রবিবার, ২৯ এপ্রিল, ২০১২

কিনার নাইরে'



শাহদীন মালিক
সব মিলিয়ে আমরা অশান্তিতে আছি। এর বেশিরভাগ দায় সরকারি দলের। তবে লাগাতার হরতাল করে বিরোধী দল যথার্থ প্রতিবাদ করছে কিন্তু তা আমাদের অশান্তি কমাচ্ছে না। আমাদের অশান্তি ও দেশের অশান্ত পরিস্থিতিতে বড় দুই দল পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে অবিলম্বে যদি কোনো ব্যবস্থা না নেয় তাহলে দেশের শাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অন্যদিকে এই দুই রাজনৈতিক দল থেকে এই দেশের ভোটাররা মুখ ফিরিয়ে নেবে এবং আগামী নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য নতুন দল খুঁজবে


মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশাল সমুদ্রজয়ে তার সঙ্গে সঙ্গে আমরাও সবাই আনন্দিত ও উৎফুল্ল। এর সঙ্গে আমরা আশা করব, শুধু ভারতের বিরুদ্ধে আরও সমুদ্রজয় হবে না, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ক্রমান্বয়ে ভারত মহাসাগর, প্রশান্ত মহাসাগর এবং আটলান্টিক মহাসাগরও বাংলাদেশের জন্য জয় করবেন। আপাতত যে সমুদ্রজয় হয়েছে সেই সমুদ্র থেকে অবশ্যই সম্পদ আহরণ হবে। গ্যাস, তেল আরও অন্যান্য খনিজসম্পদের জন্য বহু বড় বড় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে কোটি কোটি টাকার চুক্তি সম্পাদন হবে। এই বিশাল সমুদ্রজয়ের পর সমুদ্রের সম্পদ আহরণের জন্য বড় বড় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে এই চুক্তিগুলো খোলামেলা হওয়া উচিত। দেশের সব খনিজসম্পদের মালিক জনগণ। অর্থাৎ আমি, আপনি, দেশের নাগরিক আমরা সবাই এই সম্পদের মালিক। আমাদের সম্পত্তি নিয়ে, আমাদের পক্ষ হয়ে সরকার কার সঙ্গে কী চুক্তি করছে সেটা জানার অধিকার আমাদের সবার আছে। আমাকে না জানিয়ে আমার সম্পত্তির ব্যাপারে অন্যের সঙ্গে চুক্তি করা যায় না। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে তেল-গ্যাস সংক্রান্ত চুক্তিতে বহু বছর ধরেই বিশাল বিশাল দুর্নীতি হয়েছে। সেই দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য তেল-গ্যাস সমৃদ্ধ নতুন কয়েকটি গণতান্ত্রিক দেশে এই চুক্তিগুলো প্রকাশ করা সংক্রান্ত আইনও হয়েছে। আমাদেরও প্রথমত সেই আইন হওয়া দরকার। দ্বিতীয়ত, আইন না হলেও কোনো বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে তেল-গ্যাস নিয়ে এখন যে নতুন নতুন চুক্তি হবে তা আমাদের না জানিয়ে করা যাবে না। করলে আমরা ধরে নেব সমুদ্রজয়ের ফল শুধু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তার আশপাশের প্রিয়জনেরাই ভোগ করবেন। তখন তা হবে কেবল প্রধানমন্ত্রীর সমুদ্রজয়, দেশের সমুদ্রজয় নয়। উপরের এই কথাগুলো বলতে হচ্ছে এই কারণে যে, ইদানীং স্থলভাগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালন অত্যন্ত নড়বড়ে হয়ে গেছে। ক্রমাগত একের পর এক ঘটনা ও দুর্ঘটনায় একদিকে যেমন সরকারের প্রতি আস্থাহীনতা বাড়ছে, অন্যদিকে জনগণেরও অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা বাড়ছে।
আমরা সবাই খুব অশান্তিতে আছি। প্রথমত, কতগুলো লোমহর্ষক অপরাধের কোনো সুরাহা না হওয়া; দ্বিতীয়ত, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পদে থাকা বা পদে না থাকার ব্যাপারে খুব সাদামাটা আইনি ব্যাপারগুলোকে সাংঘাতিক ঘোলাটে করে ফেলা; তৃতীয়ত, হাতেনাতে ধরা দুর্নীতির ঘটনা নিয়ে টালবাহানা এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর আইনের বাইরে এবং জবাবদিহিতার লেশমাত্র না থাকা। সব মিলিয়ে আমাদের উৎকণ্ঠা, অস্থিরতা ও অশান্তির প্রেক্ষাপটে সমুদ্র বিজয়ের উৎসব সেটা যত ঘটা করে হোক না কেন তা আমাদের স্বস্তি দিচ্ছে না। চলমান উদ্বেগজনক ঘটনাগুলোর মধ্যে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও সোহেল তাজের পদে থাকা না থাকা এমন একটা বিষয় যেটা নিয়ে ঘোলা জল সরকারের আইন ও সুশাসন বিষয়ে চরম খামখেয়ালিপনা ও অদক্ষতার পরিচায়ক।
স্পষ্টত সোহেল তাজ তার প্রতিমন্ত্রী পদেও থাকতে চাননি, এখন সংসদ সদস্য পদেও থাকতে চান না। যে পদ স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিতে চায় তাকে ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা দেশ পরিচালনা সংক্রান্ত মধ্যযুগীয়, সামন্তবাদী চিন্তার নোংরা বহিঃপ্রকাশ। উনিশ শতকে জমিদারদের অত্যাচারে বাংলার বহু এলাকা থেকে হাজার হাজার প্রজা ভেগে গিয়ে নতুন বসতি স্থাপন করেছিল। এই ভেগে যাওয়া প্রজাদের নতুন বসতি স্থাপন প্রক্রিয়াই পদ্মার দক্ষিণে বর্তমানে দক্ষিণ বাংলাদেশে বসতি গড়ে উঠেছে। কিন্তু জমিদাররা প্রজাদের চলে যাওয়ায় সবসময় বাধা দিত। পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করা বা গ্রহণ করতে টালবাহানা, এ সংক্রান্ত উদ্ভট আইনি প্রশ্নের অবতারণ ইত্যাদি সবই সহকর্মীদের আজ্ঞাবহ অধীন হিসেবে গণ্য করার চিন্তাচেতনা বলে কেউ যদি মনে করে, তাহলে তার সঙ্গে তর্ক করা কঠিন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবের উচিত ছিল আইনি অবস্থান প্রধানমন্ত্রীকে তুলে ধরা এবং বলা যে, যেহেতু সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের পদত্যাগের ঘোষণা হয়ে গিয়েছিল সেহেতু তাকে মন্ত্রীর পদে রাখতে হলে পুনরায় শপথবাক্য পাঠ করানো আইনসিদ্ধ হতো। আর জনগণ তার করের টাকায় কোনো কাজ না করা, দায়দায়িত্ব পালন না করা ব্যক্তিকে মন্ত্রীর সব সুযোগ-সুবিধা, বেতন-ভাতা দেবে কি-না সেটা জনগণের কাছ থেকে জেনে নেওয়া বাঞ্ছনীয়। কারণ, দফতরবিহীন মন্ত্রীর সব খরচ জনগণকেই বহন করতে হবে। আমাদের ধারণা, আমরা যেহেতু কোনো কাজ না করে বেতন-ভাতা পাই না সেহেতু আমরাও যিনি কোনো কাজ করবেন না অর্থাৎ দফতরবিহীন মন্ত্রীর বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধার খরচ এবং গাড়ির জন্য খরচ দিতে প্রস্তুত নই।
পদত্যাগের এ ব্যাপারগুলো থেকে জনগণের এই ধারণা আরও সুদৃঢ় হচ্ছে যে, সরকার বা সরকারপ্রধান আইনের কোনো ব্যাপারেই তোয়াক্কা করে না। এখানে তার ইচ্ছা যেটাকে তার কঠিন সমালোচকরা বলেন জেদ ও অন্যান্য হিসাব-নিকাশই মুখ্য, আইন-সংবিধান এখানে গৌণ।
অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল সমুদ্র তো জয় করতে পারেইনি, স্থলভাগের ব্যাপারেও তারা জনগণের যে খুব বেশি আস্থা অর্জন করতে পারছেন তা মনে হচ্ছে না। তবে তাদের সাংগঠনিক সম্পাদক গুম হয়ে যাওয়ায় তারা রাজনৈতিক আন্দোলনের একটা যথার্থ ও যৌক্তিক ইস্যু পেয়েছেন। এই ইস্যুতে হরতাল হয়েছে এবং নিকট ভবিষ্যতে আরও হরতাল হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। কিন্তু আপাতত হরতালের পক্ষে জনসমর্থন থাকলেও এই জনসমর্থন দু'চারদিনের বেশি থাকবে না। আমাদের হরতালে নিরীহ লোক নিহত হয়, ভাংচুর, অগি্নসংযোগ ও সম্পত্তির বিনষ্ট হয়, লাখ লাখ লোকের রুজি-রোজগার ব্যাহত হয়, ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি হয়, বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা কমে যায় অর্থাৎ হরতালের বিপক্ষে যুক্তির তালিকা অনেক দীর্ঘ। কিন্তু দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে বিরোধী দলের হরতাল ছাড়া গত্যন্তর নেই এবং গত ২০ বছরে বিএনপি থেকে হরতাল আওয়ামী লীগ করেছে অনেক বেশি। তবে এখানে মুখ্য প্রশ্ন হলো, বিএনপির আন্দোলন দেশকে শুধু অস্থিতিশীল করবে, নাকি একটা রাজনৈতিক সমাধানের দিকে নিয়ে যাবে।
উভয় প্রধান দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা এখনই যদি আলাপ-আলোচনা শুরু না করেন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক এবং সংসদ কার্যকর করার প্রশ্নে বড় দাগে কয়েকটা বিষয়ে সহযোগিতামূলক অবস্থান না আসে, তাহলে জনদুর্ভোগ ও জনঅশান্তি খুব তাড়াতাড়ি এতটাই বেড়ে যাবে যে জনগণই তখন নতুন রাজনৈতিক দলের জন্ম দেবে।
আমাদের ধারণা, এখন একটা জরিপ হলে দেখা যাবে যে, আমাদের বড় দুই রাজনৈতিক দলের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা নিকট অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি। উভয় রাজনৈতিক দলকে তাদের প্রতি জনগণের এই আস্থাহীনতাকে অবিলম্বেই কমাতে হবে। সেটা না করে তারা যদি একে অপরের প্রতি কাদা ছোড়াছুড়ি করে, অতীত নিয়ে জঘন্য ভাষায় সমালোচনা করা চালিয়ে যান এবং অতীতের মতোই কাজ করতে থাকেন, তাহলে এই দেশে নতুন বড় রাজনৈতিক দলের উত্থান খুব দূরের ব্যাপার থাকবে না।
মোদ্দাকথা, সব মিলিয়ে আমরা অশান্তিতে আছি। এর বেশিরভাগ দায় সরকারি দলের। তবে লাগাতার হরতাল করে বিরোধী দল যথার্থ প্রতিবাদ করছে কিন্তু তা আমাদের অশান্তি কমাচ্ছে না। আমাদের অশান্তি ও দেশের অশান্ত পরিস্থিতিতে বড় দুই দল পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে অবিলম্বে যদি কোনো ব্যবস্থা না নেয় তাহলে দেশের শাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অন্যদিকে এই দুই রাজনৈতিক দল থেকে এই দেশের ভোটাররা মুখ ফিরিয়ে নেবে এবং আগামী নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য নতুন দল খুঁজবে।


ড. শাহদীন মালিক : পরিচালক, স্কুল অব ল, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এবং
আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট

পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশ



২০১২-০৪-৩০

এবনে গোলাম সামাদ
বিশ্বের কোনো দেশেরই ভবিষ্যৎ এখন আর কেবল তার নিজের দেশের ঘটনাবলির প্রবাহ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না। বিদেশের ঘটনাবলির প্রভাব এসে পড়ে তার ওপর। যুদ্ধ ভালো নয়। কিন্তু তবু এখনো যুদ্ধ হচ্ছে পৃথিবীর নানা দেশে নানা অঞ্চলে। এক দেশ আর এক দেশের সাথে জড়িয়ে পড়ছে যুদ্ধে। যুদ্ধের অবসান ঘটানোর জন্য গঠিত হয়েছিল জাতিসঙ্ঘ ১৯৪৫ সালে। কিন্তু জাতিসঙ্ঘ যুদ্ধ বন্ধ করতে পারেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসঙ্ঘকে অগ্রাহ্য করেই আক্রমণ করল ইরাককে। আর ইরাকে এখনো প্রতিদিন হচ্ছে লোকয়। যুদ্ধ চলেছে আফগানিস্তানে। যুদ্ধের হুমকি দেয়া হচ্ছে ইরানকে। সব মিলিয়ে বিশ্বপরিস্থিতি হচ্ছে জটিল থেকে জটিলতর। আমরা একটা নিরাপদ বিশ্বে বাস করছি না। ধনী-দরিদ্র সব দেশেই সামরিক খাতে ব্যয় বাড়িয়ে চলেছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেবল তার ঘরোয়া রাজনীতি দ্বারা নিরূপিত হবে না। নিরূপিত হবে বিশ্বপরিস্থিতির ওপর, আর এই বিশ্বপরিস্থিতির বিশ্লেষণ করে গৃহীত হতে হবে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি। মনে হচ্ছে বিশ্ব পরিস্থিতি বিশ্লেষণে থাকছে আমাদের চিন্তায় যথেষ্ট ঘাটতি। আমরা বিশ্বপরিস্থিতির অনেকগুলো দিককে যেন নিতে চাচ্ছি না আমাদের বিবেচনায়। আমরা অনেক সমস্যাকে করে ফেলতে চাচ্ছি খুবই সরল। যা হয়ে উঠতে পারে আমাদের জন্য বিপজ্জনক। সম্প্রতি লন্ডনে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি বলেছেনÑ ভারত আর বাংলাদেশের ভাগ্য নাকি এক সূত্রেই গাঁথা। আর তাই তার পররাষ্ট্রনীতিও হতে হবে অভিন্ন। তিনি আরো বলেছেনÑ বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক এখন হয়ে উঠেছে খুবই ঘনিষ্ঠ। যেমন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল ১৯৭১ সালে। কিন্তু ১৯৭১ সালে কলকাতায় অবস্থিত তাজউদ্দীন সরকারের কোনো স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ছিল না। তাকে অনুসরণ করে চলতে হচ্ছিল ভারত সরকারের নির্দেশ। তাই প্রশ্ন উঠছে বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের অবস্থা কি দাঁড়িয়েছে ১৯৭১ সালের তাজউদ্দীন সরকারেরই মতো। বাংলাদেশ সরকার না ভারত সরকার, প্রকৃত প্রস্তাবে কে নিয়ন্ত্রণ করছে এ দেশের পররাষ্ট্রনীতি?

আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লন্ডনে ভারতীয় সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছেনÑ তিন বছরে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর মাঝারি পর্যায়ের কর্মকর্তারা নাকি ১৯ বার সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু তারা সফল হতে পারেননি। বাংলাদেশ আছে সেনা অভ্যুত্থানের ঝুঁকির মধ্যে। যদি তিনি এ কথা সত্যি বলে থাকেন তবে সেটা কতটা সমীচীন হয়েছে তা নিয়ে থাকছে প্রশ্ন। বিদেশে দেশের ভেতরকার এই দুর্বলতাকে প্রকাশ করা দীপু মনির রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচয় বহন করছে না। তিনি যেন চেয়েছেন ভারতের প্রিয়পাত্র হতে। যেটা এ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য অবমাননাকর। কিন্তু দীপু এসব কথা বলে যেন চেয়েছেন তৃপ্তি পেতে। ভারত ও আমাদের স্বার্থ একসূত্রে গাঁথা নয়। চীন ও ভারতের মধ্যে বিরাজ করছে বিরাট সীমান্ত বিরোধ। বিরাজ করছে এশিয়ায় পরাশক্তি হওয়া নিয়ে প্রতিযোগিতা। কিন্তু বাংলাদেশের সাথে চীনের কোনো সীমান্ত বিরোধ নেই। আর পরাশক্তি হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। কী করে বাংলাদেশ ও ভারতের স্বার্থ অভিন্ন হতে পারছে সেটা আমাদের কাছে মোটেও তাই স্বচ্ছ হতে পারছে না। আর স্পষ্ট হতে পারছে না বর্তমান বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতি। আওয়ামী লীগ দাবি করছে যে, সে অনুসরণ করে চলেছে শেখ মুজিবের অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতি। কিন্তু শেখ মুজিব ঠিক কী চেয়েছিলেন সেটাও আমাদের কাছে এখনো হয়ে আছে যথেষ্ট বিভ্রান্তিকর। ১৯৭১ সালে শেখ মুজিব ছিলেন পাকিস্তানের কারাগারে। এ সময় তিনি কী ভেবেছিলেন তা আমরা জানি না। শেখ মুজিব পাকিস্তানের কারাগার থেকে ছাড়া পান ১৯৭২ সালের ৩ জানুয়ারি। এরপর তিনি ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের বিশেষ বিমানে করে যান লন্ডনে। সেখানে তিনি তদানীন্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিথের সাথে আলোচনা করেন। তিনি কেন পাকিস্তান থেকে লন্ডনে যাওয়ার ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন সে সম্পর্কে এখনো কিছু জানা যায় না।

আমি এ সময় ছিলাম কলকাতায়। কলকাতায় গুজব রটেছিল, শেখ মুজিব নাকি জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে একটি বিশেষ চুক্তি করেছিলেন। যাতে বাংলাদেশ ও বর্তমান পাকিস্তান হতে যাচ্ছে একটা কনফেডারেশন বা রাষ্ট্র সমবায়। এ কথা কত দূর সত্য তা আমরা বলতে পারি না। কিন্তু ভারতীয় বুদ্ধিজীবী মহলে এ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল যথেষ্ট উদ্বেগ। শেখ মুজিব বাংলাদেশে ফিরে ১২ জানুয়ারি (১৯৭২) বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করার পর তিনি যোগ দেন ইসলামি সম্মেলন সংস্থায়। এ উপলে তিনি যান পাকিস্তানে। তিনি মতায় আসার পর কার্যত চাননি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। বাংলাদেশে যারা পাকিস্তানকে সমর্থন করেছিল অথবা চাননি সাবেক পাকিস্তান ভেঙে যাক, তিনি চাননি তাদের বিচার করতে। কার্যত তিনি এ েেত্র প্রদর্শন করেছিলেন সাধারণ মার মনোভাব। ১৯৭৪ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোকে বাংলাদেশ সফর করার জন্য আমন্ত্রণ জানান। ভুট্টো তার আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে আসেন বাংলাদেশে। এ থেকে মনে করা যায় যে, শেখ মুজিব চেয়েছিলেন, পাকিস্তানের সাথে বিশেষ মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ হতে। যদিও তিনি ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণে জুলফিকার আলী ভুট্টো সম্পর্কে করেছিলেন বিরূপ মন্তব্য। বর্তমান আওয়ামী লীগ চাচ্ছে না পাকিস্তানের সাথে কোনো প্রকার সুসম্পর্ক গড়তে। বরং চাচ্ছে পাকিস্তানবিরোধী কথা বলে এ দেশের মানুষের কাছে জনপ্রিয় হতে। কিন্তু ১৯৭১ সালের পরিস্থিতি আর বর্তমান পরিস্থিতি এক নয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষ ভারতকে যতটা বন্ধু ভেবেছে, এখন আর তা ভাবতে পারছে না। কিন্তু এই সহজ সত্যটাকে যেন আওয়ামী লীগের নেতারা উপলব্ধি করতে পারছেন না। আর তাই হয়ে পড়ছেন গণবিচ্ছিন্ন।

আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি পরম রবীন্দ্রভক্ত। গোটা আওয়ামী লীগ এখন রবীন্দ্রনাথের মধ্যে খুঁজে পেতে চাচ্ছে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বুনিয়াদ। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ আর যা-ই হোন বাঙালি জাতীয়তাবাদী ছিলেন না। তিনি চাননি বাংলা ভাষাভিত্তিক কোনো পৃথক স্বাধীন দেশ গড়তে। তিনি আস্থাশীল ছিলেন অখণ্ড ভারতে। আর চেয়েছিলেন বাংলা বা অন্য কোনো ভাষা নয়, হিন্দি হতে হবে ভারতের একমাত্র রাষ্ট্র অথবা যোগাযোগ রার ভাষা। শেখ মুজিব ঠিক এ রকম রবীন্দ্রভক্তি প্রদর্শন করেননি। রবীন্দ্রনাথ তার মনমানসিকতায় প্রতিভাত হননি গুরুদেব হিসেবে। এ জন্যই তিনি অসুস্থ কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ভারত থেকে স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। রবীন্দ্রনাথকে নয়, তিনি নজরুলকেই প্রতিষ্ঠিত করেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে। কিন্তু নজরুলকে অবহেলা করে বর্তমান আওয়ামী লীগ ভারতকে খুশি করার জন্য শুরু করেছে যেন রবীন্দ্রপূজা। যে রকম রবীন্দ্রপূজা এখন আর ভারতেও নেই। রবীন্দ্রনাথকে তারা চাচ্ছে বস্তুনিষ্ঠভাবে মূল্যায়ন করতে। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের একটা বিরাট অংশকে ভারতে বলা হচ্ছে আসলে অনুবাদ সাহিত্য। রবীন্দ্রনাথের একাধিক ছোটগল্পে রয়েছে মার্কিন গল্প লেখক এডগার এলেন পোর প্রভাব। কবিতায় রয়েছে একাধিক ইংরেজ কবির লেখার ছায়া। উপন্যাসে পড়েছে গলস্ওয়ার্থ (J Galsworthy)-এর মতো লেখকের প্রভাব। রবীন্দ্রনাথের স্বকীয়তা নিয়ে এখন সৃষ্টি হতে পেরেছে যথেষ্ট সমালোচনা। রবীন্দ্রনাথ গীতাঞ্জলির জন্য ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তার এই ইংরেজি অনুবাদে থেকেছে বিলাতের কবি ইয়েটসের প্রভাব। ইয়েটস তার কবিতাগুলোর ইংরেজি অনুবাদকে করেছিলেন সম্পাদনা। দিয়েছিলেন তার বর্তমান রূপ। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের ইংরেজি গীতাঞ্জলি বহন করে না কেবলই রবীন্দ্রপ্রতিভার পরিচয়। এসব কথা এখন বিশেষভাবে বলছেন ভারতীয় রবীন্দ্র সমালোচকরা। কিন্তু আমরা করছি রবীন্দ্রপূজা। দেখাচ্ছি রবীন্দ্রভক্তি। রবীন্দ্রনাথের গান আমাদের ভালো লাগে। কিন্তু এই গানেও আছে ইউরোপীয় গানের প্রভাব।

বাংলা গানে প্রথম ইউরোপীয় গানের প্রভাব বহন করে আনেন দ্বীজেন্দ্রলাল রায়। দ্বীজেন্দ্রলাল রায় রচিত ও সুরারোপিত গান ‘ধন ধান্য পুষ্পে ভরা’কে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু ভারত সরকারের চাপে সেটা করা সম্ভব হয়নি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার বাংলা’ গানটিকে চাপিয়ে দেন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে। এই গানটি রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছিলেন ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের সময়। এর ল্য ছিল বঙ্গভঙ্গ রদ করা। এর ল্য ছিল না কোনো পৃথক স্বাধীন বাংলাদেশ গড়া। রবীন্দ্রনাথ ও ঠাকুর পরিবার একসময় ছিলেন খুবই ব্রিটিশভক্ত। রবীন্দ্রনাথ তার গীতাঞ্জলিতে ‘ভারততীর্থ’ কবিতায় বলেছেন, ইংরেজকে শুচিমন করে ভারত শাসন করতে, ছেড়ে যেতে নয়। একপর্যায়ে রবীন্দ্রনাথ বলতেন তিনি বিশ্বমানবতায় বিশ্বাস করেন। তিনি সর্বপ্রকার জাতীয়তাবাদের বিরোধী। এ নিয়ে এ দেশে যারা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করছিলেন তাদের সাথে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি হয় ভাবগত বিরোধ। কবি নজরুল ব্রিটিশবিরোধী কবিতা লিখে জেল খেটেছেন। তার আগে ব্রিটিশ শাসনবিরোধী কবিতা লিখে জেল খেটেছেন ইসমাইল হোসেন শিরাজী। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কখনোই এ রকম কিছু লিখেননি। বরং তার বিখ্যাত ‘চার অধ্যায়’ উপন্যাসে যা লিখেছেন, তা হতে পেরেছে ব্রিটিশ কর্তৃপরে কাছে খুবই গ্রহণযোগ্য। শরৎচন্দ্রের উপন্যাস ‘পথের দাবি’ ইংরেজ আমলে নিষিদ্ধ হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ তখন বলেনÑ শরৎচন্দ্র এ রকম উপন্যাস লিখে ঠিক কাজ করেননি। এ হলো রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণার পরিচয়। কিন্তু এই রবীন্দ্রনাথকেই এখন আওয়ামী লীগ সরকার তুলে ধরতে চাচ্ছে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্যতম অংশ হিসেবে। আর এটা জড়িয়ে পড়ছে তাদের পররাষ্ট্রনীতিরও সাথে। কারণ এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ভাবছে ভারতের সাথে গড়ে উঠতে পারবে বিশেষ সুসম্পর্ক।

অনেক কিছুই ঘটছে দণি এশিয়ায়। ভারত নির্মাণ করছে এমন পেণাস্ত্র, যা চীনের রাজধানী বেইজিংকে আঘাত করতে পারবে পরমাণু বোমা বহন করে। অন্য দিকে পাকিস্তান নির্মাণ করতে সম হয়েছে এ রকম পেণাস্ত্র, যা পরমাণু বোমা বহন করে ভারতের যেকোনো অঞ্চলকে আঘাত করতে সম। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের অস্ত্রভাণ্ডারে পারমাণবিক অস্ত্র ছিল না। কিন্তু পাকিস্তান এখন নিজেই পারছে পরমাণু বোমা বানাতে। বাংলাদেশ সরকার পাকিস্তানকে সামরিক দিক থেকে যতটা দুর্বল মনে করছে পাকিস্তান তা নয়। পাকিস্তানের সাথে চীনের সামরিক সহযোগিতা বাড়ছে। চীন পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে ইতোমধ্যেই নির্মাণ করেছে নৌঘাঁটি। সম্প্রতি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন পাকিস্তান সফরে যাওয়ার। মনে হচ্ছে এর ফলে পাকিস্তান ও রাশিয়ার মধ্যে সামরিক সহযোগিতা বাড়বে। আর এর ফলে দণি এশিয়ায় ভারত পাকিস্তান সামরিক শক্তির অনুপাত আগের তুলনায় অনেক ভিন্ন হয়ে পড়বে। বর্তমান বাংলাদেশ সরকার এটা উপলব্ধি করতে পারছে কি না আমরা তা অবগত নয়। বর্তমান পাকিস্তান হচ্ছে ব্রিটিশ শাসনামলের সেসব অঞ্চল নিয়ে গঠিত যেখান থেকে ব্রিটিশ-ভারতের সেনাবাহিনীতে এসেছে অধিক সৈন্য। বর্তমান পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশের মানুষ হলেন অনেক রণনিপুণ (War-Like)। ১৯৭১ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে সাবেক পাকিস্তান বাহিনী হেরে যায়। এর কারণ ছিল তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ হয়ে উঠেছিল তাদের বৈরী। জনসমর্থনের অভাবেই তাদের হেরে যেতে হয়। কিন্তু এখন সেই অবস্থা আর বিরাজ করছে না। তথাপি আওয়ামী লীগ একাত্তরের কথা বিবেচনা করে গ্রহণ করতে চাচ্ছে পররাষ্ট্রনীতি। যেটাকে বলা যেতে পারে মূলগতভাবেই ভুল।

আওয়ামী লীগ বলছে বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা। অন্য দিকে বিএনপি বলছে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের কথা। এই দুই দলের মধ্যে এখন বাংলাদেশে সৃষ্টি হতে পারছে চরম বিরোধ। এই দুই দলের বিরোধ কেবলই মতার ব্যাপার নয়, কিছুটা মতাদর্শেরও ব্যাপার। রাষ্ট্রপতি জিয়া চাননি পাকিস্তানের সাথে বিবাদ বিসংবাদ। তিনি চেয়েছেন, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করতে। আর এ েেত্র চেয়েছেন বর্তমান পাকিস্তানের বেশ কিছুটা সহযোগিতা। আওয়ামী লীগের বাঙালি জাতীয়তাবাদ আর বিএনপির বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ঠিক এক প্রকৃতির জাতীয়তাবাদ নয়। আর এই দুই দলের পররাষ্ট্রনীতিও তাই হতে পারে না একই রকম। বিএনপি ভারতের সাথে বৈরিতা চায় না। কিন্তু মৈত্রী গড়তে গিয়ে চায় না আপন জাতিসত্তাকে ভারতের মধ্যে বিলুপ্ত করতে।
গত সংখ্যার সংশোধনী : গত সংখ্যায় ভুলবশত ছাপা হয়েছিলÑ ভারতের সেনাবাহিনীতে টাটা কোম্পানির ট্রাক কেনা নিয়ে সংঘটিত ঘুষ কেলেঙ্কারি নিয়ে ঘটতে পেরেছে বিরাট অনুসন্ধান। সেখানে আসলে হবেÑ 
ভারতের সেনাবাহিনীতে টাট্রা কোম্পানির ট্রাক কেনা নিয়ে সংঘটিত ঘুষ কেলেঙ্কারি নিয়ে ঘটতে পেরেছে বিরাট অনুসন্ধান। টাট্রা একটি চেক কোম্পানি।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

‘মিডিয়া এত হইচই করছে কেন’?


  • হরতাল এখন


  • হরতাল তখন
    হরতাল তখন
সোহরাব হাসান | তারিখ: ২৯-০৪-২০১২

বিগত বিএনপি-জামায়াত সরকারের মতো বর্তমান মহাজোট সরকারও মনে করে, দেশে কোনো সমস্যা নেই, সংকট নেই। যেসব সংকটের কথা বলা হচ্ছে, তার সবই গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের সৃষ্টি। এ প্রসঙ্গে সাবেক মন্ত্রী ও জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর একটি উক্তি মনে পড়ছে। সিদ্দিকুর রহমান বাংলা ভাই নামের এক জঙ্গি যখন গোটা রাজশাহী অঞ্চলে মানুষ হত্যা ও গুম করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলা ভাইয়ের অস্তিত্ব নেই, এসব মিডিয়ার সৃষ্টি।’ পরবর্তীকালে বিএনপি-জামায়াত সরকারই বাংলা ভাইকে গ্রেপ্তার করে প্রমাণ করে যে, তিনি মিডিয়ার সৃষ্টি নন।
কয়েক দিন আগে এক সামাজিক অনুষ্ঠানে ক্ষমতাসীন বড় দলের কয়েকজন ছোট নেতার সঙ্গে দেখা হতেই জবাবদিহি চাওয়ার সুরে বললেন, ‘আপনারা পেয়েছেনটা কী? ইলিয়াস আলীর মতো একজন বিতর্কিত ও কালিমালিপ্ত নেতাকে নিয়ে মিডিয়া এত হইচই করছে কেন?’
ইলিয়াস আলী কতটা বিতর্কিত ও কালিমালিপ্ত, সেই বিতর্ক করার সময় এখন নয়। তিনি নিখোঁজ হয়েছেন, সরকার তথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব তাঁকে খুঁজে বের করা। সাংবাদিকেরা যদি ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার খবর পত্রিকায় লিখে থাকেন কিংবা টিভির টক শোতে তাঁকে নিয়ে কিছু বলে থাকেন, তাতে দোষের কী আছে? সরকার মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমার মামলায় জয়ী না হলে যেমন শেখ হাসিনাকে সংবর্ধনা দেওয়া যেত না, তেমনি ইলিয়াস আলী অপহূত না হলে সাংবাদিকেরা তাঁকে নিয়ে খবর লেখারও সুযোগ পেতেন না। সাংবাদিকেরা খবর তৈরি করেন না, তাঁরা কিছু ঘটলে মানুষকে জানান। কোন ঘটনার খবর কীভাবে লেখা হবে, সেই দায়িত্ব রাজনীতিকেরা নিলে দেশে সংবাদপত্র বলে কিছু থাকবে না, যা থাকবে তা হলো সরকারি প্রচারপত্র এবং তাতে কেবল সরকারের প্রশংসা থাকবে, সমালোচনা থাকবে না। সরকার ভুল করলেও বলতে হবে ‘আহ্ বেশ বেশ’।
আমরা বুঝতে অক্ষম, এ রকম একজন ‘বিতর্কিত ও কালিমালিপ্ত’ নেতাকে নিয়ে সরকারি মহল এত দিন নিশ্চুপ ছিল কেন; কেন তাঁর নামে একটি মামলা পর্যন্ত করল না; কেন তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলো না। আর এখন তাঁর নিখোঁজ হওয়া সম্পর্কে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেছেন, দলের সাধারণ সম্পাদক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করে তাঁকে জীবিত বের করতে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে বলে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করছেন। দলের নেতারা, মন্ত্রীরা প্রায় প্রতিদিনই ইলিয়াস আলী সম্পর্কে কথা বলে যাচ্ছেন। বিরোধী দল একের পর এক হরতাল ডাকছে। কঠোর কর্মসূচির হুমকি দিচ্ছে। সেসব কিছুই না! সাংবাদিকেরা এ নিয়ে কিছু লিখলেই দোষ, কিছু বললেই মহা অপরাধ!
আওয়ামী লীগের ওই নেতারা দাবি করেছেন, সাংবাদিকেরা পত্রিকায় লিখে লিখে নাকি ইলিয়াস আলীকে ‘জাতীয় নেতা’ বানিয়ে দিয়েছেন। কীভাবে? সাংবাদিকেরা বড় নেতা বানাতে চাইলে তিন বছর ধরেই তাঁকে নিয়ে লেখালেখি করতেন। ইলিয়াস আলীকে তাঁরাই বড় নেতা বানিয়েছেন, যাঁরা তাঁকে রাতের অন্ধকারে চালকসহ গুম করে দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ নেতাদের দাবি অনুযায়ী এটি যদি সরকারের বিরুদ্ধে মহা ষড়যন্ত্রের অংশ হয়ে থাকে, তা উদ্ঘাটন করার দায়িত্বও সরকারের।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের অতি বিজ্ঞ নেতারা কথায় কথায় বিএনপি আমলে কতজন খুন ও গুম হয়েছে, বোমা ও গ্রেনেড মেরে কতজন মানুষ হত্যা করা হয়েছে এবং বিরোধী দল ও সংখ্যালঘুদের ওপর কী অমানুষিক নির্যাতন হয়েছে, সেই প্রসঙ্গ টানেন। তাঁরা এও বলতে চান যে, তখন সাংবাদিকেরা চুপ করে ছিলেন। তাঁদের এই অভিযোগ সত্য হলে আমরা কাঠগড়ায় দাঁড়াতে রাজি আছি। কিন্তু জোরালো কণ্ঠে বলছি, তাঁরা প্রমাণ দিতে পারবেন না। বিএনপি আমলে সাংবাদিকেরা চুপ থাকলে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলায় ‘জজ মিয়া কাহিনি’ প্রকাশিত হলো কীভাবে? জঙ্গিদের সঙ্গে বিএনপির মন্ত্রী-নেতাদের যোগসাজশের ঘটনাও প্রথম ফাঁস করেন সাংবাদিকেরা। এখন আওয়ামী লীগ নেতা-নেত্রীরা সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের সম্পর্কে যেসব মনগড়া অভিযোগ করেন, বিএনপির আমলে তাঁদের নেতা-নেত্রীরাও অবিকল সেসব অভিযোগ করতেন। কে বলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে কোনো মিল নেই? বাংলাদেশে কোনো দলই জনমতকে তোয়াক্কা করে না। তারা তোয়াক্কা করে ক্ষমতাধর ‘বন্ধু দেশ’কে।
২০০১ সালের নির্বাচনের পর আর সারা দেশে বিএনপির ক্যাডাররা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালালে, তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিলে সাংবাদিকেরা কি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেই খবর পত্রিকায় প্রকাশ করেননি? বিএনপি আমলে যখন চট্টগ্রামে বিএনপি নেতা জামালউদ্দিন নিখোঁজ হন, তখন কি সংবাদপত্রে এ নিয়ে দিনের পর দিন লেখালেখি হয়নি? প্রেসক্লাবের সামনে জামালউদ্দিনের সন্তানদের অবস্থান কর্মসূচি যখন সরকারের পুলিশ বাহিনী পণ্ড করে দেয়, সচিত্র সেই খবরও কি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি? ২০০১ সালের নির্বাচনের পর যখন দলীয় কর্মী ও আক্রান্ত সংখ্যালঘুদের ‘ক্ষুধার্ত বাঘের’ মুখে রেখে আওয়ামী লীগের জাঁদরেল নেতারা নিরাপদে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তখন কিন্তু এই সংবাদপত্র ও সাংবাদিকেরাই এগিয়ে এসেছিলেন। আমাদের কথা বিশ্বাস না হলে ২০০২ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলন উপলক্ষে আওয়ামী লীগের পুস্তিকাগুলো তাঁরা একবার দেখে নিতে পারেন। সে সময় সংবাদপত্র ও সাংবাদিকেরা আওয়ামী লীগের ‘পরম বন্ধু’ ছিলেন। এখন তাঁরা ‘চরম শত্রু’ হয়ে গেছেন। সমস্যা হলো, রাজনীতিকেরা পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় এসে আগের পাঁচ বছরের কথা বেমালুম ভুলে যান। কিন্তু সাংবাদিকদের সব আমলের কথাই মনে রাখতে হয়। তাঁরা সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলতেই অভ্যস্ত।
আওয়ামী লীগের নেতারা বলতে চাইছেন, ‘মিডিয়ার সৃষ্টি ইলিয়াস আলী সংকট’ ছাড়া দেশে আর কোনো সংকট নেই। তাঁদের এই দাবি সত্য হলে দেশের মানুষ নিশ্চিন্ত হতে পারত। কিন্তু সরকারের দাবি ও বাস্তব যে যোজন যোজন দূরে চলে যাচ্ছে, সে বিষয়টি ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা মনে রাখেন না।
এই সরকারের মেয়াদ তিন বছর চার মাস পার হতে চলেছে। সংবিধান অনুযায়ী পাঁচ বছর মেয়াদের তিন মাস বাকি থাকতেই তারা নতুন নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে। কার অধীনে নির্বাচন হবে সেই বিতর্কে এখন যাচ্ছি না। আমরা বলতে চাইছি, এই তিন বছর চার মাসে সরকার কী করেছে, আর এক বছর দুই মাসে কী কী করবে। সে ক্ষেত্রে আমরা আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রতি আরেকবার আলোকপাত করে নিই।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রথম পাঁচ অগ্রাধিকার ছিল: দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি-সংকট দূর, দারিদ্র্য ঘোচানো ও বৈষম্য হ্রাস এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা। এখন সুশাসন দূরের কথা, সরকারের শাসনব্যবস্থাই ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। সব ক্ষেত্রে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে ঘেরাও করছেন শিক্ষকেরা, ছাত্ররা চড়াও হচ্ছে শিক্ষকদের ওপর। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে উপর্যুপরি মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, সংসদীয় কমিটির বৈঠকে সরকারি দলের সাংসদেরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী লা-জবাব। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে মহাজোটের শরিক দলের একজন প্রভাবশালী সাংসদ নিজে গুম হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। একটার পর একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে অচলাবস্থা চলছে। বিদ্যুতের অভাবে কলকারখানা অর্ধবেলা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। কৃষির সেচ ব্যাহত হচ্ছে। জনজীবন অতিষ্ঠ। তাহলে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের সাফল্য গেল কোথায়?
মহা শোরগোল তুলে অবকাঠামো উন্নয়নে ভারতের কাছ থেকে যে ১০০ কোটি ডলার ঋণ পাওয়ার কথা ছিল, তারও বেশ কিছু প্রকল্প আটকে গেছে। দিল্লির সঙ্গে তিন বছর দেনদরবার করেও সরকার তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি করতে পারেনি। সীমান্তবিরোধ নিষ্পত্তি ও ছিটমহল বিনিময়ে প্রটোকল সই করলেও তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেই। দেশের কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচিত উপাচার্য নেই। আড়াই মাসেও সাংবাদিক সাগর-রুনির ঘাতকদের শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। এখন আদালত সেই দায়িত্ব র‌্যাবের হাতে ন্যস্ত করেছেন। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির হোতাদের বিরুদ্ধে সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বরং কাউকে কাউকে পুরস্কৃত করেছে বলে অভিযোগ আছে।
সরকার জাতীয় সংসদকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু করার কথা বললেও গত তিন বছরে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সেখানে তেমন আলোচনা হয়নি। একজন প্রতিমন্ত্রী পাঁচ মাসের মাথায় পদত্যাগ করলেও বিষয়টি সরকার ঝুলিয়ে রেখেছিল। এখন তিনি সংসদ সদস্য পদ থেকেও পদত্যাগ করেছেন। রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুতের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা সরকার ভর্তুকি দিলেও লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণায় মানুষ বিপর্যস্ত। সিভিল প্রশাসন এখন প্রায় দলীয় প্রশাসনে পরিণত হয়েছে। সরকার সোল্লাসে ঘোষণা দিয়েছিল, তিন মাসের মধ্যে বিভক্ত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন করবে। এখন ছয় মাস অতিক্রান্ত হলেও সেই নির্বাচনের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সর্বশেষ বিষয়টি আদালতে গড়িয়েছে। এখন ঢাকার অধিকাংশ বাসিন্দা বিশ্বাস করে, সরকার নির্বাচন ঠেকিয়ে রাখার জন্য যথাসময়ে ওয়ার্ডগুলোর সীমানা নির্ধারণ করেনি, ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা হয়নি।
ক্ষমতাসীন দলের মহাবিজ্ঞ নেতারা কি বলবেন, এসবও সংবাদপত্র ও সাংবাদিকেরা আটকে রেখেছেন?
আওয়ামী লীগ দিনবদলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল। কিন্তু তিন বছর চার মাস পর দেশবাসীর দৃশ্যগ্রাহ্য দিনবদল হয়নি। তবে আওয়ামী লীগের নেতাদের, মন্ত্রীদের দিন ঠিকই বদল হয়েছে। ক্ষমতায় আসার আগে কার কী অবস্থা ছিল, এখন তাঁরা কী অবস্থায় আছেন, তা কারও অজানা নয়। সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের (বর্তমানে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী) এপিএসের গাড়িতে যে ৭০ লাখ টাকা পাওয়া গেছে, তার সঙ্গে মন্ত্রী জড়িত কি না, সেটি প্রমাণসাপেক্ষ। কিন্তু এই একটি ঘটনাই আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘুষ ও দুর্নীতি কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। আওয়ামী লীগ নেতাদের এখন আর জোর গলায় বলার উপায় নেই যে, ‘ওরা সব দুর্নীতিবাজ, আর আমরা ধোয়া তুলসীপাতা।’ এ ক্ষেত্রে ‘জনবিরোধী’ বিএনপি সরকারের সঙ্গে ‘জনদরদি’ আওয়ামী লীগ সরকারের ফারাক একেবারেই লোপ পেতে বসেছে।
হ্যাঁ, ফারাকটি নিশ্চিত করা যেত যদি প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সব মন্ত্রী ও সাংসদের আয় ও সম্পদের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করতেন। কেন করলেন না?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।

sohrab03@dhaka.net


শনিবার, ২৮ এপ্রিল, ২০১২

ইলিয়াস আলীর দীর্ঘায়ু কামনা করি


আবদুল মান্নান | তারিখ: ২৮-০৪-২০১২

গত বছর এলডিপির নেতা কর্নেল (অব.) অলি আহমদ ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেছিলেন, এই সরকার সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টিকবে না। তারপর যখন সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টিকেই গেল, তখন তিনি সরকারের আয়ু ডিসেম্বর পর্যন্ত বৃদ্ধি করলেন। না, তাতেও তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী ফলল না। তারপর পরবর্তী মেয়াদ আগামী (মানে সামনের) বাজেট সেশনের আগ পর্যন্ত বৃদ্ধি করলেন। আগামী বাজেট জুন মাসের ৭ তারিখে সংসদে পেশ হওয়ার কথা রয়েছে। এখন দেশের মানুষকে সে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কর্নেল সাহেব একজন বিচক্ষণ মানুষ। ছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়ার দক্ষিণহস্ত। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গ ছাড়েননি। একাধিকবার বলেছেন, তিনিই খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে এনেছেন। বিগত জোট সরকারের আমলে খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান সঙ্গে কী-সব বিষয় নিয়ে তুমুল মতপার্থক্য হলো। বিএনপির সঙ্গ ত্যাগ করে নিজে এলডিপি নামের একটি নতুন দল বানালেন। সঙ্গে বিএনপির আরও কিছু মধ্যম সারির নেতাকে নিজ দলের পতাকাতলে সমবেত করলেন। ২০০৭ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোটের সঙ্গে অন্যদের মতো অলি আহমদও যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের গোয়ার্তুমির কারণে সে নির্বাচনটি হতে পারেনি। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগেও তিনি শেখ হাসিনার সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন। শেখ হাসিনা রাজি হননি। এখন মনে হচ্ছে, রাজি না হয়ে ভালোই করেছেন। নবম সংসদে এলডিপি মাত্র একটি আসনে জয়ী হয় এবং তিনি কর্নেল অলি আহমদ। এক দলের এক নেতা হয়েও তিনি একটি মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হন। তারপর এক দিন সস্ত্রীক খালেদা জিয়ার বাসভবনে গিয়ে ঘোষণা করলেন, এখন থেকে তিনি তাঁর সঙ্গে থাকবেন এবং সরকার পতন আন্দোলনে সহায়তা করবেন। জানামতে, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রধানের খালেদা জিয়ার গুলশানের বাসভবনে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের নজির এটিই প্রথম। সুতরাং বোঝা যায়, তিনি খালেদা জিয়ার দল ছাড়লেও তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক সব সময় ছিল। দল ছাড়ার পর তিনি খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান সম্পর্কে বেশ কিছু কড়া কথা বলেছিলেন। এসব নিছকই ছিল কথার কথা। কর্নেল সাহেবের ভবিষ্যদ্বাণী ফলবে কি না, তা দেখার জন্য দেশের মানুষকে আর মাস খানেক অপেক্ষা করতে হবে। তবে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলীর ‘অন্তর্ধান’ নিয়ে দেশে যে জমজমাট নাটক শুরু হয়েছে, তা অনেকেই গণতন্ত্রের জন্য একধরনের অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন এবং মনে করছেন, এই নাটকের পরিকল্পনা ও মহড়া অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে; কিন্তু ক্ষমতাসীন দল তা বুঝতে পারেনি। সময় থাকতে আওয়ামী লীগ অনেক কিছুই বুঝতে পারে না এবং তার জন্য শুধু দল নয়, দেশের মানুষকেও চড়া মূল্য দিতে হয়।
বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সিলেট বিএনপির সভাপতি ইলিয়াস আলী তাঁর বনানীর বাসার কাছ থেকে ১৭ এপ্রিল মধ্যরাতের পর তাঁর গাড়ির চালকসহ গুম বা নিখোঁজ হলেন। এ পর্যন্ত তাঁর বা গাড়িচালকের কোনো খোঁজ মেলেনি। কারা তাঁকে গুম করেছে, তা-ও পরিষ্কার নয়। যদিও বিএনপি বলছে, তাঁকে সরকারি বাহিনী তুলে নিয়ে গেছে। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ইলিয়াস আলীর বাসায় গিয়ে বলে এসেছেন, ইলিয়াস আলী ভালো আছে এবং সুস্থ আছে। সরকার বলছে, ইলিয়াস আলীর গুম হওয়ার সঙ্গে সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ইলিয়াস আলী কেন, যেকোনো নাগরিকই গুম হওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। সব নাগরিকের নিরাপত্তা দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। আর ইলিয়াস আলী তো বিএনপির জন্য একজন খুবই গুরুত্বপূর্ণ নেতা, তাঁর অতীত যা-ই হোক না কেন। এই গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ ‘পিস্তল ইলিয়াস’ বলে সম্বোধন করলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মির্জা ফখরুল বেশ উত্তেজিত হয়ে বুধবার এক সভায় বলেছেন, ইলিয়াস আলী নব্বইয়ের এরশাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথের একজন লড়াকু সৈনিক ছিল। তিনি এরশাদকে উৎখাত করার জন্য পিস্তল হাতে নিয়েছিলেন। তিনি আরও বললেন, এক ইলিয়াস আলীর জন্য রোববার থেকে সারা বাংলায় আগুন জ্বলবে। তবে মির্জা বলেননি, কেন তাঁকে ১৯৮৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। ১৯৯২ সালে ইলিয়াস আলী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। মাত্র তিন মাসের মাথায় কেন খালেদা জিয়া ছাত্রদলের নির্বাচিত কমিটি ভেঙে দিতে বাধ্য হন, তা-ও কিন্তু বলেননি মির্জা ফখরুল। তিনি এও বলেননি, কেন খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও ইলিয়াস আলী দুই বছর কারাবাস করেন। বোধগম্য কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে এই গুরুত্বপূর্ণ নেতার অনেক কীর্তির কথা বলা থেকে বিরত থাকলাম। সবকিছু বিস্তারিত লিখে আমি নিজে গুমের শিকার হতে চাই না। আমার মতো অভাজন গুম হলেও ইলিয়াস আলীকে নিয়ে দেশে যে রকম তোলপাড় হচ্ছে, তার কোনোটাই আমার জন্য হবে না।
রাজনৈতিক ব্যক্তিদের শত্রু থাকাটা বিচিত্র কিছু নয়। এই শত্রু সামান্য স্বার্থের দ্বন্দ্বে সৃষ্টি হতে পারে অথবা প্রতিপক্ষ যদি কোনো কারণে অন্যজনের রাজনৈতিক উত্থানের বাধার কারণ হয়, তখন প্রতিপক্ষও শত্রু হয়ে যেতে পারে। কিংবা রাজনৈতিক মতদ্বৈধতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন এক পক্ষ অন্য পক্ষের শত্রু হয়ে যেতে পারে। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার কথা বাদই দিলাম, বিগত চারদলীয় জোটের শাসনামলে চট্টগ্রামের বিএনপির নেতা জামালউদ্দিন গুম হয়ে গেলেন। পরিবারের সবার সে কী আহাজারি। তাঁরা দেখা করলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে। লাভ হলো না কিছুই। তাঁরা বললেন, নিজ দলের লোকজনই জামালউদ্দিনকে গুম করেছে। আওয়ামী লীগের নেতা আহসানউল্লাহ মাস্টারকে হত্যা করা হলো, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া সিলেটের জনসভায় গ্রেনেড হামলায় নিহত হলেন, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ছোড়া অসংখ্য গ্রেনেডের হামলায় শেখ হাসিনা বেঁচে গেলেও বর্তমান রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভী রহমানসহ ২২ জন নিহত হলেন। তারপর কী হলো? বিএনপি এক ইলিয়াস আলীর জন্য যেভাবে দেশ অচল করে দিল, তার ছিটেফোঁটাও তো আওয়ামী লীগ তখন করতে পারল না। সম্ভবত তাঁরা কেউই ইলিয়াস আলীর মতো তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন না!
বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য ইলিয়াস আলী অপরিহার্য, সে কারণে সবাই সমবেদনা জানাতে ইলিয়াস আলীর বাসায় ছুটে গেছেন। তাঁকে উদ্ধারের জন্য এক দিন এক দিন করে বিএনপি লাগাতার তিন দিন হরতাল আহ্বান করল। হরতাল শুরুর আগের দিন একজন ঘুমন্ত বাস-ড্রাইভার বদর আলীকে নৃশংসভাবে পুড়িয়ে মারা হলো। পরদিন পিকেটারদের তাড়া খেয়ে পালাতে গিয়ে ক্যাব ড্রাইভার আবদুর রশিদ দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করলেন। ইলিয়াস আলীর নিজ এলাকায় বিশ্বনাথে পুলিশের গুলিতে তিনজন নিহত হলেন। তাঁদের জন্য কেউ তেমন একটা উচ্চবাচ্য করল না। কারণ, তাঁরা কেউই ইলিয়াস আলীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নন। তিন দিনের হরতালে লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর এইচএসসি পরীক্ষা তছনছ হলো। কারও কিন্তু এ ব্যাপারে মাথাব্যথা নেই। বৃহস্পতিবার মির্জা সাহেব বলেছেন, তাঁরা হরতাল দিতে চান না, কিন্তু দিতে বাধ্য হয়েছেন; কারণ দেশের মানুষ নাকি হরতাল চায় এবং পছন্দ করে। এ ব্যাপারে সহকর্মী মুনতাসীর মামুনের একটা মন্তব্য মনে পড়ল। হরতালের তৃতীয় দিনে কারওয়ান বাজারে পিকেটাররা ভোরে একটি নতুন প্রাইভেট গাড়িতে আগুন দিলে মামুন ফোনে আমাকে জানালেন, মনে হয়, জনগণ বিএনপির হরতাল পছন্দ করেছে। কারণ, একজন রাস্তায় তার নতুন গাড়িটা বের করে পিকেটারদের কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগাতে দিয়েছে। তার সঙ্গে দ্বিমত করি কীভাবে? 
সবাই ইলিয়াস আলীর বাড়িতে সমবেদনা জানাতে ছুটে গেলেও একই পাড়ায় বসবাসরত খালেদা জিয়া কিন্তু যাওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি। তিনি তাঁর ২৩ তারিখের সংবাদ সম্মেলনে ইলিয়াসের পরিবারকে তাঁর দপ্তরে হাজির থাকার ব্যবস্থা করেছেন। ইলিয়াস আলীর স্ত্রী প্রথম দিকে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে বেশ সহযোগিতা করলেও খালেদা জিয়ার সঙ্গে হরতালের দ্বিতীয় দিন তাঁর সাক্ষাতের পর থেকে চুপচাপ হয়ে গেছেন। খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেছিলেন, তিনি সরকারকে শনিবার পর্যন্ত সময় দিচ্ছেন ইলিয়াস আলীকে হাজির করার জন্য। তা করতে ব্যর্থ হলে রোববার থেকে নতুন এবং কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। কিন্তু তাঁর তর সইল না। ঠিক পরদিন ১৮ দলীয় মিত্রদের নিয়ে বিএনপি ঘোষণা করল, ইলিয়াস আলীবিহীন শনিবার পার হলেই পরের দুই দিন ফের হরতাল। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ সাংবাদিকদের ডেকে জানালেন, সরকার ইলিয়াস আলীকে জীবিত উদ্ধারের সব চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে এবং তিনি আশা করছেন, এই নেতা দ্রুত উদ্ধার হবেন। না, যেহেতু জনগণ হরতাল পছন্দ করে, সেহেতু তা আগেভাগেই ঘোষণা করে দেওয়া ভালো। আসলে অনেকের মতে, ইলিয়াস আলী এখন বিরোধী দলের রাজনীতির জন্য একটি তুরুপের তাসের মতো। তাঁকে উদ্ধার করতে পারলে তখন বিএনপি কী নিয়ে রাজনীতি করবে? তাদের বলেছি, তারা নতুন একটা ইস্যু খুঁজে নেবে। অসুবিধা হবে না। 
সরকারকে বলি, এক ইলিয়াস আলীকে উদ্ধার করতেই যদি এত সময়ক্ষেপণ হয়, তাহলে দেশের মানুষের তো হতাশ হওয়ারই কথা। তাঁকে তো ইতিমধ্যে হিরো বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন তাঁকে দ্রুত খুঁজে বের করুন। আর বিএনপি সরকার উৎখাতের নতুন কোনো পথ খুঁজতে থাকুক, কারণ বাজেট সেশন তো এসে গেল। কর্নেল সাহেব তো ওই পর্যন্তই এ যাত্রায় সময় বেঁধে দিয়েছেন। ইলিয়াস আলীর অন্তর্ধানে আমি নিজেও তাঁর পরিবারের সঙ্গে সমব্যথিত, কারণ আমারও একটা পরিবার আছে। তবে অনেকের মতে, জীবিত ইলিয়াস আলীর চেয়ে মৃত ইলিয়াস বিরোধী দলের জন্য অনেক বেশি লাভজনক। আমি তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করি।
 আবদুল মান্নান: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

শুক্রবার, ২৭ এপ্রিল, ২০১২

অন্ধকার সুড়ঙ্গে রাজনীতি_ আলো কোথায়?


মাহমুদুর রহমান মান্না
রাজনীতি যে একটি সংঘর্ষের সুড়ঙ্গের মধ্যে প্রবেশ করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। পরিণতি কী হবে সেটাও দৃশ্যমান নয়। ধরেই নেওয়া যেতে পারে যে আমরা যা চাই না, ভাবি না, পছন্দ করি না_ সে রকম একটা কিছু ঘটে যাবে। এসব নিয়ে উদ্বেগ যথেষ্ট এবং তা সর্বমহলে। আরও উদ্বেগের বিষয় যে, এ সুড়ঙ্গ থেকে আলোর পথে উত্তরণের কোনো আন্তরিক চেষ্টা লক্ষণীয় নয়। পর্দার অন্তরালে অনেক কিছু ঘটে। সেটা ভালো হতে পারে, মন্দ হতে পারে। কিন্তু হঠাৎ করে সবাইকে চমকে দিয়ে ভালো কিছু ঘটবে, এমন ভরসা কে দেবে?


দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক। কিছুদিন ধরেই_ আমি নিকট অতীতের কথা বলছি, রাজনীতি সংঘাতের মুখোমুখি। চ্যালেঞ্জ-পাল্টা চ্যালেঞ্জ ধ্বনিত হচ্ছিল সভা-সমাবেশের ভাষণে। সংবাদপত্র ও টেলিভিশন সংবাদের সূত্রে দেশবাসী সব খবরই জানতে পারছে এবং এ উদ্বেগ তাদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে। প্রধান দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পরস্পরের চরম প্রতিপক্ষে পরিণত হয়েছে। কেউ কাউকে ছাড় দিতে চাইছে না।
বিএনপি নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ক্ষমতায় থাকাকালে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে ছিল। কিন্তু আন্দোলনের চাপে তারা এটা মেনে নেয়। বর্তমান মহাজোট সরকার সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের সূত্র ধরে জাতীয় সংসদের মাধ্যমে এ পদ্ধতি বাতিল করে দিলে বিএনপি বিষয়টিকে মেনে নেয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবিতে তারা জনসমাবেশ ও রোডমার্চের কর্মসূচি গ্রহণ করে। ঢাকা থেকে তারা কয়েকটি এলাকায় গিয়ে সমাবেশ করে এবং এতে কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে উৎসাহের সৃষ্টি হয়। জানুয়ারির প্রথম দিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ১২ মার্চ ঢাকায় মহাসমাবেশ অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন। আমাদের জানা আছে, এ সমাবেশ আয়োজনের পথে নানা ধরনের বিঘ্ন ঘটে এবং এ জন্য বিএনপির পক্ষ থেকে সরকারকেই পুরোপুরি দায়ী করা হতে থাকে। তবে শেষ পর্যন্ত নয়াপল্টন ও আশপাশের এলাকাজুড়ে একটি বড় ধরনের সমাবেশ অনুষ্ঠানে তারা সফল হয় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনর্বহালের জন্য সরকারকে তিন মাসের আলটিমেটাম দেওয়া হয়। অন্যথায় ১২ জুন ঢাকায় আরেকটি বড় ধরনের সমাবেশের মাধ্যমে নতুন করে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। এ আন্দোলনের লক্ষ্য কেবল সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল নয়, বরং মহাজোট সরকারের পতন ঘটানো_ এ ধারণাও বিএনপির নেতাদের বক্তব্য-বিবৃতিতে প্রকাশ পেতে থাকে। খালেদা জিয়া সরকারকে 'ল্যাংড়া-নুলা' করে ঘরে পাঠিয়ে দেবেন, জনসমাবেশে এমন মন্তব্যও করেছেন। কর্মী-সমর্থকদের কাছে এ ধরনের কথা বিপুল আনন্দ-উল্লাসের কারণ হলেও তার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া বুঝতে পর্যবেক্ষকদের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এসব ছিল রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্রমশ উত্তাপ বৃদ্ধির ব্যারোমিটার।
বিএনপির দিক থেকে এ ধরনের উত্তাপ ছড়ানো বক্তব্য আসতে থাকলেও দেশের সবচেয়ে পুরনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব কিন্তু তার রাজনৈতিক জবাব প্রদানের চেষ্টা করেননি। বরং তাদের কোনো কোনো নেতা একইভাবে দম্ভ প্রকাশ করতে থাকেন বিভিন্ন সমাবেশে। তারা চিরাচরিত মেজাজে বলেন, আওয়ামী লীগকে আন্দোলনের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। বিএনপি এবং তার মিত্ররা রাজপথে নামলে তারাও সেখানেই পাল্টা শক্তির প্রকাশ ঘটাবেন। ১২ মার্চের সমাবেশের পাল্টা হিসেবে ১৪ মার্চের সমাবেশকে অনেকে এ ধরনের কর্মসূচি হিসেবেই দেখে থাকেন। তবে অস্থির পরিস্থিতির মধ্যেও অনেকের আশা ছিল, 'তিন মাসের আলটিমেটামের মধ্যে' সংলাপ বা এ জাতীয় কিছু একটা ঘটে যেতে পারে। পরিস্থিতির যদি প্রকৃতই বড় ধরনের অবনতি ঘটে, সেটা প্রকাশ পাবে ১১ জুনের পরে।
কিন্তু ইতিমধ্যেই সবাইকে স্তম্ভিত করে দিয়ে ঘটে গেল সাবেক সংসদ সদস্য এবং সিলেট জেলা বিএনপি সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলীর 'নিখোঁজ' রহস্য, যা রাজনীতির জন্য সবচেয়ে উদ্বেগ ও অস্বস্তির ঘটনা। ইংরেজিতে বলতে পারি ডিস্টার্বিং। এ ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টিকারী ঘটনা কে বা কারা ঘটিয়েছে সেটার তদন্ত তো দূরের কথা, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহল সেটা গভীরভাবে ভেবে দেখেছে বলেও প্রতীয়মান হয় না। জনগণের কাছেও বিষয়টি স্পষ্ট নয়। তবে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের আচরণ এবং ঘটনা পরম্পরায় তাদের দিকে সন্দেহের আঙুল উঁচু করেছে। মানবাধিকার নিয়ে কাজ করছে এমন একটি সংগঠন জানিয়েছে, বর্তমান সরকারের মেয়াদকালে অন্তত ১০০ লোক গুম হয়েছে। এর মধ্যে রাজনীতির লোক আছে, বাইরের লোক আছে। সন্ত্রাসীও আছে। এসব ঘটনা কারা ঘটিয়েছে এবং কেন ঘটিয়েছে সে বিষয়ে কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সরকার প্রস্তুত করেছে এবং প্রতিকারের কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে_ সে বিষয়ে সরকার কিছুই জানায়নি। আমাদের এটাও জানা আছে যে, সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির করুণ ও নিষ্ঠুর মৃত্যুর আড়াই মাস পরও এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে একজনকেও চিহ্নিত করা হয়নি, আটক তো দূরের কথা। ভাবতে অবাক লাগে, যে ঘটনা সাংবাদিকসহ বিভিন্ন মহলকে প্রবলভাবে আলোড়িত করেছে সেই ঘটনার শিকার দু'জন সুপরিচিত সাংবাদিকের ভিসেরা টেস্ট করা হয়নি! এটা কীভাবে সম্ভব?
একইভাবে বিস্মিত হতে হয় ইলিয়াস আলীর 'নিখোঁজ' হওয়ার পরের রাতে তার নিজের এলাকা সিলেটের বিশ্বনাথ থানায় তার বিরুদ্ধে ১১ বছরের একটি পুরনো মামলা নতুন করে গ্রহণ করার ঘটনায়। কেন দেশে এমন সব ঘটনা ঘটছে এবং কারা ঘটাচ্ছে তার প্রমাণ থাকুক বা না থাকুক, জনগণ এ জন্য সরকারের প্রতিই কিন্তু আঙুল তুলবে। ইলিয়াস আলীকে ফিরে পেতে বিএনপি ইতিমধ্যে টানা তিনদিন সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালন করেছে। কোথাও কোথাও হরতালের সহিংসতা ঘটেছে। প্রথমদিকে বিএনপি কর্মীরা মিছিল-সমাবেশ-পিকেটিং করতে পারেনি। অনেক ক্ষেত্রে তারা পথে নামতেও ভয় পেয়েছে। কিন্তু এ হরতালের এক পর্যায়ে দেখা গেছে রাজপথে তাদের উপস্থিতি বেড়েছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে 'সাহসী হয়ে' ভাংচুর-অগি্নসংযোগের ঘটনা ঘটাচ্ছে। পুলিশ পিকেটার ও মিছিলকারীদের বিরুদ্ধে কোথাও কোথাও নিষ্ঠুর আচরণ করেছে। আবার তাদের নিশ্চুপ থাকা বা ভাংচুরকে তেমন গুরুত্ব না দেওয়ার কথাও শোনা গেছে। ক্ষমতাসীন কর্মীদের বাড়াবাড়ির ঘটনাও সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে এসেছে। তারা রাখঢাক না করেই প্রতিপক্ষের প্রতি মারমুখী আচরণ করছে।
এ প্রেক্ষাপটেই এসেছে চারদিনের আলটিমেটাম, যা শেষ হবে শনিবার। এ সময়ের মধ্যে অবশ্যই সরকারকে ইলিয়াস আলীকে জীবিত ও সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। অন্যথায় সরকার পতনের জন্য আরও কঠোর কর্মসূচি প্রদান করা হবে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ইলিয়াস আলীকে ফিরে না পেলে কাল রোববার থেকে গ্রামবাংলার সবুজ প্রান্তরে যে আন্দোলনের আগুন জ্বলবে তা নেভানোর ক্ষমতা বর্তমান মহাজোট সরকারের নেই। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নবগঠিত ১৮ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো বুধবার এক সভায় মিলিত হয়ে লাগাতার হরতাল প্রদানের কর্মসূচি দিতে খালেদা জিয়ার প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। ইতিমধ্যে প্রচার হয়ে গেছে, রোববার ও সোমবার টানা ৪৮ ঘণ্টা হরতাল দেওয়া হবে। মনে রাখা চাই, এর আগের দু'দিন সরকারি ছুটি এবং মঙ্গলবার মে দিবসের ছুটি।
রাজনৈতিক অঙ্গনে সংকট যে ঘনীভূত হয়েছে তা নিয়ে দ্বিমত নেই। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাও সর্বত্র। কিন্তু পরিস্থিতি শান্ত করা এবং স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার কোনো কার্যকর উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায় না। বিএনপির তরফে আন্দোলন সর্বাত্মক করার হুমকি রয়েছে। আওয়ামী লীগও আন্দোলনের ভয়ে ভীত নয় বলে হুমকি দিয়ে চলেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আরও কোনো কোনো দায়িত্বশীল নেতা বলেছেন, বিরোধীরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে কঠোরভাবে তা দমন করা হবে। আওয়ামী লীগ কর্মীরাও যে রাজপথে মোকাবেলায় নেমে পড়বে, এমন হুশিয়ারিও শোনা যাচ্ছে।
এসব কথা লিখছি ২৬ এপ্রিল দুপুরে। ২৯ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত দেশে ইতিবাচক কিছু ঘটবে, এমন সম্ভাবনা দেখছি না। এটাও লক্ষণীয়, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ গিয়েছিল মহাজোটের ব্যানারে। সরকার গঠনেও শরিক দলগুলোর কেউ কেউ ঠাঁই পায়। কিন্তু এখন রাজনৈতিক মোকাবেলার সময়ে শরিকরা কেউ সঙ্গে নেই। তাদের কেউ কেউ পরিস্থিতির অবনতির জন্য সরকারকে দায়ী করছে। এইচএম এরশাদ অনেক আগেই অন্য পথ ধরেছেন। মাঠে আওয়ামী লীগ একা এবং প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি তাদের জোট বড় করেছে। কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা হচ্ছে সেটাও দল কিংবা জনগণের কাছে স্পষ্ট নয়।
রাজনীতি যে একটি সংঘর্ষের সুড়ঙ্গের মধ্যে প্রবেশ করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। পরিণতি কী হবে সেটাও দৃশ্যমান নয়। ধরেই নেওয়া যেতে পারে যে আমরা যা চাই না, ভাবি না, পছন্দ করি না_ সে রকম একটা কিছু ঘটে যাবে। এসব নিয়ে উদ্বেগ যথেষ্ট এবং তা সর্বমহলে। আরও উদ্বেগের বিষয় যে, এ সুড়ঙ্গ থেকে আলোর পথে উত্তরণের কোনো আন্তরিক চেষ্টা লক্ষণীয় নয়। পর্দার অন্তরালে অনেক কিছু ঘটে। সেটা ভালো হতে পারে, মন্দ হতে পারে। কিন্তু হঠাৎ করে সবাইকে চমকে দিয়ে ভালো কিছু ঘটবে, এমন ভরসা কে দেবে? বিএনপির স্পষ্ট ঘোষণা, ইলিয়াস আলীকে না পেলে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। তারা বলবে, এমন অবকাশও নেই। এরপরে তো রয়েছে মূল ইস্যু_ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের তিন মাসের আলটিমেটাম, যার অর্ধেক সময় ইতিমধ্যেই অতিক্রান্ত। সংঘাত ছেড়ে সংলাপের পথে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক পক্ষগুলোকে নিয়ে আসার কার্যকর কোনো উদ্যোগ আসবে কি? কেউ কি বরফ গলাতে সক্রিয় হবে?

মাহমুদুর রহমান মান্না :রাজনীতিক

গুম ও গণতন্ত্রের সহাবস্থান কি সম্ভব!


এম আবদুল হাফিজ
ক্ষমতার মেয়াদ যখন ফুরিয়ে আসতে থাকে এ অঞ্চলে যে কোনো দেশের সরকার অস্বাভাবিক আচরণে প্রবৃত্ত হয়। উল্টাপাল্টা কাজ করতে থাকে, বাস্তবতা থেকে ছিটকে পড়ে। শক্তি মদমত্ততার মৌতাতে আবিষ্ট এরা যখন বোঝে যে, তাদের অঙ্গুলি সঞ্চালনে রাষ্ট্রযন্ত্রটি আর চলবে না, সেটি অন্য কারও কর্তৃত্বে চলে যাবে, এমন বাস্তবতার যন্ত্রণা অসহ্য। সেই যন্ত্রণায় এখন মহাজোট সরকার ভুগছে এবং বুঝে না বুঝে একের পর এক তার পদস্খলন হয়েই চলেছে।
কোথা থেকে এ বয়ান শুরু করা যায়? ক'দিন আগেকার টাকার বস্তার মাজেজা দিয়ে? প্রধানমন্ত্রী অবেলায় নিয়োগপ্রাপ্ত রেলমন্ত্রীকে তুরস্ক থেকে এসেই শাসালেন। অনেক নাটকীয়তার পর যে সুরঞ্জিতের পদত্যাগের প্রশ্নই ওঠে না, অথচ বেশকিছু নাটকীয়তার পর পদত্যাগ করলেন, কোনো এক অদৃশ্য হাতের ইশারায় তাকে আবার মন্ত্রিত্বে বরণ করলেন। ইতিমধ্যেই কিন্তু সুরঞ্জিত সেনের সততার কৌমার্য শেষ হয়েছে। তাকে এখন পুরো দেশ, জনগণ এবং সহকর্মীরা সেভাবেই অর্থাৎ ঘুষবাণিজ্যের হোতা হিসেবেই দেখবে। আমাদের এ স্বপ্নের দেশকে রাজনীতিকরা একটি 'পোড়া' দেশে পর্যবসিত করতে সক্ষম হয়েছেন, যেখানে আমাদের জীবনমান জন্তু-জানোয়ারের পর্যায়ে নেমে গেছে। দেখেছেন না, শ্রমিক মজদুরকে কীভাবে ট্রাকের মেঝেতে বা ট্রেনের ছাদে করে স্থান থেকে স্থানান্তরে নিয়ে যাওয়ায়, সড়ক বা রেলপথ দুর্ঘটনায় এদের কিছু মরে, কিছু গন্তব্যে পেঁৗছে_ এভাবেই এরা এ দেশে শুধু বেঁচে থাকতে, টিকে থাকতে জীবন-সংগ্রাম করে। তবু এদের পেটপুরে খাবার সংস্থান হয় না।
প্রাণভরে পান করার বিশুদ্ধ পানি মেলে না, বিদ্যুৎবিহীন আস্তানায় ঠাসাঠাসি করে ঘর্মাক্ত কলেবরে এদের নিদ্রার প্রয়াস। এদের কোনো বিনোদন নেই, প্রত্যাশা পূরণের সম্ভাবনা নেই। আদিম যুগে জন্তুরাও নাকি এর চেয়ে ভালো থাকত। অন্তত তাদের জন্য নিরাপত্তার কোনো হুমকি ছিল না। এখন তো এ দেশের মানুষ নিজ গৃহে, শহরে বা গঞ্জেও নিরাপদ নয়। জীবনের এত সমস্যা, অপূর্ণতা এবং অপ্রাপ্তির মধ্যে আবার 'গুম' নামের আরেক উপসর্গের প্রাদুর্ভাব। হঠাৎ করেই এ রাজধানীর এক প্রাণকেন্দ্র থেকে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক জনপ্রিয় নেতা ইলিয়াস আলী নিখোঁজ। স্বাভাবিকভাবে সারাদেশই এমন নিরাপত্তাহীনতায় হতবাক এবং আতঙ্কগ্রস্ত। প্রত্যাশিত এক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি শিবির তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে এবং কর্মসূচিতে তীব্রভাবে এই সৎ এবং লড়াকু নেতার প্রত্যাবর্তনের জন্য উন্মুক্ত; কিন্তু কোথায় ইলিয়াস, কেউ তার সন্ধান জানে না। যাদের হাতে রাষ্ট্র এবং জনগণের নিরাপত্তা সমর্পিত তারাও সাগর-রুনি হত্যা তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্তদের মতো আবোল-তাবোল বলায় লিপ্ত। এমনকি ইলিয়াস আলীর নিখোঁজে আওয়ামী-শিবির পর্যন্ত বিব্রত এবং শঙ্কিত। কেননা রাজনৈতিক অঙ্গনে এটি একটি মারাত্মক উপসর্গ। যে হারে এ দেশে সরকারের মেয়াদে গুম-অপহরণের ঘটনা ঘটেছে এবং অপহৃতদের সন্ধান ব্যর্থ হয়েছে তা ভয়াবহ। একদিন তা যে রাজনৈতিক শূন্যতায় রূপান্তরিত হতে পারে, সে আশঙ্কায় সারাদেশ এই গুমের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে।
এমন ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে সরকারের যে প্রত্যাশিত ভূমিকা তা এড়িয়ে কর্তৃপক্ষ শুধু ফাপা আশ্বাসদানেই লিপ্ত। এ পরিপ্রেক্ষিতে কখনও কখনও মনে হবে যেন, দেশে কোনো সরকার নেই বা থাকলেও যে কারণেই হোক তাদের কর্তৃত্ব প্রতিফলিত হয় না। মাত্র এক সপ্তাহ আগে তুরস্ক থেকে ফিরে প্রধানমন্ত্রী তার দলবল নিয়ে আবার কাতারে আঙ্কটাড সম্মেলনে। জানি না এমন রুটিন রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্বে স্বয়ং দেশের প্রধান নির্বাহীর উপস্থিতি অপরিহার্য কি-না, তবে এ সংকটকালে জনগণ দেশের নেতৃত্বকে তাদের পথনির্দেশের জন্য দেশেই প্রত্যাশা করে। দেশে এমনিতেই রাজনৈতিক অস্থিরতা। তাতে যে এই গুমের প্রবণতা নতুন মাত্রা যোগ করবে তা নিদ্বর্িধায় বলা যায়। বিএনপি ইতিমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে যে, সরকার যতক্ষণ ইলিয়াসকে ফিরিয়ে না দেবে, লাগাতার ঘর্মঘট চলতে থাকবে। কী জানি দুর্বলতম এ সরকারে এতে কোনো দুর্বলতা নতুন করে ধরা পড়ে নাকি। এ জন্য সরকারও যে মারমুখী প্রতিক্রিয়ায় লিপ্ত হবে তা তাদের শাসানিতেই বোঝা যাচ্ছে। বাংলাদেশ কি এর ফলে উদ্ভূত সহিংসতা ও অস্থিরতা সহ্য করতে পারবে? স্পষ্টই এর ফলে বাংলাদেশের গণতন্ত্র নতুন করে হুমকির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।

ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম আবদুল হাফিজ : সাবেক মহাপরিচালক বিআইআইএসএস ও কলাম লেখক

একটি বাকস্বাধীনতার মামলা ও বাদীর জবানবন্দি



মিজানুর রহমান খান | তারিখ: ২৮-০৪-২০১২
২৪ এপ্রিল ২০১২ অপরাহ্নে আমি ব্যারিস্টার নওশের আলী মোল্লার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলি। সে অভিজ্ঞতা যুগপৎ বিস্ময়কর ও চমকপ্রদ। তিনি রাষ্ট্রদ্রোহিতা (সেডিশন) ও বিশ্বাসঘাতকতার (ট্রিজন) দায়ে আইনের অধ্যাপক আসিফ নজরুলের বিচার চাইছেন। রাষ্ট্রদ্রোহিতার চেয়ে অধম বিশ্বাসঘাতকতা। বাংলাদেশ সংবিধানের ৭ক অনুচ্ছেদমতে, ‘অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতা দখলের কোনো কার্যে সহযোগিতা, উস্কানি বা সমর্থন’ দিলে তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। দণ্ডবিধির ১২৪ক ধারামতে যাবজ্জীবন। আমাদের আইনে অবশ্য ট্রিজনের শাস্তি নেই।
ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ আদালতে এ মামলার শুনানিকালে আসিফ যা বলেননি, তাই নিয়ে মামলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছিলেন। তখন ভাবলাম, তথ্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করি। তখন ভাবিনি, একজন ব্যারিস্টার আদালতের কাছে ভুল উদ্ধৃতি পেশ করতে পারেন। এ নিয়ে নওশের আলীর সঙ্গে ওই দিন দুপুর ১২ টা ২২ মিনিট থেকে ২৬ মিনিট ১১ সেকেন্ড কথা হয়। 
অভিযোগকারী হলফ করে একজন আইনের অধ্যাপককে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত করে আবেদন করার মাস পেরোলেও জানেন না, আসিফ নজরুল অবিকল কী বলেছিলেন। তিনি আমার কাছে আসিফের একটি উক্তি শুনতে ছয়বার অনুরোধ করেন। আমাদের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে, তিনি আদালতে সঠিক তথ্য না দিয়ে হলফ করে অসত্য ও অর্ধসত্য বক্তব্য দিয়েছেন। যদিও তিনি মামলা দায়েরের আগে ১৩ বা ১৪ মার্চ বাংলাভিশনে হাজির হয়ে আসিফের বিরোধপূর্ণ ভাষ্যের সিডি সংগ্রহ করেছিলেন। প্রথম আলো-র সংগ্রহেও এই সিডি আছে।
গত ১২ মার্চ আসিফ নজরুল, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও রিয়াজউদ্দিন আহমেদ বাংলাভিশনে এক আলোচনায় অংশ নেন। মুজাহিদুল ইসলাম এক-এগারোর প্রসঙ্গ তোলেন, যেটা আমরা অহরহ করে থাকি। উপস্থাপকের কথার সূত্রে আসিফের বক্তব্য বাংলাভিশনের টেপ থেকে তুলে দিচ্ছি: 
‘এখানে যদি নেগোসিয়েশনের স্কোপ দুই নেত্রী বন্ধ করে দেন, নেগোসিয়েশনের স্কোপ যদি রি-ওপেন করার চেষ্টা না করে সরকারি দল, তাহলে যে পরিস্থিতি হবে, এখন আমার মাঝে মাঝে মনে হয়—যদি আপনি কিছু মনে করেন না, এটা খুব খারাপ শোনাবে—আমার মনে হয় যদি প্রধানমন্ত্রীর কাছে জিজ্ঞাসা করা হয়, আপনার কাছে অপশন আছে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে অথবা অন্য কোনো শক্তি। আপনি কোনটিতে রাজি আছেন? আমার ধারণা উনি বলবেন, অন্য কোনো শক্তি, বিএনপি না। 
‘যদি বেগম খালেদা জিয়াকে জিজ্ঞেস করা হয়, নেক্সট ইলেকশনে আওয়ামী লীগ আসবে অথবা অন্য কোনো শক্তি আসবে, আমার মনে হয়, উনিও বলবেন অন্য কোনো শক্তি এবং এটা কিন্তু বানানো কথা না, এটা অনেকেই বিশ্বাস করেন। এই লেভেলের যখন তিক্ততা হয়ে যায়, তখন তো অন্য কোনো শক্তিই আসার কথা! ওনারা কি বুঝতে পারছেন যে ওনাদের তিক্ততার মাত্রা এমন পর্যায়ে চলে গেছে, ওই মাত্রাতিরিক্ত তিক্ততার কারণে ওয়ান ইলেভেন হয়েছিল এবং আবারও হতে পারে।’
এ মামলার বাদী নওশের আলী মোল্লা। বয়স প্রায় ৫০। বাড়ি রাজবাড়ী। বাংলাভিশনে সিডি আনতে গিয়ে তিনি অনুষ্ঠানের উপস্থাপক মোস্তফা ফিরোজের কাছে নিজেকে জাসদের সাবেক কর্মী বলে পরিচয় দিয়েছিলেন।
আমি নওশের আলীকে বললাম, ‘আপনি আদালতকে বলেছেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে কী মনে করেন—প্রশ্নটি করেন একজন দর্শক আসিফ নজরুলকে। কিন্তু এটা তো সত্য নয়। প্রশ্নটি করা হয়েছিল সবাইকে। আপনি আদালতকে আরও বলেছেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও...বলবেন সম্ভবত তৃতীয় কোনো শক্তি ক্ষমতায় আসবে এবং এটাকেই তিনি ফেভার করবেন। আসিফ তা বলেননি।’ মিলিয়ে দেখেছি, ‘আসলে এটাকেই তিনি ফেভার করবেন’—এই বাক্যটি পুরোপুরি বানোয়াট। নওশের তখন বললেন, ‘আচ্ছা, তাহলে একটু শোনান তো।’ ওই অংশ তাঁকে অবিকল পড়ে শোনালাম। নওশের বলেন, ‘তিনি তো “তৃতীয় শক্তির” কথাই বলেছেন এবং সেটা আর্মিকেই বোঝাতে চাচ্ছেন। এটা তো হান্ড্রেড পারসেন্ট।’ 
পাঠক, লক্ষ করুন, আসিফ তাঁর ওই মন্তব্যের কোথাও ‘তৃতীয় শক্তি’ বলেননি। নওশের আদালতের কাছে তাঁর আবেদনে নির্দিষ্টভাবে আটবার “দেশ শাসনের জন্য প্রত্যক্ষভাবে অসাংবিধানিক ‘তৃতীয় শক্তি’কে প্রত্যক্ষ উস্কানি” ধরণের বাক্য ব্যবহার করেছেন। বললাম, ‘আপনি একজন ব্যারিস্টার। আপনি নিশ্চয় মানবেন যে অনুমান করা ও নির্দিষ্ট তথ্যের মধ্যে পার্থক্য আছে।’ 
আমি নওশেরের কথায় ভড়কে যাই। কারণ তিনি বললেন, ‘আমাকে কি তাঁর (আসিফের) বক্তব্যের একটা নকল দেওয়া উচিত ছিল না?’ বলি, ‘কে দেবেন?’ তাঁর নিঃসংকোচ উত্তর, ‘কেন তাঁর আইনজীবীরা দেবেন।’ তাঁর আক্ষেপ, ‘আপনারা মিডিয়া পেয়ে গেলেন। আমি পেলাম না।’ আমি বলি, ‘আপনি কী বলছেন এসব?’ ভেবেছিলাম, তিনি হয়তো তাঁর হাতে থাকা সিডির সত্যতা অধিকতর যাচাই করতে মরিয়া। পরে ভুল ভাঙল।
বললাম, ‘আপনি বাকস্বাধীনতার প্রশ্নে মামলা করেছেন। আপনি কি আর কখনো কাউকে “অন্য শক্তি” শব্দ দিয়ে এ রকম ইঙ্গিত করতে শোনেননি?’ নওশের বললেন, ‘আমি পত্রপত্রিকায় দেখেছি এবং শুনেছি। কিন্তু এভাবে প্রধানমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে নয়।’ একপর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন, ‘আসিফ ইঙ্গিত করেছেন।’ 
বললাম, ‘তাহলে সেটাই বলতেন যে তিনি ইঙ্গিত করেছেন।’ আরও বললাম, ‘আসিফ দাবি করেননি যে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। আপনি আপনার নিজস্ব ধারণাকে তথ্য হিসেবে চালাতে পারেন না।’
নওশের তাঁর সঙ্গে আলোচনার ১২ মিনিট পরে নির্দিষ্টভাবে অনুরোধ করেন, ‘আচ্ছা, আপনি একটু আমাকে আসিফের বক্তব্যটা পড়ে শোনান।’ 
আমি তখন সন্দেহ করি, তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খ না শুনেই আদালতে মামলা করেছেন। পরে আদালতে দেওয়া তাঁর আবেদনটি পরীক্ষা করে তার সত্যতা পাই। তখন তাঁকে বলি, ‘তাহলে আপনি কিন্তু মানলেন, আপনার অভিযোগ তথ্যভিত্তিক নয়।’ তাঁর উত্তর, ‘আচ্ছা, বলুন।’ আমি আসিফের উল্লিখিত বক্তব্য পুরোটা পড়ে শোনাই। নওশের নিশ্চিত করেন যে তিনি ওই টক-শোর হুবহু ট্রান্সক্রিপশন পড়েননি। বারের টিভিতে শুনেছিলেন।
নওশের পুরো মনোযোগ ঢেলে দেন আসিফের একটি উক্তি জানতে। ঘটনার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী-সংশ্লিষ্টতা দেখানোই সম্ভবত তাঁর মুখ্য আকর্ষণ। ‘দেখুন, আপনি ওই জায়গাটায় আসুন। যেখানে তিনি বলেছেন, কথাটা শুনতে খারাপ শোনাবে...।’ ব্যারিস্টার নওশের আমাকে প্রধানমন্ত্রী-সংশ্লিষ্ট আসিফের ওই উক্তিটি শোনাতে ছয়বার অনুরোধ করেন। আমি তা রক্ষাও করি। অনুমান করছিলাম, তিনি হয়তো রেকর্ড রাখছেন।
তাঁকে বলেছিলাম, ‘কোথায় আসিফ সামরিক বাহিনীর কথা বলেছেন? “অন্য কোনো শক্তি” মানে তো রাজনৈতিক শক্তিও আমি ধারণা করতে পারি। আপনি বা কেউ বলতে পারেন, আমি তা মনে করি না। কিন্তু এ জন্য দণ্ড দিতে চাইছেন কেন?’
নওশের বলছেন, ‘দেখুন, আদালত সিদ্ধান্ত দেবেন। মিজান ভাই, ওই লাইনটা একটু পড়েন।’ আমি তাঁকে দ্বিতীয়বার পাঠ করে শোনাই। তাঁকে পুনর্বার বলি, ‘আপনি এই “অন্য কোনো শক্তির” মানে অবশ্যই অসাংবিধানিক শক্তি—কী করে তা দাবি করবেন?’ তখন নওশের বলেন, ‘এটা সাব-জুডিশ ম্যাটার (বিচারাধীন বিষয়)। আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না। ১৩ জন (প্রকৃতপক্ষে ১৬) অ্যামিকাস কিউরি, মানে আদালতের বন্ধুরা বিষয়টি ব্যাখ্যা করবেন। আপনি আদালতে আসবেন। তবে ওই কপিটা (আসিফের বিবৃতি), আমি সেটা এখনো পাইনি। আপনি যদি আবার ওই লাইনটা পড়েন।’ এ পর্যায়ে বলি, ‘আমি দরকার হলে ওই লাইনটা আরও পাঁচবার বলব। কিন্তু যে সিডি আপনার হাতে আছে তার বিবরণ আপনি কেন বাদী হয়ে এখন আশা করছেন?’
এর উত্তরে নওশের যা বলেছেন, তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে আসিফের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য না জেনেই তিনি আদালতে নালিশ করেছেন এবং প্রতিকার চেয়েছেন। তিনি আদালতে দেওয়া তাঁর আবেদনের ৬, ৮, ১০ ও ১১ নম্বর পৃষ্ঠায় তার প্রমাণ রেখেছেন। যেমন, “আসিফ নজরুলের কাছে দর্শকের প্রশ্ন ছিল, ‘কে পরবর্তীতে ক্ষমতায় আসছেন, এ ব্যাপারে আপনি কী মনে করেন?’ (পৃ. ১০) এটা তাঁর কাল্পনিক বাক্য।
কেন তাঁর কাছে আসিফের বিবৃতির বিবরণ নেই? আমার এই প্রশ্নের উত্তরে ব্যারিস্টার নওশের বলেন, ‘যেদিন প্রথম শুনানি হয়েছে, সেদিনই আমি আদালতে বাংলাভিশন থেকে আনা সিডিটা জমা দিয়েছি। আমাকে আদালত সেটা এখনো রিটার্ন দেননি। ওই একটাই সিডি। আমার হাতে কপি নেই।’ পুনর্বার বললাম, ‘যে জিনিস আপনি ট্রান্সক্রিপশন করেননি, সেটি আসিফের কাছে চাওয়া কি সংগত?’ তাঁর সরল উত্তর, ‘আমি যেটা ট্রান্সক্রিপশন করব আর প্রতিপক্ষ যেটা করবে, সেটা তো একই হবে।’ বললাম, ‘সে তো ঠিকই। কিন্তু আসিফের বক্তব্য সত্যিই কী, সেটা আমার কাছ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের এক মাস পরে প্রথম শুনলেন, সেটা অবাক ব্যাপার কি না?’
সদুত্তর না দিয়ে তিনি বললেন, ‘আপনি ওই লাইনটা একটু আবার বলেন।’ আমি তাঁকে তৃতীয়বার পড়ে শোনাই। তিনি অন্য কারও বক্তব্য শুনতে চাননি।
১৮ মিনিট পরে বলি, ‘আপনি ভিন্নভাবে নেবেন না। পেশাদারি দিক থেকে বলছি। এ রকম একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী বাকস্বাধীনতার বিষয়, আদালত যেখানে ১৬ জন অ্যামিকাস কিউরিকে ডেকেছেন, সেখানে আপনি না জেনে মামলা করেছেন, আপনার হাতে ট্রান্সক্রিপশন পর্যন্ত নেই।’ তখন তিনি বলেন, ‘কে বলেছে তা নেই!’ কিন্তু পরমুহূর্তেই অনুরোধ, ‘তবে আপনি যদি ওই লাইনটা আরেকবার পড়েন।’ তাঁকে চতুর্থবার পড়ে শোনাই। এবার তাঁকে প্রশ্ন করার আগেই তিনি বললেন, ‘এ ব্যাপারে আমি আপনার সঙ্গে কোনো আর্গুমেন্টই করব না। তবে ওই লাইনগুলো আবার একবার বলুন, প্লিজ।’
আমি বলি, ‘কী মুশকিল, আপনাকে তো এক্ষুনি বললাম।’ কারো উক্তি বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সামগ্রিকভাবে বিবেচ্য। নওশের আলী অবশ্য ষষ্ঠবারের মতো উচ্চারণ করেন, ‘আচ্ছা, তবু আরেকবার বলেন।’
এবার একটু দৃঢ়তা এনে বলি, ‘না, আপনি আমার একটা কথা শোনেন।’ অ্যামিকাস কিউরিদের কাছে ১৫ এপ্রিল প্রেরিত আদালতের পত্র আমি তাঁকে পড়ে শোনাই। যেখানে লেখা, আসিফ নজরুল ‘...ফাউন্ড টু বি হাইলি অ্যান্টি স্টেট ইনভাইটিং আনডেমোক্রেটিক অ্যান্ড আনকনস্টিটিউশনাল থার্ড পার্টি টু রুল দ্য কানট্রি’। আদালতে দেওয়া নওশেরের পিটিশন পড়ে দেখি, এই বাক্য ইংরেজিতে নওশের অবিকল লিখিতভাবে আদালতকে বলেছেন। আমি এসময় তাঁকে বলি, ‘কোথায় আসিফ ‘অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক তৃতীয় শক্তি’কে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন—এসব শব্দ কোথায় পেলেন? তিনি তো বরং দুই নেত্রীর তিক্ততায় শঙ্কিত হয়ে তাঁদের সতর্ক করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। এবারে নওশের বললেন, ‘আপনি যেভাবে আমাকে জেরা করছেন, মনে হচ্ছে, আপনি যেন আরেকজনের পক্ষ হয়ে কথা বলছেন।’ বললাম, ‘আপনাকে প্রশ্ন করা সাংবাদিকতার মধ্যে পড়ে।’
বললাম, ‘আমাদের জানার অধিকার আছে, একজন বার অ্যাট ল হয়ে, যা বলা হয়নি—তা আদালতে গিয়ে কীভাবে বলেছেন। ১৯৭৩ সালের বার কাউন্সিল আইন অনুযায়ী, আপনি এটা পারেন না।’ নওশের বলেন, ‘আমি কী পারি আর না পারি, তা আদালত বুঝবেন। অন্য আইনজীবীরা বলবেন। আপনি সাংবাদিক হয়ে আর কোনো প্রশ্ন করবেন না। আমি ফ্যাক্ট তো বানাইতে পারব না। আমি ফ্যাক্টের বাইরেও যেতে পারব না।’ আমরা তাঁর সঙ্গে এখানে একমত হতে পারি।
এদিকে আরেক বিস্ময়। ব্যারিস্টার নওশেরের আইনজীবী হিসেবে আদালতের ১৫ মার্চের আদেশে অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদের নাম আছে। ২৫ এপ্রিল জানতে চাইলে মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘এটা ভুলে ছাপা হয়েছে। রিট আবেদনকারী নিজেই এ মামলার আইনজীবী।’
জনগণের শেষ ভরসাস্থল সুপ্রিম কোর্টের সুমহান মর্যাদা সুরক্ষার দায়িত্ব সবার। এখানে বার কাউন্সিলের আচরণবিধির তৃতীয় অধ্যায়ের তৃতীয় দফার লঙ্ঘন ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে। এখানে বলা আছে, ‘একজন আইনজীবী ইচ্ছাকৃতভাবে কন্টটেন্টস অব ডকুমেন্টস বা দলিলের বিষয়বস্তু ভুলভাবে উদ্ধৃত করবেন না।’ একজন বার অ্যাট ল বাদী আদালতের প্রতি কর্তব্য পালন করেননি বলে আমাদের মনে হচ্ছে। তিনি বস্তুগত তথ্যাদি চাপা দিয়েছেন এবং সুচিন্তিতভাবে তথ্য বিকৃত করেছেন বলে প্রতীয়মান হয়েছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের গত ১৫ ডিসেম্বরে দেওয়া এক রায়ের বরাতে বলি, ‘আইনজীবীর পেশাগত অসদাচরণ অমার্জনীয়। কারণ আইন পেশা মহত্তম। এটা ব্যবসা-বাণিজ্য নয়। এ পেশার মহত্ত্বে কেউ কালি লাগালে আইনের শাসনের প্রতি জনগণের বিশ্বাসে ফাটল ধরতে বাধ্য।’ 
 মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com