সোমবার, ৩০ এপ্রিল, ২০১২

ইলিয়াস আলীর গুম, বিরোধী দল নির্মূল ও একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার পাঁয়তারা


মো. নূরুল আমিন

গুম হওয়া বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে ফেরত দেয়ার দাবিতে বিএনপি ও তার নেতৃত্বাধীন আঠারদলীয় জোট আহূত দ্বিতীয় দফা হরতালের দ্বিতীয় দিনে আমি যখন এই কলামটি লিখতে বসেছি তখনও পর্যন্ত ইলিয়াস আলীর কোন সন্ধান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা তার অধীনস্থ কোন সংস্থা দিতে পারেনি। তবে আজ (সোমবার) সকালে টেলিভিশন চ্যানেলসমূহে ব্রেকিং নিউজ হিসেবে যে খবরটি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হচ্ছে সেটি হচ্ছে- বিএনপি'র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অব: ব্রিগে: জেনারেল হান্নান শাহ, রুহুল কবীর রিজভী, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সাদেক হোসেন খোকা এবং অন্যান্য সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধে রাজধানীর দু'টি থানায় ককটেল বিস্ফোরণ, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের দায়ে ২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার আসামীদের মধ্যে এলডিপি প্রধান ড. কর্নেল অলি আহমদও আছেন। কর্নেল অলি আহমদ একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং বীর প্রতীক খেতাবধারীও। বিএনপি ও তার নেতৃত্বাধীন জোটের সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধে এই মামলাগুলো দেয়ার পর অনেকেই এখন নিশ্চিত হয়ে গেছেন যে, ইলিয়াস আলীর সন্ধান পাওয়ার সম্ভাবনা হয়তো এখন তিরোহিত হয়েই যাচ্ছে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী দেশব্যাপী এখন বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের গ্রেফতারের চিরুনি অভিযান শুরু হবে।
ভারতবর্ষসহ আমাদের এই অঞ্চলে একসময় নরবলি প্রথা চালু ছিল। বিভিন্ন কাজ ও লক্ষ্যকে সামনে রেখে নরবলি দেয়া হতো। আমরা যখন ছোট ছিলাম তখনও কিছু লোকের মধ্যে এই বিশ্বাস প্রচলিত ছিল যে, বড় বড় পুল ও বৃহৎ নির্মাণ কাজকে টেকসই করার জন্য নরবলি দেয়া অপরিহার্য। ঐ সময়ে ছেলেধরাদের উৎপাত ছিল লক্ষণীয়। পল্লী এলাকায় ছেলেধরারা ছোট ছোট ছেলেদের ফুসলিয়ে কিংবা জবরদস্তি অপহরণ করে ঠিকাদারদের কাছে বিক্রি করতো। ঠিকাদাররা নির্মাণ স্থাপনা বা ব্রিজের ফাউন্ডেশনের তলায় তাদের বলি দিতো। এতে নাকি দেবতারা তুষ্ট হতেন এবং এর ফলে ঐ স্থাপনা টেকসই ও মজবুত হতো। এই নির্মম কাজে গ্রাম এলাকার বহু শিশু ঠিকাদারদের বলির শিকার হয়েছিল এবং অনেকের পিতামাতা এবং আত্মীয়-স্বজন পাগলও হয়ে গিয়েছিলেন। কালপরিক্রমায় এই কুসংস্কারটি বাংলাদেশ থেকে দূরীভূত হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এখন ছেলেধরা ও অপহরণকারীদের একটি অংশ বিদেশে পাচারের উদ্দেশ্যে ছেলেমেয়েদের অপহরণ করে এবং সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এই অপহরণকারীদের খপ্পর থেকে আমাদের সরকার প্রধানের বাবুর্চীর মেয়েও রক্ষা পায়নি। কিছুদিন আগে তাকে মুম্বাইয়ের নিষিদ্ধ পল্লীতে পাওয়া গিয়েছে। তবে ছেলে ও মেয়ে শিশু অপহরণ ছাড়াও এখন রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও আইন-শৃক্মখলা বাহিনীর নাম ও পদ ব্যবহার করে একশ্রেণীর অপহরণকারীর দৌরাত্ম্য বেড়েছে বলে মনে হয়। এরা রাজনীতিবিদদের অপহরণ করে গুম করে দিচ্ছে। অপহৃত এসব ব্যক্তিকে এখন ব্রিজ বা বড় ধরনের স্থাপনা নির্মাণের বেদীতে বলি দেয়া হচ্ছে না। তাদের বলি দেয়া হচ্ছে রাজনৈতিক দলসমূহের ক্ষমতায় টিকে থাকার দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পের বেদীমূলে। ইলিয়াস আলী ও তার ড্রাইভার, সিলেটের ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দু'জন  শিবির নেতাসহ গত এক বছরে অপহৃত শতাধিক রাজনৈতিক নেতাকর্মী এই ক্ষমতা প্রকল্পের বলি হয়েছেন কিনা আমি জানি না। তবে ঘটনা পরম্পরায় মনে হচ্ছে যে, তাদের বলি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। আরেকটি কথা। বিএনপি ও আঠারদলীয় জোট ইলিয়াস আলীর গুমকে ইস্যু করে তার মুক্তির মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার যে আন্দোলন শুরু করেছে তাকে ভন্ডুল করার জন্যে সরকার বিএনপি'র সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধে যে মামলা দিয়েছে তা তাৎপর্যপূর্ণ। গতবছর একই ধরনের ঘটনায় জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমীর, ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেলসহ সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের এবং দলটির কেন্দ্রীয় ও মহানগরী দফতর পুলিশ কর্তৃক অঘোষিতভাবে বন্ধ করে দেয়া এবং অন্য নেতা-কর্মীদের পাইকারীভাবে গ্রেফতার করায় যারা উল্লসিত হয়েছিলেন কিংবা চুপ ছিলেন তাদের অনেকেই এখন সরকারের আসল উদ্দেশ্য উপলব্ধির চেষ্টা করছেন বলে মনে হয়।
বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী অপহরণ ও গুম রহস্যের উন্মোচন এবং তাকে ফেরত দেয়ার জন্য প্রদত্ত আলটিমেটামের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবার প্রেক্ষাপটে দ্বিতীয় দফা হরতালের কথা বলছিলাম। হরতালের আগের দিন অর্থাৎ গত শনিবার দেশের বিভিন্নস্থানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও পুলিশ বাহিনী হরতাল সমর্থকদের উপর একাধিক হামলার খবরও বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এ উপলক্ষে আঠারো দলীয় জোটের অসংখ্য নেতাকর্মী যেমন হতাহত হয়েছেন, তেমনি তাদের শত শত নেতাকর্মী গ্রেফতারেরও শিকার হয়েছেন। সারাদেশ এখন অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে। সরকারের দুঃশাসন, সরকারি দল ও আইন-শৃক্মখলা রক্ষাবাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে হত্যা-গুম, অপহরণ ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সারাদেশ যেমনি প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছে, তেমনি ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী এবং মন্ত্রীদের রাজপথে লাঠি নিয়ে বিরোধীদলের আন্দোলন প্রতিহত করার প্রকাশ্য ঘোষণা দেশকে রাজনৈতিক সংঘাত-সংঘর্ষ, এমনকি গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে হয়। দেশের মানুষ এখন চরম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। খুন, ডাকাতি, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি এবং নারী নির্যাতনসহ সবক্ষেত্রেই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সার্বিক আইন-শৃক্মখলা পরিস্থিতি বেসামাল হয়ে পড়েছে। সহযোগী দৈনিক যুগান্তরের এক সমীক্ষা রিপোর্ট অনুযায়ী ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার পর আতঙ্কগ্রস্ত রাজনীতিবিদরা অনেকেই রাতের বেলা বাসা থেকে বের হতে ভরসা পাচ্ছেন না। নিউইয়র্কভিত্তিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) শুক্রবার ২৭ এপ্রিল এক বিবৃতিতে বলেছে, এম ইলিয়াস আলীসহ বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সরকারকে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। মহাজোট সরকার ক্ষমতা নেয়ার পর থেকে শুক্রবার পর্যন্ত রাজনৈতিক বিবেচনায় ৭০৩২ জন আসামীকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় যাদের নাম প্রত্যাহার করা হয়েছে তাদের অধিকাংশই হত্যাকান্ডসহ সন্ত্রাসী কার্যকলাপে জড়িত। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর চাঞ্চল্যকর দুটি হত্যা মামলার ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত ২২ আসামীকে দন্ডাদেশ মওকুফ করে দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। এক বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক নেতাসহ ১১৮ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৬২ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সূত্র জানিয়েছে। তাছাড়া ৩ হাজার ৪১২ জন বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন। আইন-শৃক্মখলা পরিস্থিতি ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে। প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো স্থানে নৃশংস খুনের ঘটনা ঘটছে। রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হচ্ছে। কোনো বড় ধরনের ঘটনা ঘটলে সরকারের নীতি-নির্ধারকদের ইশারায় তদন্ত করতে হয় পুলিশ ও র‌্যাবকে। ফলে ঘটনাগুলো ধামাচাপা পড়ে যায়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ব্র্যাড এডামস মনে করেন যে, বাংলাদেশে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা, বিশেষ করে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের হত্যা-গুমের নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। গত ১৭ এপ্রিল গাড়ি চালকসহ জনাব ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত তার কোনো খোঁজ সরকার দিতে পারেননি। বলাবাহুল্য, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এই মানবাধিকার সংস্থাটির রিপোর্টে বিস্ময়ের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে ইলিয়াস আলীকে খুঁজে বের করার জন্য প্রধানমন্ত্রী পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে একই সঙ্গে বলেছেন সরকারকে বেকায়দায় ফেলা এবং আন্দোলনের ইস্যু তৈরির জন্য বিএনপি চেয়ারপার্সনের নির্দেশে ইলিয়াস আলী ও তার গাড়ি চালক লুকিয়ে রয়েছেন। সংস্থাটির মতে এই বিষয়টি আশ্চর্যজনক।
আশ্চর্যজনক শুধু প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যই নয়, পুরো ঘটনাটি প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী ইলিয়াস আলী যখন অপহৃত হন তখন অকুস্থলের নিকটেই একজন পুলিশ কর্মকর্তা ডিউটিরত ছিলেন। তিনি হৈ চৈ শুনে অতিদ্রুত সেখানে যান এবং ইলিয়াস আলীকে জোরপূর্বক গাড়িতে তোলার প্রাক্কালে এক ব্যক্তিকে ধরে ফেলেন। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী এ পর্যায়েই অপহরণকারীরা তাদের গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তা বলে দাবি করে এবং পরিচয়পত্র প্রদর্শন করে তাকে সরে যেতে বলে। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা অপহরণের কাজে ব্যবহৃত গাড়ির মধ্যেও একটি গোয়েন্দা সংস্থার পরিচয় সংক্রান্ত কিছু সামগ্রী দেখতে পান এবং পিছু হটে আসেন। পুরো বিষয়টি পার্শ্ববর্তী এলাকার একজন ডাব বিক্রয়কারী প্রত্যক্ষ করেছেন এবং পার্শ্ববর্তী একটি বাড়ির এক ব্যক্তি মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় তা ধারণও করেছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে এই যে, এদের সবাই এখন নিখোঁজ। প্রত্যক্ষদর্শী নিখোঁজ ডাব বিক্রেতা সোহেল রানার পিতা রহমত আলীর অভিযোগ অনুযায়ী পুলিশ সনি ক্লাব থেকে তার ছেলেকে ধরে নিয়ে গেছে। সোহেল ২৫ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ। বনানী থানার অফিসার ইনচার্জের দেয়া তথ্য অনুযায়ী তারা তাকে ছেড়ে দিয়েছে, হয়ত অন্য কোনো এজেন্সি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে নিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু সোহেলের পিতা বলেছেন যে, পুলিশ তার ছেলেকে ছাড়েনি। গত শুক্রবার রাতে ছেলেকে দেখতে গেলে তাকে শনিবার ১২টায় যেতে বলা হয়েছে এবং সাথে সাথে এও বলা হয়েছে যে আগামী ১০ দিনের মধ্যেও পুলিশ সোহেলকে ছাড়বে না। এই এক অদ্ভুত কান্ড। পুলিশ ইচ্ছামত লোকজনকে গ্রেফতার করে লুকিয়ে রাখছে। দেশের আইন-কানুন সংবিধানের কোনও তোয়াক্কা করছে না। তাদের আত্মীয়-স্বজন আহাজারী করছেন। আমাদের সংবিধানের ৩৩নং অনুচ্ছেদে পরিষ্কার বলা আছে গ্রেফতারকৃত কোনও ব্যক্তিকে যথাসম্ভব শীঘ্র গ্রেফতারের কারণ জ্ঞাপন না করে প্রহরায় আটক রাখা যাবে না এবং উক্ত ব্যক্তিকে তার মনোনীত আইনজীবীর সাথে পরামর্শের এবং তার আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। এতে আরো বলা হয়েছে, গ্রেফতারকৃত ও প্রহরায় আটক প্রত্যেক ব্যক্তিকে গ্রেফতারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে হাজির করা হবে এবং ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ব্যতীত তাকে তদতিরিক্তকাল প্রহরায় আটক রাখা যাবে না। আমাদের সরকার তার পুলিশ ও আইন-শৃক্মখলা বাহিনী সংবিধানের এই অনুচ্ছেদটি মানছেন না। একইভাবে তারা মানছেন না এ ব্যাপারে প্রদত্ত দেশের উচ্চ আদালতের দিক-নির্দেশনাও।
ইলিয়াস আলীর গুমের রহস্যটি উদঘাটিত হবার সম্ভাবনা খুবই কম বলে আমার ধারণা। এর কারণ হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্টে কিছুটা উল্লেখ করা হয়েছে। ইলিয়াস আলী গুম হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী যে মন্তব্যটি করেছেন সেটি ছিলো এই যে, আন্দোলনের ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করার জন্য বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ইলিয়াস আলীকে লুকিয়ে রেখে তাকে অপহরণ ও গুম করা হয়েছে বলছেন বলছেন। পাশাপাশি পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী তিনি তার সন্ধান করার জন্য আইন-শৃক্মখলা বাহিনীকেও নির্দেশ দিয়েছেন। তার এই নির্দেশের যৌক্তিক যে তাৎপর্য তা হচ্ছে বিরোধীদলীয় নেত্রী যেসব স্থানে তাকে লুকিয়ে রাখার সম্ভাবনা আছে প্রাথমিকভাবে সেসব স্থান থেকে তাকে খুঁজে বের করা। কিন্তু ইলিয়াস আলীর গুমের দু'সপ্তাহ পরও তাকে বের করা যায়নি অথবা তাকে বের করা হয়নি। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের সাথে ঐকমত্য পোষণ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, আইন প্রতিমন্ত্রীসহ শীর্ষস্থানীয় সরকারি নেতারা বলছেন যে, ইলিয়াস আলীর অপহরণ বা গুমের সাথে বিএনপি জড়িত রয়েছে। যদিও তাদের কেউই এ পর্যন্ত এ ব্যাপারে দৃশ্যমান কোন প্রমাণ জাতির সামনে উপস্থাপন করতে পারেননি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে আইন-শৃক্মখলা রক্ষাবাহিনী প্রধানমন্ত্রী অথবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীর মতামতের বিরুদ্ধে কোন কিছু করতে বা বলতে পারেন কিনা। এর একমাত্র উত্তর না। কেননা, তাদের ঘাড়ে একটি মাত্রই মাথা রয়েছে, দু'টি নয়। দেশের গণমাধ্যমসমূহ, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, আইনজীবী এবং সুশীল সমাজের বৃহত্তর অংশ মনে করেন যে, ইলিয়াস আলীকে সরকারি বাহিনী তুলে নিয়ে গেছে এবং কয়েকটি পত্রিকায় তাদের দাবির সমর্থনে প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণী এবং বেশকিছু আলামতেরও উল্লেখ করেছে। আইন-শৃক্মখলা রক্ষাবাহিনী বা পুলিশ তাদের তদন্ত বা অনুসন্ধানে যেহেতু নিরপেক্ষ হতে পারছে না সেহেতু ইলিয়াস আলীকে জনসম্মুখে আনা কিংবা তার অপহরণের ব্যাপারে তদন্তে প্রাপ্ত প্রকৃত তথ্যও তুলে ধরতে পারছে না। কেননা এ তথ্য হয়ত প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রীদের মন্তব্য ও বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক। এ অবস্থায় ইলিয়াস আলী সমস্যার আশু কোন সমাধান হবে বলে মনে হয় না। উপরের অনুমান আরও দৃঢ় হয় যখন দেখা যায় সরকার এই নির্মম ঘটনাটির সুরাহার পথে না গিয়ে ব্যাপক হামলা-মামলার পথ অনুসরণ করছেন। এই পথ শান্তির পথ নয়। সংঘাত ও হানাহানির পথ এবং সংঘাত ও হানাহানি শুরু হলে তা থেকে ফিরে আসা অত্যন্ত কষ্টকর। তবে একটা কথা এখানে বলে রাখা দরকার। ইলিয়াস আলীর অন্তর্ধান বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা অশনি সংকেত হয়ে থাকবে। বিরোধী রাজনীতিকরা এর শিকার হচ্ছেন। তারা নিরাপত্তা বঞ্চিত। কিন্তু এর ঢেউ যে সরকারি দলের ওপর পড়বে না তার গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে না। এই প্রবণতা গণতান্ত্রিক প্রবণতা নয়। সরকারি দল মনে করছেন বিরোধী দলকে নির্মূল করে অনন্তকাল তারা ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবেন। একদলীয় শাসন ব্যবস্থার দিকেই তারা এগুচ্ছেন বলে মনে হয়। ৩০ এপ্রিল সোমবারের দৈনিক যুগান্তরের ৮ম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত সিঙ্গেল কলামের একটি খবরের প্রতি আমি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি ‘‘চৌদ্দগ্রামের বিএনপি নেতাকে জুতারমালা পরিয়ে দল না করার হুঁশিয়ারি’’ শিরোনামে প্রকাশিত এই রিপোর্টটিতে বলা হয়েছে যে, চৌদ্দগ্রাম উপজেলা বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক হাসান শাহরিয়ারকে সরকার দলীয় ছাত্রলীগ নামধারী নেতাকর্মীরা বেধড়ক মারধর করে গলায় জুতার মালা পরিয়ে লাঞ্ছিত করার প্রতিবাদে রোববার হাসান শাহরিয়ার একটি সংবাদ সম্মেলন করেছে। সংবাদ সম্মেলনে হাসান শাহরিয়ার অভিযোগ করে বলেছেন, বুধবার ছাত্রলীগ নামধারী কাজী রিয়াদ, ইসমাইল, সায়মনসহ ১৫/২০ জন নেতাকর্মী তাকে জোরপূর্বক অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে বাড়ি থেকে নিয়ে আসে এবং বেদম মারধর করে গলায় জুতার মালা পরিয়ে হুমকি দিয়ে বলে, ভবিষ্যতে যেন বিএনপির রাজনীতি না করি। যদি এ কথার পরও বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত থাকি তাহলে তাকে ইলিয়াস আলীর মত গুম করা হবে। এ ঘটনার পরে হাসান শাহরিয়ার জীবনের নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের দাবিতে শনিবার চৌদ্দগ্রাম থানায় অভিযোগপত্র দায়ের করেছেন। খবরটির শিরোনামের উপরেই গলায় জুতার মালা পরা অবস্থায় বিএনপি নেতা হাসান শাহরিয়ারের একটি ছবিও ছাপা হয়েছে। এই খবরটি থেকে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, ইলিয়াস আলী গুমের ম্যাসেজটি তার তাৎপর্যসহ আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে এবং ঐ পর্যায় পর্যন্ত আওয়ামী নেতাকর্মীরা বিশ্বাস করে যে, ইলিয়াসকে তারা অর্থাৎ তাদের দলীয় সরকারই গুম করেছে। এর পর আর মন্তব্য করা নি্রয়োজন।
শেষ করার আগে শেখ সাদীর একটি গল্প বলি। একবার একটি বণিক দল বাণিজ্য সফরে বেরিয়েছিলেন। কয়েক ক্রোশ যাবার পর একদল ডাকাত প্রকাশ্য দিবালোকে তাদের পথ আগলে ধরে এবং সর্বস্ব কেড়ে নিতে উদ্যত হয়। এই অবস্থায় বণিক দলের একজন প্রবীণ সদস্য আক্ষেপ করে বলে উঠেন যে, সারাজীবন শুনে এসেছি চোর-ডাকাতরা গৃহস্থ ও ভালো মানুষদের ভয় করে এবং তাদের দেখলে পালায়। এখন দেখছি জামানা পাল্টে গেছে। তারাই এখন আমাদের তাড়াচ্ছে। আমাদের সমাজের অবস্থাও এখন অনেকটা এরকমের হয়ে পড়েছে। দাগী অপরাধী ও চোর-ডাকাতরা সমাজের দন্ডমুন্ডের কর্তা হয়ে সজ্জনদের মাথার ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে এবং তাদের অত্যাচার, নির্যাতন এবং গুমের শিকার বানাচ্ছে। দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের পালন করাই হচ্ছে পুলিশের কাজ। পুলিশের লোকেরা এখন শিষ্টদের দমন করছে দুষ্টকে করছে লালন-পালন। একজন মন্ত্রী ঘুষ কেলেংকারির ঘটনা থেকে মানুষের দৃষ্টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য একজন রাজনীতিককে গুম করা তারই প্রমাণ। এই অবস্থার অবসান ঘটানোর দায়িত্ব শুধু ১৮ দলীয় রাজনৈতিক জোট বা নেতাদের নয়, ১৬ কোটি মানুষের প্রত্যেকের। তারা কি তাদের দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসবেন না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন