শনিবার, ৩১ মার্চ, ২০১২

সংসদের ভাষা : অশালীনতার মাপকাঠিতে কে কোথায়



সিরাজুর রহমান

প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সংসদে ফিরে গেছে, এটা ভালো কথা। সংসদে বসে তারা জাতির ও দেশের ভালোমন্দ বিবেচনা করবেন, সমস্যাগুলোর সমাধান করবেন আর জাতিকে মহত্ত্বর, উজ্জ্বলতর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন- এসব উদ্দেশ্যেই ভোটদাতারা তাদের নির্বাচিত করেছিলেন। অন্তত নীতির দিক থেকে সেটা সত্যি কথা। দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশে নীতি আর বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান বঙ্গোপসাগরের মতোই দুস্তর। বাস্তবতা প্রায়ই নীতিকে খুঁজে পায় না।
সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট তাদের নিখুঁত আর সুগভীর তদন্তের জন্য বিশ্বব্যাপী সম্মানিত। ইকোনমিস্ট বলে দিয়েছে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয় হয়েছিল এবং শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন ‘ভারতের বস্তা বস্তা টাকা আর পরামর্শের জোরে’। সে নির্বাচন যে ন্যায্য আর নিরপেক্ষ হবে না সেটা আগে থেকেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। শেখ হাসিনা নিজ মুখে স্বীকার করেছিলেন যে, ফখরুদ্দীন-মইন ইউ আহমেদের বর্ণচোরা সামরিক স্বৈরতন্ত্র ছিল তাদের ‘আন্দোলনের ফসল’। বিচিত্র নয় যে, সে সরকার শেখ হাসিনাকে গদিতে বসানোর জন্যই তৈরি হয়েছিল। তার ওপরেও বিএনপিকে ধ্বংস করার নানা চেষ্টা করেছে সে সরকার আর তাদের তৈরী নির্বাচন কমিশন। কমিশন বিএনপিকে বাদ দিয়েই নির্বাচন করতে চেয়েছিল। নির্বাচনে বিএনপিকে হারানোর বহু কসরত হয়েছে, দু’টি সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীও সে ষড়যন্ত্রে অংশ নিয়েছিল।
ফলাফল যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। তা সত্ত্বেও বিএনপি গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের কথা ভেবে মাস্টারপ্ল্যানের পরাজয় মেনে নিয়েছিল এবং সংসদে যোগও দিয়েছিল। কিন' সেটাও বিদেশী সাহায্যে স'াপিত সরকারের সহ্য হয়নি। পরাজিত বিএনপির নাক মাটিতে ঘষে দেয়ার সব রকমের চেষ্টা করেছে ‘বিজয়ী’ দল। সংসদকক্ষে আসন বরাদ্দ, বিরোধী দলের কথা বলার অধিকার ইত্যাদি নিয়ে বহু নোংরামি হয়েছে। এমনকি সেসব ব্যাপারে স্পিকারও সব সময় নায্যতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারেননি।
সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ছিল স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এবং ‘উজ্জ্বল নক্ষত্র’ তার কয়েকজন সহকারীর ভূমিকা। দিনের পর দিন তারা কদর্য ও অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করে সংসদের পবিত্রতা নষ্ট করেছেন, সংসদকক্ষের প্রতিটি আনাচ-কানাচকে পূঁতিগন্ধপূর্ণ করে তুলেছেন। শেখ হাসিনা প্রায় ছয় বছর দিল্লিতে ছিলেন। তারা খুব সম্ভবত নিজেদের স্বার্থের অনুকূল করে তাকে সহায়ক করে তুলেছেন। তিনি দেশে ফিরে এসেছেন এই বদ্ধমূল ধারণা নিয়ে যে, তার পিতা হত্যার পরের অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিসি'তিতে যারা রাষ্ট্রতরণীর হাল দৃঢ় হাতে ধারণ করে শিশুরাষ্ট্রকে অতলে তলিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করেছেন, তারা সবাই তার পিতা ও পরিবারের হত্যাকারী এবং তাদের ক্ষমতা গ্রহণ চৌর্যবৃত্তিরই শামিল। লক্ষণীয় এই, শেখ হাসিনার এই চিন্তাধারা এসেছে তার এ বিশ্বাস থেকে যে, তার পিতা স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, সুতরাং বাংলাদেশ তার বংশানুক্রমে পাওয়া পৈতৃক সম্পত্তি।
শেখ মুজিব জীবিতাবস'ায় কখনো দাবি করেননি যে, তিনি স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন। সত্যি বটে, স্বাধীনতা কথাটা তিনি ৭ই মার্চের ভাষণে উচ্চারণ করেছিলেন। সে উচ্চারণ তার আগে মওলানা ভাসানী এবং অন্যরাও করেছেন। কিন' আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ইত্যাদির জন্য যে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার প্রয়োজন সে ঘোষণা দিয়েছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান, শেখ মুজিবুর রহমানের নামে। শহীদ জিয়াকে সে কৃতিত্বটুকু দিতেও বর্তমান সরকার রাজি নয়, এমনই তাদের আক্রোশ।
জিয়াউর রহমান সংশয়পূর্ণ দেশ আর সেনাবাহিনীর আত্মঘাতী বিভ্রান্তির মধ্যে ক্ষমতায় এসে শক্ত হাতে রাশ টেনে ধরেছিলেন। তিনি বাকশালী স্বৈরতন্ত্রকে উল্টে দিয়ে গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছিলেন, বাক ও সংবাদের স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করেছিলেন, সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও দেশ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। তার অবদান এত বেশি ছিল বলেই বোধ হয় তার বিরুদ্ধে হাসিনার ঈর্ষা ও ক্রোধ অন্তহীন। স্মরণীয় যে, ভারত থেকে হাসিনার দেশে ফেরার ১৩ দিনের মাথায় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হয়েছিলেন। সে ষড়যন্ত্রে কে বা কারা জড়িত থাকতে পারে সে সম্বন্ধে তখন অনেক জল্পনা-কল্পনা হয়েছিল। জিয়ার হত্যার পরও আওয়ামী লীগ নেত্রীর আক্রোশ প্রশমিত হয়নি। জিয়ার পত্নী ও পুত্রদের হয়রানি করার কোনো চেষ্টা তিনি বাদ দিচ্ছেন না।
খালেদার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর গালিগালাজ
নতুন সংসদে নতুন প্রধানমন্ত্রী গোড়া থেকেই বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া ও তার নির্বাসিত পুত্রদের বিরুদ্ধে কদর্য গালিগালাজ শুরু করেন। আরো কয়েকজন আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য তাতে ধুয়া ধরেন। সংসদের পরিবেশ এমন পূঁতিগন্ধপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় যে, বিরোধী দল একাধিকবার সংসদ বর্জন করতে বাধ্য হয়। অবশ্যি সরকারি দলের তাতে কোনো অসুবিধা হয়নি। তারা প্রায় বিনা আলোচনায় যদৃচ্ছ ‘আইন‘ পাস করেছে, সংবিধানকে তুলোধুনো করে ছেড়ে দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বলেছিলেন যে, ‘বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে‘ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনব্যবস'া অন্তত আরো দু’টি সাধারণ নির্বাচনে চালু রাখা উচিত। কিন' বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ নিয়ে আওয়ামী লীগের কোনো মাথাব্যথা নেই। তারা সংবিধান আর গণতান্ত্রিক রীতিপদ্ধতির ওপর স্টিমরোলার চালিয়ে ফ্যাসিবাদী পদ্ধতিতে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে চায়। তারা প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি উপড়ে ফেলেছে, এই হাস্যকর যুক্তিতে যে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে সে পদ্ধতি আর বজায় রাখা সম্ভব নয়।
বিরোধী দল সংসদ বর্জন করে চলছিল বলে সংসদে প্রতিবাদ জানানোর সুযোগ তাদের ছিল না। সে জন্যই গত রোববার (১৮ মার্চ) তাদের সংসদে প্রত্যাবর্তন সমুচিত হয়েছে। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ও গণতন্ত্রকামী অন্য দলগুলো সংসদের বাইরে আন্দোলন করে তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি ফিরিয়ে আনার পক্ষে দুর্জয় জনমত গড়ে তুলেছে। এখন সংসদে ফিরে গিয়ে সাংবিধানিক পদ্ধতিতে সে দাবি উচ্চারণ করার উপযুক্ত সময়।
বিএনপির প্রত্যাবর্তনের প্রথম দুই দিন এ দলের দু’জন মহিলা সংসদ সদস্যের কিছু অশালীন উক্তি নিয়ে সংসদে তুমুল হট্টগোল সৃষ্টি হয়েছে। স্পিকার-সংশ্লিষ্ট অংশগুলো অসংসদীয় বলে কার্যবিবরণী থেকে ‘এক্সপাঞ্জ’ (মুছে ফেলা) করেছেন। সেটাই সঙ্গত ব্যবস'া। এর পূর্ববর্তী সময়ে সরকারি দলের, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর কদর্য উক্তিগুলো সম্বন্ধে যদি তিনি সমানে দৃঢ়তা দেখাতে পারতেন তাহলে পরিসি'তির হয়তো এত অবনতি হতো না।
সাধারণ মানুষের এটা মনে করা স্বাভাবিক হবে যে, আলোচ্য দু’জন মহিলা সংসদ সদস্য প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের মন্ত্রীসহ আরো কিছু সংসদ সদস্যের উক্তির সামনে ‘আয়না’ তুলে ধরে সঠিক কাজই করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর বহু উক্তিতে বিরোধী দলের নেত্রী অবশ্যই অপমান বোধ করেছেন, কিন' সাধারণ মানুষের অনুভূতিও খুবই আহত হয়েছে। সাধারণ বুদ্ধিতে বলে পাল্টা অভিযোগ তাদের মুখের ওপর ছুড়ে দিলে প্রধানমন্ত্রী ও তার সহকর্মীরা ভবিষ্যতে এ ধরনের কটু কথা বলা থেকে বিরত থাকবেন। ‘ঢিলটি মারলে পাটকেলটি খেতে হয়’- এ শিক্ষা তাদের হবে।
প্রধানমন্ত্রী অতি সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, খালেদা জিয়া ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোলে বসে’ ক্ষমতা পেতে চান। ফখরুদ্দীন-মইন ইউ আহমেদ স্বৈরশাসনের সাথে আওয়ামী লীগ নেত্রীর হার্দিক সম্পর্কের আলোকে তিনি সে সরকারের কোলে বসে ক্ষমতা পেয়েছিলেন বলে যে মন্তব্য করা হয়েছে তা থেকে যদি প্রধানমন্ত্রীর মনে এ উপলব্ধি আসে যে, এ জাতীয় মন্তব্য অপমানকর ও পীড়াদায়ক, তাহলে সেটা কল্যাণকর হবে। 
খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান ২০০১ সালের নির্বাচনে যে সাংগঠনিক প্রতিভা দেখিয়েছিলেন তা থেকে আওয়ামী লীগের ভীত হওয়া স্বাভাবিক। তার ওপর শহীদ জিয়াউর রহমানের পরিবারের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত গাত্রদাহের ব্যাপার তো আছেই। শেখ হাসিনা একজন অর্ধশিক্ষিত ও অমার্জিত উকিলকে দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে (তার নিজের বিরুদ্ধে ১৫টি গুরুতর দুর্নীতির মামলাসহ) সাত হাজারেরও বেশি ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহার করিয়ে নিয়েছেন, রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত বেশ কয়েকজন খুনির দণ্ড মওকুফ করিয়ে নিয়েছেন। অপর দিকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে জিয়া পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা সাজানো হচ্ছে, সুপ্রাচীন বহু মামলায় তারেক রহমানকে ‘পরিপূরক তালিকায়’ আসামি করা হচ্ছে। 

দুর্নীতি ও দুর্নীতির সম্ভাবনা
তারেকের রাজনীতিতে ফিরে আসার সম্ভাবনায় আওয়ামী লীগ যে আতঙ্কিত এ কথা সবাই জানে। সুতরাং অনেকেই মনে করেন যে, শেখ হাসিনার পুত্র সম্বন্ধে কিছু বয়ান সংসদে উত্থাপনের প্রয়োজন ছিল। সজীব ওয়াজেদ জয় একটি মার্কিন কোম্পানির কাছ থেকে পাঁচ মিলিয়ন ডলার ঘুষ নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ ছাপার জের ধরে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে আদালত ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন, কিন' তার পরও বাড়তি তিন মাস তাকে কয়েদ করে রাখা হয়েছিল। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে যদি মামলা হতে পারে তাহলে সজীবের বিরুদ্ধে অভিযোগের কেন তদন্তও হবে না?
মাত্র কিছু দিন আগে ব্রিটেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ড. লিয়াম ফক্সকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে। তার অপরাধ : তার এক বন্ধু তার উপদেষ্টা বলে দাবি করে ভিজিটিং কার্ড বিলি করেছেন এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সরকারি সফরের সময় সেখানে হাজির ছিলেন। সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ হয়নি, কিন' সে সুযোগে উপরিউক্ত ব্যক্তি হয়তো প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে আর্থিক লাভবান হতে পারতেন এমন একটা ইঙ্গিত অবশ্যই ছিল। সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে প্রমাণ আছে যে, তিনি বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা দাবি করে ভিজিটিং কার্ড ছাপিয়েছেন এবং ওয়াশিংটনের প্রভাবশালী মহলে সে কার্ড বিলি করেছেন। তা ছাড়া টেলি-সংবাদে অনেকেই নিশ্চয় দেখেছেন যে, জয় প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন বিদেশসফরে তার সঙ্গী হয়েছিলেন।
আমার পরম সৌভাগ্য, বহু দেশ থেকে সহৃদয় পাঠকেরা আমাকে টেলিফোন করেন, ইমেইলে মন্তব্য খবর ও গুজব ইত্যাদি পাঠান। বিভিন্ন সময়ে তাদের কেউ কেউ আমাকে জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে জয়ের অন্তত দু’টি প্রাসাদোপম অট্টালিকা আছে এবং তার বিলাসবহুল জীবনযাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় আয়ের জ্ঞাত কোনো উৎস তার নেই। তা ছাড়া অসংলগ্নতার জন্য তার নাম পুলিশের নথিভুক্ত বলেও কেউ কেউ আমাকে জানিয়েছেন। অনুরূপভাবে কেউ কেউ বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর কন্যা-জামাতা কানাডায় অভিজাত জীবনযাপন করছেন, কিন' তারা কোনো চাকরি কিংবা ব্যবসায় করছেন বলে কেউ জানে না। এমন অভিযোগও আছে, যে দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর অর্থায়নে বিরত থাকছে তার সাথে কানাডা প্রবাসী প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়দের কারো আচরণ জড়িত থাকতে পারে। বহু লোকের যখন এ ধরনের ধারণা আছে তখন বিষয়গুলো নিয়ে উপযুক্ত তদন্ত করে প্রধানমন্ত্রী পুত্র-কন্যাকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারেন।
সংসদে বিএনপিদলীয় উপরিউক্ত মহিলা সংসদ সদস্যদ্বয়ের সংশ্লিষ্ট উক্তিগুলো অবশ্যই অশোভন ও অসংসদীয় ছিল। কিন' সংসদ জাতি ও দেশবাসীর জন্য। তারা যদি মনে করেন যে, এই দু’জন সংসদ সদস্যের উক্তি প্রধানমন্ত্রী ও তার সহকর্মীদের দৃষ্টি উন্মোচনে সহায়ক হবে তাহলে সে উক্তিগুলোরও প্রয়োজন ছিল বলতে হবে। 
লেখক : বিবিসি খ্যাত প্রবীণ সাংবাদিক 
লন্ডন, ২০.০৩.১২ 
serajurrahman@btinternet.com

বুধবার, ২৮ মার্চ, ২০১২

এভাবে আর কত দিন চলবে



॥ মাসুদ মজুমদার ॥

ভারতের একটি মানচিত্রে বাংলাদেশকে সে দেশের অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছিল। এ নিয়ে আপত্তি উঠেছিল, শেষ পর্যন্ত কী হয়েছে কেউ জানে না। সমপ্রতি কেরালায় ভারতের আশপাশের সব দেশকে ভারতের অংশ দেখিয়ে পাঠ্যপুস্তক ছাপানো হয়েছে। ‘বৃহৎ ভারত’ ও ‘অখণ্ড’ ভারত-ভাবনা থেকে ‘ইন্ডিয়া ডকট্রিন’-এর জন্ম। ভারতের কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার সুযোগ পেলেই দাদাগিরির মাধ্যমে সেটি প্রতিবেশীদের বুঝিয়ে দিতে ভুলও করে না, কার্পণ্যও করে না। আমাদের স্বাধীনতা-ভাবনায় ভারত আসে দু’ভাবে। প্রথম ভাবনায় সাহায্যের জন্য কৃতজ্ঞতায় মাথা নুইয়ে পড়ে। আবার আমাদের টিকে থাকার প্রশ্নে ভারতের অসহযোগিতায় ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। এরই প্রেক্ষাপটে আজকের লেখা।

ছিটমহলবাসী অনশনে গেল, সরকার কোনো কথা বলল না। প্রশ্ন, ৪০ বছরেও তারা কি স্বাধীন দেশে পরাধীন হয়ে থাকবে? যে ভারত আমাদের স্বাধীনতায় এত সাহায্য-সহযোগিতা করল তারা কেন আমাদের মাথা তুলে দাঁড়াতে দিতে চায় না? আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব তাদের কাছে মর্যাদাহীন, বাজারটাই আসল। ভারত নিজের স্বার্থ এক রত্তি ছাড় দিচ্ছে না, আদায় করে নিতে চাচ্ছে ষোলো আনা। ভারতের এত অহমিকার কাছে আমাদের স্বাধীনতা যেন তাৎপর্যহীন।
স্বাধীনতা, ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। বহুমাত্রিক অর্থ ও ধারণা নিয়ে এটি একেকজনের কাছে একেকভাবে ধরা দেয়।
প্রথাগত ক্রীতদাসের কাছে স্বাধীনতা যেভাবে ধরা দেয়, সাধারণ কারাবন্দীর কাছে সেটি কিছুটা ভিন্ন অর্থ বহন করে। অনেক আদিবাসী কিংবা উপজাতি স্বাধীনতা উপলব্ধি করে তাদের মতো করে। বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর কাছেও স্বাধীনতা সমান অর্থ বহন করে না। মরুবাসী বেদুইন, অরণ্যবাসী মানুষ স্বাধীনতাকে তাদের মাত্রাজ্ঞান দিয়ে বুঝতে চায়। তবে সমাজবদ্ধ মানুষ যখন রাষ্ট্রাচারে অভ্যস্ত হয়ে উঠল- তখন স্বাধীনতা অন্যমাত্রিক ব্যঞ্জনা ও দ্যোতনা নিয়ে ধরা দিলো।

নানাভাবে মানুষই মানুষের জন্মগত স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চায়। একশ্রেণীর মানুষ অপর শ্রেণীর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করতে চায়। এই শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশের ভাষাই প্রভুত্ব থেকে উৎসারিত হয়। এখানে একদল শাসক সাজে, অন্যরা শাসিত। একটি গোষ্ঠী প্রভু, অন্যরা ক্রীতদাসতুল্য। শাসন-শোষণ ও অবদমিত করে রাখার অর্থই হলো পরাধীন করে রাখা। সঙ্গত কারণেই ক্রীতদাসের মানস আর মুক্ত মানুষের চিন্তা এক হয় না। স্বাধীনতার ধারণাও জনে জনে মনে মনে পার্থক্য সৃষ্টি করে। এ কারণেই মানসিক গোলামেরা স্বাধীনতার আবেগ লালন করে কিন' অহম বোঝে না। অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে, আত্মমর্যাদা বোঝে না। অস্তিত্ব বিসর্জন দেয় কিন' সার্বভৌমত্বের বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রাখতে পারে না।

সহজাতভাবে মানুষ প্রভুত্বকামী। মানুষ মানুষের ওপর প্রভুত্ব করার উদগ্র বাসনা লালন করে বলেই মানুষের ভেতর শ্রেণিভেদপ্রথা চালু হতে পেরেছে। এখানে মানুষ দাস ও প্রভুতে রূপান্তরিত হয়। সব ঐশীগ্রনে' মানুষকে সমান মর্যাদার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাণী ভাবা হয়েছে। মানুষের ওপর মানুষের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব রাখা হয়নি। মানুষের সাথে মানুষের পার্থক্য আছে যোগ্যতার। তারতম্য হয় চেহারায়, অবয়বে। আর থাকে জ্ঞানবুদ্ধির ফারাক, বোধবিশ্বাসের দূরত্ব। সাধারণভাবে মানুষ সৃষ্টির সেরা। এমন ধারণা থেকেই রাষ্ট্র মানুষের প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন হিসেবে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের অর্থ খুঁজে পেয়েছে, নীতি প্রণয়ন করেছে, পররাষ্ট্র নীতির স্বাধীন বৈশিষ্ট্য রচনা করেছে।

ইসলাম স্বাধীনতার একটি সার্বজনীন ব্যাখ্যা ও সংজ্ঞা উপস'াপন করেছে। সৃষ্টির সেরা মানুষ। মানুষ মানুষের প্রভুত্ব করবে না। মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে একমাত্র সৃষ্টিকর্তার আনুগত্য করার জন্য। এ কারণেই বলা হয়, মানুষ কলেমা পড়ে শুধু ঈমানের ঘোষণা দেয় না, নিজেকে স্বাধীন বলেও ঘোষণা করে। কারণ কলেমা পড়ার পর মানুষ আর মানুষের প্রভুত্বের আওতায় থাকে না। প্রভুত্ব সংরক্ষিত হয়ে যায় একমাত্র সৃষ্টিকর্তা বা আল্লাহর জন্য। অবশিষ্ট দায়দায়িত্ব ও আনুগত্য মানুষ অধিকার ও কর্তব্যজ্ঞান থেকে বিধিবিধান তৈরি করে অনুসরণ করে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান স্বাধীনতার একটি রাজনৈতিক সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছে। কিছু অধিকার ও দায়বোধ নিয়ে মানুষ সমঝোতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়ে। রাষ্ট্র একটি সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান। এর একটি সরকার থাকবে। নির্ধারিত সীমার ভেতরে এর জনগোষ্ঠী বসবাস করবে। নিজেরা সমঝোতার ভিত্তিতে একটি সংবিধান প্রণয়ন করবে। গরিষ্ঠের অভিমত বা ভোট নিয়ে সেটি কার্যকর হবে। রাষ্ট্র নামের প্রতীকী প্রতিষ্ঠানটিকে প্রতিনিধিত্ব করবে সরকার। সরকার গঠন করবে এর জনগণ- সেটা প্রত্যক্ষভাবেও হতে পারে, পরোক্ষভাবেও হতে পারে। সমাজ ও রাষ্ট্র মানুষের ইচ্ছার প্রকাশ। সমাজ ও রাষ্ট্র দুটোই মানুষের জন্য। সৃষ্টিকর্তার দেয়া বিধিবিধানেও মানুষকে সমাজবদ্ধ হয়ে ঐক্য-চেতনায়, ভ্রাতৃত্ববোধে উজ্জীবিত হয়ে, অধিকার ও কর্তব্য-সচেতন থেকে জীবন যাপন করতে বলা হয়েছে।

স্বাধীনতাকে অর্জনের বিষয় ভাবা হয় দুটো কারণে : প্রথমত, এটি একটি বিশেষ জনগোষ্ঠীর ইচ্ছার প্রকাশ ঘটিয়ে আত্মপ্রকাশ করে; দ্বিতীয়ত, এটি যুদ্ধ করে, কূটনৈতিকভাবে, সমঝোতার ভিত্তিতে কিংবা শাসন-শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে লাগাতার লড়াইয়ের মাধ্যমে অর্জিত ফসলও হতে পারে।
পাক-ভারত যেভাবে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, বাংলাদেশ স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে ভিন্নভাবে। একইভাবে দেশে দেশে স্বাধীনতা অর্জনের আলাদা ইতিহাস আছে। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি ৪০ বছর পূর্ণ হচ্ছে। বাঙালি জাতিসত্তা বাংলাদেশী হিসেবে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে। আমরা বাঙালি কিন' বাংলাদেশী। পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে বাঙালি রয়েছে- তারা বাংলাদেশী নয়, ভারতের নাগরিক তথা ভারতীয়। তাই রাষ্ট্রাচার ও জাতিসত্তা সব সময় এক লাইনে বা সরলরেখায় সব ভাবের প্রকাশ ঘটায় না।

যেমন ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান ব্রিটিশমুক্তির মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করল। দুটো দেশই বহুভাষী মানুষের জনপদ, বহুধর্মীয় গোষ্ঠী ও নৃগোষ্ঠী উভয় দেশে বসবাস করে। ভারত-পাকিস্তান সেই উত্তরাধিকার বহন করে স্বাধীন। আমরা একাত্তর ছুঁয়ে স্বাধীনতার কথা বলছি। মধ্যখানের ইতিহাস অবশ্যই শোষণ-বঞ্চনার। তার পরও ভারতীয় উপমা সামনে রেখে বিষয়টিকে মনের বড় ক্যানভাসে নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। সে ক্ষেত্রে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে আমাদের জাতীয় নেতারা অবদান রেখেছেন, অবিনাশী ভূমিকা পালন করেছেন, তাহলে ’৪৭ সালের অর্জন থেকে আমাদের হিস্যাটুকু ভারত কিংবা পাকিস্তানকে বর্গা বা ছাড় দেয়া হবে কেন! কেন খণ্ডিত ইতিহাসচর্চার এমন বেসাতি!

আজকাল স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে শুধু আবেগের বিষয় ভাবা হয় না। কারণ গ্লোবাল ভিলেজের এই যুগে স্বাধীনতাকে আরো জুতসই ব্যাখ্যা করে বোঝার চেষ্টা করা হয়। এখন মৌলিক অধিকার, মানবাধিকার অনেক বেশি আলোচিত। অর্থনৈতিক শোষণের বিষয়টিও সমালোচিত। রাজনৈতিক নিপীড়ন নিন্দিত প্রসঙ্গ। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, ধর্মীয় অধিকার বঞ্চিত করা, নৃগোষ্ঠীর অস্তিত্ব সংরক্ষণসহ দ্বিরাষ্ট্রিক ও বহুরাষ্ট্রিক সম্পর্কের বোঝাপড়ায় স্বাধীনতার মানদণ্ড নির্ণিত হয়। পৃথিবীর কোনো মানুষ ইরাক-আফগানিস্তানে আগ্রাসন মেনে নেয়নি। ইরাকের পোড়ামাটি ও আফগানিস্তানের ধ্বংসস-ূপ যে নবীন শিশুকে স্বাধীনতার অর্থ শিখিয়েছে- সেটা যুক্তরাষ্ট্রবাসীর বোধগম্যের বাইরে। ফিলিস্তিনি কোনো শিশু কিংবা শরণার্থীশিবির অথবা অধিকৃত অঞ্চলের বাড়ন্ত বয়সের তরুণকে স্বাধীনতা অর্থ খুঁজতে বললে যা বলবে, যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের শিশু-কিশোর তা বলবে না। জাতপাতে পিষ্ট ভারতীয় তফসিলি জাতিগুলো স্বাধীনতাকে যেভাবে বুঝছে, কাশ্মির-সেভেন সিস্টার বুঝেছে ভিন্নভাবে। মাওবাদীদের ধারণা একেবারে আলাদা। শাসক ও আর্যসমাজভুক্ত বাবুরা বুঝেছে ভিন্নভাবে। একইভাবে বসনিয়া-চেচনিয়ার শিশুরা স্বাধীনতাকে ছুঁয়ে দেখেছে ভিন্নমাত্রিক উপলব্ধি নিয়ে। প্রাসঙ্গিকতার এত সব উপমা টানার অর্থ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ধারণা যে এখনো তর্কিত প্রসঙ্গ হয়ে আছে সেটা উপলব্ধি করা। পূর্ব তিমুর ও সুদানও এর বড় উপমা হতে পারে। এখানে এসেই আমরা বিবেচনায় নিতে পারি পশ্চিম বাংলার আজকের ভূমিকার। আমাদের স্বাধীনতার বিপরীতে তাদের অবস'ান রাষ্ট্রবিজ্ঞান অবশ্যই ভেবে দেখতে চাইবে। সেই সাথে দেশে দেশে স্বাধীনতার রূপময়তায় যে ফারাক, সেটাও দায়বোধকে জাগ্রত করবে।

এ জন্যই বলা হয়, স্বাধীনতা ছেলের হাতের মোয়া নয় যে একেবারে সহজলভ্য। আবার অতটা অধরা কিছু নয় যে, একটি জনগোষ্ঠীর চিন্তার ঐক্য, বাসনা ও স্পৃহা আজীবন না পাওয়ার বিষয় হয়ে থেকে যাবে। আরো একটি ইতিহাসকেন্দ্রিক উপমা টানা যেতে পারে। আমরা একসময় স্বাধীন ছিলাম, এই যুক্তি না মানলে ব্রিটিশরা আমাদের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিল কিভাবে? আমরা স্বাধীনতা হারিয়েছিলাম, তা না হলে পরাধীনতা কিভাবে দুই শ’ বছর আমাদের গ্রাস করে রেখেছিল। বাহাদুর শাহ জাফর, ইসমাইল শহীদ, তিতুমীর, সিরাজউদ্দৌলা, ফকির মজনু শাহ, হাজী শরীয়তুল্লাহ, মুন্সী মেহেরুল্লাহ, সূর্যসেন, ক্ষুদিরাম, হাবিলদার রজব আলীরা কার বিরুদ্ধে কেন লড়েছেন? একাত্তর সাল থেকে ইতিহাস রচনাকারীরা এ প্রশ্নের জবাব দেবেন কিভাবে?

তা ছাড়া জাতীয় কবি নজরুল কোন শিকল ভাঙার গান গাইলেন, কোন কারার লৌহ কপাট ভাঙতে উদ্বুদ্ধ করলেন? নবাব সলিমুল্লাহ, শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক উত্তরণ নিয়ে আমরা ক্ষুদ্র চিন্তার গণ্ডিবদ্ধ ভাবনায় দোল খাচ্ছি না তো? ইতিহাসের যোগসূত্র খুঁজে পেতে সচেষ্ট না হলে কিংবা ইতিহাসের যোগসূত্রতা হারালে আমরা কূপমণ্ডূক হয়ে যাবো। নিজেদের অস্তিত্বকেও বিপন্ন করব। হাজার বছরের ঐতিহ্য থেকে আমাদের বৃন্তচ্যুত করে দিতে পারলেই স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের শত্রুরা খুশি হয়। আমরা সে ধরনের ষড়যন্ত্রের গহ্বরে ডুবে যেতে পারি না।
৪০ বছরে পা দিয়ে আমরা দেখছি আমাদের স্বাধীনতার অহঙ্কারকে পাক-ভারত যুদ্ধের বাইপ্রোডাক্ট বানানো হচ্ছে। স্বাধীনতা পাইয়ে দিতে ভারতের করুণা ও অনুদানের খেসারত দিতে দিতে আমরা সন্ধিজালে জড়িয়ে পড়ছি। আমাদের নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে ঢুকে পড়েছে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের শত্রুরা। জল-জল্লাদদের কারণে মরুকরণে দেশ ছারখার। অর্থনৈতিক শোষণ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে হার মানাচ্ছে। আমরা প্রতিবেশী দেশের পণ্য ও সংস্কৃতির বাজারে রূপান্তরিত হয়েছি। স্বাধীনতা দিবসেও ছিটমহলবাসীর আহাজারি থামানোর কোনো প্রয়াস লক্ষ করা গেল না। পাওয়া, না পাওয়ার হিসাব মেলাতেও দেখলাম না। স্বাধীনতাকে পণ্য বানিয়ে বহুজাতিক কোম্পানির বাণিজ্যটা কিন' দৃষ্টি এড়ালো না।

যে জাতি বাংলা ভাষার মান রক্ষার জন্য লড়াই করেছে, প্রাণ দিয়েছে, সে জাতি এখন হিন্দির জোয়ারে ডুবতে বসেছে। পিণ্ডির পরিবর্তে দিল্লি আমাদের ওপর জেঁকে বসেছে। এ যুগে স্বাধীনতা মানে এক চিলতে জমি নয়; এক খণ্ড কাপড় দিয়ে বানানো পতাকা নয়; অনুশীলন-অযোগ্য একটি সংবিধান নয়; সুরম্য অট্টালিকার অকার্যকর সংসদ নয়; নির্বাচিত কিন' একনায়কতান্ত্রিক মানস-লালিত একটি সরকারও নয়। এখন স্বাধীনতা মানে মৌলিক ও মানবাধিকারের সংরক্ষণ; আইনের শাসনের নিশ্চয়তা; মতপ্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা; সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা; দেশের সার্বভৌম ক্ষমতা রক্ষায় দেশ রক্ষাবাহিনীর উন্নত মম শির মানসিকতা; পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে সব বিদেশী প্রভুত্ব অস্বীকার করা; দেশের ভেতর সম-অধিকারের ভিত্তিতে অবাধ গণতন্ত্র চর্চার পরিবেশ বজায় রাখা- সর্বোপরি জনমতকে প্রাধান্য দিয়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা। তবেই না স্বাধীনতার অর্থ দাঁড়ায় মাথানত না করা। বন্ধুকে প্রভুর আসনে না বসিয়ে সমমর্যাদা নিশ্চিত করা। সর্বপ্রকার অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক নিপীড়ন, সাংস্কৃতিক গোলামিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলতে পারা- স্বাধীনতা তুমি আমার অহঙ্কার, অর্জনের সোনাঝরা ফসল, তোমাকে পাবো বলেই এত বিসর্জন মেনে নেয়া।

বাস্তবে ৪০ বছরের মাথায় এসেও আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে। ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগে, চিন্তার সততা ও স্বাধীনতার পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস এখন আদালতের কাঠগড়ায়। স্বাধীনতার ঘোষক বিতর্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে ঠাণ্ডা মাথায় ও পরিকল্পিতভাবে। সংবিধান এখনো সর্বজনীন দলিলের মর্যাদা পাচ্ছে না। বিতর্কিত সংশোধনী যেন আমাদের নিয়তি। সংসদ নিয়ে উচ্ছ্বাস উবে গেছে। গণতন্ত্র এখনো বোবাকান্নায় গুমরে মরছে। ভিন্ন মত ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যেন অসহ্য। দুই দিন আগে ২৬ মার্চ পালন করা হলো, অথচ স্বাধীনতাকে পাওয়ার আকুতি, আর কী পাওয়ার ও চাওয়ার ছিল- কী পেয়েছি সেই গান এখনো বাজছে। নীতিনির্ধারকেরা এসব নিয়ে ভাবার গরজই বোধ করছেন না- হায়রে স্বাধীনতা- তোমাকে নিয়ে ছলচাতুরির রাজনীতি আর কত দিন চলবে!

স্বাধীনতা দিবসও আমাদের এক মঞ্চে তুলতে পারে না, জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানানোর দায়বোধ করায় না, অবিতর্কিত সংবিধান রচনার তাগিদ দেয় না, গণতন্ত্রের জন্য উদগ্র বাসনা জাগায় না। তাহলে কি ধরে নেয়া হবে আমাদের রাজনীতিবিদেরা শুধুই ক্ষমতান্ধ, ক্ষমতার জন্যই শুধু স্বাধীনতার মতো মহান অর্জনকে অপব্যবহার করেন?
এবার স্বাধীনতার মাসে পরাধীনতার গ্লানিটাও যেন বেড়ে গেল। বিদেশী বন্ধুদের নিয়ে সরকারের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ করে দিলো। বিরোধীদলীয় নেত্রীর সাথে অশোভন ও অগণতান্ত্রিক আচরণের মধ্য দিয়ে সরকার আবার প্রমাণ করল নির্বাচিত স্বৈরাচার কাকে বলে। সরকারি নির্দেশে রূপসী বাংলায় অনুষ্ঠিতব্য মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান নিশ্চয়ই সরকারের বাড়া ভাতে ছাই ছিটায়নি। এর মাধ্যমে বিদেশী বন্ধুদের বিরত করার বদখেয়াল কারো ছিল বলে মনে হয়নি। সরকার কূটবুদ্ধিতাড়িত হয়ে হয়তো চায়নি মিডিয়ায় বিরোধীদলীয় নেত্রীর সরব উপসি'তি। বিদেশী বন্ধুদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর খবরের সাথে বিরোধীদলীয় নেত্রীর খবরটা সবাই জানুক- এটাই যেন অসহ্য বিষয় হলো। স্মৃতিসৌধে যাওয়ার পথে বিরোধীদলীয় নেত্রীর ‘যাত্রাভঙ্গের’ কারণটাও অসহিষ্ণু আচরণেরই অংশ। ক্রিকেট নিয়ে বিদ্রূপও রুচিবোধ এবং সাধারণ ভদ্রতাকে আহত করে। আমরা জানি না এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম কী সবক পেল, আর ঢাকায় অবস'ানরত বিদেশী বন্ধুরাই বা কী মেসেজ গ্রহণ করল। এসব কর্মকাণ্ডকে কি শুধুই বাড়াবাড়ি বলা হবে! নাকি উসকানিমূলক কাজে উগ্রতার বহিঃপ্রকাশ ভাবা হবে। সরকার কি চাচ্ছে বিরোধী দল বা জোট নো রিটার্ন পয়েন্টে চলে যাক? হয়তো বা সেটাই সরকারের গোপন ইচ্ছা।

প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন দাঁড়ায়- সরকার কি নৈতিক পরাজয়ের সাথে সাথে ব্যর্থতার অনুশোচনায় আক্রান্ত? হয়তো বা তাই। নয়তো এত সব অগণতান্ত্রিক ও আত্মঘাতী তৎপরতার ব্যাখ্যা করা কিভাবে সম্ভব। গণতান্ত্রিক পথ ও পন'া রুদ্ধ করে দেয়ার গোপন ইচ্ছা সক্রিয় না থাকলে কোনো সরকারই দেশকে অসি'র ও অসি'তিশীল করতে চায় না। বর্তমান সরকারের অনেক আচরণই গণতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণার বিচারে অগ্রহণযোগ্য। এর শেষ কোথায়? এভাবে আর কত দিনই বা চলবে- এ জিজ্ঞাসার মধ্যেই জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিহিত রয়েছে।
digantaeditorial@gmail.com

মঙ্গলবার, ২৭ মার্চ, ২০১২

দুই কান লাল



সৈয়দ আবুল মকসুদ | তারিখ: ২৮-০৩-২০১২

বাংলাদেশের জনগণের নেতারা গণতন্ত্রের প্রবল প্রেমিক। রাজনৈতিক নেতাদের মুখ ও দেশের মাইকগুলোর মুখ যখন সভা-সমাবেশে নিকটবর্তী হয়, তখন বোঝা যায় গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে তাঁদের কী সীমাহীন আগ্রহ ও প্রচেষ্টা। মানুষ যেমন ঘরে বাস করে, গণতন্ত্রেরও একটা ঘর আছে। সেই ঘরের ইংরেজি নাম পার্লামেন্ট। আমরা বাংলা করেছি জাতীয় সংসদ। তাই নেতারা অব্যাহতভাবে বলেন: তাঁদের সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হবে সংসদ। নেতারা রাশি রাশি কথা বলেন। তাঁদের কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু যে সংসদকক্ষ হবে, এটা তাঁদের একমাত্র না হলেও সবচেয়ে সত্য কথা। কোন ভোটারের বাবার সাধ্য এ কথা অস্বীকার অথবা অবিশ্বাস করে?
গণতন্ত্র বাতাসের মতো। তা চোখে দেখা যায় না, অনুভব করা যায় এবং গণতন্ত্রের সেই বাতাসের প্রকাশ ঘটে জনপ্রতিনিধিদের কর্মকাণ্ড ও বক্তৃতার মাধ্যমে। সংসদকক্ষের বাসিন্দা হলেন জনপ্রতিনিধিরা। সংসদকে আইনসভাও বলা হয়। সেখানে আইনকানুন তৈরি হয়, প্রচলিত অপ্রয়োজনীয় আইন পর্যালোচনা করে তা বাতিল বা সংশোধন করা হয়। আইনকানুন রচনার কাজ না থাকলে জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। পার্লামেন্টারিয়ানদের মুখই হলো পুঁজি। সুতরাং তাঁরা সুবক্তাও হন। বক্তার মুখনিঃসৃত যুক্তিসমৃদ্ধ বাণীকেই ভালো বক্তৃতা বলা হয়।
আইনসভাগুলো এখন অনেক গণতান্ত্রিক দেশেই জনপ্রতিনিধিদের ‘সকল কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু’ হয়ে উঠছে। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারতের কথাই ধরা যাক। মুঠোফোনে ‘অশ্লীল ভিডিও’ দেখা, গালিগালাজ করা প্রভৃতি মানুষের কর্মকাণ্ডের মধ্যে গণ্য। সুতরাং তা শুধু নিজের ঘরের মধ্যে বসে না করে সংসদকক্ষে বসে বা দাঁড়িয়ে মাইকের সামনে করতে অসুবিধা কি? কিছুদিন আগে ভারতের কর্ণাটকের তিন মন্ত্রী মুঠোফোনে পর্নো ছবি দেখতে গিয়ে সাংবাদিকদের হাতে ধরা পড়েছেন। দলীয় পরিচয়ে অভিযুক্তরা হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টির সদস্য।
নরেন বাবুর গুজরাট আইনসভায়ও একই মজাদার ঘটনা ঘটেছে। অধিবেশন চলাকালে পানিসম্পদ বিভাগের জন্য বাজেট-সহায়তা নিয়ে আলোচনা চলছিল। তখন এক সদস্য তাঁর পাশে বসা আরেক সদস্যকে তাঁর ট্যাবলেট পিসিতে ছবি দেখাচ্ছিলেন। আগে আমরা জানতাম বিজিপি শুধু হিন্দু ধর্ম নিয়ে আছে। এখন জানা গেল তারা ধর্ম, শিল্পকলা ও আদিরস নিয়েও সমান মশগুল। দুই বন্ধু প্রথমে দেখছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের ছবি, তারপর কার্টুন ছবি এবং সব শেষে শুরু করেন নগ্ন নারী মডেলের অপূর্ব ছবি দেখা।
তাঁদের ওই আনন্দঘন মুহূর্তটি ধরা পড়ে এক সাংবাদিকের ক্যামেরায়। সাংবাদিক স্পিকারের কাছে অভিযোগ করেন। তিনি প্রথম স্পিকারের পিএকে বিষয়টি জানান। পিএ গিয়ে স্পিকারকে জানান। এরপর আইপ্যাডটি অধিবেশনকক্ষ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনাটি তদন্ত করতে একটি বিশেষ কমিটিকে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন। (প্রথম আলো, ২২ মার্চ)
স্পিকার নিজের কক্ষে ভিডিওটি দেখতে চেয়েছেন কি না, তা খবরে জানা যায়নি। মডেলের নগ্ন ছবিটি সত্যি সত্যি অশ্লীল কি না, তা যাচাই করতে চাওয়া দোষের নয়। জনপ্রতিনিধিরই তা করা উচিত।
সংসদকে শুধু সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু নয়, প্রাণবন্তও নাকি দেখতে চায় গণতন্ত্রকামী মানুষ। কোনো কোনো দেশের সংসদ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে খিস্তিখেউড়ে। যৌন ছবি চোখ দিয়ে দেখতে হয়। একসঙ্গে দু-চারজনের বেশি দেখতে পারেন না। খিস্তিখেউড় যৌন ছবির মতোই অশ্লীল এবং তা দু-চারজন নয়, বধিররা ছাড়া একসঙ্গে কোটি কোটি মানুষ শুনতে পায়। সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যদের খিস্তি-বিনিময়ে সংসদ হয়ে ওঠে সাংঘাতিক এবং ‘প্রাণবন্ত’, আর জনগণের হয়ে ওঠে দুই কান লাল।
তবে শুধু সংসদে নয়, কোনো কোনো হতভাগ্য দেশে জননেতা ও জনপ্রতিনিধিরা জনসভাগুলোকেও করে তুলছেন প্রাণবন্ত। অনেক রকম বৃত্তান্তের সঙ্গে বংশ-বেত্তান্তও উঠে আসছে। তবে প্রতিপক্ষের নানা-নানি, দাদা-দাদি, খালা-খালু, মাসি-পিসি নিয়ে যত কম বলা যায়, ততই জনগণের কান কম লাল হয়। আর একটি জিনিস আমাদের মতো সাধারণ মানুষের চেয়ে নেতাদের মতো জ্ঞানীরাই ভালো জানেন যে এই জগতে কারও জন্ম হবে আঁতুরঘরে, কারও ম্যাটারনিটি হাসপাতালে, কারও জন্ম চা-বাগানে, কারও রাবার বাগানে, কারও বা গোলাপ-বাগানে। জন্মের জায়গাটি মানুষের জীবনকে সার্থক করে না, মানুষের জীবন সার্থক কর্মে। এক শিশুর জন্ম হয়েছিল দীনতম কাঠের ঘরে। তিনি হলেন সবচেয়ে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি। সেখানকার কংগ্রেসে তাঁর জন্মলগ্ন ও জন্মের স্থান নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।
কোনো কোনো দেশে সংসদে একসঙ্গে এক দল থাকাই ভালো। এক দল থাকলে জনগণের এক কান লাল হয়। দুই দল একসঙ্গে সংসদে থাকলে দুই কান হয় রক্তিম। অর্থাৎ এমন ব্যবস্থা করা উচিত যেন যেদিন সরকারি দল সংসদে থাকবে, সেদিন বিরোধী দলের থাকার প্রয়োজন নেই। যেদিন বিরোধী দল সংসদে পদধূলি দেবে, সেদিন সরকারি দলের ছুটি। তাতে অন্তত একটি কান বাঁচবে।
 সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

সোমবার, ১৯ মার্চ, ২০১২

জনসভা ওরফে মহাসমাবেশের উপকথা

১২ মার্চের মহাসমাবেশের দিন রাজপথে মিছিল ও পুলিশসৈয়দ আবুল মকসুদ | তারিখ: ২০-০৩-২০১২

১২ মার্চের মহাসমাবেশের দিন রাজপথে মিছিল ও পুলিশ
হোসেন শাহি বাংলায় জনসভা হতো না, মহাসমাবেশ তো নয়ই। তবে ধর্মসভাগুলোতে বহু মানুষের সমাগম হতো বলে ধারণা করি। আলিবর্দীর শাসনামলে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যায় মহাসমাবেশের রেওয়াজ ছিল বলে কোনো বইয়ে পাইনি। হোসেন শাহি রাজত্বে ও নবাবি আমলের বাংলায় গণতন্ত্র ছিল না। গণতান্ত্রিক রাজনীতির যেদিন থেকে সূচনা, সেদিন থেকে জনসভা ওরফে মহাসমাবেশেরও জন্ম। কুড়ি শতক পর্যন্ত যা ছিল জনসভা ও সমাবেশ, একুশ শতকে এসে তা প্রমোশন পেয়ে হয় জনসমুদ্র ও মহাসমাবেশ।
আঠারো শতকে মজনু শাহরা, ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহের নায়কেরা, হতদরিদ্র কৃষক-তাঁতিদের নিয়ে জনসমাবেশ করেছেন। তাঁদের যে ব্রিটিশ শাসক ও জমিদার মহাজনদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে, সে কথা তাঁদের ডেকে বুঝিয়েছেন। মীর নিসার আলী ওরফে তিতুমীর দরিদ্র কৃষক প্রজাদের নিয়ে সমাবেশ করে থাকবেন। হাজি শরীয়তুল্লাহ খাজনা বন্ধের আগে মুসলমান প্রজাদের নিয়ে সমাবেশ অবশ্যই করেছেন। তবে তিতুমীর ও শরীয়তুল্লাহর সমাবেশের জন্য খুব বড় মঞ্চ, লাখ লাখ চাররঙা পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন অথবা অগণিত মাইকের প্রয়োজন হয়নি।
কংগ্রেসের প্রথম আঠারো বছর জনসভার কোনো বালাই ছিল না। বছরে একবার বার্ষিক অধিবেশন বা সম্মেলন করতেন। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সারা দেশ থেকে সেজেগুজে আসতেন। সম্মেলন সাধারণত ঘরের মধ্যেই হতো। কখনো বাইরে প্যান্ডেল করে নেতারা ইংরেজিতে বক্তৃতা করতেন। প্রধান দাবি সরকারি চাকরি-বাকরিতে উচ্চশিক্ষিত হিন্দুদের কোটাটা বাড়ানো। নেতাদের কাছে জনগণের সমস্যার কোনো মূল্য ছিল না।
শতাব্দীর শুরুতে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ গঠনের ঘোষণা আসতেই কংগ্রেসের নেতাদের তন্দ্রার ভাবটা কেটে যায়। গা ঝাড়া দেন। সরকারি চাকরি তো দূরের কথা, এবার পূর্ব বাংলার জমিদারিটাও বুঝি হাতছাড়া হয়ে যায়। রাতারাতি নেতারা রাস্তায় নামেন। শুধু নেতাভিত্তিক আন্দোলনে সুবিধা হবে না, সরকারের টনক নড়বে না। হিন্দু প্রজাদেরও সঙ্গে না রাখলে কাজ হবে না। শুরু হলো জনসভার আনুষ্ঠানিক জয়যাত্রা। দেশব্যাপী সভা-সমাবেশ। তবে মহাসমাবেশ নয়। শুধু জনসভার জয়যাত্রা নয়, শুরু হলো নেতা-পূজাও। সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি হেঁটে বা ঘোড়ার গাড়িতে নয়, কর্মীদের কাঁধে চড়ে সভাস্থলে যাওয়াটাই পছন্দ করতেন। দ্বিতীয় দশকে গান্ধী রাজনীতিতে প্রবেশ করে মানুষের কাঁধে চড়ার প্রথা বাতিল করলেন। নেতাকে কাঁধে বহনের রেওয়াজ এখনো থাকলে মারাত্মক সমস্যা হতো। কারণ, নেতৃত্ব আর একচেটিয়া পুরুষের হাতে নেই।
মাইক-পূর্ব জনসভায়ও হাজার হাজার মানুষ হতো কুড়ি শতকের তৃতীয় দশক পর্যন্ত। কোনো কোনো নেতার কণ্ঠস্বর ছিল বাঘের মতো। বস্তুত, যাঁর গলায় যত জোর, তিনি তত বড় নেতা। তবে খালি গলায় বক্তৃতা যত জ্বালাময়ীই হোক, তা সব শ্রোতার কান পর্যন্ত পৌঁছাত না। তাহলে উপায়? সামনের দিকে যেসব শ্রোতা নেতার কথা শুনেছেন, তাঁরা ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের শ্রোতাদের তা বলে দিতেন। এভাবে একেবারে পেছন পর্যন্ত বক্তব্য পৌঁছে যেত।
জনসভা গণতান্ত্রিক রাজনীতির অপরিহার্য অংশ। জনসভা নেই তো তাদের রাজনীতিও নেই। একদিক থেকে ডেমোক্র্যাটদের চেয়ে বিপ্লবীরা ভালো। জনসভার নাম-গন্ধ তাঁদের অভিধানে নেই। তাঁদের অতি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং তাঁরা করেন ঘরের মধ্যে নিশ্ছিদ্র গোপনীয়তায়। অথবা কোনো গহিন অরণ্যে, যার পাঁচ মাইলের মধ্যে কোনো মানুষের ছায়াটিও নেই। গোয়েন্দাদের বাবারও সাধ্য নেই যে তাঁদের সভার বিষয়বস্তু নোট করেন। নেতা এক বাক্য বলে চোখ নিমীলিত করেন। তারপর তিন মিনিট নীরবতা। পরবর্তী বাক্যের অর্ধেক বলে মার্ক্স ও মাওয়ের ছবির দিকে তাকান। যেন সেখান থেকে কোনো নির্দেশ আসবে। কিন্তু ছবি কোনো কথা বলে না। এক দিন এক রাত দুই-তিনটি ‘তত্ত্ব’ নিয়ে আলোচনা হয়। শেষটায় একপক্ষ বলে, সোজা সশস্ত্র বিপ্লব। আরেক পক্ষ থিসিস দেয়—বিপ্লবের স্তর আসে নাই। গেল পার্টি ভেঙে। বিপ্লবের রূপরেখা হয়ে গেল। জনগণ কিছুই জানল না।
বুর্জোয়া গণতন্ত্রীদের নিয়ে সে সমস্যা নেই। দেশের লোককে ডেকে মনের কথা, দলের পরিকল্পনার কথা গলায় যত জোর আছে তা দিয়ে, দুই হাত প্রসারিত করে, জনতাকে জানিয়ে দেন। নেতা করেন দুই হাত প্রসারিত আর জনতা দুই হাত কাছাকাছি এনে মারে সজোরে করতালি। এভাবে নেতা ও জনতায় মিলে দেশ উদ্ধার। মহাসমাবেশ থেকে ঘরে ফিরে আসার আগে মানুষ বুঝতেই পারে না, নিজেদের জন্য ভালো কিছুর ব্যবস্থা করে এল, না কপালে পেরেক ঠুকে দিয়ে এল।
প্রাচীন ঐতিহাসিক নগর ঢাকাতেই বহু ঐতিহাসিক জনসভা হয়েছে গত ১১০ বছরে। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তায় হয়ে গেল সর্বশেষ দুই ঐতিহাসিক মহাসমাবেশ। ব্রিটিশ যুগে খুব বড় জনসভা হতো করোনেশন পার্কে, বুড়িগঙ্গার তীরে। সদরঘাটের সেই পার্ক এখন উধাও হয়ে গেছে। এখন সেখানে মার্কেট প্রভৃতি। গান্ধীজিও করোনেশনে বক্তৃতা করেছেন। মাওলানা মোহাম্মদ আলী, মাওলানা শওকত আলীরাও করেছেন, চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষ বসুও করেছেন। সেকালে কিছু জনসভা হতো ভিক্টোরিয়া পার্ক বা বাহাদুর শাহ পার্কের সামনে।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ববঙ্গের সবচেয়ে বড় জনসভাটি হয় রেসকোর্স ময়দানে, এখন যা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। গভর্নর জেনারেল মুহম্মদ আলী জিন্নাহ ওই জনসভায়ই পাকিস্তানের ললাটে পেরেক ঠুকে দিয়ে যান। বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যও নির্ধারিত হয়ে যায়। পাকিস্তান আমলে বড় বড় জনসভা হতো আরমানিটোলা মাঠে, গেন্ডারিয়ার ধূপখোলা মাঠে এবং পল্টন ময়দানে। জীবনে প্রথম সবচেয়ে বড় যে জনসভাটিতে আমি উপস্থিত ছিলাম, সেটি ১৯৫৬-তে। ঢাকা স্টেডিয়ামের সেই সভায় চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন-লাই ভাষণ দেন। মঞ্চে ছিলেন আর দুজন নায়ক—প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী।
জনসভা করা কোনো ছেলেখেলা নয়। জনসভার আয়োজন করা একধরনের আর্টও বটে। নৃত্যনাট্য মঞ্চস্থ করতে যে নৈপুণ্যের দরকার, জনসভা আয়োজন করা তার চেয়ে কম দক্ষতায় সম্ভব নয়। নেতা জনসভার স্থান, তারিখ ও সময় ঘোষণা করেই খালাস। পরের দায়িত্ব অন্য মাঝারি নেতা ও কর্মীদের। দক্ষতার সঙ্গে জনসভার ব্যবস্থা করতে করতেই অনেক পেশিবহুল কর্মী নেতা হয়ে ওঠেন।
প্রথম হলো জনসভার প্রচারের ব্যবস্থা করা। সে জন্য মাইকসহ ঘোষণাকারী ভাড়া করা হয়। জনসভার সপ্তাহ খানেক আগে থেকে পাড়া-মহল্লার মানুষের দুপুরের ঘুম হারাম। বিকট জোরে মাইকে ঘোষিত হতো: ভাই সব, আগামী ২০ মার্চ রোজ মঙ্গলবার ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে বি-রা-ট জনসভা। প্রধান অতিথি হিসেবে ওই সভায় গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিবেন বাংলার গণমানুষের নেতা, অমুক আন্দোলনের মহান রূপকার, কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের নয়নের মণি, জনগণের অধিকার আদায়ে আপসহীন কণ্ঠ ইত্যাদি ইত্যাদি...জাতীয় নাজাত পার্টির চেয়ারম্যান হিম্মত আলী তালুকদার। বক্তাদের বিশেষণ প্রভৃতি বলা যদি শুরু হতো পুরানা পল্টন থেকে, তাদের নামটি ঘোষিত হতো ফকিরাপুল বাজারে গিয়ে।
বাংলার মাটিতে সবশেষ দুটি মহাসমাবেশে যোগ না দিয়ে ঘরে বসেই উপভোগ করেছি সাত দিন ধরে। গত সপ্তাহের কথা। জীবনের বৃহত্তম জনসভাটিতে যোগ দিই আজ থেকে ৪১ বছর ১৩ দিন আগে। লাখ লাখ মানুষ রেসকোর্স ও তার আশপাশের রাস্তায়। কাউকেই গলায় গামছা দিয়ে বাড়ি থেকে টেনে আনা হয়নি। সেকালে বড় বাসও ছিল না। তাই বাস ভাড়া করার উপায় ছিল না লোক আনতে। চাররঙা পোস্টার ছিল না। ব্যানার-ফেস্টুন ছিল খুবই সামান্য। নানা কথা লেখা গেঞ্জি গায়ে দেওয়া শ্রোতাও ছিল না।
১৫ বছর যাবৎ যত জনসভা/মহাসমাবেশ হচ্ছে, তার প্রতিটি ‘স্মরণকালের বৃহত্তম জনসভা’। নেতাদের বক্তৃতার ভাষাও অনবদ্য। সংগত কারণে প্রতিপক্ষকে সমালোচনা করা দোষের নয়। খিস্তিখেউড় কত প্রকার, তা জনসভায় গেলে শোনা যায়। অংশবিশেষ শোনা যায় টিভির পর্দায়। একালে নেতারা ভাষণ দেন জেম্স জয়েস, ভার্জিনিয়া উল্ফ বা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর চেতনাপ্রবাহ রীতিতে। কী বলছেন তাঁরাও জানেন না, শ্রোতারাও বোঝে না। কেন তাঁরা অমন ভাষা ব্যবহার করেন, তা মনোবিশ্লেষকেরা ভালো বলতে পারবেন।
বাংলার মাটিতে গত ১২ মার্চের মহাসমাবেশটি ছিল মানবেতিহাসের এক অভূতপূর্ণ সমাবেশ। মহাসমাবেশে কী ঘটবে তা রাষ্ট্রের মহাব্যবস্থাপকেরা অলৌকিকভাবে মাস দেড়েক আগেই জেনে যান। আমাদের সরকারি দলগুলোর নেতারা, পুলিশ-গোয়েন্দারা ভবিষ্যতে কী ঘটবে, তা সবই জানেন। যা ঘটে যায়, সে সম্পর্কে তাঁরা নীরব। তারস্বরে বলা হতে লাগল, ওই দিন অঘটন ঘটবে, নাশকতা হবে। তাই মানুষের ‘জানমাল’ বাঁচাতে মহাসমাবেশের দুই-তিন দিন আগেই বন্ধ রইল ঢাকামুখী কিছু ট্রেন। কারণ, ট্রেন চললে নাশকতাপন্থীরা উড়িয়ে দিতে পারে। বন্ধ রাখা হলো বাসসহ সড়ক পরিবহন। বাস চললে তা পুড়িয়ে দিতে পারে। সদরঘাটের ত্রিসীমানায় আসতে পারল না লঞ্চ-স্টিমার। ‘ওরা’ ডুবিয়ে দিতে পারে। যাঁরা কোনো রকমে দক্ষিণ বাংলা থেকে এসেছিলেন, তাঁরা আটকে রইলেন বুড়িগঙ্গার পচা পানিতে। যাঁরা নৌকায় নামার চেষ্টা করলেন, তাঁদের অনেকের পিঠে পড়ল লাঠির বাড়ি। পুলিশকে সহযোগিতার জন্য ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে ও নদীর মধ্যে ছিলেন সশস্ত্র স্বেচ্ছাসেবক।
মহাজোট সরকার রবিঠাকুরের অতি ভক্ত। তাই সরকার ও গোয়েন্দারা জনগণের উদ্দেশে বললেন: ‘ওগো আজ তোরা যাসেন ঘরের বাহিরে।’ মানুষের যাতায়াতের সব পথ বন্ধ রইল। কিন্তু তার পরও দেখা গেল মহাসমাবেশের দিন নয়াপল্টনে ‘তিল ঠাঁই আর নাই রে’।
প্রজাতন্ত্রের ম্যানেজাররা বুঝতে চেষ্টা করলেন না, রাজধানীতে মানুষ সুষ্ঠু জনসভায় যোগ দিতে আসে না। এখানে জীবিকাপ্রত্যাশী চাকরির ইন্টারভিউ দিতে আসেন, ব্যবসার জন্য আসেন, চিকিৎসার জন্য আসেন, মরণাপন্ন রোগীকে দেখতে আসেন, প্রেমপিরিত করতেও আসেন। তাঁদের যাতায়াতে বাধা দেওয়া মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। সমাবেশকে টিভি চ্যানেলে প্রচার করতে বাধা দেওয়া মতপ্রকাশের অধিকারে হস্তক্ষেপ শুধু নয়, সংবিধানের ৩৬, ৩৭ এবং ৩৯ অনুচ্ছেদকে অস্বীকার করা।
১৪ মার্চের সমাবেশটি ছিল ১২ তারিখের সমাবেশের জবাব। ঢাকায় আসার সব দরজা খুলে দেওয়া হলো। শুধু ঢাকার অল্প মানুষে কুলাবে না বলে শত শত বাসে বাইরে থেকে আনা হলো লোক। সরকারি অফিসগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেওয়া হলো সভা-সমাবেশে যোগ দেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা। সম্ভব হলে সব হাসপাতাল ও ক্লিনিকের রোগীদেরও অ্যাম্বুলেন্স ও স্ট্রেচারে করে আনা হতো বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে।
জনসভাকে মনে হয় রাজনৈতিক বিষয়। আমাদের দেশে এখন তা অর্থনীতির বিষয়ও। জনসভা রাখছে মৃতপ্রায় অর্থনীতিকে সচল। মহাসমাবেশ নিয়েও একদিন গবেষণা হবে। বাংলা বিভাগ করবে ‘বাংলা কবিতায় জনসভা প্রসঙ্গ’ অথবা ‘জনসভা বাঙালি নেতাদের ভাষা প্রয়োগ: একটি মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ’। ইতিহাস বিভাগ বসে থাকবে না। তারা করবে ‘বাঙালির অধঃপতনের জনসভার ভূমিকা’। অর্থনীতি বিভাগকে করতে হবে বহু গবেষণা। মাইক ভাড়ায় কত টাকা আয়-ব্যয়। মঞ্চ বানাতে বাঁশ, তক্তা, কাপড়, পেরেক, গজাল, দড়ি প্রভৃতি কেনাকাটা। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, পরিবহন সেক্টরে মহাসভার প্রভাব। ক্লিনিকের মালিকদের কথাও আসবে। তাঁদের এক-একটি সমাবেশের আগে-পরে কেমন আয় হয়। রুম ভাড়া, ডাক্তারের ফি, ব্যান্ডেজ, কটন, ওষুধ প্রভৃতিতে টাকার লেনদেন অর্থনীতিতে অবদান রাখে।
ছাপাখানার আয় তো সীমাহীন। চাররঙা পোস্টার বিদেশি কাগজে ছাপা। পোস্টার সাঁটাতে শত শত শ্রমিক নিয়োগ। এ কালের জনসভায় বাঁশের ভূমিকাই বেশি। মঞ্চ বানানো থেকে স্বেচ্ছাসেবকদের সদ্ব্যবহারের জন্য উজাড় হয় বাঁশঝাড়। তবে প্রধান বিষয় হলো মহাসমাবেশ উপলক্ষে চাঁদা সংগ্রহ। সমাবেশ করতে যদি ব্যয় ধরা হয় ৩০ লাখ, চাঁদা ওঠে পাঁচ কোটি।
মহাসমাবেশ নিয়ে উপাখ্যান লেখা যায়, কড়ি দিয়ে কিনলাম-এর মতো উপন্যাস লেখা যায়, গবেষণা করা যায়; কিন্তু এ কথাও কবুল করতে হবে, অর্থপূর্ণ একটি জনসভাই একটি জাতির ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিতে পারে। সে দৃষ্টান্ত বাঙালির ইতিহাসে আছে। অন্যদিকে অর্থহীন মহাসমাবেশ জনগণের জীবনে নিয়ে আসে মহা দুর্দশা।
সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

আন্তঃনদী-সংযোগ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা

সিরাজুর রহমান

সভ্যতার আদি ধ্যানধারণা অনুপ্রাণিত হয়েছিল শান্তিপূর্ণ পারস্পরিক সহাবস'ানের স্বপ্ন থেকে। তুমি বেঁচে থাকো, আমাকেও বাঁচতে দাও- এটা সভ্য সমাজের খুঁটি। এর ব্যতিক্রম করা হলে অশান্তি ঘটে। আমাকে আক্রমণ করা হলে আত্মরক্ষার জন্য পাল্টা আঘাত হানার অধিকার আমার থাকবে- এ বিশ্বাস সব সভ্য সমাজের আইনেও স্বীকৃত। দুর্ভাগ্যবশত মানবজাতি সব সময় সুসভ্য আচরণ করেনি, পরের অধিকারকে সম্মান করতে শেখেনি। তার পরিণতি কখনো মানবজাতির জন্য কল্যাণকর হয়নি। জ্ঞাত ইতিহাসের অজস্র হানাহানি আর যুদ্ধবিগ্রহ তারই পরিণতি।
অথচ মানবজাতি সাধারণভাবে শান্তিতে বেঁচে থাকতে চেয়েছে। মানবজাতিকে শান্তির পথে চলতে সাহায্য করার আশায় প্রথম মহাযুদ্ধের পর লিগ অব নেশনস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সে সংস'া যথেষ্ট শক্তি সংগ্রহ করতে পারেনি। জাতিগুলো সংস'ার বিধিমালা মেনেও চলেনি। জার্মানি ও ইতালির ফ্যাসিস্ট শক্তি প্রথমে ইউরোপ ও পরে গোটা বিশ্বের ওপর প্রভুত্ব বিস্তার করতে চেয়েছিল। একপর্যায়ে জাপানও এই উন্মাদ উচ্চাভিলাষে শরিক হয়। কয়েক কোটি লোক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মারা গিয়েছিল, মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রা কয়েক যুগ পিছিয়ে গেছে সে যুদ্ধে। জাতিসঙ্ঘের পত্তন হয়েছে সব দেশ ও জাতির গ্রহণযোগ্য বিধিমালা প্রণয়ন করে যুদ্ধবিগ্রহের প্রয়োজনীয়তার অবসান করা এবং বিশ্বশান্তি নিরাপদ করার লক্ষ্যে।
‘পরস্য অপহরণ’- অন্যের যা আছে আমি নেব, অন্যের ভাগটা আমি ভোগ করব, এই প্রলুব্ধতা সর্বকালেই সভ্যতার প্রতি প্রধান হুমকি হয়ে রয়েছে। জাতিসঙ্ঘ সনদের মোটামুটি সাধারণ স্বীকৃতি-সমর্থনের কারণে পরের দেশ দখলের প্রবণতা হ্রাস পেলেও পরের সম্পদ অপহরণের স্পৃহা বরং বেড়েই চলেছে।
এ প্রবণতা সবচেয়ে লক্ষ্যমান নদীর পানির ব্যাপারে। নদীগুলো অনাদিকাল থেকে পাহাড়-পর্বত ও উচ্চভূমি থেকে বহু দেশ পেরিয়ে সমুদ্রে পড়ে। জনবসতি বৃদ্ধি ও প্রযুক্তির বিকাশের ফলে চাষবাসে সেচ এবং পানি-বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নদীর পানির ব্যবহার অভাবনীয় রকম বেড়ে গেছে। উজানের দেশগুলোর অত্যধিক চাহিদার কারণে ভাটির দেশ প্রায়ই তাদের ন্যূনতম প্রয়োজনীয় পানিও পাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বিগত তিন দশক থেকে হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছেন যে, ভবিষ্যতের বড় যুদ্ধগুলোর কারণ হবে নদীর পানির হিস্যা নিয়ে বিরোধ।
জাতিসঙ্ঘ এ দিকেও মনোযোগ দিয়েছে। একাধিক দেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত নদনদী সম্বন্ধে জাতিসঙ্ঘ কনভেনশনের (চুক্তি) পঞ্চম ধারাটি ১৯৯৭ সালের ২১ মে ১০৪-৩ ভোটে গৃহীত হয়েছে। এতে নদীর পানিসম্পদের সুষম ব্যবহার তীরবর্তী দেশগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কনভেনশনের ৭ নম্বর ধারায় নদীতীরবর্তী অন্য দেশগুলোর ‘উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না করার জন্য যথোপযুক্ত ব্যবস'া নেয়া’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নদীর পানি নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের বর্তমান স্বার্থের সঙ্ঘাতকে জাতিসঙ্ঘ কনভেনশনের পঞ্চম ও সপ্তম ধারার আলোকে বিবেচনা করতে হবে। ভারত দ্রুত উন্নয়নমুখী দেশ। কৃষির জন্য সেচ, কলকারখানার প্রয়োজন আর পানি-বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ভারত অভিন্ন নদীগুলোতে অবিরাম বাঁধ নির্মাণ করে চলেছে। অভিন্ন নদীগুলোতে ভারত এযাবৎ ৫০টিরও বেশি বাঁধ তৈরি করেছে। মাত্র গত সপ্তাহে বৃহত্তর সিলেটের ভেতর দিয়ে প্রবহমান সারি নদীর উজানে নতুন তৈরী পানি-বিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্বোধন হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের (সরকারের নয়) প্রবল প্রতিবাদ অগ্রাহ্য করে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের কাজও দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতির ওপর ভারতের এসব প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়া হবে অভাবনীয়। বাংলাদেশ সীমান্তের উজানে গঙ্গা নদীর ওপর ফারাক্কা বাঁধের প্রভাব বিবেচনা করলেই দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়া পরিষ্কার হয়ে যাবে। ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে ষাটের দশক থেকে সাবেক পাকিস্তানের সরকার প্রবল প্রতিবাদ করে আসছিল। সে কারণে বাঁধটি তৈরি হলেও চালু হতে পারেনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান মাত্র ১৪ দিনের জন্য ‘পরীক্ষামূলকভাবে’ ফারাক্কা বাঁধ চালু করতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর প্রস্তাবে সম্মত হন। কিন' সে ১৪ দিন এখন চিরস'ায়ী হয়ে গেছে। শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়ার সাথে ফারাক্কায় গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি করেন। চুক্তিতে সি'র হয়েছিল যে, খরার মওসুমে বাংলাদেশকে ৩০ হাজার কিউসেক (বাংলাদেশের প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম) পানি দেয়া হবে। কিন' সে পরিমাণ পানিও বাংলাদেশ কোনো বছরই পায়নি।


শুকনো পদ্মা আর রবীন্দ্রনাথের কবিতা
পরিণতিতে গঙ্গার বাংলাদেশ অংশ পদ্মার বেশির ভাগ শুকনো মওসুমে স্রোত থাকে না। পলি জমে জমে নদীর তলা উঁচু হয়ে শুকিয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন : ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে/বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে/পার হয়ে যায় গরু পার হয় গাড়ি/ দুই ধার উঁচু তার/ ঢালু তার পাড়ি।’ পদ্মা ছোট নদী নয়। প্রমত্তা পদ্মাকে নিয়ে বহু কবিতা, গান ও কাহিনী লেখা হয়েছে। কিন' এখন পদ্মায় সব সময় ‘হাঁটুজলও’ থাকে না। মানুষ, গরু আর গাড়ি অনায়াসে এ নদী পার হয়। পানির অভাবে পঞ্চাশ আর ষাটের দশকে জাতিসঙ্ঘের উদ্যোগে তৈরী গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্প অকেজো হয়ে গেছে। বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল শুকনো মওসুমে মরুভূমির মতোই উষর। দেশের পশ্চিমাঞ্চলের নদী মোহনাগুলো পলি জমে জমে উঁচু হয়ে গেছে। জোয়ারে আর সামুদ্রিক বানে বঙ্গোপসাগরের নোনা পানি নদীর উজানে এলে আর নামতে পারে না। লবণাক্ততার কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার একর উর্বর জমি অনাবাদি হয়ে যাচ্ছে।
বর্ষায় ভারতীয়রা তাদের বাঁধ রক্ষার জন্য স্লুইস গেটগুলো খুলে দেয়। বর্ষার স্বাভাবিক বৃষ্টি আর স্‌্েরাতের সাথে এই বাড়তি পানি যুক্ত হয়ে ধেয়ে আসে পদ্মা, মেঘনা প্রভৃতি বাংলাদেশের নদীগুলোতে। শুকিয়ে যাওয়া নদীতল সে পানি ধরে রাখতে পারে না। নদীর পার ভাঙে, হাজার হাজার একর উর্বর জমি হারিয়ে যায়। নদীর দুই তীর বন্যায় ডুবে যায়। নদীতল ক্রমেই উঁচু হচ্ছে বলে প্রতি বর্ষায় বন্যা বেশি থেকে আরো বেশি এলাকা ডুবিয়ে দিচ্ছে, সে পানি নেমে যেতেও বেশি থেকে বেশি সময় লাগছে। বন্যায় বার্ষিক ফসল হানি অপরিমেয়। অর্থাৎ ভারতের তৈরী বাঁধগুলো হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য শাকের করাত, যেতেও কাটে, আসতেও কাটে। খরা ও বর্ষা- উভয় মওসুমেই বাংলাদেশের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে।
এই হচ্ছে একটি নদী-পদ্ধতির মর্মান্তিক দুর্দশা। তিস্তা-পদ্ধতির অবস'াও এখন সমানেই মর্মান্তিক। টিপাইমুখ বাঁধ চালু হলে সুরমা-কুশিয়ারা-মেঘনা অঞ্চলও একই রকম ঊষর হয়ে যাবে। শুধু যে ইলিশ মাছ আর আসবে না বাংলাদেশে তাই নয়, বাংলাদেশের পূর্বাংশের পরিবেশ প্রাণী উদ্ভিদ সব কিছু বদলে যাবে।
অর্থাৎ নদীর পানিসম্পদের ‘সুষম ব্যবহার’ করার জন্য জাতিসঙ্ঘ কনভেনশনের পঞ্চম ধারার এবং ‘অন্য দেশের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না করার জন্য যথোপযুক্ত ব্যবস'া নেয়ার’ যে বিধান সে কনভেনশনের সপ্তম ধারায় আছে ভারত ইতোমধ্যেই তা অমান্য করে চলেছে। তার ওপর ১৯৮২ সালে ভারত একটা ‘মেগা প্রকল্প’ তৈরি করেছে উত্তর-পূর্ব ভারতের নদীগুলোকে একটি খাল দিয়ে সংযুক্ত করে সেসব নদীর পানি মধ্য ভারতের ঊষর অঞ্চলে সেচের জন্য নিয়ে যেতে। ভারতের সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর মানুষ এ প্রকল্পের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করে। এত বছর পর সুপ্রিম কোর্ট গত সপ্তাহে সে মামলার চূড়ান্ত রায় দিয়েছেন। রায়ে মেগা প্রকল্পকে বৈধ ঘোষণা করে পরিবেশ-সংক্রান্ত সব ভারতীয় আপত্তি বাতিল করে দেয়া হয়েছে।
আপাতদৃষ্টিতেই ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ভারতের আইন ও ভারতের স্বার্থ বিবেচনা করে রায় দিয়েছেন। কিন' সে রায়ে যে আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসঙ্ঘ কনভেনশনের পঞ্চম ও সপ্তম ধারার বিরোধিতা করা হয়েছে সুপ্রিম কোর্ট সেটা অগ্রাহ্য করেছেন। মেগা প্রকল্পটি নির্মাণ শুরু হলে সেটা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণারই শামিল হবে।


ভারত যে কারণে সাহস পায়
কথা হচ্ছে বাংলাদেশ কি বেঁচে থাকতে চায়? এবং বেঁচে থাকতে হলে বাংলাদেশীদের কী করতে হবে? সাদা চোখেই আমরা দেখতে পাচ্ছি- স্বাধীনতার পর থেকে কোনো সরকারই দেশের জীবন-মরণের এ প্রশ্নটি নিয়ে তেমন মাথা ঘামায়নি। স্বাধীনতার সময় থেকেই নাগরিকদের একাংশ সুশীলসমাজের ছত্রছায়ায় এবং ভারতীয় দালালদের সহায়তায় বাংলাদেশকে আবারো ভারতের সাথে সংযুক্ত করার প্রস'তি হিসেবে ‘বাঙালি জাতীয়তার’ ধ্বনি তুলেছে। ‘ওপারের বাঙালিরা’ আমাদের যতই পদাঘাত করুক ‘বাঙালি জাতীয়তার’ পূজারীরা সেসব অগ্রাহ্য করে দাদা-দিদিদের পদলেহন করে চলেছে। বাংলাদেশের স্বার্থ সম্যক উপলব্ধি করার সময় ও সুযোগ দেশের মানুষ পায়নি।
অপেক্ষাকৃত সামপ্রতিককালে বড় দল দুটোর একটা বাকশালী স্বৈরতন্ত্র ফিরিয়ে এনে গদি চিরস'ায়ী করার উন্মাদ স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে। সে লক্ষ্যে তাদের সর্বশক্তি নিয়োজিত হয়েছে এক দিকে সব প্রকারের গণতান্ত্রিক বিরোধিতাকে নির্মূল করা, অন্য দিকে পাশের বড় দেশের অনুগ্রহ লাভের যথাসাধ্য চেষ্টা করা। রাজনৈতিক বিরোধীদের অনেককে হত্যা করা হয়েছে। দাড়ি ও টুপি পরিহিত কোনো লোক রাজনীতির কথা বললেই তাকে যুদ্ধাপরাধী বলে জেলে পোরা হয়, ঐক্য-সংহতি বলে যে একটা কথা অভিধানে আছে, আজকের বাংলাদেশে এলে সেটা মনে হয় না।
ভারতের অনুগ্রহ লাভের জন্য এমন কিছু নেই, যেটা বাংলাদেশের বর্তমান সরকার করছে না। আমাদের পররাষ্ট্র-স্বরাষ্ট্র সব নীতি ভারতের মর্জির ওপর নির্ভর করছে। বিদেশী উসকানি ও সহযোগিতায় বিডিআরে বিদ্রোহ ঘটিয়ে ৫৭ জন উচ্চপদস' সেনাকর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়েছে, বিডিআরকে অবলুপ্ত করা হয়েছে, এমনকি সেনাবাহিনীর অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিএসএফ এখন খেয়ালখুশিমতো বাংলাদেশীদের হত্যা করছে, বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে আমাদের নাগরিকদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে, আমাদের কৃষকদের ফসল কেটে নিয়ে যাচ্ছে। দেশের রেল, সড়ক ও সমুদ্রবন্দরগুলো ভারতের করিডোর ও বহির্বাণিজ্যের জন্য বিনামূল্যে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব আর ভৌগোলিক এলাকা যেন এখন ভারতের খেলার সামগ্রী। তারা আমাদের নদী-উপনদী আর খালে বাঁধ নির্মাণ করে ১৩৪ চাকার ট্রাক ও ট্রেইলার চালায়। টিপাইমুখে ভারতের বাঁধ তৈরির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর সাহস বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের নেই।
ভারতের সংযোগ খালটি তৈরি হলে নদীর পানির প্রাপ্যতা আর পরিবেশের ওপর কুপ্রভাবের ভয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের নাগরিকরাই উদ্বিগ্ন। সে জন্যই তারা ভারতের সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানিয়েছিল। বাংলাদেশের আশু কর্তব্য জাতিসঙ্ঘ ও আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা, কেননা; আগেই বলেছি, এ রায় জাতিসঙ্ঘের নদীর পানিসংক্রান্ত কনভেনশনের পঞ্চম ও সপ্তম ধারার বিরোধী। কিন' শেখ হাসিনার সরকার সে আপিল করবে কি? মোটেই মনে হয় না। কেন না শেখ হাসিনা আশা করছেন, ভারতের ‘বস্তা বস্তা টাকা আর পরামর্শেই’ তিনি গদি আঁকড়ে থাকতে পারবেন।
প্রতিটি নাগরিকের কর্তব্য
জাতিসঙ্ঘ ও আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের সাহায্য চাওয়ার জন্য দুর্ভাগ্যবশত আমাদের পরবর্তী সরকার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। দুর্ভাগ্য এ জন্য বলছি যে, ভারতীয়রা সংযোগ খালটি তৈরি করে ‘ফেইট একম্পলি’ (প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা সৃষ্টি) করে ফেললে সেটার পরিবর্তন সব সময়ই কঠিন হয়। কিন' আমাদের বা নাগরিকদেরও অনেক কিছু করণীয় আছে। সরকার নীরব থাকলেও সব গণতান্ত্রিক শক্তি ও বুদ্ধিজীবীদের উচিত ভারতকে এবং বিশ্বসংস'া ও বিশ্বসমাজকে জানিয়ে দেয়া যে, ভারতের পানি আগ্রাসনের দরুন বাংলাদেশের যে পরিমাণ ভূমি চাষাবাদ ও মনুষ্য বসতির অযোগ্য হয়েছে, সে পরিমাণ ভূমি বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে দাবি করবে।
সরকার যখন নিষ্ক্রিয় তখন দেশকে বাঁচানোর, দেশের ভবিষ্যৎকে বাঁচানোর দায়িত্ব প্রত্যেক নাগরিককে হাতে তুলে নিতে হবে। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতের একখানি ট্রেন, একটি ট্রাক কিংবা একখানি জাহাজও যাতে যেতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করা প্রত্যেকটি নাগরিকের অবশ্য কর্তব্য হবে। আর এক বোতল ফেনসিডিলও যাতে বাংলাদেশে না আসে সে দিকে সবাইকে সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে। বাংলাদেশে আজকাল চমৎকার শাড়ি ও জামাকাপড় তৈরি হয়। তার পরও ভারতীয় শাড়ি পরার বিলাসিতা বর্তমান অবস'ায় গ্রহণযোগ্য নয়। ভারতীয় শাড়ি-কাপড় বর্জন করা প্রতিটি দেশপ্রেমিক বাংলাদেশী নারীর কর্তব্য হবে। কোনো নারীকে ভারতীয় শাড়ি পরতে দেখা গেলে তাকে সামাজিকভাবে বর্জন করতে হবে।
ইতোমধ্যে অবৈধভাবে যেসব ভারতীয় বাংলাদেশে বাস করছেন, চাকরি করছেন, পেছনে থেকে আওয়ামী লীগ গুণ্ডাদের উসকানি দিচ্ছেন, এমনকি ভোটও দিচ্ছে আওয়ামী লীগকে, ‘সিটিজেন্স অ্যারেস্ট’ বিধির আওতায় তাদের সবাইকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করতে হবে। আর ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদের’ কথা এর পরেও যারা উচ্চারণ করবে, তাদের ধরে জিজ্ঞেস করতে হবে- শেখ হাসিনা ও দীপুমণির বন্ধু মমতা ব্যানার্জি বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করেন কি না, করলে তিনি কেন শুধু সর্বনাশা বর্ষাকালেই বাংলাদেশকে নদীর পানি দেবেন, তিনি কেন বাংলাদেশের পাওনা জমি বাংলাদেশকে বুঝিয়ে দেবেন না? তাতেও যদি কারো চৈতন্যের উদয় না হয়, তাহলে বুঝতে হবে, তিনি বাংলাদেশকে বিলুপ্ত করে আবারো অখণ্ড ভারত গড়তে চান। তাকে গলাধাক্কা দিয়ে বাংলাদেশ থেকে বের করে দেয়া সবার অবশ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়াবে।
লন্ডন, ০৫.০৩.১২
serajurrahman@btinternet.com

তত্ত্বাবধায়ক বিতর্কের অবসান হচ্ছে আদালতের পূর্ণ রায়ে!


হারুন জামিল ও হাবিবুর রহমান
তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে সব ধরনের বিতর্ক অবসানে সুপ্রিম কোর্টের রায় লেখা শেষ হচ্ছে। বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক তার অসমাপ্ত রায় আগামী মাসেই প্রকাশ করতে যাচ্ছেন। প্রাথমিক রায়ে যেসব বিষয় উল্লেখ ছিল তার অনেক কিছুই থাকছে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করে গত বছর মে মাসে তিনি যে রায় দিয়েছিলেন,পূর্ণাঙ্গ রায়ে তার অনেক পরিবর্তন থাকবে। রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান আরো কমপক্ষে দুই টার্ম রাখার যে কথা আগে উল্লেখ করা হয়েছিল পূর্ণাঙ্গ রায়ে তার ব্যাখ্যা থাকবে। একই সাথে উপদেষ্টা পরিষদে কারা থাকতে পারবেন তার একটি নির্দেশনাও থাকবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে রাষ্ট্রপতি অথবা স্পিকারের কথা উল্লেখ থাকতে পারে। উপদেষ্টা পরিষদের আকার ১০ সদস্য এবং তা সরকারি ও বিরোধী দল থেকে সমানসংখ্যক সদস্যের ভিত্তিতে রাখার নির্দেশনা দেয়া হতে পারে। রায় প্রকাশের পর এ বিষয়ে সংসদের আগামী বাজেট অধিবেশনেই সংবিধান সংশোধনীর জন্য নতুন বিল আনার সম্ভাবনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে এমন আভাস পাওয়া গেছে।
বিচারপতি খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ গত বছর মে মাসে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে রায় দিয়েছিলেন। রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করে তা সংবিধানের পরিপন'ী বলে উল্লেখ করা হয়। তবে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আরো দুই টার্ম সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করা যেতে পারে বলে আদালত রায়ে মন্তব্য করেন। কিন' পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগেই বিরোধী দলগুলোর প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও সরকার একতরফাভাবে তত্ত্বাবধায়কব্যবস'া বাতিল করে সংবিধান সংশোধন করে। ছয় মাসের মধ্যে এই রায় পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশের কথা থাকলেও তা দীর্ঘায়িত করা হয়। বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে বিরোধী দল বড় ধরনের আন্দোলনের প্রস'তি নেয়ায় সরকারের পক্ষ থেকেই এখন রায়টি দ্রুত লেখার তাগিদ দেয়া হয়েছে। রায়ে যাতে সরকারের অভিপ্রায়ের প্রতিফলন থাকে সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস'াও নেয়া হয়েছে।
জানা গেছে, সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে সংক্ষিপ্ত রায়ে যেসব কথা উল্লেখ করা হয়েছিল বিস্তারিত রায়ে তার বাইরে অনেক কথাই থাকবে। বিস্তারিত পর্যবেক্ষণও উল্লেখ করা হবে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ওই রায়টি বিভক্ত রায় হলেও প্রধান বিচারপতিসহ বেঞ্চের অপর তিনজন একমত হওয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতেই তা চূড়ান্ত হয়। ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে রায় দেয়ার পরপরই তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক অবসরে যান। এরপর এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
জানা গেছে, আপিল বিভাগের প্রিজাইডিং বিচারক হিসেবে বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক রায়টির মূল অংশ লেখা ও সমন্বয় করলেও দ্বিমত পোষণকারী বিচারপতিদের বক্তব্যও সেখানে উল্লেখ থাকবে। ইতোমধ্যে রায়ের বেশির ভাগ অংশই লেখা শেষ হয়েছে এবং বর্তমানে পরিমার্জনের কাজ চলছে।
সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার অন্যতম অ্যামিকাস কিউরি ও দেশের একজন শীর্ষ স'ানীয় আইনজীবী গতকাল জানান, জনগণ রায় চান, পলিটিক্যাল থিসিস চান না। রায় মামলার বিষয়বস' ও ঘটনা-প্রবাহের ওপর নির্ভরশীল। আদালত বিষয়বস' ও ঘটনার বাইরে রায় দিতে পারেন না। এ মামলার শুনানিতে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে দেশের শীর্ষ আইনজীবীরাই রায় চেয়েছেন, কোনো পলিটিক্যাল থিসিস চাননি।
খ্যাতনামা আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক এ প্রসঙ্গে নয়া দিগন্তকে বলেন, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করার সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংবলিত ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায় দেখে সংবিধান সংশোধন করা উচিত ছিল। রায়ে দুই মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখার কথা বলা হলেও এ বিধান বাতিল করা ঠিক হয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়া গেলে সমস্যার সমাধান হতে পারে কি না- প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কী রায় দেয়া হবে তার ওপর নির্ভর করবে সমস্যার সমাধান হবে কি না।
রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প থাকতে পারে কি না- প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হওয়ার পরেই এ বিষয়ে বলা যাবে। গত ১০ মে তত্ত্বাবধায়ক সরকার মামলার আপিল বিভাগের সংক্ষিপ্ত রায় প্রদানের দিন প্রবীণ এই আইনজীবী বলেছিলেন, তত্ত্বাবধায়কব্যবস'া সংক্রান্ত আপিল বিভাগের রায় স্ববিরোধী। রায়ে বলা হয়েছে, এখন থেকে রায় কার্যকর হবে। আবার বলা হয়েছে দশম ও একাদশ এই দু’টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই হবে। এটা সম্পূর্ণ স্ববিরোধিতাপূর্ণ।
প্রবীণ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন এ প্রসঙ্গে নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা চাই দেশে নিরপেক্ষ সংস'ার অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হোক। তা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা অন্য যেকোনো নামে হতে পারে। আপিল বিভাগ এই বিষয়টি অনুধাবন করেছিলেন। এ জন্য রায়ে আগামী দুই মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখার কথা বলা হয়েছে। কিন' বর্তমান সংবিধান সংশোধন করে যে বিধান করা হয়েছে তাতে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা তাদের পদে থেকে সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার তিন মাস আগে নির্বাচন হবে। কিন' বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন করা অসম্ভব। আমরা মনে করি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। তা না হলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। আমরা নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনে দেখেছি নির্বাচন কমিশন একটি দন্তহীন বাঘ। নির্বাচন কমিশনের স্পষ্ট নির্দেশ সত্ত্বেও সেখানে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়নি। সরকার নির্বাচন কমিশনের চিঠির জবাব দেয়ার প্রয়োজনও মনে করেনি। অথচ সরকারকে প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করার বিধান রয়েছে। আর এত বড় ঘটনার পরও নির্বাচন কমিশন সরকারের বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে কোনো ব্যবস'া নেয়নি।
খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, দেশের শীর্ষ আইনজীবী ও সুশীলসমাজ মনে করে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থেকে তাদের অধীনে যদি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়, তবে তা হবে একটি প্রহসন। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দেশকে সঙ্ঘাতের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার না থাকলে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল রাজনৈতিক সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়বে। এ জন্য যত দ্রুত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান ফিরিয়ে আনা যায় তাহলে তা দেশ ও মানুষের জন্য কল্যাণকর হবে।
তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ের জন্য অপেক্ষা না করে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়কব্যবস'া তুলে দেয়া অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। আর এত দিন পর আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার সম্পর্কে কিছু বলা হবে, এটাও প্রহসনের মতো এবং দেশকে সঙ্ঘাতের দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা। খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তে সংসদকে পদক্ষেপ নিতে হবে। এর অর্থ সংসদ সার্বভৌমত্ব হারিয়েছে। সংসদ আপিল বিভাগের ওপর নির্ভরশীল হোক এটা কাম্য নয়।
উল্লেখ্য, গত বছরের মে মাসে সংক্ষিপ্ত আদেশে আপিল বিভাগ বলেছিলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতে আপিল মঞ্জুর করা হলো। সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী আইন ১৯৯৬ এখন থেকে বাতিল ও সংবিধানপরিপন'ী ঘোষণা করা হলো। দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ত্রয়োদশ সংশোধনীর অধীনে হতে পারে। আইনের অনেক পুরনো নীতি হচ্ছে এই- কোনো কিছু বেআইনি হলেও প্রয়োজনের তাগিদে তা বৈধ হতে পারে। একই সাথে রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তা হচ্ছে সর্বোচ্চ আইন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের বিচারপতিদের নিয়োগের বিধান বাতিলে আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে সংসদের স্বাধীনতা থাকবে। ওই মামলার শুনানি শুরু হয় গত বছরের ১ মার্চ। রায় ঘোষণা করা হয় ১০ মে। সুপ্রিম কোর্ট আটজন বিশিষ্ট আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিযুক্ত করেন। এর মধ্যে মাত্র একজন তত্ত্বাবধায়কব্যবস'া বাতিলের পক্ষে বক্তব্য রাখেন। অন্যরা এই বিধান রাখার পক্ষে সংবিধানের ব্যাখ্যা দেন। কিন' আদালত অ্যামিকাস কিউরিদের বক্তব্য গ্রহণ করেননি।
তত্ত্বাবধায়কব্যবস'ার অন্তর্ভুক্তি ও রিট দায়ের : ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়কব্যবস'া অন-র্ভুক্ত হয়। ষষ্ঠ সংসদে গৃহীত এ সংশোধনীতে রাষ্ট্রপতি সম্মতি জানান ১৯৯৬ সালের ২৮ মার্চ। এরপর থেকে নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে থাকে। এ অবস'ায় ত্রয়োদশ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে অ্যাডভোকেট এম সলিমউল্লাহসহ কয়েকজন আইনজীবী হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, তত্ত্বাবধায়কব্যবস'া বা পদ্ধতি গণতন্ত্রের মৌলিক চেতনার পরিপন'ী। এটা সংবিধানেরও পরিপন'ী। ওই আবেদনের ওপর শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল জারি করেছিলেন। পরে রুলের শুনানি গ্রহণ করে হাইকোর্টের তিন বিচারপতির বৃহত্তর বেঞ্চ ২০০৪ সালের ২৪ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস'াকে বৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীন, বিচারপতি মো. আওলাদ আলী এবং বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চে ওই শুনানি হয়। ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট রায় ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। রায়ে তত্ত্বাবধায়কব্যবস'াকে বৈধ ঘোষণা করা হয়। বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীন মূল রায় লিখেন। অন্য দুই বিচারপতিও তার সাথে একমত পোষণ করেন।
রায়ে হাইকোর্ট বলেছিলেন, ১৯৯৬ সালের ত্রয়োদশ সংশোধনী বৈধ ও সংবিধান সম্মত। এ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের প্রস-াবনা ৪৮ এবং ৫৬ অনুচ্ছেদে কোনো সংশোধন আনা হয়নি। এ কারণে কোনো গণভোটের প্রয়োজন ছিল না। এই সংশোধনী সংবিধানের কোনো মৌলিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস করেনি, বিশেষ করে গণতন্ত্র ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে। তবে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি দেন হাইকোর্ট। সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো মামলায় হাইকোর্ট যদি মনে করেন গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন জড়িত রয়েছে তাহলে সার্টিফিকেট দেয়া হয়। এতে আর লিভ টু আপিল করতে হয় না। সরাসরি আপিল হয়ে যায়।
হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যান আবেদনকারীরা। মূল রিট আবেদনকারী এম সলিমউল্লাহ মারা যাওয়ায় এবং অন্য আবেদনকারী অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস বাবু হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ায় আপিলটি মো. আব্দুল মান্নান খান বনাম বাংলাদেশ সরকার নামে কার্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকে এবং এর ওপরই শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

ইতিহাস বিকৃতি প্রসঙ্গে

এবনে গোলাম সামাদ

পত্রিকার খবর পড়ে জানলাম, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১৯ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা হয়েছে ইতিহাস বিকৃতির। তাই বিষয়টি নিয়ে আমাদের মতো অনেকের মনে জাগছে অনেক প্রশ্ন। সব দেশেই ইতিহাস নিয়ে গবেষণা ও চর্চা করেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা। তাদের ইতিহাস গবেষণা ও চর্চার ক্ষেত্রে থাকা উচিত স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতাকে ধরা উচিত গণতন্ত্রের অংশ। বাংলাদেশ যদি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়ে থাকে তবে এই গণতান্ত্রিক অধিকারে হস-ক্ষেপ করতে যাওয়া সমীচীন বলে বিবেচনা পেতে পারে না। একটা দেশের আদালত খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। কিন' সর্বক্ষেত্রে আদালতকে টেনে আনলে তা সৃষ্টি করতে পারে প্রভূত সমস্যা। সেটা একটা জাতির জীবনে বাঞ্ছিত হতে পারে না।
কয়েক বছর আগের ঘটনা, ভারতে কলকাতা হাইকোর্টে কলকাতার ইতিহাস বিকৃতি নিয়ে একটি মামলা হয়েছিল। কলকাতা হাইকোর্ট এর জন্য কয়েকজন খ্যাতনামা ঐতিহাসিককে নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেন। এবং তাদের কাছে জানতে চান কলকাতা শহরের ইতিহাস। এসব ইতিহাস বিশেষজ্ঞরা বলেন, জব চার্নব কলকাতায় কুঠিবাড়ি স'াপনের আগেই সেখানে ছিল হাটবাজার ও বর্ধিষ্ণু জনপদ। এখানে বাস করত অনেক আর্মানি খ্রিষ্টান ব্যবসায়ী। জব চার্নব তাই কলকাতাকে বেছে নিয়েছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কুঠি স'াপনের জন্য। আর্মানি খ্রিষ্টান ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পেয়েছিল যথেষ্ট সাহায্য-সহযোগিতা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কলকাতায় কুঠি স'াপন না করলেও এখানে গড়ে উঠতে পারত বিশেষ ব্যবসায় কেন্দ্র। তাই বলা চলে না, জব চার্নব কলকাতা শহরের জনক। যদিও কলকাতা শহর গড়ে ওঠার পেছনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অবদান খুবই বিদিত। ইংরেজরা ১৬৮৫ খ্রিষ্টাব্দে চেয়েছিল তারা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কুঠি স'াপন করতে। কিন' নৌযুদ্ধে ইংরেজরা পর্তুগিজদের সাথে সে সময় এঁটে উঠতে পারেনি। চট্টগ্রাম থেকে যায় পর্তুগিজদের অনুকূলে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কলকাতায় কুঠি স'াপন করে ১৬৯০ সালের কাছাকাছি। কলকাতা হাইকোর্ট তাই রায় দেন, কলকাতা শহরের জন্মদিন হিসেবে কোনো বিশেষ দিবস পালন করা যাবে না। তাদের এই রায়ের বিরুদ্ধে কোনো সমালোচনা ওঠেনি। কারণ আদালত বিশিষ্ট ঐতিহাসিককে নির্ভর করে প্রদান করেন তাদের রায়।
আমাদের দেশে ইতিহাস বিকৃতি নিয়ে হাইকোর্টে অভিযোগ উঠেছে। আমাদের হাইকোর্ট কিভাবে এর বিচার করবেন সেটা আমরা বলে দিতে পারি না। তবে মনে হয় কলকাতা হাইকোর্টের বিচার এ ক্ষেত্রে কিছুটা নজির হতে পারে। আমাদের অধ্যাপকের বিরুদ্ধে ইতিহাস বিকৃতির যেই অভিযোগ উঠেছে সেটা তাদের ইচ্ছাকৃত না প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব সেটা বিচার্য হতে হবে। তারা যা বলেছেন, সেটা তাদের জ্ঞানের অভাবজনিত কারণে ঘটে থাকতে পারে। আসলে ১৯৭১ সালে প্রকৃতই কী ঘটেছিল সে সম্বন্ধে আমরা চেষ্টা করেও তথ্য সংগ্রহ করতে যে পারছি তা নয়। যেসব তথ্য পাচ্ছি তাদের সমন্বয়ে ইতিহাসের একটা সমন্বিত চিত্র এখনো পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অনেক তথ্যই মনে হচ্ছে পরস্পরবিরোধী। যেমন ভারতের তদানীন-ন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ৬ নভেম্বর ১৯৭১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিউ ইয়র্ক শহরে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বক্তৃতা দেন। এই বক্তৃতায় তিনি বলেন, তিনি যত দূর জানেন, শেখ মুজিব নিজে এখন পর্যন- বাংলাদেশের স্বাধীনতার কোনো ঘোষণা প্রদান করেননি। শেখ মুজিবকে মুক্ত করে তার সাথে আলোচনার মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যার একটি শানি-পূর্ণ সমাধান তাই এখনো অসম্ভব নয়। বলা হচ্ছে, শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষক। যারা এর বিপক্ষে কিছু বলবেন, ধরতে হবে তারা ইতিহাস বিকৃত করছেন। কিন' ইন্দিরা গান্ধী সত্য হলে বলতে হবে তাদের বক্তব্য ইতিহাস বিকৃতির নিদর্শন নয়। ইন্দিরা গান্ধী সে সময়ের ঘটনা সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত ছিলেন। এই বক্তৃতায় ইন্দিরা গান্ধী আরো বলেন, শেখ মুজিব মার্কিনবিরোধী নন। তাই শেখ মুজিবের সাথে সহযোগিতা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র লাভবান হতে পারে। ইন্দিরা গান্ধীর এই বক্তৃতাটি সঙ্কলিত হয়েছে ÔIndia Speaks’ নামক বইয়ে। বইটি সরকারিভাবে প্রকাশিত হয়েছিল ভারতের প্রচার দফতর থেকে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে।
শেখ মুজিব ব্যক্তিগতভাবে কী চেয়েছিলেন সেটা অনুমান করা যথেষ্ট কঠিন। শেখ মুজিব পাকিস-ান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি লন্ডনে যান। পাকিস-ান থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি সরাসরি বাংলাদেশে আসেননি। তিনি কেন লন্ডনে গিয়েছিলেন সেটা যথেষ্ট পরিষ্কার নয়। লন্ডনে তিনি বিলাতের তদানীন-ন প্রধানমন্ত্রী হিথের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তিনি কেন এই সাক্ষাৎকারকে প্রয়োজনীয় মনে করেছিলেন আমরা তা জানি না। সাংবাদিক অ্যানথোনি ম্যাসকারেনহ্যাস তার বহুল পঠিত Bangladesh, A Legacy of Blood বইয়ে বলেছেন- শেখ মুজিব তাকে লন্ডনে বলেন, তিনি (শেখ মুজিব) পাকিস-ানের সাথে সব রকম সম্পর্ক ছিন্ন করতে যাচ্ছেন না। তিনি পাকিস-ানের সাথে বিশেষ ধরনের সম্পর্ক (Some link) রাখার পক্ষে। এই বিশেষ ধরনের সম্পর্ক কী হবে সেটা তিনি ঠিক করবেন বাংলাদেশে যাওয়ার পর। তিনি এই বিষয়ে আলোচনা করবেন তার দলের আর সব নেতার সাথে। তারপর তিনি এই বিষয়ে গ্রহণ করবেন সিদ্ধান-। ম্যাসকারেনহ্যাস সত্যি হলে বলতে হবে শেখ মুজিব চাননি পাকিস-ানের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করতে। বরং চেয়েছিলেন, পাকিস-ানের সাথে একটা বিশেষ রকমের সম্পর্ক বজায় রাখতে। কিন' এখন বলা হচ্ছে, পাকিস-ানের সাথে শেখ মুজিব চেয়েছিলেন সব সম্পর্কের বিচ্ছেদ। মার্কিন পত্রপত্রিকায় এ সময় খবর বেরিয়েছিল যে, বাংলাদেশ চাচ্ছে পাকিস্তানের সাথে একটা বিশেষ সম্পর্ক বজায় রাখতে। শেখ মুজিব দেশে ফেরার পর তার সাথে নানা বিষয়ে তাজউদ্দীনের গুরুতর মতপার্থক্য হতে দেখা যায়। তাজউদ্দীনের বিপক্ষে আওয়ামী লীগের মধ্য থেকে অভিযোগ ওঠে যে, তিনি (তাজউদ্দীন) হলেন ভারতের চর। তিনি ভারতের সাথে এমন সব গোপন চুক্তি করেছেন, যা বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন'ী। শেখ মুজিব তাজউদ্দীনকে বাদ দেন তার মন্ত্রিসভা থেকে। তাজউদ্দীন ভারতে গিয়ে গড়েছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার। এতে শেখ মুজিবের কত দূর সম্মতি ছিল তা বলা যায় না। তাই বাংলাদেশের ইতিহাস লেখা হয়ে আছে যথেষ্ট কষ্টসাপেক্ষ। এ বিষয়ে ইতিহাস লিখতে গিয়ে অনেকেই করতে পারেন ভুল। কিন' এই ভুলকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায় না। ধরতে হয়, না জানার কারণেই এই ভুল ঘটতে পারছে।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর জেনারেল জিয়াউর রহমান মোশতাকের পর ক্ষমতায় আসেন। জিয়াউর রহমান যখন দিল্লি সফরে যান তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মোরারজি দেশাই। ভারতের প্রেসিডেন্ট ছিলেন নিলম সঞ্জীব রেড্ডি। ভারতের প্রেসিডেন্ট রেড্ডি দিল্লি বিমানবন্দরে জিয়াউর রহমানকে স্বাগত জানান। তিনি তার স্বাগত ভাষণে জিয়াউর রহমানকে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশর স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে। ভারতের প্রেসিডেন্টের এই উক্তিকে সত্যি বলে ধরলে জিয়াকে বলতে হয় স্বাধীনতার ঘোষক। আমাদের কোনো ঐতিহাসিক যদি জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক বলতে চান, তাকে বলা যাবে না অপরাধী। কারণ ভারতের প্রেসিডেন্ট একজন খুবই নির্ভরজনক ব্যক্তি। অবশ্য তার বক্তব্যেও ভুল থাকা সম্ভব। ইতিহাস বিকৃতি নিয়ে আমাদের অধ্যাপকদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে তার বিচার করতে হলে ইন্দিরা গান্ধীর এবং ভারতের প্রেসিডেন্টের দেয়া ভাষণকে বিবেচনায় নিতে হবে। আদালত কী রায় দেবেন আমরা সে বিষয়ে কোনো অনুমান করতে চাই না। কিন' বাইরে রাজপথে অনেক কিছুই ঘটছে।
আমরা ১২ মার্চ দেখলাম খলেদা জিয়ার ডাকে বিপুল জনসমাগম ঘটতে। বিএনপি আবার ক্ষমতায় আসতে পারে। বিএনপি ক্ষমতায় এলে সেই সরকার নিঃসন্দেহে জিয়াকে আবার ঘোষণা করবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে। ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তখন আর বজায় থাকবে না। এটা সহজেই অনুমান করা চলে। ইতিহাস বিকৃতি নিয়ে যে মামলা উঠেছে সেটা না ওঠা ছিল ভালো। এতে দেশবাসীর মনে সৃষ্টি হতে পারছে নানা বিভ্রান্তি।
এই লেখাটি শেষ হওয়ার পর জানতে পারলাম অধ্যাপকদের বিপক্ষে যে মামলাটি করা হয়েছিল সেটি খারিজ করে দেয়া হয়েছে। খবরটি জেনে খুব খুশি হলাম। একসময় আমিও অধ্যাপক ছিলাম আর তাই অধ্যাপকদের এভাবে বিচার করা আমার কাছে মনে হচ্ছিল খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত। সর্বোপরি এসব অধ্যাপক এমন কিছু লেখেননি যা ইতিহাসের খুবই বরখেলাপ। আমি আমার লেখায় যা প্রমাণ করতে চেয়েছি, তাই হয়তো এই লেখাটির এখনো কিছু মূল্য আছে।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট