শনিবার, ৩০ জুন, ২০১২

নতুন বাজেট_ সমস্যা ও সম্ভাবনা


এমএম আকাশ
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে উন্নয়ন ও ভর্তুকি ব্যয়ের দ্বন্দ্ব রয়েছে। এর মীমাংসা কীভাবে হয় এবং কোনদিকে ঝুঁকে পড়ে তার ওপর ভবিষ্যতের অনেক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অঙ্ক নির্ভর করবে।
তাহলে সামগ্রিকভাবে কী দাঁড়াল? অনেক টানাপড়েন ও চাপের মুখে এ বাজেট।
সরকার যদি লুটেরা ধনিক শ্রেণীর কাছ থেকে নির্মমভাবে কিছু রাজস্ব আদায় করতে পারে, তাহলে জনগণের ওপর বোঝা
না বাড়িয়ে, মুদ্রাস্ফীতি কমিয়ে প্রবৃদ্ধির হার সম্মানজনক
রাখা যেত


নতুন অর্থবছর ২০১২-১৩ আজ ১ জুলাই থেকে শুরু হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বাজেট পেশ করার পর এ নিয়ে সংসদের ভেতরে ও বাইরে অনেক আলোচনা হয়েছে। এ থেকে সাধারণভাবে যেসব মন্তব্য পত্রিকার পাঠক এবং টেলিভিশন ও আলোচনা সভার শ্রোতারা বারবার শুনেছেন, সেগুলো এভাবে তুলে ধরা যায়।
এক. এবারের বাজেট আকারে বড় এবং তা বাস্তবায়নের ক্ষমতা সরকারের নেই। বিপরীতে সরকারের বক্তব্য_ বাংলাদেশের অর্থনীতি আকারে বড় হচ্ছে। আমাদের চাহিদা-প্রয়োজন বাড়ছে। সে তুলনায় বাজেট মোটেই বড় নয় এবং বাস্তবায়নযোগ্যও বটে।
দুই. বাজেটে আয় ও ব্যয়ের যে প্রস্তস্নাবনাই অর্থমন্ত্রী করুন না কেন; বছর শেষে সেটা রক্ষা করা সম্ভব হবে না। রাজস্ব আয়ের যে হিসাব করা হয়েছে, তা আদায় হবে না। রাজস্ব ব্যয়ও বেড়ে যাবে। ফলে উদ্বৃত্ত কমবে। বিদেশি সাহায্য কম পাওয়া যাবে অথবা তার ব্যবহারের হার কমে যাবে। সুতরাং প্রস্তস্নাবিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি পূরণ হবে না। বিপরীতে সরকারের বক্তব্য_ আমাদের রাজস্ব বিভাগ গত কয়েক বছরে প্রচুর দক্ষতা দেখিয়েছে এবং সেটা আরও বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ কারণে রাজস্ব্ব আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটা পূরণ করায় সমস্যা হবে না।
তিন. বিদেশি দাতা অর্থাৎ উন্নয়ন সহযোগী সংস্থ্থা ও দাতাদের সঙ্গে সরকারের যে মতবিরোধ চলছে, তার প্রভাবে বিদেশি সাহায্য কম আসবে। সরকার বাধ্য হবে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ঘাটতি পূরণ করতে। ফলে মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস পাবে না। বিপরীতে সরকারের বক্তব্য_ সার্বিকভাবে এ বছরের বাজেটে রাজস্ব্ব ঘাটতি জিডিপির ৫ দশমিক ১ শতাংশ। সুতরাং এটা প্রচলিত ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অতএব, চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই।
চার. বহুল বিতর্কিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভর্তুকির চাপ কমবে না। ভর্তুকি না দিলে বা অনেক পরিমাণে কমিয়ে আনতে হলে দফায় দফায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়াতে হবে। তার ফলে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে। যেহেতু সাধারণ নির্বাচন সনি্নম্নকটবর্তী হচ্ছে এবং সে কারণে এ বছরটি সরকারের পুনর্নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সেহেতু মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি সরকারের জন্য নেওয়া কঠিন। কিন্তু পরিস্থি্থতি তো শাঁখের করাতের মতো। যদি সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তাকে বর্ধিত ভর্তুকির সংস্থান করতে হবে। সেটা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বা টাকা ছাপিয়ে করলে মুদ্রাস্ফীতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হবে। সরকারের তাই চয়েজ থাকবে কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন কিংবা ডিমান্ড-পুল ইনফ্লেশন_ কোনো একটি বেছে নেওয়া। অর্থাৎ ইনফ্লেশনের চাপ থাকছেই। সংযত মুদ্রানীতি দিয়ে এই সমস্যা কিছুটা ট্যাক্ল করা সম্ভব। কিন্তু তাতে প্রবৃদ্ধির হার আবার কিছুটা হ্রাস পাবে। গত ২০১১-১২ অর্থবছরের শেষদিকে সরকার সংযত মুদ্রানীতি অনুসরণ করে (অর্থাৎ ঋণপ্রবাহ সংকোচন ও সুদের হার বৃদ্ধি) মুদ্রাস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু সে জন্য তাকে মূল্য দিতে হয়েছে_ প্রবৃদ্ধি সাত শতাংশ থেকে খানিকটা কম (৬ দশমিক ৩ শতাংশ) মেনে নিতে হয়েছে। অর্থাৎ মুদ্রাস্ফীতি কমাতে সংযত মুদ্রানীতি নিলে তার প্রতিকূল প্রবৃদ্ধি প্রতিক্রিয়া রয়েছে। সরকারের সমর্থকদেরও কেউ কেউ ঘরের ভেতরের আলোচনায় স্বীকার করেন, মুদ্রাস্ফীতির বিপদ প্রবৃদ্ধি কমার বিপদের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক। গত বছর প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমলেও অন্য দেশের মান-এ যেহেতু এ হার সম্মানজনক ছিল এবং আগামীতে থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে, তাই এ বিষয়টি নিয়ে তেমন দুশ্চিন্তার কারণ নেই।
পাঁচ. সমালোচকরা বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু এ জন্য সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং সাশ্রয়ী দামে বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিপরীতে সরকারের জবাব, আমরা তো মানুষকে বিদ্যুৎ দিয়েছি। দাম একটু বেশি পড়েছে, তবু অন্যান্য দেশের তুলনায় এ দাম অনেক কম।
এবারে বাজেটের মোট আয়তন প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রীর দেওয়া বিভিন্ন হিসাব থেকে আমরা দেখছি যে, নতুন এই বছরে জিডিপির সম্ভাব্য আয়তন ধরা হয়েছে ১০ লাখ ৪১ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা এবং বিদায়ী বছরে প্রাক্কলিত (সংশোধিত) জিডিপি ছিল ৯ লাখ ১৪ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকা। এই হিসাব অনুসারে যদি ধরে নিই, জিডিপি বৃদ্ধির নমিনাল হার ২০১২-১৩ অর্থবছরে হবে টাকার অঙ্কে ১৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ এবং মুদ্রাস্ফীতির হার অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবিত ৭ দশমিক ৫ শতাংশই থাকবে; তাহলে বলা যায়, জিডিপি বৃদ্ধির প্রকৃত হার হবে ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে বিদায়ী বছরের তুলনায় ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। অতএব এখানে নিঃসন্দেহে একটি গরমিল আছে। কিন্তু সব মিলিয়ে বলা যায়, এ প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যেই থাকবে। তাতে অবশ্য বর্তমান বিশ্ব ও আশপাশের দেশের মান-এ খুব অখুশি হওয়ার কিছু নেই। সরকারি বাজেট জিডিপির ১৮ শতাংশের মতো। এটাও একটি স্ট্যান্ডার্ড প্যারামিটার। সেই হিসাবে আমি মনে করি না যে, বাজেট উচ্চাভিলাষী। কিন্তু যেটা সরকার স্ব্বীকার করেনি তা হচ্ছে, সরকারের হিসাবই প্রবৃদ্ধির প্রস্তাবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এবং এটা বাস্তবায়িত না হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
প্রতিটি বাজেটেই আয় ও ব্যয় সম্পর্কে কতগুলো পূর্বানুমান থাকে। এটা বাস্তস্নবসম্মত না হলে পুরো বাজেট ওলটপালট হয়ে যায়। এ কারণে প্রস্তাবিত বাজেটের চেয়ে সংশোধিত বাজেট অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়। আমরা যদি গত বছরের বাজেট প্রস্তাব ও সংশোধিত হওয়ার পরের পরিসংখ্যান তুলনা করি, তাহলে এটা সহজেই বুঝতে পারব। ২০১১-১২ অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের প্রস্তাব ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। আদায় হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ সংশোধনের মাত্রা ছিল প্রায় (-) ৩ শতাংশ। অন্যদিকে, রাজস্ব ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। কিন্তু সংশোধিত ব্যয়ের পরিমাণ ৯১ হাজার ৮২৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ সংশোধন হয়েছে প্রায় (+) ৫ শতাংশ। এ প্রবণতা দীর্ঘকালীন। অর্থাৎ সচরাচর আমরা যে আয়ের হিসাব দিই, আয় করি তার চেয়ে কম এবং ব্যয়ের যে হিসাব দিই, প্রকৃত ব্যয় করি তার চেয়ে বেশি। ফলে রাজস্ব উদ্বৃৃত্ত কমে যায় এবং শেষ পর্যন্ত উন্নয়ন ব্যয় কাটছাঁট করি। এভাবে আমরা বর্তমানের স্বার্থে ভবিষ্যৎকে জলাঞ্জলি দিই। গত অর্থবছরেও তাই হয়েছে। ওই বছর প্রস্তাবিত উন্নম্নয়ন ব্যয় ছিল ৫৫ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা। সংশোধিত ব্যয় হয়েছে ৪৫ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা। উন্নয়ন ব্যয় প্রস্তাবের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে প্রায় ১০ শতাংশ। আমার অনুমান, নতুন বছরেও এমনটি ঘটবে। এ থেকে আরও নিশ্চিত হওয়া যায় যে, প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৭ দশমিক ৩ শতাংশ অর্জিত হবে না। সরকার বলতে পারে যে, সরকারি খাতে বিনিয়োগ কমলেও বেসরকারি খাত সেটা পুষিয়ে দেবে। কিন্তু পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপির করুণ পরিণতি এবং এ যাবৎকালের প্রবণতা এর বিপরীত সাক্ষ্য দেয়। কোনোক্রমে যদি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য আরও বেড়ে যায় (যদিও গত কয়েক দিনে দাম কিছুটা কমার প্রবণতা লক্ষণীয়), তখন সরকার যে 'সহনীয়' ভর্তুকির মাত্রার কথা বলছে, সেটুকু দিতেই সম্ভাব্য কোষাগারে টান পড়বে। এ অবস্থায় সরকারকে অভ্যন্তরীণ ঋণ বাড়াতে হবে কিংবা বাইরে থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। সরকার অবশ্য ৫ থেকে ৭ শতাংশ সুদে 'সভরেন বন্ড'-এর কথা বলছে। এর অর্থ বিদেশি পুঁজিবাজারে বন্ড ছেড়ে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহের চেষ্টা করা। তবে এটা হচ্ছে সরকারের শেষ অপশন। প্রথমে তারা চেষ্টা করবে বিদেশি সাহায্যসূত্রে অর্থ সংগ্রহ করতে। তার পরে অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে এবং সবশেষে সভরেন বন্ড থেকে। সম্ভাব্য ঝুঁকি ও বিকল্প অর্থায়নের 'অপশন' হিসেবে এসব উৎসের কথা অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন। এ জন্য আবারও বলব, অত্যন্ত চাপের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ হবে এ বছরের বাজেট বাস্তবায়ন। তবে সরকার যদি প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশিদের কাছ থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে পারে, রফতানি খাতে সহসা আর যদি কোনো চাপ না পড়ে এবং পাইপলাইনে রয়ে যাওয়া বিদেশি সাহায্য ব্যবহারের মাত্রা যদি আরও কার্যকর করা যায়, তাহলে এসব ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে।
বিদায়ী বছরের বাজেটে বৈদেশিক সাহায্যের প্রস্তাব করা হয়েছিল ১৭ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা। সংশোধিত হিসাবে তা কমে দাঁড়িয়েছিল ১১ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৩৪ শতাংশ কম! এ বছরে সরকার চাইছে ১৮ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা। এর অর্থ দাঁড়াবে, গত বছরে প্রস্তস্নাবের তুলনায় প্রায় ৩৪ শতাংশ হ্রাসের পর যা সরকার পেয়েছে, সে তুলনায় নতুন বছরে প্রায় ৫৬ শতাংশ বাড়তি সাহায্য সংগ্রহের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ প্রস্তাব কার্যকর করতে হলে দাতাদের সব পরামর্শ গিলতে হবে। কিন্তু এসব তিক্ত বটিকা গিললে পরিণতি কী হয় তার উদাহরণ ইন্দোনেশিয়া; যাকে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ স্টিলগিৎজ বলেছেন 'আইএমএফ রায়ট'। আর যদি গিলতে প্রস্তুত না থাকে, তাহলে সরকারকে মৌলিকভাবে নতুন করে ভাবতে হবে।
নির্বাচনী বছরের নিকটবর্তী অর্থবছরে সরকার কী করবে? প্রকৃতপক্ষে, উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের জন্য অর্থায়নের মাত্রা দাতাদের সঙ্গে সরকারের সম্পর্কের ওপর অনেকখানি নির্ভর করছে। তবে বলতে পারি যে, এ পর্যন্ত প্রাপ্ত সংকেত দাতাদের দিক থেকে শুভ নয়।
সরকারের বিদ্যুৎ খাতের যে পরিকল্পনা তাতে দেখা যায় এপ্রিল, ২০১২ পর্যন্ত মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৫৪ শতাংশ উৎপাদন করেছে সরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো এবং বাকি ৪৬ শতাংশ এসেছে বেসরকারি খাতের প্ল্যান্ট থেকে। আগামী চার বছরে অর্থাৎ ২০১৬ সাল নাগাদ মোট যে ১৪ হাজার ৭৭৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে, তাতে ৫৮ শতাংশের জোগান আসবে বেসরকারি খাত থেকে এবং ৪২ শতাংশ উৎপাদন করা হবে সরকারি প্ল্যান্টে। অর্থাৎ সরকার ক্রমবর্ধমান হারে বেসরকারি খাতের দিকে ঝুঁকছে। বেসরকারি খাত দয়াদাক্ষিণ্য দেখাতে আসে না। তারা পুঁজির ওপর নির্ধারিত অঙ্কে মুনাফা অর্জনে সচেষ্ট হবে। সুতরাং দাম বৃদ্ধি অনিবার্য হবে। তবে বিদ্যুৎ তৈরির ব্যয় নির্ভর করে কোন ধরনের জ্ব্বালানি ব্যবহার করা হবে তার ওপর। ২০১২ সালের প্রথম দিকের হিসাবে দেখা যায়, ১৭ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল ব্যবহার করে। এ ধরনের প্ল্যান্টের উৎপাদন ব্যয় কয়লা, গ্যাস ও পানির প্ল্যান্টের তুলনায় অনেক বেশি পড়ে। উল্লেখ করা দরকার, বর্তমানে বাংলাদেশে ৭৮ শতাংশ বিদ্যুৎ প্রকল্পে জ্বালানি হিসেবে গ্যাসের ব্যবহার হয়ে থাকে।
এখন থেকে যে নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে তার কতটা গ্যাস, কয়লা বা পানি এবং কতটা জ্বালানি তেল ব্যবহার করে_ তার ওপর ভবিষ্যতের মূল্য পরিস্থিতি ও সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ এবং অর্থনীতির সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ প্রাপ্তি ও প্রতিযোগিতার ক্ষমতা ইত্যাদি বিষয় নির্ভর করবে। কেউ কেউ বলেন, বিদ্যুৎ আমদানি করা হবে, কয়লা আমদানি করে কয়লাভিত্তিক প্রকল্প চালু হবে, নতুন গ্যাসক্ষেত্রের গ্যাসের জোগান দেওয়া হবে বিদ্যুৎ প্ল্যান্টে এবং পানি-বায়ু-আলো ব্যবহার করে বাড়তি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ করা হবে। সুতরাং সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ মিলবে। এ সম্ভাবনা আমি অসম্ভব মনে করি না। কিন্তু এসব পদক্ষেপ তো ব্যক্তি খাত বা বেসরকারি খাত নেবে না। যেহেতু সরকারের মনোবীক্ষণে ব্যক্তি খাত এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীর আধিক্য, সেহেতু এসব নন-ট্রাডিশনাল উদ্যোগে সরকার না ঝুঁকলে কপালে দুঃখ আছে। সরকারের বিদ্যুৎ সংক্রান্ত রোডম্যাপ থেকে জানা যায়, এ খাতে এ বছর ৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। জ্বালানি খাতেও প্রায় সমপরিমাণ ভর্তুকির পরিকল্পনার উল্লেখ রোডম্যাপে ছিল। কিন্তু বাজেট দেখে এ ভর্তুকি কোত্থেকে আসবে, সেটা স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল যেহেতু এ খাতে আর কোনো ভর্তুকি প্রদান নিষিদ্ধ করেছে, সুতরাং বাড়তি অর্থ হয়তো সরকার ঋণ হিসেবে দেবে। এ অবস্থায় দাম বৃদ্ধি অনিবার্য এবং তা কি সহনীয় মাত্রায় থাকবে? নতুন অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে মোট ব্যয় বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৯ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা এবং সেখানে উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ দেখানো হয়েছে প্রায় ৯ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা। এর অর্থ হচ্ছে, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে উন্নয়ন ও ভর্তুকি ব্যয়ের দ্বন্দ্ব রয়েছে। এর মীমাংসা কীভাবে হয় এবং কোনদিকে ঝুঁকে পড়ে তার ওপর ভবিষ্যতের অনেক অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক অঙ্ক নির্ভর করবে।
তাহলে সামগ্রিকভাবে কী দাঁড়াল? অনেক টানাপড়েন ও চাপের মুখে এ বাজেট। সরকার যদি লুটেরা ধনিক শ্রেণীর কাছ থেকে নির্মমভাবে কিছু রাজস্ব আদায় করতে পারে, তাহলে জনগণের ওপর বোঝা না বাড়িয়ে, মুদ্রাস্ফীতি কমিয়ে প্রবৃদ্ধির হার সম্মানজনক রাখা যেত। প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার আমজনতার ওপর মোবাইল রিচার্জ কর আরোপ এবং ব্যাংকের সুদের ওপর কর বসিয়ে নিজেকেই হাস্যাস্পদ করেছিল। অবশ্য দুষ্ট লোকেরা বলে, বাজেটের মূল বিষয়গুলো থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রাখতেই এসব প্রস্তাব সুচিন্তিতভাবে রাখা হয়। কিন্তু সরকারকে মনে রাখতে হবে, তারা উটপাখি নয়। বালুর নিচে মুখ লুকিয়ে রাখলেই ঝড় আসা বন্ধ হবে না। তবে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কল্যাণমূলক পুঁজিবাজারের রাস্তা নিলে দাতাদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব আরও বাড়বে। কিন্তু জনসমর্থনের নিরিখে পরবর্তী নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। কোন পথ সরকার বেছে নেয়, সেটা দেখার অপেক্ষায় থাকব।

ড. এমএম আকাশ : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বুধবার, ২৭ জুন, ২০১২

হ্যালো, নষ্ট সুশীলেরা



ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী :
 জোট সরকারের শেষ দিকে বাংলাদেশে সুশীল সমাজ নামক এক সংঘবদ্ধ ইতরগোষ্ঠীর আবির্ভাব হয়েছিল। যে ইতরেরা এই সমাজে নিজেদের ‘সুশীল সমাজ' ঘোষণা করে সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী শক্তির দালাল হিসাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছিল। তারা যে কী মাত্রায় নষ্ট ও ইতর ছিল সেটা ভাষায় প্রকাশ করা দুষ্কর। আমি কেঁদে-কেটে এক নিবন্ধ লিখে তাদের কাছে আবেদন জানিয়েছিলাম, ‘আম্মু, আমি সুশীল হবো'। জীবনে এই প্রথম সে লেখায় সুশীল হওয়ার জন্য আমি আমার যোগ্যতার বিস্তারিত তুলে ধরেছিলাম। ওনাদের জানিয়েছিলাম, ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে নয়, পত্রিকায় লিখে। কারণ ওনারা তখন সাম্রাজ্যবাদী-আধিপত্যবাদীদের মদদে এতটাই শক্তিশালী ছিলেন যে, আমার মতো নিম্নমানের মানুষের সে আকুল আবেদন শুনে তাদের কেউ আমাকে ঐ সুশীল সমাজের অন্তর্ভুক্ত হতে ডাক দেননি। তার জন্য কোনো আবেদন পত্রের ব্যবস্থা ছিল কিনা, সেটিও আমার জানা নেই। থাকলেও অমন খোলা আবেদনের পর তারা নিশ্চয়ই আমাকে আবেদন ফরমটি অন্তত মেইলে পাঠিয়ে দিতেন।
বলা নেই, কওয়া নেই, দশ-বারোজন লোক মিলে হঠাৎ এক কলঙ্কিত বিকেলে নিজেদের সুশীল বলে ঘোষণা করে বসেছিলেন। তখন সাম্রাজ্যবাদী-আধিপত্যবাদীরা সুশীল খুঁজছে। এবং তারা জানে সঠিক সুশীল কে হতে পারে। ফলে তারা টাকা ঢালল, সুশীলেরা জোট সরকারকে তথা রাজনৈতিক সরকারকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য হেন কোনো অপকর্ম নেই যাতে লিপ্ত হলেন না। তাদের প্রধান অস্ত্র তাদের হাতে গোটা দুই প্রভাবশালী পত্রিকা ছিল, কিছু এনজিও ছিল, আর ছিল কিছু ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। তাদের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশকে সারা পৃথিবীর কাছে কিভাবে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসাবে চিহ্নিত করা যায়। আহা! সেকি শোরগোল। মইন-ফকরের মতো মীরজাফরদের সঙ্গী হয়ে কিভাবে দেশে স্বৈরতন্ত্র কায়েম করা যায়, তার জন্য ঐ ইতরেরা মরিয়া হয়ে উঠেপড়ে লাগল। রাষ্ট্র ও জনগণের বিরুদ্ধে এই দ্রোহের তারা নানান নাম দেয়ার চেষ্টা করলেন। এবং তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রধান দুটি পত্রিকায় কী যে সব ইতর রিপোর্ট ছাপা হতে থাকল, চল্লিশ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে এরকমটি কখনও দেখি না।
সাংবাদিকতাকে তারা এমন নষ্ট ও স্বার্থবুদ্ধি পর্যায়ে নিয়ে গেল যে, আত্মগ্লানি অনুভূত হতে থাকল। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্সসহ পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেছি। হল্যান্ডের আইএসএস থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেছি। এই সুশীলদের মাত্র দুজনের পিএইচডি ডিগ্রী ছিল। তাদের একজন সত্যিকারই গবেষণা করে পিএইচডি অর্জন করেছিলেন। সমাজে তার সুখ্যাতিও ছিল। আর একজন পিএইচডি পেয়েছিলেন রাশিয়ান। তিনি রাশিয়ার এমন এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স অর্জন করেছিলেন যেখানে মস্কোপন্থী ছাত্রদের অনার্স পাস করলেই তার নাম দেয়া হত পিএইচডি। তেমন এক পিএইচডি এই সুশীল সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এখনও নামের আগে ডক্টর লেখেন। আমি দশ বছর সারা বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ঘুরে আমার পিএইচডি'র সকল রসদ সংগ্রহ করেছি। গোটা পঞ্চাশেক বই লিখেছি। টেলিভিশনে বিভিন্ন বিষয়ে নিরপেক্ষ বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে খানিকটা অতিরিক্ত পরিচিতি লাভ করেছি। প্রতি সপ্তাহে দুই-তিনবার পত্রিকায় লিখে আত্মপ্রকাশ করার চেষ্টা করেছি।
কিন্তু আমি কিছুতেই বুঝতে পারিনি যে, আমি কেন সুশীল হতে পারব না। সুশীল হওয়ার জন্য আমার আকুল আবেদনে তারা কেউ সাড়া দেননি। কিছুদিন ভারী ভগ্নমনোরথ ছিলাম। আমি ভাবলাম, সুশীলদের সকলেরই তো পিএইচডি ডিগ্রী নাই। আমার তো ডিগ্রী আছে। কৃতকর্ম আছে, যা ঐ সুশীলদের একজন ছাড়া বাকি কারও ছিল না। তবু আমার আকুল আবেদন তারা গ্রাহ্য করেননি।
তারা অবিরাম বলে গেছেন যে, জোট সরকার বাংলাদেশকে এক ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। সেই জন্য তারা সভা-সেমিনার করেছেন। বিদেশী পয়সায় গ্রামে গ্রামে সৎপ্রার্থীর খোঁজ করতে গেছেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের ধাওয়া খেয়ে তারা ফিরে এসেছেন। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সুশীলদের একজন অনলাইনে সৎমানুষের রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দিয়ে বেশ একটা আলোড়ন তুলেছিলেন। এক তছনছ কান্ড। এ ভদ্রলোক এখন অনেক বিপদে। তার সাকসেস স্টোরির শেষ নেই। কিংবা সাকসেস স্টোরির নামে তার প্রতিষ্ঠানের লুণ্ঠনের কোনো শেষ নেই।
বাংলাদেশে এক আমরা আশ্চর্য ব্যাপার দেখি। সেটি হলো, এ দেশের নাগরিকদের সম্মানিত ব্যক্তিরা নিজেদের সম্মান কেন যেন ব্যক্তিস্বার্থে ধরে রাখতে পারেন না। প্রেসিডেন্ট আবদুর রহমান বিশ্বাস বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হিসাবে গণতন্ত্র রক্ষায় যে ভূমিকা পালন করেছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে অবিশ্বাস্য ঘটনা হয়ে থাকবে। কিন্তু নির্বাচনের আগে তিনি এক অদ্ভুত কান্ড করে বসলেন। তিনি জাতীয় সংসদের এমপি হিসাবে দাঁড়াবার জন্য বিএনপি'র কাছে আবেদন করলেন। তার আবেদন একটু লম্বা ছিল। যদি তাকে মনোনয়ন না দেয়া হয় তাহলে যেন তার ছেলেকে মনোনয়ন দেয়া হয়। এটা ভাবতেও বিস্ময় লাগে। সাবেক প্রেসিডেন্ট থাকবেন সকল রাজনীতি, সকল স্বার্থবুদ্ধির ঊর্ধ্বে। তিনি হবেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। না। জেনারেল নাসিমের সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা রোধ করে দিয়ে এ দেশের মানুষের হৃদয়ে তিনি গভীর ঠাঁই করে নিয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনে দাঁড়াতে চেয়ে বিএনপি'র কাছে আবেদন করেছিল। আমাদের ট্র্যাজেডি এটাই। স্বৈরাচারী এরশাদ কোনো বিবেচনার যোগ্যই নন। কিন্তু আবদুর রহমান বিশ্বাসের কাছে প্রার্থিত ছিল না। তেমনি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী এমন এক ইতর কাজ করে বসল যে, তাকে দেশের রাষ্ট্রপ্রধান পদ ত্যাগ করতে হলো। তারপর তিনি অনেক রাগ। বিএনপি'র বিরুদ্ধে একজন রাজনৈতিক দল গঠন করে নিজেকে প্রেসিডেন্ট পদের মর্যাদা থেকে অনেক নিচে নামিয়ে দিলেন।
না। এটা শেখ মুজিবের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তার তো কোনো দরকারই ছিল না যে, তিনি একবার প্রেসিডেন্ট আবার প্রধানমন্ত্রী, আবার প্রেসিডেন্ট হবার জন্য সংবিধান সংশোধন করলেন। এটি ভাবাও যায় না। শেখ মুজিবুর রহমান সারা জীবন বহুদলীয় গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করেছিলেন। কিন্তু তিনি কেন যেন ক্ষমতার মোহে মদমত্ত হয়ে উঠলেন। বাকশাল গঠন করে সকল রাষ্ট্রীয় শক্তি, প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ, সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিতে চাইলেন। কে কোথায় বিচারক, কি না কি রায় দিবে, কোনো দরকার আছে! শেখ মুজিব সব কিছুই নিজের হাতে নিতে চেয়েছিলেন। অর্থাৎ বাংলাদেশে যারা প্রেসিডেন্ট হিসাবে ছিলেন, তারা কেউই তাদের মর্যাদা রক্ষা করতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। এটা আমাদের জন্য বড় দুর্ভাগ্যের বিষয়।
কিন্তু আলোচনা শুরু করেছিলাম সুশীল দিয়ে। এখন কি রাষ্ট্র ব্যর্থ? সেইসব সুশীল একেবারে রক্ত খেয়ে লম্বা জোঁক যেন। একেবারে আসল রূপে ফিরে গেছেন। তাদের লক্ষ্য অনুযায়ী, কিংবা প্রভুদের সেবাদাস হিসেবে তারা যা করেছে, তার চাইতে নিম্নমানের ইতরকর্ম পৃথিবীর ইতিহাসে কোথায়ও ঘটেছে কিনা, হুবহু তেমন কোনো ইতিহাস আমার জানা নেই। সুশীলরা বলতে পারেন, আমি ইতিহাস পড়িনি। তাদেরকে চ্যালেঞ্জ করতে চাই যে, তারা তখন যে খবর ছাপতেন, তা কোনো বিবেচনায়ই খবর ছিল না। জোট সরকারের মন্ত্রী-এমপি-নেতাদের বিরুদ্ধে তারা এমন গীবত প্রচার করতে লাগলেন, তা কোনো যৌক্তিকতার মানদন্ডে গ্রহণযোগ্য ছিল না। যেমন কোনো মন্ত্রী বা এমপি ৮ ফাইল ত্রাণের টিন চুরি করেছেন। কেউ চুরি করেছেন গাছ, কেউ বা গরু। এসব যখন প্রকাশিত হতো তখন গা গুলিয়ে আসত।
বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘকালের ও সবচেয়ে সফল অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান সম্পর্কে তারা লিখল যে, তিনি বন বিভাগের গাছের চারা চুরি করেছেন। সে চারা লাগিয়ে তিনি তার বাগানবাড়ি সজ্জিত করেছেন। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো এই যে, বছরের বৃক্ষরোপণ মওসুমে বন বিভাগ নানা জাতের লক্ষ লক্ষ চারা বিনামূল্যে জনসাধারণের মধ্যে বিতরণ করে। এবং নানা প্রচার প্রচারণার মাধ্যমে গাছ লাগাতে উৎসাহিত করে। সাইফুর রহমান যদি সে গাছ নিয়ে গিয়ে তার বাগানবাড়িতে লাগিয়ে থাকেন, তাহলে একথা নিশ্চিত করে বলা যায় যে, সে গাছগুলোর সুরক্ষা হবে। সেগুলো যথাযথভাবে বেড়ে উঠবে ও যথার্থ বিকাশ নিশ্চিত হবে। অর্থাৎ বনবিভাগের উদ্দেশ্য সফল হবে। তাকে দুর্নীতি বলে এমনভাবে প্রচার করা হলো যে সাইফুর রহমান বিরাট দুর্নীতি করে ফেলেছেন।
এমনি হাজারো গপ্পো তারা প্রতিদিন প্রচার করেছে জনগণকে ধোকা দেওয়া ও বোকা বানানোর জন্য। শেষে শুধু জোট সরকার নয়, সকল রাজনৈতিক দল ধ্বংস করার জন্য তারা উঠেপড়ে লেগেছিল। রাজনৈতিক দল মানেই যেন চোর-বাটপারের আখড়া। অর্থাৎ দেশে রাজনৈতিক দলই থাকতে পারবে না। কেবল সুশীলেরা থাকবে। তখন এই নষ্ট লোকেরা সৎ মানুষের দল গঠনের জন্য বিদেশী টাকায় গ্রামে গ্রামে ঘুরছিল। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য সফল হয়নি। সাধারণ মানুষই তাড়া করে তাদের আবার রাজধানীতে ফেরত পাঠায়। যখন তারা দেখল যে, এভাবে সৎ মানুষ খুঁজতে গেলে জনগণের হাতে মার খাওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো পথ থাকবে না। তখন তারা আর এক সুশীলকে দিয়ে সৎ মানুষের রাজনীতির দোকান খুলতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের সে প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়। তবে ওইসব ইতর প্রচারণার মাধ্যমে তারা ঠিকই দেশে সামরিক আইন নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল।
কিন্তু এখন দেশের কী অবস্থা! দ্রব্যমূল্য আকাশছোঁয়া। আইন-শৃক্মখলা বলতে দেশে কিছু নেই। প্রতিদিন ডজন ডজন মানুষ গুম হয়ে যাচ্ছে। ব্যবস্থা নেই। বিচারবিভাগ, প্রশাসন, পুলিশ সর্বত্র দলীয়করণ। টেন্ডারবাজি দখলবাজিতে দিশেহারা মানুষ। অর্থনীতি ফোকলা হয়ে গেছে। বাংলাদেশ যেন ভারতের অধীনস্ত হয়ে পড়েছে। ট্রানজিট বন্দর করিডোর ভারতকে প্রদানের  মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এখন মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে সুশীলেরা। তবে কী তাদের সকল আন্দোলনের লক্ষ এটাই ছিল। সে লক্ষ্য অর্জিত হয়ে গেছে বলেই এমন নীরবতা?

বিএনপির আন্দোলন-২

মাহমুদুর রহমান মান্না


গত সংখ্যায় বলেছিলাম_ আগামীতে বিএনপির আন্দোলন, আন্দোলনের কৌশল, ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা ইত্যাদি বিষয়ে লিখব। আজ এমন একটি দিনে লিখতে বসছি যেদিন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। গত সংখ্যায় লেখা প্রকাশ হওয়ার পর একজন ভদ্রলোক আমাকে ফোন করেছিলেন। যতদূর মনে পড়ে তার নাম মাসুদ। তিনি আমার চেয়ে দু'এক বছরের সিনিয়র হবেন। ছাত্র ইউনিয়ন করতেন। তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি মোটামুটিভাবে সক্রিয় ছিলেন। তিনি আমার একটি ভুল সংশোধন করেছেন বা তিনি যেটাকে ভুল মনে করেছেন সে সম্পর্কে বলেছেন। আমি বলেছিলাম আইয়ুব খানের যে পতন হলো ওই সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানে তেমন বড় আন্দোলন হয়নি, যার কারণে তাকে পদত্যাগ করতে হবে। প্রধানত এখানকার আন্দোলনের কারণেই তাকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। তিনি ফোনে আমাকে বললেন, আপনার এ লেখা যেহেতু অনেকে পড়ে, বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম, তাদের মধ্যে একটি ভুল তথ্য থেকে যেতে পারে। কারণ ওই সময় পশ্চিম পাকিস্তানেও ব্যাপক আন্দোলন হয়েছিল। তিনি বললেন, আমার মনে আছে, তখন আমি সেই আন্দোলনের মধ্যে ছিলাম। আর সারা পৃথিবীতেই তখন যুব আন্দোলন, যুব বিদ্রোহের একটি সময় চলেছে। ফ্রান্সে দ্যগলের মতো লৌহমানব যুব সমাজের আন্দোলনের মুখে প্রথম পালিয়ে গিয়েছিলেন। পরে অবশ্য ফিরে এসে আবার নির্বাচনে জিতেছিলেন। সেটি এক বিস্ময়কর ঘটনা। মাসুদ বললেন, আমরা সবসময় নিজেদের কাজ নিয়ে গর্ব এবং অহঙ্কার করি। তার জন্য হয়তো অন্যের বিষয়ে ভালো করে খোঁজও নেই না। কিন্তু সত্যি কথা হলো, পশ্চিম পাকিস্তানে তখন যে ব্যাপক আন্দোলন হয়েছিল এবং প্রধানত সে আন্দোলনের কারণে পাঞ্জাবি শাসকচক্রের ভিত নড়ে গিয়েছিল। তাদের নিজেদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছে সে কারণে শেষ পর্যন্ত আইয়ুব খানকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। পাঠক জ্ঞাতার্থে আমি এ বিষয়টি এখানে লিপিবদ্ধ করার প্রয়োজন মনে করলাম।

ক্ষমতার বিষয়টিকে অনেক দিক দিয়ে দেখা দরকার। বক্তৃতায় আমরা বলি '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এতবড় প্রচণ্ড প্রতাপশালী আইয়ুব সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছে, কিন্তু বুঝতে হবে ক্ষমতা একটি সর্ব ব্যাপক জিনিস। ক্ষমতার পরিবর্তন একটি বিরাট আলোড়ন-আন্দোলনের ফলে হয়। এর বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ অনেক কারণ থাকে। সেগুলো পরিপূর্ণ ও পরিপক্ব না হলে ক্ষমতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে না। সেদিক থেকে মাসুদ সাহেব আমাকে যে সাহায্য করেছেন তার জন্য তাকে অনেক ধন্যবাদ। আর সে বিবেচনা সামনে রেখে আমি এখন আমার বর্তমান লেখার প্রসঙ্গে কিছু কথা লিখব।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বড় ধরনের গণআন্দোলনের উদাহরণ যদি দেওয়া যায় তাহলে সেটি এরশাদের বিরুদ্ধে। সামরিক ফরমান জারি করে তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন। তখন দেশে আওয়ামী লীগ-বিএনপির মতো বড় দুটি দল ছিল। তারপরও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নয় বছর ক্ষমতায় ছিলেন। নয় বছর পর তিনি যে চলে গেলেন_ আমরা সবাই এরকম করে বলি তিনি একটি গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গেছেন। কিন্তু আমি এ কথা বলব, যারা '৬৯ দেখেছেন তারা মানবেন বা আমার সঙ্গে একমত হবেন যে, এরশাদ আমলের ছাত্র আন্দোলন বা গণঅভ্যুত্থান '৬৯-এর মতো ছিল না। এ আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরে করতে করতে শেষ পর্যন্ত সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে যুক্ত করতে গিয়ে করা হয়েছিল জনতার মঞ্চ। সচিবালয় থেকে সবাই এসে যোগ দিয়েছিলেন এবং এক অর্থে প্রশাসন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল। প্রশাসনকে যদি এরকম ভেঙে তছনছ না করা যেত, তাহলে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ পদত্যাগ করতেন কিনা এ কথা বলা এখন মুশকিল। কারণ সময় গেলে মানুষের কথার বদল হয়। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হয়। নিশ্চয় এমনকি খোদ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ওই সময় যেরকম করে অবস্থা দেখতেন এখন সে রকম দেখেন না। তার বক্তব্য শোনলেও হয়তো তখনকার বাস্তব পরিস্থিতির চিত্র এখন পাওয়া যাবে না। কিন্তু এটা সত্যি রাজপথে লাখ লাখ মানুষের মিছিল উত্তাল গণজাগরণে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পদত্যাগ হয়নি। কারণ এরপরে যে নির্বাচন হয়েছিল সে নির্বাচনে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে বহুভাবে আইনের বিধানে আটকে রাখলেও জাতীয় পার্টি আশাতীত সাফল্য অর্জন করেছিল। এটা সম্ভব হয়েছিল কিভাবে? আমি বলতে চাচ্ছি, এ ধরনের গণঅভ্যুত্থানের কথা আমরা মাঝে মাঝে বক্তৃতায় বলি। সেগুলোর অর্থ সবই এই অর্থে পরিচ্ছন্ন নয়। এ প্রসঙ্গে একটি কথা বলি_ আমাদের এ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে নেতাদের বক্তৃতায় যতবেশি আবেগ থাকে ততবেশি যুক্তি ও বিশ্লেষণ থাকে না। অতএব শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে মানুষকে উদ্দীপ্ত করা এবং সেখানে ক্ষমতা কিংবা রাজনীতির যে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক থাকে সেটিতে পরিবর্তন ঘটে যায়নি। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও শেষ পর্যন্ত সিভিল প্রশাসন ও সামরিক প্রশাসনের মধ্যে বাধাগ্রস্ত হওয়ার পর পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। পাঠক, এগুলো হলো ভূমিকা। ভূমিকায়ই অনেক কথা বলার চেষ্টা করছি আমি। আমি বলছি বিএনপি খুব একটি পরিপক্ব রাজনৈতিক দল তা হয়তো বলা যাবে না। অনেকে যে রকম বলেন বিএনপি কোনো রাজনৈতিক দলই নয়, ওটা ক্যান্টনমেন্টের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এসেছে, সামরিক বাহিনীর লোকদের আবার বুদ্ধি কোথায়, তাদের বুদ্ধিতো হাঁটুতে থাকে। এ ধরনের কথাবার্তার কোনো মানেই নেই। কোনো কোনো সামরিক নায়ক দীর্ঘদিন দেশ শাসন করেছেন বা দেশ চালিয়েছেন। জনপ্রিয় হিরোর মতো মারা গেছেন। অনেকের কথা বলতে পারি। মিসরে কিংবা লিবিয়ায় আমাদের সময়কার এরকম কিছু বড় বড় ঘটনা ঘটতে দেখেছি। আমি এই প্রসঙ্গটি এ জন্য আনলাম যে, বিএনপি ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের ঘোষণা করেছে ধীরে ধীরে, আর এ কারণে আজ প্রায় চার দশকের কাছাকাছি সময় পার করার পরে বিএনপি রাজনীতিতে একেবারে অপরিপক্ব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, এগুলো যে কোনো বিবেচনায়ই আনা যাবে না এরকম ভাবার দরকার নেই। আমি আমার গত লেখায় যে রকম বলেছিলাম এখন সেই লেখারই প্রতিধ্বনি করছি। বিএনপি খুব হিসাব করছে। তারা মনে করছে নির্বাচনে জিতবে। যদি সেটি একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়। তাতে আওয়ামী লীগ জিততে পারবে না। আমার কথার প্রমাণ দিয়েছেন সদ্য কারামুক্ত বিএপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি আলোচনায় বলেছেন, বিএনপি যে কোনোভাবেই কোনো তৃতীয় শক্তির আবির্ভাবের বিরোধিতা করছে। তারা তৃতীয় শক্তির আবির্ভাব দেখতে চান না। তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন, ব্যাপারটা যদি রাজনৈতিকভাবে হয়, তিনি তার বিরুদ্ধে কথা বলছেন না। কিন্তু অরাজনৈতিক ও অসাংবিধানিকভাবে যদি কোনো তৃতীয় শক্তির আবির্ভাব হয় তাহলে বিএনপি সেটিকে সর্বশক্তি দিয়ে ঠেকাবে। এই একটি মজার ব্যাপার। পাঠকদের অনেকের মনে থাকতে পারে, যখন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এসেছিলেন তখনো আমাদের দেশে এই বড় দুটি রাজনৈতিক দল ছিল। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। এই দুই দল যদি সজাগ, সচেতন ও রাজপথে থাকত তাহলে কি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় আসতে পারতেন? বিশ্লেষকরা বলেন, প্রধানত এ দুটি রাজনৈতিক দলের পারস্পরিক দ্বন্দ্বের মধ্যদিয়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বেরিয়ে এসেছেন।

আর এ প্রসঙ্গে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে দোষারোপ করে যে, তারাই তখন সামরিক শাসন টেনে এনেছিলেন। তাদের দুর্বলতায় বা তাদের আশকারায় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতায় আসতে পেরেছিলেন। ঠিক এরকমভাবে আমি বলি_ যখন জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে সামরিক বাহিনীর সমর্থন নিয়ে একটি সরকার তত্ত্বাবধায়কের নামে তিন মাসের জায়গায় দুই বছর ক্ষমতা দখল করেছে, তখনো কিন্তু একইরকম অভিযোগ করা হয়েছে। বেশি করে এ ব্যাপারে বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ আসছে, কারণ আওয়ামী লীগের নেতারা সেই সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। কিন্তু তারপরও একজন আরেকজনকে অভিযোগ করার ব্যাপারে ছাড়ছেন না যে, সামরিক সরকার আসার সুযোগ তাদের কারণে হয়েছে।

এখনো একই বিষয়ের প্রতিধ্বনি আমি দেখতে পাচ্ছি। বেশ কিছুদিন খোদ প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের মন্ত্রীরা, আওয়ামী লীগের নেতারা এই কথা বলছেন যে, সামরিক বাহিনীকে আশকারা দিচ্ছে বিএনপি। তারা তাদের উস্কে দিচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি। ঠিক বর্তমান পরিস্থিতিতে আবার উল্টো দিকে যেতে শুরু করেছে বিএনপি। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির পক্ষ থেকে এ কথা চালু করার চেষ্টা করছেন যে, আওয়ামী লীগ জনসমর্থন হারিয়ে ফেলেছে। যদি নির্বাচন দেওয়া হয় তাহলে তারা জিততে পারবে না। এ জন্য তারা তৃতীয় কোনো শক্তির হাতে, অরাজনৈতিক কোনো শক্তির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে চলে যেতে চায়। পঞ্চদশ সংশোধনী খুব দৃঢ়তার সঙ্গে গ্রহণ করে বলা হলো কোনোভাবেই যেন এ দেশে আর কোনো সামরিক শাসন না আসতে পারে তার জন্য এ সংশোধনী। তখন মনে হয়েছে, অন্তত আওয়ামী লীগ ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছে যে, বিএনপি সম্ভবত আওয়ামী লীগের বদলে সামরিক সরকারকে চাইছে। কোনো কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষক তখন এ রকম মত প্রকাশ করেছেন যে, এই দুই নেত্রী পরস্পর পরস্পরের ওপর এতই বিতৃষ্ণ যে, যদি নিজে থাকতে না পারেন তাহলে অন্য কাউকে দিয়ে যাবেন তবু একে থাকতে দেবেন না। অনেকটা জেদের ভাত কুকুরকে খাইয়ে দেওয়ার মতো। মানুষ কি বুঝছে, কি বুঝবে তারা তার জবাব দেবে; কিন্তু মূল কথা দুটি দলের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই চলছে।

বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়ার ক্ষেত্রে কিংবা আমাদের দেশের ক্ষমতার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক শক্তির একটা প্রভাব আছে এ কথা আমরা সবাই বলি। এ কথার মানে কি? আন্তর্জাতিক শক্তি, বৃহৎ শক্তি, প্রতিবেশী শক্তি তাদের ইচ্ছার দাস হিসেবে কাউকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে? এ রকম আসলে হয় না। দ্বন্দ্বতত্ত্ব যে রকম বলে বস্তুর বিকাশ হয় বস্তুর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে, ঠিক সেরকম করে দেশের মধ্যেই যদি সেই দুর্বলতা না থাকে তাহলে বাইরের কোনো শক্তি কিছু করতে পারে না। আমাদের দেশের জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ, যতটা বিস্তার লাভ করেছিল সেটা দমন করার প্রচেষ্টায় আওয়ামী লীগ বেশ খানিকটা এগিয়ে আছে। সবাই বলে জঙ্গিবাদ দমনের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ বেশ কিছু পয়েন্ট অর্জন করেছে এবং বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল তখন তারা জঙ্গিবাদকে মদদ দিয়েছিল ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই বাংলাভাইয়ের উত্থান, বিভিন্ন জায়গায় বোমা হামলা এসব ঘটনা থেকে তারা বহির্বিশ্বকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে, বিএনপি এ ব্যাপারে নিশ্চুপ। আর তখন ক্ষমতায় ছিল যে বিএনপি খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে তারা এ ব্যাপারে অনেকটা চোখ-কান বন্ধ রেখেছিলেন। বলেছিলেন এসব বাংলা ভাই কিংবা জঙ্গিবাদ মিডিয়ার সৃষ্টি। বাস্তবে এদের কোনো অস্তিত্ব নেই। এই একটি কারণে বিএনপি এখনো বহির্বিশ্বের সমর্থনের জায়গায় প্রচণ্ড রকম দুর্বল রয়েছে। বিএনপির নেতৃত্বের মধ্যে এক বিরাট আপেক্ষিক শূন্যতা বিরাজ করছে। আপেক্ষিক এ কারণেই বললাম, বেগম জিয়ার যথেষ্টই বয়স হয়েছে। তিনি এরই মধ্যে বিভিন্ন জনসভায় বলেছেন, তিনি নতুন নেতৃত্বের কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে চান। সবাই ভেবেছে নতুন নেতৃত্ব বলতে তিনি তার পুত্রকে বোঝাতে চাইছেন। তার পুত্ররা বিগত জোট সরকার আমলে এমন এমন কাজ করেছেন, যেগুলো নিয়ে বিরোধী দল প্রচার-প্রচারণায় নেমেছিল, যা মানুষ বিশ্বাস করেছিল। যার কারণে বিএনপি নির্বাচনে পরাজয় বরণ করেছিল। এমনও প্রচার হয়েছিল যে, বেগম জিয়ার বড় ছেলে যিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তিনি তখন জঙ্গিবাদিদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেছিলেন। আমি কোনো বিতর্কের মধ্যে যাচ্ছি না সত্যি কিংবা মিথ্যা নিয়ে। রাজনীতি এমন একটি জিনিস, আমি মাঝে মাঝে বলি, সত্য মিথ্যার বিচার পরে হয়। মানুষ কোনটাকে সত্য বলে জেনেছে তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয়ে যায়। এটি বিএনপির জন্য একটি বিরাট মাইনাস পয়েন্ট। বিএনপি চাইলে আন্দোলন করে ক্ষমতায় চলে যাবে এরকম নয়। আমার কাছে কিছু কিছু ঘটনা এরকম মনে হয়েছে যে, বিএনপির পক্ষ থেকে এখন আন্তর্জাতিক এই লবিকে পক্ষে টানার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমি জানি না, মার্কিন পররাষ্ট্র সেক্রেটারি হিলারি ক্লিনটন যখন এলেন তখন তিনি যেরকম করে বেগম জিয়ার বাসায় গেলেন, দেখা করলেন, কথা বললেন, পাটি সাপটা গেলেন, সবমিলে সেই দৃষ্টির আদৌ কোনো পরিবর্তন ঘটছে কিনা। এটা কি তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের বার্তা দেয় নাকি সরকারের ওপর এক ধরনের চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, সেটা এখনো জানা যায়নি। আর এদিকে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত যারা আমাদের এখানকার রাজনীতিতে বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন রকম প্রভাব ফেলে সেই জায়গাতেও বিএনপি নিশ্চয় কিছু একটা করার চেষ্টা করছে, যাতে তারা তাদের প্রতি বিরূপ মনোভাবাপন্ন না থাকে। কিন্তু সে দিকে কতখানি সফলতা তারা অর্জন করেছে, সেটা বলতে পারব না। বিএনপি আন্তর্জাতিক এই সম্পর্কের ব্যাপারে এতদিন উদাসীন ছিল তার কারণ হচ্ছে, এখানে তাদের কোনো যোগ্য নেতৃত্ব ছিল না বা যারা ছিল অতীতে তাদের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। শোনা যায়, বেগম জিয়া এ ব্যাপারে নিজের থেকে আগ্রহ নিয়ে এসব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন। একই ঘটনা হয়তো আওয়ামী লীগ সম্পর্কে বলা যায়। বলা যায়, উভয় দল আগামীতে আন্দোলনের নামে যাই করুক না কেন, ক্ষমতার পালা বদলের জন্য যাদের যাদের সমর্থন দরকার, তাদেরকে সমর্থনে নেওয়ার জন্য, অন্তত নিরপেক্ষ করার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করছেন। বেগম জিয়া যদিও বলেছেন, ঈদের পর আরও বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি দেবেন এবং জঙ্গি আন্দোলনের কর্মসূচি দেবেন। আমি মনে করি, সেটাও নির্ভর করবে কতটা এই শক্তি-সাম্য তিনি তার পক্ষে আনতে পারবেন।

লেখক : রাজনীতিক

ই-মেইল : mrmanna51@yahoo.com

গণমাধ্যম নিয়ে দুদকের গাত্রদাহ কেন



দ্বিতীয় চিন্তা

॥ আযম মীর ॥
পদ্মা সেতুর দুর্নীতি প্রসঙ্গে গণমাধ্যমের সাথে আর কোনো কথা বলবে না দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গণমাধ্যমের কর্মীদেরও একই নীতি অনুসরণের অনুরোধ জানিয়েছে দুদক। গত রোববার দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান সাংবাদিকদের এ কথা জানিয়েছেন। দুর্নীতির গন্ধ পাওয়া মাত্রই যে দুদক গণমাধ্যমকর্মীদের ডেকে ঢাকঢোল পিটিয়ে তা প্রচারে অভ্যস্ত, সেই দুদকের এমন উল্টো সুর বিস্ময়কর বৈকি। দুদক চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘পদ্মা সেতুর দুর্নীতির বিষয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আর কোনো কথা নয়।’ কেন? গোলাম রহমানের মতেÑ ‘দুদকের তদন্ত নিয়ে গণমাধ্যমে খণ্ড খণ্ড আকারে এমন সব সংবাদ আসছে, যার কারণে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।’
পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগ তোলার পর দুদক এ নিয়ে তদন্ত করেছে। বলেছে, এ প্রকল্পে কোনো দুর্নীতি হয়নি। তখন কিন্তু দুদক নিয়মিত প্রেস ব্রিফিং করেছে। তদন্তে কখন কী পাওয়া যাচ্ছে না যাচ্ছে তার খুঁটিনাটি গণমাধ্যমকে জানিয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তকালে আমরা দেখেছি দুদককে প্রায় প্রতিদিন ব্রিফিং করতে। এ বিষয়ে গণমাধ্যমে স্বাধীনভাবে বহু প্রতিবেদন ও মতামত প্রকাশিত হয়েছে। তখন দুদকের উৎসাহের কোনো কমতি ছিল না। কিন্তু পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে দুদকের এত রাখঢাক কেন? কেনই বা গণমাধ্যমের ওপর সেন্সরশিপ আরোপের চেষ্টা? দুদক চেয়ারম্যানের অভিযোগ, গণমাধ্যমে খণ্ড খণ্ড আকারে সব সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে।
দুদক চেয়ারম্যান ও সরকারের মন্ত্রীদের বক্তব্যের মধ্যে যথেষ্ট মিল পাওয়া যাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও গণমাধ্যমের সমালোচনা করে বলেছেন, পদ্মা সেতুর দুর্নীতি নিয়ে গণমাধ্যম বিভ্রান্তিকর খবর প্রকাশ করছে। দুদক চেয়ারম্যান ও অর্থমন্ত্রীর দাবিÑ বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের সাথে প্রকাশিত সংবাদের কোনো মিল নেই। তা হলে কী আছে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে? কেন তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হচ্ছে না? সংবাদপত্র এ সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রকাশের আগে তো দুদক কোনো কথাই বলেনি। আর এখন উল্টো সংবাদপত্রকেই দোষারোপ করা হচ্ছে।
২০ জুন প্রথম আলো, যুগান্তরসহ কয়েকটি দৈনিকে রিপোর্ট প্রকাশের পর ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। প্রথম আলোর শিরোনাম ছিলোÑ ‘পদ্মা সেতু নিয়ে দুদকে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন। ১০ শতাংশ ঘুষ চান মন্ত্রী-সচিব। এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পদ্মা সেতু প্রকল্পে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ ছিল চার কোটি সত্তর লাখ ডলার। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কাজ পাইয়ে দেয়ার জন্য কানাডাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিনের কাছে ১০ শতাংশ অর্থ কমিশন চেয়েছিলেন যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ তিনজন। তারা হলেনÑ সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া এবং পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলাম। তাদের প্রতিনিধিরা এই অর্থ কমিশন হিসেবে চান। অর্থের অবৈধ লেনদেনের জন্য গ্রেফতার হওয়া এসএনসি-লাভালিনের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়েরে দুহাইমের কাছ থেকে এই তথ্য পেয়েছে কানাডার পুলিশ। আর বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে এই তথ্য পেয়েছে দুদক। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীদের সম্পৃক্ততার তথ্যও রয়েছে।
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে তা তদন্ত করার জন্য অর্থমন্ত্রীর কাছে চিঠি দেয়। কিন্তু অর্থমন্ত্রী বা সরকার তা আমলে নেয়নি। এরপর বিশ্বব্যাংক দুদকের কাছে দুর্নীতির তথ্যসমেত প্রতিবেদন দেয়। দুদক একপ্রকার গোপনে বিষয়টির তদন্ত করছিল। সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী ও জাতীয় সংসদের হুইপ নূর ই আলম চৌধুরী লিটনের ভাই নিক্সন চৌধুরীকে দুদক জিজ্ঞাসাবাদ করেছে বলে সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে।
সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে দেখা যাচ্ছে, পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগের ক্ষেত্রে মূল্যায়ন কমিটি পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের নাম সুপারিশ করেছিল। এগুলো হলোÑ কানাডার এসএনসি-লাভালিন, যুক্তরাজ্যের হালকো গ্রুপ, নিউজিল্যান্ডের একন অ্যান্ড এজেডএল, জাপানের ওরিয়েন্টাল কনসালটেন্ট কোম্পানি লিমিটেড এবং যুক্তরাজ্য ও নেদারল্যান্ডসের যৌথ বিনিয়োগের প্রতিষ্ঠান হাই পয়েন্ট রেন্ডাল। এর মধ্যে কানডার এসএনসি-লাভালিনকে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে অনুমোদনের জন্য বিশ্বব্যাংকের কাছে পাঠানো হয়েছিল। এরপরই এ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। মজার ব্যাপার হলো, কানাডিয়ান কোম্পানি পরামর্শক নিয়োগের জন্য মনোনীত হলেও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথেই কানাডিয়ান পুলিশ দ্রুততার সাথে তদন্ত করেছে এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানির দু’জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করেছে। অথচ পরামর্শক নিয়োগের জন্য আবেদনকারীদের পক্ষে অন্যান্য দেশের দূতাবাসের কর্মকর্তারা নানাভাবে তদবির করেছেন বলে সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে। তবে কানাডিয়ান সরকার কেন এত কঠোর হলো? কারণ আর কিছুই নয়Ñ কানাডার আইন ও সংস্কৃতিতে ঘুষ লেনদেন তো দূরের কথা, এ নিয়ে কথাবার্তা বলাই গর্হিত অপরাধ। কানাডা পুলিশের তদন্তদল প্রমাণ পেয়েছে, এসএনসি-লাভালিনের কাছে ঘুষ চাওয়া নিয়ে বাংলাদেশের অনেকের কথাবার্তা হয়েছে। আটককৃত ব্যক্তিরা সে দেশের পুলিশের কাছে তা স্বীকারও করেছে। দুদকের কাছে দেয়া বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে দিন-ক্ষণসহ তার বিস্তারিত বিবরণ আছে। আছে নামধামও। দুদক এসব যাচাই করতে গিয়ে মিল খুঁজে পাচ্ছে বটে। তবে ঘুষ-টুষের কথা কেউ স্বীকার করছে না।
প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, দুদক যে আগে তদন্ত করে সব কিছু ঠিকঠাক আছে বলে রায় দিয়ে দিলো, তা কিসের ভিত্তিতে? বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে যাদের নামধাম আছে তাদেরকে কি কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল? এসব প্রশ্নের কোনো জবাব দেয়া দূরে থাক, এখন দুদক যে তদন্ত চালাচ্ছে সে সম্পর্কেও গণমাধ্যমে আর কোনো তথ্য না দেয়ার কথা ঘোষণা করেছে। দুদকের দাবি, বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন সম্পর্কে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য সঠিক নয়? তবে সঠিক তথ্যটি কী? দুদক নিজেই বলছে, বিশ্বব্যাংক দুদককে যে তথ্য দিয়েছে তাতে সুনির্দিষ্টভাবে কয়েক ব্যক্তির নাম উল্লেখ আছে। পরামর্শক সংস্থার কাছ থেকে তারা ঘুষ দাবি করেছেন প্রাপ্ত তথ্য থেকে এ উপসংহারে আসা সঠিক হবে না। দুদক বলছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটিপর্যায়ে পরিপূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্নপর্যায়ে নানা অভিযোগ ওঠা অস্বাভাবিক নয়। প্রতিটি অভিযোগই গুরুত্বের সাথে অনুসন্ধান করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে কমিশন অঙ্গীকারবদ্ধ। যদি তাই হয়, তবে বিশ্বব্যাংকের তথ্যসংবলিত পত্র প্রকাশে আপত্তি কেন দুদকের। দুদক তো অতীতে তদন্তের আগেই অভিযোগ জনসমক্ষে প্রকাশ করেছে। আর পদ্মা সেতুর মতো স্পর্শকাতর এবং অতীব জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ তো অনেক বড় কিছু। যে প্রকল্পে অর্থায়নই স্থগিত করে দিয়েছে বিশ্বব্যাংকসহ অন্য সাহায্যদাতারা। জনসাধারণের অধিকার আছে জানার, কাদের নাম বিশ্বব্যাংকের অভিযোগপত্রে রয়েছে। তাদের কার কী তৎপরতা ছিল। তারা যদি মন্ত্রী, সচিব বা অন্য কোনো সরকারি পদপদবিতে সমাসীন হন, তবে তাদের পদে রাখা কতটা সমীচীনÑ সে প্রশ্ন ওঠাও স্বাভাবিক। গণমাধ্যম নয়, দুদকই এসব রাখঢাক করতে গিয়ে বরং জনগণকে বেশি বিভ্রান্ত করছে। সংবাদপত্রে যখন যার নাম প্রকাশিত হচ্ছে, তিনি তার প্রতিবাদ করছেন। মন্ত্রী আবুল হোসেন এবং সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া প্রতিবাদ জানিয়েছেন। দু’জনই আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন। সচিব মোশাররফ হোসেন তো বিশ্বব্যাংককে চ্যালেঞ্জই প্রদান করেছেন। এমনকি এ কথাও বলেছেন, ১০ শতাংশ ঘুষ গ্রহণের কোনো কথাই নাকি বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
পদ্মা সেতু প্রকল্পের দুর্নীতি নিয়ে আগেও এই কলামে একাধিকবার লিখেছি। সে সব লেখায় বলেছি, সরকার দুর্নীতির অভিযোগটি খোলাসা না করে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করলে জটিলতা বাড়বে বৈ কমবে না। প্রথমে তো সরকার বিষয়টি আমলেই নিতে চায়নি। উল্টো বিশ্বব্যাংককেই চ্যালেঞ্জ করেছে। চুক্তি বাতিল করে বিকল্প সূত্রে অর্থ সংগ্রহ করে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে। আমরা তখনই প্রমাদ গুনেছিলাম। যে দেশের উন্নয়ন প্রকল্পের বিরাট একটি অংশ সাহায্যদাতাদের ওপর নির্ভরশীল, যাদের অর্থনীতি বিশ্বব্যাংকের অর্থ ছাড়া সচল রাখা যায় না, তাদের পক্ষে বিশ্বব্যাংকের সাথে লড়াই করতে যাওয়া কতটা আত্মঘাতী ব্যাপার, সরকার বোধ হয় বিলম্বে হলেও বুঝতে পারছে। তাই অন্তত একজনের কণ্ঠে কিছুটা বাস্তবতার সুর পাওয়া যাচ্ছে। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এখন বলছেন, বিশ্বব্যাংকের সাথে চুক্তি বাতিল নয়, দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়টি নিষ্পত্তি করেই সরকার প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে চায়। এ নিয়ে তার সর্বশেষ বক্তব্য হলো, আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যেই পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হবে। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে যা করণীয় তাই করব।
পদ্মায় অনেক পানি ইতোমধ্যে ঘোলা হয়েছে। এ প্রকল্পের দুর্নীতির বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিক খবর। সরকার বিষয়টি নিয়ে সোজা পথে না গিয়ে বিষয়টিকে যে জটিল করে ফেলেছে, তা এখন টের পাচ্ছে। তাই দুদকের মাধ্যমে এর কিনারা করতে চায়। কিন্তু এ মামলা সুরঞ্জিতের অর্থ কেলেঙ্কারি নয়। যেনতেন করে সব সাফ সুতরা ঘোষণা করা যাবে না। সঠিক পথে, যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য মানের তদন্তই করতে হবে দুদককে। নচেৎ তা গলার কাঁটা হয়েই থাকবে সরকারের জন্য। 
azammir2003@yahoo.com

রাজনৈতিক মিথ্যাচারের শেষ কোথায়?



॥ মুহাম্মদ আবদুল জববার ॥

একটি মিথ্যা কথা আরো ১০টি মিথ্যা কথা বলার পথ নির্দেশ করে। মিথ্যার প্রলেপ দিয়ে সত্যকে ঢেকে রাখতে চাইলেও একদিন সত্য প্রকাশ পাবেই। মিথ্যার পরিণাম ধ্বংস। মিথ্যাবাদী রাখালের কথা সবার জানা আছে। তার আহ্বানে প্রথম দিকে কিছু পথচারী সাড়া দিলেও রাখাল মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হওয়ায় যেদিন বাঘ তাকে আক্রমণ করল সেদিন অনেক কাকুতি-মিনতি করে বাঘ... বাঘ... বাঁচাও... বাঁচাও বললেও তাকে কেউ বাঁচাতে আসেনি। যার পরিণতি ছিল অপ্রত্যাশিত মৃত্যু।
আমাদের সমাজে এই অপ্রত্যাশিত কালচার প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে। ভিন্নমতের যে কাউকে আক্রমণ করা বা অপমানিত করাই যেন আমাদের কালচার। এ কালচার থেকে রেহাই পায়নি আমাদের জাতীয় রাজনীতিও।
মিথ্যাচারের কারণে কত মানুষের জীবন ত-বিত। বছরের পর বছর বিনা অপরাধে কারাবরণ করছে কত মানুষ, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। এ দেশের ইতিহাসে খোঁজ মেলে কত জজ মিয়ার! এসব মিথ্যাচারের বীভৎস চিত্রগুলো চোখের পর্দায় ভেসে এলে গা শিউরে ওঠে। এর কোনো সমাধান কি নেই? 
তখন অনার্স প্রথম বর্ষে পড়তাম। শুনলাম কলেজ আঙিনায় দু’টি ছাত্র সংগঠনের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে, আর এ মামলায় আমার বড় ভাইকে আসামি করা হয়েছে। সে সেদিন কলেজেও যায়নি। তাকে গ্রেফতার করা হলো, দীর্ঘ তিন মাস কারাভোগ করতে হলো। একজন নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা দেয়া সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। যার যতটুকু অপরাধ আইনের আলোকে অপরাধী হলে সে ততটুকু শাস্তি পাবে। পরে শুনেছিলাম কারো চাপে বাধ্য হয়ে কলেজ কর্তৃপ কিছু নির্দোষ ছাত্রকে দায়ী করে মামলা করে।
ঘটনা ঘটার পরে প্রকৃত দোষীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়, অথচ নিরপরাধ নাগরিকের ওপর পুলিশের নির্মম প্রহার, রিমান্ড, জেল-জুলুম চলছেই। মন্ত্রীর মুখ থেকেও শোনা যায়, জেলে গেলে কী হবে? কয়েক দিন পরে ছেড়ে দেবে। এ কেমন কথা? বিনা অপরাধে একজন নাগরিককে কেন জেলে যেতে হবে, কেন তার স্বাধীনতা খর্ব করা হবে। সন্দেহÑ রাজনৈতিক কর্মী! হিউমেন রাইটস ওয়াচসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলো সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও কার কথা কে শোনে। বিরোধী দলের কোনো সভা সমাবেশ করলেই আইনশৃঙ্খলা নষ্ট হয়! অথচ এ বছরের ১২ মার্চ বিরোধী দলের সমাবেশকে সামনে রেখে মহাজোট সরকার তিন দিন ধরে অঘোষিত হরতাল দিয়ে জনজীবন স্তব্ধ করে। ১১ জুন ১৮ দলের গণসমাবেশে আগত নেতাকর্মীদের ওপর সরকারের লালবাহিনী সদরঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এতে কি আইনশৃঙ্খলা বিঘিœœত হয়নি? বিরোধী দল হরতাল ডাকলে কোনোভাবেই মিছিল মিটিং করতে দেয়া হয় না অথচ নিজ দলের নেতাকর্মীদের পুলিশি প্রহরায় শোডাউন করে জনমনে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়। এটিও কি আইনশৃঙ্খলা রার নমুনা! বিরোধী দলের কর্মসূচি মানেই বাধা, পুলিশের লাঠিচার্জ, ১৪৪ ধারা জারি অথবা সরকারি দলের আক্রমণ। তারপর ধরপাকড়। মামলা, জেল-জুলুম। জামিনের পর শ্যোন অ্যারেস্ট ইত্যাদি ইত্যাদি। এরপরও সামনে মতায় আসার স্বপ্ন! এসব কাণ্ডজ্ঞানহীন নির্বুদ্ধিতা জাতির পথচলাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
কয়েক দিন আগে বিরোধী দল হরতাল ডেকেছিল। সচিবালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে বোমা হামলার ঘটনায় ১৮ দলের নেতাকর্মীদের নামে মামলা দেয়া হলো। তারপর কোর্টে অ্যারেস্ট। অথচ এই ঘটনার দিন অনেকেই ছিলেন রাজধানীর বাইরে। এসব হাস্যকর।
সম্প্রতি সাগর-রুনি রহস্যজনক খুনের কোনো কুল-কিনারা করতে পারেনি পুলিশ। ঘটনার পর দিন শুনলাম যে, পুলিশ কয়েকজন সন্দেহভাজন হেরোঞ্চিকে গ্রেফতার করেছে। অথচ মূল আসামি ধরাছোঁয়ার বাইরে। এভাবে কত হত্যাকাণ্ড স্বাধীনতার ৪১ বছরে ঘটল। সরকার তদন্তের নামে আইওয়াশ করে কিন্তু বেশির ভাগ হত্যা মামলার রহস্য জাতির সামনে অস্পষ্ট থেকেই গেল। 
এখন শুরু হয়েছে নতুন সংস্কৃতি গুম করে ফেলা। এ সরকারের আমলে ৯ শতাধিক মানুষ গুম হয়েছে। এদের একটা অংশ ফিরছে লাশ হয়ে। আর একটা অংশের সন্ধান মেলেনি। এসব পরিবারের অর্তনাদে জাতি বাকরুদ্ধ। ঔপনিবেশিক কায়দায় নাগরিকদের যখন-তখন ধরে নিয়ে যাওয়া এবং অত্যাচার-নির্যাতন, হুমকি দিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী আদায় করে বিচারের আগেই অভিযুক্তকে দোষী প্রমাণের এই চর্চা বড় ধরনের তি করবে। 
কার স্বার্থে এসব গুম, টর্চার? অপরাধী যত বড়ই হোক না কেন তার জন্য আইন আছে, আছে আদালত। তার নাগরিক অধিকার যদি আমরা ুণœ করতে সানন্দে রাজি হই, সব নাগরিকের অধিকার রাষ্ট্র ুণœ করতে মোটেও দ্বিধা করবে না। 
কারো বিরুদ্ধে যেকোনো পরে অভিযোগ উঠলে পরীা-নিরীা না করে তাকে নাগরিকের চোখে অপরাধী সাব্যস্ত করার প্র্যাকটিস মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের দৃষ্টিতে অন্যায়। একজন ব্যক্তি যত বড় অপরাধই করুক না কেন যদি তার নাগরিক অধিকার ুণœ করে আগেই অপরাধী বলে চিহ্নিত করি তাহলে আইন-আদালত-সংবিধানের কী দরকার? এতে সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। নিরপরাধ কত জজ মিয়ার আর্তচিৎকার গুমরে মরবে কাল থেকে কালান্তরে। কিছু সুবিধাবাদী লোক মতার অপব্যবহার করতে সদা তৎপর। সরকার পুলিশ প্রশাসনকে অপব্যবহার করে আইনের রকদেরকে জনগণের সামনে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। র‌্যাব-পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে ক্রসফায়ার, গুম, লুণ্ঠন ইত্যাদিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের। 
নিজদের ব্যর্থতা ঢাকার জন্য বিরোধী দলকে জেল-জুলুম দিয়ে দমন করা কোনোভাবেই উচিত নয়। বরং নিরপরাধ ব্যক্তিদের অকারণে হয়রানি সরকারের পতনকে ত্বরান্বি^ত করে এবং সরকারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হয়। দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দল একাত্ম হয়ে কাজ করা জরুরি। নচেৎ দেশের অভ্যন্তরে গোলমাল পাকাতে বহিঃশত্র“ সদা তৎপর থাকে। বর্তমানে র‌্যাবকে যত্রতত্র ব্যবহার করে তাদের বিশেষত্ব ম্লান হতে চলেছে। প্রতিনিয়ত সীমান্তে বিএসএফ বাংলাদেশী হত্যা করছে। কিন্তু কোন অদৃশ্য ইশারায় বিজিবি জোরালো ভূমিকা রাখছে না?’
পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আছে, তা সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলকে ভাবতে হবে। যাদের ওপর জনগণের জানমালের নিরাপত্তা তাদের সুযোগ-সুবিধা ও সম্মান বাড়ানো জরুরি।
অপর দিকে পুলিশের চিন্তা করা উচিত, এ দেশের ভুখা-নাঙ্গা মানুষগুলোর ট্যাক্সের টাকায় তাদের বেতন দেয়া হয়। সুতরাং প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তা-সম্ভ্রম রার দায়িত্ব তাদেরই। আর নয় মিথ্যা আর লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি, ভিন দেশের পদলেহন। সবাই নিজের কর্তব্য সচেতনতা ও জবাবদিহিতার দ্বারকে উন্মোচন করে শান্তির সোনালি দেশ গঠনে ব্রতী হই। 
zabbarics@gmail.com

বিশ্ব দুর্নীতি(মুক্ত) দিবস

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম


সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ঢাকায় দুই দিনব্যাপী এক দুর্নীতিবিরোধী সম্মেলনের আয়োজন করে। এই সম্মেলনে যোগ দিতে আসা এক তরুণ আমাকে জিজ্ঞেস করল, বছরের একটি দিন দুর্নীতিমুক্ত দিবস হিসেবে পালন করলে কেমন হয়? তার চিন্তাটি ভালো: প্রতিবছর প্রতিদিনই আমরা কোনো না কোনো দিবস পালন করছি, যেমন তামাকমুক্ত দিবস অথবা হাত ধোয়া দিবস। তাতে আর কিছু না হোক, এসব বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয়। তবে দেশের ঠাকুর ফেলে আমরা যেহেতু বিদেশি কুকুর ধরতে অস্থির এবং ওস্তাদ, তাতে দিবসটি শুধু দেশীয় হলে তেমন সাড়া পাওয়া যাবে না। বস্তুত, তামাকমুক্ত দিবস অথবা হাত ধোয়া দিবসের আগে ‘বিশ্ব’ থাকায় আমরা শুধু বিড়ির দিকে নজর না দিয়ে সিগারেটের দিকেও দিচ্ছি এবং হাত যেনতেনভাবে একটু পানি ঢেলে না ধুয়ে লাক্স সাবান ও হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে ধুচ্ছি। ফলে কিছুটা ফল পেতে হলে দুর্নীতিমুক্ত দিবসের আগেও ‘বিশ্ব’ শব্দটি জুড়ে দিতে হবে। 
বিশ্ব সাদাছড়ি দিবস দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের নিরাপদে চলাচলের বিষয়টি নিশ্চিত করতে আমাদের সচেতন করে—যদিও ঢাকা বা চট্টগ্রাম শহরে নিরাপদে চলাচলের জন্য এক জোড়া, এমনকি চার জোড়া স্বাস্থ্যবান চোখও যথেষ্ট নিশ্চয়তা দেয় না। নিশ্চয়তা যেহেতু নির্ভর করে যানচালকের কৃপা ও দাক্ষিণ্যের ওপর, ভয় হয়, বিশ্ব দুর্নীতিমুক্ত দিবসটিও বিপরীত একটি অবস্থারই সৃষ্টি করবে। বিশ্বের অনেক দেশে এ দিবসটি ইতিবাচক একটি ভূমিকা পালন করলেও বাংলাদেশে ঘটবে উল্টোটি। যেমন, সারা দেশে রেল চলবে না, যেহেতু সাবেক রেলমন্ত্রী কথিত কালো বিড়ালদের সেদিন তাদের থাবা গুটিয়ে রাখতে হবে, ফলে রেলের চাকা যাবে বন্ধ হয়ে। সারা দেশের প্রশাসনে কোনো কাজ হবে না, যেহেতু বড় বড় দান বাদ দিলেও গত্যর্থ (গতি+অর্থ) অর্থাৎ স্পিড মানির ঘাটতিতে কোথাও কোনো ফাইল নড়বে না। পুলিশ সম্পর্কে মাননীয় অর্থমন্ত্রীর একটি সাম্প্রতিক উক্তি মনে রেখে বলা যাবে, পুলিশি কাজকর্ম থেমে যাবে, ফলে দিনটা চলে যাবে অপরাধীদের দখলে। কোনো সরকারি হাসপাতালে রোগী চিকিৎসা বা ওষুধ পাবে না, যেহেতু সামান্য সেবা ও ওষুধ পেতে সেবাদাতার করতল তৈলাক্ত করতে হয়; সারা দেশে সরকারি নিয়োগ, টেন্ডার ও ক্রয়সংক্রান্ত কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যাবে; বন্দরের মাল ওঠানামা ক্ষতিগ্রস্ত হবে; ঢাকা শহরে ভোর রাতে ট্রাকে করে যেসব তরিতরকারি, ফলমূল, হাঁসমুরগি ইত্যাদি আসে সেসব উৎসে পড়ে রইবে; বিমানের আগের দিনের ফ্লাইটটি ওই দিনও আর আকাশে উড়বে না। অবশ্য বিমানের যাত্রীদের জন্য এটি কোনো খবরই নয়। একসময় বাজারে একটি চুটকি খুব চলত: বিমানের প্রতিটি ফ্লাইট সময়মতো ছাড়ে—হ্যাঁ, গতকাল সকাল নয়টার ফ্লাইটটি আজ সকাল নয়টায় ছেড়েছে। সময়টা তো ঠিক রেখেছে। এখন লোকে বলে, বিমানের ফ্লাইট আজ থেকে কিয়ামত পর্যন্ত কোনো একদিন উড়লেই যাত্রীরা উৎফুল্ল হয়, নিজের দেশের জাতীয় বিমান সংস্থা বলে কথা। 
দেশটার তাহলে যা হবে তাকে পরিবহনের ভাষায় বলা যায় চাক্কা জ্যাম। এই জ্যামের ব্যাপকতা ওপরের মাত্র কয়েকটি উদাহরণ সঠিক তুলে ধরতে পারবে না, সম্ভবও নয়। তবে এর ফলে যে দুর্যোগ সৃষ্টি হবে তা কল্পনা করতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। সরকারি দলের টেন্ডার বাহিনী থেকে শুরু করে ভূমিদস্যুরা এতে মারাত্মক ক্ষিপ্ত হবে। যেখানেই টেবিলের নিচ দিয়ে—দুঃখিত, পড়ুন ওপর দিয়ে—খাম চালাচালি হয়, সেখানেই প্রত্যেকের মেজাজ খারাপ হবে। এমনকি পুরোনো গল্পের নিরীহ সেই ঢেউ গণনাকারীরও। আমি নিশ্চিত, সকাল শেষ হতে না-হতেই দিবসটির বিপক্ষে নানা জায়গা থেকে প্রতিরোধ সৃষ্টি হবে। আমি অবাক হব না, যদি দিবসটির প্রবর্তক বিশ্ব সংস্থাটির (বিশ্ব দিবসগুলোর জিম্মাদার কে, আমি জানি না) কাছে ওই দিন দুপুরের মধ্যেই ডলারভর্তি খাম পৌঁছে যায় দিবসটিকে বিশ্ব বর্ষপঞ্জি থেকে বাদ দেওয়ার জন্য।
জনগণ সচেতন হতে হতে প্রতিবাদী হয়ে দাঁড়ালে কিছু একটা তো হয়ে যেতে পারে, নাকি? তৎপরতা হবে সে জন্য। তবে বাংলাদেশের চাক্কা জ্যাম যাতে না হয়, সে বিষয়টাও তো দেখতে হয়। আমরা যেহেতু বাংলাদেশে থাকি, যা আসলে আম (অর্থাৎ পাবলিক) জ্যামের দেশ বলে বিশ্বে বিখ্যাত, আমাদের পক্ষে সে বিলাস হবে আত্মঘাতী। ফলে আমরা বরং একটি সময় ও দেশোপযোগী প্রস্তাব দিতে পারি এবং তা হবে বিশ্ব দুর্নীতি দিবস পালন। তাহলে বিশ্বও খুশি হবে (বিশ্বে এমনকি পশ্চিমা বিশ্বেও দুর্নীতি ওকগাছের মতোই পোক্ত), আমরা তো বটেই। আমাদের রেলের কালো বিড়ালগুলো গোঁফে তা দেবে, হাসপাতালে রোগী একটা প্যারাসিটামল অন্তত পাবে, থানায় থানায় স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষক নিয়োগ কিছুটা এদিক-সেদিক হতে থাকবে, টেন্ডারের কনটেন্ডাররা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে। এই একটি দিবস প্রতিবছর সাদা করার জন্য যে পরিমাণ অর্থের জোগান দেবে, তাতে সামান্য ট্যাক্স লাগালেই আমাদের সামনের কোনো বাজেটেই আর ঘাটতি নিয়ে ভাবতে হবে না।
এ রকম একটা দিনের প্রস্তাব আমরা এখন তুলতেই পারি। 
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

রোজার আগে সরকারকে যা মনে রাখতে হবে

মোহাম্মদ হেলাল


আমদানি মূল্য কিংবা উৎপাদন খরচ নয়, চাহিদা আর সরবরাহের ফারাকই দাম ওঠানামা করায়। বাজার অর্থনীতি মানেই বাজারের অর্থনীতি। চাহিদা এবং সরবরাহের অর্থনীতি। একটা নির্দিষ্ট সময়ে চাহিদা ও সরবরাহের সমতার ভিত্তিতে বাজারের ভারসাম্য দাম ঠিক হয়। এই দামে ক্রেতারা সম্মিলিতভাবে যেটুকু কিনতে চায়, আর বিক্রেতারা সম্মিলিতভাবে যেটুকু বিক্রি করতে চায়, উভয়ই সমান হয়। এই দুয়ের মধ্যে ফারাক সৃষ্টি হলে সাধারণত দামের ওঠানামার দ্বারা তা দূর হয়। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকলে ভারসাম্যে পৌঁছাতে হয় চাহিদা কমাতে হয়, নইলে সরবরাহ বাড়াতে হয় অথবা দুটোই করতে হয় একসঙ্গে। দাম বেড়ে গিয়ে আপনাআপনি তা হয়ে যায়। লাভবান হন সরবরাহকারীরা। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি থাকলে বাড়তি সরবরাহ কাটাতে চাহিদা বাড়াতে হয় দাম কমিয়ে। পচনশীল না হলে সরবরাহও কমতে পারে কম দামের ফলে। এ ক্ষেত্রে লাভবান হন ভোক্তারা। চাহিদা আর সরবরাহের এই দামনির্ভর সমন্বয় কিন্তু সার্ভিসের ক্ষেত্রেও আমরা দেখি। যেমন, একজন রিকশাওয়ালা যাত্রীর তুলনায় রিকশার সংখ্যা কম দেখলে ভাড়া বাড়িয়ে দেয়। ফলে যাদের রিকশায় যাওয়া বেশি জরুরি, তারা বেশি ভাড়া দিয়ে যায়। অন্যরা বিকল্প খোঁজে। আবার ছুটির দিনে উল্টোটাও ঘটে। তার মানে এই সমন্বয় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলায়ও। যেমন, পবিত্র রমজানের এক-দেড় মাস আগে চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতে একটা দাম ঠিক হয়েছিল চিনি কিংবা তেলের। যখন রোজা আসি আসি করছে কিংবা রোজা আসার পর এসব পণ্যের দাম বেড়েছে। লোকজনের ক্ষোভ, রোজায় চাহিদা বাড়ে ব্যবসায়ীরা জানেন, তাঁরা বেশি পরিমাণে সরবরাহ করেন না কেন। ব্যবসায়ীরা আবার বাড়তি সরবরাহ বেশি দামে করার দাবি করে দাম বাড়ার পক্ষে যুক্তি দেন। 
প্রশ্ন হলো, চাহিদা বেড়ে গেলেও দাম আগের পর্যায়ে রাখতে হলে কী করতে হবে। যেটুকু চাহিদা বেড়েছে, ঠিক তার সমপরিমাণ সরবরাহ বাড়াতে হবে। তবে তা হতে হবে অবশ্যই আগের দামে। যদি সরবরাহের উৎস বিশ্ববাজার হয়, তবে একই দামে সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হয় অনেক সময়। সে কারণেই ভোজ্যতেল কিংবা চিনির দাম রমজানে একই পর্যায়ে থাকবে—প্রত্যাশা করেন ভোক্তারা। প্রথম আলোর ২১ জুন সংখ্যায় প্রকাশিত খবর—আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে দেশে দাম কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়ে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন কয়েক দফা সুপারিশ করলেও তা আমলে নেয়নি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়—এর ভিত্তিও এ ধরনের প্রত্যাশা। কিন্তু সরবরাহ একই দামে এলেও যদি পরিমাণে চাহিদার চেয়ে কম হয়, তাহলে কিন্তু দাম বাড়বে। তার মানে বিশ্ববাজার থেকে কোন দ্রব্য কত দামে কেনা হলো, অভ্যন্তরীণ বাজারের দাম নির্ধারণে তাৎক্ষণিক তা বিচার্য বিষয় নয়। বিষয় হলো বাজারে ওই দ্রব্যের যে দাম আমরা দেখতে চাই, সেই দামের বিপরীতের চাহিদাকে মেটাতে পারছে কি না সৃষ্ট সরবরাহ, না পারলে দাম বাড়বেই। 
মোট কথা, বিশ্ববাজার থেকে যত কম দামেই কেনা হোক না কেন, দেশের বাজারে ঘাটতি থাকলে দাম বাড়বেই। তেমনিভাবে বিশ্ববাজার থেকে বেশি দামে কিনলেও দেশের বাজারে দাম কমবে যদি উদ্বৃত্ত থাকে। গত রমজানে চিনির দাম ৬৫ টাকা স্থির করা হয়েছিল। কিন্তু এই দামে সর্বসাধারণের যে চাহিদা, তা মেটানোর মতো সরবরাহ বাজারে ছিল না। তার মানে ব্যাখ্যা একটাই, পর্যাপ্ত আমদানি হয়নি। অথবা আমদানি পর্যাপ্ত হলেও বাজারে চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সরবরাহ বাড়েনি। এবার সরকার নির্ধারিত দামের অনেক নিচে বিক্রি হচ্ছে চিনি। কেন এমনটি ঘটছে। দরকার পর্যাপ্ত গবেষণার! না। কারণ একটাই। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি। ফলে নিত্যপণ্যের দামের স্থিতির জন্য দরকার চাহিদা আর সরবরাহের মধ্যে সমন্বয় সাধনে সরকারের কার্যকর ভূমিকার। অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদিত পণ্যের বেলায়ও এ কথা প্রযোজ্য। 
গত রমজানের আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলেছিল, পর্যাপ্ত চিনি আমদানি হয়েছে, কিন্তু ব্যবসায়ীরা সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন। আমদানির যে ফিগার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দিয়েছিল, সেখানে জাহাজে করে আসছে এবং এলসি খোলা হয়েছে এমন অপরিশোধিত চিনিকেও গণনায় ধরা হয়েছিল। আমরা জানি, বেশ কয়েকটা রিফাইনারি কোনো চিনি আমদানি করেনি গত বছর রমজানের আগে। অন্যদিকে সরকার টিসিবি এবং বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনকে দিয়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৩০ হাজার টনের মতো চিনি কিনে রমজানের আগে নিজের স্টক বাড়িয়েছিল। এগুলো রমজানে ছাড়ার জন্য রাখলেও তা কিন্তু রমজানের আগে বাজারের সরবরাহ কমিয়েছিল। বিভিন্ন দীর্ঘসূত্রের ফলে সরকারের কেনা চিনি বাজারে ফিরে আসতে অনেক সময় লেগেছিল। প্রশ্ন হলো, সরকার চিনি কিনবে ভালো কথা, কিন্তু অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে কেন? আর অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে কিনলেও তা আরও অনেক আগে নয় কেন? সেই ক্ষেত্রে আমদানিকারকদের বিশ্ববাজার থেকে আরও বেশি পরিমাণে চিনি কিনে আনার সময় ও সুযোগ থাকত। এই পথে না হেঁটে সরকার নিজে কার্যকর সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছিল। ফলে চিনির দাম বেড়েছিল।
তবে মাঝেমধ্যে মিডিয়া এবং সরকারের দেওয়া তথ্যও স্পেকুলেশন তৈরি করে দাম বাড়ানোয় ভূমিকা রাখে। গত রমজানের আগে খুচরা, পাইকারি ব্যবসায়ী ও রিফাইনাররা জেনেছিল যে সরকার অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে চিনি কিনছে। আরও জেনেছিল যে বেশ কটি রিফাইনারি আমদানি ও পরিশোধন কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। এগুলোকে তারা চিনির বাজারে সংকটের আলামত হিসেবে ধরে নিয়েছিল। ফলে তাদের অনেকেই ভবিষ্যতে বিক্রির জন্য চিনি খানিকটা ধরে রাখার চেষ্টা করেছিল। এভাবে কম আমদানিজনিত সরবরাহ আরও কমে গিয়ে বাজারে দাম আরও বেড়েছিল। আবার ভোক্তারা অদূর ভবিষ্যতে অর্থাৎ রমজানে আরও দাম বাড়ার ভয়ে রমজানের আগে বেশি কেনার চেষ্টা করেছিলেন। বাজারের নিয়মে তাই হওয়ার কথা। তবে এর সবকিছুর মূলেই ছিল চিনির কম আমদানি কিংবা কম আমদানির খবর। তবে আমদানি সত্যি সত্যি বেশি হলে কম আমদানির খবরজনিত স্পেকুলেশন বেশিক্ষণ থাকার কথা ছিল না, ফলে এ থেকে সৃষ্ট দাম বৃদ্ধি অল্প সময়েই ঠিক হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। তার মানে আমদানি আসলেই কম হয়েছিল। এবার চিনির অতিরিক্ত সরবরাহ থাকায় সরকার কেজিপ্রতি দাম ৫৫ টাকা স্থির করলেও তা বর্তমানে ৪৮ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
আগেই বলেছি, চাহিদার বৃদ্ধির বিপরীতে সমানতালে সরবরাহ না বাড়লে দাম বাড়বে বাজার অর্থনীতিতে। তার পরও যদি আমরা জোর করে দাম আগের জায়গায় কিংবা কোনো একটা লেভেলে রাখতে চাই, তবে সেটা করার উপায় আছে কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোলের মাধ্যমে। এক, চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করা। রেশনিংয়ের মাধ্যমে চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করে তা সরবরাহের লেভেলে রাখা, যা আমাদের দেশে এখন আর করা হয় না। সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ভোগ-লালসা কমিয়ে চাহিদা নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছিলেন। মন্ত্রীর মত অনুযায়ী চাহিদা না বাড়লে দাম বাড়ত না। একেবারেই খাঁটি কথা। কিন্তু তা তো সমস্যা তৈরি হওয়ার আগের চিকিৎসা। আর তিনি যাঁদের কম খেতে বলছিলেন, তাঁদের অনেকেই ভোজ্যতেলের মতো জিনিসও ছটাকে কিনে খান। ফলে এমন আধমরাদের ভোগ-লালসা কমাতে বলা একেবারেই অযৌক্তিক ছিল। কিন্তু তাঁর এই বক্তব্য পরোক্ষভাবে এই কথাই ছিল যে চাহিদা বাড়লে দাম বাড়বেই। দুই, দাম নিয়ন্ত্রণ করা। কোনো একটা দাম বেঁধে দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে তা বাস্তবায়ন করা। মুখে যা-ই বলুক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দুই নম্বর পন্থাই বেছে নিয়েছিল। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সেই পথের একটা সমস্যা হলো, দাম ঠিক রাখতে পারলেও সবাই পণ্য কিনতে পারে না। আর ঠিকমতো কন্ট্রোল করতে না পারলে বেঁধে দেওয়া দামে বাজারে পণ্য বিক্রি হয় না। বাস্তবে তাই হয়েছিল, ১৬-১৭ কোটি মানুষের এই গরিব দেশে এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ একেবারেই অসম্ভব। আর ভয়ভীতির ফলও দীর্ঘ মেয়াদে শুভ হয় না। 
সরকারকে মনে রাখতে হবে, দেশের চিনির ৮০-৮৫ শতাংশ জোগান দেয় এই প্রাইভেট রিফাইনাররা। এদের দিয়ে জোর করে কার্যক্রম চালানো সম্ভব নয়। তবে রাষ্ট্রীয় মালিকানার ক্ষেত্রে ভিন্ন কথা। লাভ-লোকসান যা-ই হোক, সরকার উৎপাদন করবেই। জনগণের ভর্তুকিতে চললে তা সম্ভব। কিন্তু ব্যক্তিমালিকানার ক্ষেত্রে তা লোকসান কাঁধে নিয়ে কেউ উৎপাদন কিংবা আমদানি করবে না। আবার যদি এরা কোনো কারণে পর্যাপ্ত পরিমাণ চিনি আমদানি না করে, তবে ডিও হোল্ডারদের বাদ দিয়ে ডিলার নিয়োগ করেও অবস্থার অবনতি বৈ উন্নতি সম্ভব নয়। আমদানি কম হলে দাম বেঁধে দিয়ে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারা বাস্তবায়ন করাও সম্ভব নয়। চিনি ও ভোজ্যতেল উভয়েরই দাম বেঁধে দেওয়া হয়েছিল গত বছর। তেলের দাম ব্যবসায়ীরা মেনেছিলেন কিন্তু চিনিরটা মানেননি। কেন মানলেন না, তা একটু ভেবে দেখা দরকার। একই ব্যবসায়ীর অর্ধেকটা ভালো আর অর্ধেকটা খারাপ কিংবা তেলের ব্যবসায়ী ভালো, কিন্তু চিনির ব্যবসায়ী খারাপ, এ কী করে হয়। এবারের রমজানের আগে বাজার নিয়ন্ত্রণের সময় এই বিষয়গুলো সরকারের মাথায় রাখা উচিত। 
মোহাম্মদ হেলাল: শিক্ষক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।