শুক্রবার, ১১ মে, ২০১২

দৃশ্যপটে আবারও বিদেশীরা



আহমদ আশিকুল হামিদ : 
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আবারও বিদেশীদের তৎপরতা বেড়ে চলেছে। যেন একই বিশেষ কেন্দ্রে বসে সুচিন্তিত আয়োজনের মাধ্যমে নেমে পড়া- এমনভাবেই দৃশ্যপটে আসতে শুরু করেছেন তারা। পরামর্শের আড়ালে আবারও নিজেদের নির্দেশনা উপস্থাপন করতে দেখা যাচ্ছে তাদের। রাজনৈতিক সংকট ও আগামী জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে তো বলছেনই, গুম-খুন থেকে দুর্নীতি পর্যন্ত কোনো বিষয়ই বাদ পড়ছে না। এই সুযোগ যে তারা আওয়ামী লীগ সরকারের বদৌলতে পেয়েছেন সে কথা নিশ্চয়ই উল্লেখের অপেক্ষা রাখে না। জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে আসলে দেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কিত দুশ্চিন্তার পরিপ্রেক্ষিতে। কারণ, নিকট অতীতেও দেখা গেছে, বিদেশীরা তখনই দৃশ্যপটে এসে থাকেন, দেশ যখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। তাছাড়া বিদেশীদের প্রকাশ্য তৎপরতার পরিণতি কখনো ভালোও হয়নি।
কাকে রেখে তথা কোন দেশকে রেখে কোন দেশের কথা দিয়ে শুরু করবেন আপনি? কারণ, একমাত্র গণচীন ছাড়া বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সব দেশই এরই মধ্যে দৃশ্যপটে এসে গেছে। চীন ব্যতিক্রম এজন্য যে, এ দেশটিকে সাধারণত বাংলাদেশের রাজনীতির ব্যাপারে প্রকাশ্যে কিছু বলতে বা করতে দেখা যায় না। বাকি দেশগুলো অর্থাৎ ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তো বটেই, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাইনবোর্ডকে সামনে রেখে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালি পর্যন্ত প্রত্যেকেই যার যার মতো বক্তব্য রাখতে ও জোর তৎপরতা চালাতে শুরু করেছে। প্রথমে সবশেষে আগত দেশগুলোর কথাই বলা যাক। গুম-খুন, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক সংকটসহ বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। গত ৯ মে ছিল বাংলাদেশের সঙ্গে ইইউ-এর সম্পর্কের ৪০তম বার্ষিকী। ইউরোপ ডে'ও ছিল সেদিন। এ উপলক্ষে রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকায় নিযুক্ত ইউ-এর ১৩ জন রাষ্ট্রদূত গুম-খুন, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক সংকট ও সহিংসতা নিয়ে অভিন্ন ভাষায় কথা বলেছেন, সমাধানের পরামর্শ দিয়েছেন। প্রতিদিন পত্রিকা খুললেই যে দুর্নীতি এবং গুম-খুনের খবর চোখে পড়ে সে কথা তারা বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গেই বলেছেন। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর গুম এবং গার্মেন্ট শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের হত্যাকান্ডের উদাহরণ দিয়েছেন। বলেছেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংকটও ঘনীভূত হচ্ছে। তাদের স্পষ্ট অভিমত ছিল, সব মিলিয়েই বিদেশে অর্থাৎ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ইমেজ দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নেতিবাচক এই ইমেজের কারণে বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগ আসছে না। যারা বিনিয়োগ করেছেন তারাও তাদের অর্থ অন্য কোনো দেশে সরিয়ে নিতে চাচ্ছেন। অনেকে নিচ্ছেনও। রাষ্ট্রদূতরা তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন বিশেষ করে সর্বব্যাপী দুর্নীতির বিরুদ্ধে।  বলেছেন, এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে দুর্নীতি সীমা ছাড়িয়ে না গেছে। দুর্নীতির প্রশ্নে ইইউ ‘জিরো টলারেন্স' দেখাবে বলেও ঘোষণা করেছেন রাষ্ট্রদূতরা। অর্থাৎ কোনোভাবেই দুর্নীতিকে সহ্য করবে না ইউরোপের দেশগুলো। রাষ্ট্রদূতরা গুম ও খুনের ব্যাপারে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর গুম এবং শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের হত্যাকান্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার না হলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য বিক্রি কঠিন হয়ে পড়বে। বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত রফতানির মতো অনেক সুবিধা হারিয়ে বসবে। রাজনৈতিক সংকট প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূতরা বলেছেন, সংকট কাটিয়ে ওঠার এবং আগামীতে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে সংসদের ভেতরে অথবা বাইরে সংলাপে বসতে হবে।
ইইউ-এর রাষ্ট্রদূতদের বক্তব্য দিয়ে শুরু করার কারণ সম্ভবত উল্লেখের দরকার পড়ে না। সাধারণ মানুষ না জানলেও সত্য হলো, ইউরোপের দেশগুলো বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান অংশীদার। ঋণ ও সাহায্যেরও বিরাট একটি অংশ আসে এই দেশগুলো থেকেই। সুতরাং তাদের কথা নিয়ে হেলাফেলা করা যায় না। লক্ষণীয় যে, রাষ্ট্রদূতদের বক্তব্যে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে দুর্নীতি এবং গুম-খুনসহ সহিংসতার দিকগুলো। বাংলাদেশের উন্নয়নের সঙ্গে ইইউ-এর যেহেতু ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এবং ইইউ সহযোগিতা বন্ধ করলে দেশকে যেহেতু সর্বাত্মক বিপদে পড়তে হবে সেহেতু রাষ্ট্রদূতদের কথাগুলোকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া দরকার। কোনো প্রসঙ্গেই তারা কিন্তু সামান্য বাড়িয়ে বলেননি। দুর্নীতি আগেও হয়েছে কিন্তু বর্তমান সরকারের আমলে দুর্নীতি ছড়িয়ে গেছে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে। জড়িয়ে পড়েছেন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টারা পর্যন্ত। অন্য কারো কারো নামও এসে যাচ্ছে, যাদের মধ্যে দু-চারজন আবার বিদেশে বসবাস করেন। পদ্মা সেতুর মতো অনেক ক্ষেত্রেই দুর্নীতির খেসারত দিতে হচ্ছে সমগ্র জাতিকে। গার্মেন্টসের বিপুল অর্ডার স্থগিত ও বাতিল হয়ে যাচ্ছে। অন্যান্য পণ্যের রফতানির সঙ্গে বিশেষ করে জনশক্তি রফতানি কমে যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশে প্রতিদিন চাকরি হারাচ্ছে হাজার হাজার শ্রমিক। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথও সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
এদিকে বিদেশী বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার আসল কারণও দুর্নীতি। উদ্বেগের কারণ হলো, আগে শুধু সমালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ইইউ-এর রাষ্ট্রদূতরা এবারই প্রথমবারের মতো দুর্নীতির ব্যাপারে ‘জিরো টলারেন্স' দেখানোর ঘোষণা দিয়েছেন। এর অর্থ এবং অনিবার্য পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চয়ই বিস্তারিত বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন পড়ে না। বিদেশী বিনিয়োগই যথেষ্ট নয়, বিদেশী সাহায্যও বাংলাদেশের দরকার। কারণ, বিনিয়োগ করলেও বিদেশীরা লাভের অর্থ নিজেদের দেশে নিয়ে যায়। অন্যদিকে শিল্পকারখানার বিকাশ ঘটেনি বলে দেশের ভেতরে কর্মসংস্থান যেমন হতে পারে না তেমনি বাধাগ্রস্ত হয় অবকাঠামোসহ উন্নয়ন কর্মকান্ড। কারণ সরকারের হাতে টাকা থাকে না। বেতন-ভাতা দিতেই ট্যাক্সের অর্থ শেষ হয়ে যায়। এজন্যই বিদেশী সাহায্য ছাড়া বিশেষ করে উন্নয়ন কর্মকান্ড চালানো সম্ভব নয়। কিন্তু এখানেও দুর্নীতিই প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে উঠেছে। কারণ, সাহায্যদাতা দেশগুলোকে তাদের ট্যাক্সদাতা জনগণের কাছে প্রতিটি টাকার জন্য পাই পাই করে কৈফিয়ত দিতে হয়। সে জনগণ যখন দুর্নীতির পাশাপাশি গুম-খুন ও সহিংসতার খবর জানতে পারে তখন আর কোনো দেশের সরকারের পক্ষেই বাংলাদেশকে সাহায্য দেয়া সম্ভব হয় না। এটাই কঠিন সত্য। এজন্যই ইইউ-এর রাষ্ট্রদূতরা দুর্নীতির মূলোচ্ছেদ করার তাগিদ দিয়েছেন। একই কঠোরতার সঙ্গে বলেছেন গুম ও খুনের বিরুদ্ধেও। রাজনীতির ব্যাপারে তারা অবশ্য যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার এবং নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাব দেয়ার পরিবর্তে রাষ্ট্রদূতরা সরকার ও বিরোধী দলকে সংলাপে বসার তাগিদ দিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে তারা কিন্তু বুঝিয়ে দিয়েছেন, বিরোধী দলগুলোকে বাইরে রেখে আয়োজিত কোনো একতরফা নির্বাচন ইইউ-এর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।
মূলত রাজনৈতিক সংকটের প্রশ্নেই প্রাধান্যে এসেছে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভিমতও। মাত্র ক'দিন আগে, গত ৫ মে ঢাকায় এসেছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন এবং ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি। এমন এক সময়ে তারা এসে হাজির হয়েছিলেন যখন বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে গুম করার প্রতিবাদে সারাদেশে তুমুল আন্দোলন চলছিল। মাঝখানে পাঁচদিন সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়েছে, পুলিশকে দিয়ে নেতাকর্মীদের পেটানো হয়েছে যথেচ্ছভাবে। গ্রেফতার তো করা হয়েছেই, নারী নেত্রীর শরীরে পর্যন্ত নির্যাতনের অসংখ্য দগদগে চিহ্ন পাওয়া গেছে। উচ্চ আদালতে জামিন না পাওয়ায় নেতাদের তখন পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছিল। এমন এক অবস্থার মধ্যেই এসেছিলেন হিলারি ক্লিনটন এবং প্রণব মুখার্জি। দু'জনের মধ্যে বেশি অবাক করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। কারণ, গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহম্মদ ইউনূসকে কেন্দ্র  করে ঢাকা ও ওয়াশিংটনের সম্পর্কে সৃষ্ট তিক্ততার পরিপ্রেক্ষিতে শোনা গিয়েছিল, ড. ইউনূসের সমস্যা না মেটা পর্যন্ত হিলারি ক্লিনটন বাংলাদেশে আসবেন না। কিন্তু দৃশ্যত সে সমস্যা না মিটলেও হিলারি ক্লিনটন ঢাকা সফর করে গেছেন। হিলারি ক্লিনটনের সফরকেন্দ্রিক আলোচনায় বেশি গুরুত্ব পেয়েছে তার কিছু পরামর্শ এবং মন্তব্য। যেমন অব্যাহত গুমের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গুম চলতে পারে না। চলমান রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকার এবং বিরোধীদলের মধ্যে সংলাপ অনুষ্ঠানেরও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। হিলারি ক্লিনটন স্পষ্ট ভাষাতেই জানিয়ে দিয়েছেন, সব দল অংশ না নিলে তেমন কোনো নির্বাচনকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করবে না। বিরোধী দলীয় নেত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার বাসভবনে গিয়ে সাক্ষাৎ করার মধ্য দিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাবের প্রকাশ ঘটিয়েছেন তিনি।
বস্তুত ঢাকা-ওয়াশিংটন পার্টনারশিপ ডায়ালগ বিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষরের বাইরে হিলারি ক্লিনটনের খুব কম তৎপরতাই রয়েছে যেগুলোকে সরকারের জন্য সমর্থন হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ অনুষ্ঠান ও আগামী নির্বাচনে সব দলের অংশ গ্রহণকে নিশ্চিত করার তাগিদ এসেছে হিলারি ক্লিনটনের সারকথা হিসেবে। এর মধ্য দিয়ে হিলারি ক্লিনটন প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতাসীনদের হতাশই করে গেছেন। কারণ, নির্বিচারে দমন-নির্যাতন চালানোর এবং মিথ্যা মামলা চাপানোর মাধ্যমে তারা এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন যাতে বিশেষ করে বিএনপিসহ প্রধান কোনো বিরোধী দলই নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে। পাশাপাশি কেয়ারটেকার সরকারের ব্যাপরটি তো রয়েছেই। এ প্রসঙ্গে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার দাবি জানিয়ে বেগম জিয়া সরকারের জন্য আগেই চমৎকার সুযোগ তৈরি করেছেন। কিন্তু সরকার হাঁটছে নিজের ইচ্ছা মতো। এখানেই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন হিলারি ক্লিনটন। যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট করতে হলে সরকারকে এখন শুধু সংলাপে বসলেই চলবে না, নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা নিয়েও বিরোধী দলের দাবি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। নাহলে বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ নেবে না; আর সব দল অংশ না নিলে তেমন কোনো নির্বাচন ও তার ফলাফলকে তথা নতুন সরকারকে মেনে নেবে না যুক্তরাষ্ট্র। এটাই সহজ হিসাবের কথা। সুতরাং বলা যায়, হিলারি ক্লিনটন সরকারকে বিপদের মধ্যে ঠেলে দিয়ে গেছেন।
ওদিকে প্রণব মুখার্জিও কম যাননি। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার উদ্দেশ্যে এলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং জনাকয়েক মন্ত্রী ও উপদেষ্টার পাশাপাশি বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি। এসব উপলক্ষে রাজনৈতিক প্রশ্নে প্রণব মুখার্জি বলেছেন, তার দেশ বাংলাদেশে একতরফা নির্বাচন চায় না এবং ভারত কোনো দলবিশেষের সঙ্গে নয় বরং বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে সুসম্পর্ক চায়। প্রণব মুখার্জির এই মন্তব্য নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক পর্যালোচনা চলছে। অর্থমন্ত্রী হলেও প্রণব মুখার্জিকে গুরুত্ব দেয়ার বিশেষ কারণ হলো, ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকান্ডকেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহসহ বিভিন্ন উপলক্ষে পরিষ্কার হয়েছে, যখন যে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেই থাকুন না কেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি তিনিই দেখাশোনা করেন। সে দিক থেকে প্রণব মুখার্জিকে ভারতের বাংলাদেশ বিষয়ক মন্ত্রী বলা যায়। বাংলাদেশের রাজনীতি ও জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রণব মুখার্জি অবশ্য মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারেননি। কারণ, তিনি শুধু একতরফা নির্বাচন চান না বলেই থেমে গেছেন, বিস্তারিত আলোচনায় যাননি। অথচ সত্যি সদিচ্ছা থাকলে প্রণব মুখার্জি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশে পরামর্শ দিয়ে যেতেন। বলতেন, প্রধানমন্ত্রী যেন বিরোধী দলের দাবি মেনে নেন এবং তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের আয়োজন করেন। ‘দাদা' প্রণব মুখার্জিকে যথেষ্ট মান্য ও সমীহ করেন বলেই তিনি বললে শেখ হাসিনা সম্মত না হয়ে পারতেন না। কিন্তু আসল এ জায়গাতেই প্রণব মুখার্জি সুচিন্তিতভাবে নীরবতা অবলম্বন করেছেন। এক তরফা নির্বাচন চান না- এর বাইরে একটি কথাও বলেননি তিনি। তা সত্ত্বেও তার মন্তব্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, অন্তরালে যা কিছুই থেকে থাকুক না কেন, প্রকাশ্যে তাকেও অন্তত হিলারি ক্লিনটনের মতো অবস্থানই নিতে হয়েছে।
এ প্রসঙ্গেই এসেছে ক্ষমতাসীনদের দিকটি। বলা হচ্ছে, ক্ষমতাসীনদের উচিত নির্বাচনের বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া। কারণ প্রণব মুখার্জি সুকৌশলে এড়িয়ে গেলেও সরকারের আরেক ‘মুরুবিব' মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন তো বটেই, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে রাষ্ট্রদূতরাও ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলেছেন, সব দলের অংশ গ্রহণ ছাড়া অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচনকে তারা মেনে নেবেন না। অর্থাৎ সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা এবং নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে সব দেশই এক সুরে কথা বলেছে। এমন অবস্থায় সরকার যদি তার সিদ্ধান্ত থেকে নড়তে না চায় তাহলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সে নির্বাচনই শুধু প্রত্যাখ্যাত হবে না, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত কোনো সরকারও অন্য দেশগুলোর সমর্থন অর্জন করতে পারবে না। এর ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে পড়বে। সুতরাং বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থেই সরকারের উচিত বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে অনতিবিলম্বে সমঝোতার লক্ষ্যে সংলাপ শুরু করা। সদিচ্ছা থাকলে বিষয়টি কঠিনও হওয়ার কথা নয়। কারণ, উচ্চ আদালতের যে রায়ের আলোকে তারা সংবিধান সংশোধন করেছেন সে রায়েই পররবর্তী দুটি জাতীয় নির্বাচন কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে করা যেতে পারে বলে মন্তব্য রয়েছে। এজন্য দরকার শুধু আরো একটি সংশোধনী- যেটা ক্ষমতাসীনরা চাইলেই হতে পারে। সরকার সহজ এ পথটিতে পা বাড়াবে কি না সে প্রশ্নের উত্তর নিয়ে জল্পনা-কল্পনা করার পরিবর্তে এখানে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে মাত্র সেদিনের তিক্ত অভিজ্ঞতা স্মরণ করিয়ে দেয়া দরকার। বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের শেষদিকেও কিন্তু বিদেশীরা এভাবেই তৎপর হয়ে উঠেছিলেন। তখনও রাজনৈতিক সংকট, সুশাসনের অভাব ও দুর্নীতির ব্যাপকতার মতো নানা বিষয়ে কথা বলেছিলেন বিদেশীরা। ২০০৫ সালের মার্চে ভারত সফরকালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিজা রাইস ঘোষণা করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘বাংলাদেশের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেবে' এবং এই প্রক্রিয়ায় ভারতকে ‘সঙ্গে রাখবে'। আসলেও দেশ দুটি একযোগেই পদক্ষেপ নিয়েছিল। সেবারের সঙ্গে এবার কিছু পার্থক্যও অবশ্য রয়েছে। সেবার জাতীয় সংসদে দেয়া ভাষণে কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ কারো চোখ রাঙানিকে ভয় করে না। বাংলাদেশ কারো নির্দেশে চলবে না।' বেগম জিয়া একই সাথে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ‘নাক গলানো' বন্ধ করার জন্যও বিদেশীদের প্রতি কঠোর ভাষায় ‘পরামর্শ' দিয়েছিলেন। এটাই তার নিজের এবং জোট সরকারের পাশাপাশি চারদলীয় জোটের জন্যও ‘কাল' হয়েছিল। সুষ্ঠু ও গণতন্ত্রসম্মত প্রতিযোগিতায় না পেরে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল আওয়ামী লীগ। এবার এখনো কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বেগম খালেদা জিয়ার মতো কঠোর অবস্থান নিতে দেখা যাচ্ছে না- যদিও একে-ওকে দিয়ে পরোক্ষভাবে জবাব দেয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। উদ্বেগের কারণ হলো, দেশে গণতন্ত্র থাকলে এবং বিরোধী দলকে যথোচিত সুযোগ দেয়া হলে বিদেশীদের যথেচ্ছ নির্দেশনাকে পাশ কাটানো যায়। এমনকি সরকার বিপদে পড়লে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে বিরোধী দলও এসে পাশে দাঁড়ায়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী দলকেই উৎখাত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। ভয়ের কারণও আসলে এখানেই। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন