শুক্রবার, ৬ জুলাই, ২০১২

জনপ্রশাসনকে ভুল বার্তা দেবে

আলী ইমাম মজুমদার 


প্রশাসনকে বিরাজনীতিকীকরণের অঙ্গীকার আমাদের প্রধান দলগুলো করে থাকে। আর ক্ষমতায় এসে করে তার উল্টোটি। মহাজোট সরকারও এর ব্যতিক্রম করেনি। তবু তাদের কিছু কাজে শুরুতে আশান্বিত হয়েছিল অনেকে। গণহারে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া থেকে তারা বিরত রয়েছে। প্রায় দুই বছর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সরকারি কর্মচারীদের কর্তব্য সম্পাদনে প্রতিবন্ধকতা অপসারণের উদ্দেশ্যে সিভিল সার্ভিস আইন ২০১১-এর একটি খসড়াও ওয়েবসাইটে এসেছিল। কিছু অপূর্ণতা সত্ত্বেও কিছু ভালো বিধান এতে ছিল। যেমন বিনা কারণে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার সুযোগ বন্ধ, যুগ্ম সচিব পর্যায় পর্যন্ত সরকারি কর্মকমিশনের মাধ্যমে পরীক্ষা নিয়ে পদোন্নতি ইত্যাদি প্রশাসন দলীয়করণের সুযোগ কমাতে পারত। সুধীজন বেশ কিছু সংশোধন বা সংযোজনের প্রস্তাব রাখে। এখন মনে হচ্ছে, গোটা বিষয় হিমাগারে পাঠিয়ে আইনটির খসড়া তৈরি হয়েছে। 
বেশ কিছু পত্রপত্রিকায় গুরুত্ব দিয়েই প্রকাশিত হয়েছে এ খসড়ার বিধানগুলো। সরকার এ নিয়ে কোনো প্রতিবাদ করেনি। তাই ধরে নিতে হয় খসড়াটি বিবেচনায় রয়েছে। এতেও অবশ্য সিভিল সার্ভিস আইনের মতোই বিনা কারণে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার সুযোগ বন্ধ করা হয়েছে। তবে সরকারি কর্মকমিশনের মাধ্যমে পরীক্ষা নিয়ে যুগ্ম সচিব পর্যায় পর্যন্ত পদোন্নতির বিধানটি নেই। তাই নিশ্চিতভাবেই এটা পশ্চাৎমুখী। 
নতুন খসড়ার একটি বিধান খবরের কাগজ আর জনপ্রশাসনে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। খবরের কাগজের ভাষ্য অনুযায়ী, সে বিধানটি হচ্ছে, ‘সরকার প্রয়োজন মনে করিলে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নির্দিষ্ট শ্রেণী, প্রকৃতি বা কর্মের সেবা সম্পূর্ণ বা আংশিক লইতে পারিবে...।’ উল্লেখ্য, বিবেচ্য আইনে সরকারি কর্মচারীর সংজ্ঞার পরিসর অনেক বৃহৎ। তদুপরি এতদবিষয়ক অন্য যেকোনো আইনের চেয়ে এই আইন প্রাধান্য পাবে বলে খসড়ায় উল্লেখ রয়েছে। একুশ শতকের বিশ্বে সরকারি কাজে কিছু কিছু আউটসোর্সিং ধারণা নতুন নয়। তবে আশঙ্কা করার যৌক্তিক কারণ রয়েছে যে আইন করে এ ধরনের বিধান করলে এর রাজনৈতিক বা অন্য কোনোভাবে অপব্যবহার হতে পারে। পদোন্নতির অপেক্ষমাণ যোগ্য ব্যক্তি থাকতে সচিবালয়, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর—যেকোনো স্তরে ‘আউটসোর্সিংয়ের বাঁকা পথে উঁচু পদে বসে পড়তে পারেন। গত ১০ জুনের ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার-এর প্রধান শিরোনামাধীন সংবাদটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ এবং ওপরে বর্ণিত আশঙ্কাকে দৃঢ় করে। এতে বলা হয়েছে, প্রশাসনকে গতিশীল ও দক্ষ করতে সচিবের কিছুসংখ্যক পদে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হবে। খবরটিতে একজন অত্যন্ত দায়িত্বশীল প্রবীণ মন্ত্রীর উদ্ধৃতিও দেওয়া হয়েছে। 
উল্লেখ করা আবশ্যক, এমনিতেই রাষ্ট্রপতির কোটায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিধান রয়েছে। এ ধরনের চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত বেশ কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন সরকারি পদে আছেন। সচিব পদে এভাবে কোনো বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিকেও নিয়োগ দেওয়া চলে। অতীতেও তা হয়েছে। তবে তাঁরা খুব কমই সফল হয়েছেন। আবার নিজ কর্মক্ষেত্রেও অত্যন্ত সফল এবং জনগণের কাছে নন্দিত কোনো কোনো ব্যক্তিও সচিব পদে এসে সফল হননি। নিয়োগকারী সরকারই ফেরত পাঠিয়েছে। সচিব পদটা মূলত বিশেষজ্ঞের নয়। সচিব তাঁর কাজে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেবেন। সে পরামর্শ অনুযায়ী কোনো প্রকল্প প্রস্তাব অথবা আইন বা বিধি প্রণয়নের ক্ষেত্রে সচিবকে আরও অনেকগুলো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের দ্বারস্থ হতে হবে কার্যপ্রণালি বিধিমালা (রুলস অব বিজনেস) অনুসারে। সুতরাং, সরকার কীভাবে পরিচালিত হয় এর ওপর ব্যাপক ধারণা থাকা একজন সচিব হওয়ার পূর্বশর্তই বটে। তা ছাড়া অন্য মন্ত্রণালয়গুলোতে মূল ভূমিকায় যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সচিবের ব্যক্তিগত সম্পর্ক সে কাজটি সম্পাদনে অত্যন্ত সহায়ক হয়। সচিব মন্ত্রণালয় বা বিভাগের প্রিন্সিপাল অ্যাকাউন্টিং অফিসার। নিজ কার্যালয় ছাড়াও তাঁর অধীনে সংস্থা, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, করপোরেশন ইত্যাদির বরাবরে বরাদ্দ করা অর্থ বিধিবিধান অনুসরণে ব্যয়ের নিশ্চয়তার দায়িত্বও সচিবের। জাতীয় সংসদের পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটিতেও জবাবদিহি তাঁরই। তাই আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিষয়েও সচিবের ব্যাপক ধারণা থাকা আবশ্যক। প্রশাসনসহ অন্য সব ক্যাডার থেকে উপসচিব পদে পদোন্নতির পর সচিব হওয়ার পথে যাত্রা শুরু। নানা ঘাট পেরিয়ে গুটি কয়েকের ভাগ্যেই এটা জোটে। সেসব ঘাটের অভিজ্ঞতা আর পারস্পরিক চেনাজানার মাধ্যমে সচিব পদে নিয়োজিত ব্যক্তি সম্পাদন করা তাঁর দায়িত্ব। কেউ কেউ রাষ্ট্রপতির কোটায় সরাসরি সচিব হচ্ছেন বটে। তবে দু-একটি ব্যতিক্রম ব্যতীত তাঁরা প্রায়ই নিষপ্রভ থেকে যান।
সরকারের কাজে গতি আনার জন্য কোনো কোনো পদে বিশেষজ্ঞ নিয়োগের যে প্রয়াস, তা অনেকটাই অতীতে যাঁরা কাজ করেছেন বা বর্তমানে করছেন, তাঁদের দক্ষতার প্রতি অনেকটা আস্থাহীনতাই বটে। কিন্তু এটা তো অস্বীকার করা যাবে না, গত ৪০ বছরে এ দেশের যে অর্জন, তাতে সরকারি কর্মচারীদেরও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে, তেমনি যা কিছু ব্যর্থতা তার অংশীদারও তাঁরাই। 
নিয়োগে মেধা আর বদলি পদোন্নতি ও পদায়নে নির্মোহভাবে মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে দলীয়করণের বলয় থেকে জনপ্রশাসনকে বের করতে পারলে সরকারের কাজে আরও গতি আসবে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব এ বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ। আউটসোর্সিং করে খুঁটিনাটি ভার লাঘব করা যায়—তবে রাষ্ট্রযন্ত্রের দক্ষতা কতটা বৃদ্ধি পাবে, তা প্রশ্নবিদ্ধ। তবে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি পদে চুক্তি ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিয়ে ফলাফল দেখা যেতে পারে। আউটসোর্সিংয়ের আইনি বিধান এখনই আবশ্যক বলে মনে হচ্ছে না। বরং এ সুযোগটির অপব্যবহারের আশঙ্কা থাকে। এ ধরনের আইন প্রণয়নের বার্তা জনপ্রশাসনের বিশাল অংশ ভালোভাবে নেওয়ার কথা নয়। সরকারের বর্তমান মেয়াদের শেষ দিকে এসে কেন এ ভুল বার্তা?
 আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

দুর্নীতিতে স্বপ্নভঙ্গ পদ্মা সেতুর : যমুনা সেতুর স্বপ্নপূরণ হয় যেভাবে



সৈয়দ আবদাল আহমদ
দেশে যে বেশুমার দুর্নীতি চলছে তার সর্বশেষ নিদর্শন—পদ্মা সেতু প্রকল্পের ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি বাতিল করে দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। দুর্নীতির অভিযোগে এর আগে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পের অর্থায়ন স্থগিত করেছিল। সংস্থাটি সরকারকে দুর্নীতির অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করার অনুরোধ করেছিল। দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে মন্ত্রিত্ব থেকে সরানোর পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু সরকার কিছুই শোনেনি। ফলে মুখ ফিরিয়ে নেয় বিশ্বব্যাংক। দুর্নীতির দায়ে ডুবল পদ্মা সেতু। দুর্নীতিতেই স্বপ্নভঙ্গ হলো পদ্মা সেতুর।
পদ্মা সেতু প্রকল্পের ঋণচুক্তি বাতিলের পর এডিবিও ঋণ সহায়তা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে। জাইকাসহ অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থাও হয়তো একই পদক্ষেপ নেবে। এর ফলে প্রকল্পটির আপাতত সম্ভাবনা যে আর নেই, এটা জোর গলায়ই বলা যায়। পদ্মা সেতু নির্মাণ শুধু আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিই ছিল না, দেশের অর্থনৈতিক বিকাশ ও দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের জন্যও অপরিহার্য ছিল। কিন্তু সরকারের মন্ত্রী-আমলাসহ উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতির অভিযোগের কারণে উজ্জ্বল একটি সম্ভাবনার মৃত্যু ঘটল।
এত বড় ঘটনার পর সরকারকে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়ার দরকার ছিল। সেটা তো করেইনি, উল্টো দুর্নীতিকে ডিফেন্ড করতে গিয়ে বিশ্বব্যাংককেই দোষারোপ করেছে সরকার। অর্থমন্ত্রী এমএ মুহিত পরপর তিন দিনই তার বক্তব্যে পদ্মা সেতুর ঋণচুক্তি বাতিলের জন্য বিশ্বব্যাংকের বিদায়ী প্রেসিডেন্ট রবার্ট জোয়েলিককে দায়ী করে বলেছেন, তার একক সিদ্ধান্তেই চুক্তি বাতিল হয়েছে। কিন্তু দায়িত্ব নিয়েই নতুন প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম জানিয়ে দেন, পদ্মা সেতুর ঋণচুক্তি বাতিলে বিশ্বব্যাংকের সিদ্ধান্ত একদম সঠিক। দুর্নীতি করাকে বিশ্বব্যাংক কখনোই প্রশ্রয় দেবে না। কিন্তু তাতেও সরকারের টনক নড়েনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে দাঁড়িয়ে বললেন—বিশ্বব্যাংক নিজেই দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান। তার পরিবারের কেউ কমিশন খায়নি।
পদ্মা সেতু ছাড়াও বর্তমানে বাংলাদেশের ৩৩টি প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের ৪৬০ কোটি ডলার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। দেশে দুর্নীতির যে অবস্থা, এসব প্রকল্পে যাতে আর দুর্নীতির অভিযোগ না ওঠে সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। যদি এসব প্রকল্পেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠে তাহলে বাংলাদেশকে যে চরম খেসারত দিতে হবে, সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে।
এখনও সময় আছে পদ্মা সেতু প্রকল্পের অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিয়ে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে বরখাস্ত করে ফের ঋণচুক্তিটি করার জন্য বিশ্বব্যাংকের কাছে আবেদন করার পরামর্শ এসেছে বিরোধী দলসহ বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে। কিন্তু সরকার এখনও বড় বড় কথা বলতেই ব্যস্ত রয়েছে। মালয়েশিয়ার ঋণ নিয়ে পদ্মা সেতু করব, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করব ইত্যাদি। এটা অবাস্তব চিন্তা নয় কি? বিশেষজ্ঞরা এরই মধ্যে সতর্ক করেছেন, মালয়েশিয়ার ঋণ নিলে যে বিপুল পরিমাণ সুদ দিতে হবে তার ভার বাংলাদেশ বইতে পারবে না। আর নিজস্ব অর্থায়ন করতে গেলে জনগণের ওপর যে কত বড় খড়গ নেমে আসবে তা বলাই বাহুল্য। তদুপরি পুরো বিষয়টি আরও বেশি লেজে-গোবরে অবস্থার মতো হয়ে যেতে পারে।
যমুনা সেতুর স্বপ্নপূরণ হয় যেভাবে
যমুনা সেতু নির্মাণের সুন্দর উদাহরণ চোখের সামনে ছিল । যমুনা সেতুও ছিল তখনকার সবচেয়ে বড় প্রকল্প। এর সঙ্গেও বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাইকা জড়িত ছিল। সেই প্রকল্প নিয়ে তো কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। তত্কালীন নেতৃত্ব স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করার জন্য সেদিন অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে যমুনা সেতুর স্বপ্নপূরণ হয়েছিল। সেটা কীভাবে হয়েছিল সে কাহিনীই শোনা যাক :
১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে বিএনপি তার নির্বাচনী ইশতেহারে যমুনা সেতু নির্মাণের জন্য জনগণের কাছে অঙ্গীকার করেছিল। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠিত হয়। সরকারে আসার পর বিএনপি জনগণকে দেয়া তার নির্বাচনী অঙ্গীকার মোতাবেক যমুনা সেতু নির্মাণের যাবতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করে।
যমুনা সেতু নির্মাণ করতে গিয়ে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে অনেক বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করতে হয়েছে। বিএনপি সরকার যাতে এ সেতু নির্মাণে হাত দিতে না পারে সে ব্যাপারে প্রথম থেকেই চালানো হয় নানা ষড়যন্ত্র। তত্কালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ শুরু থেকেই নানা বিরোধিতা করে। আওয়ামী লীগ যমুনা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দিন দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহ্বান করেছিল। স্বার্থান্বেষী একটি মহলকে দিয়ে এ সেতুর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়েছিল। স্বার্থান্বেষী মহলটি যমুনা সেতুর পরিবর্তে ব্রহ্মপুত্র ব্যারাজ নির্মাণের কৌশলী প্রচার চালিয়েছিল। দুটি ইংরেজি পত্রিকার মাধ্যমে যমুনা সেতু নির্মাণের বিরুদ্ধে বিভিন্ন নিবন্ধ ও নিউজ আইটেম প্রচার করা হয়েছিল। তখন স্বার্থান্বেষী মহলটি প্রচার চালিয়েছিল, যমুনা সেতু অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাব্য নয়। কিন্তু সব বাধা ডিঙিয়ে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তার সরকার এ সেতু নির্মাণে দৃঢ়তা প্রদর্শন করে এবং যমুনা সেতু নির্মাণকে অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করে। ওই সময়টিতে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার উপ-প্রেস সচিব হিসেবে খুব কাছে থেকে তা প্রত্যক্ষ করেছি।
সরকারে আসার তিন মাসের মধ্যেই ১৯ মে ’৯১ জাতীয় অর্থনৈতিক নির্বাহী পরিষদ (একনেক) বৈঠকে যমুনা সেতু প্রকল্পের ছক (পিপি) অনুমোদন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নির্দেশে সরকার সেতু প্রকল্পটি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ত্রি-বার্ষিক আবর্তক বিনিয়োগ কর্মসূচিতে কোর প্রকল্প হিসেবে একে অন্তর্ভুক্ত করে এবং চতুর্থ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় এ প্রকল্পের জন্য মোট ২,২৫০ কোটি টাকার সংস্থান রাখে। তখন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান এ ব্যাপারে বিশেষ ভূমিকা রাখেন।
যমুনা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থ জোগানের জন্য উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থাগুলোকে রাজি করাতে বিশেষ উদ্যোগ নেন খালেদা জিয়া। তার নির্দেশে তত্কালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান ও যোগাযোগমন্ত্রী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বিশেষ দূত মোরশেদ খান বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাপান সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন। বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট মি. লুই প্রেস্টনকে বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানানো হয়। বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের সঙ্গে অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান, যোগাযোগমন্ত্রী অলি আহমদ বৈঠক করেন। প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গেও বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের বৈঠক হয়। তিনি যমুনা সেতু এলাকাও পরিদর্শন করেন। সরকারের আমন্ত্রণে বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাপানের একাধিক উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে আসে। যমুনা সেতুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য কয়েকবার সমীক্ষা চালানো হয়। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নির্দেশে অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান ও বিশেষ দূত মোরশেদ খান এ প্রকল্পে জাপানকে রাজি করাতে ১৩ নভেম্বর ’৯৩ থেকে ১৯ নভেম্বর ’৯৩ পর্যন্ত জাপান সফর করেন। তারা জাপানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন এবং প্রকল্পের বিভিন্ন দিক ব্যাখ্যা করেন। ১৯৯৪ সালে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও স্বয়ং দ্বিপাক্ষিক সফরে জাপান সফর করেন এবং যমুনা সেতুতে অর্থ জোগান দিতে জাপানকে সম্মত করান। ওই জাপান সফরে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে থাকার আমারও সৌভাগ্য হয়। সব প্রচেষ্টার পর বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাপান যমুনা সেতুতে অর্থ জোগান দিতে রাজি হয়। ১৬ ফেব্রুয়ারি ’৯৪ তারিখে ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংকের বোর্ড মিটিংয়ে যমুনা সেতুর জন্য বিশ্বব্যাংক কর্তৃক ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দেয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে এবং ২৫ ফেব্রুয়ারি ’৯৪ আইডিএ’র সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এডিবির সঙ্গে ১৮ মার্চ ’৯৪ তারিখে ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দেয়ার ব্যাপারে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২৯ মার্চ ’৯৪ প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া জাপান সফরকালে বাংলাদেশ ও জাপান সরকারের মধ্যে ২০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিময় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং ১৮ জুন ’৯৪ ঢাকায় বাংলাদেশ সরকার ও জাপানের ওইসিএফএর মধ্যে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যমুনা সেতুর পূর্বপ্রস্তুতিমূলক কাজ হিসেবে ৪,৩০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয় এবং ১৯৯৩ সালের আগস্ট মাসেই যমুনা সেতুর পূর্ব তীরে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ কাম রাস্তা নির্মাণ সম্পন্ন হয়।
অর্থ জোগান থেকে শুরু করে যমুনা সেতু প্রকল্পের সব আয়োজন সম্পন্ন হওয়ার পর সরকার ২১ মার্চ ’৯৪ সেতুর জন্য চারটি কন্ট্রাক্ট দরপত্রের সম্মতিপত্র ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে প্রদান করে এবং ২৭ এপ্রিল ’৯৪ তাদের কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে ১০ এপ্রিল ’৯৪ যমুনা নদীর দুই তীরে যমুনা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও তার সরকারের নিরলস প্রচেষ্টা, দৃঢ় ইচ্ছা ও আন্তরিকতার ফলে যখন বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের একটি বড় স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে, তখন এর কৃতিত্ব নেয়ার জন্য আওয়ামী লীগ মরিয়া হয়ে ওঠে। তারা শুধু কৃতিত্ব ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টাই নয়, যমুনা সেতু নিয়ে নির্জলা মিথ্যাচার চালায়। যমুনা সেতুর নাম বদল করে দিয়ে তাদের প্রয়াত নেতার নামে নামকরণ করে। যারা এ সেতু নির্মাণের বিরোধিতা করেছে, হরতাল করেছে অথচ কৃতিত্ব নিতে এবং নিজেদের নামে নামকরণ করতে তাদের বিবেকে এতটুকু বাধেনি। রেডিও-টেলিভিশনে নির্লজ্জভাবে একের পর এক অনুষ্ঠানে তারা মিথ্যাচার করে।
যমুনা সেতুর স্বপ্ন সারা বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্ন। এ স্বপ্ন এক শতাব্দীর। এ স্বপ্ন বিচ্ছিন্ন কোনো এক নেতার ছিল না। জনগণের এ স্বপ্নের কথা ১৯৫৩ সালে প্রথম উচ্চারণ করেছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী। তিনি তখন বলতেন, যমুনা নদীর ওপর সেতু হলে উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের দুরবস্থা ঘুচে যাবে। দু’ আনার পটল ঢাকায় দু’টাকায় খেতে হতো না। ১৯৫৪ সালে তিনি যমুনা সেতুর কথা প্রকাশ্যে জনসভায় বলেছেন। এরপর ১৯৬৪ সালে তত্কালীন পার্লামেন্টে সাইফুর রহমান নামে একজন সদস্য যমুনা সেতুর কথা উচ্চারণ করেন। পরে মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমান এ সেতুর কথা চিন্তা করেন। কিন্তু যমুনা সেতু বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত জেনারেল এরশাদের স্বৈরশাসনের সময় যমুনা সেতু নিয়ে নোংরা রাজনীতি আর চালাকিই করা হয়েছে। শুধু ১৯৮৫ সালের জুলাই মাসে জারিকৃত অধ্যাদেশ বলে যমুনা বহুমুখী সেতু কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়। এ সেতুর নামে সারচার্জ ও লেভি প্রবর্তন করে প্রায় ২০০ কোটি টাকা উঠানো হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলো, এ টাকা এরশাদ সরকার সরকারি কর্মচারীদের বেতন দেয়ার কাজে লাগায়। তখন যমুনা সেতু প্রকল্পের ওপর সমীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও দাতা সংস্থাগুলোর মধ্যে আলোচনা হয়। কিন্তু বিশ্বব্যাংক এতে দ্বিমত পোষণ করে। তাছাড়া ওই সময় দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা সন্তোষজনক না থাকায় উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থাগুলো এই ব্যয়বহুল প্রকল্পে অর্থায়নে সম্মত হয়নি।
বিএনপি সরকারই টাকার সংস্থান করে কার্যকরভাবে এ সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করে এবং তার সরকারের সময় পর্যন্ত ৮০ ভাগেরও বেশি কাজ সম্পন্ন করে। প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া যমুনা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও কাজ শুরুর পর এ সেতুর কাজের অগ্রগতি দেখার জন্য বেশ কয়েকবার যমুনা সেতু এলাকা পরিদর্শনে যান। প্রায় প্রতি মাসেই তিনি সেতুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে যমুনা সেতুর অগ্রগতি পর্যালোচনা করেছেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন। যমুনা সেতুর নামকরণের ব্যাপারে তখন দুটি দাবি ছিল। একটি দাবি হচ্ছে— এ সেতু মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর নামে নামকরণ। অন্য দাবিটি ছিল হজরত এনায়েতপুরী (রহ.)-এর নামে। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় এ সংক্রান্ত উভয় দাবির ব্যাপারে আলোচনার পর বলেছিলেন, উনারা দু’জনই সর্বজন শ্রদ্ধেয়। তাদেরকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখলেই ভালো হয়। কারণ তাদের একজনের নামে সেতু হলে অপর তীরের মানুষের মধ্যে প্রতিক্রিয়া হবে। তাতে তারা বিতর্কিত হবেন। এর চেয়ে যেহেতু নদীর ওপর সেতু হচ্ছে, নদীর নামে হলেই ভালো হয়। সেদিনই এ সেতুর নামকরণ করা হয় যমুনা সেতু। কিন্তু এ মহত্ সিদ্ধান্তটিও ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার বাতিল করে দিয়ে নিজেদের নেতার নামে এ সেতুর নামকরণ করেছে।
১৯৯৪ সালে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জাপান সফরের একটি অভিজ্ঞতার কথা এখনও মনে পড়ে। ২৯ মার্চ ’৯৪ সন্ধ্যায় বাংলাদেশ-জাপান দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ছিল জাপানি প্রধানমন্ত্রী মি. হোসোকাওয়ার সরকারি বাসভবনে। এ বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের এবং প্রধানমন্ত্রী হোসোকাওয়া জাপানি দলের পক্ষে বৈঠকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। এক ঘণ্টার এই বৈঠক শেষে সফরসঙ্গী হিসেবে দেখলাম, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া পরম আনন্দে বৈঠক থেকে বের হচ্ছেন। অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান (মরহুম) এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত মোরশেদ খানও আনন্দিত। তারা বৈঠক থেকে বেরিয়ে বাইরে অপেক্ষমাণ আমরা সফরসঙ্গীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বললেন, আল্লাহ্র অশেষ রহমতে জাপান যমুনা সেতুতে ঋণ দিতে রাজি হয়েছে। তারা তখন বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকার কথাও বলছিলেন। এরপরই লনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যমুনা সেতুতে ঋণ দেয়ার বিনিময় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর জাপানি প্রধানমন্ত্রীর দেয়া নৈশভোজে আমরা অংশ নিই।
১৯৯৪ সালের ১০ এপ্রিল সকালে যমুনা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। সেদিন হরতাল ছিল। ঢাকা থেকে সব রাষ্ট্রদূত, বিদেশি সংস্থার প্রতিনিধি এবং সাংবাদিকদের হেলিকপ্টারে করে যমুনা সেতু এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। যমুনা নদীর উভয় তীরে অর্থাত্ সিরাজগঞ্জ জেলার সাইদাবাদ ইউনিয়নের বড় শিমুলিয়ায় ও টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতী থানার শ্যামশৈল মৌজায় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া যমুনা সেতুর সফল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সেদিন হরতাল উপেক্ষা করে দুই তীরের হাজার হাজার মানুষ এই ঐতিহাসিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে ছুটে এসেছিলেন। তিন ঘণ্টারও অধিক সময় ধরে নদীর দু’পাড়ে পৃথক দুটি বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান হয়েছিল। সেতুর উদ্বোধন করে খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘এই যমুনা সেতু হবে দেশের সামগ্রিক সুষম উন্নয়ন এবং জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার মহামিলনের সেতু। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি স্মরণীয় ঘটনা ও দেশের উন্নয়নে যমুনা সেতু একটি মাইলফলক। এই সেতু নির্মাণের মধ্য দিয়ে দেশের জনগণের শতাব্দীর স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে। ইনশাআল্লাহ্ ১৯৯৮ সালের প্রথম দিকে এর নির্মাণ কাজ শেষ হবে।’ তিনি সেদিন এও বলেছিলেন, ‘জনগণের এত বড় স্বপ্ন বাস্তবায়নের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পেরে আমি আনন্দিত। দেশের অর্থনীতিতে যমুনা সেতু উন্নয়নের অনুঘটকের ভূমিকা পালন করবে।’
তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার এই কীর্তি এখন দীপ্যমান। তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যমুনা সেতু নির্মাণ ১৯৯৮ সালের প্রথম দিকেই সম্পন্ন হয়েছে। বিএনপি সরকারে থাকা অবস্থায়ই যমুনা সেতুর প্রায় আশি ভাগের বেশি কাজ সম্পন্ন হয়। বাকি কাজ সম্পন্ন হয় আওয়ামী লীগের সময়। প্রতি বছর বাজেটে কত টাকা বরাদ্দ থাকবে তাও বিএনপি সরকার ঠিক করে রেখেছিল।
১৯৯১ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে প্রথম মেয়াদের বিএনপি সরকার দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেয়। ১৯৯৪ পর্যন্ত চার বছরে বিএনপি সরকার ৩১২টি সেতুই নির্মাণ করে। সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার করে ৬ হাজার ৬০০ কিলোমিটার। ১৯৯৪ সালের ১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তখনকার সবচেয়ে দীর্ঘতম সেতু মেঘনা-গোমতী সেতু উদ্বোধন করেন। ৩ সেপ্টেম্বর ’৯১ এটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন তিনি। ২৫৭ কোটি টাকার জাপানি অনুদানসহ এই সেতু নির্দিষ্ট সময়ের ১৩ মাস আগেই নির্মাণ সম্পন্ন হয়।
এই সেতু নির্মাণের মধ্য দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম সরাসরি সড়ক সংযোগ স্থাপিত হয়। এ সেতু উদ্বোধন করে বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ এবং তামাবিল থেকে ভেটখালী পর্যন্ত জাতীয় মহাসড়কে আর কোনো ফেরি থাকবে না। অল্প সময়েই দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে যাতায়াত সম্ভব হবে।’ যমুনা সেতু নির্মাণের পর খালেদা জিয়ার সে কথাই সবাই উপলব্ধি করেন। যমুনা সেতু দেশের পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। একটি সরকারের আন্তরিকতা, শ্রম ও স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করার ফলেই সেদিন এত বড় একটি প্রকল্প বাস্তবের মুখ দেখেছিল। এই উদাহরণ চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে সেটা কাজে লাগানো গেল না। এটা বর্তমান সরকারের এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বড় ব্যর্থতা। আসলে পদ্মা সেতু নির্মাণের চেয়ে এ প্রকল্প থেকে কীভাবে কত তাড়াতাড়ি সুবিধা আদায় করা যাবে, সে চেষ্টাকেই অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছিল। আর এটাই পদ্মা সেতুর স্বপ্নভঙ্গে কাল হয়ে দাঁড়ায়।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট
abdal62@gmail.com

বিনা আশরাফিতে ‘আশরাফি পরামর্শ কেন্দ্র’



অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমদ তালুকদার
সৈয়দ আশরাফ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। গত ২০ জুন বলেছেন, বিএনপির কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে আদালতের আশ্রয় নেয়া উচিত। গায়ে মানে না আপনি মোড়ল। কথাটা অতি পুরনো। দেশের সব অঞ্চলের মানুষই এই প্রবাদটি সম্পর্কে ধারণা রাখেন। আদালতের আশ্রয় নেয়ার পরামর্শ দেয়ার কারণেই আমার ভীষণ ইচ্ছা হলো এ বিষয়ে দু’চার কথা লিখতে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পূর্বসূরি এবং সরকার নিজে রাজনৈতিক সরকারকে যখন তখন আদালতে যাওয়ার মন্ত্র বা কৌশল শিখিয়েছেন বলে আমার মনে হয়। কোনো রাজনৈতিক সঙ্কট, রাজনৈতিকভাবে সমাধান না করে, তা আদালতের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টাটাই যে একটা অপচেষ্টা, এরই মধ্যে তা বেশ প্রমাণিত। কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যাক।
শেখ মুজিব হত্যা মামলার আসামিদের ইমিউনিটি দেয়ার জন্য বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল হত্যার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিচার করা যাবে না। সংবিধানের সংশোধনীর মাধ্যমে ওই সংশোধনটি, যেটি সংবিধানের মৌলিক চরিত্র হিসেবে রূপ পরিগ্রহ করেছিল, তা বাতিল করা হলো। সংবিধান মতে, সংবিধানের মূল বা মৌলিক চরিত্রকে ঝরসঢ়ষব গধলড়ত্রঃু দিয়ে সংশোধন করা যায় না। কিন্তু আদালতে যাওয়ার পর দেখা গেল এবং আদালত বলেছিলেন, ঝরসঢ়ষব গধলড়ত্রঃু দ্বারা সংবিধান সংশোধনের বিষয়টি যা ওই আইনে জবঢ়বধষ করা হলো, আদালতের আদেশে তাকে সঠিক বলে রায় দিলেন। অথচ সবাই জানেন, সংবিধানের মূল চরিত্র অনংড়ষঁঃব গধলড়ত্রঃু ব্যতিরেকে সংশোধন করা যায় না। অথচ করা হলো তাই। ওই রায়ের পর শেখ মুজিব হত্যার এজাহার দায়ের হয় ২৫ বছর পর। বিচার সম্পন্ন করা হয়। অনেকের ফাঁসির আদেশ হয়। কেউ কেউ পলাতক। কারও কারও ফাঁসি এরই মধ্যে কার্যকরও হয়ে গেছে। একটি অধ্যায়ের শেষ হলো আদালতের মাধ্যমে। তবে এটা ঠিক, হত্যা কোনোদিন কোনো রাজনৈতিক বিবেচনায় আসা বিবেকবানদের কাছে বা আইনের দৃষ্টিতে কাম্য নয়। হত্যার বিচার আইনের মাধ্যমে হয়, রাজনীতি দ্বারা নয়। ইদানীং দেখা যাচ্ছে, কোনো কোনো অপরাধের আইনে বিচার না হয়ে রাজনীতি দ্বারা তার বিচার করার চেষ্টা চলছে। মনে রাখা দরকার, আইনের বিকল্প আইন, অন্য কিছু নয়। যাহোক, আদালতের মাধ্যমেই একটি ইস্যুর সমাধান আবারও ঘটল। তাই বলছিলাম, রাজনীতির বিকল্প রাজনীতি, আইন নয়।
একটি সিনেমা হলের মালিকানার জটিলতা নিরসনের জন্য কোনো এক ব্যক্তিকে আদালতের আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়েছিল। ওই মামলার আদেশ হলো জিয়াউর রহমানের শাসনকাল অবৈধ। শুনেছি গরুকে নদীতে ফেলে রচনা লিখেছিলেন কোনো এক ছাত্র তার পরীক্ষার খাতায়। ওই ছাত্র যদি জীবিত থেকে থাকেন, আর এই ঘটনা প্রবাহ অবলোকন করে থাকেন, তাহলে হয়তো নিজেকে আগে যদি লজ্জিত মনে করে থাকেনও, এখন নিঃসন্দেহে গর্ববোধ করছেন তিনি। যা হোক আদালতের মাধ্যমে আবারও একটি রাজনৈতিক ইস্যুর সমাপ্তি ঘটল।
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সাহেব তার শাসনকালে নির্দেশ দিয়েছিলেন উচ্চ আদালতের সার্কিট বেঞ্চ বসার পরিবর্তে ঢাকার বাইরে উচ্চ আদালত স্থাপন করা হবে এবং এরশাদ সেটা করেছিলেন। এরশাদের মতে, জনগণ নাকি তার সুফল পাচ্ছিল। এরশাদের আমলে উপজেলা সৃষ্টি করে অধস্তন বিচার ব্যবস্থাকেও উপজেলায় স্থানান্তর করা হয়েছিল। কিন্তু ভালো-মন্দ বিচার না করেই এবং জনগণের মতামতের কোনো রকম ধার না ধেরেই উচ্চ আদালত ঢাকার বাইরে স্থানান্তর ও উপজেলার বিচার ব্যবস্থা উপজেলায় স্থানান্তর সংবিধানের মূল চরিত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিধায় তা কেন্দ্রে অর্থাত্ ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হলো। তবে উপজেলা ব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটেনি। বিলুপ্ত হয়েছে উপজেলার বিচার ব্যবস্থা।
উপজেলার নাম দিয়ে জেলা শহরে এখন সেই বিচার ব্যবস্থা চলছে। যাহোক আদালতের মাধ্যমে উচ্চ আদালত ঢাকায় নিয়ে আসা হলো। চলে এলো উপজেলার বিচার ব্যবস্থা জেলা শহরে। আদালতের মাধ্যমেই কেন্দ্রের বাইরে আদালত স্থানান্তরের বিষয়টির সমাধান হলো। আবারও একটি রাজনৈতিক ইস্যু আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হলো।
১/১১-এর অবৈধ সরকার যখন ক্ষমতায় আরোহণ করলেন, তখন তারা নিত্যনতুন কথা বলতেন। হঠাত্ একদিন বলে ফেললেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার করতে হবে। বিশেষ করে দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দলকে। অর্থাত্ আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে। একটি দালাল গোষ্ঠী তৈরি করে ফেলল উভয় দলেই। পরে যদিও ওই গোষ্ঠীর প্রায় সবাই আবার মূল ধারায় মিশে গেছেন। যা হোক, বিএনপির একটি গোষ্ঠী নিজেরা বিএনপির মূলধারা হিসেবে দাবি করে ফেলল। বিষয়টির সৃষ্টি হয়েছিল নির্বাচন কমিশনের সংলাপকে কেন্দ্র করে। শেষ পর্যন্ত সংলাপে নির্বাচন কমিশন কাকে ডাকবেন তা সুরাহার জন্য বিষয়টি নিয়ে যাওয়া হলো আদালতের দোরগোড়ায়। সিদ্ধান্ত হলো ১/১১-এর তৈরি অংশই বৈধ অংশ। এমনকি ওই অংশের অতি প্রবীণ নেতা তার ভুল বুঝতে পেরে, আদালতে হলফনামা সম্পাদন করে পিছুটান দেয়া সত্ত্বেও আদালত রায় দিলেন তাদের পক্ষে, যারা বিএনপির কেউই নন। বেগম খালেদা জিয়ার নিয়োগ দেয়া মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে ডাকলেন না সংলাপে। বিএনপির সংবিধানে এবং কাউন্সিলে প্রদত্ত ক্ষমতাবলেই বেগম খালেদা জিয়া খোন্দকার দেলোয়ারকে মহাসচিব নিয়োগ দিয়েছিলেন। এক্ষেত্রে সেই আদালতই আর একটি রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান দিলেন!
বেগম খালেদা জিয়ার স্বামী শহীদ জিয়া দুষ্কৃতকারীদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন। দুই নাবালক পুত্রসন্তানসহ তিনি দারুণ অসহায় অবস্থায় পড়ে গেলেন। শহীদ জিয়ার দেশ ও মানুষের প্রতি অবদানের কথা বিবেচনায় রাষ্ট্র বেগম খালেদা জিয়াকে দুই এতিম ও নাবালক সন্তান নিয়ে বসবাসের জন্য ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের যে বাসায় তিনি বসবাস করতেন, সেই বাড়িটির মালিকানা দলিলমূলে হস্তান্তর করে। দীর্ঘ ৪০ বছর সময়কাল সন্তানদের নিয়ে তিনি বাসবাস করলেন ওই বাসায়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে বেগম খালেদা জিয়াকে ওই বাড়ি থেকে উচ্ছেদের নোটিশ প্রদান করল। বেগম জিয়া অতি আইন মান্যকারী নাগরিকের মতো আদালতের আশ্রয় নিলেন। দেশের সর্বোচ্চ আদালতে মামলাটি বিচারাধীন থাকাকালে বেগম খালেদা জিয়াকে ৪০ বছর যে বাড়িতে বসবাস করলেন, সেই বাড়ি থেকে তাদের মতে আদালতের নির্দেশে উচ্ছেদ করা হলো। শুনেছি মানুষ অবৈধভাবেও যদি কোনো স্থানে একটি যুক্তিসঙ্গত সময়কাল বসবাস করেন, তাহলে তার একটা অধিকার জন্মায়। অথচ বেগম খালেদা জিয়া ৪০ বছর বৈধভাবে মালিক হয়ে বসবাস করার পরও তার কোনো বৈধ অধিকার জন্মাল না। আরও একটি অধ্যায় আদালতের মাধ্যমেই নিষ্পত্তি ঘটল!
কোনো একটি বিষয়ে মামলা হলো। আদালত রায় দিলেন যে, কোনো গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা থাকা ঠিক নয়। তবে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আরও দুটি জাতীয় সাধারণ নির্বাচন কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে। কারণ হিসেবে বলেছেন, দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিবেশ এখনও দেশে তৈরি হয়নি। এটাকে সরকার লুফে নিল। সংসদে বিল এনে আদালতের রায়ের কথা বলে সংবিধান থেকে কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থার আইনটি সংশোধনের দ্বারা বাতিল করে দিল। পূর্ণাঙ্গ রায় এখনও প্রকাশ পায়নি। তা সত্ত্বেও কেয়ারটেকার সরকারের আইনটি বাতিল হয়ে গেল। আদালত দেশের আর একটা রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান এভাবে দিলেন। প্রশ্ন হলো, সমস্যার কি সমাধান হলো, না সমস্যা বেড়ে গেল? যা হোক জনাব আশরাফ বললেন, বিএনপি যদি আইন মানে তাহলে কেয়ারটেকার সরকারের দাবি নিয়ে আদালতে যেতে পারে। এখন সব বিবেকবান মানুষ নিজ নিজ বিবেকের কাছে যদি প্রশ্ন করেন যে, কেয়ারটেকার সরকারের দাবি নিয়ে বিএনপি আদালতে গেলে ফলাফল কী হতে পারে? নিশ্চয়ই আপনারা উত্তর পেয়ে যাবেন।
আশরাফ সাহেব হঠাত্ বিএনপিকে পরামর্শ দিতে আরম্ভ করলেন কেন তা বুঝতে পারলাম না। বিএনপির প্রতি তাদের এমন কী ঋণ আছে জানি না। হয়তো কিছু একটা ব্যাপারে আওয়ামী লীগ বিএনপির কাছে ঋণী থাকতে পারে। আর তা হয়তো, শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব মৃত্যুর আগে আওয়ামী লীগ বিলুপ্ত করে বাকশালের জন্ম দিয়েছিলেন। শহীদ জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে একদলীয় ব্যবস্থা বাতিল করে বহুদলীয় ব্যবস্থার প্রবর্তন করলেন, ফলে আওয়ামী লীগ আবার নতুনভাবে বাকশালের গর্ভ থেকে জন্ম নিল। আশরাফ সাহেব হয়তো সে কারণে বিএনপির কাছে তার দলকে ঋণী ভাবছেন। যাক একটা কৃতজ্ঞতা বোধ থাকার জন্য অন্তত ধন্যবাদ দিতে হয় জনাব আশরাফকে। কিন্তু সমস্যা হলো, বিএনপি তো এমন কোনো পরামর্শ আশরাফ সাহেব বা তার দলের কাছে চায়নি? তাহলে তিনি এমন বড় শুভাকাঙ্ক্ষী সাজলেন কেন বিএনপির? কে যে কখন কার শুভাকাঙ্ক্ষী সাজে তা বোঝা বড় কঠিন হয়ে পড়ে মাঝে মাঝে। একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। আমি অঙ্ক করতে খুবই ভয় পেতাম। অঙ্কের শিক্ষক পড়াতে এলে ভাবতে পারতাম না কী করব। মা এগিয়ে এসে প্রতিদিন বলতেন, বাবা তুমি ড্রামের আড়ালে গিয়ে পালাও। আমি মায়ের কথায় প্রতিদিন ড্রামের কাছে পালাতাম। আর আমার শিক্ষক এসে প্রতিদিন ওখান থেকে আমাকে ধরে নিয়ে গিয়ে পড়তে বসাতেন। আমি প্রতিদিনই একই জায়গায় পালাতাম। আর একই জায়গা থেকে মাস্টার মশাই আমাকে রোজ ধরে নিয়ে যেতেন। বিষয়টি বুঝতে আমার অনেক বড় হতে হয়েছে। জানি না আশরাফ সাহেব হঠাত্ করে মাস্টার মশাই সেজে আমাদের অঙ্ক শেখাতে ব্যস্ত হলেন কেন? বিএনপির দর্শন সহজ ও সরল এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ, এটা ঠিক। তবে আপনি সহজ-সরল দেখে যতটা বোকা মনে করেছেন বিএনপিকে, বিএনপি তা কিন্তু নয়। পোড় খেতে খেতে বিএনপির বুদ্ধিতে এখন অনেকটা পাক ধরেছে। বিএনপিকে দয়া করে আপনার ‘আশরাফি দাওয়াখানা’ থেকে বিনে পয়সায় পরামর্শ দেয়া বন্ধ করুন। বিএনপি জানে, কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা যেভাবে অর্জিত হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই পুনঃঅর্জন করতে হবে। যেভাবে বাদ দেয়া হয়েছে সে পথে যে কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন হবে না, তা বিএনপি ভালোভাবেই বুঝতে পারছে। তাই বলছিলাম কি, বিএনপির প্রতি আপনাদের ঋণ শেষ হয়ে গেছে। যদি পারেন দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আপনার নিজের দলকে পরামর্শ দিন যে, কেয়ারটেকার ব্যবস্থা যেভাবে বিলুপ্ত করেছে, আপনার দলীয় সরকার সেভাবেই যেন পুনর্বহাল করে। আর তাতে আপনার দলই বেশি লাভবান হবে। হয়তো দেশবাসী উপকৃত হবে, দেশ রক্ষা পাবে অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতির হাত থেকে। মনে রাখবেন, কোনো স্বৈরাচারই জনগণকে উপেক্ষা করে বেশিদিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি। আপনারাও পারবেন না। যত তাড়াতাড়ি শুভবুদ্ধির উদয় হয়, ততই মঙ্গল। কোনো রাজনৈতিক ইস্যু আদালতে নিয়ে তা আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা করলে আদালতের নিরপেক্ষ চরিত্রের ওপর প্রভাব পড়তে বাধ্য। এরূপ চেষ্টা অপচেষ্টার রূপ ধারণের আগেই তা বাদ দিতে পারা উত্তম। যদিও এরই মধ্যে অনেক দূর চলে গেছেন, তবে ফিরে আসা ভালো। রাজনৈতিক ইস্যু আদালতে বারবার নিয়ে গেলে তার দ্বারা রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বই বারবার ফুটে ওঠে। স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থারই অপর নাম। একথা ভুলে না যাওয়াই কাম্য। স্বাধীন বিচার ব্যবস্থাকে বিব্রত না করাই সভ্যতা। আর বিচার বিভাগকে যদি কোনো দল মনে করে নিজেদের, তা বোধকরি আর বেশিদিন চলবে না। বাংলাদেশের বিচার বিভাগের কিন্তু অনেক ঐতিহ্য আছে, এ কথাটি ভুললেও চলবে না।
লেখক : অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট

পদ্মা সেতুকেন্দ্রিক দুর্নীতি : যথেষ্ট নয় সাফাই গাওয়া



আহমদ আশিকুল হামিদ :
 ঝামেলা ভালোই পাকিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এমন এক সময়ে এসে পদ্মা সেতুর ঋণ বাতিল করেছে সংস্থাটি, জাতীয় সংসদে যখন বাজেট সবে পাস হয়েছে। অনেকে ধারণা করেছিলেন, এই বাজেটের বিরুদ্ধে বিরোধী দল সম্ভবত আন্দোলনে নামবে। আওয়ামী স্টাইলে হরতাল না করলেও দু-একটি মিছিল-সমাবেশ অন্তত করবে। অমন ধারণার পেছনে যুক্তিসঙ্গত কারণও ছিল। অর্থমন্ত্রী বাজেট পেশ করতে না করতেই সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়ে গিয়েছিল। যেসব পণ্যের ওপর নতুন কর ধরা হয়েছে সেগুলোর শুধু নয়, যেগুলোর ওপর কর কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে সেগুলোরও দাম বেড়েছে। ওষুধ থেকে ইলেকট্রনিক সামগ্রী পর্যন্ত হেন পণ্যের নাম বলা যাবে না যেগুলোর দাম না বাড়িয়েছিল ব্যবসায়ীরা। আপত্তি উঠেছিল এজন্য যে, অর্থমন্ত্রীর তথা সরকারের দায়িত্ব কেবল বাজেট পেশ করা নয়, বাজারও নিয়ন্ত্রণে রাখা। কিন্তু শেখ হাসিনার অর্থমন্ত্রী কেবল বাজেট পেশ করেই খালাস হয়ে গেছেন। এই সুযোগে পকেটের সঙ্গে মানুষের গলা কাটার ব্যাপারেও পাল্লায় নেমে পড়েছিল ব্যবসায়ীরা। সে পাল্লার তথা বাজেটের বিরুদ্ধে আন্দোলনের জন্য জনগণ যখন বিরোধী দলের দিকে আশায় তাকিয়ে অপেক্ষা করছিল, ঠিক তেমন এক সময়েই বিশ্বব্যাংক হঠাৎ পদ্মা সেতুর ঋণ বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে বেঁচে গেছে শেখ হাসিনার সরকার (কে জানে, সব জেনে-বুঝেই বিশ্বব্যাংক ‘বাপের কাজ' করেছে কি না!)।
সঙ্গে সঙ্গে ময়দানে নেমে পড়েছেন ক্ষমতাসীনরা। প্রথম দু-তিনদিন পর্যন্ত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে সোচ্চার দেখা যাচ্ছিল। তারপর দৃশ্যপটে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কোনো একজনই রাগ গোপন করেননি, রাগ সামালও দিতে পারেননি। সাংবাদিকদের সামনে তো বটেই, জাতীয় সংসদেও তারা এমনভাবেই বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন যা দেখে মনে হচ্ছিল যেন বিশ্বব্যাংক বিএনপি বা জামায়াতের মতো বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দল! বিশ্বব্যাংকের বিদায়ী প্রেসিডেন্ট রবার্ট জোয়েলিককে তো নাম ধরেই তুলোধুনো করেছেন তারা। শুধু এটুকু বলতেই বাকি রেখেছেন যেন রবার্ট জোয়েলিক তাদের কাছে দু-চার লাখ ডলার ঘুষ চেয়েছিলেন কিন্তু তারা রাজি হননি বলেই বিদায় নেয়ার আগে লোকটি ঋণ বাতিল করে গেছেন! বিশ্বব্যাংকের নতুন প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম অবশ্য উল্টো কথাই শুনিয়েছেন। দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই তিনি তার পূর্বসুরীর সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে ঘোষণা করেছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও সুর নরম হয়নি ক্ষমতাসীনদের। বিশ্বব্যাংককে তুলোধুনো করার এবং এক হাত নেয়ার ব্যাপারেও যথারীতি অগ্রবর্তী অবস্থানে থেকেছেন প্রধানমন্ত্রী। ৪ জুলাই জাতীয় সংসদের ভাষণে তিনি আগুন ঝরিয়েছেন।
ক্ষমতাসীনদের এমন প্রতিক্রিয়াই অবশ্য স্বাভাবিক। কারণ, বিশ্বব্যাংক শুধু তীরের কাছাকাছি এসে নৌকাই ডুবিয়ে দেয়নি, রাজনৈতিক অর্থে থাপ্পড়ও কষেই মেরেছে। জনগণের নাকের সামনে বহুদিন ধরে এই একটি মাত্র মূলার মতো মূলা ঝুলিয়ে রেখেছিলেন ক্ষমতাসীনরা। তাছাড়া টাকার পরিমাণও তো সামান্য নয়- ২০১১ সালের ২৮ এপ্রিল বিশ্বব্যাংক ১২০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দেয়ার চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। মে ও জুন মাসে চুক্তি হয়েছিল আইডিবি, এডিবি ও জাইকার সঙ্গে। সব মিলিয়ে ঋণ পাওয়া যেতো তিনশ' কোটি মার্কিন ডলারের মতো। বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। পদ্মা সেতু নির্মাণের পরও বিপুল পরিমাণ অর্থ বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। শোনা গেছে, আওয়ামী লীগ নাকি নির্বাচনের তহবিলও এই টাকা থেকেই তৈরি করতো। সে সম্ভাবনা তো নস্যাৎ হয়েছেই, পাশাপাশি আবার কলংকের বিরাট একটা তিলকও লেগেছে। গোটা জাতি অসম্মানিত হলেও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভের কারণ, তার কেবল সিঁদুর ও চন্দনের তিলক লাগানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে। দুর্নীতির- তাও এত বড় দুর্নীতির তিলক তার জন্য হজম করা কঠিনই হওয়ার কথা! কিন্তু সেটাই লাগিয়ে দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এজন্যই সংসদে ভাষণ দেয়ার সময় খুবই উত্তেজিত দেখা গেছে প্রধানমন্ত্রীকে। কথায়ও তিনি সংযত থাকতে পেরেছেন বলা যাবে না। যেমন রাগে-দুঃখে বিশ্ব্যাংককে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তিনি। কিছু উদাহরণও দিয়েছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী লক্ষ্য করেননি যে, বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ অনেক পুরনো এবং প্রতিষ্ঠিত তথা স্বীকৃতও বটে। একই কারণে প্রশ্ন উঠেছে, সব জেনেও তারা কেন দুর্নীতিপরায়ণ একটি সংস্থার কাছেই ভিখেরীর মতো হাত পেতেছিলেন? এখানে অর্থনীতিবিদ প্রফেসর আনু মুহাম্মদের একটি কথার উল্লেখ না করলেই নয়। তিনি লিখেছেন, ‘পদ্মা সেতু নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বিশ্বব্যাংককে যেসব পত্র লেখা হয়েছে, সেগুলো আমার পড়ার সুযোগ হয়েছে। কাকুতি-মিনতি ও হাতজোড় তাতে কম নেই। দুর্নীতির মধ্য দিয়ে যারা নৈতিকভাবে পরাজিত, দাসত্ব আর মেরুদন্ডহীনতাই যাদের সম্বল, তাদের গলায় জোর থাকবে কী করে?' (দৈনিক প্রথম আলো, ৪ জুলাই, ২০১২) অর্থাৎ ধাক্কা খাওয়ার ও অপমানিত হওয়ার পর লম্বা অনেক কথা বললেও ক্ষমতাসীনরা একই বিশ্বব্যাংকের কাছেই ভিক্ষার জন্য ‘হাতজোড়' করে আবেদন-নিবেদন করেছিলেন। টাকাটা পাওয়ার জন্য দেন-দরবারও তারা করেননি।
সংসদে দেয়া ৪ জুলাইয়ের ভাষণেও প্রধানমন্ত্রী যথারীতি চারদলীয় জোট সরকারকে ধরে টানাটানি করেছেন, বেগম খালেদা জিয়াকে ব্যক্তিগতভাবে পাকড়াও করতে চেয়েছেন। বিশ্বব্যাংক যে জোট সরকারের সঙ্গেও কয়েকটি চুক্তি বাতিল করেছিল সে কথাটা তিনি বিশেষ ইঙ্গিত সহকারে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, যাতে তার সরকারের লজ্জা ও ব্যর্থতার সমালোচনা করার আগে বিরোধী দল মাত্র সেদিনের ইতিহাস মনে রাখে। কথাটার মধ্যে আংশিক সত্যতা থাকলেও প্রধানমন্ত্রী কিন্তু ‘প্লাস পয়েন্ট' অর্জন করতে পারেননি। কারণ, শেখ হাসিনা যতো চিৎকার করেই বলুন না কেন, ইতিহাসের সত্য হচ্ছে, পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলপ্রসূ উদ্যোগ প্রথমে নিয়েছিল বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার। ২০০৪ সালে জাপানী সংস্থা জাইকাকে দিয়ে মাওয়া-জাজিরা প্রান্তে বিস্তারিত সমীক্ষাও জোট সরকারই করিয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় যুক্ত হয়েছিল বিশ্বব্যাংক এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। জাইকাসহ অন্য দু-একটি সংস্থা ও রাষ্ট্রও পদ্মা সেতু নির্মাণের ব্যাপারে সহায়তা করতে সম্মত হয়েছিল।
সংসদের ওই ভাষণে অন্য কিছু কথা বলেও তাক লাগিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তার পরিবার সদস্যদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করার পাশাপাশি নিজেই নিজের সার্টিফিকেট দিয়েছেন তিনি, এজন্য দুদকের সাহায্য নেননি। বলেছেন, তার পরিবার বলতে তিনি নিজে, বোন রেহানা এবং দু'জনের পাঁচ সন্তানকে বোঝায়। কথাটা কিন্তু না বললেও চলতো। কারণ, এটুকু সবই জানেন। জনগণ যা জানে না এবং যা জানতে খুবই আগ্রহী তা হলো, তার বোন রেহানা এবং সুপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়সহ পাঁচ সন্তানের কে ঠিক কোন কাজ করেন অর্থাৎ তাদের আয় আসে কোত্থেকে? এমন প্রশ্নের কারণ, সবাই তারা বিদেশে থাকেন- কেউ লন্ডনে, কেউ ওয়াশিংটনে, কেউ আবার কানাডার টরন্টোতে। শোনা যায়, প্রত্যেকে থাকেনও আবার চরম বিলাসিতার মধ্যে, বিত্ত-বৈভবও নাকি যথেষ্ট। প্রশ্ন ওঠে, এত বিপুল টাকা তারা পান কোথায়? তাদের কেউই তো নাকি উল্লেখযোগ্য এমন কোনো চাকরি বা ব্যবসা করেন না, যা থেকে এত বিপুল টাকার আয় আসতে পারে। অন্য একটি প্রশ্নও উঠেছে। পরিবার সম্পর্কে জানানই যখন দিয়েছেন তখন প্রধানমন্ত্রীর একথাটাও জানানো উচিত ছিল, দু' বোনের ছেলেরা ঠিক কোন দেশের এবং কোন ধর্মের মেয়েদের বিয়ে করেছেন? ছেলের ও ভাগ্নের বৌরা কি সবাই মুসলমান নাকি ইহুদী ও খৃস্টান? বলা বাহুল্য, ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশের প্রধানমন্ত্রী বলেই বহুদিন ধরে এ ধরনের প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা চলছে। কিন্তু শেখ হাসিনা কোনো জবাব দেননি। সে কারণে সত্য ও কল্পনা মিলিয়ে নানা কথাও প্রচলিত রয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। 
ওদিকে অর্থমন্ত্রী ও যোগাযোগমন্ত্রীকে দিয়ে সাফাই গাওয়ানোর পর নিজে দৃশ্যপটে এসেও প্রধানমন্ত্রী কিন্তু জনমনে আস্থা তৈরি করতে পারেননি। কারণ, যে-কোনো ব্যাখ্যা বা পর্যালোচনায় দেখা যাবে, পদ্মা সেতুকেন্দ্রিক বর্তমান সংকট ও লজ্জা-অপমানের জন্য সর্বতোভাবে দায়ী শেখ হাসিনার সরকার। সেতু নির্মাণের মাধ্যমে জাতির সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার পরিবর্তে ক্ষমতাসীনদের মধ্যে নিজেদের আখের গোছানোর উদ্দেশ্য প্রধান হয়ে ওঠায় প্রাথমিক পর্যায় থেকেই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। ঘুষ-দুর্নীতির পথে গোপন আয়োজনের মাধ্যমে পরামর্শক নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতাসম্পন্ন অনেক প্রতিষ্ঠানের দরপত্র বাতিল করে সরকার কাজ দিয়েছিল কানাডীয় প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিনকে। দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছিল তখনই। দুর্নীতির প্রথম তথ্য ফাঁস করেছিল দুনিয়া কাঁপানো ওয়েবসাইট ‘উইকিলিকস'। ২০১১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ‘উইকিলিকস' জানিয়েছিল, বাংলাদেশের যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের ‘সততায় ঘাটতি আছে'। সঙ্গে সঙ্গে তৎপর হয়ে উঠেছিল বিশ্বব্যাংক। অভিযোগে বিশ্বব্যাংক বলেছিল, তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী ও যোগাযোগ সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন এসএনসি-লাভালিনের কাছে ১০ শতাংশ হারে ঘুষ দাবি করেছিলেন। ঘুষের এই বাণিজ্যে বিশেষ কারো কারো প্রবাসী স্বজনসহ প্রভাশালীদের নামও এসেছিল- যারা ‘উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতিমূলক ষড়যন্ত্র' করেছিলেন। বিষয়টি তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিশ্বব্যাংক প্রথমে শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছিল। কিন্তু ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে ক্ষমতাসীনরা সে সময় অভিযুক্তদের পক্ষেই সাফাই গেয়েছিলেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত বলে বসেছিলেন, টাকাই যেখানে আসেনি সেখানে ঘুষ খাওয়ার ও দুর্নীতি করার প্রশ্ন আসে কিভাবে? মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে সততার সার্টিফিকেট দিয়ে দুদকও জবরই দেখিয়েছিল।
অসন্তুষ্ট বিশ্বব্যাংক তখন কানাডা সরকারকে তদন্ত করার আহবান জানিয়েছিল। গোপন তথ্যও তখনই ফাঁস হতে শুরু করেছিল। তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিল কানাডীয় প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিন। এর দু'জন কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। তাদের কাছ থেকেই জানা গেছে, যোগাযোগমন্ত্রী ও সচিবসহ তিনজন ১০ শতাংশ হারে ঘুষ দাবি করেছিলেন এবং এসএনসি-লাভালিনও ঘুষ দিতে সম্মত হয়েছিল। এ ব্যাপারে মধ্যস্থতা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর এক প্রয়াত ফুফাত ভাইয়ের ছেলে। ওয়াশিংটন ও লন্ডনসহ বিদেশে বসবাসরত বিশিষ্ট আরো জনাকয়েকের নামও প্রকাশিত হয়েছিল। এসব ব্যাপারে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিশ্বব্যাংক তাগিদ দিয়েছিল সরকারকে। সংস্থাটি তাদের তদন্ত রিপোর্টও পাঠিয়েছিল। অন্যদিকে সরকারের পাশাপাশি দুদকও ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টাই চালিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের বুঝতে অসুবিধা হয়নি, সংস্থাটির রিপোর্টে যেহেতু ‘প্রভাবশালী' অনেকের নাম এসেছে সে কারণে দুদকের পক্ষে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে না। এজন্যই বিশ্বব্যাংক শেষ পর্যন্ত চুক্তি বাতিল করেছে। বিশ্বব্যাংক কিন্তু কানাডীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘুষ-দুর্নীতিকেই একমাত্র কারণ বানায়নি। তথ্য-প্রমাণসহ বরং বলেছে, পদ্মা সেতুকেন্দ্রিক দুর্নীতি হয়েছে আরো অনেকভাবেই। একটি উদাহরণ হিসেবে সেতু নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণের কর্মকান্ডে চুরি, জালিয়াতি ও দুর্নীতির কথা এসেছে। পদ্মা সেতুর জন্য সরকার দু'হাজার ৭২০ দশমিক ৭৩ একর জমি অধিগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। বাংলাদেশেরও বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টে জানা গেছে, পরিকল্পিত সেতুর এলাকা সংলগ্ন অঞ্চলগুলোতে নালজমিকে ভিটেবাড়ি হিসেবে দেখিয়ে, কোথাও একজনকে অন্যের জমির মালিক সাজিয়ে এবং কোথাও বা খাস জমিতে রাতারাতি বাড়িঘর নির্মাণ করেও বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাট করা হয়েছে। লোপাট করেছে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন।
সর্বব্যাপী এ দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ারই তাগিদ দিয়েছিল বিশ্বব্যাংক। অন্যদিকে যোগাযোগমন্ত্রী ও সচিবসহ দু-চারজন কর্মকর্তাকে বদলি করার বাইরে আর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি সরকার। এর মধ্যদিয়েও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ক্ষমতাসীনদের মধ্যকার কয়েকজন এবং বিদেশে বসবাসরত তাদের স্বজনরা দুর্নীতিতে জড়িত থাকায় সরকার জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়নি। ফল যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। ৩০ জুন বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু চুক্তি বাতিল করেছে। সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুকেন্দ্রিক দুর্নীতি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ সরকারের অসহযোগিতার উল্লেখ করেছে। বলেছে, বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তা এবং কানাডার পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তা ও বেসরকারি পর্যায়ের ব্যক্তিদের মধ্যে ‘উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতিমূলক ষড়যন্ত্র' সম্পর্কে বিভিন্ন উৎস থেকে ‘বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-প্রমাণ' পাওয়া গেছে। এসবের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংকের পরিচালিত তদন্তের দুটি রিপোর্ট ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে এবং ২০১২ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানকে দেয়া হয়েছিল। বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির ব্যাপারে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার আহবান জানিয়েছিল। কিন্তু সরকারের প্রতিক্রিয়া ও জবাব ‘সন্তোষজনক' ছিল না। কোনো পদক্ষেপও নেয়নি সরকার। সে কারণে বিশ্বব্যাংকের পক্ষে ‘চোখ বুজে থাকা' সম্ভব হয়নি। যে কোনো প্রকল্প স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন করার জন্য বিশ্বব্যাংক তার দাতাদের কাছে দায়বদ্ধ বলেই সংস্থাটি পদ্মা সেতু চুক্তি বাতিল করেছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, বিশ্বব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্য প্রচন্ড অসম্মান হিসেবেই এসেছে। এমন দুর্নাম জাতির ভবিষ্যতের জন্য শুধু ভয়ংকরই নয়, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দৃষ্টিকোণ থেকেও অতি ধ্বংসাত্মক। যেহেতু বিশ্বব্যাংকসহ দাতা সংস্থা ও রাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় বলে সরকার মনে করে, সেহেতু ক্ষমতাসীনদের উচিত বিশ্বব্যাংকের অসন্তোষ দূর করার জন্য তৎপর হয়ে ওঠা। সত্যি পদ্মা সেতু নির্মাণ করার সদিচ্ছা থাকলে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে আবুল মাল আবদুল মুহিত এবং ওবায়দুল কাদেরের মতো ‘অতি যোগ্য' মন্ত্রীদের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীরও উচিত জিহবা সামাল দেয়া। একই সঙ্গে সরকারের উচিত বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ ও দুটি রিপোর্টসহ প্রকৃত সকল ঘটনা প্রকাশ করা। দুর্নীতিতে জড়িত হিসেবে বিশ্বব্যাংক যাদের নাম বলেছে তারা কারা- সে পরিচিতি অবশ্যই প্রকাশ করতে হবে। অভিযুক্তদের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কারো স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনেরা রয়েছেন কি না তা যেমন জানানো দরকার তেমনি দরকার অন্য একটি জিজ্ঞাসারও জবাব দেয়া- বিশ্বব্যাংক কেন ‘উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতিমূলক ষড়যন্ত্র' কথাটা বলেছে? এসবের জবাব না দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও তার সঙ্গি-সাথীরা যদি নতুন পর্যায়েও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে তিক্ততা বাড়াতে থাকেন তাহলে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা যাবে না। ক্ষমতাসীনরা আদৌ স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করবেন কি না সে বিষয়ে অবশ্য ইতোমধ্যেই সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, বিরোধী দলগুলো যখন জাতীয় মর্যাদার প্রশ্ন তুলেছে তখন জবাব দেয়ার পরিবর্তে ক্ষমতাসীনরা উল্টো দলীয় কর্মী ও ক্যাডারদের দিয়ে মিছিল করাচ্ছেন। তারা বিরোধী দলের বিরুদ্ধে হুংকার দিতে শুরু করেছে। জনগণ অবশ্যই এমন কর্মকান্ড দেখতে চায় না। প্রধানমন্ত্রীকে বুঝতে হবে, তাদের দুর্নীতির কারণে মাটিতে মিশে যাওয়া দেশের মর্যাদা ফিরিয়ে আনা না গেলে জাতিকেই শুধু মাথা নিচু করে থাকতে হবে না, অর্থনীতিও সর্বাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নিজেরা সত্যি ‘ক্লিন' কি না সে কথাটা প্রমাণ করার জন্য হলেও শেখ হাসিনার উচিত অবিলম্বে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া।

জাতিরাষ্ট্রের উন্নয়ন ভাগ্য নিয়ে তামাশা

সাদেক খান


সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরের শেষ মাস তথা এই ইংরেজি সালের জুন মাসটা ছিল বাংলাদেশের মানুষের জন্য দুর্ভোগের। হাল আমলে নিত্যনৈমিত্তিক খুন, লাশ উদ্ধার আর গুমের খবরের মধ্যে জুন মাসের একুন ছিল ৪০৭ খুন, গুপ্তহত্যা বা গুমের লাশ ১২, ক্রসফায়ার বা র্যাব-পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু ৫। দেরি করে পাওয়া খবরে ৩০ জুন খুন হওয়া ৯ লাশ উদ্ধার ওই হিসাবে আসেনি। ওই ৯ জনের মধ্যে ছিল ঢাকার নবাবগঞ্জে বিল থেকে উঠানো সাত বছরের মেয়ের লাশ, ফরিদপুরের সালথায় পাটক্ষেতে ফেলে যাওয়া নয় বছরের ছেলের লাশ, বড়াইগ্রাম আর ধামরাইয়ে রাস্তার পাশে পড়ে থাকা অজ্ঞাত তরুণ-তরুণীর লাশ, চরফ্যাশনে সাগরে চুবিয়ে মারা জেলের লাশ, কুয়াকাটায় ছেলের হাতে খুন হওয়া বাবার লাশ, বালিয়াডাঙ্গা আর মিঠাপুকুরে যথাক্রমে যৌতুকের জন্য নির্যাতনে আর পরকীয়ার সন্দেহে দুই গৃহবধূ খুন আর ধামরাইয়ে জুয়ার টাকার ভাগ নিয়ে খুন হওয়া স্কুলছাত্রের লাশ। এভাবে প্রতিদিন গড়ে খুন হয়েছে ১৪ জনের বেশি। হিসাবে আরও ধরা হয়নি বেশকিছু লঞ্চ ও নৌকাডুবির মৃত্যু, অপঘাত মৃত্যুর সংখ্যাও ধরা হয়নি। যেমন ৩০ জুনেরই শুধু খবর : সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত চার, আহত দশ, বন্যার পানিতে ডুবে মরেছে দুজন, সেপটিক ট্যাংকের বিষাক্ত গ্যাসে মৃত পাঁচ, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মরেছে একজন, ট্রেনে কাটা পড়ে একজন, আর আত্দহত্যা করেছে এক স্কুলছাত্র, চাঁদাবাজদের হামলায় আহত হয়েছে ১০ জন, আর সন্ত্রাসী হামলায় গুরুতর আহত হয়েছে এক ছাত্রনেতা।

জুনে সারা মাসে দেশে ৭৮টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১৪ জন নারী ও ৬৪ জন শিশু। সারা দেশে একজন সাংবাদিক নিহত ও ১৪ জন সাংবাদিক নির্যাতিত হয়েছেন। এ ছাড়া ৩২ জন ইভ টিজিং এবং আটজন এসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন। ওদিকে হঠাৎ বন্যায় আর ভারতের আসাম-মেঘালয়ে অতিবৃষ্টির ঢলে নদীস্ফীতিতে অস্থির দেশের এক-পঞ্চমাংশ। মফস্বলে জলাবদ্ধতায় পানিবন্দী মানুষ বিপন্ন, রাজধানীতে মহানগরগুলোতে খাবার পানি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের হাহাকার। জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী নির্বিকারচিত্তে একটা মনগড়া বিশাল ঋণনির্ভর বাজেট পেশ করে দলীয় এমপিদের বাহবা কুড়ালেন, যারা হাততালি দিলেন তারাও জানেন ওই বাজেট বাস্তবায়ন হবে না, গলাবাজি আর ভোটারদের মিথ্যা সান্ত্বনা দেওয়ার বুলি জোগাবে মাত্র। আর সাধারণ মানুষের ভাগ্যে বাজেট পেশের দিন থেকেই শুরু হলো বিড়ম্বনা। বাজেট প্রস্তাব পেশের দিন যে দ্রব্যমূল্য বাড়তে শুরু করেছে, তা আর থামার লক্ষণ নেই। বাজেট আলোচনা করতে গিয়ে শেয়ারবাজারে দরপতনের কোনো প্রভাব অর্থনীতিতে বর্তায় না বলে তিনি যে ফতোয়া দিলেন, তার ফলে সারা মাস শেয়ারবাজারের অধঃপতন আর থামল না। শেয়ারবাজার ডুবলেও বাজেটে যে কালো টাকা বিনিয়োগ (আর কালো টাকা তৈরিরও) ঢালাও সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তাতে 'অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল হতে চলেছে' বলে আপ্তবাক্য শোনালেন অর্থমন্ত্রী। আর যত দোষ নন্দ ঘোষ এই থিওরি অনুসরণ করে প্রধানমন্ত্রী ও তার পারিষদরা বলতে থাকলেন : আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই উন্নয়ন, আর বিএনপি দেশকে শুধু হত্যা, ষড়যন্ত্র আর লাশ উপহার দিতে পারে, পদ্মা সেতুতে গোড়ায় বিএনপি-ই দুর্নীতি করেছিল বলে বিশ্বব্যাংকের অনুদান বন্ধ ছিল, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বৈদেশিক ঋণপ্রাপ্তির গেরো খুলেছে। এমন সময় নতুন সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরের শেষ দিনে বাংলাদেশের যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ভাষায়, 'বিনা মেঘে বজ্রপাত' ঘটাল বিশ্বব্যাংক। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ পরিবেশকদের অনলাইনে এবং বিবিসি রেডিও টেলিভিশনে ৩০ জুন ভোরে বহুভাষিক বিশ্বসংবাদে দুনিয়াকে জানান দেওয়া হলো_ বাংলাদেশের পদ্মা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের জন্য বিশ্বব্যাংক যে ১২০ কোটি ডলার ঋণ দিতে চেয়েছিল, দুর্নীতির অভিযোগ পেয়ে দীর্ঘ বাদানুবাদের পর শেষ পর্যন্ত বিশ্বব্যাংক সেই ঋণ দেবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওয়াশিংটন থেকে জারি করা বিশ্বব্যাংকের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হলো, দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার সহযোগিতা না করায় ওই ঋণচুক্তি বাতিল করা হয়েছে। সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তা, কানাডার পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি ব্যক্তিদের মধ্যে যোগসাজশে বিভিন্ন সূত্র থেকে দুর্নীতির বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-প্রমাণ বিশ্বব্যাংকের হাতে এসেছে। এসব তথ্য-প্রমাণ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে দেওয়া হয়েছে। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এবং ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে এসব তথ্য-প্রমাণ দেওয়া হয়। তাদের প্রদত্ত তথ্য-প্রমাণ সম্পর্কে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি করেছিল বিশ্বব্যাংক। বলেছিল, যেসব সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের সরিয়ে দিতে এবং অভিযোগ তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি বিশেষ তদন্ত দল নিয়োগ করতে। বিশ্বব্যাংকের এই অবস্থান ব্যাখা এবং বাংলাদেশ সরকারের জবাবের জন্য একটি উচ্চ পর্যায়ের দল ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সরকারের প্রতিক্রিয়া বা জবাব সন্তোষজনক ছিল না। বিশ্বব্যাংক একটি প্রকল্পে তখনই অর্থায়ন করতে পারে যখন তারা সেই প্রকল্পের স্বচ্ছতা এবং কার্যক্রমের পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। 

এমন 'বজ্রাঘাতেও' সবজান্তা অর্থমন্ত্রীর বাক পারুষ্যের দম কমেনি। বিশ্বব্যাংকের ঋণচুক্তি বাতিল ঘোষণার সাত দিন আগে বুকের পাটা জাহির করে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সাংবাদিকদের বললেন, পদ্মা সেতুর অর্থায়ন নিয়ে আমি কোনো বক্তব্য রাখতে চাই না। শুধু এটুকু বলতে পারি, অপ্রমাণিত বিষয় নিয়ে (দুর্নীতির) কথা উঠছে। আমি একসময় বিচারিক হাকিমের দায়িত্ব পালন করেছি। তাই জানি, প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষী বলা যায় না। প্রমাণ ছাড়া কারও নাম প্রকাশ করা নির্বুদ্ধিতা। দুর্নীতি দমন কমিশনের (বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ তদন্তের) ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারি না। কিছু এলে ওখানেই পাঠিয়ে দেই। তবে আমি এ কথা বলব, পদ্মা সেতুর জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন নিয়ে একটি অভিযোগও আসেনি। ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) চুক্তিই অনুমোদন করে রেখেছে। কিন্তু কাজ বন্ধ। যেহেতু সবার একসঙ্গে কাজ করার কথা।

শেয়ারবাজার নিয়ে খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ কমিটির প্রতিবেদনেও কিছু নাম এসেছিল। কিন্তু সাক্ষী নেই। একই জিনিস হয়েছে পদ্মার বেলায়। কিছু নাম এসেছে। প্রমাণের কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু সেই প্রমাণ আমার কাছে নাথিং (কিছুই না)। 

এখন পদ্মাসেতুর ঋণচুক্তি বাতিলের পর তিনি কয়দিন ধরে সকালে এক কথা, বিকালে এক কথা, আজ এক রায়, কাল আরেক রায় দিয়ে চলেছেন, যার মূল কথা তার কিংবা বাংলাদেশ সরকারের কোনো দোষ নেই। সব দোষ বিশ্বব্যাংকের বিদায়ী প্রধান কর্মকর্তা রবার্ট জোয়েলিকের। নতুন প্রধান কর্মকর্তা মি. কিমের কাছে চিঠি লিখে তিনি সব ঠিক করে ফেলবেন। প্রথমেই তিনি বললেন, পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংকের বিবৃতি 'সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য'। বিশ্বব্যাংকের কায়দা-কানুন রীতিনীতি বা ভেতরের খবর তার নখদর্পণে এমন এক ভঙ্গি নিয়ে তিনি বললেন, (বিশ্বব্যাংকের) বিবৃতিতে যে ভাষা এবং ভাব ব্যক্ত করা হয়েছে, বিশ্বব্যাংক সে রকম বিবৃতি তাদের কোনো সদস্য দেশ সম্পর্কে দিতে পারে কি না, সে বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আমার মনে হয়, এটি বিশ্বব্যাংকের মন্তব্য নয়। এটি বিশ্বব্যাংকের বিদায়ী সভাপতি রবার্ট জোয়েলিকের ব্যক্তিগত মন্তব্য। পরদিন কিছুটা স্বর খাটো করে 'পদ্মাসেতু বিষয়ে গণমাধ্যমের উদ্দেশে সরকারের বক্তব্য' পেশ করতে গিয়ে তিনি বললেন, 'বিশ্বব্যাংক একটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ঘোষণা করে পদ্মা সেতুর জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে যে ঋণচুক্তি দস্তখত করেছিল, সেটি বাতিল করা হয়েছে। তাদের বিজ্ঞপ্তিতে একটি অভিযোগ করা হয়েছে, একটি দুর্নীতিসংশ্লিষ্ট ষড়যন্ত্র প্রতিরোধে বাংলাদেশ যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি। এতে বিশ্বব্যাংক দাবি করেছে, তিনটি বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সম্মতি চেয়েও তারা পায়নি।

শনিবার আমি এক সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বিশ্বব্যাংকের এ ধরনের বিজ্ঞপ্তি প্রদানের যৌক্তিকতা সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশ করেছি এবং সে জন্য তাদের বিজ্ঞপ্তিটি অগ্রহণযোগ্য মনে করেছি। আমি আরও বলেছি, 'পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ তারা তুলে ধরেছে এবং সে সম্বন্ধে আমরা কোনো পদক্ষেপ নেইনি'_ এ কথাটিও সঠিক নয়। তার পর পদ্মা সেতু নিয়ে অর্থায়ন বিশ্বব্যাংক বিগত বিএনপি সরকারের দুর্নীতির কারণেই বন্ধ রেখেছিল, সরকারিভাবে এই দাবি করে তার প্রচেষ্টায় কি করে ঋণচুক্তি সম্পাদিত হলো সেই কৃতিত্বের বিশদ বিবরণ দিয়ে তিনি মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্বব্যাংকের কাছে বার্তা দিলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পের ঋণচুক্তি বাতিল অনাকাঙ্ক্ষিত ও রহস্যজনক। এ ব্যাপারে বিশ্বব্যাংকের বিজ্ঞপ্তি জারি করা অসম্মানজনক। বিষয়টি বিশ্বব্যাংকের পুনর্বিবেচনা করা উচিত। আমরা তাদের পুনর্বিবেচনার জন্য অপেক্ষা করব। 

পরদিন জাতীয় সংসদে বিবৃতি দিয়ে আবারও বিশ্বব্যাংকের ওপর দোষারোপ করে অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দিলেন, আমি জোরগলায় বলতে পারি, পদ্মা সেতু প্রকল্পে কোথাও কোনো অপচয় বা দুর্নীতি হয়নি। আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, এই অর্থবছরেই আমরা পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করব। বিশ্বব্যাংক অসমর্থিত বা অসম্পূর্ণ অভিযোগের ভিত্তিতে একটি দেশকে এভাবে অপবাদ দিতে পারে না বা সে দেশের জনগণের মর্যাদাহানি করতে পারে না। 

অর্থমন্ত্রীর কর্তৃত্বাধীন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) থেকে সাংবাদিকদের বেনামি ব্রিফিং দেওয়া হলো_ পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য বিশ্বব্যাংকের নতুন প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিমই এখন ভরসা, এ ভাবনা মাথায় রেখে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করছে সরকার। সে অনুযায়ী কাজও শুরু করেছে। কিন্তু সেই আশারও বাড়া ভাতে ছাই দিয়ে বিশ্বব্যাংকের নয়া প্রধান জিম ইয়ং কিম ৩ জুলাই সরাসরি বলে দিয়েছেন, পদ্মা সেতু বাতিলের সিদ্ধান্ত সঠিকভাবে নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের মঙ্গলের বিষয়ে আমরা সজাগ। কিন্তু বিশ্বব্যাংক কখনো দুর্নীতি সহ্য করে না। সেটাও দেখতে হবে।

দেশবাসীর প্রতিক্রিয়ার নমুনা প্রতিবেদনে এক সংবাদ ভাষ্যকার লিখেছেন, এক বছর ধরে পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর সরকার যে অবস্থান নিয়েছিল বা যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছে বলে দাবি করেছে, তা আমাদের জনগণের কাছে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়নি। দ্বিতীয়ত, আমরা দেখলাম, আমাদের 'স্বাধীন' দুর্নীতি দমন কমিশন পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে খুবই দ্রুততার সঙ্গে একটি তদন্ত করল। এত দ্রুত এ ধরনের একটি আন্তর্জাতিক দুর্নীতির তদন্ত করে সিদ্ধান্ত দেওয়ার 'সক্ষমতার' জন্য 'করিৎকর্মা' হিসেবে আমরা দুদকের প্রশংসা করতে পারি, কিন্তু তদন্তের ফলাফলের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নয়। ফলে দুদক যে তদন্ত করেছে এবং যে রায় দিয়েছে, বাংলাদেশের মানুষের কাছেই তা বিশ্বাসযোগ্য হয়নি। বিশ্বব্যাংক তো অনেক পরের ব্যাপার!

দুর্নীতির তদন্তে বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ তিনটি শর্ত, সন্দেহভাজনদের সাময়িক 'ছুটি' (বরখাস্ত নয়) দিয়ে দূরে রাখা, দুদকে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষ টিম গঠন করা এবং বিশ্বব্যাংক নিযুক্ত একটি উপদেষ্টা প্যানেলকে তদন্তের সর্ববিষয়ে অবহিত রেখে পরামর্শ নেওয়া, সে সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী সংসদে দেওয়া বিবৃতিতে বলেছেন, এ প্রস্তাবগুলোতে সমস্যা হচ্ছে যে, আমরা কোনো কিছু প্রমাণ হওয়ার আগেই দুর্নীতির দায় স্বীকার করে নিচ্ছি।

প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, যে কোনো দুর্নীতির তদন্তে এটাই স্বাভাবিক নিয়ম যে, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদের তদন্তের স্বার্থে সরিয়ে দেওয়া হয়। এর সঙ্গে দুর্নীতি স্বীকার করে নেওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। অন্যদিকে দুদকের তদন্ত যে গ্রহণযোগ্য হয়নি, বিষয়টি যে আরও গুরুত্ব দিয়ে বিশেষভাবে তদন্ত করা উচিত, সে দাবি তো দেশের ভেতর থেকেই উঠেছে। আর আন্তর্জাতিক যে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে এবং যে প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের সম্পৃক্ততা রয়েছে, তারা সেখানে স্বচ্ছতার বিষয়টি নিশ্চিত করতে চাইবে, এটাই তো স্বাভাবিক। এ তিনটি শর্তের ভিত্তিতে তদন্ত করে যদি প্রমাণ করা যেত বাংলাদেশে কোনো দুর্নীতি হয়নি, সেটাই কি সবচেয়ে ভালো পথ ছিল না? বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি বাতিল করায় বাংলাদেশ অপমানিত হয়েছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। সেই অপমানের দায় কার? অর্থমন্ত্রী বলেছেন, আমি জোরগলায় বলতে পারি, পদ্মা সেতু প্রকল্পে কোথাও কোনো অপচয় বা দুর্নীতি হয়নি। তা-ই যদি হয়, তবে দেশের ভেতরেই পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে যে বিচারিক তদন্তের দাবি উঠেছে, তা মানতে সমস্যা কোথায়?

এসব প্রশ্নের সদুত্তর নেই। তবে মিডিয়ায় বাগযুদ্ধে মোটেও পিছপা হননি অর্থমন্ত্রী ও অন্যান্য ক্ষমতাসীন নেতা-মন্ত্রীরা। যোগাযোগমন্ত্রী বললেন, পদ্মা সেতু নিয়ে 'চমক' আছে, 'সারপ্রাইজ'-এর অপেক্ষা কর। পরে বিশ্বব্যাংকের নয়া প্রধান জিম ইয়ং কিমের মুখে 'ঋণচুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত সঠিক' এ কথা শোনার পর যোগাযোগমন্ত্রী বললেন, 'সারপ্রাইজ' কথাটা বলা ভুল হয়েছে। বিরোধী দলনেতা বেগম জিয়া সাফ বললেন, পদ্মা সেতু দুর্নীতিতে প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবার জড়িত বলেই এত গড়িমসি, পদ্মা সেতু হতে পারল না। সঙ্গে সঙ্গে এক আওয়ামী শীর্ষ নেতার হুমকি_ ওই কথা ফিরিয়ে নিন, না হলে সারা দেশে জেলায় জেলায় একসঙ্গে দলের ওস্তাদ মামলাবাজরা মানহানির মামলা ঠুকে হয়রানির চূড়ান্ত করবে। বিএনপির এক শীর্ষনেতা জবাবে বললেন, মুরাদ থাকে তো বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করুন। দেশের লোক ভাবছে, জাতিরাষ্ট্রের ভাগ্য নিয়ে কি তামাশা ফেঁদেছে রাজনীতিকরা!

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

ডিম থেকে যে গল্পের শুরু



এ এ  জা ফ র  ই ক বা ল
বাজারের পাইকাররা এক ডজন ডিমের দাম নিচ্ছেন ১১০ টাকা। পাড়ার মুদি দোকানগুলোতে এক হালি ডিমের দাম এখনও ৪০ টাকা। একটা ডিম উত্পাদনে খরচ কত, ভোক্তাদের সে হিসাবটি সঠিকভাবে যথাসময়ে জানান না দিয়ে মাত্র এক থেকে দেড় সপ্তাহের মধ্যে ৮৫-৯০ টাকা ডজনের ডিম ১২০ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। ভোক্তারা যখন ডিম-মুরগির বাজার নিয়ে সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন তখন টেলিভিশনে টক শো করে বোঝানো হয়েছে, চারটি ডিম সমান এক লিটার দুধ; মিল্ক ভিটার এক লিটার দুধ বিক্রি করা হচ্ছে ৬২ টাকায়। সুতরাং এক পিস ডিমের দাম তো ১৫ টাকা হওয়া উচিত। 
কথার চাতুরীতে পোল্ট্রি খামারি এবং ব্যবসায়ীরা ভোক্তাদের নিয়ে যে খেলা খেলেছেন তাতে তারা হেরেছেন। পুরো কূটকৌশলটিই হয়ে গেছে বুমেরাং। 
সরকার দৈনিক গড়ে ছয় লাখ পিস ভারতীয় ডিম আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। এতে খামারি পর্যায়ে প্রতিডজন ডিমের দাম কমেছে ২০ আর ভোক্তাপর্যায়ে ১০ টাকা। যদিও জুলাই পর্যন্ত ডিম আমদানির সিদ্ধান্ত রয়েছে। এ সময়ের মধ্যে যদি বাজার নিয়ন্ত্রণে না আসে তাহলে সরকার বাধ্য হবে ছয় লাখের জায়গায় দৈনিক ১৮ লাখ ডিম আমদানি করতে। আগস্টে রোজা থাকবে, সুতরাং এ মাসেও খোলা রাখতে হবে ডিম আমদানির দরজা। 
এখন পোল্ট্রি ব্যবসায়ীদের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে ভিন্ন সুর। লাখো টাকা খরচ করে সংবাদপত্রে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে তারা বলছেন, ভারতে বার্ড ফ্লু আছে, তাই সেখান থেকে ডিম আমদানি করা উচিত নয়। ভারতীয় ডিমের গুণগত মান ভালো নয়, আকারে ছোট। এভাবে ডিম আমদানি অব্যাহত থাকলে সব পোল্ট্রি খামার বন্ধ হয়ে যাবে। বেকার হবে লাখো লোক এবং ক্ষতি হবে হাজারো কোটি টাকা। শুধু ভারত থেকে ডিম আমদানি বন্ধ করলেই চলবে না, বিদেশের কোনো বড় কোম্পানিকেও এদেশে পোল্ট্রি খামার গড়ে তুলতে দেওয়া যাবে না। কারণ তারা তাদের দেশের ব্যাংক থেকে কম সুদে ঋণ নিয়ে এদেশে যে মুনাফা করবে তা-ও নিয়ে যাবে তাদের দেশে। এতে করে দেশ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সুতরাং পোল্ট্রি শিল্পকে বাঁচানোর প্রয়োজনে সরকারকে শতকরা ৫.৫০ হারে নতুন আরোপিত কর রেয়াত দিতে হবে এবং কৃষিঋণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদেরও ব্যাংকঋণের সুদের হার কমাতে হবে। 
দেশের পোল্ট্রি শিল্পকে বাঁচানোর তাগিদে সরকার এসব দাবি পূরণে সহানুভূতিশীল হলে কেউ আপত্তি করবে না। তবে এক্ষেত্রে পোল্ট্রি ব্যবসায়ী এবং খামারিদের অঙ্গীকার করতে হবে-সময় এবং সুযোগ বুঝে তারা যেন ভোক্তাদের এবারকার মতো জিম্মি বানিয়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির অপকৌশল গ্রহণ না করেন। কোনো বড় বিদেশি কোম্পানি যদি তাদের দেশের পুঁজি নিয়ে বাংলাদেশে পোল্ট্রি শিল্প গড়তে আসে তাহলে দেশের স্বার্থেই তাদের স্বাগত জানানো প্রয়োজন। কারণ বাংলাদেশের পোল্ট্রি ব্যবসায়ীদের তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আনা না গেলে এ শিল্পের উন্নয়ন চিন্তা অবান্তর। পাশাপাশি ভারতের সঙ্গেও বাজার প্রতিযোগিতায় থাকতে হবে। মাত্র মাস তিনেক আগেও টেকনাফ থেকে মংডুতে প্রচুর ডিম যেত। দাম বেড়ে যাওয়ায় সেখানে ডিম পাঠানো যাচ্ছে না। এতে কার কতটুকু ক্ষতি হয়েছে খামারি এবং ব্যবসায়ীরা নিশ্চয়ই তা বিবেচনায় নেবেন। 
খামারিরা যে ডিম বিক্রি করছে পিসপ্রতি সাড়ে সাত টাকা ভোক্তাকে কেন সে ডিম ১০ টাকায় কিনতে হবে? শুধু সরকারকে নয়, খামারিদেরও বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া উচিত। ব্যবসায় আড়তদারের মতো মধ্যস্বত্বভোগী থাকতেই পারে কিন্তু তাদের ওপরও দৃশ্যমান এবং পরিকল্পিত নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি।
দেশে যেখানে ডিমের ঘাটতি দৈনিক ২০ থেকে ২৫ লাখ সেখানে কেন ছয় লাখ পিস আমদানির অনুমতি দেওয়া হল? ভারতীয় ডিম ঢাকা পর্যন্ত আসতে নাকি খরচ হয় পিসপ্রতি সাড়ে ছয় টাকা। বাংলাদেশি কিংবা ভারতীয় কোনো ডিমই তো সাড়ে সাত কিংবা আট টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায় না। সঙ্গত কারণেই বলতে হয়, চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ভোক্তাদের কম দামে ডিম সরবরাহের জন্য কিংবা ডিমের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য ডিম আমদানি করা হচ্ছে না। চাহিদা ঘাটতির সুযোগে তৃতীয় পক্ষকে অস্বচ্ছ ব্যবসা করার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এ অস্বচ্ছতাগুলো চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। এগুলো অপসারণ কিংবা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেননি কেউ। দেশে এখন ব্যবসা-বাণিজ্যের যে অবস্থা বিরাজমান তাকে না বলা যায় ভোক্তাবান্ধব, না বলা যায় উত্পাদনবান্ধব। যে বিশেষণটি এক্ষেত্রে সর্বাধিক প্রয়োজন হতে পারে-ভোক্তাদের গলায় গামছা পেঁচিয়ে পয়সা আদায়ের চেষ্টা মাত্র। 
সারা মুসলিম বিশ্বে রমজান এলে ব্যবসায়ীরা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর দাম কমায়। বাংলাদেশে সেটি ঠিক তার উল্টো। রমজান আসতে না আসতেই বেড়ে চলেছে পেঁয়াজ, ছোলা, ডাল, রসুন, হলুদ, শুকনা মরিচের দাম। এসব পণ্য বিপণনে সরকার শতকরা ১০ ভাগের বেশি মুনাফা না করার পরামর্শ দিয়েছে। এ ধরনের পরামর্শ ও নির্দেশ অতীতে কেউ মানেননি, ভবিষ্যতেও কেউ মানবেন না। কারণ মানানোর মন্ত্র সরকারের জানা নেই। তা ছাড়া রাজনৈতিক সরকার যদি জনস্বার্থের কথা বিবেচনায় না নিয়ে দলের লোককে দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করাতে চায় এবং করার সুযোগ তৈরিতে সব সময় যত্নবান থাকে তাহলে অবধারিতভাবেই জনস্বার্থ উপেক্ষিত হবে। 
এবার টিসিবির ডিলারশিপ কারা পেয়েছে? এমন লোকও নাকি আছে যাদের দোকান কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানই নেই। ইতোমধ্যে এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে গণমাধ্যমে। টিসিবি কর্তৃপক্ষ অদ্যাবধি এ প্রশ্নটি আমলে নেয়নি। চিনি, ভোজ্যতেল, ডাল, ছোলা, খেজুরসহ অনেক পণ্য আমদানি এবং বিপণনের দায় এবার টিসিবির কাঁধে। তারা যদি এ দায় দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর ন্যস্ত করে অতীতের মতো নিরাপদ থাকতে চায় তাহলে সরকারের বারটা বাজাতে আর কারো প্রয়োজন হবে না। 
সময় বাঁচানো, অর্থ বাঁচানো এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার ব্যাপারে সরকার সোচ্চার হলেও এক্ষেত্রে টিসিবি এবং ট্যারিফ কমিশনের কী করা প্রয়োজন তা বোধ হয় এ দুটি প্রতিষ্ঠান বোঝে না। এমনকি সরকারকে সহযোগিতা করার কৌশল নির্ণয়েও তারা উদাসীন। টিসিবি এবং ট্যারিফ কমিশনের দুটি ওয়েবসাইট আছে। টিসিবির ওয়েবসাইট সম্পর্কে মানুষ জানে কিন্তু ট্যারিফ কমিশনের ওয়েবসাইট সম্পর্কে কেউ কিছু জানেই না। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যা আমাদের আমদানি করে আনতে হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে সেসব পণ্যের দাম কোথায় কত, সেগুলো সঠিকভাবে এ ওয়েবসাইটগুলোতে নেই কেন? থাকলে কী হতো? ভোক্তারা দাম না বাড়ানোর জন্য ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারত। গত ছয় মাসে ভোজ্যতেলের দাম কতবার বেড়েছে? ব্যবসায়ীরা কার অনুমতি নিয়ে ভোজ্যতেলের দাম বাড়াচ্ছেন? যারা সিন্ডিকেট করে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ান তাদের বিরুদ্ধে ট্যারিফ কমিশন কী ব্যবস্থা নিয়েছে? অচিরেই জনগণ এগুলো জানতে চাইবে, কারণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতার প্রশ্নে জনগণ আগের চেয়ে বেশি সজাগ এবং সোচ্চার। প্রতিষ্ঠান আছে কি নেই সেটাই যখন বোঝা যায় না তখন সে প্রতিষ্ঠান রেখে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতা গুণে কী লাভ?
অবশ্য আজকাল রাজনৈতিক প্রশাসনে একটি নতুন ও আজব ব্যাখ্যা শোনা যাচ্ছে সরকারের মন্ত্রী-আমলাদের মুখে-লিখিত অভিযোগ থাকতে হবে। গত সাড়ে তিন বছরে যে বিষয়ে ভোক্তারা লিখিত অভিযোগ করেননি, আগামী দেড় বছরেও করবেন না কিন্তু তারপর যে জবাবটি দেবে তা সামাল দেওয়াটা হয়ে উঠবে কঠিন। 
নুনের দাম বাড়ছে তো বাড়ছেই। দেশি নুন দিয়ে বাজার চাহিদার ঘাটতি মেটানো যাচ্ছে না বলে বিদেশ থেকে প্যাকেটজাত লবণ আমদানির সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। তথাপি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। বাজারে ২০ টাকার এক কেজি নুন কিনতে গুনতে হচ্ছে ৩০ টাকা। তবে টাকা হলে নুন পেতে অসুবিধা হয় না। নুন নিয়ে শেষ পর্যন্ত কোন কেলেঙ্কারি হবে কে জানে। প্রবীণদের নিশ্চয়ই স্মরণ আছে নূরুল আমিন সরকারের নুন কাহিনী। দুই আনার নুনের দাম যখন আট টাকায় পৌঁছেছিল তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা হাইকোর্ট মোড়ে তত্কালীন প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রী মানিকগঞ্জের আবদুল লতিফ বিশ্বাসের সঙ্গে কী আচরণ করেছিল তা অনেকের জানা থাকতে পারে। 
ব্যবসায়ী এবং উত্পাদকরা সুযোগ পেলেই পণ্য ঘাটতি তৈরি করে জিম্মি বানায় ভোক্তাদের। ব্যবসায়ীদের এই কারসাজি চলে এসেছে দীর্ঘদিন ধরে। এ অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেছে সব সময়ের সব সরকার। কিন্তু লক্ষ করা গেছে, একটা সময় সরকারি শাসনযন্ত্র এবং সরকার ভোক্তার প্রয়োজনে অঙ্গীকারটি আমলে না নিয়ে সমঝোতা করছে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে। এতে সাময়িকভাবে হয়তোবা কারও কিছু লাভ হচ্ছে কিন্তু জনঅধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং জনপ্রতিনিধিদের স্বচ্ছতা হচ্ছে প্রশ্নবিদ্ধ। কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে এই অস্বচ্ছতা প্রত্যাশা করে না জনগণ। 
আর ১০টি অনুন্নত পণ্য ঘাটতির দেশের মতো আমাদের দেশেও রয়েছে অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতি। চাহিদার তুলনায় উত্পাদন কম হওয়ায় যে স্বাভাবিক পণ্য ঘাটতি, তা পূরণে পরিকল্পিত আমদানি সম্পর্কে সব সময় সতর্ক থাকতে হয় নিয়ন্ত্রণকারী বিশেষ করে সরকারকে। কোথা থেকে, কখন কোন পণ্য আনা প্রয়োজন-এগুলো নির্ধারিত নিয়মে যথাসময়ে সঠিকভাবে করা হলে সমস্যা সৃষ্টির ঝুঁকি থাকে কম। হঠাত্ সৃষ্ট কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির কারণে অনেক সময় এমন অবস্থাও ঘটে যেগুলো সামাল দেওয়া নিয়ন্ত্রণকারী, বিশেষ করে সরকারের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। তারপরও সব দায় বহন করতে হয় সরকারকে এবং এ সঙ্কট নিরসনে প্রস্তুতিটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্যই প্রয়োজন দেশে একটি সুষ্ঠু বাণিজ্যনীতি। 
আমাদের কোনো জাতীয় বাণিজ্যনীতি নেই। দেশের বয়স দুই কুড়ি অতিক্রান্ত হওয়ার পরও আমরা বাণিজ্যনীতির প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দিচ্ছি না। বাণিজ্যনীতি না থাকার কারণেই সময় এবং পরিস্থিতি বুঝে সুযোগ নিচ্ছেন ব্যবসায়ী, উত্পাদক এবং আমদানিকারকরা। এটা দূর হওয়া এবং দূর করা অত্যন্ত জরুরি। জনপ্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক সরকারের দ্বারা কাজটা যত সহজ ততটা সহজ নয় বিকল্প কোনো প্রশাসনের দ্বারা। এজন্য প্রয়োজন উদ্যোগ। কেন সে উদ্যোগ অনুপস্থিত সে ব্যাখ্যা কে দেবে? 
গ্রীষ্ম এবং বর্ষায় ডিম উত্পাদনে কতটা ঘাটতি থাকবে এবং কখন ডিম আমদানি করা হলে বাজার ব্যবস্থার ওপর মূল্যবৃদ্ধির কৌশল ঘটাতে পারবেন না ব্যবসায়ীরা, সেটা জানা থাকতে হবে কর্তৃপক্ষের। তাদের অজ্ঞতা জনভোগান্তির সৃষ্টি করলে দায় নিতে হবে সরকারকে। এখন নিতেও হচ্ছে। ডিম, নুন, তেলসহ অধিকাংশ পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সরকারকে চাপের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। 
বাজার নিয়ন্ত্রণের আইন সব দেশেই থাকে। কিন্তু আইন প্রয়োগের সঠিক কৌশল জানা না থাকলে আইন করে লাভ হয় না। আমাদের দেশে সে কৌশলটি খুঁজে বের করার আদৌ তাগিদ দেখা যাচ্ছে না। পয়সা হলে সবকিছুই পাওয়া যায়। অর্থাত্ সরবরাহ পরিমিত। পরিমিত সরবরাহ থাকার পর কেন পণ্যের দাম বাড়ছে সেটা নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না কেউ। এটা চলতে পারে না কিংবা চলতে দেওয়া উচিতও নয়। 
পণ্যবাজার যদি নিয়ন্ত্রণে না থাকে, ন্যায্যমূল্যে সঠিক সময়ে ভোক্তাকে পরিমিত পণ্য সরবরাহ যদি নিশ্চিত করা না যায় তাহলে কখনোই অর্থনীতিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। অর্থনীতিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে রাজনীতিতেও সুস্থতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে ডিম, নুন এবং তেল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সমঝোতা দীর্ঘমেয়াদি সুফল বয়ে আনবে না। ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পর্যায়ের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে যদি দ্রব্যমূল্যের সমন্বয় না থাকে তাহলে সব ক্ষেত্রেই বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে ওঠে।

লেখক : সাবেক ব্যাংকার

পদ্মা সেতু, বিশ্বব্যাংক ও অর্থমন্ত্রী


আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
যে প্রলয়ঙ্করী বন্যা ও প্লাবনকবলিত বাংলাদেশ দেখে বিবিসি থেকে শুরু করে অধিকাংশ বিদেশি পর্যবেক্ষক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, এবার বাংলাদেশে প্লাবনজনিত দুর্ভিক্ষে কমপক্ষে দু'লাখ লোক মারা যাবে, সে দুর্ভিক্ষ তৎকালীন হাসিনা সরকার ঠেকিয়েছিল। একজন লোককেও না খেয়ে মারা যেতে দেওয়া হয়নি। ত্রাণকার্যে সারা জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে নেমেছিল

পদ্মা সেতু সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিকে একটি আশার বাণী শুনিয়েছেন। সংসদে তিনি বলেছেন, অভ্যন্তরীণ সম্পদ দ্বারাই পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত করা সম্ভব এবং তার সরকার এই কাজটি করবে। সংসদে দেওয়া বক্তৃতায় পদ্মা সেতু প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের চাতুরীর কথাও তিনি ব্যক্ত করেছেন। প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। তিনি দেরিতে হলেও বিশ্বব্যাংকের খেলা সম্পর্কে সোজাসাফটা কথা বলেছেন এবং জাতিকে আশ্বাস দিয়েছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ দ্বারা পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব এবং এই সম্ভব কাজটিই তার সরকার করবে।
প্রধানমন্ত্রী এখন যে কথা বললেন, তার অর্থমন্ত্রী আগেই সে কথা বলতে পারলেন না কেন, তা আমার কাছে এক বিস্ময়। তিনি উল্টো বলেছিলেন, অভ্যন্তরীণভাবে অর্থ সংগ্রহ দ্বারা পদ্মা সেতু প্রকল্পের মতো কাজ করা সম্ভব নয়। সম্ভবত এই ধরনের নেতিবাচক মনোভাব থেকেই তিনি বিশ্বব্যাংকের সকল অযৌক্তিক ও অন্যায় দাবির সামনে নতজানু হয়ে দেনদরবার চালিয়ে যাওয়ার নীতি গ্রহণ করেছিলেন এবং সম্ভবত প্রধানমন্ত্রীকে এমন কথা বুঝিয়েছিলেন যে, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে তার যে সম্পর্ক, তাতে ব্যাংকপ্রধানদের মন তিনি গলাতে পারবেন।
অর্থমন্ত্রী তা পারেননি। তথাপি আশা ছাড়েননি। সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন না করার একতরফা ও অবমাননাকর সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়ার পরও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বিশ্বব্যাংকের কাছে ধর্ণা দেওয়ার কাজটি চালিয়ে যেতে চাচ্ছেন। এটা টিপিক্যাল ব্যুরোক্রেটিক টেন্ডেন্সি (বিশেষ ধরনের আমলা মনোভাব)। আমি ব্যক্তিগতভাবে অর্থমন্ত্রীকে চিনি এবং শ্রদ্ধা করি। ছাত্রজীবনে তিনি বাম রাজনীতি করতেন এবং ভাষা আন্দোলনে আমরা এক সঙ্গে জেল খেটেছি। তিনি বিশ্বব্যাংকেও চাকরি করেছেন, কিন্তু বাংলাদেশের অনেকের মতো তাদের চাকর হননি জানতাম। আমি তার চরিত্রকে চলি্লশের দশকের কমরেড কবি গোলাম কুদ্দুসের কবিতা দিয়ে বিচার করতাম :
'চাকুরি করবো চাকর রবো না
লক্ষ গলায় গর্জন
আজ দৈত্য বধের সত্য করেছি অর্জন।'
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের মতো দৈত্য বধের শক্তি অর্জন না করুন, অন্তত এই দৈত্যের ছলচাতুরী ও চক্রান্ত থেকে জাতিকে মুক্ত রাখার সাহস দেখাবেন এটা আশা করেছিলাম। যে সাহসটা শেখ হাসিনার প্রথম অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া সাহেব দেখিয়েছিলেন।
যে প্রলয়ঙ্করী বন্যা ও প্লাবনকবলিত বাংলাদেশ দেখে বিবিসি থেকে শুরু করে অধিকাংশ বিদেশি পর্যবেক্ষক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, এবার বাংলাদেশে প্লাবনজনিত দুর্ভিক্ষে কমপক্ষে দু'লাখ লোক মারা যাবে, সে দুর্ভিক্ষ তৎকালীন হাসিনা সরকার ঠেকিয়েছিল। একজন লোককেও না খেয়ে মারা যেতে দেওয়া হয়নি। ত্রাণকার্যে সারা জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে নেমেছিল। বন্যাদুর্গতদের বাঁচানোর জন্য মার্কিন নৌ-সৈন্য ডেকে আনতে হয়নি। ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে বাংলাদেশকে বহির্বিশ্বে ছুটতে হয়নি। এই অসম্ভবও সম্ভব করেছিল হাসিনা সরকার। অর্থমন্ত্রী হিসেবে কিবরিয়া সাহেবের অবদান তাতে ছিল অনন্য।
এখন পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন করবে না জেনে বিএনপি-জামায়াত এবং একশ্রেণীর মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবী বগল বাজাচ্ছেন। ভাবছেন এই সরকারের পতন আর ঠেকায় কে? শেখ হাসিনার প্রথম মন্ত্রিসভার আমলে মহাপ্লাবন ও বন্যার পর দু'লাখ লোক না খেতে পেরে মারা যাবে বলে পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা ভবিষ্যদ্বাণী করায় বিএনপি ও তাদের সেবাদাসরা সেদিনও এমনি করে আনন্দে বগল বাজিয়েছিল। এক উজবুক বিএনপি নেতা তো বলেই ফেলেছিলেন, 'চুয়াত্তরের (১৯৭৪) দুর্ভিক্ষে লক্ষাধিক লোকের মৃত্যু যেমন মুজিব সরকারের পতন ঘটিয়েছিল, এবার প্লাবনজনিত দুর্ভিক্ষে লক্ষাধিক লোকের মৃত্যু হাসিনা সরকারের পতন ঘটাবে।' শকুনির অভিশাপে সেবার গরু মরেনি।
এবারেও (হাসিনার দ্বিতীয় দফা সরকারের আমলে) পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন না করার ঘোষণা দেওয়ায় একই মুখচেনা রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী মহলে আনন্দের বিউগল বাজছে। তাদের কাছে পদ্মা সেতু না হলে সর্বনাশটা হাসিনার, দেশের নয়। হাসিনার সঙ্গে দেশেরও যদি সর্বনাশ হয় তাতে তাদের আপত্তি নেই। এরা কারা? এই তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের নামের তালিকাটি তাদের 'লাইফ স্কেচ'সহ প্রকাশ করলে দেখা যাবে, অধুনা যারা ড. ইউনূসের মহত্ত্ব কীর্তন কোরাসে যোগ দিয়েছেন অথবা পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধ হওয়ায় বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি উচ্চারণ না করে হাসিনা সরকারের মাথায় একতরফা সব দোষ চাপাতে ব্যস্ত, তারা অধিকাংশই বিশ্বব্যাংকের মোসাহেব। আমাদের বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে (আমার মুহিত ভাই) আমি বিশ্বব্যাংকের এই বাংলাদেশি সেবাদাসের দলে ফেলিনি। ছাত্রজীবনে বামপন্থি এবং এরশাদের অর্থমন্ত্রী পদে স্বেচ্ছায় ইস্তফাদানকারী এই মানুষটিকে আমি অন্য চোখে দেখতাম এবং এখনও দেখি। সে দেখা শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার দেখা। দেশের শেয়ারবাজার ধস নিয়ন্ত্রণে তিনি যে দ্রুত সক্ষম হতে পারেননি বা পারছেন না, তাতেও আমি তাকে ব্যর্থ অর্থমন্ত্রী বলি না বা তিনি পদত্যাগ করুন তা চাই না। কারণ, এই শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি উদ্দেশ্যমূলকভাবে মনুষ্যসৃষ্ট এবং অর্থমন্ত্রী কোন অদৃশ্য শক্তির সঙ্গে অসম যুদ্ধে ঠেকে গেছেন তা আমি জানি। কিন্তু মন্ত্রী ও ব্যক্তি হিসেবে তার দুর্বলতা আমি প্রথম টের পাই ড. ইউনূসের হাসিনা সরকারবিরোধী তৎপরতা মোকাবেলা করার সময়।
তিনি ড. ইউনূসের ব্যক্তিগত বন্ধু। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি এবং ড. ইউনূস দু'জনেই আমেরিকায় ছিলেন। কিছুকাল আগে একদিন ঢাকায় প্রায় মধ্যরাতে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে কয়েকজন বন্ধুসহ গল্প-গুজব করছি, তখন তিনি ড. ইউনূসের তখনকার কিছু কাণ্ডকীর্তির কথা বলছিলেন। আমি তখনই তাকে বলেছিলাম, আপনি ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা ভেবে তার প্রতি দুর্বলতা দেখাবেন না। তার প্রতি অযথা অবিচার না হয় তা আপনি দেখবেন; কিন্তু তার কার্যকলাপে যদি দেশের ক্ষতি, দেশের গরিব মানুষের ক্ষতি হয়, তাহলে আপনাকে অবশ্যই শক্ত হতে হবে। আপনি জানেন, কেন তাকে নোবেল প্রাইজ দেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ী হিসেবে ড. ইউনূস চতুর, কিন্তু ব্যক্তি-মানুষ হিসেবে ভীরু। তার রাজনৈতিক দল গঠনের সময়ই এই ভীরু চরিত্রের পরিচয় আপনি পেয়েছেন।
অর্থমন্ত্রীকে এও বলেছি, আপনি জানেন, শেখ হাসিনা অবশ্যই ড. ইউনূসের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভয়ে ভীতি নন। সেই সাহসের পরিচয় তিনি ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময়েই দেখিয়েছেন। তাদের বিরোধ নীতিগত। একজন সরকারপ্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর যাবৎ গ্রামীণ ব্যাংকে যে অনিয়ম চলছে, গরিব গ্রামীণ নারীদের মালিকানার নামে এক ব্যক্তির যে স্বেচ্ছাচারী মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার দিকে নজর না দিয়ে পারেন না। দেশের অর্থনীতিতে (এবং রাজনীতিতেও) বিদেশি স্বার্থের প্রতিভূ হিসেবে এক ব্যক্তির মনোপলি প্রতিষ্ঠিত হোক তাও তিনি চাইতে পারেন না। এ ব্যাপারে গোড়া থেকেই আপনার সতর্ক হওয়া উচিত ছিল।
সত্য কথা বলতে কি, অর্থমন্ত্রী হিসেবে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে তার যোগাযোগ থাকা সত্ত্বেও মুহিত ভাই গোড়াতে ড. ইউনূস সম্পর্কে নিজের দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। শক্ত হতে পারেননি। গ্রামীণ ব্যাংক প্রধানের পদ থেকে ড. ইউনূসকে অব্যাহতি দেওয়া উচ্চ আদালত বৈধ বলে রায় দেওয়ার পরও তিনি তাকে ব্যাংকটির ক্ষমতাহীন সুপ্রিমো করে রাখার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তখন ড. ইউনূস সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন এক কথা এবং অর্থমন্ত্রী বলেছেন আরেক কথা। যেমন নিজেদের অভ্যন্তরীণ সম্পদ দ্বারা পদ্মা সেতু প্রকল্পের বাস্তবায়ন সম্ভব কি-না সে সম্পর্কে এখন আবার প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে পরস্পর বিরোধিতা দেখা যায়।
ড. ইউনূস সম্পর্কেও গোড়ায় অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য দেশের মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। সেই বিভ্রান্তির সুযোগ নিয়ে একশ্রেণীর সুযোগসন্ধানী মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবী ড. ইউনূসের 'মহামিত্র' সেজে সরকারবিরোধী প্রচার যুদ্ধে নেমে পড়েছে। কারণ, তারা বুঝতে পেরেছিল, এই যুদ্ধে বিশ্বের একক সুপার পাওয়ার ও পশ্চিমা দেশগুলো কোন পক্ষে? ড. ইউনূসের পেছনে শক্তি জোগাচ্ছে কারা?
অর্থমন্ত্রী তখনও বুঝিয়ে-সুজিয়ে বন্ধু ড. ইউনূসকে ঠাণ্ডা করতে পারবেন ভেবেছিলেন। তিনি তা পারেননি। বরং তার নমনীয় মনোভাবকে সরকারের দুর্বলতা ভেবে নিয়ে অপর পক্ষ আরও বেশি রণবাদ্য এখন পেটাতে শুরু করেছে। অর্থমন্ত্রীর এখন চৈতন্য ফিরেছে। তিনি এখন বলতে বাধ্য হয়েছেন, 'ড. ইউনূস যা বলেছেন তা রাবিশ।' কিন্তু তার এই রাবিশ শব্দটি আর অস্ত্র হিসেবে কাজ করবে কিনা তা সন্দেহের বিষয়।
পদ্মা সেতু নিয়েও আমাদের অর্থমন্ত্রী বা সরকার বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবেন তা বলি না। বাংলাদেশ ছোট এবং গরিব দেশ। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এদের সঙ্গে লড়াই করার তো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু একটি ছোট এবং দুর্বল দেশও আত্মপ্রত্যয়ী ও সাহসী হলে শক্তিধরদের অন্যায় চাপ প্রতিহত করতে পারে, সাম্প্রতিক বিশ্বে তার প্রমাণ আছে।
অতীতে প্রেসিডেন্ট নাসেরের আমলে আমেরিকা হঠাৎ অর্থায়ন বন্ধ করা সত্ত্বেও মিসরের আসোয়ান বাঁধ তৈরি হয়েছিল। অবশ্য তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল, তারা সাহায্য নিয়ে এগিয়ে এসেছিল। কিন্তু চীনের 'চিরকালের দুঃখ' নামে পরিচিত হোয়াংহো নদীর প্লাবন রোধ ও বাঁধ নির্মাণে পশ্চিমা অর্থ সাহায্য ছাড়াই শুধু জনবলের সাহায্যে যে অসম্ভবকে সম্ভব করা হয়েছে তা বিস্ময়কর।
বছরের পর বছর ধরে যুদ্ধে ফরাসি ও আমেরিকানরা ভিয়েতনামকে একেবারে ধ্বংস করে দিয়েছিল। তার পুনর্গঠনের অর্থের প্রয়োজন ছিল পঞ্চাশটা পদ্মা সেতু তৈরির অর্থেরও বেশি। বিশ্বব্যাংক টাকা দেয়নি, আমেরিকা ও পশ্চিমা দাতা দেশ টাকা দেয়নি। হো চি মিন সরকার অভ্যন্তরীণ সম্পদ ও জনবল ব্যবহার করে আজকের শক্তিশালী ভিয়েতনাম গড়ে তুলেছেন। বাংলাদেশে একটি পদ্মা সেতু কেন অভ্যন্তরীণ সম্পদ ও আমাদের বিশাল জনবল দ্বারা হাসিনা সরকার তৈরি করতে পারবে না? চাই সরকারের দৃঢ় মনোবল এবং একজন অর্থমন্ত্রীর সাহস ও কৌশল। আমাদের অর্থমন্ত্রী এই দুটি গুণ অর্জন করুন, এটি আমার প্রার্থনা।
লন্ডন, ৬ জুলাই ২০১২, শুক্রবার