শুক্রবার, ২৭ জানুয়ারী, ২০১২

গণতন্ত্রের আন্দোলনকে বিভ্রান্ত ও বিধ্বস্ত করার সরকারি চেষ্টা


গণতন্ত্রের আন্দোলনকে বিভ্রান্ত ও বিধ্বস্ত করার সরকারি চেষ্টা ॥ সিরাজুর রহমান ॥

স্কুলে আমাদের সিনিয়র অঙ্ক শিক্ষক সুধীন ভট্টাচার্য্য ভীষণ রসিক লোক ছিলেন। পাটীগণিতের মতো নীরস বিষয়ের ক্লাসেও তিনি মুহূর্তে হাস্যমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারতেন। সেই দিন তিনি ‘রুল অব থ্রি’ নামে পাটীগণিতের একটি বিধি শেখাচ্ছিলেন আমাদের। তিনটি করে অঙ্ক ক্লাসেই করতে বললেন। একটা ছেলে বাঁ হাত দিয়ে চোখ কচলাচ্ছিল। সুধীন বাবু ওকে জিজ্ঞেস করলেন অঙ্কগুলো পেরেছে কি না? ছেলেটি জবাব দিলো সে এক চোখ বন্ধ করে দুটো অঙ্ক করেছে। শিক্ষক চট করে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা, এক চোখ বন্ধ করে দুটো অঙ্ক করেছিস তুই, দুই চোখ বন্ধ করে চারটা করতে পারতিস? গোটা ক্লাস হো হো করে হেসে উঠেছিল।
আরেকটি ছেলে অঙ্ক কষে বের করেছিল পটোলের সের ছয় আনা হবে। স্যার তাকে বললেন- আচ্ছা, পটোলের সের যদি ছয় আনা হয় তাহলে যে তুলেছে তার বাবার নাম কী? কলকাতায় তখনকার প্রচলিত বাংলায় ‘পটোল তোলার’ অর্থ ছিল অক্কা পাওয়া বা মারা যাওয়া। সুতরাং আমরা সবাই এই অ-সম্পর্কিত রসিকতায় হেসে উঠেছিলাম। বিশেষ করে এ কাহিনীটার অবতারণা করলাম বাংলাদেশের কিছু ঘটনার প্রসঙ্গে।
বাংলাদেশের জন্য বর্তমান পরিসি'তি খুবই ট্র্যাজিক না হলে আওয়ামী লীগ, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বহু উক্তি স্কুলের অঙ্কের ক্লাসের মতো হাস্যরোল সৃষ্টি করতে পারত। আগেও কোনো কোনো লেখক লিখেছেন, বাংলাদেশে সকালবেলার সূর্য ওঠে পুবের আকাশে কিন' নতুন চাঁদ যে পশ্চিম আকাশে ওঠে শেখ হাসিনা সম্ভবত সে জন্যও বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়াকে (জনসাধারণ তিনবার যাকে ভোট দিয়ে প্রধানমন্ত্রী করেছিল এবং বর্তমানেও যিনি গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবেন বলে জাতি আশা করে) দায়ী করেন। দেশে আইনশৃঙ্খলা নেই, ন্যায়বিচার নেই, জানমালের কিংবা নারীর মর্যাদার নিরাপত্তা নেই। মাত্র গত সপ্তাহে নিউইয়র্ক-ভিত্তিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক প্রতিবেদনে বলেছে, আন্তর্জাতিক সমালোচনার ফলে র‌্যাবের বিচারবহির্ভূত হত্যা কমলেও বাংলাদেশে মানুষ গুম হওয়ার ঘটনা অনেক বেড়ে গেছে। দায়িত্ব স্বীকার করে সেসব দুষ্কৃতির প্রতিবিধানের পরিবর্তে কথায় কথায় এবং কারণে-অকারণে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বিষোদগার করছেন প্রধানমন্ত্রী এবং তার সাঙ্গপাঙ্গরা।
শেখ হাসিনা নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ১০ টাকা কেজি দরে চাল দেবেন, বিনা মূল্যে সার দেবেন কৃষককে, রাতারাতি বিদ্যুতের ঘাটতি দূর করবেন, আরো কত কী? কোন প্রতিশ্রুতিটা পালন করতে পেরেছেন তিনি? মানুষ অসন'ষ্ট। খুবই ক্রুদ্ধ। শেখ হাসিনার সরকার কিছুই দিতে পারছে না তাদের। অন্য দিকে প্রধানমন্ত্রী প্রাণ খুলে সব কিছু দিয়ে দিচ্ছেন ভারতকে। ভারত একে-দুয়ে বাঁধ দিয়ে বাংলাদেশের সব নদীর পানি আটকে দিচ্ছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী করজোড়ে বলছেন, ‘দেবো প্রভু, আরো দেবো, যতো চান ততো দেবো’। ভারত আমাদের সড়ক চায়, রেলপথ চায়, নদী চায়, বন্দর চায়। দিল্লিকে সব কিছু দিয়ে কৃতার্থ বোধ করেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের পর আমাদের ভূগোলকেও তারা নিয়ে নিতে চায়। আমাদের দেশের ভেতরে এসে তারা আমাদের নদীতে, শাখানদী আর খালগুলোতেও বাঁধ দিচ্ছে।

কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা আর চাই না
বাংলাদেশের মানুষ তিন বছরে অনেক কিছু সয়েছে। যুদ্ধ করে অর্জিত স্বাধীনতার ওপর অন্য দেশের পোদ্দারি কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো সর্বক্ষণ যন্ত্রণা দিচ্ছে তাদের। তারা এখন আর নীরব থাকবে না। তারা প্রতিবাদ করছে, হরতাল করছে। তারা বলছে, তারা গণতন্ত্র চায়, তত্ত্বাবধায়কপদ্ধতি চায়। প্রধানমন্ত্রী বলছেন, যত দোষ খালেদা জিয়ার। খেটেখাওয়া মানুষ যৎসামান্য সঞ্চয়, বউয়ের বাপের বাড়ি থেকে পাওয়া গয়না আর গ্রামের বাড়ির জমি বিক্রি করে আনা টাকা শেয়ারবাজারে লগ্নি করেছে। ১৯৯৬-২০০১ সালে সরকারের সমর্থক আর সরকারের পৃষ্ঠপোষক দুষ্ট লোকেরা সাধারণ মানুষের সে লগ্নির টাকা লুটেপুটে খেয়েছে। গত তিন বছরে আবারো হরির লুট চলেছে শেয়ারবাজারে।
মধ্যবিত্তের লাখ লাখ কোটি টাকা তারা লুট করেছে, সে টাকায় ডলার কিনে বিদেশে পাচার করেছে। কিন' একটাও মুদ্রাপাচারের মামলা হয়েছে কী কারো বিরুদ্ধে? হয়নি। হয়নি, কেননা এরা খালেদা জিয়ার পুত্র নয়, শেখ হাসিনার বরপুত্র। ৩২ লাখ পরিবার শেয়ারবাজারে সর্বস্ব খুঁইয়ে পথে বসেছে, তাদের পোষ্য দেড় থেকে দুই কোটি নরনারী ও শিশু সর্বস্বান্ত হয়েছে। মানুষ ক্রুদ্ধ। এমন সাঙ্ঘাতিক অবিচারে হয়তো পাগলও হয়ে গেছে কেউ কেউ। তারা প্রতিবাদ করছে, হরতাল করছে, রাজপথ অবরোধ করছে। শেখ হাসিনার মনে পড়ে গেছে রবীন্দ্রনাথের কবিতা : ‘যা কিছু হারায় গিন্নি বলেন কেষ্টা ব্যাটাই চোর’। সে রকম করেই শেখ হাসিনা বলছেন, সব কিছুর জন্য খালেদা জিয়াই দায়ী।
ধরা পড়ার ভয়ে চোর নিজেই ‘চোর চোর’ বলে ছুট দেয়। এ দৃশ্যের সাথে আমাদের অনেকেরই পরিচয় আছে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের হয়েছে সে দশা। মানুষ ক্রুদ্ধ, অত্যাচারিত, নির্যাতিত, নিপীড়িত, সর্বোপরি অপমানিত। এ অবস'া চলতে দিলে তাদের সংযমের বাঁধ ভেঙে যেতে বাধ্য। সরকারি মহলে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে, মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য এরা খালেদা জিয়ার দিকে আঙুল দেখাচ্ছে। নাগাল পাচ্ছে না বলে পাশের দেশ থেকে আঁকশি ধার করে আনছে। কলকাতার পত্রিকা ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করছে। সে ধুন তুলে ঢাকার সরকার আবারো গান জুড়ে দিয়েছে। সব কিছুর জন্যই খালেদা জিয়া দায়ী। ‘যা কিছু হারায় গিন্নি বলেন কেষ্টা ব্যাটাই চোর’। এ দিকে বাংলাদেশের শহর-নগর আর পথে-ঘাটে কী হচ্ছে? সরকারি দলের সোনার ছেলেরা খুন-খারাপি, ছিনতাই-রাহাজানি, নারী ধর্ষণ ও সম্পত্তি গ্রাস করছে, বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে সিট-বাণিজ্য, ভর্তিবাণিজ্য ও হত্যা চালাচ্ছে নির্বিবাদে। তাদের নৈরাজ্য আর খুন-খারাপির দায়িত্ব শেখ হাসিনা বহন করতে রাজি নন, ভান করা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী ও তার বরপুত্ররা ধোয়া তুলসিপাতা।

সাত দফা চুক্তি কি ফিরিয়ে আনা হচ্ছে?
উনিশ শ’ একাত্তর সালে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানিদের কাছে বন্ধীত্ব গ্রহণ করেছিলেন। আওয়ামী লীগের অন্য নেতারা পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন ভারতে। বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা, বিডিআরের বীর জওয়ানেরা আর দলত্যাগী সৈন্যরা নয় মাস ধরে মুক্তিযুদ্ধ করেছে, দেশের সাধারণ মানুষ সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা দিয়েছে তাদের। সে জন্য বহু নির্যাতন সয়েছে তারাও, বাংলাদেশের নারী তার আত্ম মর্যাদা বিসর্জন দিয়েছেন।
কলকাতার হোটেলে-গেস্ট হাউজে প্রমোদ আর বিলাসে কাটিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতারা ভারত সরকারের ব্যয়ে। তাদের আশ্রয় আর ভরণ-পোষণ এবং মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য দানের বিনিময়ে ভারত সরকার যা যা দাবি করেছিল সব কিছু মেনে নেয়া ছাড়া দেশ থেকে পলাতক এসব আশ্রিত আওয়ামী লীগ নেতার গত্যন্তর ছিল না। দিল্লির সাথে এরা সাত দফা চুক্তি করেছিলেন। চুক্তিতে তারা মেনে নিয়েছিলেন যে স্বাধীন হলে বাংলাদেশের স্বাধীন কোনো পররাষ্ট্রনীতি থাকবে না, নিজস্ব সেনাবাহিনী থাকবে না বাংলাদেশের এবং বিডিআরকে ভেঙে দিতে হবে। তাজউদ্দীনের সরকার সেসব দাবি মেনে নিলেও ভারতের এসব অন্যায় শর্ত মেনে নেয়া শেখ মুজিবের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তিনি ইন্দিরা গান্ধীকে সাফ সাফ বলে দিয়েছিলেন, বাংলাদেশ সেসব দাবি মানবে না। কিন' প্রমাণ হয়ে গেছে শেখ মুজিব আর শেখের কন্যা হাসিনার সম্মান ও মর্যাদাবোধ এক মাপের নয়।
শেখ হাসিনা এ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি। এখন আর কারোই অজানা নয় যে ‘ভারতের বস্তা বস্তা টাকা আর পরামর্শে‘ এক মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী আওয়ামী লীগ গত নির্বাচনে জিতেছিল। তারপরই শুরু হয়েছে ভারতকে মূল্যদান। সেটি অবশ্যি প্রত্যাশিত ছিল। কিছু পেতে হলে কিছু দিতেই হয়। শেখ মুজিব যে সাত দফা চুক্তি নাকচ করে দিয়েছিলেন সে চুক্তি আবার বহাল করা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীত্বের মূল্য হিসেবে।
এ সরকারের দেড় মাসের মাথায় বিডিআর বিদ্রোহ ঘটে। প্রায় তিন বছর গড়িয়ে গেলেও সব ঘটনা সাধারণ মানুষেরও ভুলে যাওয়ার কথা নয়। আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতা ক’দিন আগে থেকেই বিডিআরের কোনো কোনো সদস্যের সাথে মুঠোফোনে প্রচুর আলাপচারিতা করছিলেন বলে তখনো বলাবলি হচ্ছিল, মিডিয়ার কোনো কোনো অংশেও সেসব কথা প্রচারিত হয়েছে। একপ্রস' হত্যালীলার পর ঘাতকেরা গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সাথে দীর্ঘ আলাপ করেন, প্রধানমন্ত্রী তাদের ‘সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা দেন’। বর্ণাঢ্য নামের সব মানুষ তারপরও বিডিআর সদর দফতরে যান এবং তারপর চলে আরো এক দফা হত্যাকাণ্ড। সন্ধ্যায় বিডিআরে হাওয়া খেতে যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন এবং তখনকার খবর অনুযায়ী তার উপসি'তিতে আরো একবার গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। সেনাবাহিনী এগিয়ে আসছিল বিদ্রোহ দমন করতে, কিন' তাদের মাঝপথে থামিয়ে দেয়া হয়। বিদ্রোহের পরে পরে বাণিজ্যমন্ত্রী কর্নেল ফারুক খান যেসব আজেবাজে ও পরস্পরবিরোধী কথাবার্তা বলেছিলেন সে প্রসঙ্গ না হয় না-ই তুললাম।

আসল রহস্য উদঘাটন করতে হবে
বিডিআর বিদ্রোহের বিচার হয়নি। লোকদেখানো বিচারের নামে শুধু শত শত জওয়ানকে নানা মেয়াদে শাস্তি দেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের গৃহপালিত মিডিয়া এবং কলম সন্ত্রাসীরা ছাড়া অন্যেরা বহুবার সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ তদন্ত করে পালের গোদাদের খুঁজে বের করার দাবি জানান। আমি নিজেও একাধিক কলামে সুস্পষ্ট ভাষায় সে দাবি করেছি। কিন' ঘটনার পেছনের ঘটনা ও ষড়যন্ত্র আবিষ্কার এবং পালের গোদাদের মুখোশ খুলে দেয়ার কোনো চেষ্টাই হয়নি।
বিডিআর বিদ্রোহে সেনাবাহিনীর উচ্চপদস' ৫৭ জন কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জন নিহত হয়েছিলেন। তার পর থেকে সেনাবাহিনী যেন যবনিকার অন্তরালে চলে গেছে, কোনো জাতীয় অনুষ্ঠানেও দেশবাসী তাদের সেনাবাহিনীকে দেখতে পায়নি। শুধু টের পাওয়া যাচ্ছে যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যদের শান্তিরক্ষী বাহিনী হিসেবে জাতিসঙ্ঘের কাছে ভাড়া দিয়ে কিছু বিদেশী মুদ্রা অর্জন করা হচ্ছে। দিল্লির অভিপ্রায় অনুযায়ী বিডিআরকে ভেঙে দেয়া হয়েছে। তার পরিণতি কী হয়েছে সবাই তা দেখতে পারছে। মাঝে মধ্যেই ভারতীয়রা বাংলাদেশের জমি দখল করে নিচ্ছে। সীমান্তে হরহামেশা বাংলাদেশী খুন হচ্ছে। ভারতের জামাই সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের কাছে সেসব ‘ছোটখাটো ঘটনা’, সে দিকে সরকারের গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন নেই। সেনাবাহিনীর অস্তিত্ব লোপ করে দিয়ে কি সাত দফা চুক্তির আরো একটি দফা পালন করা হবে?
আবারো ‘যা কিছু হারায় গিন্নি বলেন কেষ্টা ব্যাটাই চোর’। সরকার বিডিআর বিদ্রোহের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার করেনি। হঠাৎ করে আবার সে বিদ্রোহের জন্য খালেদা জিয়ার ঘাড়ে দায় চাপানোর কথা মনে হয়েছে কোনো কোনো সরকারি মহলের। এ দিকে আবার অভিযোগ উঠেছে যে সেনাবাহিনীতে একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেষ্টা হয়েছিল। সেনাবাহিনীর দিক থেকে এক সংবাদ সম্মেলনে শুধু অভিযোগই করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে সে বিষয়ে তদন্ত চলছে। অভিযোগ ও তদন্ত মানেই যে অপরাধের প্রমাণ নয়- এ কথাটা কেউ বোধ হয় আওয়ামী লীগ নেতাদের শেখায়নি অথবা আজ্ঞাবহ আদালতে অভিপ্রায় অনুযায়ী রায় পেয়ে পেয়ে তাদের বদ অভ্যেস হয়ে গেছে, নিজেদের অভিযোগকে তারা প্রমাণিত অপরাধের সমার্থক বিবেচনা করছে।
এবং খোদ প্রধানমন্ত্রী তো কোনো রকম তদন্তের আগেই খালেদা জিয়াকে দোষী সাব্যস্ত করে বসেছেন! খালেদা জিয়া সম্পর্কে শেখ হাসিনার গাত্রদাহের কারণ বাংলাদেশের মানুষের অজানা নয়। সামরিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে তার আপসবিহীন সংগ্রামের সময় থেকে বাংলাদেশের মানুষ তাকে গণতন্ত্রের ধারক ও বাহক রূপে গ্রহণ করেছে, গণতন্ত্র বিপন্ন বোধ করলেই তারা তার নেতৃত্বে সংগঠিত হয়। অন্য দিকে শেখ হাসিনার পরিকল্পনা হচ্ছে বাকশালী অথবা অন্য কোনো ফ্যাসিস্ট পদ্ধতিতে চিরকালের জন্য গদি আঁকড়ে রাখা। তার এই অশুভ পরিকল্পনার প্রধান বাধা খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব। বহু সাজানো মামলায় খালেদা জিয়া ও তার ছেলেদের ফাঁসানোর চেষ্টা করছেন শেখ হাসিনা। সেটি সম্ভব না হলে জনতার চোখে তাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য মিথ্যা অভিযোগের তো অবধি নেই।
দুর্ভাগ্যবশত দেশের মানুষ খালেদা জিয়াকে যতটা শক্তিশালী সমর্থন দিয়েছে, বিএনপির মন্ত্রিত্ব ও নেতৃত্ব-লিপ্সু নেতাদের কেউ কেউ তেমন আন্তরিক সমর্থন ও সুপরামর্শ তাকে দিচ্ছেন বলে মনে হয় না। তারা যে বেঁচে আছেন হয়তো সেটা প্রমাণ করার জন্যই মাঝে মধ্যে তারা বক্তৃতা করেন কিংবা বিবৃতি দেন। আমার প্রায়ই মনে হয় এরা কৌতুক গানের লিরিকের “রাঁধিব বাড়িব ব্যঞ্জন কুটিব, হাঁড়ি তবু ছোঁ’বনা” গোছের নেতা। তারা মাঠে নামবেন না, সংগঠনের কাজ করবেন না। আমার মনে হয় তাদের সবাই সুপরামর্শও দিচ্ছেন না নেত্রীকে।

অহেতুক বিতর্ক শক্তি ক্ষয় করছে
বর্তমান গণতন্ত্রের আন্দোলনে খালেদা জিয়া সুপরামর্শ পাচ্ছেন বলে আপনাদের মনে হয় কি? সংবিধান থেকে ইসলামকে বর্জন এবং একতরফা সংবিধান সংশোধন করে যেই দিন তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি বাদ দেয়া হয় বাংলাদেশের মানুষ সেই দিনই বুঝে গেছে এ সরকারের মতলব শুভ কিংবা সাধু নয়। তারা পাশের দেশের দাবি অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে ইসলামকে বিতাড়িত করে ‘উগ্র সেকুলারিজম’ চালু করতে চায়। সে মূল্যে ভারতের সমর্থনে গদি পোক্ত করতে চায়।
খালেদা জিয়ার আন্দোলন যখন সাফল্যের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে, তখন বিএনপির কোনো কোনো মহল থেকে ‘সাংবিধানিক আন্দোলনের‘ কথা উঠছে। কোন সংবিধানের কথা বলছে তারা? যে সংবিধান নিয়ে শেখ হাসিনা ময়দার কাইয়ের দলার মতো খেলা করছেন সে সংবিধানের? মতলবি মহল গুজব ছড়াচ্ছে, ভেতরে ভেতরে আওয়ামী লীগের সাথে নাকি বিএনপির বোঝাপড়া হয়ে গেছে, সমঝোতা হবে শিগগির। কিন' কিসের বোঝাপড়া? কিসের সমঝোতা? সরকার কি তত্ত্বাবধায়কপদ্ধতি ফিরিয়ে আনতে রাজি হয়েছে? অথবা রাজি হবে বলে আশ্বাস দিয়েছে? দিলেই বা তাদের আশ্বাসের মূল্য কী?
বর্তমান গণতন্ত্রের আন্দোলন দুই থেকে তিন মাস আগেই তুঙ্গে উঠেছে। নেতাদের মধ্যে দ্বিমত থাকতে পারে কিন' সাধারণ মানুষ বুঝে ফেলেছে ঠেলে না ফেললে এ সরকার গদি ছাড়বে না। দলীয়কৃত পুলিশ, প্রশাসন আর বিচারব্যবস'া তাদের হাতে। সেসব ব্যবহার করে তারা গদি আঁকড়ে থাকতে চাইবে, প্রয়োজন হলে দলীয় সরকারের অধীনে আবারো মাস্টারপ্ল্যানের নির্বাচন করে। আরো বস্তা বস্তা টাকা আর চানক্যদের পরামর্শ আসবে পাশের দেশ থেকে। এ অবস'ায় ‘কুইক, কুইক, শ্লো’ আন্দোলনের কৌশল হতে পারে না। আম পাকলে পেড়ে নিতে হবে, নইলে পচে যাবে কিংবা কাকে খাবে। লোহা তপ্ত থাকতে হাতুড়ির ঘা দিতে হয়, নইলে অযথা পরিশ্রমই সার হবে। এসব সাধারণ বুদ্ধির কথা বিএনপির নেতারা কী বোঝেন না? নেতৃত্বের ভেতরে যদি কুচক্রি কিংবা মীরজাফরের বংশধরদের কেউ থেকে থাকেন তাহলে কঠোর ব্যবস'া নিতে হবে তাদের বিরুদ্ধে। নইলে আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে। খালেদা জিয়ার কাছ থেকে বাংলাদেশের মানুষ সেটি আশা করে না।
(লন্ডন, ২৪.০১.১২)
serajurrahman@btinternet.com

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন