বৃহস্পতিবার, ৫ জুলাই, ২০১২

রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে সংলাপের বিকল্প নেই



॥ কাজী সাইদ ॥

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন এক নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। রাজনীতিবিদেরাই এখন রাজনীতিবিদদের চরিত্র হননে এবং জীবন হরণে সদা তৎপর। মতাসীনেরা এখন বিরোধী দলকে রাজনৈতিক প্রতিপরে চেয়েও জাতশত্র“ ভাবতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। বিরোধীদের নির্মূল করে নিজেদের রাজনৈতিকভাবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। সরকার কোনো ধরনের ব্যর্থতা কবুল করতে একেবারেই নারাজ। ভিন্নমতাবলম্বী অথবা সরকারের শাসন প্রক্রিয়ার কোনো ধরনের সমালোচনা সহ্য করতে এরা নারাজ। বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতৃত্বকে নানা ধরনের মামলা মোকদ্দমায় নাস্তানাবুদ করে রাজনৈতিক অঙ্গনে একধরনের ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হচ্ছে। কথায় কথায় মুক্তবিবেক চর্চার বুদ্ধিজীবীদের সমালোচনার জবাবে বলা হচ্ছে দেশদ্রোহী, রাষ্ট্রদ্রোহী। মাহমুদুর রহমান, আসিফ নজরুল, শফিক রেহমান, আসাফ্ উদ্দৌলাহ্র মতো স্বাধীন মত প্রকাশে বিশ্বাসী বুদ্ধিজীবীদের আদালতে মানহানি মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে। প্রতিহিংসা আর প্রতিশোধের আকাক্সা চরিতার্থ করতে গিয়ে গণতন্ত্রের নিরন্তর চর্চাকে অবজ্ঞা আর উপহাসের দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে। সব েেত্র দলীয়করণের ষোলোকলা ইতোমধ্যে পূর্ণ করা হয়েছে। ভোটের আগে সাধারণ মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে ‘একটু সেবা’ করার সুযোগ চেয়ে যারা ভোটের কাঙাল, ভিুক সেজেছিলেন, তারা মতার মসনদে গিয়ে দাবি করছেন জনগণ তাদের পাঁচ বছরের জন্য মতায় বসিয়েছে। জনকল্যাণে আকাশচুম্বী প্রতিশ্র“তির ফুলঝুড়ি তারা বেমালুম ভুলে গেছে। কোনো কোনো েেত্র সেসব প্রতিশ্র“তিকে এরা অস্বীকার করছে। এ দেশে ভোটে নির্বাচিত মানেই গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত। মতা পাওয়ার পর কোনো ধরনের গণতান্ত্রিক রীতিনীতি-আদর্শ মানতে তারা বাধ্য নয়। যেনতেনভাবে নির্বাচিত হতে পারলেই তো হলো। ভোটডাকাতি করে হোক, সাজানো প্রশাসনকে দলীয় কর্মীর মতো ব্যবহার করে হোক, বিদেশী উপদেশ আর বস্তাভর্তি টাকা পাওয়ার মাধ্যমে হোক কিংবা টেন্ডারবাজদের ভোটবাক্স ছিনতাইয়ের মাধ্যমে হোক, দলীয় সশস্ত্র মাস্তানদের ভোটকেন্দ্র দখলের মাধ্যমেই হোকÑ কোনোভাবে জিতলেই তো হলো। দেশী-বিদেশী কিছু ভাড়াটিয়া নির্বাচন পর্যবেককে দিয়ে ‘নির্বাচন অবাধ-সুষ্ঠু’ হয়েছে বলে সনদ পেয়ে গেলে তো কোনো কথাই নেই। এ ধরনের আর একটি নির্বাচন ভবিষ্যতে বাংলাদেশে অনুষ্ঠানের জন্য বর্তমান মতাসীন সরকার মাইন্ড সেট করে ফেলেছে বলে জনগণ সন্দেহ করছে। 
গোপন কথাটি রবে না গোপনে : আদালতের একটি অতি সংপ্তি রায়ের খণ্ডিত শব্দাবলি ‘তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা মূল সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক’ এর ওপর ভর করে জাতীয় সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে সংবিধানের যে দিন পঞ্চদশ সংশোধনী বিল পাস হলো, সে দিন থেকেই জনমনে উপরোল্লিখিত সন্দেহ দানা বেঁধেছে। মতাসীন মহাজোট নেত্রী যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ‘দানব’ বলে ভর্ৎসনা করেন, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বিরোধী জোটকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘সর্বোচ্চ আদালতের রায় না মানলে রিভিউ আপিল করুন অথবা নির্বাচনে আসুন। দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আবার ফিরিয়ে আনুন। এ ছাড়া কোনো উপায়ে এটা করা সম্ভব নয়।’ অথবা মাহবুবুল হানিফ যখন বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে আরো দুই মেয়াদে মতায় আনতে হবে। এক মেয়াদে জাতির ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব নয়।’ কিংবা আইন প্রতিমন্ত্রী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দিয়ে যেসব বুদ্ধিজীবী তাদের মত দিচ্ছেন, তাদের জ্ঞানপাপী বলে গালাগাল করেনÑ তখন জনমনে বিরোধী জোটের তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবি যথার্থ বলে মনে হওয়াই স্বাভাবিক। ভিশন ২০২১ এর মাজেজাটা এখানেই! স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের আগাম ঘোষণায় রয়েছে এর অন্তর্নিহিত গূঢ় রহস্য। 
নিরপে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করলে বর্তমান মতাসীন জোট ভবিষ্যৎ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার ব্যপারে শঙ্কিত বলে মনে হয়। মতাসীন থেকে দলীয় প্রশাসনকে যথেচ্ছ ব্যবহার করে নির্বাচনে জিতে আসাটা একেবারেই নিশ্চিত। এ কারণেই বিরোধী জোট থেকে দাবি করা হচ্ছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে পুনঃস্থাপনের। তা না হলে দলীয় সরকারের অধীনে বিরোধী জোট নির্বাচনে অংশ নেবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েই ান্ত হয়নি, সে নির্বাচন হতে দেয়া হবে না বলেও জানিয়ে দিয়েছে। মহাজোটের অন্যতম শরিক দল জাতীয় পার্টির কর্ণধার হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা জীবন বাজি রেখে হলেও প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছেন। এতে করে এরশাদের জাতীয় পার্টি এবং মতাসীন আওয়ামী লীগের মধ্যে আগামী নির্বাচন নিয়ে একটি গোপন আঁতাতের পূর্বাভাস পরিলতি হচ্ছে। বিরোধীদলীয় জোট নির্বাচনে না এলে এরশাদের বিরোধীদলীয় নেতার আসনে বসার সম্ভাবনা প্রবল হয়ে দেখা দিয়েছে। ইদানীং জেনারেল এরশাদ মহাজোট ছেড়ে এককভাবে নির্বাচন করার আওয়াজ বুলন্দ হওয়ার পেছনে রহস্যটা এখানেই।
কেন এই মতার মদমত্ততা? পাঠক, চলুন এখন আমরা একজন বিদগ্ধ লেখকের আমাদের দেশীয় রাজনীতিকদের আত্মস্থ রাজনীতির ব্যাকরণের অংশ বিশেষের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করি।
রাজনৈতিক বৈয়াকরণ : বিদগ্ধ রাজনীতিক মরহুম আবুল মনসুর আহমদের ১ জুন ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত ‘গালিভারের সফরনামা’ নামে একটি সার্থক রাজনৈতিক রম্য রচনা। প্রায় অর্ধশত বছর আগে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিকে তিনি যেভাবে উপলব্ধি করেছিলেন এত বছর পরও রাজনৈতিক সংস্কৃতির কোনো গুণগত পরিবর্তন পরিলতি হয়নি। রাজনীতিতে আজ ‘নৈতিকতার’ লেশমাত্র অবশিষ্ট আছে বলে মনে হয় না। তিনি লিখেছিলেনÑ
“১. মনুষ্য-জাতি যে আচরণের দ্বারা রাজদরবারে নীত হয় এবং তথায় গোপাল ভাঁড়ের মতো সাফল্যের সাথে মনের ভাব গোপন রাখিয়া রাজা-প্রজা উভয় পকে ফাঁকি দিতে পারে তাকে রাজনীতি বলা হয়।
রাজনীতি মোটামুটি তিন প্রকার : ক. রাজা (বাদশাহ) নীতি; খ. রাজ (সরকার) নীতি; গ. রাজ (মিস্ত্রি) নীতি। ‘ক’ এর সৈন্যবাহিনী, ‘খ’ এর কর্মীবাহিনী, ‘গ’ এর জোগালিয়া বাহিনী দরকার। রাজা সৈন্যবাহিনীকে ফাঁকি দিয়া রাজ কোষের টাকা বিদেশে পাঠাইবেন, যাতে দেশে বিপ্লব হইলে বিদেশে গিয়া আরামে দিন যাপন করিতে পারেন। রাজনীতিক মন্ত্রী কর্মী বাহিনীকে ফাঁকি দিয়া সরকারি টাকায় নিজের শিল্পকারখানা ও বাড়িঘর করিবেন, যাতে মন্ত্রীত্ব গেলেও আরামে বাড়ি বসিয়া খাইতে পারেন। রাজমিস্ত্রি জোগালিয়া বাহিনীকে ফাঁকি দিয়া একের মাল-মসলা দিয়া অন্যের দালান নির্মাণ করিবেন, যাতে কাজ পাওয়া না গেলেও কিছু দিন চলিতে পারেন। যে শাস্ত্র জানিলে রাজনীতি শুদ্ধরূপে করিতে, বলিতে ও লিখিতে পারা যায়; তাকে রাজনীতির ব্যাকরণ বলা হয়।
২. ভাষায় ব্যাকরণের ভিত্তি তিনটি : শব্দ, বাক্য ও পদ। রাজনীতিক ব্যাকরণেরও তাই। তবে এ েেত্র ওই তিনটি ভিত্তির বাস্তবরূপ এইÑ অর্থহীন আওয়াজকে শব্দ বলে। এই শব্দ যত বেশি মোটা, ভারী, উঁচা, বুলন্দ ও কর্ণভেদী হয় তত বেশি শুদ্ধ হয়। গলার আওয়াজ না কুলাইলে মাইক ব্যবহার করিবে। বাক্যÑ যে সমস্ত শব্দ দ্বারা নিজের মনোভাব গোপন করিয়া ভোটারদের ফাঁকি দিয়া নির্বাচনে জয়লাভ করা যায় তাদের সমষ্টিকেই বাক্য বলা হয়। যথাÑ বাকি+ও এই দুইটি শব্দের সমষ্টিই বাক্য। কখনো পূরণ না করিবার মতলবে যেসব ওয়াদা বা আওয়াজ করিয়া বাকি মূল্যে ভোট খরিদ করা হয় তাকেই বাক্য বলা হয়। পদ- এসব বাক্যের বিভিন্ন অংশ বা শেয়ারকে পদ বলে। যথা- প্রেসিডেন্ট, স্পিকার, মিনিস্টার, পার্লামেন্টারিয়ান, সেক্রেটারি, অ্যাম্বাসেডর ইত্যাদি।”
আবুল মনসুর আহমদ এসব লিখেছিলেন পাকিস্তানের শাসনামলে যখন পশ্চিম পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসনের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের শোষণ বঞ্চনার এন্তার বাস্তব অভিযোগ ছিল। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে বিগত ৪০ বছর আমরা বাংলাদেশীরাই স্বশাসিত। ৪০ বছর ধরে এ দেশের জনগণ যে পদ্ধতিতে শাসিত ও শোষিত হয়েছেÑ রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদ সম্পর্কে আবুল মনসুর আহমদের যে ধারণা বিবৃত হয়েছে এর বিন্দুমাত্র কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি? না, জনগণকে গালভরা মিথ্যা প্রতিশ্র“তি দিয়ে ভোট বাগিয়ে মতায় গিয়ে মতাসীনেরা বরাবরই রাষ্ট্রীয় সম্পদকে কিভাবে নিজেদের সম্পদে রূপান্তরিত করা যায় সে চেষ্টাতেই লিপ্ত হয়েছে এবং কামিয়াবিও হয়েছে। মতার পালাবদলেও রাজনৈতিক সংস্কৃতির কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন ল করা যায়নি। 
নির্দলীয় নিরপে সরকার : এ প্রসঙ্গে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার সর্বশেষ অবস্থান প্রশংসনীয়। তার মতে, তত্ত্বাবধায়ক নাম নিয়ে যদি মতাসীনদের কোনো অ্যালার্জি থেকে থাকে তাহলে সুষ্ঠু, নিরপে এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য নির্দলীয়-নিরপে সরকারব্যবস্থার বিকল্প নেই। তাকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন। 
নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসবে ততই বিরোধী দলের এ দাবির প্রতি জনসমর্থন দিন দিন বাড়বে এতে কোনো সন্দেহ থাকার কারণ নেই। পরস্পরবিরোধী প্রধান দুই রাজনৈতিক শিবিরের এ অনড় অবস্থান দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে সঙ্ঘাতমুখী করে তুলছে। এ নিয়ে জনগণ শঙ্কিত, আতঙ্কিত। মতায় থেকে এরশাদের সমর্থন নিয়ে একপীয় নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ আবারো সরকারে এবং জাতীয় পার্টি গৃহপালিত বিরোধী দলে থাকার যে মাইন্ড সেট করা হয়েছে, তা থেকে মহাজোটকে সরে আসতে হবে। বিরোধী জোটকে নির্বাচনের বাইরে রেখে নির্বাচন করলে সারা দেশে সঙ্ঘাত অনিবার্য। দেশবাসীর কাছে এ ধরনের নির্বাচনের ফলাফল যেমন গ্রহণযোগ্য হবে না, তেমনি বহির্বিশ্বে ও এর গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। দেশে যেসব সম্মানিত বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী বিবেকতাড়িত হয়ে লোভ লালসার ঊর্ধ্বে থেকে প্রতিনিয়ত দেশের মঙ্গল কামনা করেন তাদের এ মুহূর্তে দেশমাতৃকার প্রতি দায়িত্ব অনেক। টিভি টকশো, সাাৎকার, কলাম লিখে তারা যেমন গণসচেতনতা বাড়াচ্ছেন ঠিক তেমনি মতাসীন এবং বিরোধী জোটের দেশপ্রেমিক, প্রাজ্ঞ, অভিজ্ঞ, পরিশীলিত ও মার্জিত রুচিসম্পন্ন কিছু নেতার সাথে ভবিষ্যৎ নির্বাচনপদ্ধতি নিয়ে এখনই সংলাপের উদ্যোগ নিতে পারেন। ধীরে ধীরে তা দুই নেত্রীপর্যায়ে উন্নীত করা গেলে নির্দলীয় নিরপে সরকারের একটি রূপরেখা উভয় জোটের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে। ‘বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?’ এমনতর দ্বিধাদ্বন্দ্বে যত বেশি কালপেণ হবে, ততই দেশবাসীর জন্য অশুভ পরিণতির কালোমেঘ ঘনীভূত হতে থাকবে। অতএব শুভষ্য শীঘ্রম! 
kazi_sayed@yahoo.com

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন