বৃহস্পতিবার, ২২ নভেম্বর, ২০১২

টিআইবি রিপোর্টের বিরুদ্ধে জাতীয় সংসদের প্রতিক্রিয়া


ব দ রু দ্দী ন উ ম র



ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সদস্যদের আর্থিক এবং অর্থনৈতিক আচরণের ওপর এক তদন্ত রিপোর্টে বলেছে যে, তাদের শতকরা ৯৭ ভাগই নেতিবাচক কাজ ও দুর্নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাত্ তারা দুর্নীতিবাজ। তাদেরকে ধোয়া তুলসীপাতা না বলে এই রিপোর্টে দুর্নীতিবাজ বলায় জাতীয় সংসদ সদস্যরা ও সেই সঙ্গে সংসদের স্পিকার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাদের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হতে পারে যে, তারা নিজেরাও নিজেদের দুর্নীতিমুক্ত সাধু-সন্ত মনে করেন! এ কারণে তারা টিআইবির এই রিপোর্টের বিরুদ্ধে শুধু ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেই ক্ষান্ত হননি, টিআইবিকে বন্ধ করে দেয়ার দাবিও জানিয়েছেন। চোখ বন্ধ করে রাখলে মানুষের দৃষ্টি অন্ধকারাছন্ন হয়, কিন্তু বাইরের জগতের আলো এর ফলে নির্বাপিত হয় না। সেভাবে টিআইবি রিপোর্ট দিক আর নাই দিক, টিআইবিকে বন্ধ করা হোক আর নাই হোক, জাতীয় সংসদ সদস্যরা যে দুর্নীতিবাজ এটা জানার জন্য এখন বাংলাদেশে কোনো গবেষণার প্রয়োজন নেই। এই সংসদ সদস্যদের সঙ্গে যদি জনগণের কোনো যোগসম্পর্ক থাকত তাহলে ট্রেন বাস লঞ্চ ও রাস্তাঘাটে লোকজন তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তাদের দুর্নীতির যেসব কথা অহরহ বলছেন, তার থেকেই তারা তাদের সম্পর্কে দেশের লোকের ধারণা বিষয়ে অবহিত হতে পারতেন। কিন্তু তাদের অবস্থা এদিক দিয়ে একেবারে ভিন্ন। তারা সরকারি ও শ্রেণীগত ক্ষমতায় বলীয়ান হয়ে পরম নিশ্চিন্তে এবং অপরাধের জন্য কোনো শাস্তির ভয়ে ভীত না হয়ে চুরি, ঘুষখোরি, জমি দখল ইত্যাদি দুর্নীতি করে গেলেও জনগণ তাদেরকে সততার পরাকাষ্ঠা মনে করে তাদের জয়গান করছে—এটাই মনে হয় তাদের ধারণা! হয়তো তাদের ধারণা, তারা যত বিচিত্র গর্হিত কাজই করে চলুন, সর্বাবস্থায় জনগণের কর্তব্য হলো ‘দেশপ্রেমিক’ দল হিসেবে তাদেরকে দুর্নীতিমুক্ত মনে করা, কৃতজ্ঞচিত্তে তাদেরকে পরবর্তী নির্বাচনে ভোট দিয়ে আবার ক্ষমতায় বসানো!!
আসলে টিআইবি সংসদ সদস্যদের ওপর তার তদন্ত রিপোর্টে যা বলেছে তাতে দেশের কোনো একজন লোকও বিস্মিত হয়েছে অথবা এ রিপোর্টের বক্তব্য অসত্য মনে করেছে, এটা আওয়ামী লীগের লোক ও তাদের ঘরানার বুদ্ধিজীবী ছাড়া অন্য কেউ মনে করে না। কাজেই টিআইবি তদন্ত করে সংসদ সদস্যদের আচরণ সম্পর্কে কী বলেছে, তার ওপর নির্ভর করে মানুষ বসে নেই। সংসদ সদস্যদের লাগামহীন চুরি, ঘুষখোরি, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের প্রত্যক্ষদর্শী বা ভুক্তভোগী হিসেবে টিআইবি রিপোর্টে যা আছে তার থেকে অনেক বেশি তারা জানেন।
সম্প্রতি নিযুক্ত তথ্যমন্ত্রী এ রিপোর্ট সম্পর্কে বলেছেন যে, এ রিপোর্ট যে তদন্তের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে তাতে পদ্ধতিগত ত্রুটি আছে। পদ্ধতিগত কিছু ত্রুটি আছে এটা বলাই যেতে পারে। কারণ এসব ক্ষেত্রে পদ্ধতি বিষয়ে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু এখানে কথা হলো, পদ্ধতিগত কিছু ত্রুটি যদি থাকেও, তাহলে সে ত্রুটিমুক্ত হয়ে তদন্ত ও গবেষণা করলে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সদস্যদের বিষয়ে আলোচ্য টিআইবি রিপোর্টে যা বলা হয়েছে তার থেকে ভিন্ন কিছু পাওয়া যাবে মনে করার কারণ নেই।
জাতীয় সংসদের স্পিকারসহ সংসদ সদস্যরা টিআইবি রিপোর্টের বিরুদ্ধে যেভাবে ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন, তার থেকে মনে হয় তারা নিজেদের জনগণের কাছে সত্ হিসেবে, সততার প্রতিমূর্তি হিসেবে দেখতে বড়ই পছন্দ করেন! এর জন্য সহজ উপায় হচ্ছে চুরি, ঘুষখোরি, দুর্নীতি ইত্যাদি না করা। এসব না করলে তদন্ত যে পদ্ধতিতেই হোক, কিছুই পাওয়া যাবে না। কিন্তু নিজেরা এসব গর্হিত কাজ নিয়মিতভাবে এবং লোকের নাকের ডগায় ও চোখের সামনে করে যাবেন এবং জনগণ ও সেই সঙ্গে এ বিষয়ে তদন্ত কাজে নিয়োজিত যে কোনো সংস্থা তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে তাদের জয়গান করবে এটা এক অস্বাভাবিক প্রত্যাশা।
শুধু সংসদ সদস্যরাই নন, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং উপদেষ্টারা পর্যন্ত যে চুরি, ঘুষখোরি, সব ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত—এটা এখন এক প্রকাশ্য সত্য। রেলওয়ে, সোনালী ব্যাংক, বাংলাদেশ বিমান, পদ্মা ব্রিজ, ডেসটিনি ইত্যাদিতে সম্প্রতি যে সব দুর্নীতি কেলেঙ্কারি হয়েছে সেটা আওয়ামী লীগ সম্পর্কে অনেক আওয়ামী সমর্থকেরও চোখ খুলে দিয়েছে। এ দেশে বর্তমান সরকারের আমলে চুরি-ঘুষখোরি করলে যে শাস্তির কোনো ব্যবস্থা নেই, উপরন্তু পুরস্কৃত হওয়ার ব্যাপার আছে, আওয়ামী মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের দৃষ্টান্ত এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। রেলে চাকরি বাণিজ্য করতে গিয়ে পাহাড়প্রমাণ ঘুষের টাকা ধরা পড়ার পর চারদিকে তার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়ায় শেষ পর্যন্ত সুরঞ্জিতকে রেলের মন্ত্রিত্ব থেকে সরানো হলেও পরদিনই তাকে দফতরবিহীন মন্ত্রী করে দুর্নীতির গৌরব অর্জনের জন্য পুরস্কৃত করা হয়েছে। এর ফলে মন্ত্রী হিসেবে কিছু কাজ করে তাকে আগে বেতন-ভাতা, অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিতে হলেও এখন তিনি কোনো কাজ না করেই সেসব সুবিধা পাচ্ছেন! অর্থাত্ জনগণের ট্যাক্সের টাকার খেয়ানত করেই এভাবে একজন দুর্নীতিবাজ দলীয় লোককে প্রতিপালন করা হচ্ছে!! সরকারের প্রধানমন্ত্রীর এ কাজ কি দুর্নীতি নয়? এ কাজ যে দলের প্রধানমন্ত্রী করেন, সে দলের সংসদ সদস্যরা সবাই নিরামিষভোজী পরম ধার্মিক—এটা মনে করাও এক অবাস্তব চিন্তা।
শুধু আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্যরাই নয়, বর্তমান মহাজোট সরকারের অন্য ‘বিপ্লবী’ সদস্যরাও একই কাতারে থেকে একইভাবে নিজেদের সত্চরিত্র টিআইবি রিপোর্টে কলঙ্কিত হতে দেখে চিত্কার করেছেন। ১৩ জন বিরোধীদলীয় সদস্যের ওপর দেয়া টিআইবি রিপোর্টে ১২ জনকেই দুর্নীতিবাজ বলা হয়েছে। বিএনপি যদি সংসদ বর্জন না করে সংসদে থাকত, তাহলে তারাও যে একইভাবে ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে চিত্কার করত, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
বাংলাদেশে শাসক শ্রেণী ও শাসক দলভুক্ত লোকদের এই দুর্নীতি যদি শুধু তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত, তাহলে তা এতখানি বিপজ্জনক হতো না, যতখানি বিপজ্জনক আজ হয়েছে। এর মূল কারণ এই শাসক শ্রেণী এবং এদের একের পর এক সরকার প্রথম থেকেই অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত তো করেই নি, উপরন্তু অপরাধ করলে শাস্তি যাতে না হয় সেই শর্তই শাসন ব্যবস্থার মধ্যে তৈরি করেছে। প্রেসিডেন্ট যেভাবে লক্ষ্মীপুরের ক্রিমিনাল তাহেরের বেটাসহ ২১ জনের মৃত্যুদণ্ড মাফ করেছেন, সেটা থেকে নিয়ে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে তার দুর্নীতির জন্য পুরস্কৃত করা পর্যন্ত অসংখ্য দৃষ্টান্ত এ বিষয়টিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সমাজে অপরাধীরা আরও সক্রিয় হয়েছে, তাদের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে যাচ্ছে এবং তাদের অপরাধের বৈচিত্র্যও দেখা যাচ্ছে অবাক হওয়ার, সেই সঙ্গে আতঙ্কিত হওয়ার মতো ব্যাপার। প্রধানত রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত লোকজনের দ্বারা ও তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এসব অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকলেও সাধারণভাবে সমাজে এর বিস্তৃতি ঘটে এক ভয়ঙ্কর সামাজিক নৈরাজ্য আজ বাংলাদেশে সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতির দিকে না তাকিয়ে টিআইবি রিপোর্টের বিরোধিতা এবং টিআইবিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে মূল সমস্যার কোনো সমাধান হবে না। কিন্তু এ বিষয়টি উপলব্ধি করার মতো অবস্থা আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব, তাদের তথাকথিত মহাজোটের শরিকবৃন্দ এবং তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত বুদ্ধিজীবীদের নেই।
২১.১১.২০১২
লেখক : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

আ’লীগের ওপর রাজনৈতিক সমাজতন্ত্রের আছর


মাসুমুর রহমান খলিলী
তারিখ: ২২ নভেম্বর, ২০১২

ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দল হিসেবে গঠন ও বিকাশ লাভ করেছিল। তবে দলীয় ইতিহাসের একটি বড় অংশজুড়ে অর্থনৈতিক নীতির ওপর সমাজতন্ত্রের প্রভাব ছিল। সমাজতন্ত্রের এ প্রভাব ঠিক মার্কসবাদী কমিউনিজমের মতো না হলেও বর্তমানে ইউরোপে যে সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক দল রয়েছে, প্রভাবের ধরনটা অনেকটা সে রকম। তবে মওলানা আবদুুল হামিদ খান ভাসানী আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠনের পর সমাজতন্ত্রের প্রভাব বেশ খানিকটা গৌণ হয়ে পড়ে। ’৫০-এর দশকে যখন আওয়ামী লীগ যাত্রা শুরু করে তখন এবং এরপর দুই দশক ধরে বিশ্বব্যাপী সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রবল প্রভাব ছিল। সাম্যবাদ বা সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শে যারা প্রকৃত বিশ্বাসী ছিলেন না, সেসব দলের নেতারাও সাম্য, সুষম বণ্টন, শোষিতের গণতন্ত্র ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করতেন। কোনো কোনো সময় বৈষম্য ও শোষণের বিষয়টি জাতীয়তাবাদ ও আঞ্চলিকতাবাদের সাথে মিশে সমাজবাদী বক্তব্যের আবহ নিত।
১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগ নেতারা স্বল্প সময়ের জন্য পাকিস্তানের কেন্দ্র ও প্রদেশপর্যায়ে ক্ষমতায় গেলেও তাদের রাজনৈতিক আদর্শবাদী চেতনার কোনো প্রতিফলন তখনকার শাসনে দেখা যায়নি। এর পর থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত আঞ্চলিক বৈষম্যবিরোধী জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছেন মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান। ৬ দফা ও অসহযোগ আন্দোলনের পথ ধরে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি সংগ্রামে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক চরিত্র ছিল উদার বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে শোষণবিরোধী বক্তব্য এসেছে, যার সাথে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সমাজতান্ত্রিক ধারার নেতাদের বক্তব্যের সাথে মিল পাওয়া যায়।
মুক্তিযুদ্ধের সাফল্যজনক সমাপ্তির পর সরকার গঠন করলে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যে সংবিধান বাংলাদেশের জন্য প্রণয়ন করা হয়, সেটি ছিল কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া একটি উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক মডেলের সংবিধান। মূল সংবিধানে মৌলিক অধিকারের যে সীমারেখা ঠিক করা হয় তা পৃথিবীর মুক্ত গণতন্ত্র চর্চার অনেক দেশের অনুরূপ। শুধু একটি প্রতিক্রিয়ামূলক অনুচ্ছেদ উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম ছিল। এটি ছিল ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ও সংগঠন প্রসঙ্গে। পাকিস্তানের শাসনকালে বৈষম্যমূলক অনেক অনুচিত পদক্ষেপ ধর্মের নামে হওয়ায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া দলগুলোর মধ্যে ধর্মভিত্তিক সংগঠন নিয়ে এক ধরনের আপত্তি ছিল। অন্য দিকে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বনকারী রাজনৈতিক শক্তির বড় অংশই ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক ভাবাদর্শের অনুসারী ছিল। এ ছাড়া ধর্মের পরিচয় ও স্বাতন্ত্র্য প্রবল থাকলে প্রতিবেশী ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব সুগভীর হবে না, এমন একটি উপলব্ধিও কারো কারো থাকতে পারে। এসব কারণে বাহাত্তরের মূল সংবিধানে ধর্মভিত্তিকতার বিষয় এনে জনগণের মৌলিক রাজনৈতিক অধিকারকে সীমিত করা হয়। এর বাইরে ১৯৭২ সালের সংবিধানকে একটি গণতান্ত্রিক ভাবধারার গ্রহণযোগ্য সংবিধান হিসেবে মনে করা যায়। আর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক চরিত্রেরই প্রতিফলন লক্ষ করা যায় এই সংবিধানে।
১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের সংশোধনীগুলো আস্তে আস্তে শাসনতান্ত্রিক চরিত্রে পরিবর্তন আনতে শুরু করে। এ ক্ষেত্রে সংবিধানের চরিত্র আমূলভাবে পাল্টে দেয় চতুর্থ সংশোধনী। বুর্জোয়া উদারনৈতিক গণতন্ত্রে বিশ্বাস এই সংশোধনীর পর আর থাকেনি। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগের সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস একেবার অর্থনৈতিক নীতিতে সীমিত ছিল। তখন দেশের বড় বড় কলকারখানা ও সেবা খাতকে জাতীয়করণ করা হয়। ‘কমান্ড ইকোনমি’ হয় অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের নিয়ন্ত্রক সূত্র। দেশে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা বেড়ে গেলে এবং একই সাথে আওয়ামী লীগবিরোধী জনমত প্রবল হতে থাকলে তখনকার সরকারের দমননীতি কঠোর থেকে কঠোরতর হতে থাকে। দমননীতির স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী সশস্ত্র গ্রুপগুলোর যেভাবে উত্থান ঘটে সেটি দেখা যায় এ সময়ে। জাসদ গণবাহিনী গঠন করে, সিরাজ শিকদার ও চীনপন্থী কয়েকটি রাজনৈতিক দল চারু মজুমদার স্টাইলে সশস্ত্র গ্রুপ গঠন করে রাজনৈতিক ও শ্রেণিশত্রু খতম অভিযান শুরু করে। এমন এক ধরনের পরিস্থিতিতে মস্কোবাদী সমাজতান্ত্রিক চিন্তা মরহুম শেখ মুজিবের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে। এ ক্ষেত্রে বিদেশে সোভিয়েত ইউনিয়ন আর স্বদেশে অধ্যাপক মনি সিংহের নেতৃত্বাধীন সিপিবি ও কমরেড মোজাফফরের ন্যাপের সাথে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় তার। এ সময়ে রাজনৈতিক সমাজতন্ত্র ও এর একদলীয় মডেল ভর করে বুর্জোয়া উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ওপর। সংবিধানে চতুর্থ সংশোধনী এনে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠন করা হয়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন ধারা শুরু হয়। এই পট পরিবর্তনের পর বহুদলীয় রাজনীতি শুরু হলে বেগম জোহরা তাজউদ্দিন, ড. কামাল হোসেন, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী প্রমুখের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নতুন যাত্রা শুরু হয়। এর কিছুকাল পরেই বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনা দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগে উদারনৈতিক বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ধারা ফিরে আসে। শেখ মুজিবের রাজনৈতিক আন্দোলনের মূল সময়টি ছিল পাকিস্তানের বাস্তবতায় আর শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রেক্ষাপট ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ। এই ব্যবধান সরিয়ে রাখলে বাবা ও মেয়ের রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ব্যক্তিত্বের পার্থক্য ছাড়া অন্য কোনো তারতম্য বড় করে দেখা যায় না।
অন্য দিকে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় যাওয়ার পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনকালে বৈশিষ্ট্যগতভাবে মোটা দাগে উদার বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থারই প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। এই পাঁচ বছরের শাসনকালের সাথে বাকশাল গঠনের আগ পর্যন্ত মরহুম শেখ মুজিবের শাসনকালের সাথেও মিল রয়েছে। তবে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার যে জাতীয়করণমুখী সমাজতান্ত্রিক নীতি অনুসরণ করেছিল, সেখান থেকে সরে এসে মুক্তবাজার অর্থনৈতিক নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। ’৭০ ও ৯০-এর দশকের জাতীয় আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতার প্রভাব দুই আওয়ামী লীগ শাসনে অবলোকন করা যায়।
১৯৭৩ সালের নির্বাচনের মতো একচেটিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় বসে আওয়ামী লীগ। সংসদে দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার এমন অবস্থা হয় যে, আওয়ামী লীগ চাইলে সংবিধানে যেকোনো পরিবর্তন আনতে পারে। এই পরিবর্তন বাতিলের এখতিয়ার রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের। বর্তমান আমলে আওয়ামী লীগ সরকারের বড় কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সুপ্রিম কোর্টে বাতিল বা অকার্যকর হয়েছেÑএমনটা দেখা যায়নি। এ অবস্থা আওয়ামী লীগের সময়ের পুরো মেয়াদ অব্যাহত থাকতে পারে।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন প্রথম সরকারের সাথে বর্তমান সরকারের কিছু ক্ষেত্রে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। আগের সরকারের সময় দলের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক নেতারা গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও দলের নীতিনির্ধারণী শীর্ষ ফোরামের সদস্য ছিলেন। শাসক দল ও সরকারে গুরুত্বপূর্র্ণ সিদ্ধান্তে এর প্রতিফলন লক্ষ করা যেত। এবারের সরকারে রাজ্জাক, আমু, তোফায়েল, নাসিমদের স্থান হয়নি। সরকারের শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, পূর্ত, আইন, তথ্য প্রভৃতি মন্ত্রণালয়কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়। এসব মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ পদে এক সময় বাম রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন, এমন ব্যক্তিরা রয়েছেন। বর্তমান সরকার মূলত আ’লীগের হলেও বলা হয় এ সরকার মহাজোটের। তবে মহাজোটের সহযোগী সংগঠনের মন্ত্রীর সংখ্যা বর্তমান সরকারে মাত্র তিনজন। তবে একই রাজনৈতিক মনোভঙ্গির মন্ত্রীর সংখ্যা অনেক বেশি, যারা এর আগে সিপিবি ন্যাপ জাসদ থেকে যোগ দিয়েছেন আওয়ামী লীগে। বৈশিষ্ট্যগতভাবে তাদের চিন্তা ও এজেন্ডার সাথে আওয়ামী লীগের মূল আদর্শ উদারনৈতিক গণতন্ত্রের মিল নেই। ১৯৭৪ সালের শেষ দিকের বিশেষ পরিস্থিতিতে উদার গণতন্ত্রের ধারা থেকে বিচ্যুত করে সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামোতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আওয়ামী লীগকে। সে সময় সংবিধান সংশোধন করে পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থা পাল্টে ফেলা হয়েছিল। আওয়ামী লীগের বর্তমান মেয়াদে সংবিধান পরিবর্তন করে একদলীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে না। কিন্তু এমন কিছু পদক্ষেপ সরকারি সিদ্ধান্তে দেখা যাচ্ছে যা আওয়ামী লীগের বুর্জোয়া উদার গণতান্ত্রিক চিন্তাদর্শের সাথে মেলে না।
জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো বাংলাদেশে এখনো নিবন্ধিত বৈধ রাজনৈতিক দল। এসব দলের সাথে আওয়ামী লীগ ১৯৯৫-৯৬ সালে একসাথে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলন করেছে। কিন্তু পরবর্তী রাজনৈতিক মেরুকরণে এসব দল হয়ে যায় বিএনপির রাজনৈতিক সহযোগী। ফলে আওয়ামী লীগ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলকে রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলতে মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালসহ আরো নানা কর্মসূচি গ্রহণ করছে। কিন্তু এসব দলের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হলে দু’টি বিপদের বিষয় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বিবেচনায় ছিল। এর একটি হলো জামায়াত ও অন্য ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের জনশক্তির একটি বড় অংশ বিএনপিতে গিয়ে তারা সে দলের শক্তিকে অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে। দ্বিতীয়তটি হলো স্বাধীনতার পর জুলুম-নিপীড়ন ও রাজনৈতিক নিষ্পেষণ থেকে সশস্ত্র গণবাহিনী ও সর্বহারা দলের বিকাশ ও প্রাবল্য যেভাবে দেখা গিয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি ধর্মভিত্তিক দলের মধ্যে দেখা যায় কি না। এ দু’টি শঙ্কা বাস্তবে রূপ নিলে ক্ষমতাসীন দলকে এক দিকে রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে, অন্য দিকে আইন-শ্ঙ্খৃলার ক্ষেত্রে অরাজকতা সৃষ্টি হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলার অনিবার্য পদক্ষেপ হয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা অথবা সাংবিধানিক রাজনৈতিক একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা। জনসমর্থনের দিক থেকে একেবারে ুদ্র একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী দেশের বৃহত্তম দল আওয়ামী লীগের ওপর ভর করে ১৯৭৫ সালে এটি করতে সক্ষম হয়েছিল। ২০১২ সালে সে ধরনের লক্ষণ ক্রমেই প্রবল হয়ে উঠছে। ‘জঙ্গি’ হিসেবে জামায়াত ও এর পৃষ্ঠপোষক হিসেবে বিএনপি নেতাদের বিচার করার ঘোষণা আসছে প্রভাবশালী মন্ত্রীদের বক্তব্যেও। দেশের অর্ধেক মানুষকে দমন, উৎখাত ও বিচার করার মাধ্যমে আইনি শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কিছু করা সম্ভব হবে না। কেবল বাংলাদেশ অরাজকতার নতুন এক পর্বে প্রবেশের আশঙ্কাই প্রবল হবে। এ ধরনের লক্ষণ এখন কিছু ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হচ্ছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত যারা হবে তাদের মধ্যে শীর্ষে যে আওয়ামী লীগ থাকবে, তা শাসক দলের অনেক প্রাজ্ঞ নেতার মূল্যায়নেও দেখা যাচ্ছে।

এ দেশের মানুষ ভারত-মুখাপেী হবে না




সাদেক খান
তারিখ: ২২ নভেম্বর, ২০১২

বিগত সপ্তাহান্তে বাংলা একাডেমীর নতুন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল একটি নতুন বইয়ের হাইপ্রোফাইল বা মর্যাদাবান প্রকাশনা উৎসব। বইটির লেখক ভারতীয়, প্রকাশক এ দেশের লব্ধপ্রতিষ্ঠ ইংরেজি ডেইলি স্টার। প্রকাশকের জ্ঞাতিকুটুম্ব (প্রতিষ্ঠানের মালিকানার বড় শরিকের সূত্রে) বহুল প্রচারিত বাংলা দৈনিক প্রথম আলোয় পরদিন (১৭ নভেম্বর) শেষ পাতায় আকর্ষণীয়ভাবে আয়তরেখাবন্দী করে ওই অনুষ্ঠানের একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তার চমকপ্রদ শিরোনাম, উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে, ‘দেশ ভাগ একটি ভুল’।
ওই দিনই সন্ধ্যায় একটি টেলিভিশন চ্যানেলের বৈঠকখানায় টকশোতে অংশ নেয়ার জন্য অপেমাণ কিছু বিজ্ঞ নাগরিকের একজনের নজরে পড়ল ওই শিরোনাম। একরকম চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি। বললেন, ‘এই যে, আবার শুরু হয়েছে। যারা বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্র সাব্যস্ত করার প্রচার শুরু করেছিল, এরা এখন অন্য কায়দায় বাংলাদেশের ভারতভক্তির পাঁয়তারা শুরু করেছে।’ তার এমন ধারণা শুধরাতে আরেকজন বলে উঠলেন, ‘ভুল করছেন, এটা প্রথম আলোর উদ্যোগ নয়, প্রথম আলো রিপোর্ট করেছে মাত্র। আর শিরোনামটি উদ্ধৃতি। ভারত বিভাগের সময় পাকিস্তানের ঘরবাড়ি ছেড়ে শরণার্থী হয়ে ভারতযাত্রার বেদনাদায়ক স্মৃতি থেকে এ কথা লিখেছেন ভারতের প্রথিতযশা সাংবাদিক ও কূটনীতিবিদ কুলদীপ নায়ার।’ দ্বিতীয় বক্তা পত্রিকা থেকে পড়ে শোনালেন : কুলদীপ নায়ার বলেছেন, ‘হিন্দু, মুসলিম, ভারতীয়, পাকিস্তানিÑ এসব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে এখন আমাদের ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো ঐক্যবদ্ধ একটি দণি এশিয়া গড়তে হবে। দেশ বিভাগের পর আমি পাকিস্তান ছাড়ি, আমার পরিবারের সাথে বিদায়ের সময় কান্নার যে মুহূর্ত এমন অনেক কিছুই আমি পারিনি তুলে ধরতে। দেশ বিভাগের পর লাখ লাখ উদ্বাস্তু মানুষ যখন দেশ ছাড়ছিল, তখন হেলিকপ্টার থেকে তা দেখে জিন্নাহ কপাল চাপড়ে বলেছিলেন, এ তিনি কী করলেন! আমার অনুভূতি হলো, দেশ বিভাগ ভুল ছিল। দেশ বিভাগের প্রেতি না হলে এই উপমহাদেশে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা হতো না।’
এবার একজন তৃতীয় বক্তা টিপ্পনি কাটলেন, ‘ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার উৎপত্তি তো দেশ বিভাগের পরে নয়, অখণ্ড ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার আমলে। ১৮১৭ সালের হিন্দু কলেজে তার গোড়াপত্তন, তার রাষ্ট্রবিজ্ঞানসম্মত রূপ দিয়েছিলেন বীর সাভারকর। মুসলিম লীগ সে পথে এগিয়েছে আরো পরে ১৯৪৩ সালে। ভারত বিভাগের পর খোদ ভারতেই এখনো সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প বর্ণাশ্রমের ভেদবুদ্ধি বেশি করে ছড়াচ্ছে। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সঙ্ঘাত নেই বললেই চলে। তাহলে আমরা কেন সাম্প্রদায়িকতামুক্ত হওয়ার বাহানায় অন্য নামে শিথিলভাবে হলেও অখণ্ড ভারতভুক্ত হতে যাবো?’ চতুর্থ বক্তা বললেন, ‘কপাল চাপড়ে জিন্নাহ সাহেব কখনো বিলাপ করেছেন, এটা তার সাহেবি মেজাজ চালচলনের সাথে মেলে না; কোনো ঐতিহাসিক বা জীবনী লেখক এমন কথা কোথাও লেখেননি। তা ছাড়া ধর্মভিত্তিক বাসিন্দা বদল বা পপুলেশন ট্রান্সফারের কথা তো জিন্নাহ বলেননি, বলেছিলেন ভারতীয় কংগ্রেস নেতারা।’ একজন পঞ্চম বক্তা প্রশ্ন তুললেন, ‘পাকিস্তান ছেড়ে আসার মনোবেদনা থেকেই যদি বইটি লেখার হুপ জন্মে থাকে, তাহলে তো এর প্রকাশ হওয়া উচিত পাকিস্তানে; বাংলাদেশে কেন?’ সে সম্পর্কে প্রকাশক পরিবারের ব্যাখ্যা পেশ করতে দ্বিতীয় বক্তা আবার মুখ খুললেন। পত্রিকা থেকে পড়লেন, প্রথম আলো সম্পাদক বলেছেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধু, দুই নেত্রী, রাজনীতি এসব নিয়েও তিনি বিস্তারিত লিখেছেন বইটিতে। তিনি মনে করেন, লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা আছে। তিনি সেই কারণ খুঁজে ফিরছেন।’
তৃতীয় বক্তা টিপ্পনি কাটলেন, এই প্রকাশনা উৎসবের ধুমধাড়াক্কার পেছনেও নিশ্চয় ‘অন্য কোনো ঘটনা আছে!’ দ্বিতীয় বক্তা পড়ে চললেন : ‘ড. কামাল হোসেন বলেন, একটি অসাধারণ বই; কুলদীপ নায়ারের যে বিষয়টির কথা উল্লেখ করতে হয় তা হলো, দণি এশিয়ার মানুষের প্রতি তার যে ভালোবাসা, তার যে প্রতিশ্র“তি, এর কোনো তুলনা হয় না। (প্রকাশক প্রতিষ্ঠান প্রধান ডেইলি স্টার সম্পাদক) মাহফুজ আনাম বলেন, ২০ বছর আগে কুলদীপ নায়ার পাকিস্তানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন; ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদারের কাজও করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, দণি এশিয়ার দেশগুলো এক হয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো শক্তিশালী হতে পারে।’
চতুর্থ বক্তা এবার বললেন : “দণি এশিয়াজুড়ে নিবিড় রাষ্ট্রপুঞ্জ গড়ার স্বপ্ন বা বিশ্বাস যদি ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার ঔপনিবেশিক স্মৃতিমুগ্ধ কোনো ব্যক্তি পঁয়ষট্টি বছর ধরে পুষে থাকেন, বাদ সেধে তার মোহভঙ্গ করব না। কিন্তু বাস্তবে যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দৃষ্টান্তের কথা বলা হলো, তার শক্তি কোথায়? ইউরো জোনে শামিল হয়ে পর্তুগাল, স্পেন, ইতালি, গ্রিস এসব ভূমধ্যসাগরীয় দেশ এখন ফতুর হতে বসেছে। ইউরোপজুড়ে চলছে সুবিধাবঞ্চিত নাগরিক বিােভ। লন্ডন, বার্লিন, প্যারিস, ব্রাসেলসের মতাধর সুবিধাভোগী ইউরোপীয় নেতারা মার্কিন শক্তির বদৌলতে ন্যাটো জোটের গোপন ও প্রকাশ্য সমরকৌশল প্রয়োগে মত্ত ভূমধ্যসাগরীয় আরব দেশ লিবিয়া ও সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ-অশান্তি পাকিয়ে তুলে ফায়দা লোটার নয়া ঔপনিবেশিক কারসাজি ফেঁদেছে এরা। তাতে এখন আর ইউরোপজুড়ে অস্থিরতা থেকে নাগরিক দৃষ্টি ফিরছে না। এ দিকে ভারতজুড়ে চলছে নৃতাত্ত্বিক বৈষম্যের পীড়া, বঞ্চিত বা অবদলিত জনগোষ্ঠীর প্রতিরোধ। রিজার্ভ পুলিশ, দমন আইনের সাত খুন মাফ বিশেষ মতা আর সৈন্যবল দিয়ে সেই প্রতিরোধ ঠেকিয়ে রাখা হচ্ছে। স্বাধীন নাগা, স্বাধীন অহম, স্বাধীন কামতাপুরী, স্বাধীন ত্রিপুরী বৈরিতার উত্তর-পূর্ব ভারতীয় চোরাবালি আর গেরিলা নকশাল উপদ্রুত মধ্যভারতীয় ফল্টলাইন বা বিচ্যুতি রেখা নেপালের পাদদেশ থেকে দণি ভারতের অন্ধ্ররাজ্য পর্যন্ত বিস্তৃত। সেই ঝুঁকির বেড়ি পেরিয়ে আমরা কেন দিল্লির দিকে তাকাতে যাবো? বাংলাদেশের কৃষক প্রতিরোধ ১২৫ বছর ধরে ইংরেজের সিপাই আর জমিদারের পাইক-বরকন্দাজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে স্বাতন্ত্র্য আর আত্মমর্যাদাবোধ বজায় রেখেছে। সেই স্বাতন্ত্র্য ভিক্টোরিয়ার আমলে স্বীকৃতি পাওয়ার পর সিপাহি বিদ্রোহ-পরবর্তী প্রজন্ম দুই বিশ্বযুদ্ধের যুগসন্ধিতে ইংরেজি স্কুলে পড়ে ইংরেজি কায়দা-কানুন রপ্ত করে ইংরেজের ভারতবিভক্তিকালে ভোটযুদ্ধে পাকিস্তানের প নিয়েছে, অবশেষে মুক্তিযুদ্ধ করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছে। নিজেদের মতো করেই আমরা বাঁচছি, স্নায়ুযুদ্ধোত্তর বিশ্বায়নপ্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতাম অর্থনৈতিক অবকাঠামো তৈরি করেছি, প্রবৃদ্ধির মুখ দেখতে শুরু করেছি। আমরা কেন ফের দিল্লির আঁচল ধরতে যাবো? আমাদের ুদ্র পরিসরই ভালো, স্মল ইজ বিউটিফুল। জনসম্পদে আমরা খাটো নই, জনসংহতিও ‘দশটা লতা পাকিয়ে’ নিরেট। ভূরাজনৈতিক পাকচক্রে মতার খেলায় উদভ্রান্ত নেতানেত্রীরা দিল্লির দরবারে যখন তখন দৌড়াতে পারেন। কিন্তু এ দেশের মানুষ মোটেও দিল্লির মুখাপেী হবে না।”
এবার প্রথম বক্তা আবার উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। বললেন : ‘খালেদা জিয়াই গোলমাল বাধিয়েছেন। এত দিন দেশের রাজনীতিতে একটা ব্যালেন্স ছিল। দিল্লির দালালরা সরাসরি দিল্লিকে মেনে চলার কথা বলতে সাহস পেত না। এখন শেখ হাসিনা, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দেখাদেখি সুড়সুড় করে খালেদাও দিল্লিতে ভিজিট দিয়ে এসেছেন। তাই দিল্লির দালালরা এখন নির্ভয়ে অখণ্ড ভারতের নতুন গান গাইছে।’
শেষোক্ত মন্তব্যের কোনো যৌক্তিক ভিত্তি থাক কিংবা না-ই থাক, এ কথা বহুলালোচিত যে, খালেদার সাম্প্রতিক দিল্লি সফর একটা ব্যতিক্রম ঘটিয়েছে। তাই তার প্রতিক্রিয়া যাচাই করতে আবেগবর্জিত বিতর্ক-বিশ্লেষণ প্রয়োজন। সেটা এখনো চলছে সুধী সমাজে। সেই সাধারণ বিতর্কের জের ধরে প্রথমে দেখা দরকার খালেদা জিয়ার এই মুহূর্তে দিল্লি সফরের ভূরাজনৈতিক কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল কি না বা কী ছিল।
এ সম্পর্কে ৭ নভেম্বর তার ‘সময়চিত্র’ কলামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল লিখেছেন : “(এ দেশে) বিএনপির (বিগত) আমলে জঙ্গিবাদী রাজনীতির প্রসার ঘটে। (ওই আমলেই তা দমনেও কার্যকর ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছিল। তবে) বিএনপির শেষ আমলে ভারতীয় বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে প্রশ্রয় দেয়া হয়েছিল। প্রথম কারণে বিএনপির প্রতি রুষ্ট ছিল আমেরিকা, ইউরোপ আর ভারত। দ্বিতীয় কারণে প্রধানত ভারত। গত আমলে বিএনপির সরকার কোনো এক বিচিত্র কারণে তাইওয়ানের একটি বাণিজ্যিক অফিস খোলার অনুমতি দিলে বিএনপির ‘ন্যাচারাল এলাই’ চীনও রুষ্ট হয়ে ওঠে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার সম্পর্ক অটুট রাখতে পেরেছিল কেবল পাকিস্তান, সৌদি আরবসহ মুসলিম বিশ্বের সাথে, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে যাদের প্রভাব ক্রমেই ীয়মাণ। বিএনপি তাই এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক মহলের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের জন্য। ভবিষ্যতে মতায় যেতে হলে শুধু জনসমর্থন যথেষ্ট নয়, এদের সহায়তাও লাগবে, এটা বিএনপির উপলব্ধিতে না করার কথা নয়।
শক্তিশালী প্রতিবেশী ও মুরব্বিদের উপো করে এই যুগে মতায় থাকার বা মতায় আসার নজির কম। ইরানে আহমাদিনেজাদ আর উত্তর কোরিয়ার কিম ইল সুংয়ের পরিবার তা পারছেন শক্ত জাতীয় ঐক্য, আদর্শবাদ আর মোটামুটি স্বনির্ভর অর্থনীতির কারণে। ভেনিজুয়েলায় হুগো শ্যাভেজ পারছেন গোটা ল্যাতিন আমেরিকায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মনোভাব এবং তেলনির্ভর অর্থনীতির শক্তির কারণে। কিউবা টিকে আছে মূলত ফিদেল কাস্ত্রোর ব্যক্তিত্ব আর কিউবাবাসীর কৃচ্ছ্রমূলক আত্মত্যাগের কারণে। এই দেশগুলোর ওপরও খবরদারির চেষ্টা চলছে নিরাপত্তার নানা অজুহাতে। পারমাণবিক অস্ত্র থাকার কারণে উত্তর কোরিয়া তা উপো করে চললেও অন্যদের পে সেটি আরো বহু বছর পর্যন্ত হয়তো সম্ভব হবে না।
আগে একটা সময় ছিল, যখন আন্তর্জাতিক আধিপত্যবাদের মূল কারণ ছিল অর্থনৈতিকÑ জ্বালানি, অস্ত্র, অবকাঠামোভিত্তিক ব্যবসায় আর আন্তর্জাতিক পুঁজির আধিপত্য বিস্তার। সোভিয়েত যুগে রাজনৈতিক আদর্শের আধিপত্যের লড়াইও জোরদার ছিল। এখন নাইন-ইলেভেনের পর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম নির্ণায়ক হয়ে উঠেছে নিরাপত্তা ইস্যু। জাতীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা একই সূত্রে গাঁথা, এই তত্ত্ব দুর্বল দেশগুলোতে আন্তর্জাতিক খবরদারির একধরনের নৈতিক যৌক্তিকতা সৃষ্টি করেছে। বিএনপির সরকারের আমলে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ বা ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রশ্রয় প্রদান বাংলাদেশের রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক খবরদারির সুযোগকে আরো প্রসারিত করেছে এবং একই সাথে বিএনপিকে মিত্র হিসেবে অগ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। এই পরিপ্রেেিত খালেদা জিয়ার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বিএনপিকে উদার না হোক, অন্তত মধ্যপন্থী গণতান্ত্রিক দল হিসেবে (ভূরাজনৈতিক শক্তিগুলোর কাছে) বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা।”
এবার দেখা যাক, খালেদার এই ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ অর্জনের প্রয়াস কতটা সফল হয়েছে। সে সম্পর্কে একটি মন্তব্য প্রতিবেদনে ১৪ নভেম্বর আমার দেশ সম্পাদক (সাবেক খালেদা জিয়া সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টা) মাহমুদুর রহমান লিখেছেন, “মহাজোট সরকারের প্রথম আড়াই বছরে ভারত থেকে যেসব কর্তাব্যক্তি বাংলাদেশ সফর করেছেন, তাদের মধ্যে কেউই বেগম খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করার জন্য সময় বের করতে পারেননি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে দেশী-বিদেশী কৌশল প্রয়োগে বিএনপিকে রীতিমতো ধরাশায়ী করা হয়। আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বন্ধুরা নির্বাচনে বিএনপির অবিশ্বাস্য পরাজয়ের পরিণতিতে দলটিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক ভাবতেও শুরু করেছিলেন। ‘মাইনাস টু’ বাস্তবায়ন করতে না পারলেও ‘মাইনাস ওয়ান’ করতে পারা গেছে কল্পনা করে তাদের আহাদের সীমা ছিল না। চেয়ারপারসনের সাম্প্রতিক ভারত সফর দলটিকে তাই নিশ্চিতভাবেই নতুন করে মতার পাদপ্রদীপে নিয়ে এসেছে। উজ্জীবিত দলীয় নেতাকর্মীরাও আগামী নির্বাচনে জয়লাভ করে মতায় ফেরার স্বপ্ন দেখছেন। আগেই উল্লেখ করেছি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশ অনেক দিন ধরেই বিএনপিকে আঞ্চলিক পরাশক্তি ভারতের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের তাগিদ দিয়ে আসছিল। এই সফরের মাধ্যমে তাদের সেই চাওয়াও অনেকটাই পূরণ হয়েছে। সুতরাং মতায় থাকতে চারদলীয় জোট সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বন্ধুহীন হয়ে পড়ার যে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল, তারও নাটকীয় পরিবর্তন ঘটল। কাকতালীয়ভাবে বিগত চার বছরে বর্তমান মতাসীনরাই বরং বন্ধুহীন হয়ে পড়েছে।”
বাংলাদেশের সুশীলসমাজের যে অংশ তৃতীয় শক্তি উত্থানের মাধ্যমে নবরূপে ‘মাইনাস টু’ বাস্তবায়নের আশায় কিছু দিন যাবৎ নড়েচড়ে উঠছিল, তারাও দিল্লিতে খালেদা জিয়ার উষ্ণ আতিথেয়তাপ্রাপ্তিতে বড়সড় ধাক্কা খেয়েছেন। সফরের উষ্ণতা প্রমাণ করেছে, ভারত আপাতত অচেনা কোনো তৃতীয় শক্তিকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত নয়। এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে, সাউথ ব্লক এবং ‘র’-এর নীতিনির্ধারকেরা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে জেনারেল মইনের মতো দাসসুলভ চরিত্র খোঁজার চেয়ে বিএনপিতে গওহর-মসিউর মার্কা চক্রকে উৎসাহিত করতেই অধিকতর আগ্রহী। বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পরিপ্রেেিত সেনাবাহিনীতে মইন-মাসুদ গং খুঁজে পাওয়া এবার অন্তত সহজ না-ও হতে পারে। এক ঢিলে দুই পাখি মারার মতো এক সফরেই বেগম খালেদা জিয়া ২০২১ পর্যন্ত মতায় থাকতে আগ্রহী প্রধানমন্ত্রীকে উদ্বিগ্ন করার পাশাপাশি বায়বীয় তৃতীয় শক্তিকেও হতোদ্যম করতে পেরেছেন।
অন্য দিকে, দেশের অভ্যন্তরে মিডিয়ার আনুকূল্য লাভের েেত্রও বেগম জিয়ার ভারত সফর ফলপ্রসূ হয়েছে। বাংলাদেশের মিডিয়ার বেশির ভাগ দীর্ঘ দিন ধরে ঐতিহ্যগতভাবেই ভারতের প্রতি সহানুভূতিশীল। বিভিন্ন দ্বিপীয় ইস্যুতে বাংলাদেশের স্বার্থ সংরণে বিএনপির দৃঢ় অবস্থানে এরা এত দিন তথাকথিত প্রতিক্রিয়াশীলতার গন্ধ খুঁজে পেত। বাংলাদেশের বুক চিড়ে ভারতকে ট্রানজিট প্রদান আমাদের নিরাপত্তার প্রশ্নে বিপজ্জনক এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী হলেও কয়েকটি ভারতপন্থী পত্রিকা সর্বদা ট্রানজিটের পইে ওকালতি করেছে। ট্রানজিট প্রশ্নে বিএনপির দৃশ্যত নমনীয় অবস্থান আগামী নির্বাচনে ওই সব পত্রিকার সমর্থন লাভে দলটির জন্য সহায়ক হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।
বিএনপির নীতিনির্ধারক গোষ্ঠী আন্দোলন ছাড়া কিংবা যৎসামান্য আন্দোলনের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবি বাস্তবায়ন করতে আগ্রহী। ভারতের প্রতি বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করার বিনিময়ে তাদের দাবির প্রতি দেশের সুশীলসমাজ এবং ভারতপন্থী মিডিয়ার সমর্থন লাভ করা গেলে দলীয় বিবেচনায় লাভের পাল্লাই ভারী হবে। এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত আপসহীন শেখ হাসিনাকে নীতি পরিবর্তনে বাধ্য করতে হলে আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ অপরিহার্য। সেদিক থেকেও ভারত ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারে।”
শেখ হাসিনাকে ‘আপসহীন নীতি পরিবর্তনে বাধ্য করতে’ ভারত আদৌ কোনো ভূমিকা রাখতে চাইবে কি না, সে প্রসঙ্গে আমরা পরে আসব। প্রথমে দেখা যাক একান্তে প্রদত্ত ভূরাজনৈতিক চাপ বা টোপ যা-ই বলা যাক, তাতে সাড়া দিয়ে মানুষের ধারণা বা পাবলিক পারসেপশনে খালেদা কী ব্যতিক্রম ঘটালেন। এ সম্পর্কে ১০ নভেম্বর কবি-প্রাবন্ধিক আবুল মোমেন ‘এবার বিএনপির আওয়ামীকরণ!’ শিরোনামে ভাষ্যদান করেছেন তার ‘যুক্তি তর্ক গল্প’ কলামে। তার আশ্চর্যবোধক চিহ্নটির ব্যাখ্যা অনুসরণ না করে আমরা শুধু তার ইন্ট্রো বা মুখবন্ধটি উদ্ধৃত করব। তিনি লিখেছেন, “বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার ভারত বিজয় হলো, নাকি ভারত জয় করল বিএনপির মন, সেটাই এখন জল্পনার বিষয়। তবে এর ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের আভাস মিলছে। আমাদের বিরোধীদলীয় নেতার সাথে ভারতের সরকারপ্রধানসহ রাষ্ট্রপতি ও বিরোধী রাজনীতিবিদদের যেসব বৈঠক হয়েছে, তাতে মূলত ছিল ভারতের দিক থেকে বিএনপির কাছে কিছু সুনির্দিষ্ট ইস্যুতে সুস্পষ্ট বক্তব্য। মূল তিনটি বিষয়ের মধ্যে দু’টি বিষয় সরাসরি ভারতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট, যেমনÑ ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ও পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইকে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না দেয়া এবং ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা প্রদান। তৃতীয়টি দৃশ্যত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় অর্থাৎ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। তবে এর সাথে ছিল জামায়াত-বিএনপির সম্পর্ক, জঙ্গি-ইসলামি দলগুলোর প্রতি বিএনপির মনোভাব ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট বিষয়। তাতে বাংলাদেশে একটি ধর্মনিরপে গণতান্ত্রিক শক্তি মতায় থাকার বিষয়ে ভারতের আগ্রহ স্পষ্ট হয়। আমাদের আপসহীন নেত্রী মৌখিকভাবে এসব বিষয়ে সম্মত হয়েছেন বলে শোনা যায়। অতীতকে পেছনে ফেলে সামনের দিকে তাকানোর কথা তার মুখে শোনা গেছে। ভারতীয় নেতাদের মুখেও ছিল একই ধরনের সুর।”
এখন ভারতীয় মিডিয়া আর দিল্লির ওয়াকিবহাল মহল সূত্রে পাওয়া খবর থেকে পরখ করা যাক, ভারতীয় নেতারা কী চেয়েছেন এবং ‘আপসহীন’ খালেদা কী বিষয়ে সম্মত হয়েছেন। ভারতের চাওয়া নিয়ে ২৮ অক্টোবর টাইমস অব ইন্ডিয়া পত্রিকার বিশ্লেষণে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে বলা হয়েছে (সংিেপত) : আগামী বছরের শেষ নাগাদ বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ওই নির্বাচনে জিতে খালেদা জিয়ার দল বিএনপির মতায় আসার বেশ সম্ভাবনা আছে। এ ছাড়া বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনেক কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠেছে।
নয়াদিল্লির নিজস্ব স্বার্থ বা পছন্দ-অপছন্দ (যাই থাক না কেন), ঢাকার মতায় কে থাকবে, তা তারা ঠিক করে দিতে পারে না। গত চার বছরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে, তা সত্ত্বেও আরো উন্নতির সুযোগ আছে। আগামী নির্বাচনে যদি বিএনপি মতায় আসে, তার পরও এই অগ্রগতি বজায় রাখতে চাইবে নয়াদিল্লি। (যেসব বিষয়ে) খালেদা জিয়ার কাছ থেকে পরিষ্কার হতে চাইবে ভারত, তার মধ্যে প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকার। নির্দলীয় নিরপে সরকারের অধীনে নির্বাচনের এই ব্যবস্থা গত বছর বাতিল করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। বিএনপি চাইছে, ওই ব্যবস্থা আবার চালু করা হোক, তা না হলে নির্বাচন বর্জনের হুমকিও তারা দিয়ে রেখেছে। যদিও সর্বশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলটি সুখকর ছিল না। সেনাসমর্থিত ওই সরকারের সময় জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিল। এ বিষয়ে বিএনপি কী কৌশল নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, তা জানতে চাইবে ভারত। দাবি পূরণ না হলে নির্বাচন বর্জনের বিষয়ে তারা কি সত্যিই অনড় থাকবে? আরেক দফায় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বাংলাদেশের কোনো পরে জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না। (দ্বিতীয়) যুদ্ধাপরাধের বিচার। বাংলাদেশের রাজনীতির সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার।
‘বাংলাদেশের ধর্মনিরপেতা নির্ভর করছে যুদ্ধাপরাধের বিচারের সফল সমাপ্তির ওপর। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ওই অপরাধের জন্য যারা অভিযুক্ত হয়েছেন এবং যাদের বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে, তারা বিএনপি এবং তাদের মিত্র দল জামায়াতে ইসলামীর সাবেক ও বর্তমান নেতা। কাজেই বিএনপি মতায় এলে তাদের আমলে বিচার হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে। তাই এ েেত্রও খালেদা জিয়ার অবস্থান কী এবং তিনি মতায় গেলে বিচার অব্যাহত রাখবেন কি না, তা জানতে চাইবে ভারত।’
দিল্লিতেই বিএনপি নেতাদের সূত্রে প্রকাশ, ভারতের ওই প্রশ্নগুলোর জবাবে বিএনপি দলনেত্রী জানিয়ে দিয়েছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে যাবে না।
অন্য দিকে জামায়াত ও ইসলামপন্থীরা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট আছে বলেই তারা ‘ধর্মনিরপে’ভাবে দায়িত্ব পালনে অভ্যস্ত হয়েছে। যেমন বিগত বিএনপি শাসনামলে দুই জামায়াতমন্ত্রী দুর্গাপূজার মণ্ডপে গিয়ে মূর্তিপূজারিদের শুভেচ্ছা জানিয়ে এসেছেন। ইসলামপন্থীদের সাথে না রাখলে তারা জঙ্গিবাদের খপ্পরে পড়বে। তবে ট্রানজিট, ভারতীয় স্বার্থবিরোধীদের বাংলাদেশে জায়গা না দেয়া ইত্যাদি প্রশ্নে শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশ-ভারত বোঝাপড়ায় হাল আমলে যে ‘গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি’ হয়েছে, অকপটে সেটা বজায় রাখার কথা দিয়ে এসেছেন খালেদা।
ভারত সন্তুষ্ট হয়েছে কি? বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার দেব মুখার্জি ভারতের দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকায় যে মন্তব্য প্রতিবেদন দিয়েছেন, তাতে ভারতের সন্তুষ্টি নয়, সন্দেহবাতিকের অভিব্যক্তি সুস্পষ্ট। তিনি লিখেছেন, ‘বিএনপির নেতাদের ভারতের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির যে পরিবর্তন দেখা গেছে, যা আগে থেকে ইতিবাচকভাবেই আলাদা। এ পরিবর্তন নিয়ে অনেকে এখনো সন্দিহান। সত্যি সত্যিই উভয় দেশের মধ্যকার সম্পর্ক বদলাচ্ছে কি না, সে ব্যাপারে অনেকেই অনিশ্চিত।
বিএনপির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলেছেন, ভারতের সাথে সম্পর্কে কোনো পরিবর্তন হয়নি এবং খালেদা জিয়া সেখানে বাংলাদেশের স্বার্থই জোরের সাথে তুলে ধরেছেন। তিনি খোলাসা করে বলেছেন যে, খালেদা জিয়া ট্রানজিট নয় বরং বাদবাকি এশিয়ার সাথে সংযুক্ত হওয়ার বিষয়েই একমত হয়েছেন।
(এ ছাড়া) বিশ্বাসযোগ্যতার স্বার্থে হয়তো খালেদা জিয়াকে যুদ্ধাপরাধ বিচারের ইস্যুতে জামায়াতের থেকে আলাদা হতে হবে। এ ব্যাপারে শক্তিশালী জনমত থাকলেও বিএনপি সরাসরি বিচারের বিরোধিতা না করলেও এখনো স্পষ্ট অবস্থান নেয়নি। বাইরের সাথে সম্পর্ক যার মধ্যে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কও পড়ে, তা আসলে শেষ পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিধারার পাদটীকা।
খালেদা জিয়ার ঢাকা ফেরার তিন দিন পর সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি মুখপাত্রকে যে বলতে হয়েছে, দলের ভারতনীতির পরিবর্তন হয়নি, তাতে ভারত ুণœ হয়েছে দেব মুখার্জি তেমনই ইঙ্গিত করেছেন। এ ছাড়া খালেদা জামায়াতের নেতাকর্মীদের ওপর শেখ হাসিনার পুলিশি অ্যাকশনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। জামায়াতকর্মীরা পুলিশকে রুখে দাঁড়াচ্ছে, পুলিশেরও দ্বিধা দেখা দিয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোটের গণমিছিলে ছিল জামায়াতকর্মীদের প্রবল উপস্থিতি। দেব মুখার্জির মন্তব্যে খোলাখুলিই বলা হয়েছে, বিএনপিকে ‘জামায়াত থেকে আলাদা হতে হবে।’ এ দেশের ‘অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিধারা’ সেটা হতে দিচ্ছে না। ভারত সেদিক থেকে জামায়াতকে বাংলাদেশের রাজনীতির মূল ধারা থেকে হটাতে না পেরে অবশ্যই নিরাশ হয়েছে।
তাহলেও ভারতীয় আধিপত্যবাদী কূটনীতিরই জয় হয়েছে। মূল ধারার তিন নেতানেত্রী যারা প্রত্যেকে এক দশক বা তার কিছু কমবেশি সময় ধরে বাংলাদেশ শাসন করেছেন, তারা সবাই বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনের আগে শলাপরামর্শের জন্য দিল্লির দরবারের মুখাপেী হয়েছেন। বাংলাদেশের ন্যায্য সার্বজনীন চাহিদাগুলো মেটাতে কোনো সাফ কথা কারো কাছে বলেনি ভারত। তাই আঠারোদলীয় বিরোধী জোটনেত্রী দিল্লি দরবারে হাজিরা দিয়ে যদি সব প্রশ্নে দিল্লির কাছে ‘নতজানু’ না-ও হয়ে থাকেন, দরকষাকষি ছাড়াই একতরফা যেটুকু ‘সম্মতি’ দিয়ে এসেছেন, সেটা ভারতের অর্থনৈতিক ও রণকৌশলগত সাম্রাজ্যের বশ্যতা স্বীকারের নমুনা হিসেবেই গণ্য হবে।
লেখক : বি্িযশষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট

বুধবার, ২১ নভেম্বর, ২০১২

দুর্নীতি রোধে ডিগ্রি বাতিলের দায়িত্ব নিতে হবে


প্রফেসর ড. এম এ মান্নান
তারিখ: ২২ নভেম্বর, ২০১২

আমাদের রাষ্ট্রের আর্থসামাজিক কাঠামোর মূলভিত্তি হচ্ছে হাজার বছরের পরিবার ও সমাজ। তবে আমাদের শিা ও আর্থসামাজিক কর্মকাণ্ড এবং শিা পরিচালনার মূল ভিত্তি হচ্ছে ব্যক্তি। পাশ্চাত্যের পরাধীনতার প্রভাবে আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও শিানীতি ব্যক্তিস্বার্থের দিয়ে প্রভাবিত হয়েছে। ব্যক্তির এ উত্থানে পরিবার, সমাজ, কৃষ্টির নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সমন্বিত উন্নয়ন ও শিানীতি উপেতি হয়েছে। তাই বর্তমান শিাব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে কুশিা ও দুর্নীতির উৎস হয়ে পড়েছে। শিাব্যবস্থায় নৈতিকতার চরম অবয় হয়েছে। এ আর্থসামাজিকতার প্রোপটে এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন আমরা দেখি যেখানে শিার্থীর কর্মজীবন সামাজিক দায়বদ্ধতার অঙ্গীকারস্বরূপ মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে নিবেদিত হবে। যেমন এতে এক দিকে শিার্থীর পুরস্কার দেয়ার ব্যবস্থা থাকবে  তেমনি অপর দিকে দুর্নীতিগ্রস্ত শিার্থীর ডিগ্রি বাতিলের ব্যবস্থাও থাকবে। এখানে ছাত্রছাত্রীদের চূড়ান্ত ডিগ্রি দেয়া হবে অবসর বা মৃত্যুর পর। ইসলাম বলে মানুষের মৃত্যুর পর তার সব হিসাব বন্ধ হয়ে যায়, তিনটি কাজ ছাড়া। হাদিস অনুযায়ী এগুলো হলো (১) জ্ঞানের েেত্র অবদান (২) এমন কোনো দান যা থেকে মানুষ চিরকাল লাভবান হতে থাকবে অর্থাৎ সদকায়ে জারিয়াহ আর (৩) নেক সন্তান।
প্রকৃত অর্থেই একজন মানুষের মৃত্যুর পরই তার মূল্যায়ন যথার্থ হয়। আর তাই আমার কাক্সিত বিশ্ববিদ্যালয়ে তার সারা জীবনের কর্মকাণ্ড ও অর্জন বিবেচনা করে চূড়ান্ত  ডিগ্রি দেয়া হবে। কারণ বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি দিয়েও আমরা শিাব্যবস্থায় সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ প্রবিষ্ট করাতে পারিনি। সমাজে সর্বব্যাপী দুর্নীতি। শিতিরাই বেশি দুর্নীতি করছে। আমাদের আমলাতন্ত্র দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে। রাজনীতিবিদেরা দুর্নীতিগ্রস্ত। এমনকি শিাব্যবস্থাও দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। জনগণ দুর্নীতিপ্রবণ হয়ে উঠেছে। এ অবস্থাটা কেন? এটা এ কারণে যে, আমাদের শিাব্যবস্থাটাই এমন যেখানে ছাত্রছাত্রীদের নীতি নৈতিকতার শিা দেয়া হয় না। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় একটি সার্টিফিকেট দিয়ে বুঝিয়ে দেয় এই জনশক্তিটি আমরা তৈরি করেছি। সে বিএ, এমএ, পিএইচডি প্রভৃতি মানের। বিশ্ববিদ্যালয় অনেকটা পণ্য উৎপাদনের কারখানার মতো। পণ্য উৎপাদনের পর তার ওপর লেবেল লাগিয়ে দেয়া হয়। ছাত্রের ডিগ্রিটাও একটি লেবেল; কিন্তু কারখানায় কোনো কিছু উৎপাদনের পর সে জিনিসটি ঠিক মতো চালু রাখতে বা সেটি ঠিকমতো কাজ করছে কি না সে জন্য একটি সার্ভিসিং সুবিধা দেয়। আমাদের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু সেখান থেকে বের হওয়া ছাত্রটি কী করছে তার কোনো খবর রাখে না। তাদের আবার ডেকে এনে পুরনো জ্ঞানের সাথে নতুন জ্ঞানের সংযোগ ঘটানোর কোনো ঘটনা এখানে নেই। কোনো ছাত্র যদি কর্মজীবনে দুর্নীতি করে তাহলে তার ডিগ্রি বাতিলের কোনো বিধান নেই। যন্ত্র নষ্ট হলে আমরা মেরামত করি। যে যন্ত্রের খুচরা যন্ত্রাংশ পাওয়া যায় না, আমরা সে যন্ত্র কিনি না; কিন্তু মানুষকে আমরা জনশক্তি বললেও তার ‘সার্ভিসিং’ বা ‘আপগ্রেড’ দরকার এ কথা আমরা কেউ বলছি না। অথচ এটা হওয়া উচিত ছিল। উচিত ছিল, যে বিশ্ববিদ্যালয় তার শিার্থীকে নিয়মিত ‘আপগ্রেড’ না করবে তাকে কর্মসংস্থানে নিয়োগ না দেয়া।
বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লবের যুগে এ ধরনের ফলোআপ ব্যবস্থা কঠিন বিষয় নয়। ইংল্যান্ডের ‘হাইগেট স্কুল’ ৪৪৮ বছরের পুরনো। মজার ব্যাপার হলো এই স্কুলের প্রথম  থেকে যত ছাত্র ও শিক ছিলেন তাদের সবার রেকর্ড সংরণ করা আছে। তারা ফলোআপ করে এই স্কুলের কোন্ ছেলে কোথায় কী করছে, জ্ঞান বিজ্ঞানের উন্নতি ও মানবসমাজের কল্যাণে কী অবদান রাখছে। এ থেকে বোঝা যায় পাশ্চাত্যের শিাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় খুব নিবিড়ভাবে না হলেও কিছুটা ফলোআপ সিস্টেম রয়ে গেছে। তাই আমি এমন এক বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা ভাবছি যেখান থেকে আজকের মতো গতানুগতিক বা প্রচলিত কোনো ডিগ্রি না দিয়ে সেখান থেকে দেয়া হবে সমতুল ডিগ্রি বা ডিগ্রি ইকুইভ্যালান্ট। ছাত্রটিকে কর্মেেত্র যোগ দিতে হবে। এখানকার ছাত্রদের ডিগ্রি হবে বিএসসি ইকুইভ্যালেন্ট, এমএ বা এমএসসি ইকুইভ্যালেন্ট, পিএইচডি ইকুইভ্যালেন্ট, ইঞ্জিনিয়ারিং বা এমবিবিএস ইকুইভ্যালেন্ট ইত্যাদি। যারা এখান থেকে ডিগ্রি ইকুইভ্যালেন্ট নিয়ে বের হবে তারা কর্মেেত্র একই মানের ডিগ্রিপ্রাপ্ত কারো চেয়ে কম যোগ্যতাসম্পন্ন হবে না। উপরন্তু, এখান থেকে বের হওয়া ছাত্রদের ফলোআপের ব্যবস্থা থাকবে বা তাদের জ্ঞান আপগ্রেডের কর্মসূচি থাকবে। ফলে এরা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একই মানের ডিগ্রিপ্রাপ্ত কারো চেয়ে থাকবে অগ্রগামী। আবার কর্মেেত্র গিয়ে এদের যদি নৈতিক অধঃপতন ঘটে, কেউ যদি দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে পড়ে তাহলে তাৎণিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় তার ডিগ্রি বাতিল করে দিতে পারবে। অন্য দিকে, সে যদি ভালো কোনো কাজ করে, সমাজ ও মানবতার কল্যাণে অবদান রাখে তাহলে তাকে ডেকে পুরস্কৃত ও সম্মানিত করা হবে।
আমি মনে করি এ ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের কর্মেেত্র চাহিদা হবে ব্যাপক। সবাই জানবে এখানকার ছেলেগুলোকে ফলোআপ করা হচ্ছে, তাদের দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা কম, তারা জ্ঞানে জানাশোনায় অগ্রগামী। সরকারের একক চেষ্টায় সমাজকে দুর্নীতিমুক্ত করা অসম্ভব; কিন্তু এ ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় হলে সমাজ সহজেই অনেক পরিশুদ্ধিতা অর্জন করতে পারবে।
আবার বিশ্ববিদ্যালয় যখন ডিগ্রি ইকুইভ্যালেন্ট প্রদানের চিন্তা করবে তখন এখানকার কারিকুলাম তৈরি হবে বাস্তব জীবন ও সমাজের সাথে মিল রেখে। জীবনের সাথে যুক্ত করা হবে কারিকুলামকে। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাস্তব জীবনে প্রয়োজনীয় জ্ঞানের ওপর গুরুত্ব দেয়া হবে বেশি। ফলে কারিকুলামও হবে সময়োপযোগী। নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই দেখি অর্থনীতিতে পিএইচডি করতে গিয়ে এমন অনেক বিষয় পড়তে হয়েছে যার বাস্তব প্রয়োগ কখনো দেখিনি। মরণোত্তর পুরস্কার দেয়া গেলে মরণোত্তর ডিগ্রি কেন দেয়া যাবে না?
পশ্চিমে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে কিন্তু এই ধ্যান ধারণার প্রতিফলন ঘটতে শুরু করেছে। যেমনÑ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের এমন অনেক বরেণ্য ব্যক্তিকে ডক্টরেট ডিগ্রি দিয়েছে যারা জীবন সংগ্রামে অনবদ্য লড়াই করে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন এবং যারা এক সময় ছিলেন এখানকার ছাত্র। এ ধরনের ব্যক্তিত্বকে ডেকে নিয়ে ডিগ্রি দেয়া হয়; কিন্তু গত শতকে এরকম দুইজন ব্যক্তিত্বকে ডিগ্রি প্রদানে অস্বীকৃতি জানানো হয়। তাদের একজন হলেন পাকিস্তানের জুলফিকার আলী ভুট্টো ও অন্যজন যুক্তরাজ্যের মার্গারেট থ্যাচার। ব্রিলিয়ান্ট প্রাইম মিনিস্টার অব ইংল্যান্ডকে অক্সফোর্ড বলেছিলেন, ‘শি ইজ নট ওয়ার্দি ডটার অব অক্সফোর্ড’। কারণ থ্যাচার শিা অনুদান কেটে দিয়েছিলেন। আর ভুট্টোকে দেয়া হয়নি তিনি পাকিস্তানের গণতন্ত্র হত্যা করেছিলেন বলে।
ক্যামব্রিজও একই নীতি অনুসরণ করছে। তাদের কোনো ছাত্র বিশ্বপর্যায়ে কোনো অর্জন পেলে তাকে ডেকে নিয়ে পিএইচডি দেয়া হয়। এই বিষয়গুলো আমাদের ল্েযর বাইরে রয়ে গেছে।
আমেরিকায় একজন এমডি বা ডাক্তার হতে গেলে খুব কঠিন একটা শিাপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়; কিন্তু এরপরও যে ডিগ্রি তাকে দেয়া হয় তা কিন্তু সারা জীবনের জন্য নয়। মাত্র ১০ বছরের জন্য। ১০ বছর পর আবার তাকে বোর্ডের সামনে হাজির হয়ে সমসাময়িক চিকিৎসা বিজ্ঞানে জ্ঞানের পরীা দিতে হবে। আমাদের শিাব্যবস্থায় এটা পুরোপুরি অনুপস্থিত। এমনকি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোনো ছাত্র যদি বিশ্বপর্যায়েও কোনো কৃতিত্ব অর্জন করে, তবুও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তার কোনো খবর রাখে না। তাই আমি চাচ্ছি এমন এক শিাব্যবস্থা যেখানে কেউ ভালো কিছু করলে তার যেমন স্বীকৃতি দেয়া হবে তেমনি খারাপ কিছু করলে তার শাস্তি তথা ডিগ্রি বাতিলের ব্যবস্থাও থাকবে। শিাব্যবস্থার মাধ্যমে আমরা জবাবদিহিতা ও দায়িত্বশীলতা সৃষ্টি করতে পারিনি।
আমার স্বপ্নের এই বিশ্ববিদ্যালয় যমুনা নদীর কোলঘেঁষে সিরাজগঞ্জ শহরে গড়ে উঠতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার পথে। সম্পূর্ণ ৯টি ভিন্ন ধরনের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়টি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অনুমতি পেয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমতি পাওয়ার অপোয়। পাঁচ একরের কিছু বেশি জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দ্য গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি অব ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড টেকনোলজি। একজন ব্যক্তি তথা একটি পরিবারের নিজস্ব অর্থায়নে এটি প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে যেখানে রয়েছেন বিশ্বমানের ছয়জন পেশাগত দ ট্রাস্টি। এখানকার ছাত্রদের পড়াশোনার খরচের একটা বড় অংশই বহন করবে হাউজ অব মান্নান চ্যারিটেবল ট্রাস্ট। স্বল্প খরচে, কোনো কোনো েেত্র বিনা খরচে দেশের মেধাবী ছাত্ররা সেখানে পড়াশোনা করতে পারবেন। স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিার্থীদের সনদ বাতিলের মতা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট সংরণ করবে আর সে রকম শর্তসাপেইে শিার্থীরা সেখানে ভর্তি হতে পারবেন। বাংলাদেশের ইউনিয়নপর্যায়ে প্রতিষ্ঠালগ্নে পাঁচ একরের বেশি জমির ওপর নিজস্ব ক্যাম্পাস উত্তরবঙ্গের আটটি জেলার সংলগ্ন এবং প্রতিটি জেলা থেকে ২০-৯০ মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত। মধ্যপ্রাচ্যের নব্য ইসলামিক ফাইন্যান্স এবং ওয়েলথের প্রায় অলস পড়ে থাকা আট শত বিলিয়ন মার্কিন ডলারকে আকৃষ্ট করার জন্য এ বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বমানের পেশাগত দ জনশক্তি সরবরাহ করতে পারবে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিকপর্যায়ে দ জনশক্তির চাহিদা পূরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এর বাইরেও ওয়াকফ্ সম্পত্তি ও ক্যাশ ওয়াকফ্ ব্যবস্থাপনার জন্য দ জনশক্তি জোগান দেবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম হবে ইঞ্জিনিয়ারিং, মৎস্য, কৃষি, টেক্সটাইলস প্রভৃতি েেত্র বাস্তব জীবন ধারার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকবে জীবনঘনিষ্ঠ গবেষণার েেত্র বিশেষ তহবিল। এখানকার শিার্থীদের নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধে উজ্জীবিত করা হবে যাতে তারা প্রথম থেকেই জীবনের চেয়ে বৃহত্তর ল্েয উদ্বুদ্ধ হতে পারে।
আসলে আমাদের সমাজে নীরব বিপ্লব ঘটাতে হলে শিাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। এই ঢেলে সাজানোর অর্থ শিা কারিকুলাম পরিবর্তন নয়; সমাজ ও সংস্কৃতির আলোকে শিাব্যবস্থাকে বিন্যস্তকরণ। ওপরের চিন্তাধারা এ েেত্র বৈপ্লবিক হতে পারে। শিার ব্যাপক প্রসার ঘটাতে হবে অনানুষ্ঠানিক (নন ফরমাল) শিার মধ্য দিয়ে। আনুষ্ঠানিক শিার মান আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় প্রশিতিকরণ (ডি-স্কুলিং দ্য সোসাইটি) করতে হবে। মাটি-মানুষ ও সংস্কৃতির সাথে শিাকে সমন্বিত করে উন্নয়ন ঘটাতে হবে। তবেই সাধিত হবে নীরব বিপ্লব।
মানুষ ও সমাজের ধারা পরিবর্তনে উপযোগী ধ্যান ধারণার রূপায়ণ প্রথম দৃষ্টিতে অসম্ভব মনে হতে পারে। প্রকৃতপে প্রতিষ্ঠান ছাড়া এরূপ ধ্যান ধারণার মৃত্যু স্বাভাবিক। আবার ল্য অর্জনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ লোকবল না থাকলে প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকা সম্ভব নয়। তাই দ্য গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি অব ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড টেকনোলজি সৃজনশীল চিন্তাধারার বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে সঙ্কল্পবদ্ধ। এ জন্যই স্বল্পসংখ্যক মানুষ প্রয়োজন যারা হবেন জীবনের চেয়ে বৃহত্তর ল্েয নিবেদিত। বর্তমান দুর্নীতিগ্রস্ত, ঘুণে ধরা আর্থসামাজিক প্রোপটে এই ধরনের মানুষের চরম অভাব অনুভব করছি। তবুও আমি আশাবাদী। নতুন এক শিাব্যবস্থা ও দরদি সমাজ গড়ে তোলার ল্েয আমাদের যাত্রা শুরু। তবে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার কয়েকটি চরণ দিয়েই প্রবন্ধটি শেষ করছিÑ
‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।’
……………………………………..
যদি ঝড়-বাদলে আঁধার রাতে দুয়ার দেয় ঘরেÑ
তবে বজ্রানলে
আপন  বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে নিয়ে একলা জ্বলো রে’

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড ও সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক, জেদ্দা
E-mail: hmct2004@yahoo.com

রবিবার, ১১ নভেম্বর, ২০১২

মন্ত্রীরা নার্ভাস ও বেসামাল কেন


মাসুদ মজুমদার
তারিখ: ১২ নভেম্বর, ২০১২
অর্থমন্ত্রীর সহজ-সরল স্বীকারোক্তিÑ ‘বয়স হয়েছে ভুল হতেই পারে, তবে ক্ষমা চাইব না।’ মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নিজের ছিটিয়ে দেয়া থু থু নিজেই আবার গিলে ফেলতে পারেনÑ এমন নজির বিরল। এই সরকারের আমলে অনেক বিরল ঘটনার মধ্যে এটিও একটি। যে ডক্টর ইউনূসকে তিনি দুষলেন, সেই ইউনূসকে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিয়ে বললেনÑ ‘নয়নের মণি’। এটা যেন গরু মেরে জুতা দান। আবার অমর্ত্য সেনকে কদর্য মিথ্যাচারের মাধ্যমে ব্যবহার করে ক্ষমাও চাইলেন। তার পরও তিনি ইউনূস এবং জাতির কাছে ক্ষমা চাইবেন না। একেই বলে রাজনৈতিক গোঁয়ার্তুমি, জনগণের প্রতি তোয়াক্কাহীন এবং আনুগত্যের ভরকেন্দ্রের প্রতি শর্তহীন আত্মসমর্পণ। অমর্ত্য সেন বিস্ময় প্রকাশ করার পর অর্থমন্ত্রীর টনক নড়ল, অথচ তার অসংলগ্ন বক্তব্যে জাতি বারবার বিব্রতবোধ করল, তাতে তিনি সামান্যতমও অস্বস্তিবোধ করছেন বলে মনে হলো না; টনকও নড়ল নাÑ এর মাজেজা কী?
রেল কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভাকে কচিকাঁচার আসরের সাথে তুলনা করে লোক হাসিয়েছিলেন। সেটা ছিল এই সরকারের মধুচন্দ্রিমার সময়। তারপর বুড়িগঙ্গার পানি অনেক দূর গড়াল। অর্থবিত্ত নিয়ে দুর্নীতির পর দুর্নীতিতে সরকারের গলা পর্যন্ত ডুবল। এখনো অর্থমন্ত্রী বহাল। দায়হীন। একজন ব্যবসায়ী নেতার বক্তব্য, ‘গ্যাস-বিদ্যুৎ নেই, বিনিয়োগ বন্ধÑ তার পরও অর্থমন্ত্রী শুধু হাসেন’। এ ধরনের বক্তব্যও অর্থমন্ত্রীকে বিব্রত করে না। উপস্থিত থেকে উপভোগ করেন। এ যেন মোটা চামড়ার আরেক উপমা।
এর আগে ‘বাফার স্টেট’ কাকে বলে না বোঝার কথা বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সব কূটনৈতিক মহলে হাসির পাত্র হয়েছিলেন। সেটা অজ্ঞাত ভুল হিসেবে ক্ষমাযোগ্য; কিন্তু ঠাণ্ডামাথায় মিথ্যাচার কিভাবে ক্ষমাযোগ্য হতে পারে? তারপর একের পর এক মন্ত্রীরা ‘ফাউল টক’ করে যাচ্ছেন। ইউনূস ও অমর্ত্য সেন নিয়ে বয়োবৃদ্ধ অর্থমন্ত্রীর এই মন্তব্যের আগেও তিনি নানা ইস্যুতে উদ্ভট মন্তব্য করে জনরোষ বাড়িয়েছিলেন। এবার তিনি নিজেও স্বীকার করলেন অমর্ত্য সেনকে জড়িয়ে তিনি মিথ্যা বলেছেন। একজন মন্ত্রী মিথ্যা বলার স্বীকৃতি দেয়ার পর শপথের মধ্যে থাকেন কিভাবে সেই প্রশ্ন মৌলিক। আমরা জানি না প্রধানমন্ত্রী তার এসব মন্ত্রীকে নিয়ে কী করবেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শুধু নিজের নাক-কান কাটেননি। নিজের দলেরও কান কেটেছেন। আইন-আদালত, ন্যায়নীতি এবং দেশের সংবিধানেরও নাক-কান কেটেছেন। একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিভাবে দলীয় ক্যাডারদের আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার জন্য আহ্বান জানাতে পারেন? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য এতটাই অশোভন ও অসংলগ্ন যে যুবলীগ নেতাকে ভিন্ন ভাষায় তার বক্তব্য খণ্ডন করে বক্তব্য দিতে হলো। সেই বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনিও প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের লাঠিপেটার হুমকি দিলেন। এটা যেন গোলমরিচের ঝাল সামাল দিতে কাঁচামরিচের ভর্তা গেলানো। এ সরকারের মন্ত্রীরা হররোজ বিচারের আগে রায় দিয়ে দিচ্ছেন। রায় ঘোষণার আগে সাজা দিয়ে দিচ্ছেন। দেশটা যেন মগের মুল্লুক। জনগণ যেন রায়ত কিংবা প্রজা।
এর আগে আওয়ামী লীগ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুব-উল আলম হানিফ অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যকে দলের নয় বলে মন্তব্য করেছেন। তাতে দল অভিযোগমুক্ত হতে পারে না। কারণ জনাব মুহিত প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। তা ছাড়া হানিফ দলের না সরকারের মুখপাত্র, সেটা এখনো স্পষ্ট নয়।
আমরা জানি না, মন্ত্রীরা এতটা লাগামহীন দিশেহারা হয়ে গেলেন কেন। এটা যদি ব্যক্তিগত অসুখ হয় তাহলে এক কথা। এর চিকিৎসা সহজ। যদি পুরো সরকারের রোগ হয় তাহলে ভিন্ন কথা। এই দুরারোগ্য ব্যাধি সারাতে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দরকার। আত্মস্বীকৃত মিথ্যাচার করে, আইন হাতে তুলে নেয়ার আহ্বান জানিয়েও যদি কোনো মন্ত্রী শপথের মধ্যে থাকেন বলে ধারণা করা যায়, তাহলে জাতিকে সংবিধানের দ্বিতীয় পাঠ নিয়ে ভাবতে হবে।
নার্ভাস ও বেসামাল মন্ত্রীদের দিয়ে দেশ কোনোভাবেই লাভবান হবে না। সরকারও লাভবান হয়নি, বরং এরা দল ও সরকারের লায়াবিলিটিস হয়ে তরী ডুবাচ্ছেন। তার পরও জনগণ দেখতে চায় প্রধানমন্ত্রী তার প্রবীণ এসব মন্ত্রীকে নিয়ে বুড়োর আসর বসাবেন, না জনগণের আরো ধৈর্যের পরীক্ষা নেবেন। জনগণ এখন পরীক্ষা দিতে প্রস্তুত, তবে সরকারকেও জনগণের পাওনা কড়ায়গণ্ডায় বুঝিয়ে দিতে হবে। নয়তো গুণধর মন্ত্রীদের ভাগ্য বিপন্ন হওয়া শুধু সময়ের ব্যাপার হবে।
digantaeditorial@gmail.com

মঙ্গলবার, ৬ নভেম্বর, ২০১২

বিএনপির আসল চ্যালেঞ্জ


আসিফ নজরুল | তারিখ: ০৭-১১-২০১২

বিএনপি সম্পর্কে বিদেশিদের আপত্তি প্রধানত দুটো। এক. বিএনপির আমলে জঙ্গিবাদী রাজনীতির প্রসার ঘটে। দুই. বিএনপির শেষ আমলে ভারতীয় বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। প্রথম কারণে বিএনপির প্রতি রুষ্ট ছিল আমেরিকা, ইউরোপ আর ভারত। দ্বিতীয় কারণে প্রধানত ভারত। গত আমলে বিএনপির সরকার কোনো এক বিচিত্র কারণে তাইওয়ানের একটি বাণিজ্যিক অফিস খোলার অনুমতি দিলে বিএনপির ‘ন্যাচারাল এলাই’ চীনও রুষ্ট হয়ে ওঠে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার সম্পর্ক অটুট রাখতে পেরেছিল কেবল পাকিস্তান, সৌদি আরবসহ মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে যাদের প্রভাব ক্রমেই ক্ষীয়মাণ। বিএনপি তাই এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের জন্য। ভবিষ্যতে ক্ষমতায় যেতে হলে শুধু জনসমর্থন যথেষ্ট নয়, এদের সহায়তাও লাগবে, এটা বিএনপির উপলব্ধি না করার কথা নয়।
শক্তিশালী প্রতিবেশী ও মুরব্বিদের উপেক্ষা করে এই যুগে ক্ষমতায় থাকার বা ক্ষমতায় আসার নজির কম। ইরানে আহমাদিনেজাদ আর উত্তর কোরিয়ার কিম ইল সুংয়ের পরিবার তা পারছেন শক্ত জাতীয় ঐক্য, আদর্শবাদ আর মোটামুটি স্বনির্ভর অর্থনীতির কারণে। ভেনেজুয়েলায় হুগো চাভেজ পারছেন গোটা লাতিন আমেরিকায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মনোভাব এবং তেলনির্ভর অর্থনীতির শক্তির কারণে। কিউবা টিকে আছে মূলত ফিদেল কাস্ত্রোর ব্যক্তিত্ব আর কিউবাবাসীর কৃচ্ছ্রমূলক আত্মত্যাগের কারণে। এই দেশগুলোর ওপরও খবরদারির চেষ্টা চলছে নিরাপত্তার নানা অজুহাতে। পারমাণবিক অস্ত্র থাকার কারণে উত্তর কোরিয়া তা উপেক্ষা করে চললেও অন্যদের পক্ষে সেটি আরও বহু বছর পর্যন্ত হয়তো সম্ভব হবে না।
আগে একটা সময় ছিল যখন আন্তর্জাতিক আধিপত্যবাদের মূল কারণ ছিল অর্থনৈতিক—জ্বালানি, অস্ত্র, অবকাঠামোভিত্তিক ব্যবসা আর আন্তর্জাতিক পুঁজির আধিপত্য বিস্তার। সোভিয়েত যুগে রাজনৈতিক আদর্শের আধিপত্যের লড়াইও জোরদার ছিল। এখন নাইন-ইলেভেনের পর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম নির্ণায়ক হয়ে উঠেছে নিরাপত্তা ইস্যু। জাতীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা একই সূত্রে গাঁথা, এই তত্ত্ব দুর্বল দেশগুলোতে আন্তর্জাতিক খবরদারির একধরনের নৈতিক যৌক্তিকতা সৃষ্টি করেছে। বিএনপির সরকারের আমলে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ বা ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রশ্রয় প্রদান বাংলাদেশের রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক খবরদারির সুযোগকে আরও প্রসারিত করেছে এবং একই সঙ্গে বিএনপিকে মিত্র হিসেবে অগ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে খালেদা জিয়ার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বিএনপিকে উদার না হোক, অন্তত মধ্যপন্থী গণতান্ত্রিক দল হিসেবে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা।
খালেদা জিয়ার গত বছরের আমেরিকা সফর এ ক্ষেত্রে তেমন কোনো সাফল্য বয়ে আনতে পারেনি। তিনি প্রভাবশালী কোনো মার্কিন নেতার সাক্ষাৎ পর্যন্ত লাভ করতে পারেননি। কিন্তু ২০১২ একটি ভিন্ন বছর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। এ বছর বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে বিশাল জনসমাগম, দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারের একের পর এক ব্যর্থতা, ভারত বাদে বাকি প্রায় সব প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে সরকারের সম্পর্কের অবনতিসহ বিভিন্ন কারণে আন্তর্জাতিক বিশ্বে দুই দলের গ্রহণযোগ্যতা কিছুটা হলেও পরিবর্তিত হয়েছে। এ বছর প্রণব মুখার্জির সফরের সময় ভারত কোনো দলের সঙ্গে নয়, বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্বে বিশ্বাসী—এই মন্তব্য ছিল তার একটি বড় প্রমাণ। খালেদা জিয়া ভারত সফরের আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন তখনই। ভারতে যাওয়ার আগে তিনি চীন সফর করলেন, এটা কৌশলগতভাবে ভুল কি না, তা নিয়েও আলোচনা ছিল।
খালেদা জিয়ার চীন সফর অবশ্য অসফল হয়নি। চীন বিএনপির সরকারের আমলে সড়ক, সেতু এবং বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নে লক্ষণীয় ভূমিকা রেখেছিল। বিএনপির নেত্রী ভবিষ্যতে যে চারটি ক্ষেত্রে চীনের অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহায়তা চেয়েছেন, তা জাতীয় প্রবৃদ্ধির জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। প্রথম পদ্মা সেতুর অনিশ্চয়তার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণ, সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে চীনের কুনমিংয়ের সঙ্গে সড়ক ও রেল-যোগাযোগ এবং দেশের ভেতরের সড়ক কাঠামোর সার্বিক ও সমন্বিত উন্নয়নের জন্য চীনা সহযোগিতার আশ্বাস পেয়েছেন। সহযোগিতার সঠিক ক্ষেত্র নির্ধারণ এবং তাতে চীনা আশ্বাসপ্রাপ্তিই আপাতত তাঁর বড়
সাফল্য। তবে তাঁর চীন সফর ভারত কী চোখে দেখছে, তা পর্যবেক্ষক মহলের কাছে ছিল কৌতূহলের বিষয়।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, ভারত স্বতন্ত্রভাবেই খালেদা জিয়ার সফরকে মূল্যায়ন করেছে। ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ‘আর কখনো’ বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করতে না দেওয়া-সংক্রান্ত খালেদা জিয়ার ঘোষণা ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে আশাপ্রদ বিষয় বলে বিবেচিত হচ্ছে। খালেদা জিয়ার এই ঘোষণায় প্রচ্ছন্নভাবে হলেও ভুলের স্বীকারোক্তি আছে বলে তা আন্তরিক বলে অনেকে মনে করছেন। ভারতীয় শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আমার সামান্য আলোচনার অভিজ্ঞতা থেকে জানি, বাংলাদেশের কাছে ভারতের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা এটিই। বিচ্ছিন্নতাবাদ শুধু ভারতের অখণ্ডতার জন্য হুমকি নয়, এটি ভারতের সামরিক ব্যয় এবং কৌশলগত অনিশ্চয়তাও বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। ভারত নিজেও একসময় বাংলাদেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রশ্রয় দিয়েছিল। শেখ হাসিনার প্রথম আমলে পার্বত্য চুক্তির পর অবস্থা পরিবর্তন হলেও পরের বিএনপির আমলে কেন এই সর্বনাশা খেলায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার মেতে উঠেছিল, কারা এতে জড়িত ছিল, তা বিএনপির নেত্রীর গভীরভাবে খতিয়ে দেখা উচিত। পুনরায় ক্ষমতায় এলে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং জঙ্গিদের উত্থানের পেছনে বিএনপি বা জামায়াতের যে অংশের মদদ ছিল, তাদের ক্ষমতাবলয় থেকে দূরে রাখা এবং প্রয়োজনে কঠোরভাবে দমন করার মতো দৃঢ়তা তাঁর অবশ্যই থাকা উচিত।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের এই বিষফোড়ার সমাধান কঠিন কাজ নয়। এ জন্য স্রেফ আন্তরিকতাই যথেষ্ট। দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্যান্য ইস্যুর সমাধান বরং অনেক জটিলতাপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিকতা সত্ত্বেও সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, অভিন্ন নদীর পানি ভাগাভাগি এবং ট্রানজিট সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। সম্ভবত তাঁর সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল একতরফাভাবে প্রথমেই প্রায় সবকিছু প্রদান করা, ব্যক্তি সম্পর্ক আর রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের বিস্তর ব্যবধান বোঝার অক্ষমতা এবং অন্য প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক মহলগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্বকে খাটো করে দেখা। প্রশ্ন হচ্ছে, তুলনামূলকভাবে অগভীর মৈত্রী সম্পর্ক নিয়ে বিএনপির সরকার কি পারবে এসব ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে? এসব ইস্যুতে আওয়ামী লীগ সরকারের নিরন্তর সমালোচনার পর ভারতের কাছ থেকে শ্রেয়তর কোনো সমাধান অর্জনের কর্মকৌশল কি রয়েছে বিএনপির? একই সঙ্গে দেশের স্বার্থ এবং ভারতের সঙ্গে সত্যিকারের বন্ধুত্ব রক্ষা করার ক্ষেত্রে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো
সরকার উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। বিএনপি কেন তা পারবে, সেটি পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে না পারলে ভারত ও ভোটার—দুই পক্ষই সন্দিহান থাকবে তাদের প্রতি।
তার আগে বিএনপিকে নিশ্চিত করতে হবে যে আগামী নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার না হলেও অন্তত গ্রহণযোগ্য কাঠামোর একটি সর্বদলীয় সরকার এবং নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের দাবি বিএনপিকে আদায় করতে হবে। অবস্থাদৃষ্টে এটি পরিষ্কার যে রাজপথে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলে সরকারকে বাধ্য না করাতে পারলে এই দাবিগুলো আদায় করা যাবে না। জনমত এখন বিএনপির পক্ষে হয়তো রয়েছে, কিন্তু তাকে যৌক্তিক পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়ার মতো সাংগঠনিক ও নেতৃত্বের দৃঢ়তা বিএনপির আছে কি? ২১ নভেম্বর সমাবেশের পর থেকে আন্দোলন তীব্রতর করার দিকে বিএনপি এগোতে থাকলে মামলা-হামলাসহ নানা ধরনের দমনমূলক পদক্ষেপ সরকার গ্রহণ করতে পারে। বিএনপিকে কোনোভাবেই ক্ষমতায় আসতে না দিতে সরকার মরিয়া হয়ে উঠলে রাজপথে অরাজকতামূলক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। আশঙ্কা রয়েছে যে এমন অবস্থায় গণতন্ত্র এবং আগামী নির্বাচন পর্যন্ত বিপন্ন হতে পারে।
যতই ঝুঁকি থাক, জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানের দাবি আদায়ের জন্য আগামী কয়েক মাসই সম্ভবত শেষ সুযোগ বিএনপির জন্য। এ সময় সরকার বসে থাকবে না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করে, ভারতের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি সম্পাদন করে, শেয়ারবাজার চাঙা করে এবং কিছু দুর্নীতির বিষয়ে ব্যবস্থা নিয়ে শেষ সময়ে জনসমর্থন পুনরুদ্ধারের চেষ্টা সরকার করবে। একই সঙ্গে ১০ ট্রাক অস্ত্র, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ও জিয়া অরফানেজ মামলায় কিছু বিচারিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে চাপে ফেলার চিন্তাও সরকারের থাকবে।
‘ভারত জয়’ মানেই তাই ক্ষমতায় চলে আসা নয়। আমেরিকার আশীর্বাদ মানেও ক্ষমতার কাছাকাছি চলে যাওয়া নয়। বিএনপি নির্বাচনে জিতে এসে এ দুটো দেশের প্রতি হুমকিস্বরূপ কোনো কাজ করবে না, এই নিশ্চয়তা সৃষ্টি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের একটি শর্ত মাত্র। কিন্তু এটি সম্ভব করার আসল কাজটি করতে হবে দেশের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে। বিএনপি যদি আগামী কয়েক মাসে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে, বিএনপি ও তার জোটের মৌলবাদী ও হঠকারী গোষ্ঠীকে যদি খালেদা জিয়া কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন, সরকারের পরিবর্তন হলে আগের আমলের ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি হবে না—এমন বিশ্বাস যদি তিনি মানুষের মনে স্থাপন করতে পারেন, তা হলেই কেবল বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় আসতে পারে। তা না হলে খালেদা জিয়ার বিদেশ সফরের সাফল্য কাগুজে সাফল্য হিসেবেই থেকে যাবে।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য প্রতিবেদন : গণতান্ত্রিক শাসনের বিকল্প নেই

মাহমুদুর রহমান
বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া অক্টোবরে আমাদের দুই প্রবল ক্ষমতাধর প্রতিবেশী রাষ্ট্র সফর করে দেশে ফিরেছেন। অন্য বিষয়াদির মতোই বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের দুই প্রধান নেত্রীর চরিত্রে লক্ষণীয় ভিন্নতা রয়েছে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বরাবরই বিদেশে বেড়াতে বিশেষ পছন্দ করেন। তার সকল নিকট-জনেরাও সপরিবারে প্রবাসী। প্রধানমন্ত্রীর পরিবারে দুর্নীতির ব্যাপকতা নিয়ে চারদিকে গুঞ্জন ওঠার প্রেক্ষিতে কয়েক মাস আগে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার পরিবারের সংজ্ঞা দেশবাসীকে জানিয়েছিলেন। সেই সংজ্ঞায় তিনি ছাড়া তার ছোট বোন শেখ রেহানা এবং উভয়ের পুত্র-কন্যাগণকেবল প্রধান-মন্ত্রীর পরিবারভুক্ত। পুত্রবধূ অথবা কন্যা-জামাতা এবং পৌত্র-পৌত্রীদের এই সংজ্ঞায় স্থান কোথায়, সে বিষয়ে শেখ হাসিনা অবশ্য কিছু বলেননি। যাই হোক, এরা সবাই আমেরিকা, কানাডা ও ব্রিটেনের বাসিন্দা। পদ্মা সেতু দুর্নীতির দেশে-বিদেশে তদন্তের প্রেক্ষিতে তিন দেশের মধ্যে সম্প্রতি কানাডা নিয়েই মিডিয়া ও জনগণের ঔত্সুক্য বিশেষভাবে বেড়েছে। সুতরাং, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ ভ্রমণপ্রীতির পেছনে ন্যায্য কারণ রয়েছে। অপরদিকে আগের ইতিহাসে দেখা গেছে, বেগম খালেদা জিয়া স্বদেশে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। পাঁচ বছরের সরকারি দায়িত্ব পালনকালে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাতেও দেখেছি, তিনি নিজে যেমন বিদেশে যেতে চান না, একইভাবে মন্ত্রী-আমলাদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণের প্রবণতাকেও যথেষ্ট অপছন্দ করেন। রাজনৈতিক এবং স্বাস্থ্যগত কারণে বিরোধীদলীয় নেত্রীর দুই পুত্র বিগত চার বছরেরও অধিককাল বিদেশে থাকলেও তিনি কিন্তু পরিবার থেকে দূরে থাকার যাতনা সয়ে অধিকাংশ সময় বাংলাদেশেই কাটিয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়া দশ বছর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে প্রায় নয় বছর পার করেছেন এবং এবারের মেয়াদ পূর্ণ করে তিনিও বেগম খালেদা জিয়ার ১০ বছরের রেকর্ড ধরে ফেলবেন বলেই সকলের ধারণা। মাঝখানের দুই বছরের মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের সরকারের সময়টুকু বাদ দিলে দুই নেত্রী দুই দশক ধরে পালাক্রমে সরকারপ্রধান এবং বিরোধীদলীয় প্রধান হয়েছেন। এই সময়ের বিদেশ ভ্রমণের তালিকা প্রণয়ন করলে একজনের বিদেশ ভ্রমণপ্রীতি এবং অপরজনের বিদেশ যেতে অনীহার চিত্রটি জনগণের কাছে পরিষ্কারভাবেই ফুটে উঠবে। ক্ষমতাবানদের বেড়ানোর গল্প রেখে এবার রাজনীতির গুরু-গম্ভীর আলোচনায় আসি।
বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন হতে সংবিধান অনুসারে এখনও এক বছরেরও কিছু অধিক সময় বাকি আছে। জনগণ গভীর আশঙ্কা নিয়ে আগামী নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে। দেশব্যাপী এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টির তাবত্ ‘কৃতিত্ব’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ভাগাভাগি করে নিতে পারেন। উভয়ে মিলে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রথা বাতিল না করলে এই অনভিপ্রেত অস্বস্তির সৃষ্টি হতো না। তবে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল না হলেও পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান কে হচ্ছেন, সেটা নিয়ে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে ২০০৬ সালের মতো একটা টানাপড়েন যে থাকতো, সেটা অস্বীকার করা যাবে না। কারণ অপরিবর্তিত সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা বিতর্কিত প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকই আজ সেই পদের দাবিদার হতেন। ২০০৬ সালে বিচারপতি কেএম হাসানকে সত্তরের দশকে তার সঙ্গে বিএনপির কথিত সাংগঠনিক সম্পর্ক এবং কর্নেল রশীদের সঙ্গে আত্মীয়তার কারণে আওয়ামী লীগ গ্রহণ করেনি।
তদুপরি ২০০৫ সালে চারদলীয় জোট সরকার কর্তৃক বিচারপতিদের অবসর গ্রহণের বয়স ২ (দুই) বছর বৃদ্ধি করার বিষয়টিকে তত্কালীন বিরোধী দল সন্দেহের দৃষ্টিতেই দেখেছে। কিন্তু একজন বিচারপতি হিসেবে কেএম হাসান প্রজ্ঞা, নিরপেক্ষতা, সততা এবং আইনের গভীর জ্ঞানের স্বাক্ষর রেখেছেন। তার প্রাতিষ্ঠানিক এবং ব্যক্তিগত আচরণ সর্বদাই বিচারপতিসুলভ ছিল। দীর্ঘ জজিয়তি জীবনে তিনি যে সকল রায় লিখেছেন, সেগুলো নিয়ে কখনোই কোনো প্রশ্ন উত্থাপিত হয়নি। অপরদিকে বিচারপতি খায়রুল হক আদালতপাড়ায় একজন চরম দলবাজ বিচারপতি হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতি তার ব্যক্তিগত বিদ্বেষের বিষয়টি সম্পর্কেও দেশবাসী অবহিত। কাজেই বিচারপতি খায়রুল হককে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হিসেবে মেনে নেয়া বিএনপি’র পক্ষে সঙ্গত কারণেই সম্ভব হতো না। মনে রাখা দরকার, এই ধরনের জটিলতা থেকে উত্তরণের পন্থা ত্রয়োদশ সংশোধনীতেই দেয়া ছিল।
নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন পদ্ধতি সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ, ৫৮গ (৫)-এ বলা ছিল—
“যদি আপীল বিভাগের কোনো অবসরপ্রাপ্ত বিচারককে পাওয়া না যায় অথবা তিনি প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণে অসম্মত হন, তাহা হইলে, রাষ্ট্রপতি, যতদূর সম্ভব, প্রধান রাজনৈতিক দলসমূহের সঙ্গে আলোচনাক্রমে, বাংলাদেশের যে সকল নাগরিক এই অনুচ্ছেদের অধীনে উপদেষ্টা হইবার যোগ্য তাহাদের মধ্য হইতে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করিবেন।”
এক-এগারোর সরকার গঠনের সময় তত্কালীন রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ছাড়াই শুধু সামরিক জান্তার নির্দেশে ড. ফখরুদ্দীন আহমদকে প্রধান উপদেষ্টা পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তার এই পদক্ষেপ সরাসরি সংবিধানের লঙ্ঘন হলেও সে সময় সুশীল (?) সমাজভুক্ত আইনজীবীকুল এবং শেখ হাসিনাসহ মহাজোট নেতৃবৃন্দের মধ্যে কেউ কোনো আপত্তি উত্থাপন করেননি। যাই হোক, দেশের বর্তমান বিবদমান পরিস্থিতিতে উদ্ধৃত অনুচ্ছেদটি রাজনৈতিক সংঘাত থেকে হয়তো জনগণকে মুক্তি দিতে পারত। কিন্তু একতরফাভাবে প্রায় অকার্যকর, একদলীয় সংসদে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে পঞ্চদশ সংশোধনী গৃহীত হওয়ার ফলে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য একজন ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান পদে নিযুক্তির সুযোগ রহিত করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আগামী বছর একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের পরিবর্তে প্রধান দুই দল এখন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়ন ছাড়াও দেশের অভ্যন্তরে আন্দোলন পরিচালনা এবং আন্দোলন প্রতিহত করার কৌশল নির্ধারণে ব্যস্ত।
বিগত চার বছরে বিএনপি বিভিন্ন ইস্যুতে থেমে থেমে আন্দোলনের হুঙ্কার দিলেও তেমন কোনো সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তোলেনি। বরং আওয়ামী লীগের কট্টর সমর্থকও হয়তো স্বীকার করবেন যে, ১৯৯১-পরবর্তী বাংলাদেশের বিগত চারটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সংসদীয় পদ্ধতির সরকারের মেয়াদকালে রাজপথের আন্দোলনের বিবেচনায় এবারই কোনো সরকার তুলনামূলকভাবে অপেক্ষাকৃত শান্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করে চলেছে। এখন পর্যন্ত জনগণের দৈনন্দিন জীবনযাপন হরণকারী রাজনৈতিক কর্মসূচি হরতাল দেয়াতে বিএনপি’র নীতিনির্ধারকদের মধ্যে পরিষ্কার অনীহা লক্ষ্য করা গেছে। বিএনপিবিরোধীরা বিষয়টিকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে অবশ্যই দাবি করতে পারেন যে, বিরোধী দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং সরকারের কঠোর পুলিশি ব্যবস্থার কারণেই দেশের রাজনীতি শান্তিপূর্ণ থেকেছে।
যে কারণেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই উত্তরণ ঘটে থাকুক না কেন, বাস্তবতা হলো মহাজোট সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘ চার বছর সময় পেয়েও চরম দলীয়করণ, নজিরবিহীন দুর্নীতি ও তীব্র প্রতিহিংসাপরায়ণতার কারণে দেশ পরিচালনায় সর্বক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। সরকারের বিদেশি মুরব্বি গোষ্ঠীও বাংলাদেশে জনমতের পরিবর্তন সঠিকভাবে আন্দাজ করতে পেরে তাদের কৌশলেও পরিবর্তন এনেছে। তাদের সেই পরিবর্তনে এদেশের শাসকগোষ্ঠীও যে বিচলিত হয়ে পড়ছে, সেটাও বেগম জিয়ার সাম্প্রতিক ভারত সফর নিয়ে নেতৃবৃন্দের অকূটনৈতিক মন্তব্যের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। এ অবস্থায় নির্বাচনে পরাজয়-পরবর্তী অবধারিত জনরোষ থেকে রক্ষা পেতেই ক্ষমতাসীন মহল ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার আয়োজন করছে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করলে এই সর্বনাশা খেলা থেকে তাদের অবশ্যই নিবৃত্ত হওয়া উচিত। ১৯৭৫ সালে সংবিধান সংশোধনের ফলাফল হৃদয়বিদারক হয়েছিল। জেনারেল এরশাদ ১৯৮৬ এবং ১৯৮৮ সালে দুই দফায় একতরফা নির্বাচন করলেও কোনো বারই সংসদের মেয়াদ দুই বছরের বেশি টেকাতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত তাকে গণধিকৃত হয়ে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়েছে। ১৯৯৬ সালে বিএনপি ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি সংযুক্তির জন্যই করতে বাধ্য হয়েছিল। সেই স্বল্পকালীন সংসদের মেয়াদও তাই ত্রয়োদশ সংশোধনী গ্রহণের সঙ্গেই সমাপ্ত হয়েছিল।
২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি একতরফা নির্বাচন প্রচেষ্টার বিপজ্জনক পথ ধরেই জেনারেল মইন-মাসুদ গং ক্ষমতা দখল করেছিল। রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে পেয়ে তারাও আজকের মহাজোটের মতোই নব্বই দিনের মেয়াদের কথা ভুলে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল। তথাকথিত ‘মাইনাস টু’ সেই ষড়যন্ত্রেরই অংশ ছিল। বাংলাদেশের সুশীল (?) সমাজ তত্কালীন অসাংবিধানিক সরকারকে শুধু সমর্থনই জানায়নি, ‘মাইনাস টু’ বাস্তবায়নে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিল। সে সময় ‘বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনা : প্রচারণা ও বাস্তবতা’ শিরোনামে একটি কলাম লিখেছিলাম। ২০০৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি তারিখে প্রকাশিত কলামের এক জায়গায় শেখ হাসিনা এবং বেগম খালেদা জিয়া সম্পর্কে লিখেছিলাম— “বাস্তবতা হলো, এই দুই নেত্রী মিলে দীর্ঘ ১৫ বছর নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীরূপে বাংলাদেশ পরিচালনা করেছেন এবং কারাবন্দী অবস্থাতেও এই দু’জনই বাংলাদেশের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ধারার রাজনীতির অবিসংবাদিত নেত্রীর স্থানটি ধরে রেখেছেন। বর্তমান নীতিনির্ধারকদের মধ্যে কেউ হয়তো এমন ধারণা পোষণ করেন যে, জননন্দিত নেতা চাইলেই পাওয়া যায় অথবা হওয়া যায়। কিন্তু বিষয়টি এতটা সহজ হলে তথাকথিত মাইনাস টু কৌশল এতদিনে বাস্তবায়ন হয়ে যেত।”
২০০৮ সালের মাঝামাঝি দুই নেত্রী সংসদ এলাকার সাবজেল থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। তবে দুই মুক্তিতে অনেক ফারাক ছিল। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তত্কালীন সামরিক জান্তার সঙ্গে আঁতাত করে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের বন্দোবস্ত সমাপ্তি সাপেক্ষেই জেলের বাইরে পা রেখেছিলেন। বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থবিরুদ্ধ সেই অশুভ আঁতাত নিয়ে তখন লিখেছিলাম, ‘আঁতাতকারীরা ক্ষমতার পিঠা ভাগে মত্ত।’ ওই বছর জুলাইয়ের ১৭ তারিখে নয়া দিগন্তে প্রকাশিত সেই লেখায় আমার মন্তব্য ছিল—
“বর্তমান ক্ষমতাসীনদের সাথে আওয়ামী লীগ এবং তাদের সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর মাখামাখি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। শেখ হাসিনা কারামুক্ত হয়ে দেশ ছেড়ে এখন বিশ্বভ্রমণ করে বেড়াচ্ছেন এবং সরকারের সাথে আওয়ামী লীগের একপ্রস্থ সংলাপ নাটকও সম্পন্ন হয়েছে। সর্বশেষ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এক-এগারোর অন্যতম রূপকার ও প্রচ্ছন্নের ক্ষমতাধর ব্যক্তিটির প্রশংসায় ফুলঝুরি ছোটাচ্ছেন। অপরদিকে এই সময়ের মধ্যে জাতীয়তাবাদী এবং ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীনদের নিপীড়ন তীব্রতর হয়েছে।”
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অন্যান্য মন্ত্রীর জাতিকে এক-এগারোর ভয় দেখানোর প্রেক্ষিতেই পাঠকদের পুরনো কথাগুলো মনে করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন বোধ করলাম। তাদের স্মরণে রাখা আবশ্যক, এক-এগারো আওয়ামী লীগ ও সুশীল (?) গোষ্ঠীর যৌথ প্রকল্প ছিল এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার সেই এক-এগারোর আঁতাতেরই ফসল। এটাই প্রকৃত ইতিহাস। সুতরাং, এক-এগারো সম্পর্কে সমালোচনার নৈতিক অধিকার বাংলাদেশের আর যে নাগরিকই হোক, অন্তত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাখেন না। ফখরুদ্দীন আহমদের শপথ গ্রহণের দিনে বঙ্গভবনে দলবলসহ তার সহর্ষ উপস্থিতি এবং সেই সরকারের ‘সকল কর্মকাণ্ডের’ আগাম বৈধতা প্রদানের ঘোষণার কথা ভুলো বাঙালি মুসলমান বোধহয় এখনও পুরোপুরি ভুলে যায়নি।
তাছাড়া সেই ক্যু দেতা’র অন্যতম নায়ক লে. জে. (অব.) মাসুদউদ্দিন চৌধুরী চাকরিতে একের পর এক মেয়াদ বৃদ্ধির রেকর্ড সৃষ্টি করে আজ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। তাকে এই নজিরবিহীন পুরস্কার প্রদানের পেছনে যে শেখ হাসিনার কৃতজ্ঞতার ঋণ শোধের ব্যাপারটি ক্রিয়াশীল রয়েছে, সেটি দেশের সকল সচেতন নাগরিকই বুঝতে পারেন। এক-এগারোর সরকার দ্বারা শারীরিকভাবে নির্যাতিত বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর মইন-মাসুদকে লক্ষ্য করে যতই হুংকার ছাড়ুন না কেন, তার যে দুই সাবেক জেনারেলের কেশাগ্র স্পর্শ করারও ক্ষমতা নেই, এটা সম্ভবত তিনিও জানেন। তবু চেঁচামেচি করে গায়ের ঝাল যদি কিছুটা কমানো যায় আর কী!
বেগম খালেদা জিয়ার সদ্যসমাপ্ত ভারত সফরের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে সহসাই জোর নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করবে বলেই মনে হচ্ছে। সংবিধানের বর্তমান অবস্থায় দশম সংসদ নির্বাচন আগামী বছর অক্টোবরের ২৫ থেকে ২০১৪ সালের জানুয়ারির ২৪-এর মধ্যবর্তী যে কোনো দিনে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সাবেক প্রধান বিচারপতি ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ রায়ে আবার কমপক্ষে ৪২ দিনের নির্বাচন প্রস্তুতির একটা নির্দেশনা দিয়েছেন। রায়ের ওই অংশটি বিবেচনায় নিলে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। ২০০৮ সালেও ওই মাসেই নবম জাতীয় সংসদের নির্বাচন হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মাসে নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে খানিকটা অতিরিক্ত উদ্দীপনা বিরাজ করে। দীর্ঘ তিরিশ বছরের অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ রাজনীতিবিদ শেখ হাসিনাও নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণে মনস্তাত্ত্বিকভাবে এগিয়ে থাকার এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিশ্চয়ই বিবেচনায় নেবেন। সব মিলে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা অব্যাহত থাকার বিষয়টি এখন সর্বতোভাবে শেখ হাসিনার ওপরই নির্ভর করছে।
গণআকাঙ্ক্ষা মান্য করে তিনি একটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা গ্রহণ করলে জনগণের ভোটের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি দেশও এক অবশ্যম্ভাবী বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাবে। ১৯৯৬ সালের বিএনপির মতো বর্তমান সংসদে মহাজোটের সংসদ সদস্যের সংখ্যা নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। সে সময় সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকার কারণেই বেগম খালেদা জিয়াকে ১৫ ফেব্রুয়ারির অজনপ্রিয় নির্বাচনের ঝুঁকি নিতে হয়েছিল। বর্তমান অবস্থায় শেষ হাসিনার ইচ্ছানুযায়ী সংবিধানে যে কোনো সংশোধনী আনার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা তার দলের রয়েছে। তার সরকারের মেয়াদের শেষদিন পর্যন্ত তিনি আইনগতভাবে বৈধ এবং নৈতিকভাবে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিবেচিত হবেন।
কিন্তু মেয়াদ শেষে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে শেখ হাসিনা যদি দশম সংসদের একতরফা নির্বাচন সম্পন্ন করতেও পারেন, তাহলেও তাকে আর বৈধ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশে-বিদেশে কেউ মেনে নেবে না। সেক্ষেত্রে কেবল পেশিশক্তির ওপর নির্ভর করেই তাকে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে। আগেই উল্লেখ করেছি, বাংলাদেশের ৪১ বছরের ইতিহাসে সকল অত্যাচারী শাসকের ভয়ানক পরিণতি ঘটেছে। তাছাড়া আন্তর্জাতিকভাবেও বর্তমান সরকার ক্রমেই বন্ধুহীন হয়ে পড়ছে। শেষ ভরসা ভারতীয় দুর্গতেও বেগম খালেদা জিয়া জোরেশোরে হানা দিয়েছেন। সুতরাং কেবল এক ইসলামী জঙ্গি জুজুর ভয় দেখিয়ে ২০০৮-এর মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতকে একসঙ্গে পাশে পাওয়ার সম্ভাবনা ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছে। এমতাবস্থায় ক্ষমতাসীন মহলের যে কোনো মূল্যে ২০২১ পর্যন্ত ক্ষমতায় টিকে থাকার ফ্যাসিবাদী চিন্তাই বরং আবারও অসাংবিধানিক শক্তির ক্ষমতা দখলের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
২০০৭ সালের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সমগ্র জাতিকেই শেষ পর্যন্ত এ ধরনের বোধবুদ্ধিহীন দুঃসাহসিকতার মূল্য চুকাতে হয়। মইন-মাসুদ গংয়ের তুঘলকি রাজত্ব-পরবর্তী পাঁচ বছরে সেনাবাহিনী এবং বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) থেকে শুরু করে বাংলাদেশের প্রায় সকল প্রতিষ্ঠান ধ্বংসপ্রাপ্ত অথবা দুর্বল হয়েছে। দলগুলোর সংকীর্ণ ক্ষমতার রাজনীতি চর্চা বাংলাদেশকে আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় অধিকতর পরমুখাপেক্ষী করে তুলেছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য দেশের স্বার্থে স্বাধীনতাকামী জনগণের ঐক্য প্রয়োজন। গণতন্ত্রের অনেক দুর্বলতা সত্ত্বেও দেশের স্বাধীনতা রক্ষার্থে অন্তত জাতীয় ইস্যুতে নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ করতে হলে ধারাবাহিক গণতান্ত্রিক শাসন অপরিহার্য। আশা করি, শেখ হাসিনা উপলব্ধি করবেন, অসাংবিধানিক সরকারের আগমনী পথ প্রশস্ত করার চাইতে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে পরাজিত হয়ে বিরোধী নেত্রীর ভূমিকা গ্রহণ করাও অধিকতর নিরাপদ ও সম্মানজনক। ২০০৮ সালে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হওয়ার পর মাত্র চার বছরের ব্যবধানে জনসমর্থনের বিচারে বেগম খালেদা জিয়ার অবিশ্বাস্য ঘুরে দাঁড়ানো থেকে তিনি অনুপ্রেরণা লাভ করতে পারেন।
ইমেইল : admahmudrahman@gmail.com