মঙ্গলবার, ৩ জুলাই, ২০১২

দৃষ্টিভঙ্গি বদলান জীবন বদলে যাবে-২

দৃষ্টিভঙ্গি বদলান জীবন বদলে যাবে-২


॥ মে. জে. (অব:) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক ॥

দু’টি ঘটনা পরস্পরের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত নয়। তবে দু’টিই আনন্দময়। আনন্দদাতা ও আনন্দগ্রহীতা উভয়ের মধ্যে সম্পর্কের প্রোপট প্রায় একই রকম। একটি ঘটনা একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন থেকে। তিনি একজন বাঙালি তরুণÑ নাম ইবরাহিম। ১৯৭০ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে ইবরাহিম যোগদান করেছিলেন পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি কাকুলে। ওটা ছিল ২৪তম ওয়ার কোর্স; ৯ মাসের প্রশিণ। যোগাদানের তারিখ ছিল ৯ জানুয়ারি আর প্রশিণ শুরু হয়েছিল ১২ জানুয়ারি থেকে। ৯ তারিখ পুরো দিন সবাই একাডেমিতে যোগ দেন। তিন-চার দিনের মধ্যেই আবিষ্কার হলো, ওই ২৪তম ওয়ার কোর্সে ১৭০ জন প্রশিণার্থীর মধ্যে প্রায় ৩০ জনের মতো ছিল বাঙালি। ৯ মাসের প্রশিণ শেষে সব বাঙালি তরুণই কমিশন পেয়েছিলেন। এটা ছিল অত্যন্ত আনন্দের বিষয়। এসব বাঙালি ভাইয়ের মধ্যে একজন তরুণের নাম ছিল শফি ওয়াসি উদ্দিন। তার বাবা ছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন তিন তারকা জেনারেল তথা লেফটেন্যান্ট জেনারেল; নাম খাজা ওয়াসি উদ্দিন। খাজা ওয়াসি উদ্দিন ছিলেন ইতিহাসখ্যাত বাংলাদেশের মানুষের ঐতিহ্যের অংশ, ঢাকার বিখ্যাত নবাব পরিবারের সন্তান। ওই সময় জেনারেল ওয়াসি উদ্দিন তৎকালীন পাকিস্তানের অন্যতম প্রদেশ পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়েটা সেনানিবাসে অবস্থিত একটি কোর-এর অধিনায়ক ছিলেন। সেনাবাহিনীর সাংগঠনিক কাঠামোতে দুই বা ততোধিক পদাতিক বা সাঁজোয়া ডিভিশনের মিলিত রূপকে কোর বলা হয়। ডিভিশন কমান্ডার হন মেজর জেনারেল, আর কোর কমান্ডার হন লেফটেন্যান্ট জেনারেল। 
৯ মাস প্রশিণ শেষে কোর্স যখন কমিশন পায় তখন একটি পাসিং আউট প্যারেড অনুষ্ঠিত হয়। সেই পাসিং আউট প্যারেডে একজন প্রধান অতিথি থাকেন যিনি প্যারেড রিভিউ করেন, প্যারেডের সালাম গ্রহণ করেন এবং বিভিন্ন সম্মানজনক পুরস্কার আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কারপ্রাপ্তদের কাছে হস্তান্তর করেন। ২৪তম ওয়ার কোর্সের সমাপনী কুচকাওয়াজে প্রধান অতিথি হিসেবে মনোনীত হয়ে এসেছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল খাজা ওয়াসি উদ্দিন। তারই ছেলে ওই প্যারেডে একজন অংশগ্রহণকারী ছিলেন এটা ছিল বাস্তবতা। এটা কি একান্তই কাকতালীয় ছিল, নাকি ঐতিহ্যগতভাবেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে এর রেওয়াজ ছিল তা আমি জানি না। কিন্তু যেটা খাজা ওয়াসি উদ্দিনের জন্য পরিকল্পিত ছিল না বা সব বাঙালির জন্যও পরিকল্পিত ছিল না তা হলো, পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি ঐতিহ্যের অন্যতম অংশীদার ঢাকার নবাব পরিবারের সন্তান খাজা ওয়াসি উদ্দিনের হাত থেকে প্রথম স্থান অর্জন করার কারণে গৌরবময় পুরস্কার যার নাম ‘কমান্ডার ইন চিফস কেইন’ (Commander-in-Chief’s Cane) গ্রহণ করেছিলেন একজন বাঙালি তরুণ যার নাম সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম। পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি কাকুলে বা ইন্ডিয়ান মিলিটারি একাডেমি দেহরাদুন ইত্যাদিতে দীর্ঘমেয়াদি কোর্সগুলোতে সর্বোত্তম ক্যাডেটের পুরস্কার হলো ‘সোর্ড অব অনার’ (Sword of honor))। এবং স্বল্পমেয়াদি কোর্সগুলোতে সর্বোত্তম ক্যাডেটের পুরস্কার হলো কমান্ডার-ইন-চিফ’স কেইন। কমিশনের সাত মাস পর নিজ ব্যাটালিয়নের সাথে ইবরাহিম মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন এবং যুদ্ধশেষে আরো কিছুসংখ্যকের মতো তিনিও তার বীরত্বের জন্য ‘বীর প্রতীক’ খেতাবপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। এই বর্ণনায় লণীয় বিষয় হলো, বাঙালি ঐতিহ্যের অংশীদার ঢাকার নবাব পরিবারের সন্তানের হাত থেকে প্রথম পুরস্কার নেন আরেকজন বাঙালি তরুণ। পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি কাকুলের ইতিহাসে মোট তিনবার, তিনজন বাঙালি তরুণ, সর্বোত্তম ক্যাডেট হওয়ার তথা প্রথমস্থান অর্জন করার পর সেই গৌরবময় পুরস্কার গ্রহণ করতে পেরেছিলেন। প্রথম ব্যক্তি ছিলেন পঞ্চাশ দশকের শুরুতে তরুণ আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী ‘সোর্ড অব অনার’ গ্রহণ করেছিলেন। কাইয়ুম ছিলেন প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী সাহিত্যিক, ১৯৭১ সালের শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী এবং সম্প্রতি মরহুম জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর ভাই। মাঝখানে অন্য একজন তরুণ আশরাফ কমান্ডার ইন চিফস কেইন পেয়েছিলেন। আশরাফ পরে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেছিলেন এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে মেজর জেনারেল হয়েছিলেন। ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের সাবেক ছাত্র আশরাফ বর্তমানে মরহুম। 
দ্বিতীয় কাহিনীতে আসি। রিও প্লাস টোয়েন্টি অর্থাৎ রিও-২০ সম্মেলন হয়ে গেল অতি সম্প্রতি ব্রাজিলের বিখ্যাত শহর রিও-ডি জেনেরিওতে। পৃথিবীতে অনেক প্রকার কাজের জন্য অনেক ধরনের পুরস্কার দেয়া হয়। সবচেয়ে বড় পুরস্কারের নাম নোবেল প্রাইজ। পৃথিবীতে যতজন নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন তার মধ্যে তিনজন বাঙালি আছেন। একজন বাঙালি হচ্ছেন এই বাংলাদেশের সন্তান, চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী উপজেলার বাথুয়া গ্রামের সন্তান প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বাথুয়া গ্রাম এবং আমার জন্মস্থান উত্তর বুড়িশ্চর গ্রাম পাশাপাশি প্রতিবেশী। রিও মহানগরীতে বিশ্ব ধরিত্রী সম্মেলন চলাকালে জুন মাসের ২০ তারিখ একটি বিখ্যাত পুরস্কার প্রদানের অনুষ্ঠান হয়েছিল। নাম ইকুয়েটর পুরস্কার। ইকুয়েটর (Equator) মানে বিষুব রেখা। বিষুব রেখা মানে পৃথিবীকে উত্তর ও দণি গোলার্ধে ভাগ করে যে কাল্পনিক রেখা। ব্রাজিলের রিও নগরীর একটি বড় সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠানটি হয়েছিল। আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলের মহাসমাবেশের জন্য যেমন শহরের বিভিন্ন স্থানে বিলবোর্ড, পোস্টার ইত্যাদি লাগানো হয়, ওই রূপ রিও মহানগরীতেও লাগানো হয়েছিল। মিলনায়তনের ভেতরে প্রায় দুই হাজার দর্শকের সারিতে বসেছিলেন বিশ্বের অন্তত ২০টি দেশের মন্ত্রী এবং জাতিসঙ্ঘ উন্নয়ন কর্মসূচির প্রধান প্রশাসক হেলেন কার্ক। জাতিসঙ্ঘের পরিবেশবিষয়ক কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক আচিম স্টেইনারও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। তবে ওই অনুষ্ঠানে সবার মধ্যমণি ছিলেন গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা, শান্তির ক্ষেত্রে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশের সন্তান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ওই অনুষ্ঠানে ২৪টি দেশকে বন ব্যবস্থাপনার েেত্র তাৎপর্যপূর্ণ বা ব্যতিক্রমধর্মী অবদানের জন্য পুরস্কার প্রদান করা হয়েছিল। পুরস্কারটি বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধির হাতে তুলে দেন নোবেলজয়ী এই বাংলাদেশী গর্বিত সন্তান। পুরস্কারপ্রাপ্ত দেশগুলোর তালিকায় ছিল ইথিওপিয়া, মরক্কো, গুয়াতেমালা, মাদাগাস্কার, হন্ডুরাস, নিকারাগুয়া, মেক্সিকো, সেনেগাল, চীন, কেনিয়া, মিসর, ফিজি, সোয়াজিল্যান্ড, তাজিকিস্তান, কলম্বিয়া, নাইজেরিয়া, জাম্বিয়া, মার্শাল আইল্যান্ড, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, টোগো ও সুদান। পাশাপাশি এসব দেশের সাথে পাঠক অনুগ্রহপূর্বক যোগ করে নিন বাংলাদেশ নামক দেশটি। 
বাংলাদেশের পে পুরস্কারটি নিতে গিয়েছিলেন আনোয়ার কামাল। আনোয়ার কামালের বাড়ি চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দেিণ অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী উপজেলা লোহাগাড়ার চুনতি গ্রামে। কামাল কেন গিয়েছিলেন? গিয়েছিলেন চুনতি গ্রামের একদল স্বেচ্ছাসেবী পুরুষ ও মহিলার প্রতিনিধি হিসেবে। তাদের গল্পটা আমরা বলি। এর পেছনে কারণ (এক) আমি চট্টগ্রামের সন্তান। (দুই) এই গল্পটি পাঠকের সামনে তুলে ধরে বোঝাতে চাচ্ছি আমাদের দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও দৃষ্টিভঙ্গির সাথে এই গল্পটি সম্পৃক্ত। (তিন) আজকের কলামটিও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির ধারা বহন করে। ওই সুবাদেই আবারো বলতে হচ্ছে, ‘দৃষ্টিভঙ্গি বদলান জীবন বদলে যাবে’। এখন বলব আনোয়ার কামাল এবং তার স্বেচ্ছাসেবী সহযোগীরা কিভাবে একটি গ্রামকে বদলে দিলেন, তার গল্প। 
চুনতির নাম অনেকে শুনেছেন। সেখানে প্রখ্যাত চুনতি শাহ সাহেববাড়ি আছে। সুফিবাদের সাথে জড়িত বা আগ্রহী ব্যক্তিরা এই বাড়িকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখেন। চুনতির চার পাশে রয়েছে ছোট ছোট বন, রয়েছে ছোট টিলা ও পাহাড়। সেখানে বন্যপ্রাণী থাকত, ছিল প্রচুর গাছগাছালি। সুনিবিড় পরিবেশে গাছগাছালিতে ঢাকা ছিল পুরো অঞ্চলটি। গাছগুলোর বয়সও প্রাচীন এবং সংখ্যায় প্রচুর। চুনতির বন ছিল, বন্য পশুপাখি ও জীবজন্তুর জন্য অতি প্রিয়। বিশেষ করে বুনো হাতির জন্য জায়গাটি বেশ প্রিয়। হাতির যখন বাচ্চা প্রসবের সময় কাছে আসত ঠিক তখন তারা যেখানেই অবস্থান করুক না কেন, অনেক পথ পাড়ি দিয়ে হলেও সময়মতো চুনতির বনে চলে আসত। বিশেষজ্ঞদের কাছে প্রমাণ আছে যে, আশপাশের স্থানগুলো থেকে বহু বুনো হাতি এখানে আসত বাচ্চা প্রসব করার জন্য। কিন্তু বাংলাদেশের অন্য জায়গা যেমন হয়েছে চুনতি গ্রামেরও তাই হয়েছে। সেখানে চোরাকারবারিরা গাছ কেটে বন উজাড় বা নিশ্চিহ্ন করে ফেলেছে। চোরা পশুশিকারিরা বন্যপ্রাণী শিকার করে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীকে বিপন্ন করে ফেলেছে। যেহেতু গাছগাছড়া নেই, বন উজাড় হয়ে গেছে, সেহেতু বন্যপ্রাণীগুলো বন ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। আবার শিকারিদের হাতে মারা যাওয়ার ভয়েও তারা বন ছেড়ে পলায়ন করল। বন উজাড়ের সাথে সাথে আশপাশের গরিব দুস্থ মানুষেরা জ্বালানি কাঠের জন্য বন থেকে গাছ সংগ্রহ করত। তারা আর গাছ সংগ্রহ করতে পারল না এবং বিপদে পড়ে গেল। চুনতি গ্রামে অতীতে অনেক মেহমান আসতেন এবং দর্শনার্থীরা আসতেন দূরদূরান্ত থেকে বন দেখার জন্য। বন উজাড়ের সাথে সাথে তারাও আসা বন্ধ করে দিলেন। এমন পরস্থিতিতে এক দিন চুনতি গ্রামের সচেতন বিবেকবান যুবকেরা উপলব্ধি করলেন তারা নিজেরাই নিজেদের জীবন ও অস্তিত্ব বিপন্ন করে ফেলেছেন। ঠিক সে সময় আনোয়ার কামালের নেতৃত্বে একদল তরুণ একত্র হন এবং চূড়ান্তভাবে একটি সিদ্ধান্তে আসেন এই বন ফিরিয়ে আনতে হবে। তখন তারা একটি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করেন। দীর্ঘ দিন অকান্ত পরিশ্রম করে গ্রামবাসীকে বোঝাতে চেষ্টা করলেন যে, এই বন জাতির সম্পদ, আমাদের সম্পদ। এই বনের ওপরে আমাদের মতো পশুপাখিরও অধিকার আছে। এই গাছ আমাদের উপকারে আসে; সুস্থভাবে আমাদেরকে বাঁচতে সাহায্য করে। তাই আমরা আমাদের এবং পশুপাখির স্বার্থে এই বনকে ধবংস করে দিতে পারি না। আমাদেরকে গাছগুলো এবং পশুপাখির প্রতি দয়ালু হতে হবে। তাহলে তারাও আমাদের প্রতিদান দেবে। 
আনোয়ার কামালের নেতৃত্বাধীন সেই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর পরিশ্রমের ফলে গ্রামবাসীর মনে যে নতুন চিন্তা-চেতনার সৃষ্টি হলো, তার কারণেই গ্রাম পাহাড়গুলোতে বনায়ন শুরু হলো। তারা সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সাহায্য নিলেন। গাছ কাটা বন্ধে প্রতিরোধ ও জনসচেতনতা গড়ে তুললেন। চোরাকারবারিদের প্রতিরোধ করতে বনে পাহারাদার নিয়োগ করলেন। এমনকি গ্রামের মেয়েরাও সেই পাহারার কাজে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে অংশ নিলেন। দরিদ্র মানুষের প্রয়োজনে যেন জ্বালানিকাঠ পাওয়া যায়, সে জন্য বনাঞ্চলকে দুই ভাগ করা হলো। বনাঞ্চলের এক ভাগ থেকে কেউ কোনো অবস্থাতেই কোনো প্রকারের কাছ কাটতে পারবে না। আরেক ভাগ থেকে গাছ নেয়ার মতো হলে গ্রামবাসীরা নিতে পারবে। যখন গাছ বড় হওয়া শুরু হলো, কয়েক বছর কষ্টের পর বন আবার বিস্তৃত হলো, তখন বনে বন্যপ্রাণী ফেরত আসা শুরু করল এবং সবার আগে আসতে শুরু করল বুনো হাতি। চুনতির বন এবং আশপাশে যখন হাতির খাদ্য পাওয়া শুরু হলো, নতুন কলাগাছ এবং নানা গাছগাছালি আবার গজাতে লাগল, তখন হাতি নিরাপত্তা বোধ করল। 
বিপন্ন বনকে নতুন জীবন দান তথা পরিবেশ রায় ব্যতিক্রমধর্মী প্রচেষ্টার এই সাফল্যের কথা থেকে বছরখানেক আগে সংবাদ মিডিয়া, আমেরিকার সিএনএন তাদের বিশেষ প্রতিবেদনে প্রকাশ করে। তখনই বিষয়টি পৃথিবীব্যাপী সবার নজরে আসে এবং ক্রমে ক্রমে পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মন কাড়ে। তাদের নজরে আসার সাথে সাথে বিষয়টি তারা মূল্যায়ন করে। ফলে ৬৬টি দেশের মধ্য থেকে ৮১২টি প্রকৃতি সংরণবিষয়ক উদ্যোগকে প্রাথমিক পর্যায়ে বেছে নিয়ে মূল্যায়ন করে যাচাই বাছাই করার মাধ্যমে মোট ২০টি দেশকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। দেশগুলোর নাম উল্লেখ করেছি। অন্য ১০টি দেশের নাম উল্লেখ করিনি যেগুলোকেও বিভিন্ন অবদানের জন্য পুরস্কার প্রদান করা হয়েছিল। 
বন বিভাগের কাছ থেকে চুনতি বন ব্যবস্থাপনা কমিটি ২০০৫ সালে ৮১৬টি গর্জন মাতৃগাছ নিয়েছিল। ২০১২ সালে এই ৮১৬টি গাছের মধ্যে ৮১৪টিকেই জীবিত ও বড় আকারে পাওয়া গেল। যে দু’টি পাওয়া যায়নি তার মধ্যে একটি বজ্রপাতে ভেঙে গিয়েছিল, অপরটি কাঠচোরেরা চুরি করে নিতে সম হয়েছিল। চুনতি বনের আয়তন হলো ৭৩ বর্গকিলোমিটার, যার মধ্যে এক হাজার ২০০ প্রজাতির উদ্ভিদ এবং ৪৫ প্রজাতির উঁচু গাছ আছে। ১৮৭ প্রজাতির বন্যপ্রাণীর বিচরণও ছিল চুনতির অরণ্যে। তবে ২০০৫ সালের আগে যেহেতু বেশির ভাগ বন্যপ্রাণী পালিয়ে গিয়েছিল তাই এখন নতুন করে গণনা করা সম্ভব হয়নি, কতগুলো ফেরত এসেছে। তবে ফেরত যে এসেছে তা নিশ্চিত। এই কথাগুলো বলতে গিয়ে এলাকাবাসী এবং গত শুক্রবারে প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত ফিচারের সাহায্য নিয়েছি। চুনতি গ্রামের মানুষ পাহাড় ও গাছগুলোর প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলিয়েছেন যার পরিপ্রেেিত ২০১২ সালে এসে চুনতি গ্রামের মানুষের জীবনও বদলে গেছে। তারা পৃথিবী কর্তৃক সম্মানিত হয়েছেন। এই চুনতি গ্রামের উদাহরণটি বাংলাদেশের মানুষ মডেল হিসেবে গ্রহণ করবে বলে বিশ্বাস করি। এটাও আশা করি যে, পাঠক এই লেখাটির মূল্যায়ন করবেন। যদি এই সংবাদ বাংলাদেশের অন্য গ্রামের মানুষের কাছে পৌঁছায়, তাহলে তারা এটিকে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে গ্রহণ করবেন। গত সপ্তাহের মঙ্গলবারে এই নয়া দিগন্ত পত্রিকারই সম্পাদকীয় পৃষ্ঠায় প্রকাশিত কলামের ধারাবাহিকতায়, সংপ্তি পরিসর আলোচনায় আবারো একই অনুভূতি প্রকাশ করছি। সেই অনুভূতিটি হলো: দৃষ্টিভঙ্গি বদলান, জীবন বদলে যাবে। তাই আজকের শিরোনামটিও হচ্ছে: ‘দৃষ্টিভঙ্গি বদলান জীবন বদলে যাবে-২’। বাংলাদেশের মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থা ও দৃষ্টিভঙ্গি বদলে নবতরঙ্গের সাথে সুর মিলিয়ে আমরা আরো কয়েকটি কলামে দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবন বদলের ধারা অব্যাহত রাখব। আমরা যদি চিন্তা করি, পাশাপাশি একটু সচেতন হই আমাদের চার পাশের পরিবেশ ও প্রতিবেশী নিয়ে এবং যদি সনাতন চিন্তা পরিহার করি আর ব্যতিক্রমী ও গঠনমূলক চিন্তা গ্রহণ করি, তাহলে নিশ্চিতভাবে আমাদের পাড়া-গ্রাম-মহল্লা-শহর, এমনকি পুরো জাতি তথা দেশের চিত্র বদলে যাবে। 
উদাহরণ হিসেবে আমরা সিঙ্গাপুরের কথা আনতে পারি। সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ থেকে একটি চমৎকার গল্প পেয়েছি। তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়ে আবিষ্কার করেছিলেন, কিভাবে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো যায়। শহরের মানুষ বাইসাইকেল ব্যবহার করে। তারা যেখানেই যায় এই বাইসাইকেলটি তারা রাখে গাছ কিংবা বিদ্যুতের খুঁটির সাথে বা অন্য যেকোনো প্রকারের শক্ত খাম্বার সাথে হেলান দিয়েÑ যা কিছু দণ্ডায়মান পায় তার সাথে হেলান দিয়ে। প্রধানমন্ত্রী নিজে পর্যবেণ করে দেখলেন যদি বিদ্যুতের খুঁটির সাথে হেলান দিয়ে রাখে তাহলে সাইকেলের কোনো তি হয় না এবং খুঁটিরও কিছু হয় না। কিন্তু যদি একটি চারা গাছের সাথে হেলান দিয়ে রাখা হয়, গাছটি কিছু দিন পর হেলে পড়ে। কারণ সেটি সাইকেলের ভর থেকে নিজেকে রা করতে পারে না। তিনি তখন চিন্তা করেছিলেন, কিভাবে মানুষের অভ্যাস বদলানো যায়। তিনি আরো একটি জিনিস আবিষ্কার করেছিলেন, খালি জায়গা পেলে মানুষ মাঝখান দিয়ে পথ অতিক্রম করে কেন? অর্থাৎ গ্রাম-বাংলায় অতীতে যেমন বিলের আড়াআড়ি মধ্যখান দিয়ে হাঁটত শুকনো মওসুমে এক স্থান থেকে অন্যত্র যাওয়ার জন্য, তেমনই। সিঙ্গাপুরেও মানুষ খালি জায়গার পাশে দিয়ে যাওয়া রাস্তা ব্যবহার করত না, দূরত্ব কমানোর জন্য। সিঙ্গাপুর শহরেও প্রধানমন্ত্রী আবিষ্কার করলেন এরূপ একটি ধারা। মনে করুন, এক একর জমি খালি মাঠ বা ময়দান পড়ে আছে। ময়দানের চার পাশ দিয়ে রাস্তা আছে। ময়দানে শিশুরা খেলাধুলা করে। তিনি আবিষ্কার করলেন, পথিক রাস্তা ব্যবহার না করে মাঠের মাঝখান দিয়ে আড়াআড়ি যায়। চিন্তা করলেন এসব অভ্যাস কিভাবে বদলানো যায়? এখন প্রশ্ন হলো সিঙ্গাপুরে কি আর কোনো মানুষ ছিল না এরূপ চিন্তা করার, যাদের দৃষ্টিতে বিষয়টি আসার কথা ছিল? ছিল বটে, কিন্তু তাদের দৃষ্টিতে এটা লণীয় হয়নি। এ েেত্র কেবল প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিতে প্রতীয়মান হয়েছিল। তাই তিনি সিঙ্গাপুর শহরে একটি পদ্ধতি চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি বয়স্কাউট ও গার্লগাইড অর্থাৎ কিশোর-কিশোরীদেরকে সংগঠিত করলেন বিদ্যাপীঠগুলোর মাধ্যমে। আগে তাদেরকে প্রশিতি এবং সচেতন করলেন। পুরো শহরকে বিভিন্ন অঞ্চলে ভাগ করলেন, তাদেরকে স্বেচ্ছাসেবক বানিয়ে শহরের সর্বত্র শূন্য এলাকাগুলোতে পাহারাদার বসালেন, যেন কোনো ভদ্রলোক আড়াআড়িভাবে হাঁটতে গেলে বাধা দিতে পারে। কেউ মাঠ পার হতে পেলেই বালক-বালিকাগুলো তাদেরকে বাধা দিত এবং খুব মিষ্টি সুরে বলত, ‘চাচ্চু-কাক্কু, আপনারা মেহেরবানি করে এই মাঠ আড়াআড়িভাবে পার হবেন না, একটু কষ্ট করে পাশের রাস্তা দিয়ে সোজা হেঁটে যান।’ শিশুদের সুন্দর সম্বোধন ও আচরণে সন্তুষ্ট হয়ে সবাই শিশুদের কথায় সাড়া দিতে শুরু করল। গাছের সাথে সাইকেল রাখার সময় বালক-বালিকারা, কিশোর-কিশোরীরা একটু অনুরোধের সুরে এবং মনোমুগ্ধকর সম্বোধনে বলত, ‘আঙ্কেল, দাদু, ভাইয়া, আপনার সাইকেলটা গাছের সাথে রাখবেন না। শক্ত কোনো জিনিসের সাথে রাখেন। আপনার সাইকেলটি যদি গাছের সাথে রাখেন তাহলে গাছটি ভেঙে যায়, এমনকি কিছ ুদিন পর গাছটি মরে যায়।’ এমন আচরণে মুগ্ধ হয়ে সাইকেল ব্যবহারকারীরা অভ্যাস বদলাতে শুরু করেন। অর্থাৎ এত দিন এই সাইকেলটি রাখার ব্যাপারে মানুষ মনে করত, এটাই বুঝি নিয়ম। কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর কাজে পথ দেখান প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ। সিঙ্গাপুরবাসী প্রধানমন্ত্রীকে অনুসরণ করলেন। ফলে জীবন বদলে গেল। এগুলো ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৬ দশকের ঘটনা। স্বাধীন সিঙ্গাপুরের প্রথম এক দশকের ঘটনা। আজকের সিঙ্গাপুরে যাদের বয়স ৩৫-৪০ বা ৪৫ বছর তাদের ওই সময় হয় জন্ম হয়নি অথবা তখন ছিল অবুঝ শিশু। কিন্তু তারা ওই সময়ের ভালো সিদ্ধান্তগুলোর ফল ভোগ করছেন। 
বাংলাদেশের তরুণসমাজকে আহ্বান জানাচ্ছি দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর জন্য। বয়সে তরুণ না হলেও নিজেকে তরুণ মনে করি। রাজনীতির অঙ্গনে চার বছর সাত মাস আগে নেমেছি এই স্লেøাগান নিয়ে : ‘পরিবর্তনের জন্য রাজনীতি’। এই স্লেøাগানের মানে হলো, দেশের মানুষের চিন্তা-চেতনা-কর্মে পরিবর্তন আনার জন্য প্রচেষ্টা রাজনীতির অঙ্গন থেকেই শুরু করতে হবে। রাজনীতিবিদদের হতে হবে পথিকৃৎ। কিন্তু অনেক লোকের, বিশেষ করে তরুণসমাজের আশীর্বাদ ও শুভকামনা ছাড়া এটা সম্ভব নয়। 
লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
www.kallyan-ibrahim.com

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন