রবিবার, ১ জুলাই, ২০১২

বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের সুফল মেলেনি ৫ বছর



গোলাম রব্বানী
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ করা হলেও দীর্ঘ দিনেও এর সুফল মিলছে না; নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্বেই চলছে বিচার বিভাগ। অভিযোগ উঠেছে যে, উচ্চআদালতও সরকারের অভিপ্রায়ের বাইরে যেতে পারছে না। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করার উদ্যোগটি কার্যত সরকারের মর্জির ওপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে বিচার বিভাগকে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি মাত্রায় সরকারের রাজনৈতিক অভিলাষ পূরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ বলতে প্রশাসনের হাত থেকে বিচারিক মতা নিয়ে নেয়া ছাড়া পাঁচ বছরে আর কিছুই অর্জিত হয়নি বলে জানা গেছে। বিচার বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্টদের মতে, পৃথক সচিবালয় গঠন না হওয়াটাই এ েেত্র সবচেয়ে বড় বাধা। কারণ পৃথক সচিবালয় না থাকায় এ বিভাগের নিয়ন্ত্রণ কার্যত আইন মন্ত্রণালয় তথা রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের হাতেই থেকে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২২ নম্বর অনুচ্ছেদে একটি পৃথক বিচার বিভাগের কথা উল্লেখ আছে। এ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হইতে বিচারবিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন।’ সংবিধানে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণের বিধান স্পষ্টভাবে থাকলেও রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকে কোনো সরকারই এর পৃথকীকরণে কখনো কোনো পদপে নেয়নি।
১৯৯৫ সালের ১৯ নভেম্বর মাসদার হোসেনসহ ৪৪০ জন বিচারক বিচার বিভাগ পৃথকীকরণে একটি মামলা দায়ের করেন। বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের পে ১৯৯৭ সালের ৭ মে এ মামলার রায় হয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে ১২ দফা নির্দেশনা দিয়ে ১৯৯৯ সালে তাদের রায় ঘোষণা করেন। কিন্তু এ রায় বাস্তবায়ন করেনি কোনো সরকারই; বরং বিভিন্ন সরকার এর বাস্তবায়নে ২৭-২৮ দফা সময় চেয়ে আদালতের কাছে আবেদন করে কেবল সময়পেণ করেছে।। অবশেষে ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিচার বিভাগকে পৃথক বলে ঘোষণা দেয়; কিন্তু এ জন্য পৃথক সচিবালয় গঠনের বিষয়টি এখনো ঝুলে আছে।
২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ যে পাঁচটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করে তার একটি ছিল স্বাধীন বিচার বিভাগ। এতে বলা হয়Ñ ‘বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা ও নিরপেতা নিশ্চিত করা হবে।’ কিন্তু মতা গ্রহণের সাড়ে তিন বছর পার হলেও নির্বাচনী সে ইশতেহার এখনো বাস্তবায়ন করেনি আওয়ামী লীগ। 
এ ব্যাপারে মাসদার হোসেন মামলার আইনজীবী ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য পৃথক সচিবালয় খুবই প্রয়োজন। সচিবালয় নির্বাহী বিভাগের কাছে না রেখে বিচার বিভাগের কাছে নিয়ে আসা প্রয়োজন। তবে সে জন্য জনবল দরকার। এ ছাড়া নিয়োগকৃত জনবলকে মনিটরিং করতে কিছু নিয়মকানুনও থাকতে হবে। সংবিধানবিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, এখানে দু’টি বিষয় রয়েছে- একটি হচ্ছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আরেকটি হচ্ছে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ। তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতা বলতেÑ রায় দেয়ার েেত্র স্বাধীনতা। সাধারণত এ ব্যাপারে কখনো কোনো প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ বলতেÑ নিজের প্রশাসন নিজে চালানোর উপায়। এটি করতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার ইউনিটকে অনেক বেশি শক্তিশালী করতে হবে। আইন মন্ত্রণালয় যেসব কাজ করে সেটা এনে পুরোটাই সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারকে দিতে হবে।’
তিনি বলেন, অধঃস্তন আদালতের যে কাজ আইন সচিব করেন সেটা প্রধান বিচারপতির অধীনে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের করার কথা; অর্থাৎ সারা দেশে যে বিচার কাজ চলে তার নিয়ন্ত্রণ করবেন সুপ্রিম কোর্ট। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে এসব কাজ হবে।
তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে কোনো পদপে নেয়া হচ্ছে না। এটি প্রধান বিচারপতিরও প্রশাসনিক দুর্বলতার লণ। কারণ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বিচার বিভাগ প্রশাসনিকভাবে পৃথক হয়েছে। কিন্তু এর বাস্তবায়নে কোনো পদপে নিচ্ছেন না প্রধান বিচারপতি।’
ড. শাহদীন মালিক আরো বলেন, বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠনের কোনো প্রয়োজন নেই। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার ইউনিটটিই সচিবালয় হিসেবে কাজ করতে পারে। দরকার কেবল একে শক্তিশালী করা। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সরকারগুলো বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করবেÑ এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। তবে এ চেষ্টাকে প্রতিহত করতে হবে বিচার বিভাগকে। যদি বিচার বিভাগ শক্ত হাতে তা প্রতিহত না করে তবে দোষ সরকারের নয়।
সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করতে যে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে তাতে নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি ইত্যাদি বিষয়ে সব মতা সুপ্রিম কোর্টকে দেয়া হয়েছে। কিন্তু নিম্ন আদালত পরিচালনা একটি বিরাট ব্যাপার। কারণ এর জন্য অবকাঠামো, লোকবল, অর্থ ইত্যাদি দরকার। সুপ্রিম কোর্ট থেকে বারবার তাগাদা দেয়ার পরও বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করা হয়নি। পৃথক সচিবালয় না থাকায় এখনো আইন মন্ত্রণালয় নিম্ন আদালতে বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি ইত্যাদি বিষয় দেখভাল করছে। ফলে বিচার বিভাগে নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব রয়েই যাচ্ছে। ভিন্ন সচিবালয় না থাকায় আইন মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে দায়সারা অনুমোদন দেয়া ছাড়া তাদের আর কোনো কিছু করণীয় থাকে না। তিনি বলেন, পৃথক সচিবালয় না থাকার ফলে বিচার বিভাগ পৃথক হলেও এখানো তা আইন মন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্বাধীন। আইন মন্ত্রণালয়ই এখনো বিচার বিভাগের বদলি, পদোন্নতিসহ বিভিন্ন কার্যক্রম করে যাচ্ছে। এমনও ঘটনা আছে, যেখানে আইন মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন পাওয়া না গেলে বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে গেছে। তাই নিম্ন আদালতগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হলে একে আইন মন্ত্রণালয়ের আওতার বাইরে আনতে হবে এবং এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের যে নির্দেশনা আছে সেগুলো অবশ্যই অবিলম্বে কার্যকর করতে হবে; নতুবা বিচার বিভাগ কাগজে কলমে পৃথক হলেও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে বিচারপ্রার্থী জনগণকে ন্যায়বিচার প্রদান করা যাবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রফেসর ড. আসিফ নজরুল বলেন, মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পর নিম্ন আদালতের নিয়োগ, পোস্টিং, পদোন্নতি, ছুটি ইত্যাদি েেত্র প্রধান বিচারপতির একটি ভূমিকা থাকে। নির্বাহী বিভাগ তার (প্রধান বিচারপতি) মতামতের ভিত্তিতেই কাজ করার কথা। কিন্তু এসব েেত্র যদি প্রধান বিচারপতি তার মতার প্রয়োগ না করেন তাহলে পৃথক সচিবালয় করে কোনো লাভ নেই। তিনি আরো বলেন, বিচার বিভাগ পৃথক ঘোষণার পর নিম্ন আদালতে বিচারক নিয়োগ হচ্ছেন জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে। কিন্তু একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি এ নিয়োগ প্রক্রিয়ায়ও একটি শর্ত যোগ করে গেছেন। আগে একজন আইন গ্রাজুয়েট সরাসরি জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন পরীায় অংশ নিতে পারতেন। নতুন নিয়ম অনুসারে তাকে অ্যাডভোকেট হিসেবে দুই বছরের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে। আর যেহেতু অ্যাডভোকেটশিপের পরীা বার কাউন্সিলের মাধ্যমে হয় এবং সে প্রতিষ্ঠানটির কর্তাব্যক্তিরা সরকারিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত তাই একথা বলা যায় যে, নিম্ন আদালতে যে নিয়োগ প্রক্রিয়া সেখানেও দলীয়করণের সুযোগ রেখে দেয়া হয়েছে।

‘গানবোট ডিপ্লোম্যাসি’র প্রত্যাবর্তন?

‘গানবোট ডিপ্লোম্যাসি’র প্রত্যাবর্তন?



॥ এম. আবদুল হাফিজ ॥

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া দক্ষিণ চীন সমুদ্রে তাদের প্রথম সম্মিলিত নৌমহড়া করেছে গত বছর জুলাইয়ের প্রথম ভাগে। যদিও এই মহড়ায় মাত্র তিনটি নৌপোত অংশ নিয়েছিল। এই ঘটনা একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে, তা হলো পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যেসব দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যে আগ্রহ রয়েছে তারা ক্রমবর্ধমানভাবে বল প্রয়োগের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য এবং প্রতিরোধকের ভূমিকায় নৌশক্তি ব্যবহারে ইচ্ছুক। বৃহৎ সামরিক মহড়া, বিশেষ করে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির নৌশক্তির মহড়া দক্ষিণ চীন সমুদ্রে এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এগুলোর কিছু ঋতুভিত্তিক, আবার কিছু অনুষ্ঠিত হয় নতুন পোত ও সেগুলোর সক্ষমতা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য। কিন্তু একই সাথে এসব মহড়ার লক্ষ্য আবার দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সমুদ্রে চীনের সার্বভৌমত্ব বহাল রাখা এবং সেখানে কোনো বহিঃশত্রুর অনুপ্রবেশকে ঠেকানো। 
চীনের দক্ষিণ চীন সমুদ্রে একটি অ্যান্টিসাবমেরিন মহড়ার এক মাসেরও অল্প সময়ের মধ্যে মার্কিন-জাপান-অস্ট্রেলীয় মহড়াটি অনুষ্ঠিত হয়। তারপরই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সাবমেরিন ক্রয়ের ধুম পড়ে যায়। মার্কিন বিমানবাহী জাহাজ জর্জ ওয়াশিংটন আগেই অর্থাৎ ২০১০ সালে জাপান সমুদ্রে মোতায়েন হয়েছিল, যদিও সেটি ছিল উত্তর কোরিয়ার মার্কিন মিত্র দেশগুলোতে আক্রমণ পরিচালনার কল্পিত ধারণার প্রতিক্রিয়ায়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী পোত জাপান সমুদ্রে মোতায়েন ওয়াশিংটনের অভিপ্রায় প্রকাশ্যে ওপরে নিয়ে এসেছিল যে, মার্কিনিরা এতদঞ্চলে তাদের বৈদেশিক নীতির বাস্তবায়নে তাদের নৌশক্তিকে ব্যবহার করবে। উত্তর কোরীয় রণপোত ‘চেওলান’কে ডুবিয়ে দেয়া এই অভিপ্রায়েরই অংশ। 
এসব ঘটনাপ্রবাহ আবারো ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিদের কূটনীতির অস্ত্র হিসেবে তাদের নৌশক্তি ব্যবহারের বিতর্ককে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। কিন্তু দুই শতাব্দী আগেকার সেই কৌশল আদৌ কি এখন প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পাবে? তারও আগে প্রশ্নÑ গানবোট ডিপ্লোম্যাসির উৎপত্তি কিসে? এবং তা ঘটলে পূর্ব এশিয়ার স্থিতিশীলতায় তার কী প্রভাব পড়বে?
গানবোট ডিপ্লোম্যাসির সারসংক্ষেপ রচিত হয়েছিল ১৮৫০ সালের ডন প্যাসিফিকো ঘটনার মধ্য দিয়ে, যখন ব্রিটিশ রাজকীয় নৌবাহিনী গ্রিক নৌবহরকে লুণ্ঠন করে এবং বন্দরকে অবরুদ্ধ রেখে এক ব্রিটিশ নাগরিক ডন প্যাসিফিকোর বিরুদ্ধে কল্পিত অন্যায়ের ক্ষতিপূরণ দাবি করে। জার্মানরা ১৯১১ সালে গানবোট ‘আগাদির’ পাঠালে মরক্কো সঙ্কটের উদ্ভব ঘটে, যার ফলে ফরাসি কঙ্গো জার্মানদের হাতে চলে যায়। এমন ডিপ্লোম্যাসি এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ইতিহাসকেও রূপদান করে। ১৮৫৩ সালে মার্কিন নৌবাহিনীর কমোডর ম্যাথুপেরি চারটি জাহাজ নিয়ে জাপান উপসাগরে হানা দেয়। এই বাহিনীর অগ্রসর প্রযুক্তি এবং কৌশল তৎকালীন শাসক সোগুনদের ভাবতে বাধ্য করে যে আমেরিকানদের জন্য বাণিজ্যের অনুমতি তাদেরকে দিতেই হবে। 
১৮৯৩ সালের পাকনাম এপিসডে ফরাসিরা তাদের গানবোট নিয়ে ব্যাংককের অদূরে ‘চাও ফ্রাওয়ারা’ নদীতে হানা দিলে থাই রাজকীয় প্রাসাদ অরক্ষিত হয়ে পড়ে। অতঃপর তারা সিয়াম অবরোধ করলে লাওস ফরাসিদের কাছে প্রত্যর্পণ করা হয়। ১৮৩৯ থেকে ’৪২ সাল পর্যন্ত আফিম যুদ্ধের সম্পূর্ণটাই ছিল চীনে পাশ্চাত্য শক্তিদের ভীতিপ্রদর্শনে চীনের কাছ থেকে বাণিজ্যিক ও অন্যান্য সুবিধা আদায়। ১৯০৮ সালে প্রথমবারের মতো সামরিক শক্তির ছত্রছায়ায় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের লুণ্ঠনে আনুষ্ঠানিক অংশ নেয় খোদ যুক্তরাষ্ট্র।
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে গানবোট ডিপ্লোম্যাসির শিকার দেশগুলো পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদীদের কাছ থেকে কালক্রমে এই কৌশল রপ্ত করে। ১৮৭৬ সালে জাপান তার গানবোট হামলা চালায় কোরিয়ার উপকূলবর্তী কিছু কিছু দ্বীপে। সেখান থেকে এরা কতকটা জোরপূর্বক ইনচন, পুসান ইত্যাদি বন্দরে তাদের বাণিজ্যিক ঘাঁটি গড়ে তোলে। 
গানবোট ডিপ্লোম্যাসি আমাদের অনেকের কাছে দূর অতীতের বিষয় মনে হলেও এখন আবার তার প্রত্যাবর্তনের আভাস পাওয়া যায়। অতীতে সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমা শক্তিগুলোর সাথে পশ্চাৎপদ এশিয়া-প্রশান্ত সাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর অনেক পার্থক্য ছিল। তাই সঙ্গত কারণেই এরা গানবোট মহড়ার নীতিতে সাফল্য দেখেছিল। কিন্তু আজকের বিশ্বে এই অসমতা অনেকটাই ঘুচে গেলেও নব্য সাম্রাজ্যবাদীরা এই পুরনো কৌশলের নতুন সংস্করণে এখনো একে কার্যকর করে রেখেছে। কার্যত এশিয়ায় কোনো সময়েই গানবোট ডিপ্লোম্যাসির সম্পূর্ণ পরিসমাপ্তি ঘটেনি। নতুন নতুন আঙ্গিকে তা একই বা নতুন নতুন দেশে প্রয়োগ করা হচ্ছে।
যদিও গানবোট ডিপ্লোম্যাসি পূর্ব এশীয় সমুদ্র থেকে কালেভদ্রে অন্তর্হিত হয়েছে, এ অঞ্চলে এই কৌশলের পুনরাবির্ভাব সমুদ্রের দখল সম্পর্কিত বিবাদে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এর সবচেয়ে বৃহৎ নজির জাপান সমুদ্রে বিমানবাহী রণপোত জর্জ ওয়াশিংটনের উপস্থিতি এবং ২০১০ সালে একই অঞ্চলে Invincible Spirit' শিরোনামের সামরিক মহড়া। এই একই রণপোত একই বছরের মার্চ মাসে দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে যৌথ মহড়ায় পীত সাগরে (yellow sea) ব্যবহার হয়েছিল। উত্তর কোরীয় জাহাজ ‘চেওমান’কে ঘায়েল করার সম্ভাব্য উত্তর কোরীয় প্রত্যাঘাতকে সামাল দিতে এই যৌথ মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই মহড়ায় জর্জ ওয়াশিংটনের সাথে ছিল দু’টি ক্রুজার ও দু’টি ডেস্ট্রয়ার। চীনের তীব্র সমালোচনার তোয়াক্কা করেনি মার্কিনিরা এবং তাদের মিত্ররা।
কিন্তু এ ধরনের গানবোট ডিপ্লোম্যাসিতে শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, ক্রমবর্ধমান এই প্রবণতার সাথে তাল মিলিয়ে চীনও এখন এই খেলায় মেতেছে। শুধু ২০১১ সালেই পিএলএর নৌশাখা ছয়-ছয়টি মহড়া করেছে। চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রকে বাধ্য করেছে এ কথা অস্বীকার করতে যে, মহড়াগুলো মূলত ছিল দক্ষিণ চীন সমুদ্রে আধিপত্য বিস্তারের বিবাদ সম্পর্কিত। ২০১০ সালে জুলাইয়ের শেষ ভাগে চীনা নৌবাহিনীর এ যাবৎকালের বৃহত্তম মহড়াটি হয়েছিল, যাতে চীন লাইভ ফায়ারের (Live Fire) ঝুঁকি নিয়েছিল। চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে পিএলএর চিফ অব স্টাফ চেন বিং এই মহড়া চলার সময় এর প্রতিক্রিয়া জানতে চীনাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণের কথা এবং প্রয়োজনে যুদ্ধকালীন প্রস্তুতির কথাও বলেছেন। উল্লেখ্য, এই গুরুত্বপূর্ণ মহড়াটি অনুষ্ঠিত হয় হিলারি কিনটনের দণি চীন সমুদ্রে নৌচলাচলের স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার মাত্র এক সপ্তাহ পর।
চীন এখন কোনো রাখঢাক না করে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ার বৈরী মন্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রসহ সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে কটাক্ষ করতে ছাড়ছে না। সিনহুয়া পরিবেশিত পিপলস ডেইলিতে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, চীনা নেতৃত্ব প্রতিপক্ষের রণতরীকে ধ্বংস করার ক্ষমতায় প্রত্যয়ী ও দৃঢ়সঙ্কল্প। চীন আরো বলেছে, কেউ যেন চীনা সঙ্কল্পের অবমূল্যায়ন না করে যে তা তার ভৌগোলিক সীমার প্রতি ইঞ্চি সংরক্ষণ করবে এবং এর অন্তর্ভুক্ত দক্ষিণ চীন সমুদ্র। 
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার এবং নিরাপত্তা, রাজনীতি, বৈদেশিক নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক

আসুন কালোকে কালো বলি আর সাদাকে সাদা


॥ গোলাপ মুনীর ॥


যারা আওয়ামী লীগ করেন, তিনি নেতাই হোন কিংবা হোন কর্মী-সমর্থক, তাদের একটি বদ্ধমূল ধারণাÑ তারাই হচ্ছে এ দেশের অভিজাত সম্প্রদায়, বাকিরা সব হীন-নীচু-অস্পৃশ্য। এ দেশে যা কিছু ভালো, তার সবই করেছে এবং করে আওয়ামী লীগ। আর যারা অন্য দল করে তারা কখনোই কোনো ভালো কাজ করতে পারে না। আওয়ামী লীগ মনে করে, সে দলটি যারা করে তারাই এ দেশের মুক্তিযোদ্ধা, বাকিরা স্বাধীনতাবিরোধী। অনেক নেতা আছেন, যারা প্রতিদিন আওয়ামী-বহির্ভূতদের স্বাধীনতাবিরোধী, সন্ত্রাসী, জঙ্গি, সাম্প্রদায়িক, দুর্নীতিবাজ ইত্যাদি বলে কষে গালাগাল না দিলে তাদের পেটের ভাত হজম হয় না। আওয়ামীপন্থীরা স্বীকার করতে চান না, দলমত নির্বিশেষে এ দেশের সর্বস্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে মাত্র ৯ মাসের সশস্ত্র যুদ্ধে অর্জিত হয়েছে আমাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতা। তাই তো এ দেশের সাধারণ মানুষের কাছে যার পরিচয় স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র পর্ব সূচনায় যার অবদান অসমান্তরাল, সেই জিয়াউর রহমানকে আওয়ামী লীগ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেই মানতে নারাজ। আওয়ামী লীগ নেতাদের মুখে তাই আমাদের শুনতে হয়Ñ জিয়া মুক্তিযোদ্ধা নন, স্বাধীনতার ঘোষক নন, ছিলেন পাকিস্তানের চর। ইতিহাস চুরি আর কাকে বলে!
আওয়ামী নেতাদের এ ধরনের একটি ইতিহাস চুরির এক অবাক করা কাণ্ড সম্প্রতি পবিত্র জাতীয় সংসদে ঘটিয়েছেন আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি। তিনি জাতীয় সংসদে বলেছেন, ‘বিএনপি ভারতের সাথে একটিও পানিচুক্তি করতে পারেনি। আওয়ামী লীগ সরকারই প্রথম ভারতের সাথে গঙ্গার পানিচুক্তি করেছে।’ তার এই বক্তব্য শুনে মানুষ হেসেছে। কারণ দেশের মানুষের স্মরণশক্তি এতটা ভোঁতা হয়ে যায়নি যে, বিগত শতাব্দীর সত্তরের দশকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে ভারতের সাথে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তিটির কথা বেমালুম ভুলে যাবে। আমরা শুনে অবাক হই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে দীপু মনি কী করে এমন একটি রাষ্ট্রীয় প্রকাশ্য ও বহুল আলোচিত চুক্তির কথা অস্বীকার করতে পারলেন। আমরা জানি না, এটি তার নির্জলা কোনো মিথ্যাচার, না অজ্ঞতা?
পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি ভুলে গেলেও দেশের মানুষ ভালো করেই জানে, ১৯৭৭ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে একটি চুক্তি হয়েছিল। তাই এ দেশের মানুষ মনে করে, দীপু মনির এ বক্তব্য লাগামছাড়া একটি বক্তব্য। এই লাগামছাড়া বক্তব্য দিতে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের অনেক নেতাই যে বেশ অভ্যস্ত, তা আজ সবাই স্বীকার করেন। সে যা-ই হোক, দীপু মনি জিয়াউর রহমানের আমলে সম্পাদিত যে চুক্তিটির অস্তিত্ব অস্বীকার করতে চাইছেন, সেটিকে এ দেশের মানুষ সবচেয়ে কার্যকর পানিবণ্টন চুক্তি বলেই জানে। কারণ পাঁচ বছর মেয়াদি এ চুক্তিতে গ্যারান্টি কজ অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু দীপু মনি ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার সরকারের আমলে সম্পাদিত যে চুক্তি নিয়ে গর্ব করতে চাইছেন, যে চুক্তিতে যেমনি ছিল না কোনো গ্যারান্টি কজ, তেমনি ছিল অনেক ফাঁকফোকর। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির আরো জানা দরকার, জিয়ার আমলে সম্পাদিত গঙ্গাচুক্তিতে গ্যারান্টি কজ থাকার কারণে তখন বাংলাদেশ এর মাধ্যমে গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় নিশ্চিত করতে পেরেছিল। কিন্তু ১৯৯৬ সালের চুক্তির মাধ্যমে তা নিশ্চিত করা যায়নি এই গ্যারান্টি কজের অভাবে। আমরা আরো জানি, জিয়ার আমলের পাঁচ বছর মেয়াদি চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে জেনারেল এরশাদের আমলে গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে দুইবার ভারতের সাথে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই সমঝোতা স্মারক অনেকটা চুক্তির মতোই। অতএব ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানিবণ্টন ছাড়া বিএনপির আমলে ভারতের সাথে বাংলাদেশের কোনো পানিচুক্তিই হয়নি, এমন বক্তব্য কী করে মেনে নেয়া যেতে পারে!
১৯৭৭ সালটি কোনো দূর অতীত নয়। তখন এই চুক্তির সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন পানি বিশেষজ্ঞ বি এম আব্বাস। তখন পানি বিশেষজ্ঞ হিসেবে তার নাম-ডাক ছিল প্রবাদসম। তিনি ‘ফারাক্কা ব্যারাজ ও বাংলাদেশ’ শিরোনাম দিয়ে একটি বইও লিখে গেছেন। এই বইটিতে ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের করা পানিবণ্টন চুক্তির প্রেক্ষাপটসহ এর বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। আমাদের দীপু মনির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেই বইটির অস্তিত্ব সম্পর্কে জানে না, তেমনটি ভাবতেও অবাক লাগে।
এই বইটিই আমাদের জানিয়ে দেয়, ১৯৭৭ সালের গঙ্গাচুক্তি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। এ চুক্তি সম্ভব হয়েছিল বাংলাদেশ ও ভারতের তদানীন্তন সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং দুই সরকারের প্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান ও মি. মোরারজি দেশাইয়ের ঐকান্তিক ইচ্ছা ও দৃঢ় সঙ্কল্পের জন্য। গঙ্গার পানিবণ্টন বিষয়ে এটিই দুই দেশের মধ্যে প্রথম পানিচুক্তি। চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ইন্দিরা গান্ধী ভারতের ক্ষমতায় ফিরে আসেন। চুক্তিটি নবায়ন করার পরিবর্তে একটি সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে পানিবণ্টন ব্যবস্থা বহাল রাখা হয়। কিন্তু স্মারকলিপিতে বাংলাদেশের প্রাপ্য ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার জন্য যে গ্যারান্টি কজ ছিল তা বাদ দেয়া হয়।
পানি বিশেষজ্ঞ বি এম আব্বাস আমাদের আরো জানিয়েছেন, ১৯৭৪ সালে ফারাক্কার নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর থেকে ভারত গঙ্গার পানি প্রত্যাহার শুরু করে। পরীক্ষামূলক যে ফারাক্কা ব্যারাজ চালু করা হয়, সে বাঁধের মাধ্যমে ভারত একতরফা পানি প্রত্যাহার করতে থাকে। ১৯৭৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের ইন্তেকালের পর বাংলাদেশ সরকারের প্রতিবাদ সত্ত্বেও ভারত পানি প্রত্যাহার পুরোদমেই অব্যাহত রাখে। এতে বাংলাদেশে ১৯৭৬ সালের শুকনো মওসুমে এক গুরুতর অবস্থার সৃষ্টি হয়। এ প্রেক্ষাপটে জেনারেল জিয়াউর রহমান বিষয়টি জাতিসঙ্ঘে নিয়ে যান। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিষয়টি জাতিসঙ্ঘে উত্থাপিত হয়। জাতিসঙ্ঘ বিভিন্ন পর্যায়ে ও কমিটিতে আলোচনার পর কয়েকটি জোটনিরপেক্ষ দেশের মধ্যস্থতায় বাংলাদেশ ও ভারত একটি সমঝোতা বিবৃতিতে সম্মত হয়। ১৯৭৭ সালের ৫ নভেম্বর স্বাক্ষরিত গঙ্গাচুক্তিতে ভারত গঙ্গা নদীর আন্তর্জাতিক চরিত্র স্বীকার করে নেয় এবং আন্তর্জাতিক নদীর পানির সুষম বণ্টনের নীতিতে সম্মত হয়। পাঁচ বছর মেয়াদি এই চুক্তিতে ফারাক্কায় গঙ্গার পানিবণ্টনের স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা ও শুকনো মওসুমে গঙ্গার পানিপ্রবাহ বাড়ানোর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থার বিধান রাখা হয়। বাংলাদেশের পানি পাওয়া নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চুক্তিতে এই মর্মে একটি ধারা সংযুক্ত করা হয়। ফারাক্কায় গঙ্গার পানিপ্রবাহ অস্বাভাবিকভাবে কমে গেলে বাংলাদেশকে যে পানি দেয়া হবে, তা চুক্তিতে নির্দেশিত পরিমাণের ৮০ শতাংশের কম হবে না।
১৯৮০ সালের জানুয়ারি মাসে ভারতের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ইন্দিরা গান্ধীর কংগ্রেস আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে। এই সময়ে পানিবণ্টন নিয়ে ভারতীয় মনোভাব আগের চেয়ে আরো কঠিন হয়। এবং পানি আলোচনায় এক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। ১৯৮১ সালের মে মাসে রাষ্ট্রপতি জিয়া নিহত হন। পরের বছরের ২৪ মার্চ এক রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন। ১৯৭৭ সালের গঙ্গার পানিচুক্তির মেয়াদ শেষ হয় ১৯৮২ সালের ৪ নভেম্বর। 
এই চুক্তিটি আর নবায়ন হয়নি। ১৯৮২ সালের ৭ অক্টোবর নতুন দিল্লিতে ভারত-বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। এই স্মারক পরবর্তী দুই শুকনো মওসুমের জন্য ফারাক্কায় গঙ্গার পানিবণ্টন ব্যবস্থা রাখা হয়। এবং যৌথ নদী কমিশনের ১৮ মাসের মধ্যে গঙ্গার পানিপ্রবাহ বাড়ানোর প্রশ্নেও সুপারিশ পেশের নির্দেশ দেয়া হয়। ১৯৮২ সালের স্মারকের মেয়াদ শেষ হয় ১৯৮৪ সালের ৩১ মে। কিন্তু ভারত তা নবায়নে রাজি হয়নি। উল্টো ১৯৮০ সালের শুকনো মওসুম থেকে ভারত তাদের ইচ্ছেমতো পানি প্রত্যাহার করতে থাকে। তবে এ বছর গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে দ্বিতীয় আরেকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এর পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্বাক্ষরিত হয় পানিবণ্টন সম্পর্কিত সর্বশেষ চুক্তিটি।
এই হলো ভারতের সাথে বাংলাদেশের গঙ্গার পানিবণ্টন সম্পর্কিত সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। এই ইতিহাস অস্বীকার করে দীপু মনি যা করেছেন, তাকে কী বলা যায়? এটি কি কোনো মিথ্যাচার, না, জেনেও না জানার ভান করা? কিন্তু দীপু মনিকে উপলব্ধিতে রাখতে হবে, বাস্তবতাকে অস্বীকার করা, সত্যকে অসত্য বলে প্রমাণ করা, কার্যত নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করারই শামিল।
সম্প্রতি আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে তার এক বক্তব্যের মাধ্যমে বাস্তবতাকেই অস্বীকার করতে দেখা গেছে। তিনি সম্প্রতি বলেছেন, বিএনপি আগামী নির্বাচনে ১০ সিটও পাবে না। এ ধরনের বক্তব্যে বাস্তবতার বিন্দুমাত্র ছোঁয়া যে নেই, তা যে কারো বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব সব সময় দাবি করে, এ দেশে একমাত্র আওয়ামী লীগই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যাবতীয় পদক্ষেপ নেয়, বাকি দলগুলো দেশে নিয়ে আসে অবৈধ, সংবিধানবহির্ভূত সামরিক শাসন। কিন্তু বাস্তবতা আমাদের সামনে হাজির করে অন্য চিত্র। বেগম খালেদা জিয়া যখন বিরামহীনভাবে অবৈধ সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল এরশাদের বিরুদ্ধে প্রায় ৯ বছর একাই লড়াই করে আপসহীন নেত্রীতে পরিণত, তখন শেখ হাসিনা ‘আই অ্যাম নট আনহ্যাপি’ বলে স্বাগত জানিয়েছিলেন এরশাদের ক্ষমতা দখলকে। পাশাপাশি এরশাদ আমলে নির্বাচনে অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগ কার্যত স্বৈরশাসনকেই দীর্ঘায়িত করার সুযোগ করে দিয়েছে। তা ছাড়া শেখ হাসিনা মইনউদ্দিন-ফকরুদ্দীনের অবৈধ সরকারকে বৈধতা দেয়ার ঘোষণা দিয়ে কার্যত গণতন্ত্রকেই ঠেলে দিয়েছিলেন পেছনে। তা ছাড়া আওয়ামী লীগ বাকশালী একনায়কতন্ত্র চালু করেও কি গণতন্ত্রের টুঁটি চেপে ধরেনি?
সুশাসন প্রতিষ্ঠার দাবিদার আওয়ামী লীগের বর্তমান সরকার কতটুকু সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে, তা এ দেশের মানুষ দেখে চলেছে। গলাবাজি, দখলবাজি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দলবাজি কোন মাত্রায় কতটুকু চলছে, তা মাপার ক্ষমতা এ দেশের মানুষ রাখে। 
মানুষ বোঝে এ সরকার মৌল সমস্যা সমাধানে মনোযোগী না। মনোযোগী শুধু স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে। যদি তা না হতো, আজ আমাদের এমন সব খবর পড়তে হতো না যেÑ দেশের ৫০ শতাংশ শিশু মারা যাচ্ছে পুষ্টির অভাবে; প্রাকৃতিক দুর্যোগ এলাকায় ভাত নেই, পানি নেই সর্বত্র হাহাকার; বাজার চলে গেছে সিন্ডিকেটের দখলে, মন্ত্রী-সচিবের দুর্নীতির কারণে বন্ধ হলো পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ইত্যাদি ধরনের হাজারো উদ্বেগজনক খবরের শিরোনাম।
আসলে যেকোনো সরকারের সাফল্য নির্ভর করে, সে সরকার কতটুকু বাস্তবতা স্বীকার করতে প্রস্তুত, সে সরকার কালোকে কালো আর সাদাকে সাদা বলতে চায় কি না, সে সরকার সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী চিন্তাধারা থেকে কতটুকু ওপরে উঠতে পারল; সে সরকার জনগণকে কতটুকু আস্থার মধ্যে রাখতে পারল এবং সর্বোপরি সে সরকারের উপলব্ধিতে দেশ-জাতি-সমাজচিন্তা কতটুকু প্রবল ইত্যাদির ওপর। অন্য কিছুর ওপর নয়। তাই আসুন কালোকে কালো বলি, আর সাদাকে সাদা। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : এ দেশবাসীর উন্নয়নে যার অবদান অতুলনীয়



ডাঃ সুলতান আহমদ   :
 ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা দিবস। ১৯২১ সালে এই দিনে অনেক বাধাবিপত্তি তথা ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে জাতির কিছু ত্যাগী কর্মবীরের কর্ম প্রচেষ্টা ও ত্যাগের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এ দেশবাসীর উন্নয়নে অত্র বিশ্ববিদ্যালয় বলতে গেলে একক ও অতুলনীয় অবদান রেখে চলছে। আজ যে সমস্ত জ্ঞানী-গুণীজন দেশ ও জাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রেখে যাচ্ছেন তাদের অধিকাংশই অত্র বিশ্ববিদ্যালয় হতে জ্ঞানের আলোকপ্রাপ্ত। অতীতেও অবস্থা একই রকম ছিল। একটা পশ্চাদপদ ও অনুন্নত জাতির উন্নতি ও অগ্রগতিতে একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কত বড় ভূমিকা রাখতে পারে তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকগণ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। যেমন ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা যুদ্ধে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তবে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস সম্পর্কে জাতির নতুন প্রজন্মকে বলা চলে অন্ধকারে রাখা হচ্ছে। মনে হয় এটা করা হচ্ছে অনেকটা ইচ্ছাকৃতভাবেই। বিশেষ করে অত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক পটভূমি সাধারণ মানুষ তো বটেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষকদেরও অনেকের অজানা। তৎকালীন ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা এবং বিশেষ করে তখনকার অবহেলিত ও বঞ্চিত পূর্ব বাংলার জনগণের স্বার্থে ঢাকাতে একটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে আমাদের কিছু দেশ প্রেমিক রাজনৈতিক নেতা ও সমাজ সেবককে কত কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছিল তা আমাদের অজানা। এমনকি জাতি আজ তাদের নামটা পর্যন্ত ভুলতে বসেছে। এটা দেশ ও জাতির জন্য কখনও মংগলজনক হতে পারে না।
যাহোক ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজুদ্দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে বাংলার অধঃপতনের যুগ শুরু হয়। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ১৯০ বছর ইংরেজগণ এদেশ শাসন করেছে। যেহেতু ইংরেজগণ মুসলিম শাসককে পরাজিত করে এদেশে তাদের সাম্রাজ্য বিস্তারের সূচনা করে তাই মুসলিম জাতির  প্রতি ছিল তাদের সন্দেহ ও আক্রোশ। তদ্রূপ মুসলমানগণ ও ইংরেজদেরকে ঘৃণা ও বিদ্বেষের দৃষ্টিতে দেখত বলে তাদের বিরুদ্ধে সর্বদা সংগ্রাম করে যেতে থাকে। ফলে এই দুই জাতির মধ্যে মারাত্মক ব্যবধান সৃষ্টি হয়। এ সুযোগ গ্রহণ করে এদেশের হিন্দু সম্প্রদায় সর্ব ক্ষেত্রে অগ্রসর হতে থাকে। বিশেষ করে ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা চালু হলে মুসলমানগণ চিরস্থায়ীভাবে বঞ্চিত ও অবহেলিত হতে থাকে। এ অবস্থা দীর্ঘ দিন চলতে থাকে এবং মুসলমানগণ অধঃপতনের চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এরই মাঝে ফকির বিদ্রোহ, নীলবিদ্রোহ, হাজী শরীয়তুল্লাহর ফরাজী আন্দোলন বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত হয় এবং সর্বশেষে ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহ ইংরেজ বিতাড়নে প্রায় সাফল্যের দ্বার প্রান্তে পৌঁছেছিল। এ সকল বিদ্রোহেই নেতৃত্ব দিয়েছিল মুসলমানগণ। ফলে তাদের প্রতি ইংরেজদের আক্রোশ আরও বেড়ে যায় এবং মুসলমানদের দুঃখ-দুঃর্দশা আরও বৃদ্ধি পেতে থাকে।
এরই ধারাবাহিকতায় পূর্ব বাংলার অধঃপতিত জনগণের উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের আমলে বঙ্গভঙ্গ করে পূর্ব বাংলা ও আসামকে নিয়ে ঢাকাকে রাজধানী করে একটা নতুন প্রদেশ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়া হয়। যেহেতু এ ব্যবস্থায় পূর্ব বাংলার জনগণের উন্নতি হবে বলে ধরে নেয়া হয় এবং পূর্ববাংলার অধিকাংশ জনগণ ছিল মুসলমান, তাই হিন্দু সম্প্রদায় এ ব্যবস্থা মেনে নিতে পারে না। বরং বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য ব্যাপক আন্দোলন শুরু করে। এমনকি হিন্দু বুদ্ধিজীবীগণ স্বীয় শ্রেণীস্বার্থে ও গোষ্ঠীস্বার্থে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে বাঙালী হিন্দু যুব সমাজকে ইংরেজবিরোধী সন্ত্রাসী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য ইন্ধন জোগায়। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও বংভংগের বিপক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা হলে হিন্দু সম্প্রদায় বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনে সারা পূর্ববাংলা ও আসামের রাজনৈতিক অংগন উত্তপ্ত করে তোলে। বিশেষ করে হিন্দু জমিদারগণ এ আন্দোলনে প্রত্যক্ষ মদদ দান করে। অপরপক্ষে স্বাভাবিক কারণেই পূর্ব বাংলা ও আসামের মুসলমানগণ বংগভংগের কারণে আনন্দিত হয়। ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ‘‘ঢাকা মোহামেডান প্রভিন্সিয়াল ইউনিয়ন’’ নামে একটা মুসলিম প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়। নয়া প্রদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে জাতীয় ও রাজনৈতিক চিন্তাধারার বিকাশই ছিলো এই সংস্থার মুখ্য উদ্দেশ্য। সমস্ত মুসলমান জনগোষ্ঠী এমনকি ভারতের অন্যান্য প্রদেশের মুসলমান জনগোষ্ঠীও বংগভংগের ব্যবস্থাপনার সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন। এ ধরনের এক চরম নৈরাজ্য কর ঐতিহাসিক পটভূমিতে সদ্য ইংরেজী শিক্ষিত বাঙালী মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণী যে স্বাভাবিকভাবেই বঙ্গভঙ্গের প্রতি সমর্থনের হাত সম্প্রসারিত করেছিলো তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু অদৃষ্টের পরিহাস, ঘটনা প্রবাহ এমন দিকে গড়ালো যে, ইংরেজদের অনিচ্ছা সত্ত্বেবও ১৯১১ সালের ডিসেম্বরে নতুন সরকারি সিদ্ধান্তে ‘বংগভংগ রদ' হয়ে পুনরায় যুক্তবাংলা ঘোষিত হল।
অনেকের মতে, বংগভংগের পক্ষে ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ এবং ময়মনসিংহের নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী যতটা আন্তরিক ছিলেন তৎকালীন অন্যান্য মুসলিম নেতৃবৃন্দ ততটা আন্তরিক ছিলেন না। বিশেষ করে আগা খানের ভূমিকা ছিলো এক্ষেত্রে সন্দেহজনক। ঘটনা প্রবাহের মাঝে ১৯০৬ সালে ঢাকায় ‘মুসলিম লীগ' নামক সংগঠনের জন্ম হয়। বংগভংগ রদ হওয়ার কারণে মুসলমান সমাজের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। বংগভংগের ফলে মুসলমানগণ বৃটিশ শাসনের সমর্থকে পরিণত হয়। কিন্তু বংভংগ সিদ্ধান্ত বাতিল হওয়ায় তাদের মনে হতাশা দেখা দেয়। ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ সবচেয়ে বেশি মর্মাহত হন। চতুর ইংরেজ শাসক গোষ্ঠী মুসলমানদের এ মনোভাব আঁচ করতে পেরে তাদের সান্ত্বনা দেয়ার উদ্দেশ্য ক্ষতিপূরণস্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন কমিটি গঠন করে। ১৯২৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বাংলার গবর্নর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর লর্ড লিটন ১৯২২ সালের ‘স্নাতক ডিগ্রি' প্রাপ্ত ছাত্রদের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বলেন, "I have already stated in public that in my opinion this university is Dacca's greatest possession and will do more than anything else to increase and spread the fame of Dacca beyond the limits of Bengal or even of India itself". এখানে উল্লেখ্য যে, তদানীন্তন বৃটিশ সরকার পূর্ব বাংলার মুসলমানদের খুশি করা তথা তাদের আর্থ-সামাজিক ও শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য আগ্রহী থাকলেও বর্ণহিন্দু নেতৃবৃন্দের এ কাজে সর্বদা বাধা সৃষ্টির কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরও ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হতে অনেক সময় লাগে।
বঙ্গভঙ্গের ফলে মুসলমানদের অসন্তুষ্টি দূরীকরণ তথা মুসলমানদের ক্রম অগ্রসরমান আন্দোলন প্রশমনের জন্য বিভিন্ন প্রচেষ্টা বৃটিশ কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করেন। তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকায় এসে মুসলিম নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনায় বসতে আগ্রহী হন। এ সময় নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, শেরে বাংলা এ. কে ফজলুল হক প্রমুখ মুসলিম নেতৃবৃন্দের একটি দল ভাইসরয়ের সাথে দেখা করে বিভিন্ন আলাপ-আলোচনার মাঝে ঢাকায় অন্ততঃ একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ত্বড়িত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। সরকার তাদের দাবি মেনে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণে তৎপর হয়। কিন্তু বর্ণহিন্দুগণ দারুণ বাধার সৃষ্টি করে এমনকি ১৯১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ড: রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে একটি হিন্দু প্রতিনিধি দল ভাইসরয়ের সাথে দেখা করে, বলেন, "The creation of a separate University at Dacca would be in the nature of an internal partition of Bengal". এমনকি তারা আরও অভিমত প্রকাশ করেন যে, "The Muslims of Eastern Bengal were in large majority cultivators and they would be benefited in no way by the foundation of a University". তবে এসব বলে তারা লর্ড হার্ডিঞ্জের ধারণা পাল্টাতে সক্ষম হননি। ফলে ভারত সরকার ১৯১২ সালের ৪ এপ্রিল এক পত্রে বাংলা সরকারকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য আর্থিক খতিয়ানসহ একটি পরিপূর্ণ স্কীম প্রণয়নের নির্দেশ প্রদান করেন। ভারত সরকারের এ পত্রে এই মর্মে একটি নির্দেশও ছিল যাতে শিক্ষা ক্ষেত্রে মুসলমানদের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য বজায় থাকে এবং মুসলমান ছাত্ররা নিজেদের ধর্মীয় তাহজীব ও তমদ্দুন রক্ষায় সফল হয়। সেই লক্ষ্যে বলা হয়: "There might be a faculty of Arabic and Islamic Studies in the University".
পরবর্তীতে ১৯১২ সালের ২৭ মে ব্যারিস্টার আর নাথনিয়েলের নেতৃত্বে ১৩ সদস্য বিশিষ্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন কমিটি গঠিত হয়। নাথান কমিটি শেষ পর্যন্ত একটা পূর্ণাংগ রিপোর্ট সরকারের নিকট পেশ করেন যা ১৯১৩ সালে সর্ব সাধারণের জন্য প্রকাশ করা হয় এবং ঐ বছরের ডিসেম্বরে তা ভারত সরকার কর্তৃক চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়। কিন্তু ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে নানা কারণে বিশেষ করে আর্থিক সংকটের কারণে স্কীমটি বাস্তবায়ন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। পরে ভারত সরকারের প্রস্তাবে একটা সংশোধিত সর্বনিম্ন খরচের স্কীম পেশ হলে তা গৃহীত হয়। নানা কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ বিলম্বিত হতে থাকলে মুসলিম নেতৃবৃন্দের মনে সন্দেহের সৃষ্টি হতে থাকে। ফলে নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী বিষয়টি ভারতীয় আইন পরিষদে উত্থাপন করেন এবং সরকারের পক্ষ হতে তাদের সদিচ্ছার কথা পূনব্যক্ত করা হয়।
পরবর্তী পর্যায়ে নাথান কমিটি এবং ইতোমধ্যে গঠিত কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন যৌথভাবে মত পোষণ করে যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি সরকার শাসিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হবে না বরং তা হবে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। ভারত ও বাংলা সরকার এবং নাথান কমিটি এ মর্মে ঐকমত্য পোষণ করে যে, ঢাকা বিশ্বববিদ্যালয় সব জাতির ও শ্রেণীর ছাত্রদের জ্ঞান আহরণের জন্য উম্মুক্ত থাকবে। তবে মুসলমান ছাত্রদের জন্য সেখানে একটি আরবী ও ইসলামী শিক্ষা বিভাগ খোলা হবে। কমিশনের মতে, "We do not forget that the creation of the University was largely due to the demand of the Muslim community of Eastern Bengal for greater facilities for higher education." এ সময় শিক্ষা ক্ষেত্রে মুসলমানগণ এত পশ্চাৎপদ ছিল যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কিত কমিটিগুলোতে সদস্য করার মত মুসলিম শিক্ষাবিদ পাওয়া ছিল দুষ্কর। ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে এতদাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠে কলকাতাকে কেন্দ্র করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা কালে পূর্ব বংগে মুষ্টিমেয় কয়েকটা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল এবং যেগুলো প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হত হিন্দু জমিদারদের দ্বারা। ফলে এ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুসলমান ছাত্রদের সুযোগ-সুবিধা ছিল খুবই সীমিত। বাংলার মুসলিম সমাজ শিক্ষা-দীক্ষা জ্ঞান গরিমায় সামনে অগ্রসর হউক তা বাংলার বর্ণহিন্দু শ্রেণীর বরদাশত হচ্ছিল না। ফলে তারা বংগ ভংগ রদ করেই সন্তুষ্ট হতে পারেনি বরং ঢাকাতে একটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তারা দারুণভাবে বিরোধিতা করে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরেও তারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে বলতো: "Dacca University is Mecca University; fucca (hollow) University".
যাহোক শত বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে বাংলার অবহেলিত বঞ্চিত মানুষেরা বিশেষ করে মুসলমানরা তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ে সক্ষম হয় এবং ১৯২১ সালের ১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ৩টি অনুষদ ও ১২টি বিভাগ নিয়ে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জন্ম নেয় তা ফলে-ফুলে সুশোভিত হয়ে আজ বিরাট মহীরুহে পরিণত হয়েছে। কায়েমী স্বার্থবাদীদের সমস্ত ভবিষ্যদ্বাণীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাভ করেছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খ্যাতি, যশ ও মান। তাইতো একে বলা হয় ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড'। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর নিয়োগ প্রাপ্ত হন মি. পি. জে. হারটগ সি.আই.ই। প্রথম রেজিস্ট্রার হিসাবে নিয়োগ পান খান বাহাদুর নাজির উদ্দিন আহমদ এবং প্রথম ট্রেজারার নিযুক্ত হন মি. জে. এইচ. লিনডসে আই.সি.এস। একটা উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হয় যেখানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিগণ স্থান পায়। শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন দেশী-বিদেশী নামকরা শিক্ষাবিদগণ যাদের অধিকাংশই ছিলেন অমুসলিম। বিভিন্ন ধার করা ভবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শুরু হয়। প্রায় ৬০০ একর জমির উপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত। শুরুতে তিনটি হলের ব্যবস্থা করা হয় যেমন ঢাকা হল, মুসলিম হল ও জগন্নাথ হল।
পরবর্তী ইতিহাস আমাদের সকলের কম-বেশি জানা। আজ পর্যন্ত এ বিশ্ববিদ্যালয় বৃটিশ যুগ এবং পাকিস্তানী আমল পার হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বুকে বসে দেশ ও জাতির খেদমত করে যাচ্ছে। ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ভাষা আন্দোলনসহ সর্বশেষ ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে অনন্য ভূমিকা। তবে ইদানীং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নানা কারণে অতীত ঐতিহ্য পুরোপুরি রক্ষা করতে পারছে না। এ ব্যাপারে আমাদের সকলের দলমত, জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে এগিয়ে আসা দরকার। যাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অতীত গৌরব পুনরুদ্ধার করতে পারে।

পলাশী থেকে মুর্শিদাবাদ ২৩শে জুন এবং ২রা জুলাই'র কথকতা


সাজজাদ হোসাইন খান

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর উদ্যোগে প্রথম পলাশী দিবস উদযাপিত হয়েছিল কলকাতায়। সাথে ছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং মওলানা আকরম খাঁ। এ ব্যাপারে কবি নজরুলের একটি বিবৃতি প্রকাশ পেয়েছিল দৈনিক আজাদ এবং মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় ১৯৩৯ সালের জুনে। বিবৃতিতে নজরুলের আহবান ছিল ‘মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর নেতৃত্বে কলিকাতায় সিরাজউদ্দৌলা স্মৃতি কমিটি উক্ত অনুষ্ঠানকে সাফল্যমন্ডিত করিবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করিতেছেন। কলিকাতা কমিটিকে সর্বপ্রকার সাহায্য প্রদান করিয়া আমাদের জাতীয় বীরের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করিবার জন্য আমি জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলের নিকট আবেদন জানাইতেছি। বিদেশীর বন্ধন-শৃক্মখল হইতে মুক্তি লাভের জন্য আজ আমরা সংগ্রামে রত। সিরাজের জীবনস্মৃতি হইতে যেন আমরা অনুপ্রাণিত হই। ইহাই আমার প্রার্থনা'। (২৯.০৬.১৯৩৯)।
এই প্রার্থনা বিফলে যায়নি। পলাশী দিবস প্রতি বছরই আসে। কখনো সরবে কখনো নীরবে। জাতীয় বীর সিরাজউদ্দৌলাকে স্মরণ করে অনুপ্রাণিত হয়, ব্যথিত হয়। একথা সত্য, নবাব সিরাজ ইতিহাসের এক ভাগ্যাহত বীর, দেশপ্রেমিক। চতুর্মুখি ষড়যন্ত্র তার উত্থানকে ব্যাহত করেছিল।
পরিশেষে করুণ পরিণতি। সিরাজকে হত্যা করা হয় ২রা জুন। এই হত্যাকান্ডের সাথে সাথে বাংলার স্বাধীনতার ঘটে অবসান। যা উদ্ধারে সময় ব্যয় হয়েছিল প্রায় দু'শ বছর। পলাশীর দুর্বিপাক এবং সিরাজ উৎখাতের সাথে যেসব বিশ্বাসঘাতক জড়িত ছিল তাদের প্রায় প্রত্যেকেরই অপঘাতে মৃত্যু হয়েছিল। জীবনকালেই নানা গঞ্জনা-লাঞ্ছনার ঘূর্ণিপাক তাদের গ্রাস করেছিল। ইতিহাস এমন সত্যকেই উপস্থিত করেছে। বিশ্বাস-হন্তারকদের পরিণতি শুভ হয় না কখনো। দেশ এবং দেশের মানুষকে যারা প্রতারিত করে আখেরে তারা নিজেরাই প্রতারণার ফাঁদে আটকা পড়ে। কিন্তু ইতিহাসের এমন প্রমাণকে অনেকেই আমলে আনতে চায় না। যদিও শতাব্দীর পর শতাব্দী এই জাতীয় ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছে পৃথিবীর মানুষ। বাংলার স্বাধীনতাকে যেসব কুলাঙ্গার বিদেশিদের হাতে সমর্পণ করেছিল নানা কায়দা-কৌশল করে, তাদের প্রতি দেশবাসীর ঘৃণা আর ধিক্কার জুটেছিল অবশেষে। হয়তো এই ধিক্কার এবং ঘৃণা কেয়ামত পর্যন্ত জারি থাকবে। আসলে সর্বকালেই বিশ্বাস হন্তারকদের ভাগ্যে এমনটাই ঘটে। কেউ অনুভব করে কেউ করতে চায় না।
সিরাজউদ্দৌলা বাঙালি ছিলেন না বিদেশি ছিলেন, সাম্প্রতিক কিছু লেখায় এমন প্রশ্নের অবতারণা করেছেন দু'একজন। স্বাভাবিক নিয়মেই প্রশ্ন আসে, ভারত উপমহাদেশের কত সংখ্যক মানুষের স্থায়ী বসতি ছিল এখানে? অধিকাংশ লোকই তো বাইরে থেকে আসা। বিশেষ করে মুসলিম জনগোষ্ঠী। এরা এখানে এসেছে শাসন করেছে। বিয়ে-শাদি করেছে, সন্তান-সন্তুতি নিয়ে বসবাস করেছে। তাদের শেষ আশ্রয়ও এ মাটিতেই। নবাব সিরাজউদ্দৌলাও এদেরই একজন। ব্যতিক্রম কেবল বৃটিশ। এরা এসে সম্পদ লুণ্ঠন করে আবার নিজ দেশে ফিরে গেছে ধন-সম্পদ নিয়ে। এই যে বাংলা, বাংলাদেশের নামকরণ এবং সীমা সহরতওতো করেছিলেন সুলতান ফখরউদ্দিন মুবারক শাহ। তা-ও ১৩৩৮ সালের দিকে। তার রাজ্যের নাম ছিল সুবেহ বাঙ্গালা। তিনি বিশ্বদরবারে নিজেকে পরিচিত করেছিলেন শাহে বাঙ্গালা নামে। তাহলে বাঙালি অবাঙালির ফারাকটা কোথায় গিয়ে ঠেকল? নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে যারা বাঙালি-অবাঙালির বেড়াজালে ফেলতে চায় তারা আসলে মীরজাফর-জগৎশেঠদেরই উত্তরপ্রজন্ম। ক্লাইভ-হেস্টিংসদের তল্পিবাহক। নবাব সিরাজ ছিলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব। তিনি বাংলাকে ভালবেসেছিলেন, এদেশের মানুষকে ভালবেসেছিলেন। এদেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছিলেন এটিই ইতিহাসের চরম সত্য। পরবর্তী সময় ইংরেজদের বেতনভুক কিছু কর্মচারী-চাটুকার ইতিহাস রচনা করেছিলেন, যে ইতিহাসে নবাবকে ‘অপরিণামদর্শী চরিত্রহীন' ইত্যাকার বিশেষণে বিশেষায়িত করা হয়েছে। যার ধারাবাহিকতা অদ্যাবধি চলমান।'
রজতকান্তি রায় ‘পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ' শিরোনামে একটি পুস্তক রচনা করেছেন। প্রচুর পরিশ্রম করেছেন, সময় ব্যয় তো অবশ্যই হয়েছে। তবে রজত বাবু পূর্বসুরীদের পদাংকই অনুসরণ করেছেন তার সমগ্র গবেষণায়(?)। এসব পুস্তক রচনার একমাত্র উদ্দেশ্যই যেন সিরাজ-সিরাজের গোটা পরিবারের চরিত্র হনন। রজত বাবুও ইনিয়ে বিনিয়ে কায়দা কৌশলে এই ‘মহত' কর্মটি করেছেন। পলাশী ষড়যন্ত্রের মূল চক্রান্তকারী জগৎশেঠকে তিনি ‘ঋষি-যুধিষ্ঠি' রূপে চিহ্নিত করেছেন। তিনি লিখেছেন-দেওয়ানী বিভাগের প্রভাবশালী হিন্দু মুৎসুদ্দিয়ান এবং মুর্শিদাবাদ খাজাঞ্চীখানার অধিপতি জগৎশেঠ পরিবার আদপেই কোম্পানীর ধামাধরা ছিলেন না।' চমৎকার গবেষণা তো বটেই। রজত বাবু নবাব সিরাজের চরিত্রের উপর রাজ্যের কলঙ্ক চাপিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হননি, সিরাজের আম্মা আমেনা বেগমের চরিত্র হননেও যথেষ্ট মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। তিনি লিখছেন-গহসেটি বেগম তাঁর প্রণয়ের পাত্র হোসেন কুলী খানের উপরে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন। হোসেন কুলী খানের অপরাধ তিনি গহসেটি বেগমকে ত্যাগ করে তার ছোট বোন আমিনা বেগমের কাছে যাতায়াত শুরু করেছেন।' রজত বাবু আমেনা বেগমের পরিচয় প্রকাশ করতেও আগ্রহের আতিশয্য দেখিয়েছেন। আমেনা বেগম কে? ‘আমিনা বেগম সিরাজের মা।' এগুলো আসলে রজত বাবুদের স্বভাবজাত অভ্যাস। সিরাজের প্রতি রাগ-গোস্যা থেকে উদ্গত। রায়দুর্লভ, জগৎশেঠ হতে শুরু করে আজকের রজতকান্তি রায়দের চেহারা স্বভাবে তেমন কোন পরিবর্তন লক্ষ্যযোগ্য হচ্ছে না। ক্লাইভের তস্য প্রজন্মরূপেই যেন এদের উপস্থিতি এবং উপছায়া। নবাব সিরাজের চরিত্র হনন করে এমন তথাকথিত গবেষণা পুস্তক রচিত হয়েছে অনেক। বিদ্বেষপ্রসূত হয়ে বা বিভ্রান্ত হয়ে যারাই সিরাজকে কলঙ্কিত করেছে শেষাবধি এরা নিজেরাই লজ্জিত হয়েছে, অপদস্থ হয়েছে। ইংরেজদের বিষয়ে নবাব সিরাজউদ্দৌলা নাকি প্রায়শই বলতেন, ‘এদের শায়েস্তা করতে হলে একজোড়া পয়জার চাই, আর কিছু না'। নবাব সিরাজ যদি জীবিতাবস্থায় তাঁকে নিয়ে অর্বাচীনদের রচিত পুস্তকসমূহ পাঠ করার সুযোগ পেতেন তবে হয়তো তিনি এদের ব্যাপারেও উচ্চারণ করতেন -এইসব তথাকথিত গবেষকদের(?) শায়েস্তা করতে হলে একজোড়া পয়জার চাই। অর্থাৎ একজোড়া চটি।
বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার বংশধরগণ এখন ঢাকায়। এটি একটি আনন্দের বার্তা। আনন্দের বার্তা এজন্যে যে তারা ঢাকায় বসবাস করছেন। খোদানাখাস্ত যদি তারা কলকাতা বা ভারতের কোন এলাকায় বসবাস করতেন তবে তাদের অস্তিত্ব নিয়েই সংশয় দেখা দিত। কয়েক বছর আগে পত্রিকায় এসেছিল মহিশূরের বাঘ টিপুর বংশধররা এখন কলকাতায় রিকশা চালক। সে সব এলাকায় এরকম আরো অনেক ঐতিহ্যমন্ডিত পরিবার ধ্বংসের দরজায় উপনীত। সৌভাগ্য যে, নবাব সিরাজের পরিবার মূল বাংলার নাগরিক। যে বাংলার শাসক ছিলেন তাদেরই পূর্বপুরুষ নবাব সিরাজউদ্দৌলা জং বাহাদুর। নবাব সিরাজ তো কেবল বাংলাই নয় বিহার এবং উড়িষ্যারও নবাব ছিলেন। বিহার ও উড়িষ্যায় সিরাজের অবস্থান কতটুকু? নবাব সিরাজের শাহাদাত দিবস আজ। সিরাজকে স্মরণ করলে বিশ্বাসঘাতকদের চেহারা উন্মোচিত হয়। স্বাধীনতার দুশমনদের চিহ্নিত করা যায়। তাই যত অধিক নবাব সিরাজকে স্মরণে আনা যায় ততই মঙ্গল।

পদ্মা সেতু প্রকল্প বৃত্তান্ত


জামিলুর রেজা চৌধুরী
পদ্মা সেতু প্রকল্পে ঠিকাদারের প্রাক-যোগ্যতা মূল্যায়নে 'কোয়ালিটি অ্যান্ড কস্ট বেইজড সিলেকশন' পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় বিশ্বব্যাংকের গাইডলাইন অনুসারেই। ওইখানে কারিগরি মূল্যায়নের ওপর শতকরা ৯০ ভাগ 'ওয়েইটেজ' এবং ভিন্ন একটি খামে জমা দেওয়া আর্থিক প্রস্তাবের মূল্যায়নের ওপর শতকরা ১০ ভাগ ওয়েইটেজের মূল্যায়ন করা হয়। যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব জমা দিয়েছিল তাদের উপস্থিতিতেই কারিগরি মূল্যায়ন প্রদত্ত নম্বর ঘোষণা করা হয় এবং আংশিক প্রস্তাব ও খামগুলো খুলে সবাইকে
জানিয়ে দেওয়া হয়

পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংকের আকস্মিক সরে যাওয়া নিয়ে ইতিমধ্যে সংবাদমাধ্যমে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের তরফেও কম কথাবার্তা হয়নি। আমি আর সেগুলোর পুনরাবৃত্তি করতে চাই না। কোনো বিচার-বিশ্লেষণও নয়। কারিগরি পর্যায়ে যুক্ত থাকার সুবাদে প্রকল্পটিকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখার সুযোগ হয়েছে। সে ব্যাপারেই দু'চার কথা।
২০০৭ সালে প্রস্তাবিত পদ্মা সেতুর নকশা প্রণয়নের জন্য এডিবি (এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক) বাংলাদেশ সরকারকে কারিগরি সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ এবং এ লক্ষ্যে পরামর্শকদের কাছ থেকে প্রস্তাব আহ্বান করে। এতে বিভিন্ন দেশের ছয়টি খ্যাতনামা প্রকৌশলী পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দাখিল করে এবং ফিলিপাইনের ম্যানিলায় অবস্থিত সদর দফতরে বসে এডিবি নিজেই এ প্রস্তাবগুলো মূল্যায়ন করে। একই সময় বাংলাদেশ সরকার একটি বিশেষজ্ঞ দল নিয়োগ এবং সমান্তরালভাবে ওইসব প্রস্তাব এডিবির গাইডলাইন অনুসারে মূল্যায়ন করতে থাকে। আমাদের মূল্যায়নে এডিবির মূল্যায়ন সমীক্ষায় কিছু ভুলত্রুটি ধরা পড়ে এবং তা চিহ্নিত করায় এডিবি তাদের মূল্যায়ন প্রতিবেদন সংশোধন করে। এরই ভিত্তিতে নিউজিল্যান্ডের একটি প্রতিষ্ঠান মনসেল, কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠান নর্থ-ওয়েস্ট হাইড্রোলিক ও অস্ট্রেলিয়ার প্রতিষ্ঠান স্মাক পরামর্শক নির্বাচিত হয়।
বর্তমান সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই পরামর্শক সম্পর্কিত মূল্যায়ন প্রতিবেদনটি অনুমোদন করে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেয়। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, এ ধরনের একটি জটিল ও বৃহৎ প্রকল্পে ডিজাইনের আগে প্রচুর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং তা বিশ্লেষণ করে ডিজাইন প্রণয়ন করতে হয়। এই প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন করে ২০১০ সালের মাঝামাঝি সেতুর ড্রইং প্রণয়ন শুরু করা হয়। একই সঙ্গে প্রকল্পের বিভিন্ন প্যাকেজের জন্য ঠিকাদারদের প্রাক-যোগ্যতা নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। এই বিভিন্ন প্যাকেজের প্রাক-যোগ্যতার ক্রাইটেরিয়া নির্ধারণের সময় বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) সঙ্গে অনেক আলোচনা করে চূড়ান্ত করা হয়।
এদিকে ২০০৯ সালের মাঝামাঝি এই প্রকল্পের বিভিন্ন কারিগরি দিক নিয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য একটি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেল নিয়োগ করা হয়। এর অন্তর্ভুক্ত ১০ বিশেষজ্ঞের মধ্যে তিনজন জাপানি বিশেষজ্ঞ, একজন হল্যান্ডের বিশেষজ্ঞ, একজন নরওয়েজিয়ান বিশেষজ্ঞ এবং বাকি পাঁচজন বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ।
ডিজাইন পরামর্শক সংস্থা যে প্রতিবেদনগুলো বিভিন্ন সময় সরকারের কাছে জমা দেয়, তা পর্যালোচনা করে এই বিশেষজ্ঞ প্যানেল তাদের মতামত দেয়। এই মতামতের ভিত্তিতে ২০১১ সালের মাঝামাঝির দিকে ডিজাইনটি প্রায় চূড়ান্ত করা হয়। প্রাক-যোগ্যতা নির্ধারণের জন্য সরকার আরেকটি কমিটি করে, যাদের সুপারিশমালা বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাইকা অনুমোদন করে।
এদিকে এই প্রকল্পের পরিবেশগত সমীক্ষা এবং অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়ন করা হয়। প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন করা হয়। মূল সেতুর ঠিকাদারের প্রাক-যোগ্যতা নির্ধারণে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ডিজাইন কনসালট্যান্ট ও বাংলাদেশের প্রাক-যোগ্যতা মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশে মতভেদ দেখা দেয়। মূলত একটি চীনা কোম্পানিকে কেন প্রাক-যোগ্য বিবেচনা করা হয়নি, সে বিষয়ে বিশ্বব্যাংক বারবার জানতে চায় এবং তাদের প্রাক-যোগ্য ঘোষণার জন্য সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করে। কিন্তু তাদের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ কমিটি প্রমাণ করতে সক্ষম হয়, তারা যে অভিজ্ঞতা সনদ প্রস্তাবের সঙ্গে জমা দিয়েছে তা ভুয়া।
তারা বলেছিল যে, চীনের একটি সেতুতে তারা ইস্পাতের পাইল ব্যবহার করেছে। এর সমর্থনে তারা একটি আলোকচিত্রও জমা দেয়। পরে দেখা যায়, আলোকচিত্রের সেতুটি আসলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত। এ ধরনের জালিয়াতি ধরা পড়ার পরদিন আমরা কিছু জানানোর আগেই তারা চিঠি দিয়ে প্রকল্প থেকে নিজেদের প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেয়। এরপরই বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সরকারের কমিটির সুপারিশকৃত প্রাক-যোগ্য ঠিকাদারদের তালিকা লিখিতভাবে অনুমোদন করে।
একইভাবে নদী শাসনের ঠিকাদারদের প্রাক-যোগ্যতা তালিকায় ডিজাইন কনসালট্যান্ট ও বাংলাদেশ সরকারের কমিটির সুপারিশের সঙ্গে বিশ্বব্যাংক দ্বিমত পোষণ করে। বিশ্বব্যাংকের সুপারিশ অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকারের তিনজন বিশেষজ্ঞ চীনের প্রকল্পগুলো সরেজমিন পরিদর্শন করে কোম্পানিগুলোর প্রদত্ত তথ্য যাচাই-বাছাই করে প্রতিবেদন জমা দেয়। এই তালিকাপত্র প্রায় চূড়ান্ত হওয়ার পথে।
২০১০ সালে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নির্মাণ তদারকি পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য সরকার পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রস্তাব আহ্বান করে। এই প্রস্তাব কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে তারও খুঁটিনাটি বিশ্বব্যাংক নির্দিষ্ট করে দেয়। এই মূল্যায়নের কাজ করার জন্য সরকার একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি নিয়োগ করে এবং ২০১১ সালের শুরুতে কারিগরি প্রস্তাবের ওপরে তাদের মূল্যায়ন প্রতিবেদন বিশ্বব্যাংকের অনুমোদনের জন্য প্রেরণ করে। এই কমিটিতে বিশ্বব্যাংকের সুপারিশ অনুসারে তাদেরই অবসরপ্রাপ্ত একজন বিশেষজ্ঞকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কমিটির মূল্যায়ন বিশ্বব্যাংক লিখিতভাবে অনুমোদন করে।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, এখানে 'কোয়ালিটি অ্যান্ড কস্ট বেইজড সিলেকশন' পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় বিশ্বব্যাংকের গাইডলাইন অনুসারেই। ওইখানে কারিগরি মূল্যায়নের ওপর শতকরা ৯০ ভাগ 'ওয়েইটেজ' এবং ভিন্ন একটি খামে জমা দেওয়া আর্থিক প্রস্তাবের মূল্যায়নের ওপর শতকরা ১০ ভাগ ওয়েইটেজের মূল্যায়ন করা হয়। যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব জমা দিয়েছিল তাদের উপস্থিতিতেই কারিগরি মূল্যায়ন প্রদত্ত নম্বর ঘোষণা করা হয় এবং আংশিক প্রস্তাব ও খামগুলো খুলে সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হয়।
এছাড়া বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সরকারের কমিটিকে প্রতিটি পরামর্শক দলের যে ২৭ জন 'কি পারসোনালের' নাম-অভিজ্ঞতা উল্লেখ আছে তা সঠিক কি-না তা যাচাই করার জন্য দিকনির্দেশনা দেয়। সেই অনুসারে কমিটি এসব বিশেষজ্ঞের অভিজ্ঞতা সনদ যাচাই করে দেখে। তাতে দেখা যায়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে একজন বিশেষজ্ঞের যে অভিজ্ঞতা কারিগরি প্রস্তাবে উল্লেখ আছে, তা প্রমাণ করার জন্য যথাযথ সনদ তারা উপস্থাপন করতে পারেননি। কেউ কাজ করেছেন এক ক্ষেত্রে, সনদ জমা দিয়েছেন আরেক ক্ষেত্রের। এ ধরনের একটি ঘটনার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়ে তাদের অসাবধানতার জন্য ভুল স্বীকার করে। সব মিলিয়ে তিনজন এমন ব্যক্তি পাওয়া যায়। তবে এরই ভিত্তিতে কারিগরি প্রস্তাব পুনর্মূল্যায়ন এবং আর্থিক প্রস্তাবের অসঙ্গতিগুলো দূর করা হয়। নির্ধারিত ওয়েইটেজ ব্যবহার করে সরকার গঠিত কমিটি তাদের চূড়ান্ত মূল্যায়ন বিশ্বব্যাংকে প্রেরণ করে। এই প্রতিবেদন অনুমোদনের পর সরকার যখন অপেক্ষা করছিল, তখনই বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগ উপস্থাপন করে পদ্মা সেতু প্রকল্পে তাদের কার্যক্রম স্থগিত করে।
আগেই যেমনটি বলেছি, পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে সরকার ও বিশ্বব্যাংকের মধ্যকার দ্বিমত ও দ্বৈরথ নিয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই। পদ্মা সেতু প্রকল্পের কারিগরি বিভিন্ন দিক কীভাবে মূল্যায়িত হয়েছে, সেটাই জানালাম। বিচার-বিবেচনার ভার পাঠকের।

অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ, চেয়ারম্যান
পদ্মা সেতু প্রকল্প বিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেল

শনিবার, ৩০ জুন, ২০১২

মুক্তিযোদ্ধা তালিকা সংযোজন-বিয়োজনের খেলা আর কতকাল?




ইকতেদার আহমেদ
১৯৭০ সালে পাকিস্তানের ৩০০ আসনের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা পরিচালনার অধিকার অর্জন করলেও তৎকালীন সামরিক শাসকগোষ্ঠী ষড়যন্ত্রমূলকভাবে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর বিষয়ে নানারূপ প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। এর অবশ্যম্ভাবী পরিণতিতে এ দেশে ১৯৭১-এর মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ঐতিহাসিক ৭ মার্চ ভাষণের মাধ্যমে অসহযোগ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের রূপরেখা ঘোষণা করেন। 
বঙ্গবন্ধুর ভাষণ-পরবর্তী সর্বাÍক অসহযোগ আন্দোলন শুর“ হলে কার্যত রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দেশের অন্যান্য জেলা শহরের সড়ক, রেল ও বিমান যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় বিভিন্ন জেলা শহরে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও ¯’ানীয় আওয়ামী লীগের উদ্যোগে যুবকদের গেরিলা যুদ্ধ কৌশল প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করা হয়। ২৫ মার্চ দিবাগত রাতের মধ্য প্রহরে অর্থাৎ ২৬ মার্চ স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এলে ঢাকায় কেন্দ্রীভূত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বিভিন্ন জেলা ও মহকুমা শহরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণে সচেষ্ট হয়। বিভিন্ন প্রতিকূলতার মাঝে সর্বাÍকভাবে এ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে তাদের এপ্রিল থেকে জুন অবধি লেগে যায়। এ সময়ে বিভিন্ন জেলা ও মহকুমা শহরে অব¯’ানরত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সদস্য বাঙালি সৈনিক, ইপিআর, পুলিশ, আনসার এবং ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক জনতার প্রতিরোধে প্রাণ হারায়। বিভিন্ন জেলা শহরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আগমন পূর্ববর্তী গেরিলা যুদ্ধ কৌশল প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকে। 
পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিভিন্ন জেলা ও মহকুমা শহরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ-পরবর্তী সেনা, ইপিআর, পুলিশ, আনসার এবং ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক জনতার একটি অংশ ভারতে পাড়ি জমায়। ভারতে অব¯’ানকালীন ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, জনতা সবাইকে অনধিক দু’মাসের প্রশিক্ষণ দিয়ে বিভিন্ন ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত করে দেশের অভ্যন্তরে গেরিলা যুদ্ধ চালাতে পাঠানো অব্যাহত থাকে। 
গেরিলা যুদ্ধ বলতে বোঝায় অনিয়মিত খণ্ডযুদ্ধ। আর গেরিলা যোদ্ধা হ”েছন খণ্ডযুদ্ধে নিযুক্ত ব্যক্তি অথবা নিয়মিত বাহিনীর বির“দ্ধে অনিয়মিত খণ্ডযুদ্ধে লিপ্ত রাজনৈতিক দলের সদস্য। নিয়মিত বা প্রচলিত যুদ্ধের (ঈড়হাবহঃরড়হধষ ধিৎভধৎব) সঙ্গে গেরিলা যুদ্ধের (ঁেবৎরষষধ ধিৎভধৎব) পার্থক্য হ”েছ, প্রথমোক্ত যুদ্ধটি এক বা একাধিক স্বাধীন ও স্বীকৃত রাষ্ট্রের সরাসরি ও নিয়মিত যুদ্ধ। অপরদিকে শেষোক্ত যুদ্ধটি হ”েছ স্বাধীন ও স্বীকৃত রাষ্ট্রের নিয়মিত বাহিনীর সঙ্গে স্বাধীনতা বা মুক্তিসংগ্রামরত অনিয়মিত বাহিনীর খণ্ডিত যুদ্ধ। তাছাড়া নিয়মিত ও অনিয়মিত বাহিনীর পার্থক্য হ”েছ, নিয়মিত বাহিনীর সব সদস্যই পেশাদার এবং জীবন ও জীবিকার তাগিদে নিয়মিত বাহিনীতে তাদের অন্তর্ভুক্তি, পক্ষান্তরে বিভিন্ন পেশা ও কর্মজীবীর সমন্বয়ে একটি বিশেষ লক্ষ্য হাসিলের অভিপ্রায়ে অনিয়মিত বাহিনীর গঠন এবং লক্ষ্য অর্জন সমাপ্ত হলে এর বিলুপ্তির মাধ্যমে কার্যক্রমের অবসান। 
বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা অনন্য, অম্লান ও অবিস্মরণীয়। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি এ দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সর্বাÍক সমর্থন ছিল। এ সমর্থনকে অবলম্বন করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে গেরিলা যুদ্ধ পদ্ধতিটি বেছে নেয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মুক্তিযোদ্ধাদের এ দেশের গ্রামীণ জনসাধারণ অকৃত্রিম ও হƒদয় নিংড়ানো øেহ ও ভালোবাসায় আবদ্ধ রাখতে গিয়ে নিজেদের জানমালের নিরাপত্তাকে তু”ছ ভেবে সম্মিলিতভাবে সব ধরনের সাহায্যের হাত প্রশস্ত করেছিল। তারা যে শুধু খাদ্য, পথ্য, তথ্য, বস্ত্র, আশ্রয় ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছিল তা নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে নিজেদের ঘুম ও আরাম বিসর্জন দিয়ে রাতভর মুক্তিযোদ্ধাদের পাহারা দিয়ে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিল। এমন হাজারও দুঃখজনক ও বিয়োগান্তক ঘটনা আজও আমাদের বিবেকবোধকে তাড়িত করে চলছে, যখন আমরা জানতে পারি মুক্তিযোদ্ধাদের প্র¯’ান পরবর্তী পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীরা মুক্তিযোদ্ধাদের না পেয়ে ক্রোধের জ্বালা নিবারণার্থে নৃশংসভাবে আশ্রয়দাতা গ্রামবাসীকে হত্যা করে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়ে পরিবারগুলোকে মহাবিপর্যয়ে নিপতিত করেছিল। 
১৯৭০-এর নির্বাচনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ প্রদত্ত ভোটের ৯৫ শতাংশের অধিক ভোটপ্রাপ্ত হওয়ায় স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামে বলতে গেলে এ দেশের আপামর জনগণের সমর্থন ছিল। যে ক্ষুদ্র গোষ্ঠীটি স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামের বিরোধিতা করেছিল তাদের মধ্যে জেলা, মহকুমা ও থানা পর্যায়ের নেতৃ¯’ানীয় অনেকে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এবং মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ের সন্ধিক্ষণে প্রাণ হারান। মুসলিম লীগ ও শান্তি কমিটির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত এমন কিছু ব্যক্তির পরোক্ষভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করার ঘটনাও বিরল নয়। তবে স্বাধীনতাবিরোধী নেতৃ¯’ানীয় অনেকেই বিভিন্ন কৌশল অবলম্বনে প্রাণ রক্ষায় সমর্থ হন। 
মুক্তি ও স্বাধীনতাযুদ্ধে দেশের আপামর জনগণের সমর্থন থাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের চোরাগোপ্তা হামলা ও খণ্ডযুদ্ধ প্রতিরোধে স্বাধীনতাবিরোধীদের সমন্বয়ে রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনী গঠনে ব্রতী হয়। কিš‘ মুক্তি ও স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতি এ দেশের আপামর জনগণের অকুণ্ঠ ও সর্বাÍক সমর্থন থাকায় তাদের সে প্রয়াস ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। 
যদিও আমাদের মুক্তিযুদ্ধে দেশের একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী ছাড়া সবার নিরব”িছন্ন সমর্থন ছিল; কিš‘ স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেখা গেল, যারা জেনারেল এমএজি ওসমানী, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, শেখ ফজলুল হক মনি ও সিরাজুল আলম খান স্বাক্ষরিত সনদ সংগ্রহ করতে পেরেছেন, একমাত্র তারাই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হয়ে তালিকাভুক্ত হয়েছেন। এইচএম এরশাদের শাসনামলে সনদপ্রাপ্ত সব মুক্তিযোদ্ধার সনদ জমা দেয়ার নির্দেশ প্রদানপূর্বক প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নানাবিধ যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা পুনঃপ্র¯‘তের উদ্যোগ নেয়া হয়। এ তালিকায় অনেক সংযোজন ও বিয়োজন হয়। পরবর্তী সময়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ শাসনামলে যেসব তালিকা প্র¯‘ত হয় তাতেও অনেক সংযোজন ও বিয়োজন লক্ষ্য করা যায়। এ সংযোজন ও বিয়োজন প্রক্রিয়া এখনও অব্যাহত আছে। সংযোজন-বিয়োজনের এ খেলায় একশ্রেণীর ব্যক্তির যে পকেট ভারি হ”েছ তা এখন আর গোপন কিছু নয়। ২০০৯ সালে মুক্তিযোদ্ধা সরকারি চাকরিজীবীদের চাকরি থেকে অবসরের বয়স দু’বছর বৃদ্ধি করে সাতান্ন থেকে ঊনষাটে উন্নীত করা হলে একশ্রেণীর কর্মকর্তার মধ্যে যে কোন কিছুর বিনিময়ে মুক্তিযোদ্ধা সনদ সংগ্রহের উš§ত্ত প্রতিযোগিতা দেখা দেয়। বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের অবসরের বয়স ঊনষাটে উন্নীত করায় মুক্তিযোদ্ধা সরকারি চাকরিজীবীদের অবসরের বয়স একষট্টি বা বাষট্টিতে উন্নীত হবেÑ এ আশায় অনেক কর্মকর্তাই বিপুল অংকের অর্থের বিনিময়ে মুক্তিযোদ্ধা সনদ প্রাপ্তিতে কোনরূপ কুণ্ঠাবোধ করছেন না। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদধারী অন্তত একজন কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে এ অবৈধ সনদ বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্তরা হয়তো ভবিষ্যতের জন্য সাবধান হয়ে নিজেদের এহেন হীন কার্য থেকে বিরত রাখতেন।
দেশমাতৃকার ডাকে আÍত্যাগের মহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সেদিন যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাদের মধ্যে অতি অল্পসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সনদপ্রাপ্ত হয়েছেন। আবার এমন অনেক ব্যক্তি সনদপ্রাপ্ত হয়েছেন যাদের তৎকালীন বয়স বিবেচনায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের কোন সুযোগ ছিল না। মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তাকারী দেশের এক ব্যাপক জনগোষ্ঠী অদ্যাবধি মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদানের জন্য কোন ধরনের স্বীকৃতি না পেলেও মুক্তিযুদ্ধের বির“দ্ধে অব¯’ানকারী কেউ যদি সনদ পেয়ে থাকেন তাতে অবাক না হয়ে উপায় কী! 
আমরা জš§দাত্রী মা’কে যেমন ‘মা’ বলে সম্বোধন করি, ঠিক তেমন মাতৃভূমি ও মাতৃভাষাকেও ‘মা’ বলে সম্বোধন করি। জš§দাত্রী মায়ের ঋণ যেমন অপরিশোধযোগ্য, তেমনি মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার ঋণও অপরিশোধযোগ্য। মায়ের আÍত্যাগের মতো মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার জন্য আÍত্যাগও অতুলনীয়। তাই জš§দাত্রী মা, মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার কাছে কোন বিনিময় প্রত্যাশার সুযোগ আছে কি?
মুক্তিযুদ্ধকালীন এ দেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি। ১৯৭০-এর নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের দল আওয়ামী লীগ যে হারে ভোটপ্রাপ্ত হয়েছিল, সে বিবেচনায় এ দেশের ৭ কোটি বিশ থেকে ত্রিশ লাখ লোক সক্রিয়, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। এ বাস্তবতায় মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশের এ বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অবদান মূল্যায়নে আমরা যদি ব্যর্থ হই এবং ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের ‘মুক্তিযোদ্ধা’ পদবি দ্বারা অলংকৃত করি, তাতে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ ও আÍদান ম্লান হয়ে পড়ে। 
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৪০ বছর অতিক্রান্ত হলেও অদ্যাবধি ‘মুক্তিযোদ্ধা’ শব্দটি কোন আইন দ্বারা সংজ্ঞায়িত না হওয়ায় এর বহুবিধ ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। অনেকের মতে, যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় অস্ত্র ধারণ করে শত্র“র মোকাবেলা করেছিলেন একমাত্র তারাই মুক্তিযোদ্ধা। আবার অনেকের মতে, মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা ভারতে আশ্রয়গ্রহণ করে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করেছিলেন তারাও মুক্তিযোদ্ধা। আবার অনেকে বলেন, অস্ত্রধারী মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি যারা যুদ্ধকালীন তাদের খাদ্য, পথ্য, তথ্য, বস্ত্র, আশ্রয় ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করে হয়রানি ও ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন তারাও মুক্তিযোদ্ধা। অনেকে বলেন, শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর সদস্য হিসেবে যারা পাকিস্তানি বাহিনীর সহায়তা করেছেন তারা ছাড়া সবাই মুক্তিযোদ্ধা। 
অস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন এমন মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকাংশেরই বয়স ছিল ১৮ থেকে ৪৫ বছর। ১৮ বছরের নিচের বয়সের অস্ত্রধারী মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা খুব একটা চোখে পড়ার মতো নয়। সে নিরিখে ১৮ বছর বয়সে যিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করছিলেন, বর্তমানে তার বয়স ৫৮ বা ৫৯-এর ঘরে। কিš‘ বাস্তবে আমরা দেখতে পাই, ‘মুক্তিযোদ্ধা’ শব্দটির আইনের দ্বারা নির্ধারিত সংজ্ঞার অনুপ¯ি’তিতে সংযোজন ও বিয়োজন কার্যক্রম অব্যাহত থাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাটি সংকুচিত হওয়ার পরিবর্তে সম্প্রসারিত হ”েছ। এ প্রক্রিয়ায় তালিকাটিতে মুক্তিযুদ্ধকালীন ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সের কেউ অন্তর্ভুক্ত হলে অবাক বিস্ময়ে বলতে হয়Ñ এটা বাংলাদেশ, এখানে কোন কিছুই অসম্ভব নয়। 
দেশপ্রেম ও আÍত্যাগ দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে এ দেশের আবালবৃদ্ধবণিতা মহান মুক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিল সুখী ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ার প্রত্যয়ে। এতে ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের বিষয়টি গৌণ। তাই মুক্তিযুদ্ধ করে আমরা কী পেলাম সে হিসাবের পরিবর্তে আমরা দেশকে কী দিতে পারলাম এ হিসাবটি সঠিকভাবে করতে পারলে একদিকে পাওয়া না পাওয়ার সব দুঃখ-বেদনা ঘুচে যাবে, অপরদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা সংযোজন-বিয়োজন খেলার অবসান ঘটবে। 
ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ ও সাবেক রেজিস্ট্রার, সুপ্রিমকোর্ট
রশঃবফবৎধযসবফ@ুধযড়ড়.পড়স