শুক্রবার, ১২ জুলাই, ২০১৩

মেধাবীদের সামনে অন্ধকার

কোটায় খেয়ে ফেলছে চাকরি



শফিকুল ইসলাম

চাকরিতে কোটাপ্রথা বাতিলের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কার্জন হলের সামনে শিক্ষার্থীরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন : নয়া দিগন্ত
সরকারি চাকরি েেত্র কোটাব্যবস্থা তুলে দেয়া অথবা তার সংস্কার করে নিম্নপর্যায়ে নিয়ে আসার দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে সারা দেশ। প্রায় সব কয়টি প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলনে নেমেছেন। পুলিশ ও ছাত্রলীগের যৌথ অভিযানে রক্তাক্ত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই নন, সারা দেশেই বিুব্ধ শিার্থীরা রাস্তায় নেমে এসেছেন। এ আন্দোলন দল ও মতের গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ মানুষকে স্পর্শ করেছে। দল ও মতের পরিচয় ঠিকানাবিহীন খেটে খাওয়া প্রান্তিক পরিবারের সন্তানেরাই কোটাব্যবস্থার নির্মম শিকার। নিছক মেধার জোরে উচ্চশিার আঙিনা পেরিয়ে প্রতিযোগিতামূলক পরীায় অবতীর্ণ হতে গিয়েই এসব তরুণ হোঁচট খাচ্ছেন। চাকরি নামের সোনার হরিণ তাদের কাছে অধরাই থেকে যাচ্ছে। মেধা আর কাজে আসছে না। ফলে মেধাবীদের সামনে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই নেই। কোটায় কোটায় ভাগবাটোয়ারা হয়ে যাচ্ছে সব পদ। বিুব্ধ, হতাশ, ক্রুদ্ধ তরুণেরা তাই রাজপথে নেমে এসেছেন। কী কারণে স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও কোটার বি¯তৃতি বাড়ছে; সে এক অজানা রহস্য। সাদা চোখে দেখলে মনে হয় এসবই রাজনীতির কূটকৌশলের ফল। প্রশ্ন উঠেছে, মেধাবীরা যাবেন কোথায়? শ্রম ঘামে অধ্যবসায়ে গড়ে তোলা ক্যারিয়ার কাজে না লাগলে তারা কী করবেন? যোগ্যরা স্থান না পেলে অযোগ্যরাই দখল করবেন সারা দেশ, যা ভবিষ্যতে ভয়ঙ্কর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, দেশে সরকারি চাকরি েেত্র ১০ শতাংশ জনগোষ্ঠী ৫৬ শতাংশ কোটার সুবিধাভোগী। অর্থাৎ ৯০ শতাংশ জনগোষ্ঠী কোটা সুবিধার বাইরে। প্রশাসনে ভারসাম্য রার জন্য কোটার প্রচলন করা হলেও এ ব্যবস্থা এখন নিপীড়নের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণেই ুব্ধ হয়ে উঠেছেন শিতি তরুণেরা। আবার কোটার সুবিধাভোগ নিয়ে দুর্নীতিরও শেষ নেই। দেদার অপব্যবহার হচ্ছে এ ব্যবস্থার। এখানে ভারসাম্য রার কোনো বন্দোবস্ত নেই। দেশে শিল্পের বিকাশ নেই। কর্মমুখী শিাব্যবস্থা সঙ্কুচিত। উচ্চশিিিত তরুণদের নিছক শ্রমিক হয়ে প্রবাসে পাড়ি দেয়ার ঘটনা ভূরি ভূরি। এসএসসি কিংবা এইচএসসি উত্তীর্ণ পদের বিপরীতে মাস্টার্স উত্তীর্ণদের দরখাস্ত দেয়ার ঘটনা অহরহ ঘটছে। সরকারি চাকরির েেত্র একটি পদের বিপরীতে প্রার্থী থাকেন কয়েক হাজার। প্রতিটি স্তরেই মেধা ও যোগ্যতার স্বার রাখতে হয়। প্রাথমিক বাছাইয়েই যদি কোটার আগ্রাসন শুরু হয় তাহলে সেসব প্রতিযোগীর মেধা যাচাইয়ের সুযোগ থাকে না। শিার্থীরা এটাকে রাষ্ট্রের নির্মম আচরণ হিসেবে বিবেচনা করছেন। সাম্প্রতিক কোটাবিরোধী আন্দোলনে এ বিষয়গুলো নতুন মাত্রা দিয়েছে। বাংলাদেশে সরকারি উচ্চ পদে চাকরিতে নিয়োগকারী সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পাবলিক সার্ভিস কমিশন বা পিএসসি। এ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে প্রকৃত মেধাবী ও যোগ্যদের বাছাই করে নিয়োগ দেয়া। কিন্তু গত কয়েক বছরে পিএসসির কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটি তার নিরপেতা বজায় রাখতে পারেনি বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। বেশ কয়েকটি পরীার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার অভিযোগ ওঠায় কর্তৃপ তা বাতিলও করে দেয়। এসব ঘটনা মেধাবী শিার্থীদের উদ্যম নষ্ট করেছে। তাদের মধ্যে হতাশা বাড়িয়েছে। এর ওপর কোটার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন চাকরিপ্রত্যাশীরা। বর্তমানে বিসিএস পরীার মাধ্যমে উত্তীর্ণরা নিয়োগের জন্য যেসব কোটার মুখে পড়েন সেগুলো হচ্ছেÑ মুক্তিযোদ্ধা পোষ্য কোটা ৩০ ভাগ, মহিলা ১০ ভাগ, জেলা ১০ ভাগ, উপজাতি ৫ ভাগ ও প্রতিবন্ধী ১ ভাগ। জেলা কোটার মধ্যে আবার সব জায়গা একরকম অগ্রসর না হওয়ায় সুষম বণ্টন নেই। বেশ কয়েকটি জেলা আছে যেখানকার অধিবাসীরা উত্তীর্ণ হয়েও ছিটকে পড়ছেন। জেলার কোনো কোটা না থাকায় মেধাবী হয়েও তারা চাকরি পাচ্ছেন না। আগে সনাতন ক্যাডার সার্ভিসে নির্দিষ্ট কয়েকটি পদে কোটাপদ্ধতি অনুসরণ করা হতো। কিন্তু সম্প্রতি শিকতা, চিকিৎসা, প্রকৌশল, কৃষিবিজ্ঞান, প্রাণিসম্পদ সার্ভিসেও কোটা অনুসরণ করা হচ্ছে কঠোরভাবে। অধস্তন বিচার বিভাগ বা জুডিশিয়াল সার্ভিসে কিছুদিন আগেও মেধাবীরাই চাকরি পেতেন। সম্প্রতি এখানেও কোটাপদ্ধতি চালু করা হয়েছে। বিচার বিভাগেও এখন কোটার ভিত্তিতে চাকরি হচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ৩১তম বিসিএসে প্রাধিকার কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ায় ৭৭৩টি পদ শূন্য রাখা হয়। অথচ সম্মিলিত মেধা তালিকায় ওপরের দিকে অবস্থান করেও অনেক প্রতিযোগীই চাকরি পাননি। কারণ মেধা থাকা সত্ত্বেও কোনো কোটার মধ্যে না পড়ায় তাকে বঞ্চিত হতে হয়েছে। ২৯তম বিসিএসে সাধারণ ক্যাডারে ৪১২ জনের মধ্যে ২১১ জন কোটায় নিয়োগ পেয়েছেন। আর মাত্র ২০১ জন নিয়োগ পেয়েছেন মেধার ভিত্তিতে। ২৮তম বিসিএসে সাধারণ ক্যাডার সার্ভিসে ৬৫৭ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করে পাবলিক সার্ভিস কমিশন। এর মধ্যে ৩৪৭ জনই বিভিন্ন কোটায় নিয়োগ পেয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা, নারী, উপজাতি ও পেশাগত ক্যাডারে যোগ্যপ্রার্থী না পাওয়ায় ২৮তম বিসিএসে ৮১০টি এবং ২৯তম বিসিএসে ৭৯২টি পদ খালি রাখা হয়। ৩২তম স্পেশাল বিসিএসে শুধু মুক্তিযোদ্ধা, মহিলা ও উপজাতি কোটাধারীরাই চাকরি পেয়েছেন। অবাক করা ঘটনা ঘটেছে ৩৪তম বিসিএসে। পিএসসির এ পরীায় প্রিলিমিনারিতেই কোটাব্যবস্থার প্রয়োগ ঘটানো হয়েছে। অর্থাৎ কোটার বাইরে কোনো শিার্থী প্রাথমিক যোগ্যতা যাচাইয়েরও সুযোগ পাননি। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের ইতিহাসে যা নজিরবিহীন। এর আগে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে যাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছিল তাদের বেশির ভাগই শিাবিদ। দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিকদেরই এসব নিয়োগ দেয়া হতো। কখনো কখনো পদস্থ আমলা এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন ক্যাডারের প্রার্থী বাছাইয়ে ওইসব ক্যাডার সার্ভিসে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়োগ বোর্ডে সমন্বয় করা হয়েছিল। কিন্তু এবারই প্রথম পুলিশ সার্ভিস থেকে এনে একজনকে পিএসসির সর্বোচ্চ পদে বসানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কমিশনে বর্তমানে চেয়ারম্যানসহ নিযুক্ত ১৪ জনের ১৩ জনই সরকারি দলের কট্টর সমর্থক বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ বলেন, প্রিলিমিনারি পরীায় কোটাব্যবস্থার প্রয়োগ অতীতে কখনো হয়নি। প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীার পর কোটাব্যবস্থার সমন্বয় করে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হতো। কিন্তু এবার যে বিষয়টি করা হয়েছে তা ঠিক হয়নি। কোটাপ্রথা বাতিলের দাবিতে এখন যে আন্দোলন শুরু হচ্ছেÑ এ বিষয়ে ড. ফায়েজ বলেন, চাকরিতে কোটাব্যবস্থা থাকবে কি না এ ব্যাপারে সরকার এবং পিএসসিকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পিএসসির এক সাবেক চেয়ারম্যান নয়া দিগন্তকে বলেন, পিএসসি এবার যেভাবে ফল প্রকাশ করেছে তা ঠিক হয়নি। প্রিলিমিনারি পরীায় কোটাব্যবস্থার প্রয়োগ একেবারেই অযৌক্তিক। তিনি বলেন, পিএসসি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হলেও এর অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানেরা এখন আর চাকরি পাওয়ার মতো নেই। অনেকের ছেলেমেয়েও বয়স্ক হয়ে গেছেন। তাদের নাতি-নাতনীদের কোটায় চাকরি দেয়া অযৌক্তিক। সুতরাং এখন এ কোটা সীমিত করে যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসা উচিত। তবে রাজনৈতিক কারণে কোটাব্যবস্থা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি আরো বলেন, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানেরা প্রশাসনের সবচেয়ে ভালো ক্যাডারগুলোতে কোটায় চাকরি পান। ফলে মেধাবীরা বঞ্চিত হন। যদি এক হাজার পরীার্থী হয় এর মধ্যে ৩০০ জন হয় মুক্তিযোদ্ধা কোটায়। কিন্তু সর্বোচ্চ দুই থেকে আড়াই শ’ কোটায় পাওয়া যায়। আর বাকি পদগুলো শূন্য থেকে যায়। ফলে প্রকৃত মেধাবীরা আসেন না। তবে ওই সরকারের আমলে তিনি কোটাব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে সরকারের কাছে একটি প্রস্তাবনা দিয়েছিলেন বলে জানান সাবেক ওই চেয়ারম্যান। অন্য দিকে কোটার কারণে পড়ে থাকা শূন্য পদগুলো মেধাবীদের থেকে ‘বিশেষ মেধা‘ দিয়ে পূরণ করার কথা বলেন তিনি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন