বৃহস্পতিবার, ৫ জুলাই, ২০১২

জনাকয়েক দুর্নীতিবাজের জন্য অসম্মানিত জাতি



শা হ আ হ ম দ রে জা
মাঝখানে দু-তিন দিন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এবং যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে খুবই সোচ্চার দেখা গেছে। পাঠকরাও সম্ভবত টেলিভিশনের পর্দায় তাদের দেখে থাকবেন। অর্থমন্ত্রী তো রাগই সামাল দিতে পারছিলেন না। পহেলা জুলাই সংবাদ সম্মেলনে এবং তার পরদিন জাতীয় সংসদে এমনভাবেই সব দোষ তিনি বিশ্বব্যাংকের ওপর চাপাচ্ছিলেন, যা দেখে মনে হচ্ছিল যেন বিশ্বব্যাংক বিএনপি বা জামায়াতের মতো বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দল, যার বিরুদ্ধে যখন-তখন যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই বলা ও ব্যবস্থা নেয়া যায়! বিশ্বব্যাংকের বিদায়ী প্রেসিডেন্ট রবার্ট জোয়েলিককেও তুলোধুনো করেছেন তিনি। মনে হয়েছে যেন এই একজন মাত্র ব্যক্তির ইচ্ছাতেই সবকিছু ভণ্ডুল হয়ে গেছে! মিস্টার মুহিত শুধু এটুকু বলতেই বাকি রেখেছেন যে, রবার্ট জোয়েলিক তাদের কাছে দু-চার লাখ ডলার ঘুষ চেয়েছিলেন, কিন্তু তারা রাজি হননি বলেই বিদায়ের ঠিক প্রাক্কালে লোকটি বাংলাদেশের ঋণ বাতিল করে গেছেন! ওদিকে ওবায়দুল কাদেরও যথেষ্টই শুনিয়েছেন। লগি-বৈঠার হত্যা-সন্ত্রাসে ভরা দিনগুলোতে বঙ্গভবনের অক্সিজেন বন্ধ করার ঘোষণা দিয়ে ‘বিখ্যাত’ হয়ে ওঠা এই নেতা জেনারেল মইন উ’দের ধোলাই খাওয়ার পর ‘কারাগারের পাঠশালায়’ নাকি ‘অনেক কিছু’ শিখে এসেছিলেন। সেই থেকে তিনি শুদ্ধ-অশুদ্ধ বাংলায় নাটকের ঢঙে কথা বলেন। ২ জুলাই তিনি বলে বসেছেন, ‘তদন্তনাধীন’ (হবে তদন্তাধীন) বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়াটা নাকি বিশ্বব্যাংকের উচিত হয়নি! ওবায়দুল কাদের একইসঙ্গে ‘চমক’ দেখানোর ঘোষণাও শুনিয়েছেন। কিন্তু জানাননি, সে ‘চমকে’র ধরন কেমন এবং ঠিক কীভাবে বা কাদের সহায়তা নিয়ে ‘চমক’টি দেখাবেন তারা। তীব্র সমালোচনার মুখে মন্ত্রীকে অবশ্য এক দিনের মধ্যেই সুর পাল্টাতে হয়েছে। মালয়েশিয়ার কল্পিত সাহায্য নিয়ে গালগল্প জুড়ে দেয়ার পরিবর্তে তিনি ‘ভুল স্বীকার করে’ বিবৃতি দিয়েছেন। অন্যদিকে অর্থমন্ত্রীর মুখে তালা লাগিয়ে দিয়েছেন বিশ্বব্যাংকের নতুন প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম। দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই তিনি তার পূর্বসূরির সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে ঘোষণা করেছেন।
এভাবে শুরু করার কারণ সম্পর্কে নিশ্চয়ই বাড়িয়ে বলার দরকার পড়ে না। অবশেষে বিশ্বব্যাংক সত্যিই পদ্মা সেতু চুক্তি বাতিল করেছে। ৩০ জুন ওয়াশিংটনের সদর দফতর থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুকেন্দ্রিক দুর্নীতি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ব্যাপারে আওয়ামী মহাজোট সরকারের অসহযোগিতার কথা উল্লেখ করেছে। বলেছে, বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি কানাডার পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তা এবং বেসরকারি পর্যায়ের ব্যক্তিদের মধ্যে ‘উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতিমূলক ষড়যন্ত্র’ সম্পর্কে বিভিন্ন উত্স থেকে ‘বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-প্রমাণ’ পাওয়া গেছে। এসবের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংকের পরিচালিত তদন্তের দুটি রিপোর্ট বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানকে দেয়া হয়েছে। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে এবং ২০১২ সালের এপ্রিলে রিপোর্ট দুটি পৌঁছে দেয়ার সময় বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির ব্যাপারে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। সংস্থার অবস্থান ব্যাখ্যা করার এবং পাঠানো প্রস্তাবের জবাবে সরকারের সিদ্ধান্ত ও তত্পরতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে জানার জন্য বিশ্বব্যাংক ঢাকায় একটি প্রতিনিধি দলও পাঠিয়েছিল। কিন্তু সরকারের প্রতিক্রিয়া ও জবাব ‘সন্তোষজনক’ ছিল না। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আহ্বান ও দুর্নীতিসংক্রান্ত তিনটি প্রসঙ্গের প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হয়নি। কোনো পদক্ষেপও নেয়নি সরকার। সে কারণে বিশ্বব্যাংকের পক্ষে ‘চোখ বুজে থাকা’ সম্ভব হয়নি। যে কোনো প্রকল্প স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন করার জন্য বিশ্বব্যাংক তার দাতাদের কাছে দায়বদ্ধ বলেই সংস্থাটি পদ্মা সেতু চুক্তি বাতিল করেছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, বিশ্বব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জনগণের জন্য প্রচণ্ড অসম্মান হিসেবেই এসেছে। ক্ষমতাসীনরা কথায় কথায় যার দোহাই দিয়ে থাকেন সে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দেশের মান-সম্মান একেবারে মাটিতে মিশে গেছে। আওয়ামী মহাজোট সরকারের দুর্নীতি, অসততা এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় অযোগ্যতার কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন থেকে ধরে নেবে, বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে সর্বোচ্চ পর্যায়ের লোকজন তথা ক্ষমতাসীনরাও দুর্নীতিতে আপাদমস্তক জড়িত। এর ফলে বাংলাদেশকে যে কোনো সাহায্য বা ঋণ দেয়ার আগে সব দেশ ও দাতা সংস্থা দশবার চিন্তা করবে। এমন দুর্নাম জাতির ভবিষ্যতের জন্য নিঃসন্দেহে ভয়ংকর। অথচ ক্ষমতাসীনরা একটু সতর্ক ও যত্নবান হলেই বিশ্বব্যাংককে চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত থেকে নিবৃত্ত করা যেত। পর্যালোচনায় দেখা যাবে, পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ মূলত নিয়েছিল বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার। ২০০৪ সালে জাপানি সংস্থা জাইকাকে দিয়ে মাওয়া-জাজিরা প্রান্তে বিস্তারিত সমীক্ষাও জোট সরকারই করিয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় যুক্ত হয়েছিল বিশ্বব্যাংক এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। জাইকাসহ অন্য দু-একটি সংস্থা ও রাষ্ট্রও পদ্মা সেতু নির্মাণের ব্যাপারে সাহায়তা করতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু উদ্দেশ্যে অসততা থাকায় এবং সেতু নির্মাণের মাধ্যমে জাতির সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার পরিবর্তে ক্ষমতাসীনদের মধ্যে নিজেদের আখের গোছানোর উদ্দেশ্য প্রধান হয়ে ওঠায় প্রাথমিক পর্যায় থেকেই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। ঘুষ-দুর্নীতির পথে গোপন আয়োজনের মাধ্যমে পরামর্শক নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতাসম্পন্ন অনেক প্রতিষ্ঠানের দরপত্র বাতিল করে কাজ দেয়া হয়েছিল কানাডীয় প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিনকে। দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছিল তখনই। বিশ্বব্যাংকের প্রবল আপত্তির মুখে দ্বিতীয়বার দরপত্র আহ্বানের নাটক সাজানো হলেও কাজ দেয়া হয়েছে কানাডার এসএনসি-লাভালিনকেই। ওই পর্যায়ে বিশ্বব্যাংক ভেবেছিল, যেহেতু দুর্নীতি নিয়ে কথা উঠেছে এবং সরকারও দ্বিতীয় বার দরপত্র আহ্বান করে কাজ দিয়েছে, সেহেতু ভবিষ্যতে দুর্নীতি নাও হতে পারে। অমন ধারণা ও আশার ভিত্তিতেই ২০১১ সালের ২৮ এপ্রিল বিশ্বব্যাংক ১২০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দেয়ার চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। মে ও জুন মাসে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল আইডিবি, এডিবি ও জাইকার সঙ্গে। সব মিলিয়ে ঋণ পাওয়া যেত ২২২ কোটি মার্কিন ডলার—বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা।
কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার বলে কথা! দুর্নীতির প্রথম তথ্য ফাঁস করেছিল দুনিয়া কাঁপানো ওয়েবসাইট ‘উইকিলিকস’। ২০১১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ‘উইকিলিকস’ জানিয়েছিল, বাংলাদেশের যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের ‘সততায় ঘাটতি আছে’। সঙ্গে সঙ্গে তত্পর হয়ে উঠেছিল বিশ্বব্যাংক। প্রথম অভিযোগে বিশ্বব্যাংক বলেছিল, টেন্ডার বাছাইকালে অন্য সব বিদেশি কোম্পানিকে ডিঙিয়ে ঘুষের বিনিময়ে কানাডার কোম্পানিকে মনোনীত করা হয়েছে। দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছিল, তত্কালীন যোগাযোগমন্ত্রী ও যোগাযোগ সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কানাডার এই কোম্পানির কাছে ১০ শতাংশ হারে ঘুষ দাবি করেছিলেন। ঘুষের এই বাণিজ্যে বিশেষ কারও কারও প্রবাসী স্বজনসহ প্রভাশালীদের নামও এসেছিল—যারা ‘উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতিমূলক ষড়যন্ত্র’ করেছিলেন। বিষয়টি তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিশ্বব্যাংক প্রথমে শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে ক্ষমতাসীনরা সে সময় অভিযুক্তদের পক্ষেই সাফাই গাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছিলেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত বলে বসেছিলেন, টাকাই যেখানে আসেনি সেখানে ঘুষ খাওয়ার ও দুর্নীতি করার প্রশ্ন আসে কীভাবে? দুর্নীতি দমন কমিশন—দুদকও জনগণকে স্তম্ভিতই করেছিল। তদন্তের নামে হৈচৈ করলেও মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে সততার সার্টিফিকেট দিয়েছিল দুদক।
সরকার ও দুদকের এই কার্যক্রমে বিশ্বব্যাংক সন্তুষ্ট হতে পারেনি। সংস্থাটি তখন কানাডা সরকারকে তদন্ত করার আহ্বান জানিয়েছিল। থলের বেড়ালও সে সময়ই বেরিয়ে পড়েছিল। তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিল কানাডীয় প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিন। এর দু’জন কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। তাদের কাছ থেকেই জানা গেছে, যোগাযোগমন্ত্রী ও সচিবসহ তিনজন ১০ শতাংশ হারে ঘুষ দাবি করেছিলেন এবং এসএনসি-লাভালিনও ঘুষ দিতে সম্মত হয়েছিল। এ ব্যাপারে মধ্যস্থতা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর এক মরহুম ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে। ওয়াশিংটন ও লন্ডনে বসবাসরত বিশিষ্ট আরও জনাকয়েকের নামও প্রকাশিত হয়েছিল। এসব তথ্যের ব্যাপারে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিশ্বব্যাংক তাাগিদ দিয়েছিল সরকারকে। সংস্থাটি একইসঙ্গে তাদের তদন্ত রিপোর্টও পাঠিয়েছিল। অন্যদিকে সরকারের পাশাপাশি দুদকও ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টাই চালিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পাঠানো রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর ২০ জুনও দুদকের চেয়ারম্যান ঘোষণা করেছেন, ১০ শতাংশ হারে ঘুষ চাওয়ার ব্যাপারটিতে নাকি হিসাবের ‘গরমিল’ রয়েছে! বিশ্বব্যাংকের বুঝতে অসুবিধা হয়নি, সংস্থাটির রিপোর্টে যেহেতু ‘প্রভাবশালী’ অনেকের নাম এসেছে সে কারণে দুদকের পক্ষে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে না। এজন্যই বিশ্বব্যাংক শেষ পর্যন্ত চুক্তি বাতিল করেছে। বিশ্বব্যাংক কিন্তু কানাডীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘুষ-দুর্নীতিকেই একমাত্র কারণ বানায়নি। তথ্য-প্রমাণসহ বরং বলেছে, পদ্মা সেতুকেন্দ্রিক দুর্নীতি হয়েছে আরও অনেকভাবেই। একটি উদাহরণ হিসেবে সেতু নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণের কর্মকাণ্ডে চুরি, জালিয়াতি ও দুর্নীতির কথা উঠেছে। পদ্মা সেতুর জন্য সরকার দু’হাজার ৭২০ দশমিক ৭৩ একর জমি অধিগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। বাংলাদেশেরও বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টে জানা গেছে, পরিকল্পিত সেতুর এলাকাসংলগ্ন অঞ্চলগুলোয় নালজমিকে ভিটেবাড়ি হিসেবে দেখিয়ে, কোথাও একজনকে অন্যের জমির মালিক সাজিয়ে এবং কোথাও বা খাসজমিতে রাতারাতি বাড়িঘর নির্মাণ করেও বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাট করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের লোকজনই যে এসব জালিয়াতি ও দুর্নীতিতে জড়িত সে ব্যাপারেও জানতে পেরেছে বিশ্বব্যাংক। সর্বব্যাপী এ দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ারই তাগিদ দিয়েছিল বিশ্বব্যাংক। অন্যদিকে যোগাযোগমন্ত্রী ও সচিবসহ দু-চারজন কর্মকর্তাকে বদলি করার বাইরে আর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি সরকার। এর মধ্য দিয়েও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ক্ষমতাসীনদের মধ্যকার কয়েকজন এবং বিদেশে বসবাসরত তাদের স্বজনরা দুর্নীতিতে জড়িত থাকায় সরকার জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়নি। ফল যা হওয়ার তা-ই হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের সিদ্ধান্তটি শুধু গোটা জাতির জন্যই লজ্জাকর ও অসম্মানজনক নয়, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দৃষ্টিকোণ থেকেও অতি ধ্বংসাত্মক। যেহেতু বিশ্বব্যাংকসহ দাতা সংস্থা ও রাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় বলে ক্ষমতাসীনরা মনে করেন, সেহেতু সরকারের উচিত বিশ্বব্যাংকের অসন্তোষ দূর করার জন্য তত্পর হয়ে ওঠা। কারণ কেবলই সমালোচনা ও বিরোধিতা বরং তিক্ততা আরও বাড়াবে, যার নেতিবাচক প্রভাব এদেশে চলমান অন্য অনেক প্রকল্পের ওপরও পড়তে পারে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে এখনও ৩৪টি প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক ৫৮০ কোটি ডলারের সহায়তা দিয়ে চলেছে। শুধু সে কারণে নয়, নতুন পর্যায়ে পদ্মা সেতু নিয়ে যোগাযোগ শুরু করার সদিচ্ছা থাকলেও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে তিক্ততা বাড়ানোর পরিণতি ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। আমরা মনে করি, অনেক হয়েছে, ক্ষমতাসীনদের যোগ্যতা ও পারঙ্গমতার ব্যাপারেও ধারণা যথেষ্টই পাওয়া গেছে। সত্যি পদ্মা সেতু নির্মাণ করার সদিচ্ছা থাকলে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে আবুল মাল আবদুল মুহিত এবং ওবায়দুল কাদেরের মতো ‘অতি যোগ্য’ মন্ত্রীদের উচিত দয়া করে জিহ্বা সামাল দেয়া। কারণ হিসাবের ‘গরমিল’ খোঁজা বা ‘চমক’ দেখানোর মতো কোনো বিষয়েই জনগণের আগ্রহ নেই, জনগণ চায় পদ্মা সেতু যেন রাজনীতির ‘মুলা’ হয়ে ঝুলে না থাকে। সরকারের যেহেতু বিশ্বব্যাংকসহ দাতা সংস্থা ও রাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া পদ্মা সেতুর মতো বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা নেই, সেহেতু কারও সঙ্গে তিক্ততা বাড়ানোর পরিবর্তে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করারই জোর উদ্যোগ নেয়া উচিত। মূলত সে উদ্দেশ্যেই সরকারের উচিত বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ ও দুটি রিপোর্টসহ প্রকৃত সব ঘটনা প্রকাশ করা। পদ্মা সেতুকেন্দ্রিক দুর্নীতিতে জড়িত হিসেবে বিশ্বব্যাংক যাদের নাম এনেছে তারা কারা সে পরিচিতি যেমন প্রকাশ করতে হবে, তেমনি জানাতে হবে ঠিক কোন ধরনের কারণে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়নি। অভিযুক্তদের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কারও স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনেরা রয়েছেন কিনা তা যেমন জানানো দরকার, তেমনি দরকার অন্য একটি জিজ্ঞাসারও জবাব দেয়া—বিশ্বব্যাংক কেন ‘উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতিমূলক ষড়যন্ত্র’ কথাটা বলেছে? বিশ্বব্যাংকের পক্ষে কেন ‘চোখ বুজে থাকা’ সম্ভব হয়নি, সে জিজ্ঞাসারও জবাব দিতে হবে। এসবের জবাব না দিয়ে অর্থমন্ত্রী যদি নতুন পর্যায়েও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ঝগড়া বাধাতে থাকেন এবং যোগাযোগমন্ত্রী যদি ‘চমক’ দেখাতে চান তাহলে আর যা-ই হোক পদ্মা সেতু অন্তত নির্মাণ করা যাবে না। রাখঢাক করার পরিবর্তে প্রতিটি বিষয়ে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা এবং স্পষ্ট ভাষায় জাতিকে তথ্য জানানো এখন সরকারের জন্য অবশ্যপালনীয় কর্তব্য হয়ে উঠেছে। এই কর্তব্য কতটা পালন করা হবে সে বিষয়ে অবশ্য এরই মধ্যেই সংশয়ের সৃষ্টি করেছেন ক্ষমতাসীনরা। দেখা যাচ্ছে, বিরোধী দলগুলো যখন সঙ্গত কারণে জাতীয় সম্মানের প্রশ্ন তুলেছে তখন জবাবদিহিতার পরিবর্তে ক্ষমতাসীনরা উল্টো দলীয় কর্মী ও ক্যাডারদের দিয়ে মিছিল করাচ্ছেন। তারা এমনকি বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে হুংকার দিতে শুরু করেছে। এই মনোভাব থাকলে সমস্যার সমাধান হবে না। এখন প্রথমে দরকার জাতিকে সবিস্তারে সবকিছু জানানো এবং পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সৃষ্ট সঙ্কট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা। প্রধানমন্ত্রীকে বুঝতে হবে, ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগে বাংলাদেশের মান-মর্যাদা এরই মধ্যে ধুলায় মিশে গেছে। এই মর্যাদা ফিরিয়ে আনা না গেলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জাতিকে সব সময় মাথা নিচু করে থাকতে হবে। দেশের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে সর্বাত্মকভাবে। জনাকয়েক দুর্নীতিবাজকে রক্ষার জন্য এমন পরিণতি কিছুতেই চাইবে না জনগণ।
লেখক : সাংবাদিক ও ইতিহাস গবেষক
shahahmadreza@yahoo.com

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন