মঙ্গলবার, ৩ এপ্রিল, ২০১২

দুর্নীতি দমনে রাজনৈতিক অঙ্গীকার,গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজ


farasuddin-f

ড: মেহাম্মদ ফরাসউদ্দিন



গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জন্য একবিংশ শতাব্দির সূচনায় অনেক ইতিবাচক অর্জনের আকাশে একটি কৃষ্ণপক্ষ ২০০১-২০০৫ সনে পর পর পাঁচবার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বিঘোষিত দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন শিরোপা ধারণ। বার্লিন নগরীতে অবস্থিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের অর্থায়ন প্রশ্নবিদ্ধ ও মূল্যায়ন পদ্ধতি ত্রুটিপূর্ণ হলেও কেবলমাত্র ধারণাবশতঃ হিসাব করা সর্বনিকৃষ্ট দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের কলংক কালিমা বহিঃর্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সুখের কথা, ধীরে তবে নিশ্চিতভাবে দুর্নীতির এই প্রশ্নবিদ্ধ মানদন্ডে দেশের অবস্থান এখন চতুর্দশতম (১৪তম) স্থানে উঠে এসেছে। এতে আত্মপ্রসাদের অবকাশ নেই, প্রয়োজন আত্মবিশ্লেষণ ও আত্মজিজ্ঞাসাচালিত উদ্যোগ, প্রচেষ্টা ও কর্মকান্ড যাতে দুর্নীতি প্রতিরোধ করা যায়।
বর্তমান নিবন্ধের শিরোনাম দেখেই নিশ্চিত হওয়া যাবে যে, দুর্নীতি দমনে রাজনৈতিক অঙ্গীঁকারই মুখ্য। এর কৃতসংকল্প বাস্তবায়নে গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজ গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। শিরোনামটির একটি পরোক্ষ ইঙ্গিঁত এও হতে পারে যে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাই দুর্নীতির সূচনা ও প্রসারের চালিকা শক্তি হতে পারে।
দুর্নীতির কী?
চেম্বার্সের টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরী ডিকশনারী অনুসারে করাপ্ট শব্দটির অর্থ হচ্ছে টু মেইক পিউট্রিড অর্থাৎ টু টেইন্ট, টু ডিবেইজ, টু স্পয়েল, টু ডেসট্রয় দি পিউরিটি অব । আবার করাপশন শব্দটির অর্থ করা হয়েছে পচা, ঘুষ, ভেজাল, কৃত্রিম ও নকল হিসাবে। হাল আমলের উইকিপিডিয়া যার অন্য নাম ফ্রি এনসাইক্লোপেডিয়া অনুসারে দর্শন, ধর্মশাস্ত্র অথবা নৈতিকতার আলোকে দুর্নীতি হচ্ছে আধ্যাত্মিক ও নৈতিক অবক্ষয় অথবা অর্থনৈতিক আদর্শ থেকে বিচ্যুতি। সে প্রেক্ষিতে দুর্নীতিকে অনার্জিত আয় বলা যাবে যা প্রাপ্তিতে আইন ও বিধি স্বীকৃত রোজগারের পন্থা অনুসৃত হয় নি। দুর্নীতিকে অনেকেই ঘুষ, কিকব্যাক অথবা বকশিশের আরেক নাম বলে অভিহিত করে থাকেন। সরকারী কর্মকান্ডের পরিসরে দুর্নীতি সংঘটিত হয় যা যখন এর একটি অঙ্গ অথবা এজেন্ট এমন ধরণের সিদ্ধান্ত নেন যেটি অন্যায়ভাবে আর্থিক সুবিধা আদায় অথবা স্বজনপ্রীতি অথবা রাজনৈতিক প্রচারাভিযানে চাঁদা প্রদানকারীর স্বার্থ আদায়ের পথ খুলে দেয়। বলা বাহুল্য এ ধরণের দুর্নীতিগ্রস্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াতে ন্যায়নীতি, বিবেক ও সুবিচারের কোন বালাই থাকে না। রাজনৈতিক দুর্নীতি বলতে সাধারণতঃ সরকারী (পাবলিক) ক্ষমতাবলে প্রাপ্ত সম্পদের অপব্যাবহারকে বোঝায় যার পিছনে অবৈধ ব্যক্তিগত লাভক্ষতির বিবেচনা কাজ করে। এ ধরণের দুর্নীতিতে সরকারী কর্মকর্তাগণ জনস্বার্থ উপেক্ষা করে এবং আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজী, ঘুষ ও ভোট কেনাবেচার মাধ্যমে বিশেষ করে স্বার্থান্বেষী মহলের অনুকূলে সরকারী সিদ্ধান্ত করে দেন। এ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে একটি লাভের বিনিময়ে পণ্যসেবা হিসাবে বিক্রী করা হয়।
তবে সিস্টেমিক করাপশন অর্থাৎ সর্বগ্রাসী কাঠামোবিস্তৃত দুর্নীতিটাই সবচেয়ে মারাত্মক। প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক দুর্বলতা, পদ্ধতিগত ত্রুটির ফলে সর্ষের মাঝে ভুত অবস্থান এবং নড়বড়ে নেতৃত্বের কারণেই অসৎ কর্মকর্তা কর্মচারীগণ সিস্টেমেটিক দুর্নীতিতে আখের গোছাতে তৎপর থাকেন। গোষ্ঠিস্বার্থের সংঘাত, বেশী বেশী নিয়মবহির্ভূত অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতা প্রয়োগ, জবাবদিহিতার অভাব, অস্বচ্ছতার বিস্তার, সরকারী চাকুরীর বেতনভাতার দৈন্য এবং ”বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদার” ন্যাক্কারজনক সংস্কৃতি যেথানে প্রবল সেখানে দুর্নীতি বাসা বাধবেই। ছড়িয়ে পড়বে ঘুষ, চাঁদাবাজী ও তহবিল তসরুফের ঘটনার পর ঘটনা। দুর্নীতি পরিণত হবে নিয়মে, সুশাসন হবে বিতাড়িত।
দুর্নীতির প্রকার ও পরিণাম
দুর্নীতির কুফল ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী। দুর্নীতি একটি বহুমাত্রিক ব্যাধি যেখান থেকে রাজনীতি, সমাজ ব্যবস্থা, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অবক্ষয়, পচন শুরু, এমন কি অব্যাহতভাবে তা ধ্বস নামাতে পারে। এর ফলে বিশেষ করে আর্থ-সামাজিক অগ্রগতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ট্রান্সপ্যারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল দুর্নীতি বিষয়ে একটি আলোচিত প্রতিষ্ঠান। এর মিশন স্টেটমেন্টে বলা হয়েছে, , “Corruption is one of the greatest challenges of the contemporary world. It distorts public policy, leads to misallocation of resources, harms the private sector and the private sector development and particularly hurts the poor.”
বলার অপেক্ষা রাখে না যে দুর্নীতির নেতিবাচক প্রভাব সর্বগ্রাসী। এ যেমন নৈতিকতাকে পদদলিত করে অথবা জীবনযাত্রার বিভিন্ন দিককে ভেজালে কলুষিত করে তেমনি বিচার, বিবেক ও ন্যায়পরায়ণতাকে বিসর্জন দিয়ে একজন মানুষকে ঘৃণিত জীবনধারণের দিকে ধাবিত করে। দুর্নীতির একটি রূপ হতে পারে প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে প্রদত্ত সিদ্ধান্তকে উৎকোচ অথবা অন্য কোন প্রশ্নবিদ্ধ সুবিধা গ্রহণের বিনিময়ে অন্যায়ের অনুকূলে প্রবাহিত করা।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বড় বড় কেনাকাটায় বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে বড় অংকের কিকব্যাকের মাধ্যমে প্রভাবিত করে বেশী মূল্যে নিম্ন মানের পন্য বা সেবা কিনতে প্রলুব্ধ করার নজির শুধু “লকহিড” কেলেংকারীতে সীমাবদ্ধ নেই। এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশসহ বিভিন্ন স্থানে দুর্নীতির পঙ্কে ডুবে থাকা কতিপয় দেশীয় এজেন্টকে হাত করে প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন হীরা, সোনা, তেল, কাঠ ইত্যাদি অত্যন্ত কম মূল্যে দেশান্তর করার দুর্নীতিগ্রস্ত কেনাবেচা এখনো চলছে। এতে দেশের সম্পদ স্বল্পমূল্যে পাচার হয়ে গেলেও কোন কোন দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং/অথবা প্রশাসনিক ক্ষমতাবানেরা লাভের অঙ্কে স্ফীত হয়ে দেশ বিক্রীর প্রক্রিয়ার ধিকৃত কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়।
বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর দুর্নীতির আরো একটি নিকৃষ্ট পন্থা হচ্ছে ট্রান্সফার প্রাইসিং এর মাধ্যমে সম্পদ দেশান্তর করা। একটি কোম্পানীর বিভিন্ন দেশে শাখা বা স্থানীয় অফিস থাকতে পারে। একটি দেশ বা স্থানীয় অফিসে ঐ দেশে উৎপাদিত খনিজ বা কাঁচামাল পন্য কোম্পনীটি বাজার মূল্যের চেয়ে বেশী মূল্যে কেনা হয়েছে দেখিয়ে উৎপাদনস্থল দেশান্তর করে উৎপাদন খরচ বেশী দেখিয়ে লাভের পরিমাণ কৃত্রিমভাবে হ্রাস করে দেখাতে পারে। এতে অনার্জিত লাভের অঙ্ক যেমন বেশী হয় তেমনি হ্রাস পায় কর প্রদানের পরিমাণ। জাতিসংঘে গৃহীত কোড অব কন্ডাক্ট ফর মাল্টি ন্যাশনাল কর্পোরেশনসে এ ধরণের ট্রান্সফার প্রাইসিংজনিত দুর্নীতি বিলুপ্ত করা তো দূরের কথা একে তেমন হ্রাসও করতে অক্ষম বলে মনে হয়।
দেশের অভ্যন্তরে বড় মাপের দুর্নীতির একটি হয়ে থাকে ব্যক্তি বা গোষ্ঠি স্বার্থে আইন প্রণয়ন বা আইন পরিবর্তন। এ ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়ে থাকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান অথবা সদস্য তার/ তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের পক্ষে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সরকারী নীতিতে পক্ষপাতিত্ব আনার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হওয়ার। এ ধরণের দুর্নীতি সরকার প্রধানের হস্তক্ষেপে বন্ধ হয়ে থাকে, যদি না হয় তবে সরকারের প্রতি জনসাধারণের আস্থা নষ্ট হতে পারে। তবে তার চেয়েও বড় কথা, এর ফলে সীমিত সম্পদের জন্য অসীম চাহিদাকে গোষ্ঠি/ব্যক্তিস্বার্থ ভিত্তিক বিকৃতির মাধ্যমে দেশের অপূরণীয় ক্ষতি করা হতে পারে এবং হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে দুষ্প্রাপ্য ও অপ্রতুল সরবরাহের সম্পদ জমি দখলের পেশী শক্তির অসুস্থ প্রতিযোগিতায় সরকারের কোন কোন সময়ের উদাসীনতাকে দুর্নীতির প্রশ্রয় দেয়া বলে অনেকে ভাবতে পারেন। টেন্ডার ও ছিনতাই যদি রাজনৈতিক শক্তির চোখ বুজে থাকা অর্থাৎ প্রশ্রয়ে হয়ে থাকে এবং এতে যদি সরকার ও বিরোধী দলের সমর্থিত অঙ্গ সংগঠনগুলো একতাবদ্ধ হয়ে অংশ ভাগাভাগিতে লিপ্ত হয়ে যায় তাহলে এ দুর্নীতি রোধের পথ কঠিন হয়ে পড়ে।
সাধারণতঃ সরকারী কর্মকর্তদের উৎকোচের বিনিময়ে আটকে রাখা নথি চালুকরণ অথবা নথি হারিয়ে ফেলা অথবা নথিতে ঘুষ প্রদানকারীর পক্ষে সুপারিশ করা ধরণের দুর্নীতি খুবই প্রাধান্য দিয়ে আলোচিত ও প্রকাশিত হয়। এ সকল ক্ষেত্রে অব্যাহত মূল্যস্ফীতির চলমান প্রক্রিয়ায় অপ্রতুল বেতনবৃদ্ধি এমনকি স্থবির বেতনের হ্রাসমান ক্রয়ক্ষমতায় দিশেহারা কেউ কেউ যদি স্বল্প পরিমাণে অবৈধ উপার্জনে লিপ্ত হয় তবে তাকে ফলাও না করে সমস্যা সমাধানের দিকে মনযোগ দেওয়া উচিৎ হবে। এই সকল ছোট দুর্নীতির বিষয়ে প্রচুর শোরগোল থাকলেও নির্বাচনী ব্যয় নির্বাহী বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অথবা ব্যক্তি বিশেষের বড় অঙ্কের চাঁদার বিষয়টি প্রায় সকল ক্ষেত্রেই অজানা থেকে যায়। ব্যক্তি মালিকানাধীন তথ্য মাধ্যমগুলো এ বিষয়ে তেমন উচ্চবাচ্য করে না। ভাবখানা এই যে, সব রাজনৈতিক দলই যেহেতু তাদের রাজনৈতিক খরচ মেটানোর জন্য এ ধরনের আর্থিক অনুদান গ্রহণ করে থাকে এবং একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যেহেতু বিবদমান সকল দলকেই কমবেশী আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে ভবিষ্যতে ক্ষমতাবান হলে নানা ধরণের সুবিধা ও আনুকূল্য পাবার আশায়, সে জন্য এ ধরণের প্রচারাভিযানে অর্থ প্রদানে তেমন দোষের কিছু নেই। নিশ্চয়ই সমাজ, রাষ্ট্র, ন্যায়নীতি ও স্বচ্ছতার নিরিখে এ ধরণের আর্থিক লেনদেন শুধু দুর্নীতি নয় বরং দূর্নীতির সুতিকাগার হিসাবে দানা বাঁধতে পারে।
দুর্নীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা
একটি স্বধীন দেশের সার্বভৌমত্ব ও সার্বিক নিরাপত্তা বড় ধরণের ষড়যন্ত্রের কারণে হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। আর যদি দেশের অভ্যন্তরে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সে ষড়যন্ত্রকে সহায়তা প্রদান করে তবে এর চেয়েও বড় নিকৃষ্টতম দুর্নীতি আর কী হতে পারে। বলা হয়ে থাকে যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ এর জনগণ। তবে এ বিপুল জনগোষ্ঠীকে জনশক্তি তথা মানবসম্পদে রূপান্তরের জন্য সীমিত সম্পদের সর্বোৎকৃষ্ট বরাদ্দ ও সদ্ব্যাবহার করে অন্যান্য খাতের সহযোগে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে অর্থপূর্ণ ও যথাসম্ভব বেশী বেশী বিনিয়োগ করা দরকার। যদি ইচ্ছাকৃতভাবে সেই অগ্রাধিকারের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে বরাদ্দ কমানো হয় অথবা বরাদ্দকৃত অর্থসম্পদের অপচয় বা লুটপাট করে মানবসম্পদ সৃষ্টির কাজে বাঁধা সৃষ্টি করা হয় তাহলে সে দুর্নীতি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে অপরাধ বলে বিবেচনা করা যেতে পারে। অবশ্য রাষ্ট্রীয় কোন প্রতিরক্ষা বিষয়ক তথ্য শত্রুমহলে পাচার এবং দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের গুরুত্বপূর্ণ গোপনীয় তথ্য বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়ার অপকর্ম একদিকে যেমন রাষ্ট্রের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে বিবেচিত হয় অন্যদিকে তেমনি তা সবচেয়ে নিকৃষ্ট দুর্নীতি বলেও ঘৃণিত হতে পারে।
সরকারের বাইরে দুর্নীতি
বাজারধর্মী অর্থনীতির সবচেয়ে বড় পরিসরে বিরাজমান ব্যক্তি মালিকানাধীন শিল্প ও বাণিজ্যিক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানসমূহ হয়ে থাকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বৃহত্তর চালিকাশক্তি। গণখাত ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামো সৃষ্টি করে যার ছায়াতলে ব্যক্তিখাত যোগ্যতা, দক্ষতা, ক্ষিপ্রতা, গতিময়তা ও উদ্ভাবনী পরিশ্রমে সমৃদ্ধির অগ্রগতি সৃষ্টি করে; সুতরাং উভয়খাতের পারস্পরিক পরিপূরক শক্তিই কেবল পারে সীমিত সম্পদের সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবহার নিশ্চিত করে দেশকে সমৃদ্ধির সোপানে দ্রুতবেগে এগিয়ে নিতে। সে ক্ষেত্রে একখাতের দক্ষতা যেমন অন্য খাতকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে তেমনি একের অযোগ্যতা ও দুর্নীতিও অন্যকে নেতিবাচকভাবে পিছুটানে আক্রান্ত করতে পারে। দুই খাতের মধ্যকার লেনদেনে দুর্নীতি বিরল নয়। তবে ব্যক্তিখাত এর “প্রতিবন্ধকতাকে” ঘুষ ও অন্যান্য রকমের উপঢৌকন দিয়ে এর রাস্তাকে সুগম করে। এটা দৃষ্টান্ত হয়ে গণকর্মীদের কাউকে কাউকে দুর্নীতিগ্রস্ত করতে পারে। তবে সরকারের বাইরে বা ব্যক্তিখাতের বৃহৎ মাপের দুনীতি হল আন্ডার ও ওভার ইনভয়েসিং এর মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া এবং তার চেয়েও বড় কথা, দেশের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার অংশবিশেষ বিদেশে পাচার করা। যেমন রাষ্ট্রের সম্পদ ব্যয় করে ব্যাপক পলিসি সমর্থন তথা শতকরা সত্তর ভাগ ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে বিনা শুল্কে আমদানি করতে দিয়ে তৈরী পোষাক ও নিটওয়্যারের রপ্তানীর রাস্তা সুগম করা হলেও ঐ খাতের এক শ্রেণীর রপ্তানীকারক রপ্তানী মুল্যের একটি অংশ বিদেশে জমিয়ে রেখে বাড়ী, গাড়ী ও ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন যার কোন উপকার দেশবাসী ভোগ করেন না। উপরে বর্ণিত বড় ধরণের দুর্নীতি এবং কালোবাজারী, মানিলন্ডারিং জাতীয় অপরাধ অর্থনীতির জীবনীশক্তিকে কুরে কুরে খায়। সাধারণভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে বিনিয়োগের প্রয়োজনের তুলনায় সঞ্চয়ের পরিমাণ কম হওয়ার বাঁধাটি প্রবল হয়ে থাকে। বাংলাদেশে হালে জিডিপির হিসাবে শতকরা উনত্রিশ ভাগ সঞ্চয়ের বিপরীতে বিনিয়োগ হয় শতকরা পঁচিশ ভাগের কিছু কম। অর্থনীতির ব্যাকরণে এটা ঘটতে পারে না। আন্ডার ইনভয়েসিং, ওভারইনভয়েসিং, রপ্তানীখাতের কিছু অংশ বিদেশে রেখে দেয়া, মানি লন্ডারিং ও স্মাগলিং ধরণের মারাত্মক দুর্নীতি এই অদ্ভুত সূত্রবহির্ভূত ঘটনার জন্য দায়ী বটে। ব্যক্তিখাতে ট্রেডইউনিয়নের দৌরাত্ম ও দুর্নীতির সম্পর্কে খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ ১৯৯৯ সনে একটি টাস্কফোর্সের সমীক্ষায় বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। এনজিও খাতের দুর্নীতি, অনিয়ম, অস্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার অভাবসহ বহিঃনিরীক্ষক মাধ্যমে হিসাব নিকাশ পরীক্ষা করানোর অনীহার বিষয়গুলো বহুল আলোচিত। ২০০৫ সনে ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল ঢাকা বাংলাদেশের এনজিও খাতের দুর্নীতি সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
প্রতিরোধ ও নির্মূলের উপায় কী?
দুর্নীতি বিষয়ক যে কোন আলোচনায় এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে রাজনৈতিক শক্তির মহল বিশেষের অংশগ্রহণ নিদেনপক্ষে নিরব সম্মতি ছাড়া দুর্নীতির বিষবাস্প দীর্ঘদিন চলতে পারে না। এ ক্ষেত্রে এ উপলব্ধিও সত্য যে প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর। তাহলে এ প্রশ্ন উঠতেই পারে যে রাজনৈতিক কৃতসংকল্পতা ছাড়া কি দুনীতি প্রতিরোধ বা দুর্নীতি দমন আদৌ সম্ভব। দুর্নীতি বিপুলভাবে লাভজনক, সংক্রামক এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে হলেও নির্বাচনী বৈতরণী পার হবার ক্ষেত্রে অর্থের যোগানদার। দুর্নীতি প্রতিরোধ অথবা দমনে রাজনৈতিক কৃতসংকল্প ও কার্যকর পদক্ষেপসমূহ শুরু ও জারী রাখতে হলে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অর্থনীতি ও রাজনীতির চলার পথের মোটা দাগীয় যে ক্ষেত্রসমূহের জাতীয় ঐক্য অতি অবশ্য প্রয়োজন দুর্নীতি তার অন্যতম। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২০০৮ সনের সাধারণ নির্বাচনের ইশতেহার পূর্ব “দিন বদলের সনদের” উপধারায় স্স্পুষ্ট অঙ্গীঁকার ঘোষণা করেছে, “দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থাঃ দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে শক্তিশালী করা হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে বহুমুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। ক্ষমতাধরদের বার্ষিক সম্পদ বিবরণ দিতে হবে। রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরের ঘুষ, দুর্নীতি উচ্ছেদ, অনোপার্জিত আয়, ঋণখেলাপি, চাঁদাবাজি, কালোটাকা ও পেশিশক্তি প্রতিরোধ ও নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রতি দফতরে গণঅধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নাগরিক সনদ উপস্থাপন করা হবে। সরকারী কর্মকান্ডে ব্যাপকভাবে কম্পিউটারাইজেশন করে দুর্নীতির পথ বন্ধ করা হবে।”
অনুরূপভাবে বিএনপিও ইহার নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতি দমনের বিষয়ে দৃঢ় মনোভাব বিবৃত করেছে এবং ২০০২ সনে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন স্থাপনের কথা উল্লেখ করেছে। ২০০৯ সনে পুনর্গঠিত ও নতুন করে ক্ষমতায়িত দুর্নীতি দমন কমিশন আগের যে কোন সময়ের তুলনায় শক্তিধর হলেও আইনি ক্ষমতা, জনশক্তি ও প্রক্রিয়াজাত জটিলতা একে “দন্তবিহীন বাঘে”পরিণত করেছে কিনা সে বিতর্কও মাঝে মধ্যেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এ কথা অবশ্য নিঃসন্দেহে বলা যাবে যে, সরকারী কর্মকর্তাগণের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা শুরু করতে কর্তৃপক্ষীয় পুর্ব অনুমোদনের ব্যবস্থা রহিত করা একটি যুগান্তকারী ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। দুর্নীতি দমনে সরকারের এই সদিচ্ছা পূর্ণতর রূপ নিতে পারে যদি সংবিধানের ৭৭ অনুচেছদে বিবৃত ধারা অনুসারে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করে একজন ন্যায়পাল নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়। স্মর্তব্য যে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সকলকে আয় ও সম্পদ করের আওতায় আনার সিদ্ধান্তটি দুর্নীতি প্রতিরোধে একটি কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ। এর আশু বাস্তবায়ন কাম্য। দুর্নীতি দমন কমিশনকে গ্রেফতার করার ক্ষমতা প্রদানের বিষয়টির পক্ষে যেমন বলার আছে তেমনি বিপক্ষেও। বাকী থাকলো সরকারী ও বিরোধী দলীয় সকল নেতৃস্থানীয়গণের আয়কর প্রদান বাধ্যতামূলক করা এবং সম্পদ বিবরণী জমা নেওয়া।
বাংলাদেশের দুর্নীতি ও বহিঃশক্তির প্রভাব
বাংলাদেশে দুর্নীতি প্রসারে বিদেশী সংশ্লিষ্টতা বিদ্যমান রয়েছে। দেশে যদি বছরে গড়ে দেড়শত কোটি মার্কিন ডলারের সমমূল্যে বৈদেশিক ঋণপ্রবাহ ও তৎসংশ্লিষ্ট কেনা কাটা হয় তাহলে দেশীয় দুর্নীতির ধারার সাথে বিদেশে চলমান দুর্নীতির অপশক্তি আমদানি হয়ে তা সংযুক্ত হতে বাধ্য। সে প্রেক্ষিতে অনেকেই মনে করেন যে বিদেশের অনুরূপ কিছু সম্পূরক আইনী বিধান বাংলাদেশে চালু করা উচিৎ। যেমন ”The Foreign Corrupt Practices Act (FCPA) of 1977” আইনটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এমন একটি সময়ে পাশ করা হয় যখন লকহীডের ২২ মিলিয়ন ডলারের কিকব্যকসহ ৪০০টি বড় কোম্পানী সারা বিশ্বে দুর্নীতির ব্যাধি ছড়িয়ে দিতে থাকে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে উন্নয়নশীল দেশসমূহের দুর্নীতি বিস্তারে অথনৈতিক দিক থেকে শক্তিশালী বিশ্বের দেশসমূহের নাটের গুরুদের অবদান থাকলেও এটা দমনে ঐ সকল দেশ বা প্রতিষ্ঠান এক ধরণের উদাসীন অবহেলা প্রদর্শন করে থাকে। ২০০৭ সনের ২রা নভেম্বর তারিখে ব্র্যাকে অনুষ্ঠিত একটি সেমিনারে ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনালের গ্লোবাল সভাপতি ডঃ হুগেট লাবেলকে বাংলাদেশের ২০০৩-০৪ সনে অনুষ্ঠিত দুটো খুব বড় দুর্নীতি ঘটনার বিচারে উন্নত বিশ্বের ব্যাংকিং খাত ও তথ্য মিডিয়া কেন অবদান রাখছে না তা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। বরং স্থানীয় বিষয় স্থানীয়ভাবে মিটানোর উপদেশ খয়রাত করেন।
সুশীল সমাজ ও তথ্য মাধ্যম
বিকাশমান ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, আইনী কাঠামো, সংস্কৃতি ও রীতি নীতির শেকড় গড়ে উঠতে সময় লাগে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের সংগ্রামে গণতান্ত্রিক সরকার প্রত্যক্ষ দুর্নীতি দমনে তৎপর হলেও প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকান্ডে ছাড় দিতে একধরণের বাধ্য বাধ্যবাধকতায় জড়িয়ে পড়তে পারে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেও জাতীয় ঐক্যের অভাব ও নির্বাচনী প্রচারে এমনকি রাজনৈতিক দল চালানোর জন্য অর্থ সংগ্রহের বিশ্বব্যাপী প্রথা চালু থাকার প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমনে তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর হতে পারে না। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই দেশে দেশে নিরপেক্ষ, শক্তিশালী ও দক্ষ বিচার ব্যবস্থা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী রক্ষাকবচ হতে পারে। এ সম্পর্কে আলোচনার অবকাশ বর্তমান নিবন্ধে নাই।
তথ্য মাধ্যমকে গণতন্ত্রের পঞ্চম স্তম্ভ হিসাবে গণ্য করা হয়ে থাকে। অবশ্যই এটার শক্তি বিশাল। তবে গণমাধ্যমকে যদি কুশাসন ও দুর্নীতি অনাচারের বিরুদ্ধে ধারালো অস্ত্র হিসাবে দাঁড়াতে হয় তাহলে একে সম্পূর্ণভাবে একটি নিরপেক্ষ শক্তি হিসাবে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। সত্তরের দশকে মাত্র দু’জন সাংবাদিক অসীম সাহস ও যোগ্যতায় মহাশক্তিধর মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে ইমপিচমেন্টের দ্বারপ্রান্তে এনে পদত্যাগে বাধ্য করিয়ে যে নজির স্থাপন করেছিলেন বাংলাদেশে এর পুনরাবৃত্তি আশা করা মুশকিল হবে বৈকি। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ফিরে আসার দুই দশকে দেশের তথ্য মাধ্যমের নেতৃবৃন্দকে দু’বারের বেশী ঐক্যবদ্ধ হতে দেখা যায়নি। অন্ততঃ দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে যাওয়াকে বোধহয় আমাদের মিডিয়ার বন্ধুগণ গণতান্ত্রিক কর্তব্য হিসাবে গণ্য করেন। ১৯৯৯ সনে বেসরকারী খাতে একুশে টিভি স্থাপনের মাধ্যমে তথ্য মাধ্যমে নিরপেক্ষতা স্থাপনের যে সাহসী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল ২০০২ সনের আগস্ট মাসে একুশে টিভি বন্ধ করে দেয়ার মাধ্যমে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমকে কার্যকর ভাবেই দুই শিবিরে ভাগ করে দেয়ার পথ সুগম করে।
দেশের দুর্নীতির আগাম খবর প্রকাশ করে গণমাধ্যম দুর্নীতি প্রতিরোধে ভূমিকা রাখছে নিঃসন্দেহে। তবে ঐক্যবদ্ধ মিডিয়ার কন্ঠ যত বলিষ্ঠ হতে পারত, বাংলাদেশে কেন জানি মনে হয় তেমনটি হচ্ছে না। আর ঘটে যাওয়া দুর্নীতির খবরের যেন রাজনৈতিক বিবেচনায় কম বেশী গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ ঘটে। আর এহেন খন্ডচিত্রের দুর্নীতির পক্ষপাতিত্বমূলক সংবাদের উপর ভিত্তি করেই ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল তাদের প্রশ্নবিদ্ধ ধারনাসূচক দিয়ে বাংলাদেশকে সর্বনিকৃষ্ট দুর্নীতিবাজ দেশ হিসাবে বহিঃর্বিশ্বে পরিচিত করে। দেশের নেতিবাচক ভাবমূর্তি চিত্রনে জেনে হোক বা অজান্তে হোক একটা ভূমিকা রাখে। বিভক্ত মিডিয়া শিবিরে রাজনৈতিক সহমর্মিতার কারণে দুর্নীতির খবর চেপে যাওয়া অথবা বৈরী পক্ষে (ক্ষুদ্র) তিল পরিমান দুর্নীতিকে (বিশাল) তাল পরিমাণ দুর্নীতি হিসাবে চিত্রিত করার নজির যথেষ্ট আছে।
দুর্নীতি দমনে সুশীল সমাজের ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনা করার আগে সুশীল সমাজ বলতে আমি কী বুঝি বা সাধারণভাবে কী বোঝানো হয় সে সম্পর্কে আলোকপাত করা প্রয়োজন। সুশীল সমাজ বলতে অনেকেই একটি রাজনীতি নিরপেক্ষ সচেতন দেশের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ সোচ্চার গোষ্ঠিকে বোঝায় যেটি বা যারা ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্য ব্যাখ্যা করে দুর্নীতিসহ সকল ধরণের অন্যায়ের অহিংস প্রতিবাদ করে। এহেন একটি শক্তি নির্মোহ নির্লিপ্ততায় সংগঠিত হয়ে রাষ্ট্রীয় ও সমাজের কর্মকান্ডের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে ন্যায়ের পক্ষে ও অন্যায় অবিচার অনাচার দুর্নীতি সন্ত্রাস বৈষম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ালে একটি দুর্লঙ্ঘ শক্তির প্রাচির তৈরী করতে পারে। তবে প্রশ্ন উঠতে পারে, এ ধরণের একটি সংগঠিত শক্তি কি কেবল ভলান্টারী শ্রম ও সময় দিয়ে তৈরি হতে পারে। আর যদি এর পেছনে শ্রম ও অর্থ সম্পদ খরচ করতে হয় তবে এর যোগানদাতাদের এজেন্ডার ঊর্ধে উঠে সুশীল সমাজের প্রতিষ্ঠান কি বস্তুনিষ্ঠ নিরপেক্ষ নির্লিপ্ত সাহসিকতায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে অব্যাহত ও দুর্বার প্রতিরোধ / প্রতিবাদ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে! উত্তর যে ইতিবাচক হতে পারে তার প্রমাণ সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন বিশেষ করে এর প্রাণপুরুষ ডঃ বদিউল আলম মজুমদারের জিহাদসম আইনী লড়াই যার মাধ্যমে আজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় সংসদসহ পাবলিক অফিসে নির্বাচন প্রার্থীগণকে নির্বাচনে প্রার্থী হবার সময়ই নিজ ও প্রতিষ্ঠান এবং আত্মীয় স্বজন সম্পর্কে আর্থিক, ফৌজদারীক এবং অনুরূপ তথ্যাদি প্রকাশে বাধ্য থাকা। আবার এ সুজনেরই আরেকটি দুঃখজনক বৈপরীত্য দেখা গেল যে ২০০৮ সনের নির্বাচন যেন জরুরী আইনের অধীনে হয় তার জন্য প্রাণপাত চেষ্টা করার মধ্য দিয়ে। সুজনকে অবাস্তব হতে দেখা গেল ব্যালটে না সূচক সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক বিধান রাখার আন্দোলন করতে।
২০০৮ সনের সুষ্ঠু শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সুজনসহ দেশে বিদেশে প্রশংসিত নির্বাচনে একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভোটার অংশ নেতিসূচক ভোট দিলেও গণতান্ত্রিক দাবী মেনে নিয়ে সেই দাবী পরিত্যাগ করার মানসিকতা সুজন এখনো প্রদর্শন করেনি। সুজনের বাইরেও সুশীল সমাজের বড় অস্তিত্ব অবশ্যই রয়েছে। অধিকাংশ সুশীল সমাজ প্রতিষ্ঠান দুর্নীতির বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। তার সঙ্গে যদি ঐক্যবদ্ধ তথ্য মাধ্যম সংয্ক্তু হয়ে কৃতসংকল্প লড়াই করে তা হলে যে ইতিবাচক ফল লাভ সম্ভব তার ষোলআনা প্রতিফলন ঘটেছে নারায়নগঞ্জে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে। সেখানে তথ্য মিডিয়া ও সুশীল সমাজ ন্যায় ও সত্যের পক্ষে এবং দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ দুর্বার অবস্থান নেয়ার ফলে বেগতিক দেখে এক পক্ষ নির্বাচনের আগেই রণেভঙ্গ দেয় এবং অন্য পক্ষ জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত রায়কে মেনে নিয়ে ইতিবাচক ধারার সৃষ্টি করে।
দুর্নীতি প্রতিরোধ ও দুর্নীতি দমনের অভিযানকে সফল করতে হলে সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগ ও উদ্যমকে একযোগে কাজে লাগাতে হবে। তবে এ কঠিন লক্ষ্যে সফলতা অর্জনের একটি পূর্বশর্ত হচ্ছে দুর্নীতি সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা। সাধারণভাবে সরকারী প্রচার মাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা তেমন বেশী নয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের জনসংযোগ ও প্রচারিভযানের কার্যকারিতাও আংশিকভাবে সফল হবে। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে যদি সংঘবদ্ধ ও সমন্বিতভাবে দুর্নীতির কদর্য চেহারাকে পরিচিত করে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এবং জনস্বার্থে এর কুফল সম্পর্কে তথা ও যু্ক্তিপূর্ণ ও সুচিন্তিত লেখালেখি করা হয় তা হলে দুর্নীতি প্রতিরোধ অভিযানে দুরন্ত শক্তি যুক্ত হবে। সেই সাথে আইন ও শালিস কেন্দ্র, বেলা, ব্রতী, ডেমোক্র্যাসী ওয়াচ, সুজন, পরিবেশ আন্দোলন ও অন্যান্য অনুরূপ সুশীল সমাজীয় প্রতিষ্ঠান দুনীতি অনাচার ও কুশাসনের বিরুদ্ধে উচ্চকন্ঠ সমন্বিত আওয়াজ উঠাতে পারলে এই পচনব্যাধিকে ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।
দুর্নীতি অবশ্যই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক শ্লথ গতি আনে। এর ফলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। দারিদ্র নিরসনেও দুর্নীতি একটি বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্বব্যাংকের একটি হিসাবমতে দুর্নীতির ফলে বাংলাদেশের বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে শতকরা দু’ভাগ কমতি আসতে পারে। এ সকল কারণে এবং একটি সুস্থ, সবল, প্রবৃদ্ধির জোয়ারে ভেসে থাকা সমৃদ্ধশালী অর্থনীতি ও দারিদ্র নির্মূলে মরণকামড় দেবার স্বার্থেই একটি দুর্নীতি মুক্ত সমাজ গঠন করা জরুরী। এ জন্য রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গীকারে যেমন কৃতসংকল্পতা অপরিহার্য তেমনি সেই মহৎ উদ্দেশ্য রূপায়নে বিশেষ করে একটি ঐক্যবদ্ধ গণমাধ্যমের জোরদার প্রচেষ্টা ও সুশীল সমাজ অসাধারণ ভূমিকা রাখবে নিঃসন্দেহে।

ডঃ মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন: অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন