসর্জন দিতে হবে? একটি বিষয় জানা আমাদের সবার জরুরি, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে সাহায্য-সহযোগিতার পেছনে ভারতেরও স্বার্থ বিদ্যমান ছিল। এ ছাড়া ভারত যদি মনে করে গত ৪০টি বছর যাবৎ আওয়ামী লীগ ছাড়া বাংলাদেশে চিন্তা-চেতনা করার মতো অন্য কোনো রাজনৈতিক দল নেই, তাহলে ভারত ভুল করবে। আমরাও ধরে নিয়েছিলাম ভারত জেনেশুনে ভুলই করে যাচ্ছে কিন্তু না, এ সফরে প্রণবের কথা শুনে মনে হলো তারা না বুঝে আগে ভুল করলেও এখন তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। আবার এমনও হতে পারে বাংলাদেশের মানুষকে সন্তুষ্ট করতে তিনি তার মুখের বাক্যটি দিয়ে গেলেন কিন্তু অন্তরে ঠিকই তার ল্য ও উদ্দেশ্য ভিন্ন। যা হোক ঠিক সময় বোঝা যাবে তার কথাটি কতটা যুক্তিযুক্ত। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে নানা ছোটখাটো সমস্যা বিদ্যমান। এগুলো সমাধানে তারা কাজ করে যাচ্ছে। অন্য দিকে কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ওপর প্রভাব বিস্তার করতে অম। যে কারণে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের মধ্যে বিরাজমান কয়েকটি ইস্যু মমতা ব্যানার্জির সদিচ্ছার ওপর নির্ভর হয়ে পড়েছে, যেগুলো চাইলেই কেন্দ্রীয় সরকার সমাধান করতে পারছে না। ভারতের অনেক প্রদেশ রয়েছে তবে তার মধ্যে আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরামÑ এ চারটি প্রদেশ অতি গুরুত্বপূর্ণ। যদিও আমরা মনে করি বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক উন্নয়নে কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবিকপে আমাদের সম্পর্ক উন্নয়ন ও সাহায্য-সহযোগিতা এবং ঝুলে থাকা চুক্তিগুলোর সমাধান নির্ভর করছে এই প্রদেশগুলোর মন্ত্রী-মুখ্যমন্ত্রী এবং জনগণের ওপর। তার প্রমাণ আমরা পেয়েছি ১৯৭১ সালে সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধের সময় এই প্রদেশগুলোই আমাদের ওতপ্রোতভাবে সহযোগিতা করেছে। হরিয়ানা কিংবা তামিলনাড়– সে দিন আমাদের সাহায্য-সহযোগিতা করেনি। প্রণব বাবুর সফরের পরপরই নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল জেসিসির মিটিং। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে মনমোহন সিং বাংলাদেশে আসার পর জেসিসি গঠিত হয়েছিল; তার প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। বৈঠকের ফলাফল পত্রপত্রিকায় এসেছে; শুধু শূন্য ফল বললে ভুল হবে আবার এক বললেও ভুল হবে। শূন্য এবং এক সংখ্যার মধ্যস্থ যেকোনো একটি একক আমরা গণনা করতে পারি আর এটি হলো সেই জেএসসির ফলাফল। তার পরও আশা করতেই থাকব কারণ যে ফ্রেম ওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট সেপ্টেম্বর মাসে করা হয়েছে সেটাই হচ্ছে নীল আকাশ অর্থাৎ নীল আকাশের নিচে পৃথিবীর হেন জায়গা নেই যেটি ছায়া পাচ্ছে না তদ্রƒপ ফ্রেম ওয়ার্ক এগ্রিমেন্টের আওতায় এমন কোনো হেন জিনিস নেই যেটিকে বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যকার নিরূপণ করা সম্ভব নয়, শর্ত হচ্ছে যদি ভারত চায়।
এবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি কিনটনের বাংলাদেশ সফরটির দিকে তাকাই যা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং উচ্চমাত্রার। দু’টি দেশই চেয়েছেন সর্বোচ্চ সুযোগটিকে কাজে লাগাতে তবে এ সফরটি হওয়ার কথা ছিল আরো কিছু দিন আগে। তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন ২০ ঘণ্টার জন্য কিন্তু তার বক্তব্য ছিল বাংলাদেশের জন্য পাঁচ বছরের দিকনির্দেশনা। বাংলাদেশ ও মার্কিন সম্পর্কের মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উদ্ভাসিত হয়েছে। সেগুলো হলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কিছু কিছু বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যভাবে ভূমিকা রাখেÑ ক. যেমন গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রমের কী হওয়া উচিত; খ. দেশের প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দলের ভূমিকা কী হওয়া উচিত; গ. কোন প্রক্রিয়া অবলম্বন করলে রাজনৈতিক সঙ্কট ও চলমান সমস্যার সমাধান হতে পারে; ঘ. কোন ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্বাচন হলে অবাধ সুষ্ঠু নিরপে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পাবে আবার এটাও বোঝা গেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি প্রলোভিত এবং আমাদের দেশে মাটির ওপরে-নিচে যে পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদই থাকুক না কেন, আরো বেশি আবিষ্কারের সম্ভাবনায় তারাও বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। ইতঃপূর্বে সমুদ্রসীমা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদের মাত্রা বেড়ে গেছে। তবে হিলারি কিনটনের সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের মঙ্গল ও কল্যাণের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহানুভূতির কথা প্রকাশ পেয়েছে সেটা আন্তরিক হোক বা লৌকিকতামূলক হোক সে েেত্র ইতিবাচক মন্তব্যই বাঞ্ছনীয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃৃথিবীব্যাপী তাদের প্রভাব বিস্তারের ত্রেকে ক্রমেই পরিবর্তন করছেন; বর্তমানে সোভিয়েত রাশিয়াকে কৌশলগত শত্র“ হিসেবে বিবেচনায় নেয় না যেমনটি নিয়েছিল ১৯৮৯ সালের আগে। নতুনভাবে তারা শত্র“ হিসেবে অন্য রাষ্ট্রের দিকে মনোনিবেশ করেছেন এবং এসব প্রতিদ্বন্দ্বী শত্র“ রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনার জাল বুনে বসে আছেন। অপর দিকে মিত্র রাষ্ট্রও খুঁজে বেড়াচ্ছেন। এ দিকটি বিবেচনা করলে দণি এশিয়ার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হলো ভারত আর ভারতের কাঁধে অস্ত্র রেখে তারা বাংলাদেশকে মিত্র বানাতে চায়। বাংলাদেশকে তারা যতই গুরুত্ব দিচ্ছে, বাস্তবে তাদের অন্তরে এবং কাগজে-কলমে অতি কিঞ্চিৎ বলে আমার অনুভূতি বা মূল্যায়ন। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিকে নিয়ে রাত-দিন পড়ে থাকার মতো সময়ও তাদের হাতে নেই তাই বাংলাদেশের দেখভাল করার দায়িত্ব দিচ্ছে ভারতকে, তবে শতভাগ না হলেও বেশির ভাগ।
দুই.
১৯৯৬ সালের মে মাসের ১৮ তারিখের ঘটনা গত সপ্তাহে প্রকাশিত কলামটি যদি কেউ না পড়ে থাকেন তাহলে নয়া দিগন্তের ওয়েবসাইটে গিয়ে কলামটি পড়তে পারবেন এটা তার চলমান অংশ। ১৮ মে ১৯৯৬ সালের দিকে ফিরে তাকালে দেখতে পাই সে দিন বাংলাদেশের সেনাবাহিনী প্রধান আবু সালেহ মুহাম্মদ নাসিম টাঙ্গাইলে একটি ঘূর্ণিঝড়কবলিত এলাকা পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। হঠাৎ করে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় আক্রান্ত মানুষের মধ্যে ত্রাণতৎপরতা চলছে তাই তিনি দেখতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরে এসে তেজগাঁও পুরনো বিমানবন্দরে হেলিকপ্টার থেকে নেমেই তিনি সংবাদ পেলেন দু’জন অফিসারের অবসরপ্রাপ্তির আদেশ। সে দিন জেনারেল নাসিমকে একটি সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল, তিনি কি বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত এই অবসর আদেশ মেনে নেবেন? না মেনে নেবেন না? বাংলাদেশ সরকার বাধ্যতামূলক অবসর আদেশ প্রদান করেছিল বগুড়ার জিওসি মেজর জেনারেল গোলাম হেলাল মোরশেদ খান এবং তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলসের উপমহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার মিরন হামিদুর রহমান। জেনারেল নাসিমের মনে সম্ভবত অনেকগুলো প্রশ্ন ছিল। স্বাভাবিক অবস্থায় যেকোনো সেনাবাহিনীর প্রধান সরকারের এই আদেশকে মেনে নেবেন। জেনারেল নাসিমের আগে-পরে যারাই সেনাপ্রধান হিসেবে এসেছেন তারা সবাই এরূপ আদেশ মেনে নিয়েছেন। কিন্তু জেনারেল নাসিম চিন্তা করলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমান এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস এই বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করে কী বার্তা অলিখিতভাবে প্রদান করছেন? শুভাকাক্সী এবং পরামর্শদাতারা তাকে বুঝালেন, হেলাল মোরশেদ আপনার প্রিয়তম জেনারেল তাকে অবসর প্রদান করে সরকার বোঝাতে চাচ্ছে তারা আপনার ওপর অসন্তুষ্ট এবং এরপর আপনার অন্যান্য প্রিয় ব্যক্তিকে অবসর প্রদান করা হবে এবং সবিশেষ আপনাকেও অবসরে পাঠিয়ে দিতে পারে। লিখিতভাবে না এলেও অলিখিতভাবে আলোচনায় প্রশ্ন উঠল কেন জেনারেল হেলাল মোরশেদকে অবসরে পাঠানো হবে? তার সহজ উত্তর ছিল এরূপÑ তারা সরকারের বিরুদ্ধাচরণ করে অশোভন কথা বলে সমালোচনা করেছেন যাতে জেনারেল নাসিমেরও পৃষ্ঠপোষকতা ছিল বলে তাদের বিশ্বাস। আইনের দিক থেকে হঠাৎ করে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়াটিতে কিঞ্চিৎ ত্র“টিপূর্ণ ছিল এটা বাস্তব। জেনারেল আবু সালেহ মুহাম্মদ নাসিম (বীরবিক্রম) তার প্রিয়তম জেনারেল গোলাম হেলাল মোরশেদ খানের বাধ্যতামূলক অবসর আদেশটিকে স্বস্তির সাথে গ্রহণ করতে পারেননি। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন এটি তিনি মান্য করবেন না। ১৯ তারিখ সারা দিন এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা, গবেষণা-সমালোচনার কোনো কমতি ছিল না। তার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মধ্যে যারা ঢাকায় আছেন তাদের সাথে মুখোমুখি আর যারা ঢাকায় নেই তাদের সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করছিলেন। সর্বোপরি তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি এই অবসরের প্রতিবাদ করবেন আইনানুগভাবে। এই প্রতিবাদের অংশ হিসেবে তিনি সরকারের কাছে চিঠি লিখলেন। দ্বিতীয় একটি বিষয় পরবর্তীকালে আবিষ্কার হয় যখন প্রতিবাদ করছিলেন তখন জেনারেল নাসিম বুঝতে পারেননি যে, দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি বিরাজ থাকার কারণে প্রতিরা মন্ত্রণালয়টি রাষ্ট্রপতি বিশ্বাসের আওতার অধীনে আছে। ১৯ তারিখ সকালবেলা জেনারেল নাসিম রাষ্ট্রপতি বিশ্বাসের সাথে দেখা করতে বঙ্গভবনে ছুটে যান সেখানে জেনারেল নাসিম রাষ্ট্রপতির কাছে মৌখিক প্রতিবাদ জানান এবং বাধ্যতামূলক অবসর আদেশ প্রত্যাহার করতে অনুরোধ করেন। রাষ্ট্রপতি বিশ্বাস তার এই বক্তব্যে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। পরিস্থিতি ঠিক এ রকম : বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি যিনি সংবিধান মোতাবেক দেশের এবং সরকারের প্রধান ঠিক ওই মুহূর্তে তিনি আদেশ করছেন দু’জন ব্যক্তিকে অবসরে যাওয়ার জন্য, অপর পে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান চাচ্ছেন তারা অবসরে না যাক। এই বিপরীতমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক মনোভাব থমথমে একটি উত্তেজনার সৃষ্টি করে। সংঘর্ষের দিক থেকে এটাকে আমরা সাংবিধানিক সংঘর্ষ, আধা রাজনৈতিক সংঘর্ষ কিংবা আধা কমান্ড সংশ্লিষ্ট সংঘর্ষ বলতে পারি। এরূপ পরিস্থিতি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ইতঃপূর্বে কখনো ঘটেনি, এযাবৎকালেও কখনো হয়নি।
এরপর আসে ২০ মে। যে উত্তেজনার ঘটনাটিকে কথা বা মুখে কিংবা লিখে বোঝানো যাবে না তা হলো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৯-২০ মে সময়কালটা ছিল কাগজে-কলমে ওপরে ওপরে সব ঠিকঠাক ও স্বাভাবিক। বাস্তবে সব কিছু ছিল উল্টোপাল্টা এবং অস্বাভাবিক সঙ্ঘাতময় উত্তেজনাপূর্ণ। পুরো সেনাবাহিনী প্রায় দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। এক দিকে বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতি জনাব বিশ্বাসের প্রতি অনুগত একটি দল অপর দিকে জেনারেল নাসিমের প্রতি অনুগত একটি দল। সেনাবাহিনী প্রধান ঢাকার বাইরে থেকে সৈন্যদের ঢাকা আসার জন্য আদেশ করেছিলেন। এ আদেশের পেছনে উছিলা ছিল ঢাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে এই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে সামাল দেয়ার জন্য অতিরিক্ত সৈন্য প্রয়োজন। সমগ্র বাংলাদেশে নয়, ঢাকার অদূরে ময়মনসিংহ থেকে একটি সেনাদল এসে জয়দেবপুরের চৌরাস্তার কাছাকাছি এসে অবস্থান নেয়। অপরপে সাভার থেকে একটি সেনাদল গিয়ে জয়দেবপুরের চৌরাস্তার কাছে অবস্থান নেয়। সাভার থেকে যারা যায় তারা রাষ্ট্রপতির প্রতি অনুগত আর ময়মনসিংহ থেকে যারা আসে তারা সেনাবাহিনী প্রধানের প্রতি অনুগত। কিন্তু সরেজমিন যেসব কর্নেল, ব্রিগেডিয়ার উপস্থিত ছিলেন তাদের উপস্থিত বুদ্ধির কারণে সৈন্যবাহিনী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়নি। আর বাংলাদেশ একটি রক্তয়ী সংঘর্ষ থেকে পরিত্রাণ পায়। সে দিনের উত্তেজনাময় মুহূর্তটি বাংলার আকাশ বাতাসকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। কোনো এক অছিলায় আমরা মুক্তি পেয়ে প্রাণে বেঁচে যাই এবং মুক্তি লাভ করি এই নিজেদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ধরে রাখতে। এ বিষয়ে পরবর্তীকালে আরো লিখব কিভাবে মুক্তি পেলাম, কারা সে দিন এমন সংঘর্ষটি ঘটানোর পাঁয়তারা করেছিল? কী ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য এবং কোন দিকে দেশটিকে ঠেলে দিতে চাইছিল সে দিন তারা?
লেখক : গবেষক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন